ওয়ালটনের পণ্য বিক্রি হবে অ্যামাজনে

আগের সংবাদ

কর্মক্ষেত্রে কাজপ্রিয় বস

পরের সংবাদ

মেঘ বরফের রাজ্য

আবিদ রহমান

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ২১, ২০১৯ , ৪:০২ অপরাহ্ণ

ইচ্ছেটা হঠাৎ করেই উদয় হলো। গত বছর ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে (১৫ আগস্ট) আমি আর আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু মেঘালয় গিয়েছিলাম। ভাবলাম এবার দার্জিলিং গেলে কেমন হয়? দার্জিলিংয়ে বসন্তকাল মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত। তাই ৫ এপ্রিল সস্ত্রীক ঢাকার কল্যাণপুর থেকে মানিক এক্সপ্রেসে (এসি) বুড়িমারীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম রাত ৯টায়। ভাড়া পড়ল জনপ্রতি ৯০০ টাকা। সকাল সাড়ে ৭টায় আমরা বুড়িমারী স্থলবন্দরে পৌঁছলাম। পৌঁছেই আমাদের পাসপোর্ট জমা দিয়ে দিলাম মানিক এক্সপ্রেসের কর্মচারীদের কাছে। তারা জনপ্রতি ২৫০ টাকা বিনিময়ে বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনের সব কাজ সম্পন্ন করে দেয়। এটা কীভাবে করে? এর ভেতরের গল্পটা আর নাইবা বললাম। আমরা সেখানে ফ্রেশ হয়ে হোটেলে নাশতা করলাম। সকাল ৯টায় ইমিগ্রেশন অফিস খোলার পর শুধু ছবি তোলার কাজটা লাইন ধরে সারতে হলো। ব্যস, বাংলাদেশ বর্ডারের কার্যক্রমের ইতি। এবার হেঁটে ভারতীয় ইমিগ্রেশনে ঢুকলাম। সেখানেও যথারীতি দালালের দৌরাত্ম্য। ইমিগ্রেশনের যাবতীয় কাজ জনপ্রতি ১০০ রুপিতে করে নিলাম। দুই বর্ডারের কার্যক্রম শেষ হলো। আমাদের প্রথম কাজ ছিল ঘড়ির সময় ৩০ মিনিট পেছানো। তাই করলাম। এবার যেতে হবে শিলিগুড়ি। রিজার্ভ ট্যাক্সিতে মোটামুটি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ রুপি, শেয়ারে গেলে জনপ্রতি ২৫০ রুপি আর ১০ সিটের জিপে জনপ্রতি ভাড়া পড়ে ১৫০ রুপি। আমাদের ট্যাক্সি শিলিগুড়ির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করল ১২টায়। পৌঁছাতে লাগবে মোটামুটি ৩ ঘণ্টার মতো। মাঝপথে আসতেই শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। দার্জিলিংয়ের ফ্লেভার শিলিগুড়িতেই পাওয়া গেল। এই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই আমরা শিলিগুড়ির দার্জিলিং জিপস্ট্যান্ডে পৌঁছলাম দুপুর ৩টার দিকে। আমাদের বড় একটা ব্যাকপ্যাক আর একটা লাগেজ আছে। দুটোই তুলে দিলাম জিপের ছাদে। বৃষ্টি থেকে মালামাল বাঁচাতে পলিথিন দিয়ে দেয়া হলো।

এবার জিপ ছুটতে শুরু করল দার্জিলিংয়ের উদ্দেশে। ভাড়া জনপ্রতি ২০০ রুপি। জিপ মিনিট চল্লিশ যাওয়ার পরই দূরে চোখে পড়ল সুউচ্চ পাহাড়। এই পাহাড়ের গাঁ বেয়েই আমাদের জিপ উপরে উঠতে শুরু করল। পাহাড়ি রাস্তা যথেষ্ট মসৃণ ও আঁকাবাঁকা। ভয়ের ব্যাপারটা ঘটল তখন, যখন দেখলাম বাঁপাশে কোনো রেলিং বা প্রাচীর নেই। প্রায় আধাঘণ্টা পর আবিষ্কার করলাম নিচের দিকে তাকালে ভয়ে গায়ে কাটা দিচ্ছে। আমাদের গাড়ি মোটামুটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৫০০ ফুট উপর দিয়ে পাহাড় বেয়ে উঠছে। শত শত বাঁক এই পাহাড়গুলোতে। গাড়ি উপরে উঠছে তো উঠছেই, ছুটছে তো ছুটছেই; যেন কোনো বিরাম নেই। ৩০ বা ৪০ মিনিট পরপর আমরা সমতল কোনো একটি শহরে পৌঁছে যাচ্ছি আর তখনই মনে হচ্ছে এটাই বুঝি আমার স্বপ্নের দার্জিলিং। আশা ভঙ্গ হয় তখনই, যখন সেই শহরগুলোকেও পিছু ফেলে আমাদের গাড়ি ছুটে যায় সামনের দিকে। যা হোক, যখন আমরা দার্জিলিংয়ে পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা হবে হবে অবস্থা। ক্ষুধায় পেট চো চো করছে। বৃষ্টি সেই যে পিছু নিল আর কিন্তু থামেনি এক দণ্ডের জন্যও। সুতরাং আমরা তাড়াতাড়ি আমাদের বাক্স-পেটরা নিয়ে ছাতার নিচে মাথা গুঁজে একটি মুসলিম হোটেল খুঁজতে বের হলাম। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, আপনারা বড় মসজিদের কাছে মুসলিম হোটেল পাবেন। তাই করলাম, ফলও হলো শুভ। চকবাজার থেকে হেঁটে প্রায় ৫-৬ মিনিটের পথ উপরে উঠতেই আমরা মসজিদটির সন্ধান পেলাম।

মসজিদের কাছেই দুটি মুসলিম হোটেল। একটি ছোট আর আরেকটি বড়। আমরা বড়টাতে ঢুকে পেটচুক্তি গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেলাম। হোটেলের নাম ইসলামিয়া রেস্টেুরেন্ট। গরুর মাংস ৬০ রুপি। যথেষ্ট সুস্বাদু কিন্তু অনেক ঝাল। মুসলিম হোটেলের পাশেই একটি আবাসিক হোটেল পেলাম। নাম হোটেল ক্রিস্টাল প্যালেস (লামা রোডে অবস্থিত)। সেখানে দিনপ্রতি ১ হাজার ৫০০ রুপিতে একটা রুম নিলাম। হোটেলে ডকুমেন্ট হিসেবে প্রত্যেকের পাসপোর্ট আর ভিসার ফটোকপি রাখল। সুন্দর ছিমছাম রুম। ইন্টারনেট, গিজার, টিভিসহ যাবতীয় সুযোগ সুবিধা আছে। দার্জিলিংয়ে রাত ৮টার পর সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। তাই ক্লান্ত শরীরে আর হোটেল থেকে বের হলাম না। লম্বা জার্নির পর লম্বা একটা ঘুম দেয়াটাই শ্রেয় মনে হলো। পরদিন সকাল ৭টায় ঘুম ভাঙল। জানালায় ভারি পর্দা ছিল। পর্দা সরাতেই মুখ দিয়ে একটি কথাই বেরিয়ে এলো আর তাহলো ‘অসাধারণ’। রোদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া। পাহাড়ের প্রতিটি ধাপে ধাপে বাড়ি আর হোটেল। ধাপগুলো শেষ হওয়ার পর প্রায় ৭ হাজার ফুট গভীর খাদ। পুরু ঘনত্বের সাদা সাদা মেঘগুলো ভাসছে খাদের উপর যত্রতত্রভাবে যা হোটেলের উচ্চতা থেকেও অনেকটা নিচে। মনে হচ্ছে হোটেল থেকে নেমে ৩০-৪০ মিনিট নিচে নামলেই মেঘ ছুঁতে পারব। এমন ভিউ কিন্তু সব হোটেল থেকে দেখা যায় না বা হোটেলের সব রুম থেকেও দেখা যায় না। আমি সৌভাগ্যবান ছিলাম, তাই প্রকৃতি আমাকে নিরাশ করেনি।
যাক, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আবার ইসলামিয়া রেস্টুরেন্টে নাশতা সারলাম পরোটা-ডিম আর চা দিয়ে।
এবার গন্তব্য চকবাজার মোড় ট্যাক্সিস্ট্যান্ড। দরদাম করে সাইট সিয়িংয়ের জন্য ট্যাক্সি নিলাম ১ হাজার ৫০০ রুপিতে। প্রথমে গেলাম ঘুম রেলস্টেশন ও ঘুম রেলওয়ে মিউজিয়াম। এই স্টেশন ইউনেস্কো ওয়ার্ড হেরিটেজের একটি অংশ, যা পৃথিবীর সবচেয়ে উচুঁ রেলস্টেশন (৭ হাজার ৭০৪ ফুট)। রেলস্টেশনের অদূরেই ঘুম মনেস্ট্রি। এটি একটি বৌদ্ধ মঠ। এটির জনপ্রিয় নাম হলো ইগা চেওলিং মঠ। এটি ঘুম শহরে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। মঠে মৈত্রেয় বুদ্ধের একটি ১৫ ফুট লম্বা মূর্তি আছে। ১৮৭৫ সালে লামা শেরাব গ্যাতসো এই মঠ স্থাপন করেন। ঘুম শহরের তিনটি মঠের মধ্যে এটি বৃহত্তর। সেখান থেকে গেলাম দালি মনেস্ট্রি বা Druk Thupten Sangag Choeling Monastery. খুবই সুন্দর।

 

তারপর সেখান থেকে সরাসরি পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুওলজিক্যাল পার্ক। পার্কের প্রবেশ পথেই অনেকগুলো দোকান সাজানো আছে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে থাকে দোকানিরা।
শীতের শাল, জ্যাকেট, ট্রেডিশনাল ছুড়ি, পেইন্টিংসহ নানা জিনিস এখান থেকে দরদাম করে কেনা যায়। পার্কের প্রবেশমূল্য সার্কভুক্ত দেশের জন্য জনপ্রতি ৬০ টাকা। এই পার্কের ভেতর প্রবেশ করলেই প্রথমে পড়বে চিড়িয়াখানা। অনেক ছোট একটা চিড়িয়াখানা কিন্তু সমৃদ্ধ। রয়েল বেঙ্গল টাইগার থেকে শুরু করে কালো বাঘ, চিতা বাঘ, স্নো লেপার্ড, হিমালয়ান উলফ, বিলুপ্তপ্রায় লাল পান্ডাসহ ম্যাকাও পাখিও রয়েছে এখানে। এর পাশেই রয়েছে জাদুঘর। সুন্দর ও ছিমছাম। চিড়িয়াখানা থেকে বের হলেই চোখে পড়বে হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট। এখানে নিয়মিত এডভেঞ্চার, বেসিক এবং উন্নত মাউন্টেনিয়ারিং কোর্সগুলো পরিচালনা করা হয়। জুওলজিক্যাল পার্ক থেকে বের হয়ে গেলাম রঞ্জিত ভ্যালি প্যাসেঞ্জার রোপওয়েতে (ক্যাবল কার)। সিঙ্গলা চা বাগানের প্রায় ৫০০ ফুট উপর দিয়ে ক্যাবল কারটি অপরপ্রান্ত সিঙ্গলা বাজারে পৌঁছতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে। অর্থাৎ আসা-যাওয়াসহ প্রায় ৪০ মিনিট। ক্যাবল কার থেকে নিচের সবুজ চা বাগান আর দূরের সুবিস্তীর্ণ পাহাড়ের রাশি আর মেঘমালার মনোরম দৃশ্য যে কাউকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। এর বিনিময়ে জনপ্রতি খরচ হবে মাত্র ২০০ রুপি। তবে এটিতে চড়তে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এই লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে বোরিং না হয়ে এখানকার মোমো আর পাপড়ি চাট খেয়ে নেয়া যায়। মোমো ৮ পিছ ৬০ রুপি আর পাপড়ি চাট প্লেটপ্রতি ৪০ রুপি। তারপরের গন্তব্য ছিল তেনজিং রক। এটা উল্লেখ করার মতো কিছু না। সেখান থেকে গেলাম ভারতের বিখ্যাত হ্যাপি ভ্যালি টি স্টেটে। সবগুলো স্পট দেখে বিকেল ৪:৩০ মিনিটে ড্রাইভার আমাদের চকবাজারের দার্জিলিং মলে নামিয়ে দিল। এই স্থানকেই দার্জিলিংয়ের হার্ট বলা হয়। প্রচুর পর্যটকের সমাগম হয় বিকেলটাতে। এখানে একটি ‘ওপেন এয়ার থিয়েটার’ রয়েছে। যে কেউ নাম এন্ট্রি করে স্টেজে গিয়ে নাচ, গান, আবৃত্তি বা অন্য যে কোনো পারফরমেন্স করতে পারে, তাও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। এই থিয়েটারের আয়োজক দার্জিলিং পুলিশ কর্তৃপক্ষ। ভালো একটি পদক্ষেপই বলা যায়। মলের কাছেই রয়েছে কম খরচে রেডিমেড পোশাকের মার্কেট। একটি হলো নিউ মহাকাল মার্কেট আর আরেকটি হলো মল মার্কেট। ঘণ্টা দুয়েক সেখানে ঘোরাঘুরি করে চলে গেলাম চকবাজারের কেএফসিতে। সেখানে বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর কোক দিয়ে রাতের হালকা ডিনার সেরে হোটেলে ফিরে এসে হোটেল মালিককে বললাম যে আমরা আগামীকাল টাইগার হিলে যাব, ব্যবস্থা করুন। তিনি একটি জিপ ড্রাইভারকে ফোন দিয়ে আমাদের কনফার্ম করলেন এবং বললেন ভোর সাড়ে ৪টায় হোটেলের সামনে থাকবেন। জিপ আপনাদের তুলে নিয়ে যাবে। এ জন্য দিতে হবে জনপ্রতি ২০০ রুপি। তাই করলাম। ভোরে হোটেলের সামনে থেকে জিপে উঠলাম। জিপে আমরা ১০ জন ছিলাম। অন্ধকারে হেডলাইট জ্বালিয়ে ছুটে চলল জিপ। টাইগার হিল দার্জিলিং শহর থেকে ১১ কি.মি. দূরে। শুধু আমাদের জিপ নয়, দেখলাম শত শত জিপ আর ট্যাক্সি ছুটছে টাইগার হিলের পথে। প্রায় ৪০ মিনিট পর আমরা টাইগার হিলের পাদদেশে। সেখান থেকে হাঁটা পথে লাগে ১০ মিনিট। সূর্যোদয়ের সময় নিচু উচ্চতায় সূর্যকে দেখতে পাওয়ার আগেই কাঞ্চনজঙ্ঘার শিখরগুলো আলোকিত হয়ে ওঠে। ইউটিউবে এই ভিডিও বহুবার দেখেছি আর রোমাঞ্চিত হয়েছি। কিন্তু আজ বিধিবাম। টাইগার থেকে মেঘ ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এদিকে সূর্যোদয় হয়েছে তাও প্রায় ১০ মিনিট। তাই আমরা দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে আবার জিপে চেপে বসলাম। জিপ আমাদের আরেকটা লোকেশন বাতাসিয়া লুপ-এ নিয়ে গেল। চমৎকার লোকেশন। বাতাসিয়ায় বিশাল চত্বর পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে। ফুলের বাগান। সবুজে ছাওয়া ঘাস। পাতাবাহার-লতাবাহার বাঁধানো পথ। চত্বরের মাঝখানে বিশাল উঁচু কালচে গোলাকার স্তম্ভ। ১৯৮৭ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহতদের স্মরণে তৈরি হয়েছে এটি। এই বাতাসিয়া পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু শেষ মাথা ছুঁয়ে ঘুরে এসেছে রেললাইন। ২ ফুট শর্ট গেজের রেললাইন। অনেকটা খেলনা রেললাইনের মতো। নাম যে এর টয় ট্রেন! যেহেতু এই লুপ লাইনটি গন্তব্যে পৌঁছার জন্য নয়, বিনোদন দেয়ার জন্য; আর তাই হয়তো এ রকম লুপ তৈরি করা হয়েছে। এই লুপের বিশেষত্ব হলো এটি একটি পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত। অনেকটা মালভ‚মির মতো। উপর থেকে নিচে ক্রমশ সুষম ঢালু। এখান থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। অবশ্যই আকাশ পরিষ্কার থাকা সাপেক্ষে। ভাগ্যবিধাতা এবার আমাদের প্রতি সদয় হলেন। আকাশ ক্রমশ পরিষ্কার হলো, মেঘ কেটে গেল আর বাতাসিয়া লুপ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্পষ্ট হয়ে উঠল। কাঞ্চনজঙ্ঘার উচ্চতা ৮,৫৮৬ মিটার বা ২৮,১৬৯ ফুট। নিজ চোখে না দেখলে এর সৌন্দর্য আর বিশালতা বর্ণনায় প্রকাশ করা সম্ভব না। বাতাসিয়া লুপ থেকে বাইনোকুলার দিয়েও দেখা যায় এই কাঞ্চনজঙ্ঘা। খরচ ৪০ রুপি। তবে খালি চোখে দেখার মজাই আলাদা। বাতাসিয়া লুপ থেকে আমরা সকাল ৮টা নাগাদ হোটেলে পৌঁছলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম হোটেল ছেড়ে দেব এখনই। উদ্দেশ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আরেক লীলাভ‚মি সিকিম যাব। তাই বাক্স-পেটরা নিয়ে সকাল ১০টায় হোটেল ছেড়ে দিলাম। যথারীতি ইসলামিয়া রেস্টুরেন্টে নাস্তা সেরে চকবাজার জিপস্ট্যান্ডে আসলাম। সেখান থেকে দার্জিলিং টু গ্যাংটকের শেয়ার জিপের টিকেট কাটলাম। ভাড়া জনপ্রতি ২৫০ রুপি। গ্যাংটক হলো সিকিমের রাজধানী। সিকিম ভারতের একমাত্র অর্গানিক রাজ্য। এখানে কৃষিজমিতে অজৈব কোনো সার ব্যবহার করা যায় না। আর এই নির্দেশ অমান্যে জেল-জরিমানারও বিধান রয়েছে। দুপুর ঠিক ১২টায় যাত্রা শুরু হলো আমাদের। দুপুর সাড়ে ৩টায় রাংপোতে আমরা জিপ থামিয়ে পাসপোর্ট, ভিসার ফটোকপি আর এককপি ছবি দিয়ে ফরেইন রেজিস্ট্রেশন অফিস থেকে রেস্ট্রিকটেড এরিয়া পারমিট (আরএপি) নিলাম। ভারতীয় নাগরিক ছাড়া সবাইকেই সিকিমে প্রবেশের সময় এই পারমিট নিতে হয়। বিকেল ৫টায় গ্যাংটকের জিপস্ট্যান্ডে পৌঁছলাম। জিপস্টান্ড থেকে রিজার্ভ ট্যাক্সিতে ১০০ রুপিতে গ্যাংটক মার্কেটে গেলাম। এটাই মূলত সিকিমের ট্যুরিস্ট হাব। আমরা এখানেই একটি হোটেলে রুম নিলাম। নাম হোটেল মেরিগোল্ড। ভাড়া দিনপ্রতি ১ হাজার ৫০০ রুপি। পাশেই সিকিম পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স। হোটেল থেকে মিনিট পাঁচেকের পথ হলো লাল বাজার। যা হোক, আমরা সেই ট্যুরিস্ট কোম্পানির লোকদের বললাম যে আগামীকাল সকালে আমরা পূর্ব সিকিমের সাঙ্গু লেকে যাব। তারা আমাদের দুজনের তিন কপি করে পাসপোর্ট আর ভিসার ফটোকপি আর ৩ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি নিল আর বলল, কাল সকাল ৮টায় এখানে উপস্থিত থাকবেন। আমরা সেই অনুযায়ী হোটেলে গিয়ে লম্বা একটা ঘুম দিলাম। পরদিন সকাল সাড়ে ৭টায় নাস্তা করে ট্যুরিস্ট কোম্পানিতে গেলাম। সাঙ্গু লেকের ভ্রমণ খরচ ধরা হয়েছি ৩,৫০০ রুপি, আমরা তা পেমেন্ট করলাম। কিছুক্ষণ পর টয়োটার একটা ১০ সিটের লাক্সারি মাইক্রোবাস এলো। এই জিপে কেবল আমরা দুজনই যাত্রী! ড্রাইভার একজন নেপালি। দার্জিলিং শহরের উচ্চতা প্রায় ৭ হাজার ফুট হলেও গ্যাংটকের যে পাহাড়গুলো বেয়ে এখন আমরা উঠছি সেগুলোর উচ্চতা প্রায় ১০ হাজার ফুট। আর আমাদের গন্তব্য সাঙ্গু লেকের উচ্চতা ভ‚পৃষ্ঠ থেকে ১২ হাজার ৩১৩ ফুট উঁচুতে। যথারীতি পাহাড়ের খোলা পাশটাতে এখানেও কোনো রেলিং নেই। এমন পরিস্থিতিতে ভয় না পাওয়াটাই অস্বাভাবিক। নিচের দিকে তাকালে গ্যাংটক শহরের ৫-৬ তলা বাড়িগুলোকে চিনির দানার মতো ছোট দেখা যায়। আর ঘন সাদা মেঘগুলো বর্তমান উচ্চতা থেকে কম করে হলেও ২০০ ফুট নিচে। সর্পিলাকার পথ ধরে যে পাহাড়গুলো বেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে উঠব সেই পাহাড়গুলোতে দেখলাম, ঘন কুয়াশা সেখানে। অর্থাৎ সেখানে অনেক ঠাণ্ডা। আমাদের জিপ আরো প্রায় মিনিট ১৫ পরে কয়েকটি দোকানের সামনে থামল। আমার দোকানে ঢুকে ডিম দিয়ে ম্যাগি নুডুলস খেলাম, সঙ্গে কফি। এই দোকানগুলোতে সাঙ্গু লেকে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গরম কাপড় ভাড়া দিয়ে থাকে। একটি হুডি জ্যাকেট, এক জোড়া গামবুট আর হ্যান্ড গ্লাবস ভাড়া পড়ল ২৫০ রুপি। এগুলো পরিধান করে আবার জিপে চেপে রওনা হলাম। বেশিক্ষণ লাগেনি। ২০ মিনিট পরই আমরা পৌঁছলাম আমাদের কাক্সিক্ষত সাঙ্গু লেকে। অসম্ভব সুন্দর একটি জায়গা। লেকের পানির প্রায় ৮০ ভাগই বরফ হয়ে আছে আর লেকটাকে চারদিক দিয়ে ঘিরে রেখেছে বরফের পাহাড়। এই লেকটা ভারত-চীন সীমানায় পড়েছে। এই পাহাড়গুলোর উপর দিয়ে চলাচল করছে রোপওয়ে। আমরা যেহেতু দার্জিলিংয়ে রোপওতে উঠেছি তাই এবার আর উঠলাম না। এখানে পৌঁছানোর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই তুষারপাত (স্নোফল) শুরু হলো। তার মানে হলো এখানে কিছুক্ষণ পরপরই স্নোফল হয়। সেকি দৃশ্য! বাস্তবে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। যেদিকে চোখ যায় শুধু বরফ আর বরফ। এই বরফ দিয়ে কেউ পেঙ্গুইন বানাচ্ছে, ঢালু জায়গা থেকে নিচের দিকে পিছল খাচ্ছে আবার কেউ-বা তার প্রিয়জনকে বরফ দিয়ে ঢিল ছুড়ছে। সত্যিই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। এখানে যে কেউ সামান্য অর্থের বিনিময়ে ইয়াকের পিঠে উঠে ঘুরতে পারেন। ধীরে ধীরে আমরা লেকের কাছে গেলাম। লেকটার সর্বোচ্চ গভীরতা ৪৯ ফুট বা ১৫ মিটার আর আয়তম ৬০.৫ একর। লেকের পানির বেশির ভাগ অংশ বরফ হয়ে যাওয়ায় লেকের ভেতর অনেকটা হেঁটে যাওয়া যায়। আমিও অনেকটা ভেতরে গেলাম, যদিও বরফের চাই বেশি পুরু না হলে ধসে যাওযার সম্ভাবনা প্রবল। কী আর করা। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষণ, সেটা তো থাকবেই। ঘণ্টাখানেক ঘোরাফেরা করার পর তুষারপাত সহ্যের বাইরে চলে গেল। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় শরীর তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারাতে শুরু করল। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। তাই তাড়াতাড়ি গাড়িতে ফিরে এলাম। ড্রাইভারকে বললাম, হোটেলে চল। আসার সময় যে গতিতে ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছিল এখন আর তা সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ রাস্তায় বরফের স্তর জমে পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছে। তাই আমাদের ফিরতে কিছুটা সময় বেশি লেগেছিল। হোটেলে ফিরে বুঝতে পারলাম, শীতে আমাদের শরীর অবশ হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি লেপের ভেতর ঢুকে একটা ঘুম দিলাম। ঘুম ভাঙল সন্ধ্যা ৭টার পর। প্রচণ্ড শীতের কারণে ডিনারের জন্য লাল বাজারে যেতে মন চাইছিল না। তাই আমাদের হোটেলের পাশেই একটি ডোমিনোজ পিজ্জার দোকানে গেলাম আর একটা পিজ্জা খেলাম ১৮৫ রুপি দিয়ে। হোটেল থেকে বেরিয়ে আবার রুমে ফিরে কম্বলের নিচে ঘুম। পরদিন সকালে হোটেল চেক আউট করে জিপস্ট্যান্ডে চলে আসলাম জনপ্রতি ২০ রুপি ভাড়া দিয়ে। এখানে এসে শুনলাম কোনো গাড়ি আজ শিলিগুড়ি যাবে না, কারণ আগামীকাল ১১ এপ্রিল সিকিমে লোকসভার ভোটগ্রহণ। অগত্যা একটা আউটের জিপে করে ২৫০ রুপির ভাড়া ৫০০ রুপি দিয়ে দুপুর ১টায় শিলিগুড়ির বাস ডিপোতে আসলাম। বাস ডিপোতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম ডিপো থেকে কোনো বাস আজ ছাড়বে না, কারণ একটাই। কাল নির্বাচন। এই উপলক্ষে পুলিশ গাড়ি রিকুইজিশন করছে। কী আর করা। অটোতে ১০০ রুপিতে হাওড়া ফিলিং স্টেশন বাসস্ট্যান্ডে এসে ১,২০০ রুপিতে একটি রিজার্ভ ট্যাক্সি নিয়ে ঠিক ৪টা ৪৫ মিনিটে চেংরাবান্ধা পৌঁছলাম। দুপাশের বর্ডারে আবারো প্রায় ৫০০ টাকা খরচ দিয়ে দেশের মাটিতে পা রাখলাম। অনেকের কাছে খরচটা একটু বেশি হলেও মনে রাখতে হবে এটা একটা ফ্যামেলি ট্যুর। আর এ ধরনের ট্যুরে বাজেট সব সময় নিজের আয়ত্তে থাকে না। তবে এক কথায় ভ্রমণটা ছিল দারুণ। বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকায় না গিয়ে তুষারপাত দেখাটা ছিল আসলেই মনে রাখার মতো।