জেসিআই ঢাকা ওয়েস্টের উদ্যোগে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত

আগের সংবাদ

আসাদুজ্জামান নূর যখন কবি

পরের সংবাদ

সিনেমায় হুমায়ূন আহমেদের বৃষ্টিবিলাস

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ৩, ২০১৯ , ৪:২৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ৩, ২০১৯, ৪:৩৫ অপরাহ্ণ

Avatar

হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন বৃষ্টিবিলাসী। ‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো এক বরষায়’ গানটি বেরিয়ে এসেছে এই জনপ্রিয় ও কথাসাহিত্যিক চলচ্চিত্রকারের কলম থেকে। বৃষ্টি তাকে কতটা আলোড়িত করেছে তার প্রমাণ মেলে হুমায়ূন আহমেদের লেখা গল্প ও উপন্যাসে। তার পরিচালিত বিভিন্ন ছবিতেও তিনি ক্যামেরাবন্দি করেছেন বৃষ্টিকে। ছবিতে প্রতীকী অর্থে বৃষ্টিকে ব্যবহার করেছেন তিনি। হুমায়ূন আহমেদের সিনেমায় বৃষ্টিযাপন নিয়ে এই প্রতিবেদন

আগুনের পরশমণি
মেঘলা আকাশ। চারদিক বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝড়ো হাওয়ায় গাছের ডালপালা উত্তাল। এমন আকাশেও একটি হেলিকপ্টার উড়ছে। শুকনো পিচঢালা পথে অল্প অল্প ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে। এরপর স্থির পানিতে অঝোরে বৃষ্টি পড়তে থাকে। বৃষ্টিজুড়ে যায় আবহ সঙ্গীতের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের ‘এসো নিপবনে’ গানের সুর বাজতে থাকে। যুদ্ধের হাওয়ায় যখন উত্তাল দেশ। ভয়ে যখন তটস্থ প্রতিটি প্রাণী তখনো প্রকৃতির এমন রূপে মুগ্ধ হয়ে ঘর থেকে ছোট্ট উঠোনে বেরিয়ে আসে আবুল হায়াতের মেয়ে বিপাশা। হুমায়ূন আহমেদের পরিচালনায় প্রথম ছবি এটি। ‘আগুনের পরশমণি’ মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে।

শ্রাবণ মেঘের দিন
জমিদার গোলাম মুস্তফার বাড়িতে দাওয়াত খেতে যান জাহিদ হাসান। তাকে অপমান করে বের করে দেয়া হয়। প্রচণ্ড দুঃখ পান জাহিদ। গান ধরেন- ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’। গানের মাঝখানে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে। গানের দৃশ্যেই বৃষ্টি দেখে ভিজতে নেমে যান শাওন। চরিত্রদের যন্ত্রণার সঙ্গে বৃষ্টিকে অদ্ভুতভাবে মিশিয়ে দেয়ার কাজটি বারবারই করেছেন হুমায়ূন আহমেদ। ‘শ্রাবণ মেঘের দিনে’ও এটা দেখা যায়। গানের বাইরেও হুটহাট তার ছবিতে বৃষ্টি নেমে যায়। বাংলার চঞ্চলমতি বৃষ্টির চরিত্রও হুমায়ূন আহমেদের সেললুয়েড অভিজ্ঞতার অংশ। জাহিদ ও শাওনের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন মাহফুজ আহমেদ। ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ মুক্তি পায় ২০০০ সালে।

দুই দুয়ারী
গাছের পাতা থেকে বৃষ্টির পানি পড়ছে। অন্ধকার রাতে অল্প বাতির আলো। ছাতা মাথায় শাড়ি পরিহিত শাওনকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। আর দোলনাতে বসে বৃষ্টিতে ভিজছেন রিয়াজ। রিয়াজ শাওনকে বলেন, ‘বৃষ্টির গান শুনছি। মানুষ মাঝে মাঝে গান করে। কিন্তু প্রকৃতি সারাক্ষণ গান করে।’ রিয়াজ বৃষ্টিতে ভেজার আহবান জানালেও শাওন তা প্রত্যাখ্যান করে। কিছুক্ষণ পর ছাতা উড়িয়ে দিয়ে বৃষ্টির কাছে নিজেকে সঁপে দেয় শাওন। ছবির দৃশ্যে শাওনকে ঘরে বসে গান গাইতে দেখা যায়। আর বাইরে অঝোরে কচুপাতায় বৃষ্টির পানি পড়তে থাকে। ছবির ‘বরষার প্রথম দিনে’ গানটি সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। গানটিতে মাহফুজ ও শাওনকে বর্ষায় ভিজতে দেখা যায়। ২০০১ সালে সিনেমাটি নির্মাণ মুক্তি পায় ‘দুই দুয়ারী’।

ঘেটু পুত্র কমলা ছবির দৃশ্য

চন্দ্রকথা
চেয়ারে বসে আছেন আসাদুজ্জামান নূর। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গান গাইছেন শাওন। তার নাকে নাকফুল, কানে দুল। পরনে শাড়ি পরিপূর্ণ বাঙালি নারী। তবে চোখে-মুখে লেগে আছে না পাওয়ার বেদনার ছাপ। ‘আমি কারো কাছে কিছু চাই না’ বলে চলে যান শাওন। বারান্দায় এসে দাঁড়ায় সে। বাইরে মুষলধারায় বৃষ্টি ঝরছে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি। ক্যামেরা চলে যায় গাছের ওপর। গাছের পাতা বেয়ে ঝরতে থাকে বৃষ্টির জল। সিনেমার গল্পে এ যেন শাওনের ভেতরে চেপে রাখা কান্নার বহিঃপ্রকাশ। ছবিতে আরো অভিনয় করেন ফেরদৌস ও আহমেদ রুবেল। ২০০৩ সালে মুক্তি পায় ‘চন্দ্রকথা’।

নয় নম্বর বিপদ সংকেত
হুমায়ূন আহমেদ এ ছবিতেও তার বৃষ্টিপ্রীতি লুকিয়ে রাখতে পারেননি। নুহাশপল্লীতে ধারণকৃত দৃশ্যগুলোতে প্রাকৃতিক বৃষ্টির দেখা পাওয়া যায়। অন্য ছবিগুলোর মতো এখানেও একটি বৃষ্টির গান রাখার লোভ সামলাতে পারেনি হুমায়ূন আহমেদ। এবার তিনি নিজে গান না লিখে দ্বারস্থ হোন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। কবিগুরুর বিখ্যাত গান ‘আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে’ গানটিতে কণ্ঠ মেলান মেহের আফরোজ শাওন। আর গানের সঙ্গে শাড়ি পরে পর্দায় অনন্য পারফর্ম করেন তানিয়া আহমেদ। ২০০৭ সালে মুক্তি পায় ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’।

আমার আছে জল
ট্রেন লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন মিম। অপরদিক থেকে হুইসেল বাজিয়ে ধেয়ে আসছে ট্রেন। এতে মিমের কোনো ভাবাবেগ নেই। এমন অবস্থা দেখে ছুটে আসেন ফেরদৌস। কিন্তু ট্রেন চলে যায় তার আপন গতিতে। ট্রেন যাওয়ার পর ফেরদৌস দেখেন ট্রেন লাইনের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন মিম। এক পর্যায়ে বেজে ওঠে ‘আমার আছে জল’ গানটি। গানের শেষ ভাগে গিয়ে দেখা মেলে বৃষ্টির। গায়ে বৃষ্টির পানি মেখে উচ্ছ¡সিত মিম ছুটে বেড়ায়। সিনেমার শেষের দিকে বৃষ্টি নামে। পুরনো পরিত্যক্ত বাড়ির দেয়াল কামড়ে উঠেছে লতাপাতা। শ্যাওলা লাগা এ দেয়াল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে জল। আর দুহাত প্রসারিত করে বৃষ্টিকে আপন করে নেয় মিম। বৃষ্টির বাঁধভাঙা আহবানে এক এক করে অঝোর ধারার নিচে এসে নিজেকে মেলে দেয় শাওন, জাহিদ হাসান ও ফেরদৌস। হাবিব ওয়াহিদের গাওয়া ‘বাদলা দিনে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান’ এর সঙ্গে ছবির প্রধান চরিত্রদের নিজেদের মনের একান্ত গোপন ভাব ফুটে ওঠে। ২০০৮ সালে মুক্তি পায় ‘আমার আছে জল’।

ঘেটু পুত্র কমলা
মেঘমালা ছুটে যাচ্ছে। আকস্মিক বিদ্যুৎ চমকে ওঠে। তারপর পদ্মপাতার ওপর ঝুম বৃষ্টি পড়তে থাকে। আবহে বেজে উঠে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের করুণ সুর। বৃষ্টির গভীরতা আর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের করুণ সুর দুই মিলে ভীষণ ভারী হয়ে ওঠে পুরো চিত্রটি। এ দিকে পুরনো জমিদার বাড়িতে বৃষ্টির জলে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে দেখা যায় আগুনকে। বৃষ্টির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে ঘেটু পুত্র মামুনও। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে মামুনকে নিজের পরিবারের কথা বলতে শোনা যায়। ২০১২ সালে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর মুক্তি পায় ‘ঘেটু পুত্র কমলা’।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা