আরো ৩০০ বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক

আগের সংবাদ

জেসিআই ঢাকা ওয়েস্টের উদ্যোগে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত

পরের সংবাদ

কালের গর্ভে কাকরাইলের শত শত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ৩, ২০১৯ , ৩:৫৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ৩, ২০১৯, ৩:৫৯ অপরাহ্ণ

Avatar

চলচ্চিত্রপাড়াখ্যাত রাজধানীর কাকরাইলে ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছে। সিনেমার আলো হারিয়ে যাচ্ছে। প্রায় চার যুগ আগে থেকে এই তল্লাটে গড়ে ওঠা শত শত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এই এলাকা ঘিরে গড়ে ওঠা ছোট-বড় তিন শতাধিক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই ছবি নির্মাণ বন্ধ করে দিয়েছে। গুটিয়ে নেয়া হয়েছে অফিসও।
ষাটের দশকে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাণকেন্দ্র ছিল সদরঘাট, ভিক্টোরিয়া পার্ক, নবাবপুর ও গুলিস্তানকেন্দ্রিক। আশির দশকের শুরু থেকে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ঘাঁটি গাড়তে থাকে কাকরাইলপাড়ায়। ওই সময় সিনেমা ব্যবসা রমরমা হওয়াতে পর্যায়ক্রমে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কাকরাইলের রাজমণি ফিল্ম সেন্টার, ফরিদপুর ম্যানশন, যমুনা বিল্ডিং, ভুঁইয়া ম্যানশন, ইস্টার্ন কমার্শিয়াল বিল্ডিংসহ কাকরাইলের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। বিজয়নগরজুড়েও ছড়ানো-ছিটানো ছিল সিনেমার অফিস।
একটা সময় সারা বছরই কাকরাইলপাড়ায় যেন ঈদের আমেজ লেগে থাকত। নতুন ছবি মুক্তির আগে আগে সারাদেশ থেকে হলমালিক বা হলের কর্মকর্তা, বুকিং এজেন্টরা কাকরাইলপাড়ায় এসে ভিড় জমাত। সিনেমার রিল, পোস্টার, ব্যানার কাকরাইলপাড়া থেকে সারাদেশে সরবরাহ হতো। সেসব এখন শুধুই অতীত। সেই সময় থেকে চলচ্চিত্রের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এখনো ঢিমেতালে চালিয়ে যাচ্ছেন, এমন কোনো কোনো প্রযোজক বলছেন, আশির দশক থেকে শুরু করে নব্বই দশকের শেষের দিক পর্যন্ত কাকরাইলে প্রতিদিনই যেন সিনেমার বাজার বসত। প্রযোজক, হলমালিক, বুকিং এজেন্ট, শিল্পীদের বসত মিলনমেলা। ২০০০ সাল পর্যন্ত সেই জোয়ার ছিল।
কিন্তু নব্বই দশক থেকে ভিডিও ক্লাবগুলোর দৌরাত্ম্যে সিনেমা হলে দর্শক কমতে শুরু করে। স্যাটেলাইটের ব্যাপক প্রসারের ফলে দর্র্শক সংখ্যা আরো কমে যায়। দেশি-বিদেশি চ্যানেলে দর্শকদের ছবি দেখার অভ্যাস সিনেমা হলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কমতে থাকে ব্যবসায়। প্রযোজনায় আগ্রহ হারাতে থাকে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আসে ভিডিও পাইরেসি। ভিডিও চ্যানেলে অবাধে দেশি সিনেমার প্রচার প্রযোজকদের পেটে লাথি মারে। ব্যবসায় খরা নেমে আসায় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা গুটিয়ে নিতে থাকে। নব্বই দশকের শেষের দিকে সিনেমায় অশ্লীলতা প্রবেশ করায় নামি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো সুনাম রক্ষার্থে বন্ধ হতে থাকে। অপেশাদার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অশ্লীল ছবির বিপরীতে টিকতে না পেরে এসব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো ছবি নির্মাণেও পিছিয়ে পড়ে। মূলত অশ্লীলতার কারণেই ভালো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম থমকে যায়।
একটা পর্যায়ে একসময়ের নামি-দামি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে থাকে। সেই সময়ের শীর্ষ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গত দেড় দশকে বন্ধ হয়েছে রাজল²ী প্রোডাকশন, মাসুদ কথাচিত্র, জ্যাম্বস প্রোডাকশন, এসএস প্রোডাকশন, খান আতা প্রাইভেট লিমিটেড, যমুনা ফিল্ম করপোরেশন, উজ্জ্বল ফিল্মস, আনন্দমেলা সিনেমা লিমিটেড, সুচন্দা ফিল্মস, পর্বত পিকচার্স, সোনামণি ফিল্মস, ববিতা মুভিজ, জয় ফিল্মস, ডি-রাশ ফিল্মস, এসডি প্রডাকশন, নান্টু প্রোডাকশন, স্বরলিপি বাণীচিত্র, আলমগীর পিকচার্স, লায়ন মুভিজ, চিত্রা ফিল্মস, ভাই ভাই ফিল্মস, দেশচিত্র, আশা প্রোডাকশন্স, পারভেজ ফিল্মস, হাসনাবাদ কথাচিত্র, অমি বনি কথাচিত্র, সনি কথাচিত্র, কিবরিয়া ফিল্মস, বাউল চলচ্চিত্র, আলিম ফিল্মস ইত্যাদি হাউস। সিনেমায় এসব ব্যানার দাপুটের সঙ্গে ছবি প্রযোজনা করেছে। এসব ব্যানার থেকেই ব্যবসাসফল অসংখ্য ছবি তৈরি হয়েছে। এসব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছিল হাজারো লোকের। প্রতিষ্ঠানে তালা পড়ায় কর্মীরা অন্যত্র কাজ নিয়েছেন। অনেকে এখনো বেকারত্বের অভিশাপে ভুগছেন।
গত দেড় দশকে কাকরাইলের স্বনামধন্য বেশির ভাগ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানই তাদের অফিস গুটিয়ে নিয়েছে। তবে কাকরাইলের ভুঁইয়া ম্যানশন ও ইস্টার্ন কমার্শিয়াল বিল্ডিংয়ে ছোট-বড় ২০ থেকে ২৫টি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অফিস কোনোরকমে টিকে আছে। নিয়মিত কোনো সিনেমা না থাকলেও এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কিবরিয়া ফিল্মস, আশীর্বাদ চলচ্চিত্র, জননী কথাচিত্র, হার্টবিট প্রোডাকশন, টিওটি, গীতিচিত্র কথাসহ পাঁচ-ছয়টি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অফিস খোলা হয়। তবে বন্ধ থাকা বাকি কোনো কোনো অফিস গুটিয়ে নেয়ার পরিকল্পনাও চলছে।
তবে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বন্ধের এই দীর্ঘ মিছিলের মধ্যেও বেশ কয়েকজন একক প্রযোজক ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম, জাজ মাল্টিমিডিয়া, শাপলা মিডিয়া, শাকিব খান ফিল্মসসহ কয়েকটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বছরে দুই-তিনটি করে ছবি নির্মাণ করে যাচ্ছে। তবে সবার অফিস আর কাকরাইলে নেই। রাজধানীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অফিসগুলো। অনেকে ছবি রিলিজের জন্য কাকরাইলে সাময়িকভাবে অফিস নেন। রিলিজ শেষ হতেই অফিস ছেড়ে দেন। ফলে কাকরাইলকে ঘিরে যে বাণিজ্যের বসতি গড়ে উঠেছিল তা আর প্রাণ ফিরে পাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের কণ্ঠজুড়ে শত শত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান হারিয়ে যাওয়ার বিষাদ। জমজমাট কাকরাইলের জন্য অনেকেরই চোখ সজল হয়ে ওঠে।