জঙ্গিবাদ নির্মূলে সংস্কৃতির বিকাশে এগিয়ে আসতে হবে: রাষ্ট্রপতি

আগের সংবাদ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন চুক্তির বাস্তবায়ন চায় চীন: রাষ্ট্রদূত জ্যু

পরের সংবাদ

তাহলে উপায় কী ?

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ১৮, ২০১৯ , ৯:৫০ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ১৯, ২০১৯, ২:১৪ অপরাহ্ণ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পাকিস্তানের প্রেতাত্মা এখনো আমাদের পিছু ছাড়েনি, এমন কথা যারা বলেন তারা মোটেই মিথ্যা কথা বলেন না। কিন্তু তাদের অধিকাংশই প্রেতাত্মাটাকে চিহ্নিত করেন না। প্রেতাত্মাটা অন্যকিছু নয়, প্রেতাত্মাটা পুঁজিবাদ। আর প্রেতাত্মাই বলি কী করে, সে তো ভীষণভাবে জীবন্ত। সে তো ব্যস্ত জীবিতদের জীবন কেড়ে নেয়ার কাজে। না মেনে উপায় নেই যে, আমাদের জাতীয়তাবাদীরা সবাই পুঁজিবাদী- পাকিস্তানিদের সঙ্গে তাদের নামে মস্ত পার্থক্য, চরিত্রে মৌলিক পার্থক্য নেই।

একাত্তর সালটা বাংলাদেশে মেয়েদের জন্য ছিল চরম দুর্দশার। পাকিস্তানি হানাদাররা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মেয়েদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। রাষ্ট্র তাদের লেলিয়ে দিয়েছিল। ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছিল যা ইচ্ছা তাই করার। তারা সেটা করেছেও। রাষ্ট্রীয় সমর্থনে ক্ষমতাবান হয়ে হত্যা, অস্থাবর সম্পত্তি লুণ্ঠন এবং ধর্ষণ সমানে চালিয়েছে। এখন তো পাকিস্তান নেই, এখন তো আমরা স্বাধীন, বাঙালিই শাসন করছে বাঙালিকে। তাহলে এখন কেন মেয়েরা এভাবে নির্যাতিত হচ্ছে? পাচার হচ্ছে ভারতে, জীবিকার অন্বেষণে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে লাঞ্ছিত হচ্ছে, ধর্ষিত হচ্ছে যেখানে-সেখানে, আত্মহত্যা করছে যখন-তখন, আটকা পড়ছে বাল্যবিয়ের ফাঁদে? কারণটি আমাদের অজানা নয়। কারণ হচ্ছে পাকিস্তান বিদায় হয়েছে ঠিকই কিন্তু ওই রাষ্ট্রের আদর্শ বিদায় হয়নি। আদর্শটা ছিল পুঁজিবাদী। সে আদর্শের এখন জয়জয়কার। আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। দুর্বল লাঞ্ছিত হচ্ছে, হতে থাকবে, কেননা আমরা উন্নতি করতেই থাকব এবং অত্যন্ত অল্প কিছু মানুষের উন্নতি কাল হয়ে দাঁড়াবে বাদবাকিদের জন্য। এটাই ঘটছে।
পাকিস্তানের প্রেতাত্মা এখনো আমাদের পিছু ছাড়েনি, এমন কথা যারা বলেন তারা মোটেই মিথ্যা কথা বলেন না। কিন্তু তাদের অধিকাংশই প্রেতাত্মাটাকে চিহ্নিত করেন না। প্রেতাত্মাটা অন্যকিছু নয়, প্রেতাত্মাটা পুঁজিবাদ। আর প্রেতাত্মাই বলি কী করে, সে তো ভীষণভাবে জীবন্ত। সে তো ব্যস্ত জীবিতদের জীবন কেড়ে নেয়ার কাজে। ধর্মকে সে ব্যবহার করে উপায় ও আচ্ছাদন হিসেবে। না মেনে উপায় নেই যে, আমাদের জাতীয়তাবাদীরা সবাই পুঁজিবাদী- পাকিস্তানিদের সঙ্গে তাদের নামে মস্ত পার্থক্য, চরিত্রে মৌলিক পার্থক্য নেই।
ধর্ষণ এখন সর্বত্র চলছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পথঘাট, পার্ক, বস্তি, বসতবাড়ি, কারখানা, মাদ্রাসা- মেয়েরা কোথাও নিরাপদে নেই। আমরা অতিসম্প্রতি খবরগুলো লক্ষ করছিলাম। মে মাসের ৪ তারিখে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। কাগজে ছাপা হয়েছে সে খবর। ৬ মের পত্রিকার খবর- ঢাকার জুরাইনের আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে এক তরুণীকে আটকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। পুলিশ সাতজনের একজনকেও ধরতে পারেনি। ৮ তারিখের খবর- ময়মনসিংহের গৌরীপুরে ইউপি মেম্বারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ধর্ষণের এবং গর্ভপাত ঘটানোর। ২২ মের খবর- চট্টগ্রামে বাসায় ঢুকে ১২ জন বখাটে মিলে ২ পোশাক কর্মীর ওপর গণধর্ষণ চালিয়েছে। এমনকি মাদ্রাসার শিক্ষকও কিশোরী ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে। মসজিদের ভেতরেই। ৩১ মে একটি দৈনিক প্রথম পৃষ্ঠায় জানাচ্ছে যে, কুমিল্লা শহরে হত্যার বদলা নিতে স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। ভেতরের পৃষ্ঠাতে আছে ধামরাইতে নারী ও রাজবাড়ীতে ছাত্রীকে অপহরণের পর ধর্ষণ এবং মৌলভীবাজারের কলেজ ছাত্রীকে গণধর্ষণ ও হত্যার বিরুদ্ধে স্বজনদের মানববন্ধনের খবর। হেডমাস্টারের ভয়ে ছাত্রীরা স্কুলে যাওয়া ছেড়েছে এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে। মে মাসের খবর দিয়ে শেষ করতে না করতেই ১ জুনের খবর এসে গেছে। একই পত্রিকায় দুটি খবর।
ভালুকায় ৬ বছরের শিশু ধর্ষণের পরে হত্যা এবং ঢাকায় বিদেশে পাঠানোর কথা বলে হোটেলে ডেকে এনে ধর্ষণ। ওই দিনই আরেকটি দৈনিকের ঢাকার এক সংবাদ সম্মেলনের খবর আছে। শিরোনাম- ‘গণধর্ষণের বিচার চাইলেন মুক্তিযোদ্ধা কন্যা’। ভেতরে বলা হচ্ছে সংবাদ সম্মেলনে মেয়েটির বাবা ক্রন্দনরত মেয়েটির পাশেই বসে ছিলেন। পিতার আক্ষেপোক্তি, ‘আমি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। আজ দেশ আমাকে এই মহৎ পুরস্কার দিল।’ অভিযোগ, ৮ দুর্বৃত্ত একত্রে কাজটি করেছে। তাদের একজনও ধরা পড়েনি। উপরন্তু নির্যাতিত পরিবারটিই এখন গৃহহারা।
তাহলে উপায় কী? প্রতিবাদ? অবশ্যই। প্রতিবাদটা চলছে। বাল্যবিয়েতে অসম্মত মেয়েরা কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করছে, এমন খবর পাওয়া যাচ্ছে। কিশোরী মেয়েরা বিয়ের আসর থেকে সহপাঠিনীকে উদ্ধার করছে, আমরা জানতে পাচ্ছি। মে মাসের খবরের কাগজেই বের হয়েছে এমন খবর যে মাগুরাতে এক মা তার মেয়েকে উত্ত্যক্তকারী যুবককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছেন। কিন্তু তাতে তো ব্যবস্থাটা বদলায় না।
তাহলে কি পালাতে হবে? কিন্তু পালাবেন কোথায়? একাত্তরে বাংলাদেশ থেকে মানুষকে পালাতে হয়েছিল, ফিরে এসে তারা দেখেছে এ কী পাকিস্তান তো রয়েই গেছে! বদলটা শুধু নামেই। মানুষ এখনো পালাচ্ছে। ধনীরা ইতোমধ্যে বিদেশে বাড়িঘর তৈরি করেছেন, সময়মতো চলে যাবেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দলীয় সংঘর্ষ থামানোর লক্ষ্যে দলীয় লোকদের সতর্ক করে দিয়েছেন যে দল যদি ক্ষমতায় না থাকে তাহলে টাকাপয়সা নিয়ে পালানোর পথ পাওয়া যাবে না। এই সতর্কবাণীর দরকার ছিল কি? যারা পেরেছে তারা তো ইতোমধ্যেই ব্যবস্থা করেছে, অন্যরাও তৎপর আছে। আর যাদের টাকাপয়সার অভাব, দলের লোক নয়, সাধারণ মানুষ, তাদেরও একটা অংশ কিন্তু পালাচ্ছে। রিপোর্টে বলছে নৌপথে ইউরোপে যারা পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করে তাদের মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশিরা এখন শীর্ষ স্থানে। হতভাগা এই মানুষরা অবশ্য টাকা পাচারের জন্য যায় না, টাকা উপার্জনের জন্যই যায়। কিন্তু যাচ্ছে তো। জীবন বাজি রেখে যাচ্ছে। ঝাঁপ দিচ্ছে সমুদ্রে। যুদ্ধে বিধ্বস্ত সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ইরিত্রিয়া থেকে মানুষ পালাবে সেটা স্বাভাবিক, কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী এবং উন্নতিতে পুলকিত বাংলাদেশ থেকে অত মানুষ পালাচ্ছে কেন? পালাচ্ছে এখানে জীবিকার নিরাপত্তা নেই বলে এবং মেয়েদের দুরবস্থা বলছে এখানে নিরাপত্তা নেই জীবনেরও।
সিদ্ধান্তটা তো তাই অপরিহার্য। করণীয় হচ্ছে পুঁজিবাদকে বিদায় করা। কিন্তু সে কাজ তো একা কেউ করতে পারবে না, করতে গেলে কেবল হতাশাই নয়, বিপদ বাড়বে। বিদায় করার জন্য দরকার হবে আন্দোলন এবং আন্দোলনের জন্য চাই রাজনৈতিক দল। শুধু দলেও কুলাবে না, শত্রুকে যদি সঠিকভাবে চিহ্নিত করা না হয় এবং সঠিক রণনীতি ও রণকৌশল গ্রহণ করা না যায়। বাংলাদেশে এবং বিশ্বের অনেক দেশেই জাতীয়তাবাদী যুদ্ধটা শেষ হয়েছে, বাকি রয়েছে সমাজতন্ত্রের জনযুদ্ধ।
এই যুদ্ধটা যে সহজ হবে না সেটা তো স্পষ্ট। জবরদস্ত পুঁজিবাদের দখলে অনেক অস্ত্র রয়েছে; খুবই শক্তিশালী একটি অস্ত্র হচ্ছে মিডিয়া। মিডিয়া পুঁজিবাদের নৃশংসতার খবর ছিটেফোঁটা দেয়, কিন্তু আসল খবর দেয় না; ঢেকে রাখে, বিভ্রান্ত করে এবং নানা কিসিমের রূপকথা তৈরির কারখানা চালু রাখে।
মিডিয়া রূপকথাকে খুব পছন্দ করে, কিন্তু রূপকথা তো নারকীয় বাস্তবতাকে অবলুপ্ত করতে পারবে না, যার একটি খবর ওই দিনের পত্রিকাতেই আছে এবং প্রথম পাতাতেই। সেটি হলো তিন শিশুসহ এক মায়ের লাশ উদ্ধার। এই রাজধানীতেই। ধারণা করা হচ্ছে মা নিজেই খুন করেছে নিজের সন্তানদের, একের পর এক; তারপরে খুন করেছে সে নিজেকে। মৃত মায়ের ভাই অবশ্য বলছে অসম্ভব, তার বোন এ কাণ্ড করতে পারে না, অন্যরাই ঘটিয়েছে; এটি একটি হত্যাকাণ্ড। যেভাবেই ঘটুক, হত্যা তো বটেই। এবং তিনটি সন্তান নিয়ে মা যে চরম হতাশায় ভুগছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সন্তানদের স্কুলের বেতন দিতে পারে না, তাদের এমনকি ভালোমতো আহারও জোটে না; পারিবারিক বিরোধ আছে সম্পত্তি নিয়ে। কোথাও কোনো আলো ছিল না আশার। আর সব বোঝা গিয়ে চেপে বসেছিল বিপন্ন মেয়েটির ঘাড়ের ওপর। মেধাবী ছাত্রী ছিল সে; এমএ পাস করেছে, চাকরি খুঁজেছে, পায়নি। স্বামীর তবু বাইরে একটা জীবন ছিল, স্ত্রীর জীবন তিন কামরার। জীবন তার জন্য দুঃসহ এক যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
উন্নতির রূপকথার খবর চিৎকার করে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা এখন এমনই বিকট যে তাকে ঢেকে রাখার উপায় নেই। ওই দিনের পত্রিকাতে বাংলাদেশের মানুষের নরকবাসের আরো খবর আছে। ১. সাতক্ষীরায় দ্বিতীয় মেয়ে হওয়ায় বাবার হাতে নবজাতক খুন। ২. বরগুনায় যৌতুক না পেয়ে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যা। ৩. রৌমারিতে ক্লাসরুমে ঢুকে ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা। ৪. আড়াইহাজারে বিয়ের কথা বলে ছাত্রীকে ধর্ষণ। ৫. গাজীপুরে তিন সন্তানসহ নিখোঁজ প্রবাসীর স্ত্রী। ৬. ঢাকায় মেয়ে হত্যার বিচার চেয়ে মায়ের সংবাদ সম্মেলন। পরের দিনের অর্থাৎ ১১ জুনের খবর- ১. রাজধানীতে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে দুজন গ্রেপ্তার। ২. শায়েস্তাগঞ্জে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে বিধবাকে পিটিয়ে হত্যা। ৩. কালিয়াকৈরে স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে গণধর্ষণ। ৪. হবিগঞ্জে প্রকাশ্য সড়কে ধর্ষণের পর পিটিয়ে হত্যা। প্রতিটি ঘটনাই ভয়াবহ। ‘উন্নতি’ অব্যাহত রয়েছে। এই উন্নতির অন্তর্গত কান্না বলছে ব্যবস্থার বদল চাই। হতাশা কাটবে না পরিবর্তনের আন্দোলন যদি জোরদার না হয়।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা