অধিভুক্ত সাত কলেজের সংকট নিয়ে ফের উত্তাপ

আগের সংবাদ

ধামরাইয়ে পরকীয়ার জেরে যুবককে পিটিয়ে হত্যা

পরের সংবাদ

টেলিফোন সাক্ষাৎকারে প্রিয়া সাহা

মিথ্যা অভিযোগ করিনি বাস্তবতাই তুলে ধরেছি

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ২২, ২০১৯ , ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ২২, ২০১৯, ৪:৫৭ অপরাহ্ণ

Avatar

আমি কোনো মিথ্যা কথা বলিনি। সরকারের বিরুদ্ধেও কোনো নালিশ বা অভিযোগ করিনি। সরকারি পরিসংখ্যান এবং সেই তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে করা গবেষণার তথ্য তুলে ধরেছি মাত্র। এই তথ্যগুলো আমিই যে প্রথম বলেছি তেমন নয়। ২০০১ সালে ৯৪ দিন ধরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্বাচনোত্তর চরম নির্যাতন চলেছিল। সেই সময় দেশের সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের কথা তুলে ধরে এই জনগোষ্ঠীকে রক্ষার জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা সারা বিশ্ব ঘুরেছেন। আমি তার সেই বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়েছি। যেকোনো অবস্থায় থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস আমি জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে শিখেছি। গতকাল রবিবার ভোরের কাগজকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহা। ফোনে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সেবিকা দেবনাথ।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে প্রিয়া সাহার বক্তব্যের ভিডিও প্রকাশের পর দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় ব্যাপক আলোড়ন। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হবে বলেও মন্তব্য করেছেন সরকারের মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা। প্রিয়া তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ থেকে ৩৭ মিলিয়ন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নিখোঁজ হয়েছে। তার নিজের বাড়িঘরও আক্রান্ত হয়েছে কিন্তু এর কোনো বিচার হয়নি। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা যাতে নিজ দেশে থাকতে পারে এ ব্যাপারে প্রিয়া সাহা ট্রাম্পের সাহায্য চেয়ে অনুরোধ করেন।

ভো. কা : ৩৭ মিলিয়ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিখোঁজ এই পরিসংখ্যান কোথা থেকে পেয়েছেন? এ তথ্য কতটা সত্য?
প্রিয়া : বাংলাদেশে সরকারের আদমশুমারিতেও ক্রমান্বয়ে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হ্রাস পাবার বিষয়টি উঠে এসেছে। দেশ ভাগের সময় দেশে মোট জনসংখ্যার ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল সংখ্যালঘু। এখন সেটি এসে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭ শতাংশে। সরকারি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত একটি গবেষণা করেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন প্রতিদিন ৬৩২ জন সংখ্যালঘু হারিয়ে যাচ্ছে। ২০১১ সালে স্যারের এই গবেষণার সময় আমি তার সঙ্গে কিছু কাজ করেছি। তাই এই বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবহিত। এ ছাড়া দেশে মোট জনসংখ্যা ১৮০ মিলিয়নের মতো। আমার বক্তব্যে আমি বোঝাতে চেয়েছি, দেশের জনসংখ্যা যেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বৃদ্ধি পেয়েছে সেই অনুযায়ী সংখ্যালঘু জনসংখ্যা বাড়েনি। আগের অনুপাতে যদি জনসংখ্যা বাড়ত তাহলে অবশ্যই আমার দেয়া তথ্য সঠিক।
ভো. কা : হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ দাবি করেছে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে আপনাকে মনোনীত করা হয়নি। আপনি তাহলে কিভাবে সেখানে গেলেন?
প্রিয়া : ঐক্য পরিষদ আমাকে মনোনীত করেনি এ কথা সত্য এবং আমি যে এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করব সে কথাও ঐক্য পরিষদের কেউ জানতেন না। যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম (আইআরএফ)-এর পক্ষ থেকে ১৪ জুন আমার কাছে একটি মেইল পাঠানো হয়। তারা আমার সঙ্গে বেশ কয়েকবার মেইলে ও ফোনে যোগাযোগ করেছে। অনুষ্ঠানে অংশ নেবার সিদ্ধান্তটি নিতে কিছুটা দেরি হয়েছিল আমার। ১৪ জুলাই রাতে আমি অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার জন্য ঢাকা ত্যাগ করি। আমি তখনও জানি না এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ৪০ মিনিট আগেও আমি জানতাম না আমি হোয়াইট হাউসে যাব এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে, আমি তার সঙ্গে কথা বলব। আইআরএফ-এর যে অনুষ্ঠানে আমি অংশগ্রহণ করতে এসেছি সেখানে আমার একটি প্রেজেন্টেশন ছিল। আমি সেদিন প্রেজেন্টেশন দিয়েছি। ওই অনুষ্ঠানে ঐক্য পরিষদের মনোনীত তিনজন সদস্য নির্মল রোজারিও, এড. নির্মল চ্যাটার্জি ও অশোক বড়ুয়া উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া এড. এলিনা খানও সেখানে ছিলেন। আমার প্রেজেন্টেশন শেষ হবার পরপরই আয়োজকদের একজন আমাকে ডাকলেন। বললেন, আমরা হোয়াইট হাউসে যাব। আইআরএফ-এর এটলার্জের এম্বাসেডর স্যামুয়েল ডি ব্রাউনব্যাকের নেতৃত্বে আমরা সেখানে গেলাম। একটি রুমে আমাদের বসানো হলো। শুনলাম পাশের একটি রুমে প্রেসিডেন্ট আসবেন এবং তার সঙ্গে দেখা করব। প্রটোকল অনুযায়ী সব কাজ হলো। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অন্যদের কথা বলতে দেশে আমারও ইচ্ছা হয়েছিল তার সঙ্গে কথা বলার। ঘটনাটা এমন।
ভো. কা : আপনার বক্তব্যে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। আপনার বক্তব্য দেশে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আপনাকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলা হচ্ছে এবং আপনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা করার কথাও বলা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
প্রিয়া : আমি কোনো মিথ্যা কথা বলিনি। রাষ্ট্র কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করিনি। কিছু সংখ্যক মানুষ বিষয়টিকে ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দিতেই এসব কথা বলছে। এরা দুষ্ট লোক। এরা যে দলই ক্ষমতায় থাকে তাদের পরিচয় দেয়। বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ^াসী। বিভিন্ন সময় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার সময় মুসলিম ভাইয়েরা আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমার পরিবারের সদস্যদের হুমকির সম্মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। আমি সরকারের সেই কাজকে আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এই কথাগুলো বলেছি। আমি মনে করি, প্রকৃত সত্যটা জানার পর আমার সরকার আমাকে এবং আমার পরিবারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
ভো. কা : অনেকের ধারণা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস এবং গ্রিন কার্ড পাবার জন্য আপনি এমন কাজ করেছেন। কথাটা কতটা সত্য? দেশে ফিরবেন কি?
প্রিয়া : গ্রিন কার্ড পাবার জন্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করার প্রয়োজন হয় না। আমেরিকায় এর আগেও আমি বহুবার এসেছি। আর দেশে ফিরব না কেন? প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ও আমি বলেছি আমি দেশে থাকতে চাই। পিরোজপুরে আমার ভাইবোনদের তিনশ একরের মতো জমি আছে। সম্পত্তি দখলের জন্য আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়। আমাদের জমির ফসল আমরা ভোগ করতে পারি না। আমাদের জমিতে ইটের ভাটা তৈরি করা হয়েছে। ফসল কেটে নিয়ে যায় সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান শামীম। এত নির্যাতনের পরও আমি দেশে আছি। আমি কেন আমার পূর্ব পুরুষের ভিটা ছাড়ব? আমি আমার দেশে থাকব এটাই আমার প্রথম ও শেষ কথা। তবে আমার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে আমি উদ্বিঘ্ন। আমার ছবি ছাপাতে গিয়ে গণমাধ্যমে আমার পরিবারের সদস্যদের ছবিও দেখানো ও ছাপানো হয়েছে। এতে তাদের নিরাপত্তা বিপন্ন হয়েছে।
ভো. কা : কবে নাগাদ দেশে ফিরবেন?
প্রিয়া : এখনই বলতে পারছি না। তবে দেশে আমি ফিরবই।