দুর্ভোগ সঙ্গী করে ঘরে ফিরছে মানুষ

আগের সংবাদ

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে যেভাবে সফল কলকাতা নগরী

পরের সংবাদ

বঙ্গবন্ধু বললেন, আমার বুকে অস্ত্র তাক করতে ওদের হাত কাঁপবে না! -পঙ্কজ ভট্টাচার্য

প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ২, ২০১৯ , ১২:০৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ২, ২০১৯, ১২:০৬ অপরাহ্ণ

Avatar

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার সর্বশেষ দেখা হয় পঁচাত্তরের ১৩ জুলাই। বাংলাদেশে তখনকার বুলগেরিয়ান রাষ্ট্রদূত বয়েজিদ এবং যিনি হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নির্যাতিত হয়েছিলেন, তিনি ১২ জুলাই আমাকে ডেকে নিয়ে একটা গুরুতর সংবাদ জানালেন যে, অল্প কিছুদিনের মধ্যে সেনাবাহিনীর মধ্যস্তরের অফিসারদের একাংশ একটা রক্তাক্ত অভ্যুত্থান ঘটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি এ ব্যাপারে মুজিব ভাইকে অবহিত করতে ছুটে যাই। মুজিব ভাই খবরটা শুনে বললেন, আমার বুকে অস্ত্র তাক করতে ওদের হাত কাঁপবে না!
বঙ্গবন্ধু সে দিন নিজেই খুনিদের নাম বলেছিলেন নিজের অগোচরে। মেজর ডালিম, রশিদ ও ফারুকদের বিষয়টি তুলে ধরে বললেন, ওরা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে বলেই সেনাবহিনী থেকে বহিষ্কৃত। ওরা পুনরায় সেনাবাহিনীতে চাকরি ফিরে পেতে চায়, যা সেনানিয়মে সম্ভব নয়। তাই ব্যাংকের লোন নিয়ে ব্যবসা করতে তাদের বলেছি। ওরা তো এখন লোন পেয়ে ব্যাংকক-সিঙ্গাপুর দৌড়ঝাঁপ করছে। তিনি বলেন, আমাকে নিয়ে চিন্তা করিস না। আমাকে ক্ষমতা থেকে হটাতে চাইলে আমি নিজেই ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে চাদরটা কাঁধে দিয়ে আমার প্রিয় জনতার মধ্যে চলে যাব। আবার মানুষকে নিয়ে লড়াই-সংগ্রাম গড়ে তুলব। শোকের মাস আগস্ট নিয়ে এভাবেই তার স্মৃতিচারণ তুলে ধরলেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ পংকজ ভট্টাচার্য। ভোরের কাগজের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট, পরবর্তী পরিস্থিতি, খুনি মোশতাক নিয়ে কথা বলেন ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পংকজ ভট্টাচার্য।
তিনি বলেন, সেদিন মুজিব ভাই কিছুটা বিচলিত হলেও বলেন, আমি তোদের জন্য ভাবি। মণিদা, মুজাফ্ফর, পীর হাবিদের সাবধান থাকতে বলিস। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন, আমি এন্টি ট্যাংক আনার জন্য মার্শাল টিটোর কাছে নুরুজ্জামানকে পাঠিয়েছি। এক মাসের মধ্যে প্রতিষেধক ব্যবস্থাটি এসে যাবে। এর মধ্যে আমি একজনের জুতো দেখে শিউরে ওঠলাম যিনি পাকিস্তানের সাবেক পুলিশকর্তা আবদুর রহিম। আমার মতো অনেক আন্দোলনের কর্মীদের কড়া জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু জানালেন, আবদুর রহিম তার সচিব ও বিশ্বস্ত লোক। তিনি ট্যাংক আনার বিষয়টি পুনরায় উল্লেখ করলেন। কিন্তু মুজিব ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরব তখনই আরেক বিপদ! খন্দকার মোশতাক আহমেদ দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। মুজিব ভাই বললেন, এই যে আমাদের রি-অ্যাক্শনারি নেতা এসে গেছেন। ক্রুর হাসি হেসে মোশতাক আহমেদ জবাব দিলেন, নেতা আপনার জীবদ্দশায় আমি আপনার বিরোধিতা করব না।
খুনি মোশতাক তার কথা রেখেছিল। পঁচাত্তরের পনের আগস্টের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পরে মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেনি। বাংলার ইতিহাসে এইভাবে মোশতাক দ্বিতীয় মীরজাফরে পরিণত হলেন। আমি দ্রুত সব ঘটনা অধ্যাপক মোজাফ্ফর, মণি সিংহ ও কমরেড ফরহাদকে জানাই।
কেমন ছিল রক্তাক্ত পনের আগস্টের দিনটি এমন প্রশ্নের জবাবে বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ বলেন, ১৪ আগস্ট অনেক রাত পর্যন্ত আমি শেখ মণির বাসায় ছিলাম। কীভাবে যুবশক্তিকে কাজে লাগানো যায় এ বিষয়ে তার একটি সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম। কারণ পরদিন এ ব্যাপারে আমার একটি বক্তৃতা দেয়ার কথা ছিল। ভোরবেলায় আমি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা জানতে পারি। দিগ্ভ্রান্তের মতো আমাদের পার্টির সদস্য মোনায়েম সরকারের শান্তিনগরের বাসার দিকে যাচ্ছিলাম। চারিদিকে স্তব্ধ, ভয়ার্ত পরিবেশ। মাঝে মাঝে জাসদের মিছিল, ‘রুশ-ভারতের দালাল ধর’ ইত্যাদি স্লোগান। রাস্তায় আওয়ামী লীগের কোনো কর্মীকে দেখিনি।
জাতির জনক হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিবাদ, লড়াই প্রসঙ্গে পংকজ ভট্টাচার্য বলেন, প্রথম প্রতিবাদ বামরাই করেন। অবশ্য তখন পরিবেশটা অন্যরকম ছিল। সাইফুদ্দিন মানিক, আমি, তোফায়েল, রাজ্জাকসহ অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করি। ৪ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শোক মিছিল করি। গায়েবানা জানাজা করি। সবার সামনে ছিলাম আমি। পরদিন ইত্তেফাক ওই ছবিটি প্রকাশ করে আমার মাথায় লালবৃত্ত এঁকে। সেদিন আমি বঙ্গবন্ধুর কেবিনেটে ১৭ জন মন্ত্রীকে অনুরোধ করেছিলাম গায়েবানা জানাজায় আসার জন্য। একমাত্র মহিউদ্দিন ছাড়া অন্য কেউ আসেননি।
তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহে ঐক্য-ন্যাপের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। মিছিল করে। অনেকে জেলও খাটেন। কিন্তু কোথাও আওয়ামী লীগ কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। ডিসেম্বরে আমাকে দেশত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। আমি ৬ মাস ভারতে ছিলাম। পরে দেশে ফিরে আসি। ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগসহ বামদলগুলো মিলে আবার লড়াই সংগ্রাম শুরু করি। কিন্তু আমাদের দাঁড়াতে দাঁড়াতে তিন-চার বছর লেগে যায়। এর আগেই কুখ্যাত ইনডেমিনিটি আইন করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয় খুনি চক্র।