বাংলাদেশকে হোয়াইটওয়াশ করার হুমকি দিল শ্রীলঙ্কা

আগের সংবাদ

সাম্প্রদায়িকতার আগুন নিয়ে খেলতে নেই

পরের সংবাদ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন ইস্যু

এক অন্তহীন হতাশার নাম মিয়ানমার

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ২২, ২০১৯ , ৭:২৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ২২, ২০১৯, ৭:২৫ অপরাহ্ণ

আহমেদ আমিনুল ইসলাম

অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

রোহিঙ্গা সংকটকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের শক্তিশালী কোনো রাষ্ট্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেনি। সবাই নিজ নিজ সাময়িক সুবিধাদির কথা ভেবে সংকটকে পাশ কাটিয়ে গেছেন, এড়িয়ে যাচ্ছেন এখনো। বিষয়টিকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পারস্পরিক সহযোগিতা ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির দাওয়াই দিয়েই তারা দায়িত্ব শেষ করেছেন।

ধর্মের নামে অত্যাচার, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এমন কয়েকটি দেশের প্রতিনিধির একটি দল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ওভাল অফিসে সাক্ষাৎ করতে যায়। ওই প্রতিনিধি দলে ছিলেন ইরাকে ইয়াজিদি নারীদের হয়ে আইএস জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করা নোবেল বিজয়ী নাদিয়া মুরাদ। প্রতিনিধি দলে আরো ছিলেন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরের এক রোহিঙ্গা মুসলিমও। ওই রোহিঙ্গা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোহিঙ্গা বিষয়ে তার অজ্ঞতার পরিচয় প্রকাশ করে ফেলেন। ওই রোহিঙ্গা ব্যক্তিটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানান, দুই বছর আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতনের কারণে নিজের দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর থেকে তিনি বাংলাদেশের একটি শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত আছেন। কিন্তু তারা নিজের দেশে ফিরে যেতে চান। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা জানতে চাইলে ট্রাম্প জিজ্ঞেস করেন- ‘রোহিঙ্গা, এটা আসলে কোথায়?’ পরে অবশ্য তাকে জানানো হয়, বাংলাদেশ মিয়ানমারের প্রতিবেশী একটি দেশ। এবং মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত হয়ে তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর নানাজনের নানা রকমের রসিকতা নজরে পড়ছে। যদিও ঘটনাটি সাধারণের মধ্যে কিছুটা রসের সঞ্চার ঘটিয়েছে তবু সেটি রাজনৈতিক বিশ্বে কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে সক্ষম কিনা তা বলা মুশকিল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতো বিশ্বনেতার বৈশ্বিক সংকট সম্পর্কে ধারণার এই চিত্র আমাদের কাছে অত্যন্ত করুণ বলে মনে হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের মতো একটি গুরুতর বৈশ্বিক সংকটকে একজন বিশ্বনেতা জানবেন না তা মেনে নেয়া সহজ নয়। আশার কথা নেতা না জানলেও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড এগিয়ে চলেছে মোটামুটি। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি তারও প্রমাণ বহন করছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সর্বশেষ ঘটনা হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বিখ্যাত উক্তি- ‘রোহিঙ্গা, এটা আসলে কোথায়?’ যদিও তার আগের দিন সংবাদ মাধ্যম থেকে আমরা জেনেছি যে, মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ চারজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সে দেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বক্তব্য, প্রায় দুই বছর আগে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো সহিংসতায় জড়িত থাকার গ্রহণযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রধান মিন অং হ্লাইং এবং অন্য তিন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে তারা। ২০১৭ সালের আগস্টের ঘটনায় মিয়ানমারের শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসনের এ উদ্যোগে কার্যত কী ফল প্রাপ্তি আছে তা ভেবে দেখা যেতে পারে। সাদা চোখে আমাদের সামনে যা দৃশ্যমান হয়েছে তা হলো ২০১১ সালে মিয়ানমারে রাজনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের পর থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত মিয়ানমার সরকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের হতাশার সবচেয়ে দৃষ্টান্তমূলক প্রতিফলন এটি।
রোহিঙ্গা নিধন ও নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া না দেখানোয় কেউ কেউ আবার অং সান সুকির প্রতি কোনো বাক্য উল্লেখ না থাকায় বিস্ময়ও প্রকাশ করেছেন। তবু শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে কতটুকু ভূমিকা রাখবে তা বলা না গেলেও বিষয়টি যে আলোচনার টেবিলে দীর্ঘ স্থায়িত্ব লাভ করবে তা বলা যায়। একটি সারকথা হলো- রোহিঙ্গা সংকটকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের শক্তিশালী কোনো রাষ্ট্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেনি। সবাই নিজ নিজ সাময়িক সুবিধাদির কথা ভেবে সংকটকে পাশ কাটিয়ে গেছেন, এড়িয়ে যাচ্ছেন এখনো। বিষয়টিকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পারস্পরিক সহযোগিতা ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির দাওয়াই দিয়েই তারা দায়িত্ব শেষ করেছেন।
কিন্তু এটি যে প্রচণ্ড সমস্যা হিসেবে মানবতাকে দলন করবে তা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তারা কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। আমরা শুধু বিভিন্ন ঘটনা কিংবা নানাবিধ ঘোষণায় মাঝে মধ্যে উৎসাহিত হই, আশান্বিত হই। কিন্তু সমস্যার স্থায়ী কোনো সমাধান দেখতে পাই না। তবু আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত নৃশংসতার তদন্ত কার্যক্রম শুরু হওয়ায় আমরা কিছুটা আশাবাদী হয়েছি। আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে শেষ পর্যন্ত যদি শূন্য হাতে বাংলাদেশকে ফিরতে না হয় সেজন্য কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মিয়ানমার-বাংলাদেশ যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে তার একটিও ফলপ্রসূ হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। সুতরাং এ বিষয়ে ভবিষ্যতে কূটকৌশলী হওয়ারও কোনো বিকল্প নেই। রোহিঙ্গা সংকটকে যারা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় সংকট হিসেবে ব্যাখ্যা করতে বা বুঝাতে চান তারা প্রকৃতপক্ষে সমস্যাটিকে জিইয়ে রাখার প্রতিই মনোযোগী বলে আমাদের মনে হয়।
সাম্প্রতিককালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের আমন্ত্রণে পাঁচ দিনের সরকারি এক সফর সম্পন্ন করেছেন। তার এই সফরে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ে বেশ কিছু চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পাশাপাশি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় এগারো লাখ রোহিঙ্গার স্বদেশে প্রত্যাবাসনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সবাই বাংলাদেশে বিদ্যমান ও ক্রমবর্ধমান রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আন্তরিক পরিবেশে আলাপ-আলোচনা করেছেন। মানবিকতা প্রদর্শনের জন্য তারা সবাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদও জ্ঞাপন করেছেন। আবার তারা এও বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়েই চীনের পরম বন্ধু- উভয় দেশের উন্নয়ন অংশীদার। সুতরাং দুদেশের স্বার্থ রক্ষার মধ্য দিয়ে চীন রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে কাজ করবে। চীনের পক্ষ থেকে সংকট সমাধানে এর চেয়ে শক্তিশালী এবং আরো কার্যকরী বক্তব্য আমরা আশা করেছিলাম। আমরা আশা করেছিলাম চীন কূটনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে হলেও বাংলাদেশের পক্ষে খোলামেলাভাবে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বক্তব্য প্রদান করবে, কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সংকট শুরুর সময় থেকেই আমরা শুনে আসছিলাম চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারকে একটি ‘সিগন্যাল’ দিলেই সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে চীনের প্রধানমন্ত্রী সংকট সমাধানে দুদেশের অর্থাৎ বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনার ওপরই জোর দিয়েছিলেন।
আমরা দেখেছি বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয় দেশের রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে বিভিন্ন সৌজন্য সাক্ষাৎসহ স্বাক্ষর করা হয়েছে একাধিক সমঝোতা-স্মারক ও চুক্তি। কিন্তু মিয়ানমারের পক্ষ থেকে সেসব চুক্তির অগ্রগতি আর চোখে পড়েনি বরং উসকানিমূলক নানা মন্তব্য পত্রপত্রিকা মারফতে আমরা জেনেছি। এতে উভয় দেশের মধ্যে আলোচনা নামক পদার্থটি দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতরই হয়েছে। বর্তমানে শুরু হতে যাওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়াকে মিয়ানমার কোনো না কোনো ছল-চাতুরি দিয়েই মোকাবেলা করবে। অতীতের নানা তিক্ত অভিজ্ঞতা মিয়ানমার আমাদের এভাবেই হতাশ করে! মিয়ানমার এক অন্তহীন হতাশার নাম; শুধু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কাছেই নয়- বিশ্বসভ্যতার কাছেও।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা