বিয়ে বাড়িতে ক্যাটরিনার নাচ!

আগের সংবাদ

ইরানের আকাশসীমা এবার এড়িয়ে চলছে ভারতীয় বিমান

পরের সংবাদ

সারা বিশ্বে নিজের সঙ্গীতকে প্রমাণের সময় এসেছে

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২২, ২০১৯ , ৭:১৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ২২, ২০১৯, ৭:১৯ অপরাহ্ণ

Avatar

২১ জুন বিশ্ব সঙ্গীত দিবস। দিনটিকে নিয়ে কথা বলার জন্য ‘মেলা’র মুখোমুখি হয়েছিলেন খ্যাতিমান সঙ্গীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ। সাক্ষাৎকারে তিনি নতুন প্রজন্মের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করলেন। সেই সঙ্গে নিজেদের সংস্কৃতির কাছে প্রত্যাবর্তনের তাগিদ দিলেন চার দশকের বেশি সময় ধরে সুরের ভুবনে প্রভাব বিস্তারকারী এই তারকা। পাঠককে বিস্তারিত পড়ার আমন্ত্রণ…

২১ জুন বিশ্ব সঙ্গীত দিবস; আপনি কি মনে করেন সঙ্গীতের জন্য আলাদা কোনো দিবসের প্রয়োজন আছে?
কুমার বিশ্বজিৎ : এটা শুধু প্রতীকী রূপে, আসলে সঙ্গীতের আলাদা কোনো দিবস হয় না। যারা সঙ্গীতশিল্পী বা সঙ্গীতপ্রেমী তারা সঙ্গীতের পথটাকে আষ্টেপৃষ্ঠেই আছে। এটা তো বিশ্বায়নের যুগ; ব্যাপারটা হচ্ছে বিশ্বায়নের নাম নিয়ে সর্বোপরি শোষণ করছে ওয়েস্টার্ন কালচার। এই বিশ্বসঙ্গীত দিবসে আমাদের অবস্থান কিন্তু এখনো আমরা সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। বরং আমরা মাঝেমধ্যে অনেকাংশে অতি আধুনিকতার নামে তাদের কাছে পরাজিত হচ্ছি।

তাহলে আমরা যে এখনো বিশ্বসঙ্গীত আসরে সুসংহত অবস্থানে পৌঁছাতে পারলাম না, এই ব্যর্থতার দায়ভার কার?
কুমার বিশ্বজিৎ : অনেকেই আধুনিকতা মানেই মনে করে যে অন্য সংস্কৃতিকে লালন করা। অনেকে এই দেশের গান শুনে নাক সিটকায়। ‘আমি বাহিরের গান শুনি, আমি এ দেশের গান শুনি না’ এটা বলার মধ্যে একটা ঢং আছে, নিজেকে আপডেটেড ভাবা! অনেকে অপ্রয়োজনে ইংরেজি বলাটাকে কিন্তু আধুনিকতা মনে করে, মনে করে উচ্চমার্গীয় বা শিক্ষিত! কথাটা কিন্তু খুব সূ²ভাবে আপনার শুনতে হবে- ‘অপ্রয়োজনে’ ইংরেজি বলা! আবার অনেক শিক্ষিত লোক এই ইংরেজি বলাটাকেও কিন্তু আধুনিকতা মনে করে। এ দেশে অনেক দোভাষী আছেন, তারা তো ইংরেজি বলেন। ইংরেজি হচ্ছে একটা ভাষা তা যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন, এই ভাষা দিয়ে কারো বুদ্ধিমত্তা বিচার করা যায় না। আমার দেশের লাখ লাখ মানুষ যে ভাষার জন্য আত্মাহুতি দিয়েছে, সেই ভাষাকে আমি আনস্মার্ট মনে করি কীভাবে? আপনি দেখবেন জাপানিজরা ইংরেজি জানলেও দোভাষী নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রে, এটা কিন্তু গর্ব করার মতো ব্যাপার। আমরা কারো মধ্যে একটু পাশ্চাত্যের প্রভাব দেখলেই মনে করি, ছেলেটা তো অনেক বেশি স্মার্ট! এগুলো বাদ দিয়ে নিজের অস্তিত্ব এবং পরবর্তী প্রজন্ম যেন নিজের শিকড়কে চেনেসেভাবে সংস্কৃতিকে লালন করতে হবে, তা না হলে একদিন আমার আপনার পরবর্তী প্রজন্ম কিন্তু অন্য
সংস্কৃতির হাতে জিম্মি হয়ে যাবে এবং আপনি অস্তিত্বহীনতায় ভুগবেন, সেই বেদনা কিন্তু অনেক বেশি কষ্টের হবে।

এবারের সঙ্গীত দিবস ঘিরে সামগ্রিক অর্থে আপনার প্রত্যাশা কী?
কুমার বিশ্বজিৎ : আমি মনে করি পৃথিবীর যে কোনো দেশের চাইতে আমরা সংস্কৃতির দিক থেকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। আমাদের দেশের আউল-বাউল, এমনকি নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতিটি অঞ্চলও যদি ধরি- শরিয়তি, মারফতি, মুরশিদী, ভাটিয়ালি, মাইজভা  রি, লালন; কতভাবে আমরা সমৃদ্ধ! আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র আমাদের ফোক গানকে নিয়ে রিয়েলিটি শো’তে গিয়ে মানুষের মাঝে আলোড়ন তৈরি করছে; আমরা কেন ব্যর্থ হচ্ছি! আমাদের দেশের শাহ আবদুল করিমের গান, রাধারমণের গান, হাছন রাজার গান, আমাদের দেশের দূরবীন শাহর গান; তবুও আমরা কেন পারছি না! এখানে একটা কথা বলি, মানুষ অন্য সংস্কৃতির সঙ্গে সংমিশ্রিত হবে, সংমিশ্রণ হলে সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়। কিন্তু সেখানে বেশি থাকবে নিজের সংস্কৃতি, আমার সংস্কৃতির অংশটা থাকবে বেশি। সংস্কৃতির কোনো সীমারেখা নেই, তা প্রবেশ করবেই। কিন্তু আপনাকে- আপনার সংস্কৃতিকে ঊর্ধ্বে রেখে অন্য সংস্কৃতির সঙ্গে আপডেটেড হতে হবে। আপনার যদি নিজস্ব অস্তিত্ব না থাকে তাহলে আপনার স্বাধীনতার মূল্য কোথায়? ঠিক আছে, স্প্যানিশ মিউজিকের সঙ্গে আমি কলেবোরেশন করব, ল্যাটিন বা ইন্ডিয়ান ক্লাসিক বা রক গানের সঙ্গে আমি সংমিশ্রণ করব, মেটাল-হেভি মেটালের সঙ্গে মিক্সড করব, কিন্তু আমার বেসিকটাকে বাদ দিয়ে না। হতে পারে আমার খাদ্য তালিকায় নানান পাশ্চাত্যের খাবার, তা মাসে বা সপ্তাহে একদিন, দুইদিন, তিনদিন খেতে পারি; বেসিক হলো আমার ভাত। প্রতিটা জাতিরই নিজস্বতা কিছু থাকে। আমাদের বাঙালি জাতিরও একটা নিজস্ব মূল্যবোধ আছে। আমার সংস্কৃতিকে যদি মনে করি আমার মা, সেখানে আমার মাকে আমি অলঙ্কৃত করতে পারি; আমার মাকে আমি যেভাবে দেখছি- শাড়ি পরা, হাতে চুড়ি, কানে দুল, নাকে নোলক, এখানে হঠাৎ করে মাকে শর্টস পরিয়ে দিলে তো হয় না। কারণ এটা আমার মায়ের অবয়ব না। এটাই মনে রাখতে হবে নতুন প্রজন্মকে। তাদের অস্তিত্বের জন্য, তাদের ভিত্তির জন্য, তাদের সম্মানের জন্য, তাদের গৌরবের জন্য নিজের সংস্কৃতিটাকে যেন মাথার উপরে রাখে। এটাই হোক বিশ্ব সঙ্গীত দিবসে আমাদের অঙ্গীকার। আমাদের সংস্কৃতিকে বিশ্বে প্রমাণ করা উচিত আমরা কতটুকু সমৃদ্ধ; এটাই হোক প্রত্যাশা, এটাই হোক উদ্দেশ্য, এটাই হোক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। শুধু উৎসব পালন না, অন্যের সঙ্গীতকে লালন না; সারা বিশ্বে নিজের সঙ্গীতকে প্রমাণের সময় এসেছে।