সতর্কতার পাশাপাশি প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার

আগের সংবাদ

প্রিয়জন যখন স্মৃতি

পরের সংবাদ

পশ্চিমবঙ্গ পারলে বাংলাদেশ কেন নয়

অমিত গোস্বামী

কবি ও লেখক

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ৮, ২০১৯ , ৯:৩৯ অপরাহ্ণ

কোনো অর্জন এমনি হয় না। ডেঙ্গু প্রতিরোধ মৌসুমি নয়। শীতকালে যে কাজটা এখানে করা হয় তা হলো মশার সম্ভাব্য আঁতুড়ঘর ধ্বংস করা। এটা নিয়মিত করা হয়েছে বলে কলকাতায় ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক কম। এখন বাংলাদেশে এর প্রাদুর্ভাবের পরিপ্রেক্ষিতে এখানে লাল সংকেত জারি হয়েছে। শুধু ঢাকা নিয়ে ভাবলে বাংলাদেশ ভুল করবে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রতিটি পৌরসভা ও পঞ্চায়েতকে কাজ করতে হবে যুদ্ধকালীন তৎপরতায়।

দিন পনেরো আগে আমি ছিলাম ঢাকায়। ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সূত্রপাত দেখেছিলাম তখনই। তখনই হাসপাতালে রোগীর স্রোত শুরু হয়েছে। মানুষজন আতঙ্কিত। কলকাতা ও সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় হু হু করে বিকোচ্ছে মশার ধূপ, ক্রিম, স্প্রে। যাচ্ছে বাংলাদেশে। তিরিশ টাকার ক্রিম সেখানে তিনশ টাকা। সে যাক মোচ্ছবের কাহিনী, আসুন আগে ডেঙ্গু নিয়ে দেখা যাক কলকাতা কী করেছে। সে প্রসঙ্গে বিশদে যাওয়ার আগে ডেঙ্গু সম্পর্কিত কয়েকটা বিষয় জেনে রাখা দরকার। তা হলো-

১. ডেঙ্গুর মশা আগেও ছিল, এখনো আছে। কী কলকাতায়, কী ঢাকায়। কলকাতায় ২০১৫ সালে এই রোগের প্রাদুর্ভাব প্রায় মহামারির আকার নিয়েছিল। স্বাভাবিক নিয়মে সচেতন হয়েছে সারা পশ্চিমবঙ্গ। কারণ শুধু একটি শহরে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সামলে নেয়া সত্ত্বেও কলকাতা ও সন্নিহিত অঞ্চলে এই প্রতিবেদন লেখা অবধি গত তিন মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে নয়জনের।
২. ডেঙ্গুর মশা সাধারণত স্থির ও পরিষ্কার জলে ডিম পাড়ে। ভাঙা পাত্র, নর্দমা, ডোবাতে, ফুলের টব, ডাবের খোলা, পরিত্যক্ত টায়ারে, আগাছা ভর্তি জলা- এগুলো হলো উৎস বা সোর্স। কাজেই সোর্স ধ্বংস না করলে ডেঙ্গু কমবে না।
৩. ডেঙ্গুর মশার বংশবিস্তারে বৃষ্টিপাত একটা কারণ। কম বৃষ্টি হলে ডেঙ্গুর প্রকোপ কম হয়। যেমন এবারে কলকাতায় বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। জুনে তিনশ মি.মি. বৃষ্টি হওয়ার কথা, হয়েছে মাত্র ৯৪ মি.মি.। জুলাইয়ে সাড়ে চারশ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়ে যাওয়া উচিত ছিল সেখানে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ১৩৪ মি.মি.। কলকাতা জল পেল কোথায়? সে তুলনায় ঢাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনেক বেশি।
৪. সব ডেঙ্গু মারাত্মক নয়। ডেঙ্গু তিন প্রকার- ক্লাসিক্যাল, হেমারেজিক, শক সিনড্রোম। শেষের দুটি মারাত্মক। জ্বরের তিন দিনের মধ্যে এনএস-১ অ্যান্টিজেন টেস্ট করে বোঝা যায় ডেঙ্গু হয়েছে কিনা। জ্বরের স্থায়িত্ব আরো কিছু দিন বেশি হলে আইজিএম ম্যাক এলাইজা স্ট্রিপ টেস্ট করা হয়। সঙ্গে রক্তের প্লাটিলেট পরিমাপ করে রোগের ব্যাপকতা সম্পর্কে ধারণা করা হয়।
৫. ডেঙ্গু হলেই হাসপাতালে ভর্তি করা ঠিক নয়। প্রতি ঘন মি.লি. রক্তে সত্তর হাজারের কম পরিমাণ অনুচক্রিকা থাকলে রোগীর অবস্থা সংকটজনক বলে মনে করা হয়। তখন তাকে প্লাটিলেট দিতে হতে পারে। তখনই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা উচিত।
৬. ডেঙ্গু ভাইরাস চার প্রকার বা সেরোটাইপের হয়। তাই ডেঙ্গুও চারবার হতে পারে। যে প্রকার ডেঙ্গুতে একবার কেউ আক্রান্ত হয়, তার শরীরে সেই নির্দিষ্ট প্রকার বা সেরোটাইপের বিরুদ্ধে ইমিউনিটি তৈরি হয়। কিন্তু অন্য প্রকারের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। কাজেই বর্ষায় জ্বর হলে আগেই রক্ত পরীক্ষা করা আবশ্যিক।
এ কথা সত্যি যে, পশ্চিমবঙ্গ (শুধু কলকাতা নয়) গত কয়েক বছর ধরেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। তারা কী কী করেছে?
১. সারা বছর ধরে এখানে নিবিড় নজরদারি চালানো হয়, যাতে কোথাও জল না জমে থাকে। প্রথমে কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশে শহরের পাঁচটি বরোয় ক্যামেরা লাগানো ড্রোন দিয়ে নজরদারি চালিয়েছিল একটি সংস্থা। যেসব বরো এলাকার যে যে ওয়ার্ডে আগের বছর ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান মিলেছিল, মূলত সেখানকার উঁচু বাড়িগুলোর ওপরে, পরিত্যক্ত কারখানায়, জঙ্গলে ঘোরানো হয়েছিল ড্রোন। ৪৮৪টি ছবির অনেকগুলোতেই ধরা পড়েছে মশার বংশবিস্তার। এর উদ্দেশ্য মশার বংশবিস্তারের উৎসগুলো আবিষ্কার। তারপরে সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছিল। সেই উদ্যোগ এখনো অব্যাহত। অন্যান্য পৌরসভায় বাড়ি বাড়ি ঘুরে বংশবিস্তারের উৎসগুলো ধ্বংস করার প্রক্রিয়া নিরন্তর চলে।
২. স্কুল, অঙ্গনওয়ারি কেন্দ্র থেকে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের সাহায্যে ডেঙ্গু নিয়ে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও ডেঙ্গু কার্ড চালু করা। প্রতি মাসে বা প্রতি দেড় মাসে এরা একবার আসেন এবং জেনে যান বাড়িতে কোনো মশাবাহিত রোগ হয়েছে কিনা।
৩. কলকাতার ১৪৪টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতেই ২০ থেকে ২৫ জন করে কর্মী আছেন, যাদের মধ্যে একদল প্রচারের কাজ চালান, আর অন্য দল জল জমছে কিনা কোথাও, সেটার ওপরে নজর রাখেন। এ ছাড়া আছে ১৬টি বরোর প্রত্যেকটির জন্য একটি করে র‌্যাপিড অ্যাকশন টিম। তাতে ৮ থেকে ১০ জন লোক থাকে সব ধরনের সরঞ্জাম নিয়ে, গাড়িও থাকে তাদের কাছে। কোনো জায়গায় ডেঙ্গুর খবর পাওয়া গেলে অতি দ্রুত তারা সেখানে পৌঁছিয়ে এডিস মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণের কাজ করে। একই অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে সব পৌরসভায়। গ্রাম পঞ্চায়েতগুলোও সচেতন হয়েছে।
৪. শহরে বছরে তিনবার জঙ্গল পরিষ্কার করা হয়। সরকারি জমিতে পৌর নিগম করে। ব্যক্তিগত জমিতে জমির মালিককে করতে হয়। না করলে পৌর নিগমের কাছে অভিযোগ যায়। জঙ্গল পরিষ্কারের সঙ্গে এক ধরনের কেমিক্যাল দেয়া হয়, যা আগাছার বৃদ্ধি রোধ করে। অনেক বহুতল বা সরকারি ভবনের আনাচে-কানাচে জল জমে থাকতে দেখা যায়- যেগুলো ডেঙ্গুর রোগবাহী মশা এডিস ইজিপ্টাই জন্মানোর আদর্শ জায়গা। যেসব জায়গায় জল জমে থাকতে দেখছে করপোরেশনের নজরদারি কর্মীরা, সেই ভবনগুলোর ওপরে এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা ধার্য করার জন্য আইন পরিবর্তন করা হয়েছে। জল পরিষ্কার করে দেয়ার খরচ বাবদ বিল, বাড়ির বার্ষিক করের বিলের সঙ্গে পাঠিয়ে দিচ্ছে করপোরেশন।
৫. পৌর নিগম স্থাপিত রক্ত সংগ্রহ কেন্দ্রগুলো সক্রিয় হয়েছে। এখানে জ্বর তিন দিনের মধ্যে হলেই বিনা পয়সায় রক্ত পরীক্ষা করা যায়। রক্তের রিপোর্ট ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রোগীর কাছে পৌঁছায়। এতে পরিষ্কার ডেঙ্গু পজিটিভ কিনা, অণুচক্রিকার পরিমাণ জানা যায়। তবে বেশিরভাগ ল্যাবরেটরিই এখনো বেসরকারি। তাই ১৪৪টি ওয়ার্ডেই একজন করে কর্মী আছেন, যার একমাত্র কাজ হলো ওই এলাকায় যত হাসপাতাল, নার্সিং হোম বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে সেখান থেকে মশাবাহিত রোগ নির্ণীত হলে রোগীর বিশদ বিবরণ পৌরসভাকে জানাতে হয়।
৬. জনসচেতনতা বৃদ্ধি। ডেঙ্গু রোগ সম্পর্কে ক্রমাগত প্রচার, প্লাস্টিকের ব্যাগ, চায়ের কাপ ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, কলের পাশে কাঁচা গর্ত পাকা করা, নিয়মিত মশা প্রতিরোধী ধোঁয়া দেয়া এবং পৌর কাউন্সিলরদের দায়বদ্ধতা পশ্চিমবঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বড় ভূমিকা নিয়েছে।
কোনো অর্জন এমনি হয় না। ডেঙ্গু প্রতিরোধ মৌসুমি নয়। শীতকালে যে কাজটা এখানে করা হয় তা হলো মশার সম্ভাব্য আঁতুড়ঘর ধ্বংস করা। এটা নিয়মিত করা হয়েছে বলে কলকাতায় ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক কম। এখন বাংলাদেশে এর প্রাদুর্ভাবের পরিপ্রেক্ষিতে এখানে লাল সংকেত জারি হয়েছে। শুধু ঢাকা নিয়ে ভাবলে বাংলাদেশ ভুল করবে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রতিটি পৌরসভা ও পঞ্চায়েতকে কাজ করতে হবে যুদ্ধকালীন তৎপরতায়। মনে রাখতে হবে, পুরো দেশ ডেঙ্গুমুক্ত হয়, কোনো একটি শহর নয়।
(এই প্রতিবেদনটি কলকাতা করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষের মতামতের ভিত্তিতে লিখিত)

অমিত গোস্বামী : কবি ও লেখক।