ঈদ-অর্থনীতি

আগের সংবাদ

সাভারে পশুবোঝাই ট্রলার ডুবি, ৯ গরুর মৃত্যু

পরের সংবাদ

ভূমি এখন তার মাথায় পা রাখে সে কোথায়

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১০, ২০১৯ , ৬:৩০ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ১০, ২০১৯, ৭:৪৮ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

ধরা যাক লোকটি একজন ফেরিওয়ালা। মাথায় তার চাঙাড়ি, বিক্রি করে মাছ। গ্রামে নয়, শহরেই, এই রাজধানীতেই। হাঁক দিয়ে যায় পাড়ায় পাড়ায়। কিন্তু একদা সে গ্রামে ছিল। জেলে নয়, চাষি। জমিজমা বেদখল ও ভাগাভাগি হয়ে গেছে। যা ছিল সেটুকু হাতছাড়া হওয়ার আগে বিক্রি করে দিয়ে এখন ফেরিওয়ালা হয়েছে। ভূমি এখন তার মাথায়, বিক্রি করে পাওয়া টাকাটাই পুঁজি। কত টাকার মাছ আছে তার ঝুড়িতে? হাজার তিনেক! সে মাছ সে খায় না। খাবার কথা স্বপ্নেও ভাবে না। তার স্ত্রী মাছ রান্না করছে, সে পরিবারের সবাইকে নিয়ে গোল হয়ে বসে মাছে-ভাতে খাবার খাচ্ছে এটা স্মৃতি হিসেবে ঝাপসা, স্বপ্ন হিসেবে সুদূরের। কিন্তু এখন সে পা রাখে কোথায়? জনাকীর্ণ, মানুষের ভারে ডুবুডুবু ঢাকায় তার আশ্রয় কোনখানে? কোন বস্তিতে? আমরা জানি না। জানার আগ্রহ নেই। জানা সম্ভব নয়।
তবে এটা নিশ্চিত জানি যে, এবারের ঈদে যে হাজার হাজার, হাজার কেন বলছি লাখ লাখ মানুষ নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও গ্রামের দিকে ছুটেছে এই ফেরিওয়ালাটি তাদের একজন নয়। যারা বাসে, লঞ্চে, ট্রেনে যে যেভাবে পারে গ্রামে ছুটেছে সেখানে তাদের একটা আশ্রয় আছে, এই মানুষটির জন্য সে রকম কিছু নেই। এই লোকটি একেবারেই নিরাশ্রয়, তবে মনে মনে আর পাঁচজনের মতোই সেও গৃহী বৈকি। এই মানুষটি একা নয়, এমন হাজার হাজার, লাখ লাখ নরনারী রয়েছে এই শহরে। যাদের জীবনে কোনো ছুটি নেই, ঈদ নেই। ছুটি নিলেই অনাহার। এরা পুঁজি যেটুকু আছে আঁকড়ে ধরে রাখে। কেননা জানে, যে কোনো মুহূর্তে তা বেহাত হয়ে যেতে পারে। এদের পুলিশে গুঁতোয়, মাস্তানরা চাঁদার জন্য শাসায়। গ্রামে যদি আশ্রয় থাকত তাহলে জীবন বিপন্ন করে হলেও সেখানে ছুটত, যেমন লাখ লাখ মানুষ ছুটেছে। কেননা গ্রামের ওই আশ্রয়ে জীবন আছে বলে তারা মনে করত।
একটি পত্রিকায় লিখেছে পঞ্চান্ন লাখ লোক ঢাকা ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু কই তবু তো রাস্তাঘাট একেবারে যে ফাঁকা ঠেকবে তেমন ঠেকছে না। ভিড় কিছুটা কমেছে। কিন্তু সেই কমাটা আগের বছরগুলোর তুলনায় কম। কেননা বন্যার ভয়াবহতা চলছে উত্তরাঞ্চলজুড়ে। শহরে মানুষ আছে, গাড়িও আছে। যারা বিত্তহীন তারা শহর ছেড়ে বের হতে পারেনি। যাওয়ার মতো ঠিকানা তো নেই-ই, যাবে যে তেমন খরচও হাতে নেই। গ্রামে ও মফস্বলে গেছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত। গ্রামের আপনজনরা সেখানে থাকে। আপনজনরা অপেক্ষায় থাকে উপার্জনক্ষম প্রবাসী ব্যক্তিটি কখন দেশে ফিরবে। নিয়ে আসবে স্নেহ, মমতা, সঙ্গে আনবে উপহার, নানাবিধ। একবার ছেলেবেলায় আমরা কিছুদিন গ্রামে ছিলাম। সে অনেক আগের কথা। আত্মীয়দের কেউ কেউ কলকাতায় থাকতেন, জীবিকার অন্বেষণে সেখানে গেছেন, রাজধানীতে থাকতেন একা একা, ছুটি পেলে বছরে একবার বাড়িতে আসতেন। সঙ্গে অন্যসব জিনিস তো আনতেনই, পাউরুটি, টিনের মাখন, প্যাকেটের বিস্কুট এসবও আনতেন। গ্রামে যেগুলো পাওয়ার প্রশ্নই উঠত না। তখন হাটবাজারের দোকানিরাও খুশি হতো। তাদের বিক্রিবেচা বেড়ে যেত। গ্রামের সাধারণ মানুষ অবশ্য মৃদু আপত্তি করত, কলকাতাওয়ালা এসে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে দেখে। এখন কলকাতা নেই, ঢাকাই কলকাতা হয়ে গেছে। কিন্তু গ্রাম থেকে কলকাতায় অত লোক যেত না, এখন যত লোক ঢাকায় যায়। কেবল ঢাকা কেন, পৃথিবীর হেন জায়গা নেই যেখানে বাংলাদেশের লোক নেই। উৎসবে তারাও আসতে পারে না, বড়জোর ফোন করে। এদিক থেকে তারাও বিত্তহীনদের দলে পড়ে, যদিও তাদের আয়-উপার্জন তুলনামূলকভাবে ভালো এবং গ্রামে তাদের সুস্পষ্ট বেশ দৃষ্টিগ্রাহ্য ঠিকানা রয়েছে। তাদের আত্মীয়স্বজন খারাপ নেই। ভাই, ছেলে, বাবার এমনকি মেয়ে বা বোনের পাঠানো টাকা দিয়ে তারা ঘরদোর ঠিক করে, দরজা-জানালায় পর্দা টানায়, পারলে জমি কেনে, দোকানপাটও খোলে।
ছুটিতে ছুটতে ছুটতে পড়ি তো মরি হয়ে যারা দেশের বাড়িতে গেছে তাদের আবার ঠিক ওইভাবেই ফিরে আসতে হবে। আবার সেই ঠেলাঠেলি, ঠাসাঠাসি, ধাক্কাধাক্কি- বাসে, লঞ্চে, ট্রেনে। সেই ওষ্ঠাগত প্রাণ। সময়মতো না ফিরতে পারলে চাকরি যাবে। শহর থেকে বাড়িতে গিয়ে যখন পৌঁছেছে আপনজনরা তখন ঈদের চাঁদ পেয়েছে হাতে। সুবাতাস বয়ে গেছে খুশির। কিন্তু তারাই, ওই আপনজনরাই আবার দুশ্চিন্তায় পড়ে যদি দেখে প্রিয়জনটির তাড়া নেই ঢাকায় ফিরবার। তাহলে কি চাকরি নেই? কোনো সর্বনাশ কি ঘটে গেছে, যে জন্য বাড়িতে ফিরে এসেছে, ফেরত যাওয়ার জন্য উসখুস করছে না? এবং তারা স্বস্তি পায় যখন দেখে প্রিয়জনটি আবার রওনা হয়েছে বান্ধবহীন সেই মরুভূমিতে, রাজধানীর সেই অনিশ্চিত শহরে। কেননা প্রিয়জনরা সকলেই নিকটজন তো অবশ্যই কিন্তু উপার্জনে অক্ষম হলে সে অতি প্রিয়জনটি বাড়ির গাছটিও নয়, এমনকি শুকনো কাঠও নয়, যেন সে ঝরে-পরা পাতা একটি।
কিন্তু কেন এমনটা ঘটল? ঘটার প্রধান করাণ হচ্ছে উন্নতি। এ এক বিশেষ ধরনের উন্নতি, যাতে একজন ফুলেফেঁপে ফুড়ে ফাটিয়ে সিঁড়ি ভেঙে খাড়াখাড়ি উঠে যায় ওপরের দিকে, আর অন্য দশজন সেই উন্নতির বোঝা বহন করতে গিয়ে নানা মাত্রায় অবনত হতে থাকে। এই উন্নতির আরো একটি বৈশিষ্ট্য আছে। সেটি হলো আত্মকেন্দ্রিকতা। এক কথায় একে পুঁজিবাদী ধারার উন্নতি বলা খুবই সঙ্গত। উন্নতির এই ধারায় ব্যক্তি যে নিজের মধ্যে সহৃদয়তা, সহমর্মিতা, সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ ইত্যাদিকে বিকশিত করবে, তা কিন্তু মোটেই সম্ভব নয়। উন্নতি এবং এসব মানবিক বিবেচনা মোটেই একসঙ্গে যায় না। উন্নতির সিঁড়ি ভাঙতে গেলে অবশ্য অবশ্য এ ধরনের সব রকম বোঝাকে সবেগে নিচে নিক্ষেপ করতে হয়। নইলে পদে পদে আশঙ্কা থাকে কাত কিংবা চিত হয়ে পড়ে যাওয়ার। মানবিক গুণাবলির চাঙাড়ি কাঁধে বহন করে মস্ত বড় হয়েছে এমন কাহিনী এ যুগে রূপকথাতেও পাওয়া যায় না।
উন্নতির এই দর্শন নতুন কোনো বস্তু নয়। ব্রিটিশ যুগে এটি কার্যকর ছিল, পাকিস্তানি জমানায় বদলায়নি, স্বাধীন বাংলাদেশে একেবারে লক লক করে বেড়ে উঠেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছিল তখন প্রস্তাবনা ছিল এই রকমের যে, একটা শিক্ষিত শ্রেণি তৈরি করলেই চলবে, সেই শ্রেণির কাছ থেকে শিক্ষা নিচের দিকে চুইয়ে চুইয়ে পড়তে থাকবে। এমনকি বিদ্যাসাগরের মতো শিক্ষা-অন্ত মহাপ্রাণ মানুষও শিক্ষার এই দর্শনে সাড়া দিয়েছিলেন। বহু লোককে নিম্নমানের শিক্ষা না দিয়ে অল্প লোককে ভালো শিক্ষা দিলে তাতে দেশের মঙ্গল হবে বলে তিনিও বিশ্বাস করতেন। কেননা তারও ভরসা ছিল যে, উৎকৃষ্ট শিক্ষায় যারা ধনী হবে তারা শিক্ষাবঞ্চিতদের সযত্নে প্রচেষ্টায় সুশিক্ষিত করে তুলবে। প্রতিবাদ করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। তিনি বলেছিলেন যে, শিক্ষা জল বা দুধ নয় যে, উপরে ঢাললে তা নিচে পৌঁছে যাবে। নিয়ম তো বরঞ্চ এই যে, শিক্ষা যতটুকু পাওয়া যাবে তা সুযোগপ্রাপ্তরাই নিজেদের দখলে নিয়ে নেবে এবং এমন ব্যবস্থা করবে যাতে বঞ্চিতরা বঞ্চিতই থাকে। বঞ্চিতদের শিক্ষিত করতে যাবে তারা কোন দুঃখে? প্রতিদ্বন্দ্বী সৃষ্টি করে নিজেদের প্রাপ্ত সুযোগকে খর্ব করার মতো মূর্খ তারা নিশ্চয়ই নয়। বাস্তবে এমনটাই দেখা গেছে এবং দেখা যাওয়াটাই স্বাভাবিক বটে।
শিক্ষার ব্যাপারে যা ঘটেছে উন্নতির ব্যাপারেও অবিকল সেটাই ঘটেছে। উন্নতরা তাদের প্রয়োজনে চাকরবাকর, পাহারদার, দোকানদার এসব ধরনের চাকরি তৈরি করে। লোক খাটায়, কিন্তু লোকের সঙ্গে নিজেদের উন্নতি ভাগাভাগি করে নেবে এমনটা কখনোই হতে দেয় না। আর এই যে উন্নতি, এর ফলে গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থান নেই, সেখানে অভাব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের। গ্রামে নদী যেমন শুকিয়েছে তেমনি শুকিয়েছে উন্নতির সম্ভাবনা। জীবিকা অর্জনের সুযোগ নেই বলেই মানুষ শহরে ছোটে। শহর তাদের টানে, গ্রাম তাদের ঠেলে বের করে দেয়। সমস্তটাই ঘটে উন্নতির মারাত্মক কারণে।
এত লোক চলে গেছে, তবু রাজধানীতে যে লোকের অভাব নেই তার অর্থ ওই যে টেনে নেয়া এবং ঠেলে বের করে দেয়া এই ব্যাপারটা, পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এই শহরে এখন থাকার জায়গার তো অভাবই, চলাফেরা করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গাড়িগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন তাদের হুকুম করা হয়েছে স্ট্যান্ড অ্যাট ইজ পজিশনে থাকার। বিদেশে বসবাসকারী এক তরুণের একটি কবিতা পড়লাম সেদিন। যানবাহনের অবস্থা দেখে তার মনে হয়েছে যে অসংখ্য নৌকা শহরে চলে এসেছে। কিন্তু নৌকার যা আছে গাড়ির তা নেই। যত ধীর গতিতেই হোক নৌকা চলে। সামনে এগিয়ে যায়, কিন্তু এই গাড়িগুলোর কোনো গতি নেই, তারা স্তব্ধ। কথাটা খুবই সত্য। গ্রামে নদী নেই, নৌকা তাই চলে এসেছে শহরে কিন্তু রাজপথে নৌকা চলবে কী করে? সেখানে তো পানির অভাব। অনেক সময় মনে হয়, হেঁটে বরঞ্চ দ্রুত যাওয়া যাবে, কিন্তু সেটা ভ্রমমাত্র, স্বচ্ছন্দে, নির্বিঘ্নে হাঁটা যাবে এমন ফুটপাত মস্ত এই ঢাকা শহরে একটিও অবশিষ্ট নেই। উন্নতি তাদের গিলে খেয়েছে।
আমাদের দরকার সামজিক যানবাহনের। চাই একতলা-দোতলা বাস। দরকার পাতাল রেল। প্রয়োজন নৌপথে যাতায়াতের বন্দোবস্ত। কিন্তু উন্নতির যে ভয়াবহ খপ্পরে আমরা পড়েছি তার পক্ষে সামাজিক যানবাহনের ব্যাপারে মনোযোগ দেয়াটা যে কত কঠিন ঢাকার রাজপথে তো প্রতি মুহূর্তেই তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। প্রাইভেট গাড়িগুলো চলছে না, পাবলিক বাসের জন্য শত শত পাবলিক লাইন ধরে প্রতীক্ষা করছে- এই দৃশ্য কার কাছে অপরিচিত? আমাদের উন্নতি প্রাইভেটে বিশ্বাস করে, পাবলিককে পারলে পিষে মেরে ফেলে, নুইসেন্স বিবেচনা করে। যে জন্য চিকিৎসা মানেই এখন প্রাইভেট হাসপাতালে ছোটা, সরকারি হাসপাতালে তারাই যায় যারা আমাদের ওই ফেরিওয়ালা বন্ধুটির দলে।
ঈদকে বলা হয় সাম্যের উৎসব। ধনী-দরিদ্র এক কাতারে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু তাদের খবর কী যারা বড় বড় মসজিদের সামনে হাত পেতে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে থাকে ধনীদের অনুকম্পার আশায়। খুব এটা যে পায় তা নয়, তবু আসে, আশায় আশায় থাকে। অনেকে প্রাইভেট কারে করে ঈদের জামাতে আসে, গাড়ির ড্রাইভাররাও শামিল হয়, কিন্তু ওইটুকু পর্যন্তই, জামাত শেষ হওয়ামাত্র ড্রাইভার চলে যায় তার জায়গাতে, মালিক গিয়ে বসে নিজের আসনে। জামাতে ইমাম সাহেব বলেন, ঈদ হচ্ছে একতার উৎসব। খুব আন্তরিকতার সঙ্গে বলেন। মর্মস্পর্শী হয়ে ওঠে সেই বাণী। কিন্তু বাইরে আসামাত্র দিবালোকের মতো যে সত্যের মুখোমুখি হতে হয় সেটা হলো অনৈক্য নয়- বিচ্ছিন্নতা।
ঈদ এখন যে সত্যটিকে উন্মোচিত করে দেয় সেটা হলো সমাজে বিদ্যমান অসাম্য। ব্যাপারটা এমন স্পষ্ট করে কম সময়েই এসে আমাদের ধাক্কা দেয়। মধ্যবিত্তের একাংশ ও নিম্ন মধ্যবিত্তের বৃহদাংশ দেশের বাড়িতে ছোটে আপনজনের সান্নিধ্য পাবে বলে। গরিব মানুষ কী করবে ভেবে পায় না, নিতান্তই অসহায়ভাবে চেয়ে থাকে তাদের চালচলনের দিকে। ঈদ আসলে বিত্তবানদেরই। কিন্তু তারাও ঈদে সামাজিক থাকে না, বিচ্ছিন্নই রয়ে যায়। ঈদের অনেক আগে থেকেই তারা বিপণিবিতানে ছোটাছুটি শুরু করে উপযুক্ত সাজসজ্জার সন্ধানে। সবাই সবাইকে দেখাতে চায়, কিন্তু আদতে কেউ কারোটা দেখে না। এই ক্ষেত্রে মেয়েরা অনেক এগিয়ে থাকে পুরুষদের তুলনায়। মনে হয়, কেবল মনে হয় না, ঘটনাও আসলে তাই- ঈদ পুরোপুরি করতলগত হয়ে গেছে বাণিজ্যের। ফ্যাশনের বিজ্ঞাপন, ফ্যাশন শোর উদ্বোধন, ঈদ ফ্যাশন নিয়ে পত্রিকার বিশেষ আয়োজন- সবকিছুই একটা কথা বলে, সেটা হলো ঈদে বাণিজ্যই প্রধান। নামিদামি লোকরা প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন, বিহ্বল দৃষ্টিতে হাঁ করে তাকিয়ে থেকে ডিজাইনের সৌন্দর্য অবলোকন করতে থাকেন। বিনোদন জগতের দিকপালরা মডেল হতে দ্বিধা করেন না।
ওদিকে চলে খাদ্যের আয়োজন। ঈদ এলেই খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়তে থাকে। বাড়বেই। কেননা ধনীরা এই ঈদে মাংস ভোজনের উৎসবে পরিণত করে ফেলে। ঈদের জন্য বিশেষ ধরনের খাদ্র্য প্রস্তুত প্রণালির প্রদর্শনী চলতে থাকে টেলিভিশনে ও পত্রিকায়। বিশেষজ্ঞরা এসে হাজির হন। দশ বছর আগে একজন তথ্যাবিজ্ঞের কাছে শুনেছিলাম যে, এই শহরে যে কোনো নতুন খাদ্যই বাজারজাত করা হোক না কেন তার জন্য এক লাখ ভোক্তা প্রস্তুত অবস্থায় পাওয়া যাবে। এতদিনে মনে হয় ওই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে।
অন্য অনেক কিছুর মতোই ঈদও এখন আর সামাজিক নেই, ব্যক্তিগত হয়ে গেছে। কিছুদিন আগেও ঈদকার্ডের পারস্পরিক বিনিময়ের একটা প্রথা ছিল। ওইসব কার্ড দোকানে পাওয়া যেত। এখন লোক দোকানে গিয়ে কার্ড কেনার এবং পোস্ট অফিসে গিয়ে তা পোস্ট করার চেয়ে এসএমএসে একান্ত ব্যক্তিগত বাণী প্রেরণ পছন্দ করে। তাই বলে কার্ড প্রেরণ যে উঠে গেছে তা নয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের অর্থে ব্যক্তিগত কার্ড পাঠিয়ে থাকেন। প্রত্যেকের কার্ড স্বতন্ত্র, কোনোটাই দোকানের নয়, সবগুলোই প্রদানকারী ব্যক্তির পছন্দ অনুযায়ী প্রস্তুত।
ভালো কথা, ঈদের ছুটিতে ধনীরা মফস্বলে যায় না এটা ঠিক, তবে পুরনো এই শহরে যে থাকতে পছন্দ করে তাও নয়। কেউ যায় সমুদ্র সৈকতে, কেউ খোঁজে রিভার রিসোর্ট, আরো যারা বিত্তবান তারা চলে যায় বিদেশে।
কিন্তু আমরা যারা এসব কথা বলছি তারা কী চাই? আকাক্সক্ষাটা কী? না, আমরা বড় কিছু চাই না, চাই সামাজিকীকরণ। যেমন যানবাহনের তেমনি ঈদের মতো উৎসবেরও। আমরা চাই গ্রাম যেন মানুষকে আশ্রয়স্থল থেকে উৎপাটিত করে শহরের দিকে ঠেলে না দেয়। তার জন্য প্রয়োজন হবে কর্মসংস্থানের, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের। ছোট ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলা দরকার। নদী ও জলাশয়ের সর্বোত্তম ব্যবহার চাই। চাই ফসলি বৃক্ষের সাহায্যে সামাজিক বনায়ন। চাইব আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার উন্নতি, যাতে গ্রামে থাকাটা বিপজ্জনক বলে ধারণা না হয়। দরকার মফস্বলে উন্নতমানের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। চিকিৎসার উন্নয়নের জন্য আয়োজন করা প্রয়োজন। প্রয়োজন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের। আমরা চাইব গ্রামকে শহরের দিকে টেনে না এনে শহর নিজেই গ্রামের দিকে রওনা দিক।

এসব কাজ মোটেই ছোট নয়। অত্যন্ত বড় ও কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন হবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, যে বিকেন্দ্রীকরণ গণতন্ত্রের প্রধান শর্তগুলোর একটি। উপজেলায় নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু উপজেলা ব্যবস্থা চালু হচ্ছে না। কারণ ক্ষমতা কার কাছে কতটা থাকবে ঠিক করা যায়নি। ক্ষমতা তো যাবে সাধারণ মানুষের কাছে, তা যাচ্ছে না। এমপিরা বিকেন্দ্রীকরণে সাহায্য করবেন কী, উল্টোটা ঘটাচ্ছেন। দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু আছে বলে শুনেছি, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে যা টের পাচ্ছি তা হলো সমস্ত ক্ষমতা চলে গেছে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। অপরদিকে বিরোধী দলেও নেত্রীই সর্বেসর্বা, অন্যরা তার মুখাপেক্ষী ভিন্ন অন্যকিছু নয়। সুযোগ্য তত্ত্বাবধায়করা রাজনীতিতে কোন ধরনের সংস্কার আনতে চেয়েছিল সেটা তার ও তাদের জানা-অজানা মুরব্বিরাই জানে, কিন্তু দেশবাসী যে সংস্কার লাভ করেছে তা হলো ক্ষমতার অধিকতর কেন্দ্রীভবন।
বিকেন্দ্রীকরণের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই নিতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের শাসনকর্তা যে শাসক শ্রেণি তারা তো কিছুতেই চাইবে না যে, ক্ষমতা তাদের হাত থেকে জনগণের হাত চলে যাক। তাদের চেষ্টা ক্ষমতা যেখানে থাকার সেখানেই থাকবে। ফেরিওয়ালা তার সম্পত্তি মাথায় করে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে, সম্পত্তিবানরা তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি কীভাবে বৃদ্ধি করা যায় সে চিন্তা দিয়ে মাথাভর্তি করে রাখবে। কিন্তু যে দেশে কয়েক কোটি মানুষের দাঁড়ানোর কোনো জায়গা নেই, সে দেশকে কোন অর্থে স্বাধীন বলা যাবে সে প্রশ্নটা তো থাকবেই। আমরা তার মুখোমুখি হলে দায়িত্ব বাড়ে। আর সে দায়িত্বটা অন্য কিছুর নয়, আমাদের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বটে। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি, সহজে শেষ হওয়ারও নয়।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা