দুর্ভোগের বিষয়টি সরকারের ভাবা উচিত

আগের সংবাদ

এত ছোট দেশ, এত অধিক মানুষ

পরের সংবাদ

কুপিয়ে হত্যার সংস্কৃতি

ব্যর্থতার দৃশ্যমান এক চিত্র

প্রকাশিত হয়েছে: জুলাই ১, ২০১৯ , ৮:৫৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুলাই ১, ২০১৯, ৮:৫৬ অপরাহ্ণ

স্বপ্না রেজা

কলাম লেখক।

এই অর্জনকে সফল করতে রাষ্ট্রের ভূমিকা সবচাইতে বেশি। একটা জাতি কতটা সুশৃঙ্খল, পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হবে, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করবে, নিরাপদ হবে, ন্যায্য অধিকার ভোগ করবে, আইনের প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠবে, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কিন্তু রাষ্ট্রের। একটা রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সেই নিশ্চয়তা দেবেন তার নাগরিককে।

শত শত লোকের সামনে কুপিয়ে হত্যা করা নতুন ঘটনা নয় বাংলাদেশে। কঠিনও নয়। বরং দিন দিন বেশ সহজ হয়ে উঠছে। অহরহ ঘটছে। মনের ভেতর কুপিয়ে হত্যা করার পাশবিক চিন্তা আর হত্যা করে পার পাওয়ার সম্ভাবনার সংস্কৃতি থাকলেই কুপিয়ে হত্যা করা যায়। যাচ্ছেও তাই এবং তা প্রকাশ্যে। আবার কোপানোর জন্য যে অস্ত্র ব্যবহার করা হয় তার জন্য কোনো বৈধ লাইসন্স লাগে না। নবায়নের প্রয়োজন নেই ওসবের। মন চাইলে ঘরের দা, বঁটি দিয়েও কোপানো যায়। সেটা হতে পারে ঘরের ভেতর কিংবা বাইরে। চাপাতি, রাম দা এসব কসাইখানা বা বাজার থেকে সংগ্রহ করারও দরকার হয় না। রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের সংগ্রহে যেমন এমন অস্ত্র থাকে, তেমন থাকে সন্ত্রাসী, বখাটে ও ছিনতাইকারীদের হাতে। স্থানীয় পুলিশের কেউ কেউ এসব জানে। খবরও রাখে। আবার ধর্মীয় উগ্রবাদীরাও এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারে বেশ পারদর্শী। বেশ ক’টি নৃশংস হত্যাকাণ্ড ধর্মীয় উগ্রবাদীরা কুপিয়ে ঘটিয়েছে। তারা কোপাতে ওস্তাদ, এমন কথা কারোরই অজানা নয়। কুপিয়ে হত্যার এই সংস্কৃতির একটা অংশ কিন্তু ধর্মীয় উগ্রবাদ গোষ্ঠীর কাছ থেকে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করেছে সমাজে, রাষ্ট্রে।
সম্প্রতি বরগুনায় প্রকাশ্যে শত শত মানুষ ও স্ত্রীর সামনে স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনা উল্লিখিত কোপানো সংস্কৃতির বাইরের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। স্বামীর সামনে স্ত্রীকে, স্ত্রীর সামনে স্বামীকে কিংবা বাবা-মায়ের সামনে সন্তানকে কুপিয়ে হত্যা করার মতো বর্বর ঘটনার কিন্তু অভাব নেই। বরগুনার ঘটনা কুপিয়ে হত্যার সংস্কৃতির একটা ধারাবাহিকতা মাত্র। কোনো ব্যক্তির প্রকাশ্যে অপরাধ করার প্রবণতা হলো এক ধরনের ধৃষ্টতা, দুঃসাহস। যে ধৃষ্টতা ও সাহস সে সমাজ থেকে, রাষ্ট্র থেকে তথা সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা, অসততা, অসংলগ্নতা থেকে ব্যক্তি অর্জন করে। প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করাটা হলো সেই ধৃষ্টতা অর্জনেরই ভয়াবহ একটা চিত্র এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের অনুশাসনের এক ধরনের চরম ব্যর্থতার নমুনা মাত্র। আর ব্যক্তির ভেতর চূড়ান্ত পাশবিকতা জেগে ওঠা হলো সেই ব্যর্থতারই দৃশ্যমান নমুনা।
ব্যক্তি মাত্রই কামনা-বাসনা, লোভ, আকাক্সক্ষা, ক্ষোভ, হিংসা, স্বপ্ন, আশা, সুখ ইত্যাদি মানসিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেড়ে ওঠে। অর্থাৎ ব্যক্তির ভেতর ইতিবাচক ও নেতিবাচক, এই দুধরনের বোধই সুপ্ত অবস্থায় থাকে, যা পরিবেশ ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা অর্জনের ভেতর দিয়ে ব্যক্তির ভেতর স্থির হয় যে, তিনি কোনো বোধসম্পন্ন হবেন। একজন অপরাধী কখনোই ইতিবাচক বোধসম্পন্ন হন না। সমাজের খারাপ কাজের প্রতি তার আগ্রহ সৃষ্টির পেছনে কিন্তু সে যতটা না দায়ী, তারচেয়ে বেশি দায়ী সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় যে প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব ছিল তাকে সুস্থ ও সঠিকভাবে বিকশিত হতে দেয়ার, নিয়ন্ত্রিত করার, তাদেরই। যদি বিজ্ঞান বিশ্বাস করি, তাহলে বিশ্বাস করতে হবে যে, পারিপার্শ্বিকতা ও পরিবেশই স্থির করে দেয় যে, একজন ব্যক্তি ইতিবাচক, কী নেতিবাচক বোধসম্পন্ন হবেন। সামাজিক প্রতিষ্ঠান বলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠন, ক্লাব-সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বলতে সরকার ও তার বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থা, নিরাপত্তা প্রদানকারী সংস্থাকে বুঝাতে চাইছি। উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলো যতদিন পর্যন্ত নিজেদের দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতাগুলো সততার সঙ্গে শনাক্ত করতে না পারবেন, কাটিয়ে উঠতে না পারবেন, ততদিন এই কুপিয়ে হত্যার সংস্কৃতি চলতেই থাকবে। রাম দা হয়তো একদিন জাতীয় অস্ত্র হিসেবে পরিচিত লাভ করে ইতিহাসে জায়গা করে নেবে।
টিভি সংবাদে দেখলাম আইনমন্ত্রী বলছেন, একটা ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করছে, কেউ এগিয়ে আসছে না তাকে রক্ষা করতে। অথচ ভিডিও করে ভাইরাল করা হচ্ছে। নিশ্চিত মাননীয় মন্ত্রী হতভম্ব। তিনি সামাজিক প্রতিরোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আবার সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমন ধারণা পোষণ করেছেন যে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এমন দুর্ধর্ষ হত্যাকাণ্ড হচ্ছে। দুজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বেশ উদ্বিগ্ন বিষয়টি নিয়ে। কিন্তু কেন মানুষ দূর থেকে এমন বর্বরোচিত ঘটনা ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়াতে ছবি ভাইরাল করে, অথচ কাছে গিয়ে শিকারিকে রক্ষা করতে এগিয়ে যান না, শ্রদ্ধা রেখে বলছি এই প্রশ্নের জবাব সম্ভবত আইনমন্ত্রী নিজেও জানেন। আর এই প্রশ্নের জবাবটা বলে দেবে সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর করুণ ব্যর্থতার কথা।
ধরুন, একজন ব্যক্তি এগিয়ে গেলেন। শিকারিকে রক্ষা বা উদ্ধারও করলেন। কী হলো বা হয় তারপর? সেই অপরাধী চক্র তারপর উদ্ধারকারীর পেছন লেগে যায়। প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। অপরাধীর এই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠার পেছনকার দুঃসাহস বা শক্তির উৎস কী? সেটা হলো, অপরাধের কারণে পুলিশের কাছে ধরা পড়লেও অতি দ্রুত তার জামিন পেয়ে যাওয়া। কারোর অজানা নয় যে, এ ধরনের জামিন লাভ হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায়। অপরাধীদের শক্ত সমর্থক ও আশ্রয়দাতা থাকতে হয়। আর থাকে বলেই ওরা এতটা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ত্রাস সৃষ্টি করে জনগণকে ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখে। যাই হোক, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির দুর্ধর্ষ কিছু চরিত্র প্রয়োজন পড়ে বিধায় মাঠ পর্যায়ে চাহিদা অনুযায়ী নেতারা সেসব দুর্ধর্ষ চরিত্র প্রসব করেন, লালনপালন করেন। যারা অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাইতে বেশি ক্ষমতাধর হয়ে থাকেন। ফলে যিনি নৃশংসতার প্রতিবাদে উদ্ধারকাজে এগিয়ে ছিলেন, তিনি কোনোভাবেই আর নিরাপত্তা পান না, নিরাপদ হন না। আবার যদিওবা উদ্ধারকারী পুলিশের সহায়তা চাইলেন, দেখা গেল পুলিশের সহায়তা পাওয়া নয় বরং তিনি পুলিশ কর্তৃক হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং তা প্রতি পদে পদে। পুলিশকে এসব ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে টাকা ও রাজনৈতিক প্রভাব। ফলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী ব্যক্তি নিজে এবং তার পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিনযাপন করতে থাকেন। শুরু হয় তাদের অনিশ্চিত জীবনের নতুন অধ্যায়। নৃশংস কোনো ঘটনার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিজেরাই নিরাপদহীন হয়েছেন, এমন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নাগরিকের সংখ্যা কিন্তু কম নয় রাষ্ট্রে। আর এই অভিজ্ঞতাময় বাস্তবতার কারণেই নিজেদের নিরাপদ রাখতে সাধারণ নাগরিক এখন দূর থেকে এমন নৃশংস ঘটনা দেখেন, কেউ আবার ভিডিও করে ভাইরাল করে দেন। সরাসরি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে শিকারগ্রস্তকে উদ্ধার করার কাজে নিজেকে না জড়াতে পারলেও, প্রতিবাদ ও উদ্ধারকাজে যেটুকু তার অংশগ্রহণ তা হলো, ভিডিও করে প্রকৃত ঘটনা জনসমক্ষে তুলে ধরা, রাষ্ট্রকে জানিয়ে দেয়া। এই কাজটি তো ওই নৃশংস ঘটনার একটি অন্যতম সাক্ষ্য হিসেবে থেকে যায়। অপরাধী কে তা বলে দেয়। সেটাই বা কম কী? এমন উদ্যোগে কারোর পক্ষে সম্ভব হয় না ঘটনার মূল চরিত্রকে ফ্রেম থেকে সরিয়ে ফেলা এবং নতুন কোনো চরিত্র রচনা করে গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া। ভিডিও করে ভাইরাল করাটাও কিন্তু কঠিন প্রতিবাদ। সেই সঙ্গে যেখানে প্রকৃত অপরাধীর বদলে নিরীহকে ধরে শাস্তি দেয়ার নমুনা আছে, সেখানে তো এই উদ্যোগ বড্ড কার্যকর, তাই না?
নৈতিক মূল্যবোধ কারোর জন্মগত আচরণ বা বৈশিষ্ট্য নয়। এটা জন্মের পর ব্যক্তি অর্জন করে। এই অর্জনকে সফল করতে রাষ্ট্রের ভূমিকা সবচাইতে বেশি। একটা জাতি কতটা সুশৃঙ্খল, পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হবে, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করবে, নিরাপদ হবে, ন্যায্য অধিকার ভোগ করবে, আইনের প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠবে, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কিন্তু রাষ্ট্রের। একটা রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সেই নিশ্চয়তা দেবেন তার নাগরিককে। রাষ্ট্র যদি নৃশংস কোনো ঘটনা প্রত্যক্ষ করে একজন সাধারণ নাগরিকের মতো বিস্ময় প্রকাশ করেন, তাহলে নাগরিকের শেষ আস্থাটুকু আর থাকে না। কী শেখানো হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কেন মানুষ অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে, কেন অপরাধীর চূড়ান্ত শাস্তি হচ্ছে না, কেন আইন তার নিজ স্বাধীনতায় কার্যকর হয়ে ওঠে না, কেন প্রশাসন রাজনীতিমুক্ত হতে পারছে না, কেন সত্য বললে শাস্তি পেতে হবে ইত্যাদি এমন হাজারো প্রশ্নের উত্তর সততার সঙ্গে দেয়ার চেষ্টা করলে সমস্যার কারণগুলো চিহ্নিত করা যাবে। আর কারণ জানা সম্ভব হলেই দায়িত্বশীলদের সদিচ্ছায় সমস্যা দূর করা সম্ভব, নতুবা নয়।

স্বপ্না রেজা : কলাম লেখক।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা