সোনাক্ষির অন্যরকম প্রচারণা

আগের সংবাদ

রাত পোহাবার একটু আছে বাকি

পরের সংবাদ

একজন গাহকের ঢাকা যাত্রা

রফিকুর রশীদ

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১৪, ২০১৯ , ৪:৫৬ অপরাহ্ণ

লোকটাকে কিছুতে ঠেকানো গেল না, সে ঢাকা যাবেই, তার চোখমুখের অভিব্যক্তি দেখে বেশ স্পষ্ট বুঝা যায় এখনই ঢাকার উদ্দেশে রওনা না-হলেই নয়; যত দ্রুত সম্ভব ঢাকায় তাকে পৌঁছুতেই হবে।
কেন, ঢাকায় কী কাজ তার?
নিভৃত এক পাড়াগাঁয়ের অতি সাধারণ মানুষ সে, নিজের গায়ের একমাত্র জামাটিরও উল্টো-সিধা যে বোঝে না ঠিকমতো, ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট এবং শতেক রকম গলি তস্যগলির কীইবা চেনে, কেমন করে যাবে ঢাকায়? তার বাপ-দাদা কেউ কোনো কালে ঢাকা দেখেছে এমন ইতিহাসও কারো জানা নেই, নিকটজনের মধ্যে কারো বিবরণ থেকে ঢাকা শহরের সাধারণ চিত্র জানার সুযোগও হয়নি তার। তবু সে ঢাকা যাবে, কে যেন মাথার দিব্যি দিয়েছে তার, কাজেই এখন না গেলেই নয়। সে যাবেই।
ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবার আগে যাদের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে, তারা অনেকেই এ সময়ে পথে পা বাড়াতে নিষেধ করেছে। দেশের অবস্থা সত্যিই বিশেষ ভালো না, দিনেদুপুরে খুনখারাবি ছিনতাই-ডাকাতি হরহামেশা হয়েই চলেছে, এই আতান্তর সময়ে তার মতো সহজ সরল সাধারণ একজন মানুষ অচেনা অজানা গন্তব্যে যাত্রা করে কোন সাহসে! সারল্য শুধু নয়, তার স্বভাবের মধ্যে প্রখর অনুভ‚তিসম্পন্ন কবিত্বশক্তির উপস্থিতি দেখা গেছে। চারিপাশে অঘটন-সুঘটন যাই ঘটুক, তার মনে ধরে গেলেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে গানের কলি অথবা কবিতার পঙ্ক্তি। চারণ কবি মুখে মুখেই গান বাঁধে, ক্লান্তিহীন গেয়ে বেড়ায় পথে পথে। সেই মানুষ গান থামিয়ে চলে যাবে ঢাকায়!
সে এক সময় ছিল বটে, যখন এই মানুষের মধ্যে অনেকেই তাকে ঢাকায় যেতে প্ররোচিত করেছে, যারা এখন ঢাকায় যাবার সম্ভাব্য বিপদের কথা ভেবে উৎকণ্ঠিত, তারাই কত না অবলীলায় একদা তাকে প্রলুব্ধ করেছে যাও, ঢাকায় গিয়ে তোমার গান শোনাও গে। সেটাই হবে কাজের কাজ।
চোখেমুখে অবিশ্বাসের ছায়া দুলে ওঠে তার। সলজ্জ ভঙ্গিতে প্রতিবাদ করে সে,
সিখানে আমার গান শোনবে কিডা! ঢাকায় কি গাহকের অভাব?
তাকে বুঝিয়ে বলা হয়;
না না গাহক নয়, বড় বড় অনেক শিল্পী আছে ঢাকায়, দিনরাত রেডিওর মধ্যে কত রকম গান গায় তারা; কিন্তু তোমার গান একেবারেই আলাদা। তুমি ঢাকায় যাও ভাই।
প্রস্তাব শুনে অন্তরে বেশ খুশির ঢেউ জাগে, আবার সংশয়ও জাগে সবাই তার সারল্যের সুযোগ নিয়ে ঠাট্টা করছে না তো! এমন কী আছে তার গানে! ঢাকার মানুষ শুনবে কেন তার গান?
ভেতরের এই খচখচানি সে সম্পূর্ণ ঢেকে রাখতে পারে না, মুখের মানচিত্রে ঠিকই ছায়া ফুটে ওঠে। একজন অন্যজনকে ছাপিয়ে এগিয়ে এসে আঙুল নেড়ে নেড়ে পরামর্শ দেয় ঢাকায় যাও দেখি, দেশের রাজা তো থাকে ঢাকায়, রাজাকে শোনাও গান। তবেই যদি হয় কোনো সমাধান।
সমাধানের কথা উঠছে এই জন্য যে, লোকটার গানের ভেতরে অসংখ্য সমস্যার কথা থাকে, সামাজিক নানা সংকটের ছবি থাকে। গাহক তার গানে গানে এইসব অসঙ্গতি ও সংকটের সমাধান খোঁজে, প্রতিকার চায়। শুরুর দিকে তার মন মজেছিল মুক্তিযুদ্ধে। গানের পরতে পরতে মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট নানান ঘটনার বর্ণনা। সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, পঁচিশে মার্চের পৈশাচিক হামলা, শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুঃখ-ক্লেশ, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ লড়াই, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ও আত্মসমর্পণ এবং বীর বাঙালির বিজয় লাভ এই ছিল তার অধিকাংশ গানের বিষয়বস্তু। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সব গানের শেষে ভনিতা অংশে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার সকাতর আহ্বান থাকবেই ‘ও আমার দেশের নায়ক, দেখে যাও আসিয়া/ তোমার তরে আমজনতার দুচোখ যায় ভাসিয়া…।’ সে যে কোথায় পেয়েছে এই সম্বোধন কে জানে, সবার মতো করে বঙ্গবন্ধু বা জাতির পিতা বলে না, বলে সে দেশের নায়ক, গভীর আন্তরিকতার সঙ্গেই আহ্বান জানায়। দেশের নায়ক তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন নিয়ে মহাব্যস্ত, কোথাকার এক নামগ্রোত্রহীন গাহকের আহ্বানে সাড়া দেবার সময় সুযোগ তিনি পাবেন কোথায়! গাঁও গেরামের মানুষ তখনো পরামর্শ দিয়েছে ঢাকায় যাবার। বুঝিয়ে বলেছে বঙ্গবন্ধুই বলো আর দেশের নায়কই বলো, তিনি থাকেন তো সেই ঢাকায়, তুমিও যাও, ঢাকায় গিয়ে তোমার গান শুনিয়ে এসো। কেউ কেউ অন্যভাবেও প্রলুব্ধ করেছে তুমি চেনো তাঁকে? তাঁর বুকের দুয়ার হাট করে খোলা। যাও না, ঢাকায়, তোমার এ সব গান একবার তাঁর কানে ঢুকলেই জনম সার্থক। বলা যায় না বিরাট কোনো পুরস্কারও জুটে যেতে পারে। যাও, ঢাকায় যাও।
না, গাহক নিজের গাঁও গেরাম ছেড়ে বেশি দূরে যেতে রাজি নয়। থানা শহর আর মহকুমা শহর পর্যন্ত যে দু’চার দফা গেছে, বেশিক্ষণ দাঁড়ায়নি, বেলায়-বেলায় নিজ গ্রামে ফিরে তবে স্বস্তি। রেলগাড়ি দেখার কৌত‚হল নিয়ে সে স্টেশন পর্যন্ত ঘুরে এসেছে, ঢাকা যেতে হলে এখান থেকে রেলগাড়িতে চেপে যেতে হয় গোয়ালন্দ ঘাট, তারপর নদী পেরিয়ে মোটরবাসে সোজা ঢাকা এসব বিবরণ খুব ভালো জানে, তাই বলে সে ঢাকায় যাবে! কেন যাবে, কী কাজে যাবে? গান শোনাতে! দেশের নায়কের কাছে সে পৌঁছুতে পারবে! না, এত দূর ভাবতেও সে রাজি নয়। গান গেয়ে সে আনন্দ পায়, গান গেয়েই যাবে পথে পথে, ঢাকায় যাবে কী করতে?
হ্যাঁ, পুরস্কারপ্রাপ্তির ব্যাপারটাও সে ভেবে দেখেছে। গান বেঁধে সেই গান মানুষকে শুনিয়ে সে বিমল আনন্দ পায়, এই আনন্দটুকুই তার পুরস্কার; এর অধিক কীইবা তার প্রত্যাশা আছে মনে! দশ দিগরের মানুষ যে গান শুনে তাকে বাহবা দেয় (এমন কি ফুলের মালাও পরিয়ে দেয়া হয়েছে তাকে), এ কি তার পুরস্কার নয়! না না, এর বেশি লোভী সে হতে পারবে না। গাঁয়ের মানুষ সে গাঁয়েই থাকতে চায়, চারপাশের মানুষের সুখ-দুঃখ আশা-নিরাশার কথা গানের বাণীতে সাজিয়ে গেয়ে শোনাবে, এর চেয়ে আনন্দের আর কিছু নেই তার কাছে। ভেতরে ভেতরে খুনখুনিয়ে হেসে ওঠে লোকটা, নিজের সঙ্গে নিজেই যেন পরিহাসে মেতে ওঠে কী হে গাহক, পুরস্কার নিবা না?
লোভ তার থাক আর না-ই থাক, একদিন এক রাজকীয় পুরস্কার তাকে টেনে নিয়ে যায় মহকুমা মহরে। এমসিএ সাহেব ডেকে পাঠিয়েছেন, গান শুনবেন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তিনি, সংসদের ভেতরে বাইরে কত কাজ তার, তবু তিনি গান শুনবেন, পেয়াদা এসে জানিয়ে গেল। তারপর মান্নান মেম্বার এসে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসিয়ে টেনে নিয়ে যায় টাউনে। এমসিএ সাহেবের বাড়ির সামনে এসে কী কেলেঙ্কারি যে ঘটে যায়, সাইকেলের প্যাডেল থেকে পা হড়কে একগাদা মানুষের মধ্যে দু’জনের সে কী লটরপটর দুর্দশা! গায়ের ধুলোবালি ঝেড়ে উঠে দাঁড়াতেই মান্নান মেম্বর চোখ রাঙিয়ে তাকায়, তীব্র ভর্ৎসনা করে ওঠে তোর জন্যেই তো এই হাল, সাইকেল নড়ালি কেন? হ্যান্ডেল কেঁপে গেল যে!
গাহক নির্বিবাদে ঘাড় কাত করে সমস্ত দায়-দোষ মেনে নেয়। ইচ্ছে করে সে হ্যান্ডেল কাঁপায়নি বটে, তবু অঘটন তো একটা ঘটে গেছে। অগত্যা কী আর করা! অকারণে হি হি করে হেসে চেহারায় উদ্ভাসিত বিব্রতকর ভাবটা আড়াল করতে তৎপর হয়। নিজে থেকেই ঘোষণা দেয় গাহক-মানুষ তো, গান গাওয়া ছাড়া অন্য কুনু কাজ তো করতি পারিনি।
গোল হয়ে ঘিরে থাকা মানববৃত্তের মধ্যে থেকে কে যেন কুটুশ করে মন্তব্য করে গান গাওয়ার মজা দ্যাখাচ্ছি দাঁড়া!
গা ছমছম করে গাহকের। চোখ তুলে তাকায়, মন্তব্যকারীকে শনাক্ত করার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। সেই লোকটা অতিদ্রুত অনেকের মধ্যে মিশে যায়। এমসিএ সাহেব গটমট করে সামনে এসে সোজাসুজি জিগ্যেস করেন,
তুই গান বাঁধিস?
ঘাড় মাথা চুলকাতে চুলকাতে বিনয়ের সঙ্গে সে জানায়,
জ্বি আমার গান আমি নিজেই বাঁধি, আবার নিজেই গাই।
কী গান বাঁধিস বল দেখি, পল্লীগীতি?
পল্লীসুরেই গাওয়া হয়। আগে বাঁধতাম মুক্তিযুদ্ধের গান, শোনবেন একটা?
মুক্তিযুদ্ধ ছেড়ে এখন কীসের গান বাঁধা হয়?
সমাজ-সংসারের কত কিছু নিয়িই তো গান বাঁধা যায় হুজুর। আমি গান বাঁধি সমিস্যা নিয়ি। মানুষের কত রকম যে সমিস্যা আছে!
সমিস্যা মানে হচ্ছে সমস্যা। মুক্তিযুদ্ধের বিষয় থেকে সরে এসে গাহক এখন সামাজিক নানান সমস্যা নিয়ে গান বাঁধে। তবে গানের ভনিতাতে সেই আগের মতোই দেশের নায়কের কাছে তার আহ্বান থাকে তিনি যেন অন্তত একবার এই দেশগ্রামে এসে সরেজমিনে দেখে যান মানুষের সমস্যার চিত্র। তার এ আহ্বান দেশের নায়কের কান পর্যন্ত পৌঁছেনি হয় তো, এমসিএ সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে বড্ড সাধ জাগে সেই সব গান শোনাতে। তাই সে প্রস্তাব রাখে,
মুক্তিযুদ্ধের গান দিয়ি শুরু করি তাহলি!
রাখ তোর মুক্তিযুদ্ধ! গর্জে ওঠেন এমসিএ সাহেব সমিস্যার গান কী রকম?
সে তো অনেক রকম গান আছে হুজুর, রিলিফ-চুরির গান শোনাব?
কে রিলিফ চুরি করেছে?
সে-কতা গানে গানেই শোনবেন। শুরু করব?
চোপা থামা তোর। রিলিফ-চুরি তুই দেখেছিস?
আমার আবার দেখা। দেশের লোক যা দেখে, যা বলে, আমি সেই কতা গানে বাঁধি, সুরে গাই।
এমসিএ সাহেব গরগর করে ওঠেন।
আমার জামাইকে নিয়ে তুই গান বেঁধেছিস?
জামাই! গাহক জানেই না কে এমসিএ সাহেবের জামাই। অবাক চোখে সে মান্নান মেম্বরের মুখের দিকে তাকায়। মেম্বর তখন সূত্র ধরিয়ে দেয়,
কেন, রসুলপুরের হামিদ মাস্টারকে নিয়ে গান বাঁধোনি তুমি?
হ্যাঁ, গান আছে তো! গাবো সেই গান লোকে বলে হামিদ ডাকাত…
হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে এমসিএ সাহেব ঠাস করে চড় বসিয়ে দেন গাহকের গালে। এরপর তার শিষ্য-সাগরেদরাও হাতের সুখ মিটিয়ে দক্ষিণা দেয় গাহককে। ন্যায্যমূল্যের দোকানের মালপত্তর লুটপাট করে বর্ডারে চালান করার অভিযোগে রক্ষীবাহিনী এসে হামিদ মাস্টারকে ধোলাই দিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায়। আবার এক সপ্তার মধ্যে ছাড়াও পেয়ে যায়। সে সময় হামিদ মাস্টারের অবৈধ সম্পদের পরিমাণ নিয়ে কত রকম কেচ্ছা যে রটে যায়। সেই কেচ্ছাকে গানে গানে বেঁধেছে, এই হচ্ছে গাহকের অপরাধ। এমসিএ সাহেবের বড় ভাইয়ের জামাই হামিদ মাস্টার সে-খবর সে নেয়নি কেন? যার তার নামে এভাবে থুতু ছিটানো চলে!
সে দিন আর এমসিএ সাহেবকে গান শোনানো হয়নি গাহকের, কেবল নিজের মান খোয়ানোই হয়েছে। তারপর প্রায় মাসখানেক সে মন খারাপ করে গুম ধরে বসে থেকেছে, নতুন গান বাঁধেনি, পুরানো গানও গায়নি। এমসিএ সাহেবের কাছে অপমান হবার এই ঘটনা ভেতরে ভেতরে দানা বেঁধে গানের কলি হয়ে বাগযন্ত্রের দরজায় এসে বেশ ক’দিন ধাক্কা দেয়, কিন্তু সে শক্ত হাতে গলা টিপে ধরে, সেই কলি আর স্ফুট হতে দেয় না। তবু গানের শক্তির কাছে শেষ পর্যন্ত তাকে হার মানতেই হয়। প্রতিদিনই চারপাশে কত না অনিয়ম-অসঙ্গতি ঘটে চলেছে, খুনখারাবি-লুটতরাজ লেগেই আছে, পেটের ভাত পরনের কাপড়ের দাম হু হু করে বেড়েই চলেছে; বাস্তবে এই সব দৃশ্য দেখেও আশা মেটে না গ্রামের সাধারণ মানুষের, তারা গাহকের গানে গানে এসবের বয়ান শুনতে চায়, দিনের পর দিন তাকে প্ররোচিত করে। ফলে এক সময় বাঁধ ভেঙে যায়, বানের স্রোতের মতো ভেসে আসে গানের কলি, নিজের উপরে আর নিয়ন্ত্রণ থাকে না তার। এমন কি মান্নান মেম্বরের হুমকি-ধামকিকেও সে আর পরোয়া করে না।
কিন্তু ভাবনার কথা হচ্ছে, লোকটা এত সাহস পায় কোথা থেকে! সে তো অতি সামান্য মানুষ, অতি সাধারণ মানুষ! তার মতো মানুষের শক্তি সাহসের উৎস কোথায়! এ প্রশ্নের উত্তর সে সোজাসুজি দিতে চায় না, গলা ছেড়ে গান গেয়ে ওঠে প্রবল প্রত্যয়ে ‘ও ভাইরে ভাই, এই জনগণ জাগলে তখন রক্ষা কারো নাই…।’ তবে কি জনগণের জাগরণের উপরেই তার ভরসা? স্বাধীনতার পরও জনগণের শোষণ-বঞ্চনা-প্রতারণার তো শেষ হচ্ছে না, ভাগ্যের কোনো বদল হচ্ছে না, গরিব মানুষ আরো গরিব হচ্ছে, কেউ কেউ আবার আঙুল ফুলে কলাগাছও হয়ে যাচ্ছে, তা হলে এই সব মানুষ দাঁড়াবে কোথায়, কোন ভরসায়!
গাহকের বুকে ভয়-ডর বলে কিছু নেই। হিতাকাক্সক্ষী কেউ কেউ সাবধান করে, অমুকের দুর্নীতির গানটা চেপে যাবার পরামর্শ দেয়, গানের ভেতরে রক্ষীবাহিনীর কথা না-বলার কথা বলে: গাহক এসব কানেই তোলে না; গেয়ে ওঠে ভরাট কণ্ঠের গান ‘ওরে ভয় নাইরে নাই/ আমার নেতা জাতির পিতা/ চলো তাহাকে জানাই।’ তার মানে বঙ্গবন্ধুই তার অন্তরে সাহসের অনির্বাণ বাতি জ্বালিয়ে রাখেন। সবাই ঠেলাঠেলি করে তা হলি তুমি একবার ঢাকায় যাও, নেতার সামনে গিয়ে দাঁড়াও।
‘মাথা খারাপ!’ গাহক একগাল হাসি ছড়িয়ে নিজেকে সরিয়ে নেয়, উপস্থিত ভক্তদের পরামর্শ দেয় ‘তুমরা দল বাঁধো। ঢাকায় যাও। দেখা কর। বুঝিয়ে বলো দেশের কথা। অবশ্যই শোনবে। তুমরা যাও।’
কে একজন তখনো যুক্তি দেখায় আমাদের মুখের কথা আর তুমার গানের মদ্যি আকাশ-পাতাল তফাৎ। তুমিই যাও।
যাব। সুসময় হলি আম্যু একদিন যাব ঢাকায়।
শুনে সবাই আশ্বস্ত হয়। কিন্তু সেই সময় যে কখন হয় সেটাও দেখার বিষয়।
চারপাশে কত কিছুই ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত। কটা ঘটনা নিয়ে গান বাঁধবে গাহক। ব্যাংক-ডাকাতি, পুলিশ-ফাঁড়ি থেকে অস্ত্র লুট লেগেই আছে; কুমারখালীর এমএনএ কিবরিয়া সাহেবকে হত্যা করা হলো ঈদের জামাতে কত কথা লেখা যায় গানে গানে! উত্তরবঙ্গে কে এক বাসন্তী লজ্জা নিবারণের জন্যে মাছ ধরার জাল পরে আছে বস্ত্রের অভাবে, খবরের কাগজে ছাপা ছবি দেখিয়েছে এক শিষ্য, তবু বিশ্বাস হয় না গাহকের। ক’দিন পরে নিজের স্ত্রীর পরনে ছেঁড়া-ফাটা শাড়ি দেখে আঁতকে ওঠে সে, বেশ কয়েক হাটে ঘুরে ঘুরে উচ্চমূল্যের জন্যে শাড়ি কিনতে পারেনি, সেই কথা মনে পড়ে যায়। তবে কি নিজের বউয়ের এই বেহাল দশা নিয়ে গান বাঁধবে এবং হাটেখাটে সেই গান গেয়ে বেড়াবে!
সে দিন রাতে ঘুম আসে না গাহকের চোখে। বারবার ভেসে আসে একটি মুখের ছবি। কোনোদিন তো কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়নি, কাগজে মুদ্রিত পোস্টারে নানান রকম ছবি দেখেছে। দেশের নায়ক। কত রকম যে ছবি আছে তার। থাকবেই তো! সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এতদিন পর সবগুলো ছবিতেই নায়কের চোখে বিষণ্ণতা ছলকে উঠছে কেন! তবে কি ভালো নেই দেশের নায়কের মন! গাহকেরও মন খারাপ হয়ে যায়। ঘুমন্ত স্ত্রীর পাশ থেকে উঠে সে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে। উঠোনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায়। মেঘে ঢাকা শ্রাবণ-আকাশ অন্ধকারে নত হয়ে আছে, যে কোনো সময় ঝরে পড়বে অশ্রুধারায়, তারই প্রস্তুতি চলছে সারা আকাশজুড়ে ঝলসে ওঠা বিদ্যুতের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। গাহকের তখন নতুন গান বাঁধার সাধ হয়। সে গানের বিষয়বস্তু আর কিছু নয়, শুধুই বঙ্গবন্ধু। না, তাঁর কাছে কোনো কিছু চাওয়া নয়, দেশের সংকট-সমস্যার কথা জানানো নয়, তাঁর চোখের কোণে কেন অশ্রুবিন্দু জমা হয়েছে তাই নিয়ে একটা গান বাঁধতে ইচ্ছে করে। কিন্তু শব্দগুলো কিছুতে গুছিয়ে আসে না, ঠিকমতো ধরা দিতে চায় না। বারবার চেষ্টা করে শব্দের গায়ে শব্দ গাঁথা হয়ে ওঠে না; তখন গাহক শুধু দেশের নায়ক শব্দযুগল উচ্চারণ করতে করতে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে। স্ত্রীর পাশে শুয়েও তার ঠোঁট জোড়া বিড়বিড় করে তড়পায় ‘দেশের নায়ক’ বলে বলে। সে রাতে গাহকের চোখে ঘুম আসুক আর না-ই আসুক, ভোরবেলার দিকে চোখের পাতা ভারী হয়ে স্বপ্ন নেমে আসে। সেই স্বপ্নের সূত্র ধরে সকালে উঠেই সে ঘোষণা দেয় আমি ঢাকায় যাব।
স্ত্রী চমকে ওঠে,
ঢাকায় যাবা ক্যানে?
কাজ আছে।
কী কাজ?
দেশের নায়ক স্বপ্নে আমাক ডাইকিছে।
স্ত্রীর কণ্ঠে বিস্ময় তুমাক ডাইকিছে!
হ্যাঁ, আমি স্বপ্নে দ্যাখলাম যে! হাত-ইশারায় ডাকলো…
দেশের নেতা তুমাক চেনে? তুমার নাম জানে?
চেনেই তো! সব মানুষকে চেনে! আমরাই অনেকে তাকে চিনতি পারিনি।
গাহকের স্ত্রী এবার ফ্যাঁচ করে কেঁদে ওঠে। গাহককে জড়িয়ে ধরে বলে,
তুমি ঢাকায় গেলি আমার কী হবে?
কী আবার হবে, আমি কি চিরকালের জন্যি যাচ্ছি?
স্বপ্নের কথা শুইনি কেউ এ্যামুন কইরি নাচে! পাগল হয়িচো?
না না, আমাক যাতিই হবে। অনেক কতা আছে, তাকে বুলিতে হবে। দেখা হলিই কতা হবে। কতা হলিই আমি চইলি আসপো।
এরপর কেউ আর গাহকের গতিরোধ করতে পারে না। ঢাকায় সে যাবেই। যারা এক সময় তাকে ঢাকায় যাবার জন্য পীড়াপীড়ি করেছে তাদের মধ্যে অনেকেই আপত্তি জানায়, বুঝিয়ে বলে দেশের অবস্থা ভালো না, এ সময় ঢাকায় যাওয়া ঠিক হবে না। দু’একজন তো প্রবল বাধা দেয়, কাঁধে থাবা দিয়ে বলে স্বপ্নের কথা আর বাস্তবের কথা এক হলো! বঙ্গবন্ধু কোথায় থাকে জানো? সেখানে পৌঁছাতে পারবা?
গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে গাহক জানায়, যেভাবেই হোক সে ঠিকই পৌঁছে যাবে দেশের নায়কের কাছে। অনেক কথা জমা হয়ে আছে। দেশের নায়ক সেটা জানে বলেই তো ডেকে পাঠিয়েছে। অত বড় মানুষের ডাক না-শুনে কি পারে! দেখা করেই সে গ্রামে ফিরে আসবে।
বাংলা দেশের ইতিহাসে পরদিন সকালটা আসে একেবারে অন্যরকম ভাবে। আঁতকে ওঠে দেশের মানুষ, চমকে ওঠে বিশ্ববিবেক এটা সম্ভব! বাঙালির যে-নেতাকে পাকিস্তানিরা পারেনি হত্যা করতে, কতিপয় পথভ্রষ্ট বাঙালি সৈনিক তা-ই করে বসল! ঢাকাসহ সারা দেশ স্তব্ধ। কে বলবে অজপাড়া গাঁয়ের সামান্য এক গাহক ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল কিনা, দেশের নায়কের দেখা পেয়েছিল কিনা। তবে তাকে আর গ্রামে ফিরতে কেউ দেখেনি। অনেক দিন পর গ্রাম্য মসজিদের ইমাম মৌলানা মো. তকিউল্লাহ আচনক এক তথ্য প্রকাশ করেন। ঢাকা-যাত্রার আগের রাতে স্বপ্ন দেখে গাহক নাকি তাঁর কাছে গিয়ে জানতে চেয়েছিল ভোররাতের স্বপ্ন কি সত্যি হয় হুজুর?
কেন, কেন, কী স্বপ্ন দেখেছিস ব্যাটা?
ইমাম সাহেব এভাবেই সম্মোধন করেন সবাইকে। সবাই তাঁর আপন। গাহক নামাজ পড়ে না জেনেও কটু কথা বলেন না। গাহক তাই পরম নির্ভরতায় স্বপ্নবৃত্তান্ত জানায় দেশের নায়ক উঁচু পাহাড় থেকে নিচে নেমে যাবার সময় হাত বাড়িয়ে তাকে ডেকেছেন। এ স্বপ্নের মানে কী? চোখের জলে বুক ভাসিয়ে ইমাম সাহেব জানান, এ যে বড়ই অশুভ স্বপ্ন ব্যাটা।
গাহক তখনই ঢাকায় যাবার সিদ্ধান্ত ফাইনাল করে ফেলে।