একজন প্রিয়া সাহা এবং ‘ফান্ডামেন্টালিজমে’র লেভেলিং

আগের সংবাদ

কেরাণীগঞ্জে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত ১

পরের সংবাদ

বাস্তবতা যখন ১ বনাম ১৬

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ২১, ২০১৯ , ৯:০৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ২১, ২০১৯, ৯:০৫ অপরাহ্ণ

জোবাইদা নাসরীন

শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

নুসরাতের হত্যাকাণ্ডের পর আসামি পক্ষের আইনজীবী হিসেবে কেউ কাজ করবেন না বলে ঘোষণা এলেও বর্তমানে নুসরাতের মামলার আসামি পক্ষের আইনজীবী রয়েছেন ১৬ জন এবং রাষ্ট্রীয় পক্ষের আইনজীবী আছেন মাত্র একজন। এই পরিসংখ্যান থেকে আমরা বুঝতে পারি আসলে নৈতিক সমর্থন থেকে অর্থনৈতিক সমর্থন কতটা জোরালো। সামাজিক সত্তা হিসেবে মানুষের পরিচিতি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এ দেশে যখন কোনো ধরনের ধর্ষণ এবং যৌন হয়রানির ঘটনা মিডিয়াতে মনোযোগ পায় তখন আমরা সবাই মানবিকভাবে বিষয়গুলোর সঙ্গে একাত্মবোধ করি, তখন মনে হয় এরপর এ দেশে কোনো ধর্ষণ কিংবা যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটবে না। কিন্তু বাস্তবের চিত্র একেবারেই বিপরীত। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলে শিশু ধর্ষণ। কেন এই ধর্ষণ বাড়ছে? সব ধর্ষণ একই সমান মনোযোগ পায় না। আবার যেগুলো মিডিয়ার কারণে জনমনে আলোচনা ছড়াতে সক্ষম হয় সেগুলোর ভবিষ্যৎও এক সময় আড়ালে চলে যায়।
কোনোভাবেই এটি বন্ধ করা যাচ্ছে না। যৌন নিপীড়নের শিকার শুধু মেয়ে শিশুই নয়, ছেলে শিশুও রয়েছে। আর এ পরিস্থিতিতে শঙ্কিত সংশ্লিষ্ট সবাই। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী এ বছরের প্রথম ৬ মাসে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩৯৯ শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে। অথচ গত পুরো বছরে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল ৩৫৬টি। সংস্থাটির হিসাব মতে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পরে একজন ছেলে শিশুসহ ১৬ জন শিশু মারা গেছে ২০১৯-এর প্রথম ৬ মাসে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) তথ্যমতে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৪৯৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালে ৫৭১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। গত বছরের তুলনায় এ বছরের প্রথম ৬ মাসে দেশে শিশু ধর্ষণ বেড়েছে ৪১ শতাংশ হারে। এ বছরের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৯৬ শিশু। গত বছরের প্রথম ছয় মাসে এ সংখ্যা ছিল ৩৫১ জন। এপ্রিল এবং মে এ দুই মাসেই শিশু ধর্ষণ হয়েছে ২৪১ জন, যা মোট ধর্ষণের অর্ধেকেরও বেশি। এ বছরের প্রথম ৬ মাসে ধর্ষণ হওয়া ৪৯৬ শিশুর মধ্যে ৫৩ শিশুকে গণধর্ষণ এবং ২৭ প্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। এর মধ্যে ২৩ জন শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া ওই ছয় মাসে ৭৪টি শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৮০টির অধিক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। যা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। তবে এসবই প্রকাশিত তথ্য। ধারণা করা যায় যে, ধর্ষণের সংখ্যা আরো বেশি। কারণ এখনো ধর্ষণ মামলা করতে আসা পরিবারের সংখ্যা অনেক কম।
জনমনে প্রশ্ন, হঠাৎ কেন শিশু ধর্ষণ বেড়ে গেল? এর পেছনে কোন ধরনের সামাজিক মনস্তত্ত্ব কাজ করে? হতে পারে আগেও শিশু ধর্ষণ এ রকমই ছিল। এখন মিডিয়া অনেক সোচ্চার। অভিভাবকরাও অনেক সচেতন। রাখঢাকের দেয়াল ভেঙে জানান দিতে চান অপরাধীর পরিচয় এবং ন্যায় বিচার চান। তবে এ কথা স্বীকার করে নিতেই হবে যে, সামাজিক সম্পর্কগুলো এখন অনেক বেশি ভঙ্গুর। যাদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক হওয়ার কথা ছিল, তারাই হয়ে পড়ছে ধর্ষক কিংবা যৌন নিপীড়ক। অথচ এখন এই সম্পর্কগুলোকে নিয়ে মানুষ ভয়ে থাকছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, শিশুরা প্রথম যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে আত্মীয়দের দ্বারা। কেন এমন হচ্ছে? পারিবারিক এবং সামাজিক মূল্যবোধ ভেঙে তা কেবলই অর্থনির্ভর হয়ে পড়ছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সমর্থন কেবল অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যে কারণে নুসরাতের হত্যাকাণ্ডের পর আসামি পক্ষের আইনজীবী হিসেবে কেউ কাজ করবেন না বলে ঘোষণা এলেও বর্তমানে নুসরাতের মামলার আসামি পক্ষের আইনজীবী রয়েছেন ১৬ জন এবং রাষ্ট্রীয় পক্ষের আইনজীবী আছেন মাত্র একজন। এই পরিসংখ্যান থেকে আমরা বুঝতে পারি আসলে নৈতিক সমর্থন থেকে অর্থনৈতিক সমর্থন কতটা জোরালো। সামাজিক সত্তা হিসেবে মানুষের পরিচিতি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এর পাশাপাশি ধর্ষণের সংখ্যা বাড়ার কারণ দেশে বিরাজমান বিচারহীনতার সংস্কৃতি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বলা আছে, ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। কিন্তু এমন অনেক নজির আছে যে বছরের পর বছর ধরে মামলা চলছে। যে কারণে দেখা যাচ্ছে, ধর্ষণের মামলা চলাকালীন বিভিন্ন বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অনেক সময়ই জামিনে মুক্তি পাওয়া আসামিদের নানা ধরনের হুমকি-ধমকির ধকল। এসব কারণে আইনের আশ্রয় নিতে অনেকেরই অনীহা তৈরি হয়। এর বাইরে দীর্ঘদিন মামলা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্যও অনেক পরিবারের থাকে না। তাই তাদের দৌড় থানা পর্যন্ত পৌঁছায় না। থানায় গেলেও সব ধর্ষণ একইভাবে গুরুত্ব পায় না।
বিচার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার বিপরীতে যাচ্ছে যে, ধর্ষণের শিকার নারীর পরিবারের সদস্যদের সরকারের পক্ষ থেকে চাকরি দেয়ার বিষয়টিতে হয়তো প্রধানমন্ত্রীর মহানুভবতার প্রকাশ পায়, কিন্তু অন্যদিকে বিচারের জায়গাটির শক্ত অবস্থানকে নাজুক করে ফেলে এবং ধর্ষণ বন্ধের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখে না। তাই এর বদলে বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুত করার নির্দেশ ধর্ষণ বন্ধ করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
বর্তমানে ধর্ষণ এবং যৌন হয়রানির বিষয়ে সব মিডিয়া খুব ভালো ভূমিকা পালন করছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে না নিয়ে ‘ঘটনা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। যার কারণে ধর্ষণের মতো অপরাধ লঘু হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া যখন আমরা শুধু ‘ঘটনা’ হিসেবে হাজির করি তখন যৌন সহিংসতার শিকার নারী এবং পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতটিকে জায়গা দিতে চাই না। কারণ আমরা জোর দিই ‘সেদিনের ঘটনা’র ওপর। দেখা গেছে, যখন ধর্ষণের শিকার একজন শিশুকে কোর্টে আনা হয় তখন সে ধর্ষণকারীকে দেখে মানসিকভাবে ভীত এবং আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ অজ্ঞান হয়ে পড়ে, যা তার মননে আরো বেশি ক্ষত তৈরি করে। সে কারণে ধর্ষণ কীভাবে একজন মানুষের সারা জীবনে প্রভাব ফেলে সেই বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হবে সবার আগে। কারণ ধর্ষণকেন্দ্রিক ট্রমার কারণে একজন মানুষ সারাজীবন ধরেই বিপর্যস্ত থাকে বা থাকতে পারে।
ধর্ষণ এবং যৌন হয়রানি রোধে পরিবার এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে আমরা কী কী করছি তা একটু বিশ্লেষণ প্রয়োজন। পরিবার থেকে মেয়েটিকে বারবার যৌন হয়রানি সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছি, সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য বলছি, নিপীড়ন সম্পর্কে তাকে নানা রকম তথ্য দিচ্ছি, যার ফলে একজন মেয়ে ভয় এবং আতঙ্কের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। এর পাশাপাশি আমরা ছেলেকে এই ধরনের কোনো শিক্ষার মধ্যে আনছি না। পাঠপুস্তকেও আমরা এই বিষয়গুলোকে হাজির করছি নারীর সতর্কতা হিসেবে এবং নারী কীভাবে এই অপরাধগুলোকে মোকাবেলা করবে সেই বিষয়ে টিপস দেয়া হয়েছে। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক আচরণ কিংবা সহিংসতা সংক্রান্ত আচরণ বিষয়ে কোনো আলোচনা করা হয়নি।
ধর্ষণের কেসগুলোকে সামনে হাজির করার পাশপাশি ধর্ষণ অপরাধের শাস্তি বারবার মিডিয়াতে প্রচার করা প্রয়োজন এবং জনসচেতনতার জন্য বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড জারি রাখা প্রয়োজন আরো বেশি। সেই সঙ্গে প্রয়োজন সমাজে আস্থার সম্পর্কগুলো ফিরিয়ে আনা। নারী যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন বেশি এজন্য নারীকেই সেটি রোখার প্রস্তুতিমূলক শিক্ষা প্রদান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। পুরুষকে লড়তে হবে পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে।
যৌন সহিংসতা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এটিকে ‘নারীর বিষয়’ হিসেবে পাঠ করার বিপরীতে কীভাবে সম্মিলিত উদ্যোগে প্রতিরোধ করা যায় সেই বিষয়ে আমাদের মনোযোগ তৈরি করতে হবে। আইন এবং বিচার ব্যবস্থার ভূমিকা ধর্ষণের ক্ষেত্রে আরো কঠোর এবং দ্রুত হওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে আসামিদের জামিন ধর্ষণের শিকার নারী এবং তার পরিবারকে আরো বিপর্যস্ত করে তোলে। তাই এ ক্ষেত্রে আসামির জামিনের ক্ষেত্রেও সার্বিক বিষয় বিবেচনায় আনা গুরুত্বপূর্ণ।

জোবাইদা নাসরীন : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা