বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটনে কমিশন কবে

আগের সংবাদ

ফেনীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৭

পরের সংবাদ

পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে আনা অনিশ্চিত

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১৫, ২০১৯ , ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ১৫, ২০১৯, ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ

Avatar

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত ৬ খুনিকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি এখনো আইনি ও ক‚টনৈতিক জটিলতার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। যে কারণে চ‚ড়ান্ত রায় ঘোষণার প্রায় ১০ বছর পরও ফাঁসি কার্যকর করা যায়নি ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ চালানো ওই হায়েনাদের। তবে পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার কথা জানিয়েছেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। আগামী বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকীতে এ প্রচেষ্টায় সফলতা আসতে পারে বলে আশা করছেন তারা।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর নিম্ন আদালত ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে উচ্চ আদালত থেকে ৩ জন খালাস পান। বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় মামলার কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ আবারো নির্বাচিত হলে মামলাটি গতি পায়। ২০০৯ সালে লিভ টু আপিলে ১২ জনের ফাঁসির রায় বহাল থাকে। এর আগেই ৫ খুনিকে কারাবন্দি করতে সক্ষম হয় সরকার।
২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি কারাবন্দি ৫ খুনিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এরা হলেন কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, লে. কর্নেল (অব.) মহিউদ্দিন আহমদ (ল্যান্সার), মেজর (অব.) এ কে বজলুল হুদা এবং মেজর (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন (আর্টিলারি)। এদের মধ্যে মহিউদ্দিন আহমদকে ২০০৭ সালের ১৭ জুন বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে ওই খুনি রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে যুক্তরাষ্ট্র তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। ১৯৯৮ সালে খুনি বজলুল হুদাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায় থাইল্যান্ড সরকার। আরেক পলাতক খুনি আবদুল আজিজ পাশা ২০০১ সালের ২ জুন জিম্বাবুয়েতে মারা যান।
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত বাকি ৬ খুনি খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এ এম রাশেদ চৌধুরী, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, আবদুল মাজেদ ও মোসলেম উদ্দিন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে পলাতক রয়েছেন। এরা সবাই সাবেক সেনা কর্মকর্তা। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক।
গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটিতে আইন, বিচার ও সংসদ, পররাষ্ট্র এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
তিনি বলেন, পলাতক খুনি নূর চৌধুরী কীভাবে কানাডায় বসবাস করছেন (লিগ্যাল স্ট্যাটাস) এ সম্পর্কে তথ্য দিতে কানাডা সরকারকে বাধ্য করতে ফেডারেল কোর্ট অব জাস্টিসে আবেদন করা হয়েছে। আরেক পলাতক আসামি রাশেদ চৌধুরীকে আমেরিকা থেকে ফিরিয়ে আনতে ক‚টনৈতিক ও আইনি কার্যক্রম নেয়া হয়েছে। আইনগত বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে সেখানে আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অন্য পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনতেও টাক্সফোর্স কাজ করছে। তাদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেডঅ্যালার্ট জারি করা হয়েছে।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানান, পলাতক সব খুনির ব্যাপারেই সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে সরকারের কাছে। খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করার জন্য প্রশাসনিক, গোয়েন্দাভিত্তিক ও ক‚টনৈতিকসহ সরকারের বহুমাত্রিক উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু আইনি প্রতিবন্ধকতা এবং বিশেষ বিশেষ রাষ্ট্রের আন্তরিকতার অভাবে বিষয়গুলো অনিশ্চিয়তার মধ্যে রয়েছে।
পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে আনতে এবং তাদের ব্যাপারে তথ্য চেয়ে সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, লিবিয়া, পাকিস্তান, জার্মানিসহ বেশ কয়েকটি দেশকে চিঠি দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে রাশেদ চৌধুরীকে আমেরিকা থেকে এবং নূর চৌধুরীকে কানাডা থেকে ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে আশ্বাস পাওয়া গেছে। তারা বলেন, বন্দি বিনিময় চুক্তি না থাকার পরও আমেরিকা খুনি মহিউদ্দিন আহমদকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দিয়েছিল। ক‚টনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে এবারো সেটি সম্ভব হবে। বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপনের বছরেই (২০২০) তাদের ফিরিয়ে এনে ফাঁসি কার্যকর করতে আশাবাদী তারা।
জানা গেছে, রাজনৈতিক আশ্রয়ে কানাডায় পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি এস এইচ এম বি নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনতে সরকার বিভিন্নভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নূর চৌধুরীকে ফেরত দেয়ার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সে দেশের আইন। কানাডা কোনো মৃত্যুদণ্ডাদেশ সমর্থন করে না। তাই কোনো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে রায় কার্যকরের জন্য দেশে ফেরত না পাঠানোর পক্ষে দেশটির অবস্থান রয়েছে। পলাতক খুনি খন্দকার আবদুর রশিদ ও শরিফুল হক ডালিম লিবিয়ায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। আর আবদুল মাজেদ স্পেনে ও মোসলেম উদ্দিন জার্মানিতে রয়েছেন।
প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর খুনিরা প্রথমে ঢাকা থেকে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে যান। এরপর ব্যাংকক থেকে করাচি হয়ে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার একটি বিশেষ ফ্লাইটে লিবিয়ার ত্রিপোলিতে চলে যান। পরে জিয়াউর রহমান এবং এইচ এম এরশাদের শাসনামলে অনেক খুনিকে বিভিন্ন মিশনে নিয়োগ দেয়া হয়। এরশাদের সময়ে ফারুক, রশিদ ও হুদা ঢাকায় রাজনীতি করার সুযোগ পান। খালেদা জিয়ার প্রথম শাসনামলেও খুনিদের এসব সুযোগ সুবিধা বহাল থাকে।