ত্রাণের জন্য হাহাকার

আগের সংবাদ

মিথ্যা অভিযোগ করিনি বাস্তবতাই তুলে ধরেছি

পরের সংবাদ

অধিভুক্ত সাত কলেজের সংকট নিয়ে ফের উত্তাপ

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ২২, ২০১৯ , ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ২২, ২০১৯, ১:০৫ অপরাহ্ণ

Avatar

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর অতিমাত্রার চাপ কমিয়ে শিক্ষার মান বাড়ানোর লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত করা সাত সরকারি কলেজের বহুমুখী সংকট গত দুই বছরেও দূর হয়নি। সেশনজট নিরসনে দ্রুত ফল প্রকাশ আর গণহারে অকৃতকার্যের অস্বাভাবিক ঘটনারও কোনো সুরাহা হয়নি। শিক্ষার্থীরা কয়েক মাস পরপরই রাজপথে নেমে বিভিন্ন দাবি তুললেও ঢাবি কর্তৃপক্ষ শুধু আশ্বাসই দিয়ে যাচ্ছে। সমস্যার দ্রুত সমাধান হচ্ছে না। এর মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে তিন বিষয়ে ফেল করা এক ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় ভিন্নমাত্রা যোগ হয়েছে আন্দোলনে। এসব ঘটনায় আন্দোলনকারী ও ঢাবি কর্তৃপক্ষের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, সাত কলেজের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষার মান উন্নয়নের ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। তাদের ধৈর্য ধরতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ২০১৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ, মিরপুর বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজের প্রায় দুই লাখ শিক্ষার্থীকে ঢাবির অধিভুক্ত করা হয়। এসব কলেজের অধ্যক্ষকে ঢাবি একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য হয়ে নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনার নির্দেশনা দেয়া হয়।
যে কারণে অধিভুক্তি : সরকারি কলেজগুলোর শিক্ষকদের বেশির ভাগই ব্যস্ত থাকেন প্রাইভেট বা কোচিং নিয়ে। তারা তেমনভাবে ক্লাসও নেন না। কোচিংমুখী এসব শিক্ষককে ক্লাসে ফেরানো, সনদের মান বাড়ানো ও সেশনজট কমাতেই প্রথম পর্যায়ে রাজধানীর ঐতিহ্যবাসী সাত কলেজকে ঢাবির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগের মতোই সাত কলেজ অধিভুক্তি করা হয়। তবে এ ব্যাপারে কর্মকাণ্ড শুরু হতে না হতেই বিভিন্ন দাবি তুলে আন্দোলন নামেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন : দ্রুত ফল প্রকাশ ও পরীক্ষার দাবিতে ২০১৭ সালের ২০ জুলাই শাহবাগে শিক্ষার্থীদের প্রথম দফায় আন্দোলনে পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের শেলে চোখ হারান তিতুমীর কলেজের ছাত্র সিদ্দিকুর। ওই ঘটনায় এক হাজার দুইশ ছাত্রের বিরুদ্ধে মামলা হয়। একই বছরের অক্টোবরে অনার্স চতুর্থ বর্ষের ফল প্রকাশের দাবিতে নীলক্ষেত মোড় অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। প্রশাসনের আশ্বাসে তা স্থগিত করা হলে নভেম্বরে ফল প্রকাশিত হয়। এর আড়াই মাস ২০১৪-২০১৫ শিক্ষাবর্ষের ফল প্রকাশ ও তৃতীয় বর্ষের ক্লাস শুরুর দাবিতে ফের আন্দোলন হয়। তবে উপাচার্যের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ফেরেন। তখনই প্রথমবারের মতো অধিভুক্তি বাতিল চেয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ে অবস্থান নেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা।
এর বছর খানেক পর গত ২৩ এপ্রিল গণহারে ফেলের বিরুদ্ধে ফের রাজপথে নামেন শিক্ষার্থীরা। তিন মাসে ত্রুটিমুক্ত ফল প্রকাশ, গণহারে অকৃতকার্যদের খাতা পুনর্মূল্যায়ন, স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ভবন, ঢাবি শিক্ষকদের ক্লাস নেয়া ও সেশনজট নিরসনে একাডেমিক ক্যালেন্ডারসহ ক্রাশ প্রোগ্রাম চালুর বিষয়ে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। ওই সময় ঢাবি উপাচার্য সব দাবি মেনে নিলে আন্দোলন স্থগিত হয়ে যায়।
তবে আশ্বাসের কয়েক মাস পরও পাঁচ দফা দাবি পূরণ না হওয়ায় গত ৮ জুলাই নতুন করে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। এদিনও আবার ঢাবি উপাচার্যের পুনঃআশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত করে শিক্ষার্থীরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ : তিতুমীর সরকারি কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রিয়াজ মাহমুদ, ঢাকা কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হাফিজ মৃধা, ইডেন মহিলা কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী ফৌজিয়া মিথিলা জানান, আমরা পড়ছি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে। আর পরীক্ষা দিচ্ছি ঢাবির শিক্ষকদের করা প্রশ্নপত্রে। ফলাফলে গণহারে ফেল। এটা অস্বাভাবিক। কেউই মানতে পারছে না। এ কারণেই বদরুন্নেসার ছাত্রী মিতু আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। তাছাড়া সেশনজট নিরসনেই তো আমরা অধিভুক্ত হয়েছি, কিন্তু গত আড়াই বছরে সে জট খোলেনি। বছর খানেক আগে আশ্বাস দেয়া আমাদের পাঁচ দফা দাবি এখনো পূরণ হয়নি। তবে এক্ষেত্রে অধিভুক্তি বাতিল হওয়াটা সমাধান নয়। বরং দ্রুত অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান হওয়া প্রয়োজন।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য : সাত কলেজের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সমন্বয়কারী আবু বকর বলেন, ঢাবি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমরা দ্রুততম সময়ে সমস্যার সমাধানের আশ্বাস পেয়েছি। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। আমাদের দাবিগুলোসহ বিদ্যমান সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। এদিকে, অধিভুক্তি বাতিলে ঢাবির আন্দোলনকারীদের মুখপাত্র শাকিল মিয়া জানান, সাত কলেজকে অধিভুক্তি করার পর থেকে ঢাবিতে সেশনজট বেড়েছে। কোনোভাবেই তাদের আমরা ঢাবির সঙ্গে দেখতে চাই না। এক দফা এক দাবিতে ইতোমধ্যে ঢাবিতে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছি।
মিতুর আত্মহত্যা : এক সঙ্গে তিনটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার ফলাফল পেয়ে ভেঙে পড়েছিলেন বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্রী মনিজা আক্তার মিতু। এক পর্যায়ে ১৬ জুলাই রাতে মুন্সীগঞ্জে আত্মহত্যা করেন তিনি। বান্ধবীদের মতে, গরিব পরিবারের মেধাবী মিতু টিউশনি করে খরচ চালাতো। তিন বিষয়ে ফেল করার ঘটনাটি সে মেনে নিতে পারেনি। ঘটনার প্রতিবাদে গত ১৯ ও ২০ জুলাই বিক্ষোভ করেছে তার সহপাঠী ও সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা বদরুন্নেসার শিক্ষকের মাধ্যমে মিতুর খাতা পুনর্মূল্যায়ন, সহপাঠীদের মিতুর খাতা প্রদর্শন, তার পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা প্রদানের জন্য ঢাবি প্রশাসনকে সাত দিনের আলটিমেটাম দিয়েছে।
সাত কলেজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর নেহাল আহমেদ বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যেই সব সমস্যার সমাধান হবে। নিয়মিত ঢাবি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা চলছে। শিক্ষার্থীদের কিছুটা ধৈর্য ধরতেই হবে। একই রকম বক্তব্য সরকারি তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষ আশরাফ হোসেনের। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা ফেল করলেই অভিযোগ নিয়ে আসে। সমস্যা সমাধানে কিছুটা সময় তো দিতেই হবে।
ঢাবি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : ঢাবির প্রক্টর ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেছেন, সাত কলেজের শিক্ষার্থীর শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্যই অধিভুক্ত করা হয়েছে। এসব শিক্ষার্থীর পরীক্ষাসহ অন্যান্য ব্যবস্থাপনার জন্য দ্রুত কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। সে জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন। তবে কারো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আন্দোলন করা যায় না। ঢাবির সহউপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ বলেছেন, বিষয়টা জাতীয়। তাই যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে ভাবনা-চিন্তার প্রয়োজন।