দায় কে নিবে?

আগের সংবাদ

কাশ্মির এবং ৩৫৭ ধারা প্রসঙ্গে

পরের সংবাদ

ডেঙ্গু ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১৬, ২০১৯ , ৮:৪৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ১৬, ২০১৯, ৮:৪৯ অপরাহ্ণ

পাভেল পার্থ

গবেষক, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ

ঢাকা এখন মানুষ ও এডিস মশার দখলে। এককভাবে এই দুই প্রজাতি ছাড়া অন্যান্য প্রাণপ্রজাতি এখান থেকে বিলীন হয়েছে। আর তাই মানুষ ও মশার এই সংকট আরো জটিল ও তীব্র হয়ে ওঠছে। এখানে প্রাণ-প্রজাতির প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও ভারসাম্যের গণিত ভেঙে পড়েছে। ব্যাঙ, চামচিকা, টিকটিকির মতো প্রাণীরা নেই। যারা মশা খেয়ে মশার সংখ্যা প্রাকৃতিকভাবে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করত।

প্রশ্নহীনভাবে ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশের জন্য এক জটিল দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এডিস মশাবাহিত এ রোগটি দুম করে এক-দুই দিনে এমন লাগামহীন হয়ে যায়নি। মোটাদাগে জনস্বাস্থ্যসেবায় সংকট এবং প্রশাসনিক ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উদাসীনতা ডেঙ্গু বিষয়ে সাম্প্রতিক তর্কের ময়দান দখল করে আছে। আড়াল হয়ে পড়ছে পরিবেশগত সংকট ও বাস্তুসংস্থানের বিশৃঙ্খলার বিষয়গুলো। যতটুকু জানা গেছে বাংলাদেশে এই ডেঙ্গু ছড়িয়েছে মূলত ঢাকা অঞ্চল থেকেই। নিদারুণ পরিবেশ-যন্ত্রণায় কাতর এই মহানগরকে আমরাই প্রতিদিন আমাদের জন্য বিপজ্জনক করে তুলছি। এই ছোট্ট নগর আর আমাদের দুঃসহ দূষণ ভার সইতে পারছে না। আমরা নির্দয়ভাবে ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, তুরাগ ও বালু নদীকে হত্যা করে চলেছি। উনিশ খালসহ সব জলাশয় উধাও করে দিয়েছি। নতুন প্রজন্মের জন্য এক চিলতে ফাঁকা মাঠ কী ময়দান আমরা অবশিষ্ট রাখছি না। এই নগরের ক’টি উদ্যানই বা সুস্থ আছে? অল্প বর্ষাতেই এই শহর ডুবে ভেসে একাকার হয়ে যায়। লাগামহীন নগরবর্জ্যরে যন্ত্রণার ভেতর দিয়েই শুরু হয় আমাদের প্রতিটি ভোর। ভ্যাপসা গরমে এই নগরে টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে। একের পর এক আগুনে ছাই হয়ে যায় কত সাজানো সংসার। বসতঘরের চারধারে আমরা মজুত করেছি রাসায়নিক বিস্ফোরক, আশপাশে গড়ে তুলেছি প্লাস্টিকসহ বিনাশী কারখানা। অনেক কষ্টে ট্যানারিকে কিছুটা দূরে সরাতে পেরেছি, কিন্তু তাও আর দূরে কই! একটু প্রাণ ভরে দম নেয়ার জন্যও বিষহীন বাতাস কই এই নগরে? সব দিক দিয়েই ঢাকা আজ এক পরিবেশ-সংকটাপন্ন শহর। আর এই পরিবেশ বিপর্যস্ত অঞ্চল নানা সময়ে নানাভাবে মানুষের জন্য তৈরি করছে দুঃসহ যন্ত্রণা।
ডেঙ্গু কী চিকুনগুনিয়া এমনি এক পরিবেশগত তীব্র সংকটের নিদারুণ নির্দেশনা। ডেঙ্গু মানুষের প্রাণ যাচ্ছে, দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে প্রতিটি পল বিপল অনুপল। নানামুখী প্রশ্ন ও তর্ক থাকলেও বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থা জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করছে ডেঙ্গু মোকাবেলায়। মশকনিধনের নানা প্রক্রিয়া ও তৎপরতা নিয়ে বাহাস চলছে। সবাই একমত যে, চলমান ডেঙ্গু সংকট মোকাবেলায় আমাদের দরকার এক সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কর্মকৌশল। পরিবেশব্যবস্থায় সুস্থতা না থাকলে ম্যালেরিয়ার পর চিকুনগুনিয়া এরপর ডেঙ্গু একের পর এক দুঃসহ যন্ত্রণা প্রকট হয়ে ওঠবে। পাশাপাশি জটিল শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, বহুমূত্র, ক্যান্সারসহ জটিল রোগের বিস্তার ঘটবে। ডেঙ্গুকে কেবল কোনো এক বছরের মৌসুমি সংকট হিসেবে না দেখে ডেঙ্গুসহ এমন সব জটিল যন্ত্রণা মোকাবেলায় এই প্রসঙ্গগুলো রাষ্ট্রীয় মূলচিন্তা হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। ডেঙ্গু নিয়ে আমাদের প্রবল মনস্তত্ত্বে সামগ্রিক পরিবর্তন দরকার। এটি তো এমন নয়, কোনো এক মৌসুমে এডিস মশার বিস্তার বেশি হবে আর মানুষ আক্রান্ত হবে। তারপর আমাদের মশকনিধন ও স্বাস্থ্যসেবা তৎপরতা শুরু হবে। ডেঙ্গুসহ এমন সব নাগরিক যন্ত্রণার মর্মমূলে আমাদের ফিরে তাকানো জরুরি। কেন এবং কোন পরিবেশে মশার বিস্তার ঘটছে, আবহাওয়া ও জলবায়ু এবং সামগ্রিক বাস্তুসংস্থানের সঙ্গে এর নানামুখী সম্পর্ক কেমন? ভূগোল, শ্রেণি ও বর্গ বিশেষে এর বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ কেমন? কোনো বিশেষ সংস্থা, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে দোষারোপ নয় আমাদের সবার যার কাছে যতটুকু নথি, গবেষণা ও অভিজ্ঞতা আছে তা দিয়ে ডেঙ্গু মোকাবেলায় আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডার গড়ে তোলা সম্ভব। এক্ষেত্রে আমাদের মৌলিক প্রশ্ন হলো, ‘মশা কেন বাড়ছে?’ এই প্রশ্নের উত্তর নানাভাবে আমাদের তলিয়ে দেখা জরুরি। আর এর নানামুখী উত্তরই আমাদের সামগ্রিক ডেঙ্গু মোকাবেলার সব সূত্র সামনে তুলে ধরতে পারে। যা মশা জরিপ থেকে শুরু করে আগাম সতর্ক বার্তা, রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা, মশক নিয়ন্ত্রণ, সক্রিয় চিকিৎসাসেবাসহ সামগ্রিক নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দুই.
নগর কী গ্রাম প্রতিটি অঞ্চলেই এক এক ধরনের প্রাণব্যবস্থাপনা ও বৈচিত্র্যের ব্যাকরণ থাকে। আমরা ঢাকা শহরের প্রাণব্যবস্থাপনা ও বৈচিত্র্যের ব্যাকরণ নিয়ে তুমুল উদাসীন। গ্রাম কী শহর প্রতিটি জনপদেই কেবল মানুষ নয়, আরো নানা প্রাণপ্রজাতি থাকে। তৈরি হয় এক ঐতিহাসিক প্রতিবেশসূত্র ও স্বতন্ত্র বাস্তুসংস্থান। এই বাস্তুসংস্থানে নানামুখী খাদ্যশৃঙ্খল তৈরি হয়। যখন কোনো বাস্তুসংস্থানে কোনো একক প্রজাতি নির্বিকারভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে এবং অন্যসব বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে তবে সেই বাস্তুসংস্থান চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়ে। বহুমুখী সংকট সেখানে তৈরি হয়। মহানগর ঢাকার ক্ষেত্রে তাই ঘটে চলেছে। এখানে এককভাবে সবকিছু কেবল মানুষের জন্য তৈরি হচ্ছে, সবকিছু এখানে কেবল মানুষের জন্যই। এভাবে কোনো অঞ্চলের স্বকীয় প্রতিবেশসাম্য তৈরি হয় না। প্রাণ-প্রকৃতির ব্যাকরণ অটুট থাকে না। ঢাকা এখন মানুষ ও এডিস মশার দখলে। এককভাবে এই দুই প্রজাতি ছাড়া অন্যান্য প্রাণপ্রজাতি এখান থেকে বিলীন হয়েছে। আর তাই মানুষ ও মশার এই সংকট আরো জটিল ও তীব্র হয়ে ওঠছে। এখানে প্রাণ-প্রজাতির প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও ভারসাম্যের গণিত ভেঙে পড়েছে। ব্যাঙ, চামচিকা, টিকটিকির মতো প্রাণীরা নেই। যারা মশা খেয়ে মশার সংখ্যা প্রাকৃতিকভাবে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করত। মশক নিয়ন্ত্রণে কেবল রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণের কথাই ভাবা হচ্ছে। যা সাময়িক সংকট সামাল দিলেও এর এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি সুরাহা নয়। মশক নিয়ন্ত্রণে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ ও জনগোষ্ঠীভিত্তিক ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক সমন্বয় ঘটানো জরুরি। কারণ একতরফাভাবে কীটনাশক ছিটিয়ে মশার লার্ভা কী মশা মেরে মশার সামগ্রিক বিস্তার ঠেকানো অসম্ভব। কারণ মশার ডিম যা কয়েক মাস অবধি জীবন্ত থাকে এবং আবার উপযুক্ত পরিবেশে জন্ম নেয়। এই নগরের প্রকৃতিতে প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। দীর্ঘমেয়াদি সংকটহীন জীবন কাটাতে নগরের এই প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল ব্যবস্থাকে আমলে নিতে হবে। মশার ওপর নির্ভরশীল প্রাণী জগতের সুরক্ষার প্রতি মনোযোগী হতে হবে। ঐতিহ্যবাহী মধুপুর গড়ের একটি অংশ ঢাকাতে। শালবনের এক অতীত স্মৃতি আছে এই ঢাকার মাটিতে। সতেরো শতকেও ঢাকার বনাঞ্চলে বাঘ, চিতাবাঘ দেখা গেছে। এক হিসাবে দেখা যায়, ১৮০৪ সালে ঢাকায় ২৭০টি বাঘের চামড়া এবং ১৯০৭-১৯১০ পর্যন্ত ১৩টি বাঘের চামড়া শিকারিরা জমা দেয়। ১৮৩৭ সাল অবধি প্রতি বছর কমপক্ষে একজন এখানে বাঘের হামলায় নিহত হয়েছে। বনবিড়াল, বনশূকর, বুনোমহিষ, বানর, শেয়াল, গন্ধগোকূল, বেজি, ইঁদুর, সাপ, খরগোশ, সজারু, বাদুড়, চামচিকা, ভোঁদড় আর নানা জাতের পাখির বিচরণ ছিল এই মহানগরে। নিদারুণভাবে সব হারিয়ে এই নগর আজ মানুষ আর মশাকে একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
তিন.
চলমান ডেঙ্গু সংকট কাটাতে মশা নিয়ন্ত্রণে এখনো পর্যন্ত কেবল রাসায়নিক ব্যবস্থাপনার কথাই আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা বিশ্বব্যাপী নানাভাবে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সংকট তৈরি করছে। এককালে আমরা ডিডিটি ব্যবহার করেছি, এই আমরাই আবার ডিডিটি ধ্বংস করতে এক বিশাল প্রকল্প সমকালে হাত নিয়েছি। ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই আণবিক শক্তি কমিশনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সভায় বিশেষজ্ঞ কমিটি ম্যালাথিয়ন ৫৭% ইসি, ম্যালাথিয়ন ৫% আরএফইউ, ডেল্টামেথ্রিন + পিআরও ২% ইডব্লিউ এবং প্রিমিফোস-মিথাইল ৫০% ইসি এই চারটি রাসায়নিক কীটনাশককে মশকনিধনে সুপারিশ করে। জানা গেছে, বিপিএল লিমিটেড কোম্পানির ম্যালাথিয়ন ৫৭% ইসি কীটনাশকটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বাতিল কীটনাশক তালিকায় আছে। পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলায় ২০০৭ সালে এর নিবন্ধন বাতিল হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের অর্থায়নে আইসিডিডিআরবির করা ২০১৭-১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে ঢাকা শহরের এডিস মশা আংশিক ডেল্টাম্রেথ্রিন ও ম্যালাথিয়ন প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। মশা নিয়ন্ত্রণের রাসায়নিক নিয়ে এখনো তর্ক চলছে। পরিবেশগত প্রশ্ন নয় বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফা বাণিজ্য। কেবল রাসায়নিক দমন নয়, ডেঙ্গু নিরসনে স্টোরাইল ইনসেক্ট টেকনিক (এসআইটি) প্রসঙ্গ আলোচিত হচ্ছে। এভাবে প্রকৃতিতে কৃত্রিমভাবে বন্ধ্যা পুরুষ মশার বংশ বাড়িয়ে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে তা এখনো পরীক্ষিত নয়। তারপরও দেশজুড়ে মানুষ চাইছে রাষ্ট্র সক্রিয় হোক, দ্রুত একটা কিছু করুক। এডিস মশার বংশ ও বিস্তার দ্রুত নির্মূল হোক। অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে এখন হয়তো রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া সামনে আর কোনো সহজ কৌশল নেই। তাই যতটা সম্ভব জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ প্রশ্নকে বিবেচনা করে রাসায়নিক ব্যবস্থাপনার নিয়মনীতি মেনে দ্রুত এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তবে দীর্ঘমেয়াদি মশক নিয়ন্ত্রণে অবশ্যই আমাদের পরিবেশগত ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় কর্মপন্থা তৈরি করা দরকার।

পাভেল পার্থ : গবেষক, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ।