সাময়িকী

আগামীকাল টুঙ্গিপাড়া যাবেন প্রধানমন্ত্রী

আগের সংবাদ

জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশ

পরের সংবাদ

সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্রতী বঙ্গবন্ধু

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১৪, ২০১৯ , ৫:৫৪ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ১৪, ২০১৯, ৫:৫৪ অপরাহ্ণ

Avatar

আজকের এই জাতীয় শোক দিবসে সাধারণ মানুষের প্রতি অন্তপ্রাণ মানবিক বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করছি। একেবারে ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মানবিকতার এক বরপুত্র। গরিবের দুঃখে দুঃখী বঙ্গবন্ধুর পুরো জীবনটাই অসংখ্য মানবকল্যাণধর্মী উদ্যোগে ভরা ছিল। তিনি ছিলেন দুর্যোগ দুঃসময়ে জেগে ওঠা সাহসী মানুষ। সংগ্রামী নেতা।
১৯৩৬ সাল। শেখ মুজিবের বয়স তখন মাত্র ষোলো। মাদারীপুর স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। নেতাজি সুভাষ বসুর স্বদেশি আন্দোলনের একজন কর্মী হতে সচেষ্ট। ইংরেজকে বিদায় করে স্বাধীনতা আনার স্বপ্ন তাঁর চোখেমুখেও। কিন্তু চোখের অসুখের কারণে লেখাপড়ায় বিঘœ ঘটায় ১৯৩৭ সালে বাবার কর্মস্থল গোপালগঞ্জে মিশন স্কুলে ভর্তি হন। সেই বয়সেই শেখ মুজিব শিক্ষক কাজী আব্দুল হামিদের নেতৃত্বে গড়ে তোলেন ‘মুসলিম সেবা সমিতি’। উদ্দেশ্য গরিব ছাত্রদের সেবা করা। সেজন্য আশপাশের বাড়ি থেকে মুষ্টি-ভিক্ষার চাল উঠাতেন। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্ম-জীবনী’তে এসবের বর্ণনা আছে।
১৯৩৮ সালে বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং শ্রমমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ সফরে আসেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মিশন স্কুল পরিদর্শন করেন তিনি। সেখানেই তাদের আগমন উপলক্ষে গঠিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর নেতা বালক শেখ মুজিবের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। তাঁর সাংগঠনিক সক্ষমতা দেখে মুগ্ধ সোহরাওয়ার্দী তাঁকে কলকাতায় তাঁর সাথে দেখা করতে বলেন। ১৯৩৯ সালে কলকাতায় তাদের দেখা হলো। এভাবেই তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করলেন। হলেন গোপালগঞ্জ মুসলিম ছাত্রলীগের সম্পাদক। লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজনীতি করতে থাকেন শেখ মুজিব। ১৯৪১ সালে মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে ফের গেলেন কলকাতায়। সোহরাওয়ার্দীর সাথে ঘনিষ্ঠতা আরো বাড়লো। ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হলেন। স্থানীয় মুসলিম লীগ সংগঠনেও তিনি বড় ভ‚মিকা রাখতে শুরু করলেন। ১৯৪৩ সালে শুরু হলো ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। লাখ লাখ লোক মারা যায়। সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে তিনি দুর্ভিক্ষ কবলিত মানুষকে বাঁচানোর জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। গোপালঞ্জেও দুর্ভিক্ষ পীড়িতদের জন্য নানা সাংগঠনিক উদ্যোগ নেন। এই সময়টায় তিনি জমিদারদের অন্যায় অত্যাচার স্বচক্ষে দেখে বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন। আর সে কারণেই বিকল্প ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পক্ষে ছিলেন তিনি।
এরপর মুসলিম লীগ রাজনীতির নানা উত্থান-পতন তিনি খুব কাছে থেকে দেখেছেন। দাঙ্গাপীড়িত মানুষদের বাঁচানোর জন্য তিনি স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে সুদূর আসানসোল গিয়ে ত্রাণশিবির খুলেছিলেন। এর আগে ১৯৪৬ সালে সিলেট গণভোটে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হলো। তিনি ফিরে এলেন পূর্ব বাংলায়। ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে আইন বিভাগে। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গড়লেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। শুরু করলেন ছাত্র রাজনীতি। আর অংশগ্রহণ করলেন ভাষা আন্দোলনে। একই সাথে সাধারণ মানুষের আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ভ‚মিকা রাখতে শুরু করলেন।
সরকার তখন কর্ডন প্রথা চালু করেছিল। এক জেলা থেকে অন্য জেলায় কোনো খাদ্য যেতে পারবে না। তিনি লিখেছেন, “ফরিদপুর ও ঢাকা জেলার লোক, খুলনা ও বরিশালে ধান কাটবার মৌসুমে দল বেঁধে দিনমজুরি হিসেবে যেত। এরা ধান কেটে ঘরে উঠিয়ে দিত। পরিবর্তে একটা অংশ পেত। এদের ‘দাওয়াল’ বলা হতো। হাজার হাজার লোক নৌকা করে যেত। আসবার সময় তাদের অংশের ধান নিজেদের নৌকা করে বাড়ি নিয়ে আসত। এমনিভাবে কুমিল্লা জেলার দাওয়ালরা সিলেট জেলায় যেত। এরা প্রায় সকলেই গরিব ও দিনমজুর। প্রায় দুই মাসের জন্য ঘরবাড়ি ছেড়ে এদের যেতে হতো। যাবার বেলায় মহাজনদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে সংসার খরচের জন্য দিয়ে যেত। ফিরে এসে ধার শোধ করত। দাওয়ালদের নৌকা খুবই কম ছিল। যাদের কাছ থেকে নৌকা নিত তাদেরও একটা অংশ দিতে হতো। যখন এবার দাওয়ালরা ধান কাটতে গেল কেউ তাদের বাধা দিল না। এরা না গেলে আবার জমির ধান তুলবার উপায় ছিল না। …যখন এরা দুই মাস পর্যন্ত ধান কেটে তাদের বুভুক্ষু মা-বোন-স্ত্রী ও সন্তানদের খাওয়ার জন্য, যারা পথ চেয়ে আছে, আর কোনো মতে ধার করে সংসার চালাচ্ছে কখন তাদের স্বামী, ভাই, বাবা ফিরে আসবে ধান নিয়ে, পেট ভরে কিছু দিন ভাত খাবে, এই আশায় তখন নৌকায় রওনা করার সাথে সাথে তাদের পথ রোধ করা হলো। …শেষ পর্যন্ত সমস্ত ধান নামিয়ে রেখে লোকগুলোকে ছেড়ে দেয়া হলো। এ খবর পেয়ে আমার পক্ষে চুপ করে থাকা সম্ভব হলো না। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ করলাম।” (ঐ, পৃষ্ঠা ১০৩-১০৪)। এই প্রতিবাদ তীব্র পর সরকার সিদ্ধান্ত নিলেন ধান কাটতে দাওয়ালরা যেতে পারবেন। তবে ধান তাদের নিজ বাড়িতে আনতে পারবেন না। স্থানীয় গোডাউনে রেখে রসিদ নিবেন। সেই রসিদের ভিত্তিতে নিজ এলাকার গোডাউনে গিয়ে অধিকাংশ দাওয়ালই ধান পাননি। ফরিদপুরের দাওয়ালরা সরকারি হুকুম না মেনে নৌকা নিয়ে নিজ বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর লঞ্চ নিয়ে পুলিশ বাহিনী তাদের ধাওয়া করে তাদের ধরে ফেলে। ধান নামিয়ে নেয়া হয়। সেই ধান বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। সরকারি গুদামে যায়নি। ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। এর প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু দাওয়ালদের নিয়ে শোভাযাত্রা করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বাড়িতে গিয়ে দেনদরবার করেছেন। গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনের বঙ্গবন্ধুর এ ধরনের প্রতিবাদের বিবরণ খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন ১৯৪৮ সালের ৪ এপ্রিল ফরিদপুরের এস এন একাডেমিতে অনুষ্ঠিত জনসভায় বস্ত্র, খাদ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সংকটের কথা তিনি বলেছেন। অনুরূপভাবে ১৯৪৮ সালের ১ জুন তারিখে অনুষ্ঠিত নরসিংদীর ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় তিনি বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির দাবি করেন।

একই সঙ্গে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবিও জানান। তা ছাড়া তিনি গরিব মানুষের করের টাকায় প্রশাসনের উচ্চ সারির কর্মকর্তা, মন্ত্রী, পার্লামেন্টারি সেক্রেটারিদের উচ্চ বেতনের সমালোচনা করেন। খুলনাতে একই বছর ১৩ ডিসেম্বরের এক সভায় শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর দাবি করেন। ১৯৪৭ সালের ১৩ জুলাইয়ের অন্য আরেকটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে একটি লিফলেটের উদ্ধৃতি দিয়ে শেখ মুজিবকে ‘অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলনের’ পুরোধা বলে বর্ণনা করা হয়। তাঁর নেতৃত্বে আন্দোলনের মূলে ছিল গরিব মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করা।
পরবর্তীকালে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে জিতে মন্ত্রী হিসেবেও তিনি পূর্ব-বাংলার কৃষক, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এরপর ওই মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়া হয়। তিনি ১৯৫৬ সালে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে পূর্ব-বাংলার উদ্যোক্তা শ্রেণির জন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ নেন। যেমন : প্রাদেশিক সরকারের হাতে আমদানি লাইসেন্স ইস্যু করার ক্ষমতা হস্তান্তর, প্রাদেশিক সরকার কর্তৃক পাট, তুলা ও তৈরি পোশাকের মতো শিল্পগুলোর নিয়ন্ত্রণ, পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশে) আমদানি-রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের একটি কার্যালয় এবং সাপ্লাই এন্ড ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের মহাপরিচালকের একটি কার্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ এবং অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার অন্তত ৫০ শতাংশ পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশের) জন্য বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেয়ার দাবি তিনি তোলেন। জাতীয় চা বোর্ডের সভাপতি হিসেবেও তিনি চা শিল্পের উন্নয়নে ইতিবাচক উদ্যোগ নেন। বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবনা অনুসারে ১৯৫৭ সালের জানুয়ারি থেকে পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ এ দেশীয় কর্তৃপক্ষের হাতে আসার কথা। এ সব অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি পাকিস্তানের দুই অংশের অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্রটি ভালোভাবে বুঝতে পারেন। তাই তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে পনেরোশ মাইল ভৌগোলিক দূরত্বে অবস্থিত দুই অঞ্চলের জন্য ‘দুই অর্থনীতি’ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। পূর্ব-বাংলায় জনসংখ্যার আধিক্য, কর্মসংস্থানের অভাব, এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে শ্রমিকের আসা-যাওয়া প্রায় অসম্ভবের মতো কারণগুলোই এই অর্থনৈতিক বৈষম্যের মূলে বলে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান। এর পাশাপাশি পূর্ব-বাংলার অর্থনীতিবিদরাও ‘দুই অর্থনীতি’র ধারণাকে তথ্য ও যুক্তি দিয়ে সমর্থন জানান। সেই ধারণার আলোকেই বৈষম্যের মাত্রা বোঝার জন্য বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক কমিশন স্থাপনের দাবি জানান। তাঁর প্রস্তাবনা অনুসারে একটি অর্থনৈতিক কমিশন গঠনও হয়েছিল।
এরপর সামরিক শাসন জারি হলো। বঙ্গবন্ধু চলে গেলেন জেলে। জেল থেকে বের হয়ে এই অর্থনীতিবিদ ও কিছু সরকারি কর্মকর্তাদের সহায়তা নিয়ে তিনি তৈরি করলেন ‘ছয় দফা’। দুই অর্থনীতির ধারণাকে রাজনৈতিক গতি দেয়ার জন্যই তিনি এই ছয় দফা আন্দোলনকে বেগবান করেছিলেন। দুই অঞ্চলে স্ব স্ব উদ্যোগে শিল্পায়ন, মুদ্রানীতি, বৈদেশিক মুদ্রনীতি, সুদের হার নীতিসহ এমন কিছু দাবি এই ছয় দফায় যুক্ত করেছিলেন তিনি যা কার্যত পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার দাবির পর্যায়েই পড়ে। খুব স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানি অভিজনরা তাঁর এই আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করে এবং জেলে আটকে রাখে। এক পর্যায়ে দেশদ্রোহিতার মামলাও দেয় তাঁর বিরুদ্ধে। গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা ঊনসত্তরের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁকে মুক্ত করে। মুক্ত হয়েই তিনি দল গোছাতে শুরু করেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাঁর দল নিরঙ্কুশ বিজয়ী হয়। প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের তিনিই একমাত্র বৈধ মুখপাত্র। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের এলিটরা তাঁর নেতৃত্ব মানতে রাজি ছিলেন না। তাই এমন বিপুল বিজয় সত্ত্বেও তিনি অসহযোগ আন্দোলন শুরু করতে বাধ্য হন। ৭ মার্চ ডাক দেন মুক্তির। এরপর শুরু হয় গণহত্যা। ২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তাঁকে আটক করে পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। শারীরিক অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তাঁর নেতৃত্বেই চলে মুক্তিযুদ্ধ। দেশ স্বাধীন হয়। বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি স্বদেশে ফিরেই নতুন দেশের পরিচালনার দায়িত্ব নেন। শুরু হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির নয়া সংগ্রাম।
এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের জন্য বঙ্গবন্ধু ছিলেন অন্তপ্রাণ। তাই শোকের এই মাসে তাঁরা ভাবেন এ দেশটি আরো কত আগেই না অন্তর্ভুক্তি উন্নয়নের স্বাদ পেতো যদি না বঙ্গবন্ধুকে হঠাৎ এমন করে চলে যেতে না হতো। যদিও তাঁর সুকন্যা পরবর্তী পর্বে এসে গরিব-দুঃখীর দুঃখ মোচনের নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। বঙ্গবন্ধু যখন যেখানে গিয়েছেন সেখানেই উদাত্ত কণ্ঠে বলেছেন মানুষের উন্নয়নে কথা। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের মাঝে বরাবরই প্রস্ফুটিত হয়েছে এটি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শনে সর্বাগ্রে অগ্রাধিকার পান এ দেশের সাধারণ জনগণ। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই তিনি প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন, সংবিধান-প্রণয়ন, এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন, যুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী, পুলিশ, বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) পুনর্গঠন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষাব্যবস্থার সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক স্কুল পর্যন্ত বিনামূল্যে এবং মাধ্যমিক শ্রেণি পর্যন্ত নামমাত্র মূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ, মদ, জুয়া, ঘোড়দৌড় ইত্যাদি ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধকরণ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন, নতুন ১১ হাজার প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠাসহ মোট ৪০ হাজার প্রাথমিক স্কুল সরকারিকরণ, দুস্থ মহিলাদের কল্যাণে নারী-পুনর্বাসন ব্যবস্থা, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন, ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফসহ প্রায় ৩০ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণ, কৃষকদের মাঝে দেড় লাখ গাভি ও ৪০ হাজার সেচপাম্প বিতরণ এবং ব্যাপক কৃষি উৎপাদনে উৎসাহ দেয়ার জন্য ‘বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কার’ প্রবর্তন করেন। এ ছাড়াও বিনা/স্বল্পমূল্যে কৃষকদের মধ্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত ব্যাংক-বীমার ও ৫৮০টি শিল্প ইউনিটের জাতীয়করণ ও সেসব চালুর মাধ্যমে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান, সার কারখানা, আশুগঞ্জ কমপ্লেক্সের প্রাথমিক কাজ ও অন্যান্য নতুন শিল্প স্থাপন, বঙ্গ শিল্পকারখানা চালুসহ একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়।
স্বাধীনতা লাভের এক বছরের মধ্যেই দেশ পুনর্গঠনে বহুমুখী কর্মসূচি গ্রহণ, পুরো দেশবাসীকে এ কাজে উজ্জীবিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর নেয়া পদক্ষেপসমূহ আশাতীত সাফল্য অর্জন করে। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ব্রিজ, কালভার্ট, সেতু নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান চলাচল-ব্যবস্থার উন্নয়ন, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার পুনর্গঠন. দক্ষ পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন, উত্তর-দক্ষিণ শীতল রাজনৈতিক মেরুকরণে দেশেকে ‘জোট নিরপেক্ষ সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বৈরিতা নয়’ নীতিতে প্রতিষ্ঠিত করা, পাঁচশালা পরিকল্পনা প্রণয়ন, আদমশুমারি ইত্যাদি কর্মপ্রয়াসে বঙ্গবন্ধু তাঁর সাড়ে তিন বছরের দেশ পরিচালনায় প্রমাণ রেখে গেছেন কতটা গণহিতৈষী ছিলেন। সাধারণ মানুষের মঙ্গলের বাইরে আর কিছুই তাঁর ভাববার ছিল না। শুধু তুচ্ছ ছিল তাঁর প্রাণ। যা তিনি করে গেছেন দান আগামীর সৃমদ্ধ বাংলাদেশের জন্য।