নতুন জিক্সার আনছে সুজুকি

আগের সংবাদ

সড়ক ছেড়েছে রিকশাচালকরা, ফের অবরোধ বুধবার

পরের সংবাদ

ফুল, অশ্রু ও ভালোবাসায় লাবলুকে শেষ বিদায়

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ৯, ২০১৯ , ৫:৩১ অপরাহ্ণ

যেতে নাহি দেব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়। কবিগুরুর এই অমর কবিতার মতো সত্যের কাছে হার মেনে গত সোমবার রাতে পরপারে চলে গেলেন দৈনিক ভোরের কাগজের প্রধান প্রতিবেদক ও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সাবেক সভাপতি সৈয়দ আখতারুজ্জামান সিদ্দিকী লাবলু। তিন দফা জানাজা শেষে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় তাকে রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। তার অকাল মৃত্যুর মধ্য দিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল এক প্রতিবাদী কণ্ঠ। সেই সঙ্গে নিভে গেল আশির দশক থেকে সাংবাদিকতা শুরু করা এক ত্যাগী সাংবাদিক নেতার জীবনপ্রদীপ।

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মরহুমের লাশ ভোরের কাগজ কার্যালয়ে নেয়া হয়। সেখানে তার ১ম জানাজা শেষে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সম্পাদক শ্যামল দত্ত, বার্তা সম্পাদক ইখতিয়ার উদ্দিন, প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল করিম সোহাগ, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক সুজন নন্দী মজুমদার, বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপক এস এম এ রাজ্জাক ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। ভোরের কাগজ থেকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মরহুমের লাশ ২য় জানাজার জন্য ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) প্রাঙ্গণে নেয়া হয়।

সেখানে জানাজা শেষে ডিআরইউ সভাপতি ইলিয়াস হোসেন, সহসভাপতি খোন্দকার কাওছার হোসেন, যুগ্ম সম্পাদক জামিউল আহসান সিপু, ক্র্যাব সভাপতি আবুল খায়ের, সাধারণ সম্পাদক দীপু সারোয়ার, সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান খান, পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহম্মদ মারুফ হাসান, বিশেষ শাখার ডিআইজি (রাজনীতি) মাহবুবুর রহমান, সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা, মিডিয়া উইংয়ের পুলিশ সুপার মো. কামরুজ্জামান, সিনিয়র তথ্য অফিসার এ কে এম কামরুল আহছান, র‌্যাব সদর দপ্তরের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এমরান হাসান, ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন বহুমুখী সমিতি, আইজিপি, র‌্যাব সদর দপ্তর ও ঢাকাস্থ খুলনা বিভাগীয় সাংবাদিক সমিতির পক্ষ থেকে কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মরহুমের লাশ জাতীয় প্রেসক্লাবে নেয়া হয়। বাদ জোহর সেখানে তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি সাইফুল আলম, সিনিয়র সহসভাপতি ওমর ফারুক, সহসভাপতি আজিজুল ইসলাম ভুইয়া, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোল্লা জালাল, সাধারণ সম্পাদক শাবান মাহমুদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি আবু জাফর সূর্য, সাধারণ সম্পাদক সোহেল হায়দার চৌধুরী, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবীবুর রহমান, বিভিন্ন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ তিন শতাধিক সাংবাদিক অংশ নেন। জানাজা শেষে জাতীয় প্রেসক্লাব, ডিইউজে, বিএফইউজে, বাংলাদেশ মেডিকেল রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন, পাসপোর্ট এন্ড ইমিগ্রেশন রিপোর্টার্স ফোরাম, পটুয়াখালী জার্নালিস্ট ফোরাম, রংপুর বিভাগ সাংবাদিক সমিতি ও আইএসও টেকের পক্ষ থেকে ফুল নিয়ে মরহুমকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর দুপুর আড়াইটার দিকে আজিমপুর কবরস্থানে মরহুমের লাশ দাফন করা হয়।

এদিকে, দীর্ঘদিনের সহকর্মীকে হারিয়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সাংবাদিক সমাজে। অশ্রুতে ভিজেছে শত শত চোখ। সহকর্মীরা কিছুতেই মানতে পারছেন না তার এই অকাল প্রয়ান। কিন্তু নিয়তির অমোঘ বিধান মেনে বুকে শত কষ্ট চেপে লাভলুকে চিরনিদ্রায় শায়িত করতে আজিমপুর কবরস্থানে ছুটে যান সবাই।

প্রথম জানাজার আগে ভোরের কাগজ সম্পাদক ও জাতীয় প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ শ্যামল দত্ত বলেন, আখতারুজ্জামান লাবলু সাংবাদিক জগতে অত্যন্ত প্রিয়মুখ ছিলেন। যার বড় প্রমাণ ক্র্যাবের ৬ বারের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হলো ক্র্যাবের মতো সংগঠনের ৬ বারের সভাপতি হয়েও নিজেকে গুটিয়ে রেখে অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করতেন লাবলু। আপনারা অবাক হবেন, একটি বাড়ির ছাদের চিলে কোঠায় থাকতেন তিনি। এখানেই শেষ নয়। অত্যন্ত পরোপকারী ছিলেন তিনি। কখনো কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করেননি। এই ভালো মানুষটার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে আপনারা সবাই দোয়া করবেন।

তিনি আরো বলেন, গত ২ বছর ধরে অসুস্থ ছিলেন লাবলু। আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। দিল্লিতেও পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বাঁচাতে পারলাম না। আপনারা সবাই কষ্ট করে জানাজায় শরিক হয়েছেন এজন্য কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে লাবলু অসুস্থ থাকার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রেস সচিব এহসানুল করিম হেলালসহ দেশে ও দিল্লিতে প্রেস মিনিস্টার ফরিদ হোসেনসহ অনেকে সহযোগিতা করেছেন। তাদেরও আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, লাবলুর স্মরণে আমাদের পক্ষ থেকে শোক বই ও শোকসভার আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি তার যদি কোনো দেনাপাওনা থাকে তাহলে ভোরের কাগজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করা হবে।

জাতীয় প্রেসক্লাবে জানাজার পূর্বে সংগঠনটির সভাপতি ও দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, লাবলু অত্যন্ত সাহসী সাংবাদিক ছিলেন। সারাজীবন সাংবাদিকতার পিছনেই সময় দিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি শিখিয়ে গেছেন কিভাবে সৎ, নির্লোভ ও পরোপকারী হতে হয়।

ক্র্যাবের সভাপতি আবুল খায়ের বলেন, আমরা এমন একজন মানুষকে হারিয়েছি যা বলার মতো না। ক্র্যাবকে সাংগঠনিকভাবে আজকের অবস্থানে দাঁড় করানোর পেছনে লাবলুর অবদান অনস্বীকার্য। তার অকাল মৃত্যুতে ক্র্যাবের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। আপনারা পরোপকারী লাবলুর জন্য দোয়া করবেন। পাশাপাশি শুক্রবার বাদ জুমা ক্র্যাবের পক্ষ থেকে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হবে।

ডেইলি অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকদের ক্রান্তিলগ্নে যে কয়জন সাংবাদিক পরিশ্রম করেছেন লাবলু তাদের মধ্যে একজন। এখন দোয়া ছাড়া তাকে শ্রদ্ধা জানানোর মতো কিছু আমাদের কাছে নেই। সুতরাং তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে সবাই দোয়া করবেন।

প্রসঙ্গত, গত ৮ জুলাই সোমবার রাত ১০টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সৈয়দ আখতারুজ্জামান সিদ্দিকী লাবলু। তার বয়স হয়েছিল ৫২ বছর। আখতারুজ্জামান লাবলু দীর্ঘদিন ধরে লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। এই রোগে তিনি দিল্লিতে গিয়ে চিকিৎসা করান। ঢাকায় ফিরে কয়েক মাস পর গত ২৮ মে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রায় দুমাস হাসপাতালের কেবিনে থাকার পর তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়।

উল্লেখ্য, আখতারুজ্জামান লাবলু তার বর্ণাঢ্য সাংবাদিক জীবনে ২০০৪ সালে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে ভোরের কাগজে যোগ দেন। এরপর প্রধান অপরাধ বিষয়ক প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে ভোরের কাগজের প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ পদেই ছিলেন তিনি। লাবলু ৮০’র দশকের শেষ দিকে দৈনিক কিষাণ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেন। এরপর দৈনিক সমাচার ও অনলাইন পোর্টাল বিএনএস (বাংলাদেশ নিউজ সার্ভিস)-এ কাজ করেন। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। এরপর একই পদে ২০১০, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৬ সালে মোট ৬ বার নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন।