সামাজিক অবক্ষয় এবং নৈতিক শিক্ষা

আগের সংবাদ

মোকাবেলায় যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে

পরের সংবাদ

এরশাদের পরে জাতীয় পার্টি

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ১২, ২০১৯ , ৮:০৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ১২, ২০১৯, ৮:০৩ অপরাহ্ণ

বিভুরঞ্জন সরকার

যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টির একাংশ আওয়ামী লীগের আশীর্বাদ পাওয়ার চেষ্টা করবে। আবার আরেক অংশ বিএনপির দিকেও ঝুঁকতে পারে। এক পর্যায়ে গিয়ে কেউ আওয়ামী লীগে এবং কেউ বিএনপিতেও আশ্রয় চাইতে পারেন। কোন দিকের পাল্লা ভারী হবে, সেটা স্পষ্ট হতে একটু সময় লাগবে। যাই হোক না কেন, জাতীয় পার্টির অবস্থান দুর্বল হবে। এখন ক্ষমতার রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষায় জাতীয় পার্টির দরকষাকষির যে সুয়োগ আছে, তা আর থাকবে না।

নাম ছিল মোহাম্মদ এরশাদ হোসেন। বদলে হয়েছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সেনা কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রপতি। রাজনীতিবিদ। ক্ষমতা জবরদখলকারী। স্বৈরাচার। প্রেমিক। কবি। গণআন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়েও নির্বাচনে পাঁচ আসনে বিজয়ী। এরশাদের বহুরূপ। তাকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। তিনি নিজেও আলোচনায় থাকতে পছন্দ করেন। তাই তিনি একেক সময় একেক কথা বলেন। সকালে যা বলেন, বিকেলে বলেন তার উল্টোটা। লোকনিন্দা তিনি গায়ে মাখেন না। তার যারা নিন্দা-সমালোচনা করেন, তারাও তাকে উপেক্ষা করতে পারেন না।

এরশাদ এখন গুরুতর অসুস্থ। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। তার অবস্থা নিয়ে গুজবের শেষ নেই। মৃত্যুর গুজব রটছে, রটনাকীরা বলছে, আসলে তিনি বেঁচে নেই। আর তার ভাই বলছেন তিনি বেঁচে আছেন, ডাকলে চোখ মেলে সাড়াও দিচ্ছেন। তবে যে যাই বলুক না কেন, এরশাদের সময় যে শেষ হয়ে আসছে তাতে আর কোনো সন্দেহ নেই। তার বয়স হয়েছে। গড় আয়ুর চেয়েও তিনি বহু বছর বেশি বেঁচে আছেন। এখন তার বিদায় সময়ের ব্যাপার মাত্র। এরশাদ নিজেও কিছুদিন ধরেই মৃত্যু-প্রস্তুতিই গ্রহণ করছেন বলে মনে হয়। তিনি তার সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা করেছেন। এমনকি তার অবর্তমানে তার গড়া রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবেও ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে মনোনীত করেছেন। শোনা যাচ্ছে সম্পত্তি এবং দলের ভাগ নিয়ে এরশাদের আপনজনদের মধ্যে ক্ষোভ-অসন্তোষ আছে। তাই তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে।

এরশাদ যদি চিকিৎসকদের চেষ্টা এবং সমর্থকদের দোয়ায় আরো কিছুদিন বেঁচেও থাকেন তাহলেও তার পক্ষে আর জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। সে জন্যই রাজনৈতিক মহলে এই প্রশ্ন এসেছে, এরশাদের পর জাতীয় পার্টির অবস্থা কি হবে? জাতীয় পার্টি এখন যেমন দেশের ক্ষমতার রাজনীতির একটি ভরকেন্দ্র হিসেবে আছে, সেটা কি এরশাদ-পরবর্তী সময়ে অব্যাহত থাকবে? নাকি জাতীয় পার্টি ধীরে ধীরে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে, আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে বিলীন হয়ে যাবে? রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী এরশাদের পরে জাতীয় পার্টি টেকার কথা নয়।

অবশ্য আমাদের দেশে রাজনীতিতে সব হয়। জিয়ার পর বিএনপি থাকবে না বলা হলেও বিএনপি আছে এবং প্রবলভাবেই আছে। কিন্তু জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে সেরকম না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ জাতীয় পার্টি এরশাদের দল, এরশাদের রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণের জন্যই এই দলের জন্ম হয়েছিল। এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরই জাতীয় পার্টি ‘নাই’ হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি, এটি একটি বিস্ময়। এরশাদ যে ক্ষমতা ছাড়ার পর এতদিন রাজনীতিতে টিকে আছেন, এটা যতটা না তার ক্যারিশমা, তারচেয়ে বেশি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির তাকে নিয়ে টানাটানির ফল বলেই অনেকে মনে করেন। এরশাদকে ক্ষমতা থেকে হঠানোর আন্দোলন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি যৌথভাবেই করেছে। কিন্তু তারপর এরশাদকে আবার রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা পালন করছে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। এরশাদ এবং তার দল নির্বাচনে আসন পেতে পারে, এটা অনেকের ধারণার মধ্যেই ছিল না। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে পতিত স্বৈরাচারের দল জাতীয় পার্টি মানুষের ভোটে দেশের তৃতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এরশাদ নিজে পাঁচ আসন থেকে নির্বাচিত হন কারাগারে থেকেও। রাজনৈতিক প-িত-জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হয়। এরশাদ অনেকের কাছে অজনপ্রিয় হলেও কারো কারো কাছে ঠিকই জনপ্রিয় থাকেন এবং তার দলটিও বিলীন হয়ে যায় না।

এরশাদকে কাছে পাওয়ার চেষ্টা বিএনপি করেছে। তারেক রহমান এরশাদের সঙ্গে দেখা করে পক্ষে টানার চেষ্টা করেছেন। এরশাদ বিএনপির দিকে ঝুঁকেওছিলেন। তারপর রাজনীতির হিসাব-নিকাশে তিনি বুঝতে পারেন যে, বিএনপি নয়, আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকাই তার জন্য সুবিধা ও লাভজনক। তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোটে থেকে জাতীয় পার্টি একই সঙ্গে সরকারের অংশীদার হয়েছে আবার বিরোধী দলের ভূমিকায়ও আছে। তিনি সরকারে না থাকার ঘোষণা একাধিকবার দিয়েও কথা রাখতে পারেননি। সরকারের গত মেয়াদে জাতীয় পার্টির যারা মন্ত্রী ছিলেন তারা পদত্যাগে সম্মত হননি।

তবে একাদশ সংসদ নির্বানের পর পরিস্থিতি ভিন্ন হয়। একসঙ্গে নির্বাচন করলেও এবার আর জাতীয় পার্টি থেকে কাউকে মন্ত্রী করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরশাদকে বিরোধী দলে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। জাতীয় পার্টি এখন সংসদে প্রধান বিরোধী দল আর এরশাদ বিরোধী দলের নেতা। তবে দলের মধ্যে এ নিয়ে মতবিরোধ, অসস্তোষ আছে। কেউ কেউ সরকারেও থাকতে চান। সংসদে জাতীয় পার্টি এখনো সরকারের পক্ষেই আছে। এরশাদের অবর্তমানে দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ আরো চাঙ্গা হবে, প্রবল হবে। দলের এবং সংসদের নেতৃত্ব নিয়ে সমস্যা দেখা দেবে।

জাতীয় পার্টির দায়িত্ব এরশাদ তার ভাই জি এম কাদেরের হাতে তুলে দিলেও দলে তার বিরোধীরা দুর্বল নয়। তারা এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদকে সামনে নিয়ে অগ্রসর হতে চায়। এরশাদ না থাকলে এই বিরোধ নিষ্পত্তি করা কিংবা ধামাচাপা দেয়া সহজ হবে না। তখন জাতীয় পার্টিতে ভাঙন অনিবার্য হয়ে উঠবে। জি এম কাদেরের পক্ষে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা সহজ হবে না। জাতীয় পার্টি আবার ভাগ হলে পরের নির্বাচনে এই দলের পক্ষে আসন লাভও কঠিন হবে। এমনিতেই জাতীয় পার্টির শক্তি ক্ষয় হচ্ছে। রংপুরে দলের যে বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল, এখন আর তা নেই। এরশাদ না থাকলে রংপুরেও জাতীয় পার্টির প্রভাব আরো কমে যাবে। সেই অবস্থায় সুবিধাবাদী-সুযোগ সন্ধানীরা জাতীয় পার্টির পতাকা বহন করবে, নাকি নতুন পতাকার তলে গিয়ে শামিল হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টির একাংশ আওয়ামী লীগের আশীর্বাদ পাওয়ার চেষ্টা করবে। আবার আরেক অংশ বিএনপির দিকেও ঝুঁকতে পারে। এক পর্যায়ে গিয়ে কেউ আওয়ামী লীগে এবং কেউ বিএনপিতেও আশ্রয় চাইতে পারেন। কোন দিকের পাল্লা ভারী হবে, সেটা স্পষ্ট হতে একটু সময় লাগবে। যাই হোক না কেন, জাতীয় পার্টির অবস্থান দুর্বল হবে। এখন ক্ষমতার রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষায় জাতীয় পার্টির দরকষাকষির যে সুয়োগ আছে, তা আর থাকবে না। নদী শুকিয়ে গেলেও যেমন চিহ্ন থাকে, তেমনি জাতীয় পার্টি দুর্বল হলেও সহসাই হয়তো অস্তিত্বহীন হবে না। একটি নাম সর্বস্ব দল হিসেবে এক বা একাধিক গ্রুপ হয়ে হয়তো টিকে থাকবে। তবে এখন জাতীয় পার্টি অন্য দলের ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হওয়ার ক্ষমতা রাখলেও ভবিষ্যতে সেই ক্ষমতা হারাবে।

বিভুরঞ্জন সরকার: যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা