ব্যাংক ঋণের সুদের হার কেন কমছে না?

আগের সংবাদ

বাজেট জনকল্যাণমুখী অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ রয়েই যাচ্ছে

পরের সংবাদ

বিমান আবার উড়বে ডানা মেলে

মেজর (অব.) সুধীর সাহা

কলাম লেখক।

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ১৭, ২০১৯ , ৮:০৫ অপরাহ্ণ

বিমান বাংলাদেশ তার জন্ম থেকেই লোকসানে ভরে আছে। আর এ লোকসানের মূল কারণ দুর্নীতি। বিমানের যাত্রীসেবা, কার্গো সার্ভিস সর্বত্রই দুর্নীতির করাল গ্রাসে নিমজ্জিত। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বিমানকে লুটেপুটে খাচ্ছে। এরা একদিকে নানারকম বাড়তি সুযোগ-সুবিধা আদায়ে তৎপর থাকে, আবার অন্যদিকে অবৈধপথে উপার্জনের পথও খোলা রাখে। কেউ কেউ এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। ‘বিমান বাংলাদেশ’ আমাদের জাতীয় সংস্থা। এর সুনাম-দুর্নামের সঙ্গে আমাদের পুরো জাতির সুনাম-দুর্নাম জড়িত।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্স’। ২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিমানকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত করে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে পণ্য পরিবহনে বিমান বাংলাদেশ শুধু ২৯ শতাংশ পরিবহন করছে। বাকি অংশের পুরোটাই নিয়ে যাচ্ছে বিদেশি এয়ার লাইন্সগুলো। বর্তমানে শুধু ১৬টি দেশের মধ্যে বিমান চলাচল চালু রেখেছে এই সংস্থাটি। বিমান বংলাদেশ এয়ার লাইন্সের উড়োজাহাজের সংখ্যা ১৪টি এবং ভাড়ায় আছে আরো ৩টি। সিভিল এভিয়েশনের কাছে বিমান বাংলাদেশের দেনা পড়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। বিমান বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে নড়েচড়ে বসেছে। অন্যদিকে দুদক ঘন ঘন এখানে বিচরণ করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিমান নিয়ে তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করার পর চারদিকে যেন নড়াচড়ার আওয়াজ পাচ্ছি। লক্ষণটি শুভ। এখন দেখার পালা, তাতে শেষরক্ষা হয় কিনা। বিমান বাংলাদেশ তার জন্ম থেকেই লোকসানে ভরে আছে। আর এ লোকসানের মূল কারণ দুর্নীতি। বিমানের যাত্রীসেবা, কার্গো সার্ভিস সর্বত্রই দুর্নীতির করাল গ্রাসে নিমজ্জিত। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বিমানকে লুটেপুটে খাচ্ছে। এরা একদিকে নানারকম বাড়তি সুযোগ-সুবিধা আদায়ে তৎপর থাকে, আবার অন্যদিকে অবৈধপথে উপার্জনের পথও খোলা রাখে। কেউ কেউ এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। এ আশাবাদ নিয়ে আমিও শান্তি পেতে চাই। কেননা ‘বিমান বাংলাদেশ’ আমাদের জাতীয় সংস্থা। এর সুনাম-দুর্নামের সঙ্গে আমাদের পুরো জাতির সুনাম-দুর্নাম জড়িত।
বিমান এয়ারলাইন্সে অনেক অনিয়ম তো আছেই- সবসময়ই তা ছিল। তাই তো যাত্রীরা একসময় ইচ্ছে থাকলেও বিমানের অব্যবস্থার কারণে বিমানে যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছিল। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বিমান বাংলাদেশে করে ভ্রমণের অদম্য আকাক্সক্ষা থাকে। দেশপ্রেম তো আছেই, তারপরও পরিচিত ভাষা এবং খাবার তাদের টানে অনেক বেশি করে। প্রায় এক কোটি প্রবাসী এখন বাংলাদেশে যাতায়াত করছেন। এদের দিয়ে ব্যবসা করার সব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিমান বাংলাদেশ শুধু তার অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির কারণে প্রয়োজনীয় ব্যবসা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বরং অন্যান্য বিদেশি এয়ার লাইন্সগুলো বাংলাদেশে ভালো ব্যবসা করছে। অন্যরা বাংলাদেশি যাত্রী নিয়ে ব্যবসা করতে পারলেও দেশের জাতীয় এয়ার লাইন্স ‘বিমান বাংলাদেশ’ লোকসান দিয়ে যাচ্ছে জন্মলগ্ন থেকেই। নিয়োগে অব্যবস্থা ও নিয়োগ বাণিজ্য, সময়মতো বিমান ছাড়ার অনভ্যাস, টিকেট বিক্রিতে দুর্নীতি, সামগ্রিক ম্যানেজমেন্টে অব্যবস্থা, নতুন নতুন এয়ার ক্র্যাফটের অভাবসহ নানারকম দুর্নীতির করাল গ্রাসে নিমজ্জিত বাংলাদেশের জাতীয় বিমান সংস্থা ‘বিমান বংলাদেশ’। যেখানে অন্যরা ব্যবসা ভালো করার জন্য উত্তরোত্তর নতুন নতুন রুটে বিমান নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বিমান বাংলাদেশ প্রচলিত রুটগুলো বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। বিমান বাংলাদেশ নিয়ে ইতোমধ্যে অনেক আলোচনা হয়েছে, সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। যে তিমিরে তাদের অবস্থান ছিল, আজো সেই তিমিরেই আছে। জাতীয় এ প্রতিষ্ঠানটিকে কি এভাবে মরতে দেয়া যায়?
হয়তো এবার ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বিষয়ক ৭ম নিরাপত্তা সংলাপে দুই দেশই ঢাকা-নিউইয়র্কে ফ্লাইট পুনরায় চালু করার মতৈক্যে পৌঁছেছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্সের দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে সুফল আসতে শুরু করেছে। ২০১৯-এর মার্চের শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়া এ অভিযানে শুধু এপ্রিল মাসেই টিকেট বিক্রি বেড়েছে ১৪২ কোটি ৬১ লাখ টাকা। যেখানে ২০১৮ সালের এপ্রিলে টিকেট বিক্রি ছিল ২৭০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, সেখানে ২০১৯ সালের এপ্রিলে বিক্রি হয়েছে ৪১৩ কোটি টাকা। বিমানের ইতিহাসে এটা নজিরবিহীন ঘটনা। এটি সম্ভব হয়েছে বিমানে যখন দুর্নীতিবিরোধী মনিটরিং জোরদার হয়েছে এবং দুদক তাদের বিশেষ নজর নিক্ষেপ করেছে বিমান বাংলাদেশের প্রতি। টিকেট দুর্নীতি সিন্ডিকেটের সদস্যরা টিকেট ব্লক করে তা বেশি দামে কালোবাজারে বিক্রি করত। তাদের সুবিধামতো টিকেট বিক্রি না হলে ব্লক করা টিকেট বিক্রি না করে খালি সিট নিয়ে উড়োজাহাজ ছাড়া হতো। এর ফলে বিমানকে বিপুল অঙ্কের টাকার লোকসান গুনতে হতো। এভাবেই চলেছে বছরের পর বছর। বিনিময়ে দুর্নীতিবাজ চক্র শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নতুন সরকার গঠনের শুরুতেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেন। বিমানের অব্যবস্থা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হন। নতুন মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিমানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার পরিকল্পনা করেন। ইতোমধ্যে দুদক এ সংস্থাটির আটটি খাতে দুর্নীতির বিবরণ তুলে ধরেছে- এয়ার-ক্রাফট ক্রয় ও লিজ গ্রহণ, রক্ষণাবেক্ষণ, ওভারহোলিং, গ্রাউন্ড সার্ভিস, কার্গো আমদানি-রপ্তানি, টিকেট বিক্রি এবং ক্যাটারিং। বিমানের পরিচালনা পরিষদের সভায় সংস্থাটির এমডি মোসাদ্দিক আহমেদকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। সে সঙ্গে তার এবং আরো নয়জনের বিদেশ যাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এ প্রতিষ্ঠানটি আবার ঘুরে দাঁড়াক এমনটি আশা কোটি মানুষের। বাংলাদেশের মানুষ আবার বিমানে যাত্রার জন্য ঝুঁকে পড়–ক। প্রতিষ্ঠানটি হয়ে উঠুক যাত্রীদের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে। দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে বিমানে নিয়োগ দেয়া হোক সৎ, দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। জাতীয় প্রতিষ্ঠানটি আবার ঘুরে দাঁড়াবে এমনটাই এখন বিশ্বাস করতে সাহস পাচ্ছি। বিমানে যোগ হবে নতুন নতুন এয়ার-ক্রাফট, নতুন নতুন রুট; সময়মতো ছাড়বে বিমানের উড়োজাহাজ, টিকেট ক্রয়ের ঝামেলা পোহাতে হবে না যাত্রীদের; বিমান হবে আর দশটা বিদেশি এয়ার লাইন্সের মতো লাভবান প্রতিষ্ঠান এমন প্রত্যাশাই রইল।
বিমানের বর্তমান গতি ভালো যাচ্ছে এবং এর ফলাফলও একেবারে হাতে এসে গিয়েছে। এপ্রিল মাসের টিকেট বিক্রিই তো বলে দেয় পরিবর্তনের বাতাস বইছে বিমানে। এ পরিবর্তন যেন স্থায়ী হয় এটাই কামনা করছি। সাধুবাদ জানাই বর্তমান বিমান প্রতিমন্ত্রীকে, সাধুবাদ জানাই প্রধানমন্ত্রীকে এবং সাধুবাদ দুদককে। ইতোমধ্যে চালু হয়েছে ঢাকা-দিল্লি রুটটি, যা গত পাঁচ বছর ধরে বন্ধ ছিল। এভাবে এগিয়ে গেলে সুফল আসতে বাধ্য। এগিয়ে যাওয়ার অগ্রযাত্রায় আমরা পাশে আছি সাধুবাদ নিয়ে। এতদিন বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার লোকটির অভাব ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেহেতু জোর দিয়েছেন, তাই এবার ঘণ্টা বাঁধার লোকটিও পাওয়া যাবে। আমরা আশা করতে চাই, আগামী বছরের মধ্যেই বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাব বিমান বাংলাদেশের সার্বিক ব্যবসায়। অগ্রিম সব শুভেচ্ছা। বড় কোনো প্রশ্ন নয়, এবার নিশ্চিত আশাবাদ- বিমান আবার উড়বে ডানা মেলে।

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক।