প্রস্তাবিত বাজেটে গবেষণা বরাদ্দ

আগের সংবাদ

পাকিস্তানকে ৩৩৭ রানের টার্গেট ভারতের

পরের সংবাদ

প্রস্তাবিত বাজেট ২০১৯-২০

বাজেটকে বাজেট হিসেবে দেখা দরকার

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ১৬, ২০১৯ , ৮:২৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ১৬, ২০১৯, ৮:২৮ অপরাহ্ণ

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

অর্থনীতিবিদ ও সরকারের সাবেক সচিব।

নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে গিয়ে নতুন অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের হয়তো মনে পড়বে- ‘ফরাসি লেখক আন্দ্রে মালরোকে একবার সাফল্যের কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। উত্তরে তিনি বলেছিলেন যে সাফল্যের কারণ তিনি জানেন না, তবে এ সত্য অবশ্যই জানেন যে সবাইকে খুশি করতে গেলে ব্যর্থ হতে হয়।’ তাই শেষ পর্যন্ত কঠিন কোনো পথে হাঁটার পরিবর্তে লক্ষ্যের দিক থেকে প্রস্তাবিত বাজেটটিকে হতেই হয়েছে গত ১০ বছরের ধারাবাহিকতা এবং বাস্তবায়নের দিক থেকে একটি গতানুগতিক বাজেট।

বাজেটীয় দিকনির্দেশনার বাস্তবে কতটা প্রয়োগযোগ্য বা তার অভিঘাত কেমন হতে পারে সে পর্যালোচনাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার অবকাশ থাকতে নেই। যেমন এবারের বাজেটে উচ্চারিত হয়েছে কোনো জিনিসের দাম বাড়বে না। কিন্তু পরোক্ষ কর ভ্যাট আইনের প্রয়োগ কিংবা বিদ্যুৎ, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির পরিকল্পনা উত্তর পরিস্থিতিতে পণ্য ও সেবা উভয় খাতে যে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে সে বিবেচনা আড়ালে রাখা যাবে কি? সারা বিশ্বেই সৌরবিদ্যুৎকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। কয়লাবিদ্যুৎ থেকে সরে আসছে বিভিন্ন দেশ। প্রতিবেশী ভারতও তাদের বড় বড় কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করেছে। এর বিপরীতে তারা জোর দিচ্ছে নবায়নযোগ্য বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ওপর। গত পাঁচ বছরেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা আড়াই হাজার মেগাওয়াট থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করেছে দেশটি। বাংলাদেশেও সৌরবিদ্যুৎকে উৎসাহিত করতে সোলার প্যানেল উৎপাদন, আমদানি বা সরবরাহ পর্যায়ে আগে কোনো ধরনের শুল্ক, কর বা ভ্যাট পরিশোধের প্রয়োজন হতো না। কিন্তু ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে হঠাৎ করেই কয়লাকে শুল্কমুক্ত রেখে সোলার প্যানেল আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। এর ওপর ছিল গ্রাহক পর্যায়ে নির্দিষ্ট শতাংশ ভ্যাট। এতে সোলার প্যানেলের দাম ন্যূনতম ২৫ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং এর ফলে সৌরবিদ্যুত ভবিষ্যতে হুমকিতে পড়বে বলে মনে করেছিলেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২১ সাল নাগাদ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে, শুল্ক আরোপের ফলে তাও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল সবার। কারণ এর সিংহভাগই আসার কথা সৌরবিদ্যুৎ থেকে। উপরের এ দুটি খাত এর বাজেট বাস্তবায়নের প্রকৃত অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ, পরীক্ষা পর্যালোচনার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। বাজেট বানানোর সময় ইদানীং অনেকেই মে-জুন মাসে আলোচনা-সমালোচনার শোরগোল শুরু করেন। কিন্তু বাজেট বাস্তবায়নের সময় বাস্তবতার মিল কেমন বা কতদূর তা দেখার কোনো ব্যবস্থা নেই।
২০১৯-২০-এর প্রস্তাবিত ব্যয়ের বাজেট গতবারের মূল বাজেটের তুলনায় ২৬ শতাংশ এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে প্রাক্কলিত হওয়ায় অর্থায়নে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাঁধে ৩৭-৩৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা চাপানো হয়েছে, যা অর্জন কঠিনতর হবে। অথচ সরকারি সংস্থাগুলো থেকে আয় বা রাজস্ব যদি ন্যায্য পরিমাণে পাওয়া যেত, সংস্থাগুলোর কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেরও ন্যায্য পাওনাগুলো প্রাপ্তির ব্যবস্থা বা নির্দেশনা থাকত তাহলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে জনগণের কাছ থেকে বর্ধিত কর রাজস্বের জন্য চাপ এতটা পড়ত না। অর্থাৎ সরকারি সংস্থাগুলোর অপারগতা, অদক্ষতা, ব্যর্থতার দায়ভাগ এনবিআরের মাধ্যমে জনগণের ওপর চাপত না। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ৪৮টি সংস্থার মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি লোকসানে রয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। সর্বাধিক ভর্তুকি নিচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। মুনাফা অর্জন ও সরকারকে লভ্যাংশ প্রদানে এগিয়ে আছে এক সময়ের শীর্ষ লোকসানি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিপিডিবি লোকসান দিয়েই চলছে। একই সময়ে সরকারের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ভর্তুকি নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সরকারের বার্ষিক প্রতিবেদন ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৮’-তে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম। বিপিসিও রয়েছে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের ধারায়। অন্যদিকে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। সে জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে স্থানীয় বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ‘অ্যাডজাস্ট’ (সমন্বয়) করা হলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ভোক্তাস্বার্থ ও শিল্প খাতের ওপর। অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী ৩১টি সংস্থা কমবেশি নিট মুনাফা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। লোকসান দিয়েছে ১৪টি সংস্থা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১১টি। সার্বিকভাবে এ খাতে নিট মুনাফা হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ১০ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার চেয়ে ৪ হাজার ২৭২ কোটি টাকা কম। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ গত বছরে ৬১৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করলেও এবার তা কমে ৮৬ কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী সরকার চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে অনুদান বা ভর্তুকি মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা দিয়েছে। আগের বছরে ১১টি প্রতিষ্ঠানকে অনুদান বা ভর্তুকি বাবদ দেয়া হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। এবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রায় ৪১২ কোটি টাকা নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ।
খেলাপি ঋণ, সংস্থান ও মূলধন ঘাটতি, মুনাফা বৃদ্ধির প্রতিযোগিতার কারণে ঋণ ব্যবস্থাপনায় আপস এবং সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন অন্তরায় দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে একটা নাজুক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এই খাতটিকে শক্ত ভিত্তির ওপর তুলে আনতে না পারলে যাবতীয় অর্থনৈতিক অর্জন হুমকির মুখে পড়বে। ঋণখেলাপি সংস্কৃতির প্রধান নিয়ামকগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অধঃগতি। খেলাপি ঋণের পরিমাণ নির্ধারণের সময় সব সময় অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ বিস্মৃত থাকা হয়, যদিও আদায় দুরূহ খেলাপি বলেই ঋণ অবলোপন করা হয়। খেলাপি ঋণের সঙ্গে যদি এ যাবৎ যা অবলোপন করা হয়েছে কিংবা যা ব্লক করে রাখা হয়েছে তার হিসাব যুক্ত করা হয় তাহলে দেশের প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এ পরিস্থিতি সংঘটিত লোপাটের কোনো প্রতিকার, প্রতিবিধানের ব্যবস্থা না নিয়ে পুনঃতহবিল বরাদ্দ কিংবা ছাড় দেয়ার উপায় বাতলানো মূলত বিরূপ সমালোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এবং এ পরিস্থিতিতে কালো টাকা সাদাকরণের উপায়কে অনির্দিষ্টকালের জন্য অধিকতর উদারীকরণ নীতি ও নৈতিকতা আরো বেশি প্রশ্নবোধক হয়ে প্রতিবিধান প্রতিরোধকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এটা অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য যে, নানা উদ্বেগের মধ্যেও চলতি বছর বাংলাদেশে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে কৃষি ও সেবা খাত চাঙ্গা থাকার কারণে। সেই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও শিল্প উৎপাদনের পরিস্থিতিও ভালোর পথে আছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস শক্ত অবস্থানেই থাকছে। বাজেট বয়ানের সঙ্গে বাস্তবতার, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দূরত্ব যত কমে আসবে ততই টেকসই উন্নয়ন হবে অর্থবহ।
কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি কমছে। আর্থিক খাত বিপর্যয়ের এক দশক চলছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়লেও বেসরকারি বিনিয়োগের হার স্থবির, বাড়ছে না কর্মসংস্থান। রাজস্ব আদায়ে দেখা দিচ্ছে বড় ঘাটতি। মূলত আয়ে ঘাটতি অথচ ব্যয়ের ও প্রতিশ্রুতির তালিকা লম্বা। আছে বড় প্রকল্প শেষ করার তাগিদ। দিতে হয়েছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় আলাদা নজর। আছে নতুন সাংসদের অবকাঠামো নির্মাণের, এমপিওভুক্তিকরণের অসংখ্য চিঠি। প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়া ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশাও অনেক। তাদের চাওয়া নানা ধরনের কর ছাড় বা নগদ সহায়তার প্রস্তাব করতে হয়েছে। দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে/যাবে না ফিরে- রবীন্দ্রনাথের এই বাণী নেপথ্যে বেজেই চলেছে। কিন্তু কম আয় আর বেশি ব্যয়ের বাজেটে অনেককেই হয়তো খালি হাতে ফিরতে হবে। আর তাই ‘দিবে আর নিবে’র মধ্যে সমন্বয় করাটাই হবে প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে গিয়ে নতুন অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের হয়তো মনে পড়বে- ‘ফরাসি লেখক আন্দ্রে মালরোকে একবার সাফল্যের কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। উত্তরে তিনি বলেছিলেন যে সাফল্যের কারণ তিনি জানেন না, তবে এ সত্য অবশ্যই জানেন যে সবাইকে খুশি করতে গেলে ব্যর্থ হতে হয়।’ তাই শেষ পর্যন্ত কঠিন কোনো পথে হাঁটার পরিবর্তে লক্ষ্যের দিক থেকে প্রস্তাবিত বাজেটটিকে হতেই হয়েছে গত ১০ বছরের ধারাবাহিকতা এবং বাস্তবায়নের দিক থেকে একটি গতানুগতিক বাজেট।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : অর্থনীতিবিদ ও সরকারের সাবেক সচিব।