নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিতের ব্যবস্থা নিন

আগের সংবাদ

নতুন ব্রেক্সিট যুদ্ধ, আদৌ কি জিতবেন বরিস জনসন?

পরের সংবাদ

দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো ছিল যার জীবনের ব্রত

বিভুরঞ্জন সরকার

যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ৯, ২০১৯ , ৮:১০ অপরাহ্ণ

আজ যারা নিজেদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী বলে দাবি করেন, তাদের কর্তব্য হবে দেশের মানুষের মন জয় করার রাজনীতিতে মনোযোগী হওয়া। ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে দলের স্বার্থ এবং দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থকে বড় করে দেখতে না পারলে বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা মেকি বলেই প্রতিভাত হবে।

১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির জন্য শোকের দিন। জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের ওই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল। এমনকি ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার অপচেষ্টাও সেদিন থেকে শুরু হয়েছিল। কিন্তু হাত দিয়ে যেমন সূর্যের আলো ঢেকে রাখা যায় না, তেমনি বঙ্গবন্ধুর খ্যাতি ও জ্যোতিও আড়াল করা সম্ভব হয়নি। ইতিহাস তার আপন গতিতেই এগিয়ে চলেছে। ইতিহাসের স্রষ্টা আজ স্বমহিমায় ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন। জাতীয় শোক দিবস পালনের আগে আমরা আবার একটু আলো ফেলতে পারি ইতিহাসের পাতায়। কীভাবে ইতিহাস তৈরি করলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, ‘আমার জন্ম হয় ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তারিখে। আমার আব্বার নাম শেখ লুৎফর রহমান। আমার ছোট দাদা খান সাহেব শেখ আব্দুর রশিদ একটা এমই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। আমাদের অঞ্চলের মধ্যে সেকালে এই একটা মাত্র ইংরেজি স্কুল ছিল, পরে এটা হাই স্কুল হয়, সেটি আজো আছে। আমি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত এই স্কুলে লেখাপড়ার পর আমার আব্বার কাছে চলে যাই এবং চতুর্থ শ্রেণিতে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি হই। আমার মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। তিনি কোনোদিন আমার আব্বার সঙ্গে শহরে থাকতেন না। তিনি সব সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন আর বলতেন, আমার বাবা আমাকে সম্পত্তি দিয়ে গেছেন, যাতে তার বাড়িতে আমি থাকি। শহরে চলে গেলে ঘরে আলো জ্বলবে না, বাবা অভিশাপ দেবে।’

আমাদের এটা জানা হলো যে শেখ মুজিব ছিলেন গ্রামের ছেলে। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার মতো অজপাড়াগায়ের কাদা পানিতে তার বেড়ে ওঠা। নিজে দরিদ্র পরিবারের সন্তান না হলেও তিনি তৎকালীন গ্রামীণ দারিদ্র্য দেখেছেন খুব কাছে থেকেই। মানুষের অভাব-দারিদ্র্য তিনি সইতে পারতেন না। বালকবেলাতেই নিজেদের গোলার ধান চুপিসারে বিলিয়ে দিতেন গরিবদের। গায়ের চাদর খুলে দিয়েছেন শীতে কষ্ট পাওয়া একজন দরিদ্র মানুষকে। থাকা বা না-থাকা বিষয়টি তাকে ছোটবেলা থেকেই ভাবিত এবং তাড়িত করেছে। তার মধ্যে একটি সহজাত নেতৃত্বগুণ ছিল।

শেখ মুজিব ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া নেতা ছিলেন না। তিনি ধাপে ধাপে ওপরে উঠেছেন। কারো তৈরি করা সিঁড়ি দিয়ে নয়, নিজে সিঁড়ি তৈরি করেছেন, তারপর ধীরে ধীরে ওপরে উঠেছেন। মানুষের মধ্যে থেকে, মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তিনি রাজনীতির ইমারত গড়ে তুলেছেন বলে মানুষকে তিনি ভালোবাসতেন গভীরভাবে, মানুষের প্রতি ছিল তার প্রগাঢ় বিশ্বাস। আর তাই তার সবলতা যেমন মানুষকে ভালোবাসা, তেমনি দুর্বলতাও মানুষকে অধিক ভালোবাসা।

তিনি তার জীবন অভিজ্ঞতা থেকে একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য স্থির করেছিলেন, আর সেটা হলো ‘দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো’। তিনি এই লক্ষ্য থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। একাধিকবার তাকে ফাঁসির মঞ্চের মুখোমুখি করা হলেও তিনি তার লক্ষ্যের প্রতি ছিলেন অবিচল।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করতে থাকে পাকিস্তানের কুচক্রী শাসক মহল। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় স্বাধীনতার পক্ষে এগিয়ে যাওয়ার নৈতিক অধিকার অর্জন করেন বঙ্গবন্ধু। শাসক গোষ্ঠীর তালবাহানার প্রতিবাদে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তিনি অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে দৃপ্তকণ্ঠে বলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তিনি বাঙালি জাতি, তার ‘প্রিয় ভাই ও বোনদের’ প্রতি আহ্বান জানান, ‘যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত’ থাকার। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতে নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর বর্বর হামলা চালালে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে ওঠে। এক নদী রক্ত সাঁতরে আমরা লাভ করি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। আমরা পাই লাল-সবুজের পতাকা এবং জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।

স্বাধীনতা ঘোষণার পর পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখলেও তার নামেই পরিচালিত হয় নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ। তিনি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে সরকারপ্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু গরিবের স্বার্থের রাজনীতির পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, পৃথিবী আজ দুভাগে বিভক্ত- শোষক এবং শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে। বঙ্গবন্ধু বিশ্ব রাজনীতিতে তার অবস্থান ঘোষণা করেছিলেন এই বলে- ‘আমাদের পরিষ্কার কথা আফ্রিকা হোক, ল্যাটিন আমেরিকা হোক, আরব দেশ হোক, যেখানে মানুষ শোষিত, যেখানে মানুষ নির্যাতিত, যেখানে মানুষ দুঃখী, যেখানে মানুষ সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা নির্যাতিত, আমরা বাংলার মানুষ দুঃখী মানুষের সঙ্গে আছি এবং থাকবো।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কখনো প্রতিহিংসার রাজনীতি করেননি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্যও তার ছিল বুকভরা ভালোবাসা। রাজনীতিতে উদারতা ও কঠোরতার যে সমন্বয় দরকার বঙ্গবন্ধু তা করেননি। তিনি ছিলেন কেবলই উদার, মানবিক ও সংবেদনশীল। কিন্তু তার প্রতিপক্ষ তার উদারতাকে দুর্বলতা ভেবেছে। তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে যে প্রতিহিংসার রাজনীতির সূচনা হয়, তা এখনো অব্যাহত আছে।

বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর রাজনৈতিক ব্রত থেকে তিনি বিচ্যুত হননি। সদ্য স্বাধীন দেশে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা, গরিবের হক মেরে খাওয়া ‘চাটার দল’-এর বিরুদ্ধে তার ছিল কঠোর মনোভাব। তিনি বলেছিলেন, স্বাধীনতা অর্জন করা যেমন কষ্টকর, তা রক্ষা করা তারচেয়েও কঠিন। দেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন।

স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, আমাদের নীতি পরিষ্কার। এর মধ্যে কোনো কিন্তু নাই। আওয়ামী লীগ কাউন্সিলই সুপ্রিম বডি। আপনাদের সিদ্ধান্ত সরকারকে মানতে হবে। এটা আওয়ামী লীগের সরকার। সরকারের আওয়ামী লীগ নয়। আমার অনুরোধ, নির্দেশ, আবেদন কাজ করতে হবে। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলিতে হবে। ক্ষমতা দখলের জন্য আওয়ামী লীগ সংগ্রাম করেনি। আওয়ামী লীগ এবার দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় আছে। টানা ক্ষমতায় থাকার সুফল-কুফল দুটোই আছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় দেশের অর্থনেতিক অগ্রগতি-সমৃদ্ধি যেমন দৃশ্যমান, তেমনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম-বিতর্কও আড়ালে থাকছে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা দূর হচ্ছে না।

বঙ্গবন্ধু তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন, যে কোনো মহৎ কাজ করতে হলে ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন। যারা ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয়, তারা জীবনে কোনো ভালো কাজ করতে পারেনি- আমার বিশ্বাস। এই বিশ্বাস থেকে তিনি কোনো দিন চুল পরিমাণ বিচ্যুত হননি। এই বিশ্বাস বুকে ধারণ করেই তিনি দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ- নিজের জীবন দিয়ে গেছেন। তার ত্যাগ ও সাধনার ফসল বাংলাদেশ।

আজ যারা নিজেদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী বলে দাবি করেন, তাদের কর্তব্য হবে দেশের মানুষের মন জয় করার রাজনীতিতে মনোযোগী হওয়া। ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে দলের স্বার্থ এবং দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থকে বড় করে দেখতে না পারলে বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা মেকি বলেই প্রতিভাত হবে।

বিভুরঞ্জন সরকার: যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়।