ঘাসকন্যা

আগের সংবাদ

সারাদেশে এডিস মশা ধ্বংসের পদক্ষেপ নিতে হবে: নাসিম

পরের সংবাদ

গরুকেন্দ্রিক রাজনীতি

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১০, ২০১৯ , ৬:১৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ১০, ২০১৯, ৭:৪৮ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

আমাদের দেশে কুরবানি দেয়ার ধর্মীয় বিধানের চেয়ে সামাজিক নিয়মনীতি প্রবলতর। কুরবানি দেয়া-না দেয়ার ওপর মানুষের সামাজিক মর্যাদাও নির্ভর করে। এই সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় ঋণ করেও কুরবানি দেয়ার অনেক নজির রয়েছে। কুরবানির গরু নিয়েও এক ধরনের সামাজিক প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায়। কে কয়টি এবং কত বড় গরু কুরবানি দিচ্ছে এ নিয়ে ঠাণ্ডা প্রতিযোগিতাও দেখা যায়।

মুসলিম সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম পার্বণ কুরবানির ঈদ। অতীত আর বর্তমানের এই ঈদ পালনে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। অতীতে কুরবানি দেয়া মানুষের সংখ্যা এত ব্যাপক আকারে ছিল না। এখন কুরবানি ঈদে পশু কুরবানি দেয়া ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সত্য এই যে, এই ঈদে আনন্দ একমাত্র তারাই করে থাকে কিংবা করে, যাদের কুরবানি দেয়ার সামর্থ্য আছে। আমাদের মোট জনসমষ্টির ১৫ ভাগ পরিবারে কুরবানি ঈদ আসে উদযাপনের বারতা নিয়ে। বাকি ৮৫ ভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠদের পক্ষে আর্থিক কারণে কুরবানি দেয়া সম্ভব হয় না। গ্রামে ভাগে কুরবানি দেয়ার প্রচলন অতীতেও ছিল, আজো আছে। কিন্তু সামাজিক জীবনে পরস্পর বিচ্ছিন্ন শহরের মানুষরা ভাগে কুরবানি দেয় না। দিলেও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির খুবই নগণ্য অংশ। আমাদের দেশে কুরবানির পশুর ক্ষেত্রে গরুই সর্বাধিক জবাই করা হয়। আবার যারা গরু কুরবানি দেয়, তারাই গরুর সঙ্গে খাসিও কুরবানি দিয়ে থাকে। নিম্নমধ্যবিত্তদের একটি অংশ অর্থনৈতিক কারণে খাসি কুরবানি দেয়। আমাদের দেশে কুরবানি দেয়ার ধর্মীয় বিধানের চেয়ে সামাজিক নিয়মনীতি প্রবলতর। কুরবানি দেয়া-না দেয়ার ওপর মানুষের সামাজিক মর্যাদাও নির্ভর করে। এই সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় ঋণ করেও কুরবানি দেয়ার অনেক নজির রয়েছে। কুরবানির গরু নিয়েও এক ধরনের সামাজিক প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায়। কে কয়টি এবং কত বড় গরু কুরবানি দিচ্ছে এ নিয়ে ঠাণ্ডা প্রতিযোগিতাও দেখা যায়। অর্থাৎ ধর্মীয় বিধানের চেয়েও সামাজিক মর্যাদার অংশ হয়ে পড়েছে কুরবানি দেয়া-না দেয়ার বিষয়টি।
ব্যক্তিগতভাবে ইরাকের বিভিন্ন প্রদেশ ও শহরে পাঁচ বছর ছিলাম। কুরবানির ঈদের দিন বাগদাদ, বসরা, মশুল, কিরকুক, রামাদি, ফালুজা, আল-কাইম, আকাসাত পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শহরে ঘুরে পশু কুরবানি দেয়ার দৃশ্য কখনো দেখিনি। এ নিয়ে স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করলে তারা জানিয়েছিল, ‘হ্যাঁ আমরা নিশ্চয় কুরবানি দিই। তবে সেটা হজের সময়। পশু কুরবানি দেয়া হজের আনুষ্ঠানিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে প্রতি বছর পশু কুরবানি দিই না। প্রতি বছর পশু কুরবানি দেয়ার ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার বিধান নেই।’ আমাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রায় সব প্রকল্পে গরু কুরবানি দেয়া হতো। প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শতভাগ বাংলাদেশি ছিল বিধায় মালিকপক্ষের অর্থে কুরবানি ঈদে গরু কেনা হতো। আশির দশকে চার মণ ওজনের গরু কিনতে হতো দেশের তুলনায় বহুগুণ বেশি দামে। বিদেশে থাকাবস্থায় দেখেছি মাংসের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চমূল্য গরুর মাংস। আর সবচেয়ে সস্তা মূল্য ব্রয়লার মুরগি। চার মণ ওজনের গরু তখন বাংলাদেশে বড়জোর আট-দশ হাজার টাকার বেশি হতো না। অথচ ঐ গরু আমাদের কিনতে হতো দেশের তুলনায় বহুগুণ বেশি মূল্যে। ইরাকিরা আমাদের দেশে প্রতি ঈদে পশু কুরবানির কথা শুনে বিস্ময়ে হতবাক হতো। তাদের কাছে শুনেছিলাম, মুসলমানদের পাঁচ ফরজের অন্তর্গত কুরবানি নয়। কুরবানি হজ পালনের আনুষ্ঠানিকতার ধর্মীয় বিধান। তারা সে বিধান অনুযায়ী হজ পালনের সময়ই একমাত্র পশু কুরবানি দিয়ে থাকে। এর বাইরে কুরবানি দেয়াকে ধর্মীয় বিধান বলে মনে করে না।
আমাদের দেশের মানুষের প্রোটিন চাহিদা পূরণে গরুর মাংস ছিল তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে সস্তা খাবার। কিন্তু গত কয়েক বছরে ক্রমান্বয়ে গরুর মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে গরুর মাংস খাওয়া আর সম্ভব হয় না। ভারতবর্ষের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহে গরু জবাই নিয়ে তেমন সংকট না হলেও হিন্দু অধ্যুষিত সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে গরু জবাইকে কেন্দ্র করে নানা অঘটনের দৃষ্টান্ত রয়েছে। অনেক অঞ্চলে আইনসিদ্ধ উপায়ে এটা নিষিদ্ধ। অবিভক্ত বঙ্গে মুসলমানের সংখ্যা ৫২ শতাংশ এবং হিন্দুর সংখ্যা ছিল ৪৮ শতাংশ। তুলনামূলক মুসলমান জনসংখ্যার সংখ্যাধিক্য অঞ্চলে গরু জবাই নিয়ে তেমন বিরোধ-বিরোধিতা তখন ছিল না। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ পৃথক রাষ্ট্রের অধীনে হলেও সেখানে অতীতের ন্যায় এখনো গরু জবাই হয়। পূর্ববঙ্গে মুসলিম সংখ্যাধিক্যের কারণে গরু জবাই নিয়ে কখনো বিরোধ বিপত্তির ঘটনা ঘটেনি। আমরা যে অল্প মূল্যে গরু এবং গরুর মাংস কিনতাম সেটা হিন্দু সম্প্রদায় গরুর মাংস খেতো না বলেই।
কলকাতায় গেলে দেশের চেয়ে আরো সস্তায় গরুর মাংস খাওয়া সম্ভব হতো। বিহারি মুসলিম হোটেলগুলোতে গরুর মাংসের নানা পদের গুরুপাকের রান্না মাংস ভীষণ স্বল্প মূল্যে খাওয়া যেত। মাত্র বছর পূর্বে গিয়ে পূর্বের দামের চেয়ে দ্বিগুণ দামে হোটেলে গরুর মাংসের বিক্রি দেখে দোকানিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। দোকানিটি হিন্দিতে যা বলেছিল তার বঙ্গানুবাদ হচ্ছে- কলকাতার হিন্দু সম্প্রদায় গরু খাওয়া শুরু করার পর গরুর মাংসের মূল্য বেড়ে গেছে। তারা কেবল নিজেরা হোটেলে বসে খায় না। নিজেরা খেয়ে পরিবারের জন্য পার্সেলও নিয়ে যায়। এ ছাড়া সকল ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তো রয়েছেই। সেটাও গরুর মাংসের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গরু বা গরুর মাংসের ব্যবহার ইতিহাসের নানা পর্বে ঘটেছে। আমরা জানি ১৮৫৭ সালের সিপাই বিপ্লবের ঘটনা। সিপাই বিপ্লবের মূলে কুষণ-বঞ্চনার নানা যৌক্তিক কারণ থাকলেও উপলক্ষ হয়েছিল এনফিল্ড রাইফেলের গরু ও শূকরের চর্বি মাখানো টোটার ব্যবহার নিয়ে। যেটি দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে রাইফেলের নলে ঢোকাতে হতো। এ নিয়ে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সিপাইরা টোটা ব্যবহারে অস্বীকৃতি জানায়। ক্ষুব্ধ ইংরেজরা টোটা ব্যবহারে অস্বীকারকারী সিপাইদের কামানের মুখে সারিবদ্ধ দাঁড় করিয়ে হত্যা করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ভারতবর্ষব্যাপী সিপাই বিপ্লব সংঘটিত হয়। মুসলমানদের জন্য শূকরের মাংস হারাম। অপরদিকে হিন্দুদের পক্ষে গরু ব্যবহারবিরুদ্ধ। টোটা মুখে নিয়ে দাঁতে ছিঁড়ে ধর্মচ্যুত হতে দুই সম্প্রদায়ের সিপাইদের প্রবল আপত্তির কারণেই বিদ্রোহের সূত্রপাত। যদিও টোটা সংক্রান্ত সত্যতা নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। বাস্তবে কুষণ-বঞ্চনার বিষয়টিই বিদ্রোহে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
দুই সম্প্রদায়ের মিলিত সিপাই বিপ্লবকালে কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে বিভক্তির আশঙ্কা দেখা দেয়। মুসলিম সম্প্রদায় তাদের চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী ঈদে গরু কুরবানি দেবে। যেটা হিন্দু সম্প্রদায় মেনে নেবে না। বিদ্রোহী সিপাইদের ঐক্য শঙ্কার মুখে। গরু কুরবানি নিয়ে দাঙ্গার প্রবল সম্ভাবনাময় পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। বিদ্রোহ দমনে আর শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন পড়বে না। সহসাই দুই সম্প্রদায়ের দাঙ্গা-বিরোধকে কেন্দ্র করে বিদ্রোহের পরিসমাপ্তি ঘটবে। এমনটাই আশা করছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কুম্পানির ইংরেজ শাসকেরা। কুম্পানির প্রভাবশালী ইংরেজ স্যার হেনরী লরেন্স লর্ড ক্যানিং-কে ঐ সময়ে চিঠিতে লিখেছিলেন- ‘দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে (কুরবানি ঈদের গরু জবাই নিয়ে) বিরোধ বাধবে, আমি তার অপেক্ষায় আছি।’ মুসলিম নেতৃত্বের বিচক্ষণতায় ইংরেজদের আশা পূরণ না হওয়ায় পরবর্তীতে ইংরেজ এইচসন এ নিয়ে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করে বলেছেন, ‘এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের আমরা হিন্দুদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছি।’
কুরবানি ঈদে গরু কুরবানিকে কেন্দ্র করে কোনো বিরোধ বাধেনি। ধর্মবিশ্বাসী মুসলমানেরা গরু কুরবানি দিতে না পারলে অসন্তোষ ও ক্ষুব্ধ হয়ে অঘটন ঘটাবে। অপরদিকে হিন্দু সম্প্রদায় গো-হত্যার প্রতিবাদে বিদ্রোহ থেকে সরে দাঁড়াবে। এটা খুবই স্বাভাবিক ছিল। অথচ উত্তেজনাকর বিদ্রোহী সেই পরিস্থিতিতে দুই সম্প্রদায়ের ঐক্যের কোনো বিকল্প ছিল না। দায়িত্ব সচেতন মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ সেদিন যথার্থই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছিল। উত্তর প্রদেশের বেরলীর বিদ্রোহী প্রধান খান বাহাদুর খান ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘হিন্দু সিপাইরা যদি এই সিপাই বিদ্রোহে অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করে তবে বেরলীতে কুরবানি ঈদে গরু কুরবানি দেয়া হবে না।’ এমন কি বেরলীতে গরু জবাই পর্যন্ত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।
মোগল সাম্রাজ্যের ক্ষমতাহীন শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে বিদ্রোহী সিপাইরা বিদ্রোহের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করে তাঁর নেতৃত্বে বিদ্রোহ সংঘটিত করেছিল। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর পরিস্থিতি বিবেচনায় অত্যন্ত সাহসিকতায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কুরবানি ঈদ উপলক্ষে দিল্লিতে কোনো গরু জবাই করা চলবে না। যদি কোনো মুসলমান নির্দেশ অমান্য করে, তাহলে তাকে তোপের মুখে উড়িয়ে দেয়া হবে। অন্য কোনো মুসলমান যদি এ ব্যাপারে কাউকে সাহায্য করে তবে তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।’ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর স্বয়ং কুরবানির ঈদের দিন নামাজ আদায়ের পর একটি ভেড়া জবাই করে সিপাই বিদ্রোহের ঐক্য রক্ষা করেছিলেন। ফলে ১৮৫৭ সালের ১ আগস্ট কুরবানির ঈদে গরু কুরবানি দেয়া নিয়ে দুই সম্প্রদায়ে বিরোধের সূত্রপাত ঘটেনি। ঈদের নামাজ আদায় এবং ভেড়া, খাসি, দুম্বা, ছাগল কুরবানি দিয়ে মুসলিম সম্প্রদায় ঈদ উদযাপন করেছিল।
গরু নিয়ে রাজনৈতিক বহু ঘটনা ভারতবর্ষে ঘটেছে। মহাত্মা গান্ধীর গো-হত্যার বিরুদ্ধে জীবনভর দৃঢ় অবস্থানের কথা আমরা জানি। তাঁর কিছু উদ্ধৃতি এখানে দেয়া হলো। তথ্যসূত্র : সুনীতি কুমার ঘোষ রচিত বাংলা বিভাজনের অর্থনীতি-রাজনীতি।
২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭ সালে গান্ধীর মুখপত্র হরিজন পত্রিকায় তিনি লিখেছেন, ‘এটি লেখা হচ্ছে বকর ঈদ দিবসে। এই দিবসটি মুসলমানের পক্ষে আনন্দের এবং হিন্দুদের পক্ষে কোকের। হিন্দুদের কাছে এই দিবসটি কোকের এই জন্য যে, তাঁদের মুসলমান ভাইয়েরা বলি দেয়ার জন্য গো-হত্যা করেন, যদিও তাঁরা জানেন যে গরু হিন্দুদের পুজ্য ও শ্রদ্ধার বস্তু।’
গান্ধী সারা ভারতের গো-রক্ষা সভার সভাপতি ছিলেন এবং এই সভার নিয়মতন্ত্র নিজে রচনা করেছিলেন। ১৯২৪ সালের শেষে বেলগাঁও কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতিত্বও তিনি করেছিলেন। সভাপতির ভাষণে গান্ধী বলেন, ‘স্বরাজের প্রশ্নের চেয়ে গো-রক্ষার প্রশ্নকে আমি কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না। বরং কয়েকদিক থেকে অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।’
খিলাফত আন্দোলনের স্বীকৃতি প্রদান উপলক্ষে গান্ধী বলেছিলেন- ‘এখন বোঝা যাবে কেন আমি নিজেকে সনাতনী হিন্দু হিসেবে গণ্য করি। গরুর প্রতি শ্রদ্ধায় আমি কারুর থেকে কম নই। খিলাফতের আদর্শকে আমার নিজের আদর্শ করেছি এই জন্য যে, একে রক্ষা করে গরুকে সম্পূর্ণ রক্ষা করা যাবে।’ গান্ধী আরো বলেছেন, ‘মৌলানা মহম্মদ আলীর কাছে খিলাফৎ হচ্ছে ধর্ম, আর খিলাফতের জন্য জীবনদান করে আমি মুসলমানের ছুরি থেকে গরুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই। সেটাই আমার ধর্ম, তাই আমার দাবি যে, খিলাফৎ আমাদের দুজনের কাছেই কেন্দ্রীয় বিষয়।’
স্বাধীন ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী এবং প্রধান সংবিধান প্রণেতা (বর্ণে নমঃশূদ্র) আম্বেদকর বলেছিলেন, ‘যদি জাত-বর্ণ থাকে তাহলে বর্ণ বহির্ভূত জাতিও (ড়ঁঃ পধংঃব) থাকবে। সমগ্র জাতপ্রথার অর্থাৎ বর্ণাশ্রম ধর্মের বিলুপ্তি না হলে এই সমস্যার সমাধান হবে না।’ অথচ গান্ধী বরাবরই ছিলেন বর্ণাশ্রম ধর্মের গোঁড়া সমর্থক। তিনি অস্পৃশ্যদের শূদ্র অথবা চতুর্থ বর্ণ হিসেবে গণ্য করার বিধান দিয়েছিলেন। গান্ধী আম্বেদকরের কথার প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, “মেথর মেথরই থাকবে, তবে তার ‘আদর্শ ভাঙ্গি’ (মেথর বা ঝাড়ুদার) তার পেশাকে পবিত্র কর্তব্য রূপে গ্রহণ করে মলমূত্র শুদ্ধভাবে পরিষ্কার করবে, টাকা-পয়সার আকাক্সক্ষা করবে না, মদ-মাংস ছোঁবে না। যেসব অন্ত্যজ লেখাপড়া লিখেছেন তারাও পিতৃ-পিতামহের পেশা ত্যাগ করবেন না, তাকেই মহত্বদান করবেন।” গান্ধী বর্ণাশ্রমকে বিজ্ঞানভিত্তিক বলেছিলেন এবং এর মধ্যে সৌন্দর্যও আবিষ্কার করেছিলেন।
ভারতবর্ষের দুই প্রধান সম্প্রদায় হিন্দু-মুসলমানের সমস্যাকেও গান্ধী দেখেছেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সনাতনী হিন্দু রূপে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী রূপে নয়। ৫ ডিসেম্বর ১৯৪৬ সালে নোয়াখালীতে তিনি হিন্দু মহাসভার নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বলেছিলেন, ‘আমি হিন্দু হয়ে জন্মেছি, আমার মৃত্যুও হবে হিন্দু হিসেবে, একজন সনাতনী হিন্দু হিসেবে। আমি যদি মুক্তি লাভ করি তো হিন্দু হিসেবেই হবে।’ এর পূর্বে আরো বলেছিলেন, ‘আমার দেশের থেকে আমার ধর্মকে আমি বেশি ভালবাসি, তাই আমি প্রথমে হিন্দু, পরে জাতীয়তাবাদী।’
অহিংসবাদী গান্ধী ১৯২৬ সালের এপ্রিলে পুঁজিপতি এবং হিন্দু মৌলবাদী রাজনীতির প্রবাদতুল্য ঘনশ্যামদাস বিড়লাকে লিখেছিলেন, ‘…কলকাতার দাঙ্গায় আমি বিচলিত হইনি। আমি আগেই বলেছি হিন্দুরা যদি লড়াই করতে চায় তাহলে আমাদের উচিত হবে তাকে নিষ্ঠুরতার লক্ষণ মনে করে দোষ না দিয়ে গুণ হিসেবে গণ্য করা এবং তার আরো বিস্তার লাভে সাহায্য করা।’ ঘনশ্যামদাস বিড়লা, বাজাজ, টাটা, ঠাকুরদাস প্রভৃতি পুঁজিপতিরা গান্ধীকে অর্থের জোগান দিতেন। তাঁদের অনুদানের অর্থেই আশ্রম, হিন্দুত্ববাদী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনীতিসহ ইত্যাদি কাজে সে অর্থ ব্যয় করতেন। এই পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থরক্ষায় এবং ব্রিটিশদের মিত্ররূপে গান্ধীর অবস্থান ও ভূমিকা অধিক বিতর্কিত। ঘনশ্যামদাস বিড়লা প্রসঙ্গে সুভাষ বসুর অগ্রজ শরৎ বসু বলেছিলেন, ‘পলাশীর যুদ্ধে জগৎশেঠের ভূমিকা আর বাংলা বিভাগে বিড়লার ভূমিকা অভিন্ন।’ বিড়লাকে লেখা গান্ধীর এই চিঠিটি নির্ভেজাল সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক। অহিংস মতবাদ ধারণ এবং প্রচার করলেও এই চিঠিটিতে গান্ধীর সাম্প্রদায়িক পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে। যদিও গান্ধী সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। তবে ধর্মনিরপেক্ষও কিন্তু ছিলেন না। রাজনীতিতে তাঁর ধর্মযোগ ভারতবর্ষের মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনেনি। ধর্ম থেকে দেশ-জাতির আকাক্সক্ষাকে ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারেননি। দুঃখজনকভাবে তাঁকে তাঁর অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই বর্তমান বিজেপির পূর্বসূরি হিন্দু মহাসভার সশস্ত্র কর্মীদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। যে হিন্দু ধর্মে আনুগত্যের অজস্র নজির স্থাপন তিনি করেছিলেন, সেই হিন্দু মৌলবাদী চক্রই তাঁকে হত্যা করেছিল। ধর্মকে যদি ব্যক্তিগত আচারে সীমাবদ্ধ রাখতে সচেষ্ট হতেন, রাজনীতিকে যদি ধর্মমুক্ত রাখতে পারতেন তাহলে ভারতবর্ষের ভিন্ন পরিণতি হতো। আর তাঁকেও এভাবে প্রাণ দিতে হতো না।
আমাদের সাহিত্যে গরু নিয়ে একটি গল্পের প্রসঙ্গ উল্লেখ করছি। শরৎচন্দ্রের ছোটগল্প ‘মহেশ’। গল্পের এক চরিত্র গফুর। হতদরিদ্র এক মুসলিম। পেশায় ছিল তাঁতি পরে ভাগচাষি হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করত। তার পরিবারে মাতৃহীন মেয়ে আমেনা আর বৃদ্ধ ষাঁড় মহেশ। গ্রামটি ব্রাহ্মণ শাসিত। জমিদারের খাজনা প্রদানের অক্ষমতায় গফুরকে নিগৃহীত হতে হতো। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড খরতাপে পানির আকাল গ্রামটিতে। হিন্দু সম্প্রদায়ের আধিক্যের কারণে অস্পৃশ্য মুসলিম আমেনাকে বহুকষ্টে পানি সংগ্রহ করতে হতো। পানির তৃষ্ণায় বৃদ্ধ ষাঁড় মহেশ আমেনার বহুকষ্টে আনা পানির কলসিতে মুখ দিতে গিয়ে কলসি ভেঙে যায়। এতে ক্ষিপ্ত গফুর কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে লাঙলের ফাল দিয়ে মহেশকে তীব্র আঘাত করলে, মহেশের মৃত্যু ঘটে। নিজের গরুকে নিজে হত্যা করলেও তার নিস্তার নেই। গো-হত্যার অভিযোগে চরম শাস্তি পেতে হবে। অগত্যা প্রাণ রক্ষায় বাপ-মেয়ে রাতের অন্ধকারে গ্রাম ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। গল্পের সারাংশ এটুকুই। এই গল্পে ব্রাহ্মণ শাসিত সেই সমাজে গো-হত্যা মানুষ হত্যার সমতুল্য ছিল বলেই আশ্রয়, ভিটেমাটি ছেড়ে মেয়েকে নিয়ে গফুর শহরে পালিয়ে জীবন রক্ষায় বাধ্য হয়েছিল। গল্পের গ্রামটি পশ্চিমবঙ্গের এক প্রান্তিক জনপদের। যেখানে জমিদারের নিপীড়নের পাশাপাশি ব্রাহ্মণ শাসনে মুসলমান গফুরের পরিণতির বিষয়টিও ফুটে উঠেছে। যেটি সেই সময়কার সমাজের বাস্তব চিত্রটিকে প্রকাশ করেছে।
গরু নিয়ে অজস্র রাজনৈতিক ঘটনা উপমহাদেশে ঘটেছে। এখনো ভারতে ঘটছে না, তা নয়। ফ্রিজে রাখা মাংসকে গরুর মাংস সন্দেহে মুসলমান হত্যার ঘটনাও সাম্প্রতিক। অথচ পরে প্রমাণ মিলেছে ফ্রিজের সেই মাংস গরুর ছিল না। ছিল খাসির। ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্টে ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির বহু পরে, এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক’বছর পর ভারতীয় সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অর্থাৎ আমাদের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা অন্তর্ভুক্তির পরে। দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা-কে পরিহার করে সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম প্রবর্তন করেছে বর্তমান সরকার। এ ছাড়াও সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক ধারাসমূহের বিলোপ ঘটিয়ে কতিপয় সাম্প্রদায়িক ধারাসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনার চরম পরিপন্থি। সকল সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্মীয় অধিকার এবং পালনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার পরও এখন ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার সংবিধান উপেক্ষা করে হিন্দুত্ববাদী শাসনে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভারতকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমাদের দেশে গরু রপ্তানি বন্ধ করে আমাদের স্বাবলম্বী হতে উদ্বুদ্ধ করেছে নিশ্চয়। কিন্তু নিজ দেশের গবাদিপশু পালনকারীদের জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এতে ভারতীয় খামারিদের চরম অর্থনৈতিক দুর্দশার কবলে পড়তে হচ্ছে এবং হবে। কেননা বিশ্বের কুথাও ভারতীয় গরু রপ্তানির সুযোগ নেই। তাহলে ভারতের গরুর কি হবে? ভারতের মোট জনসমষ্টির বৃহৎ অংশ নিরামিষভোজী। হিন্দু ব্যতীত অন্য যারা আমিষ খাবে তাদের জন্য গরু নিষিদ্ধ। পশ্চিমবাংলাসহ মাত্র ক’টি প্রদেশে গরু-মহিশ জবাই করার সাংবিধানিক বিধান রয়েছে। অন্য সকল প্রদেশসমূহে গো-হত্যা নিষিদ্ধকরণ হয়েছে এবং হচ্ছে। বিজেপি জনরায় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। বিজেপি শাসনামলে ভারতের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি আরো বিস্তার লাভ করবে। অপরাপর ধর্মের মানুষের ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ন হবে, সুরক্ষা হবে না। হিন্দুত্ববাদী শাসন ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ভাবমূর্তি পাল্টে দিচ্ছে এবং দেবে। এটা স্বাভাবিক। কেননা ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রচার-প্রচারণা চালিয়েই বিজেপি জনগণের ভোট আদায় করেছে। কাজেই তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা ধীরগতিতে হলেও তারা বাস্তবায়নে চেষ্টার ত্রুটি করবে না। যে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ খণ্ডিত হয়েছিল। সেই দ্বিজাতিতত্ত্বকে ভারতীয় জনগণ ভোটের মাধ্যমে পুনরায় ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে ফিরিয়ে এনেছে। বিজেপি তার সাম্প্রদায়িক পথেই হাঁটবে এতে বিস্ময়ের কারণ নেই।
মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করা কেউ গরুর রচনা লেখেনি-পড়েনি; তেমন একজনও বোধকরি পাওয়া যাবে না। (মাদ্রাসা এবং ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অবশ্য না পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।) গরুর রচনা লিখে পাশ করেনি মাধ্যমিকের এমন শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ গরু বিষয়ে শিক্ষা বঞ্চিত প্রান্তিকের মানুষ চাক্ষুষভাবে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় জেনেছে। আর আমরা জেনেছি পাঠে। গরু আমাদের জাতীয় পশু কিন্তু নয়। সর্বাধিক উপকারী পশু হলেও গরুকে সে মর্যাদা দেয়া হয়নি। দেয়া হয়েছে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে। একমাত্র চিড়িয়াখানা ছাড়া দেশবাসীর পক্ষে স্বচক্ষে বাঘ দেখা সম্ভব হয় না। বাঘের একমাত্র বসবাস সুন্দরবনে। সেখানকার কেউ কেউ দূর হতে বাঘ দেখলেও দেখতে পারে। এ ছাড়া চিড়িয়াখানাই বাঘ দর্শনের একমাত্র স্থান। খাঁচায় বন্দি বাঘ আমরা দেখেছি। জাতীয় পশু বাঘের একমাত্র আবাস সুন্দরবনে। সে সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কার শেষ নেই। সুন্দরবন সংলগ্ন রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও চালু হবার পর সুন্দরবনের অস্তিত্ব বলে আর কিছু থাকবে না। আমাদের বাঘ প্রাণরক্ষায় ভারতীয় সুন্দরবন অংশে ঢুকে যাবে। আমাদের ভূখণ্ডের একমাত্র ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের সাথে জাতীয় পশু বাঘ ও অন্যান্য প্রাণিবৈচিত্র্যের চির অবসান ঘটবে। তখন জাতীয় পশু বাঘের মর্যাদার পরিণতি কি হবে? জানি না।
গরু প্রসঙ্গে ফিরে আসি। গরু অত্যন্ত উপকারী পশু। তার বিস্তারিত বিবরণও সবাই জানি। এই গরু আমাদের কুরবানি ঈদের প্রধান পশু। গরু জবাই করে আমরা কুরবানি দিয়ে থাকি। ভারতের বর্তমান শাসক দল আমাদের গরু দেয়া বন্ধ করেছে। গো-হত্যা হতে দেবে না। এ নিয়ে আমাদের ওপর তারা ভয়ানক নাখোশ। ভারতের গরু না আসায় আমাদের গরু কুরবানি দেয়া কিন্তু বন্ধ হয়নি। অধিক দামে কেবল কিনতে হচ্ছে। কুরবানি দেয়া ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার অন্তর্ভুক্ত নয়। এটা আশির দশকের শুরুতে ইরাক অবস্থানে জেনেছি। কিন্তু কুরবানি এখন সামাজিক আচারে পরিণত। মান-মর্যাদা রক্ষায় ও প্রকাশ্যে গরু কুরবানির আবশ্যিকতা প্রশ্নহীন। আমাদের উপমহাদেশীয় ধর্মাচারে-রাজনীতিতে গরুকেন্দ্রিক অজস্র ঘটনা-দুর্ঘটনা ইতিহাসের নানা পর্বে খুবই জাজ্বল্যমান। গরুকে কেন্দ্র করে বহুমাত্রিক রাজনীতি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনা ছিল। এখনো ভারতে গরুর জন্য মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটছে। গরুতে কি আছে যে গরু রাজনীতির জন্য এমন গুরুত্ব পেয়েছে? এবং অতীতের ন্যায় আজো পাচ্ছে? তার কারণ অনুসন্ধান করা কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। গরুর রচনা আবার নতুন করে পাঠ করা এবং নতুনভাবে রচনা লেখার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। নিরীহ গৃহপালিত গরু আমাদের আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে এত যে গুরুত্বপূর্ণ, সেটা আমাদের অনেকের নিশ্চয় জানা ছিল না। আমরা নানা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গরুর গুরুত্ব এবং বহুমাত্রিক ঘটনায় গরুকে নিয়ে নতুনভাবে রচনা পাঠের তাগিদ অনুভব করছি। গরুর মর্যাদা-সম্মান এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে রয়েছে; সে কারণে গরু সম্পর্কে পুনর্পাঠ কেবল আবশ্যক নয়, অপরিহার্যও হয়ে পড়েছে।
এক সম্প্রদায়ে আচার, অপর সম্প্রদায়ের অনাচার। এ নিয়ে বিরোধ-বিভক্তি, দাঙ্গা-হাঙ্গামার অগণিত ঘটনার ধারাবাহিকতা থেকে পরিত্রাণের উপায়টি হচ্ছে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ ভূমিকা। রাষ্ট্র যদি তার ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে বাস্তবানুগ রূপে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে; তাহলেই এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। রাষ্ট্রের বৃত্তের মধ্যে সমাজ ও ব্যক্তি। ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রভাব সমাজ জীবনে প্রতিফলিত হলে এই সংকটের নিরসন ঘটবে। মানুষে-মানুষে ধর্মীয় বিরোধ-বিভক্তিতে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ বলিষ্ঠ ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিকতায় সমাজের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক বিরোধ-বিভাজনের অবসান সম্ভব। রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সকল প্রকার অধিকার ও সুযোগের সমতা নিশ্চিত হলে ধর্মীয় বিরোধ-সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির অবসানও সম্ভব। একমাত্র রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবেই সমাজ জীবনে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটে। সকল ধর্মের মানুষের ধর্মীয় অধিকার নিশ্চিত একমাত্র রাষ্ট্রের নিয়মনীতিতেই সম্ভব। রাষ্ট্রই একমাত্র সে অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতায় সমাজে সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দেয়ার সুযোগ পায়। রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল সম্ভব। তবে রাষ্ট্রকে হতে হবে সম্পূর্ণরূপে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক। সাংবিধানিক বিধি-ব্যবস্থা কাগুজে পরিণত হলেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ধর্মীয় বিভাজনে অনভিপ্রেত ঘটনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। সে সুযোগটি সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি-গোষ্ঠী গ্রহণ করে অনাচারে নেমে পড়ে। ঘটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার নৃশংস ঘটনা। তাই রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ নিয়মনীতির বাস্তবানুগ প্রয়োগ অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা