রাজধানীতে নব্য জেএমবির পাঁচ সদস্য আটক

আগের সংবাদ

চট্টগ্রামের শিল্পকলায় শোকগাথার শব্দাবলি

পরের সংবাদ

বাংলাদেশ রাষ্ট্রটাকেই হত্যা করা হয়েছিল : আনিসুজ্জামান

ঝর্ণা মনি :

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ৯, ২০১৯ , ১২:২৩ অপরাহ্ণ

পনের আগস্ট শুধু একটি কলঙ্কিত দিনই নয়, এটি জাতির জন্য বিভীষিকাময় এক অধ্যায়। ভয়াল সে রাতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নেপথ্যে শুধু ব্যক্তি মুজিবকে নয়, বাংলাদেশ নামক তার সৃষ্ট রাষ্ট্রটাকেই হত্যা করা হয়েছিল। দেশ ও জাতিকে ক্রমশই পাকিস্তানি ভাবধারার দিকে ঠেলে দেয়া হয়। নভেম্বরে কারাগারে নির্মমভাবে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। বন্দুকের নলে ক্ষতবিক্ষত করা হয় সংবিধান। ধর্ম নিরপেক্ষতা বাদ দেয়া হয় সংবিধান থেকে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র- হারিয়ে যায় সংবিধান থেকে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলতে আর কিছুই ছিল না। শোকাবহ পনের আগস্ট নিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন বরেণ্য শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান।
সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসভবনে ভোরের কাগজকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষৎকারে কলঙ্কিত আগস্টের সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, জাতির উল্টোপথে যাত্রা, ইতিহাস বিকৃতি ও থমকে যাওয়া সময় এবং বর্তমান বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া বিষয়ে কথা বলেন ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে পাকিস্তানি ভাবধারা থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছিলাম, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সেদিকে যাত্রা শুরু হয়। ওই সময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভয়াবহ পরিবর্তন ঘটে। যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করে আমরা বিজয়ী হয়েছি, সেই জাতীয়তাবাদ সরিয়ে রেখে বিকল্প চিন্তাধারা শুরু হয়। শুরু হয় ইতিহাস বিকৃতি। পরে জিয়ার দেখানো পথেই হাঁটেন এরশাদ। ওই দুঃসময় থেকে মুুক্তি পেতে আমাদের অনেক সময় লাগে।
জাতির পিতা হত্যাকা ণ্ড দেশি-বিদেশি গভীর ষড়যন্ত্রের পরিণতি। এই ষড়যন্ত্রে কারা জড়িত ছিল- এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা একক দেশীয় ষড়যন্ত্র ছিল না। সেদিন সেনাবাহিনীর কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত কিছু সেনা অফিসার মিলে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে; বিষয়টি মোটেই এত সহজ নয়। বিদেশি কোনো কোনো রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও লিবিয়াকে আমরা চিহ্নিত করেছি। মেজর ডালিম রেডিও স্টেশন দখল করে বাংলাদেশকে একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা দেন। পরদিন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোও ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানান এবং এই ধারণা সৌদি আরবকেও দেয়ার চেষ্টা করেন। এ থেকে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রের কথা ভুট্টো আগেই অবহিত ছিলেন। লিবিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মর্যাদার সঙ্গে আশ্রয় দিয়েছে। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। এতে মনে হয়, আগে থেকে লিবিয়া না জানলেও পরে সবকিছু জানতো এবং হত্যাকাণ্ডে তাদের পূর্ণ সমর্থন ছিল। আমাদের বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) তোয়াব ইসলামী ভাবধারা প্রচার করেছিলেন! তখন লিবিয়া সমর্থন করে। একসঙ্গে সভা সমিতিতে যোগ দেয় লিবিয়ার রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, আভাস পাওয়া যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানত। তাদের যোগসাজশ ছিল। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেনি বরং পাকিস্তানের পক্ষেই ছিল। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকেও সমর্থন জানায়নি। স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে চীন। এরমানে তারা বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশ চেয়েছিল!
দেশীয় ষড়যন্ত্র প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, খুনিরা সেনাবাহিনীর মধ্যে যেভাবে ষড়যন্ত্র করেছিল, জিয়াউর রহমানকেও তারা জানিয়েছিল, এটি তো আমরা সবাই জানি। জিয়া ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনো ভ‚মিকা না নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের সমর্থন দিয়েছেন। কে এম সফিউল্লাহ জানতেন বলে আমার মনে হয় না। আর যখন ১৫ আগস্ট জানলেন, তখন তিনি ভীত হয়ে পড়েছিলেন। বাধা দিতে পারেননি। তার নির্দেশ কেউ শোনেনি। কারণ সেনাবাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়েছিল। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করা ছিল চরম অব্যস্থাপনা। এটি পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে কল্পনাও করা যায় না। এভাবে অধ্যাদেশ জারি করে হত্যাকারীদের রক্ষার চেষ্টা পৃথিবীর কোনো দেশে হয়নি। এ থেকে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতায় আসা মোশতাক-জিয়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কলঙ্কিত এই হত্যার সঙ্গে জড়িত। তদন্ত কমিশন হলে সম্পূর্ণ তথ্য উদ্ঘাটিত হবে। কারণ আজও সব তথ্য আমরা জানি না। খুনিরা কিভাবে ষড়যন্ত্র করেছিল, কারা কারা জড়িত ছিল, কার মৌন সমর্থন ছিল সব জাতির জানা প্রয়োজন।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশ অনেক পিছিয়ে যায়। আমাদের ঐতিহাসিক অগ্রযাত্রা রুদ্ধ করে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ইতিহাসে তার ভূমিকাকে কালিমালিপ্ত করে। সেটিও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়। বঙ্গবন্ধু জাতির হৃদয়ে ফিরে এসেছেন। আজ বঙ্গবন্ধু সম্মানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত। আগামী বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করতে পারব।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ায় কতটুকু এগিয়েছে বাংলাদেশ- এর জবাবে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, সাধারণ মানুষের সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে উন্নত দেশ গড়তে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। এ জন্য প্রয়োজন সম্পদের সুষম বণ্ঠন। সবকিছুর সুফল যেন সবাই পায়। অর্থনৈতিকভাবে আমরা এগিয়েছি। কিন্তু সুষম বণ্ঠন নিশ্চিত করতে পারিনি। এখন এদিকে মনোযোগী হওয়া দরকার। দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে পারলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে পারব। ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক উন্নত বাংলাদেশ গড়াই হবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি বাঙালির সত্যিকারের শ্রদ্ধা নিবেদন।