গৃহীত উদ্যোগ ও সুপারিশমালার বাস্তবায়ন করুন

আগের সংবাদ

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মানবসম্পদ তৈরির বাজেট

পরের সংবাদ

বাজেটে রাজস্ব আহরণ ও শিক্ষা ভাবনা

অধ্যাপক ড. প্রিয়ব্রত পাল

অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ১৫, ২০১৯ , ৮:৫৫ অপরাহ্ণ

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ ও সময় উপযোগী করার চেষ্টা করতে হবে। নতুবা উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে যাবে। শুধু মাথাপিছু আয় বাড়লেও উন্নত স্তরে যাওয়া যায় না। স্বভাবগত পরিবর্তন একান্ত জরুরি। আমাদের দেশের ডাক্তাররা বেশ অভিজ্ঞ। কিন্তু তারপরও কেন প্রতি মাসে লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রতিবেশী দেশ ভারতে, সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা করাতে চায়?

অর্থ বছরের বাজেট বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে পেশ করেন। ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ, সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’- এই স্লোগান সামনে রেখে জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রস্তাব করেছেন ৩ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। যেখানে ঘাটতির পরিমাণ হবে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা, যা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণ খাত থেকে পরিশোধ করা হবে। বিদেশ থেকে ঋণ কাক্সিক্ষত মাত্রায় না পাওয়ার কারণে ব্যাংক খাত থেকে প্রাক্কলিত ঋণ ৪৭ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন পড়বে। যা অভ্যন্তরীণ ব্যবসা খাতে ঋণাত্মক প্রভাব ফেলবে। ব্যাংকের তারল্য সংকটের মাত্রা বেড়ে যাবে, যা ব্যাংক ব্যবস্থার জন্য মোটেও সুখকর নয়।

রাজহাঁস থেকে পালক ওঠাও যতটা সম্ভব ততটা, তবে সাবধান রাজহাঁসটি যেন কোনোভাবেই ব্যথা না পায়- ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের অর্থমন্ত্রী জাঁ ব্যাপটিস্ট কোলবার্টের এই বিখ্যাত উক্তি উচ্চারণ করলেন আমাদের অর্থমন্ত্রী এবং এই নীতি অনুসরণ করেই এক কোটি লোককে করজালের আওতায় আনার ঘোষণা দেন। প্রকৃতপক্ষে ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী করজাল বৃদ্ধির চেয়ে করারোপের মাত্রা এবং হয়রানির কথা বলেছেন। অথচ আমাদের দেশে প্রকৃত করে এর অবদান উন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম। উন্নত দেশের এক-তৃতীয়াংশের মতো। এখানে আবার ভিত্তি হিসেবে জিডিপির পরিমাণ বিবেচনায় নিলে আরো শোচনীয় অবস্থা। কারণ তাদের জিডিপি আমাদের দেশের ৬-৭ গুণ বেশি। অর্থাৎ কী পরিমাণ ওই দেশের জনগণ প্রত্যক্ষ কর দেয় তা বিবেচনার বিষয়।

প্রথমত আমাদের ২০ থেকে ২২ লাখের মতো উপার্জনকারী প্রত্যক্ষ কর দেয়। কর দানকারীর সংখ্যা আমাদের দেশে বাড়ানো সম্ভব। তবে তার আগে রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন কর অঞ্চলের দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে। সামান্য ২২ লাখ লোকের কর আদায় করতে দুর্নীতি বন্ধ করতে পারছি না। অতীতের মিটার রিডারের মতো পরিদর্শকদের দুর্নীতি চরম পর্যায়ে বিদ্যমান। বিত্তশালী ব্যক্তিদের ঘুষের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা গোপন করা স্বাভাবিক ব্যাপার। তাই করজাল বাড়ালে ঘুষের পরিমাণ এবং তাদের আয় কমবে। অন্যদিকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অবকাঠামো তৈরির কাজে দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করতে পারলে বিশেষ করে শিক্ষা খাতে, শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে। উপযুক্ত অবকাঠামোর অভাবে নিয়মিত ক্লাস প্র্যাকটিক্যাল থেকে শুরু করে ল্যাবরেটরির কাজও ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। আমাদের দেশে উচ্চ শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের ঘাটতি নেই এবং উপযুক্ত কর্ম পরিবেশের অভাবে তারা বিদেশে চলে যাচ্ছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। অধিকন্তু আমাদের এখানেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। এখানে অর্থমন্ত্রীর জাপানের উদাহরণ টেনে শিক্ষক আমদানির বক্তব্যটি অনাকাক্সিক্ষত। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন সিলেবাসে ইংরেজি, বাংলা ও মাদ্রাসা শিক্ষার ত্রুটিগুলো অর্থমন্ত্রী উপলব্ধি করতে পারেননি। এ ধরনের সমস্যা আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বুঝতে পারি। অভিভাবক হিসেবে আমাদের কষ্ট হয়। শিক্ষিত বেকার যুবকের মূল সমস্যা উপলব্ধি করা দরকার।

যারা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি, এইচএসসি ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন বিষয়ে মাস্টার্স শেষ করেন তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ বিষয়ে অবদান রাখতে চান এবং এসব ছাত্রছাত্রীর পেছনে সরকারের লাখ লাখ টাকা খরচ হয় ল্যাব, কেমিক্যাল ইত্যাদি কারণে। অথচ তারা বাধ্য হয়ে পুলিশে বা বিসিএস দিয়ে প্রশাসনে যোগদানের চেষ্টা করেন। যেখানে অতীতের শিক্ষণীয় বিষয়ের কোনো ভূমিকা থাকে না। আবার অনেকে ৩-৪ বছর ধরে চেষ্টায় আছেন নিজের পছন্দের কাছাকাছি চাকরি পেতে। উদাহরণস্বরূপ কেমিস্ট, বায়োকেমিস্ট, ফার্মাসিস্ট ইত্যাদি বিজ্ঞানবিষয়ক মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা হতাশায় ভুগছে। তাদের জন্য কীভাবে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায় তা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রসঙ্গত বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশে স্কলারশিপের মাধ্যমে অনেক ছাত্রছাত্রী পাঠিয়েছিলেন, যারা বর্তমানে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তদ্রƒপ বর্তমানে কিছু বন্ধু দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে এমএস, পিএইচডি স্কলারশিপের মাধ্যমে বিদেশে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারলে দেশে শিক্ষিত বেকার সমস্যাও কমে যাবে, তারা ওইসব দেশে নিজেদের যোগ্যতায় কর্মসংস্থান করে নিতে পারবে। অন্যদিকে দেশে বিদ্যমান চাহিদা অনুযায়ী বা প্রয়োজন অনুসারে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার করুণ কাহিনী আমরা প্রতিনিয়ত টেলিভিশনে দেখতে পাচ্ছি।

অতএব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ ও সময় উপযোগী করার চেষ্টা করতে হবে। নতুবা উন্নত দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে যাবে। শুধু মাথাপিছু আয় বাড়লেও উন্নত স্তরে যাওয়া যায় না। স্বভাবগত পরিবর্তন একান্ত জরুরি। আমাদের দেশের ডাক্তাররা বেশ অভিজ্ঞ। কিন্তু তারপরও কেন প্রতি মাসে লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রতিবেশী দেশ ভারতে, সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা করাতে চায়? রাত বারোটা, একটা, দুইটা পর্যন্ত চেম্বারে রোগী দেখার রেকর্ড পৃথিবীর কোথাও আছে কিনা জানি না। যদি সত্যিকারের সেবার দৃষ্টিতে রোগীদের সময় দিয়ে তাদের সমস্যা শুনে-বুঝে চিকিৎসা দিতেন, আমার বিশ্বাস অনেক রোগী সুস্থ হয়ে যেতেন। কিন্তু সবাই না হলেও অনেকে আর্থিক বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেন।

দেশকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রা কীভাবে, কী কারণে বাইরে চলে যাচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বিদেশে টাকা পাচার রোধ সর্বোপরি দুর্নীতি রোধের জন্য আমি মনে করি প্রতিটি সেক্টরে যেমন রাজস্ব আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাজস্ব বোর্ডের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত পরীক্ষিত ৫ জন ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তারা অতীতের অভিজ্ঞতা ও সততার কারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন। এভাবে পুলিশ বিভাগে, বিচার বিভাগে, শিক্ষাসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিভাগে মনিটরিং সেল গঠন করলে দুর্নীতিসহ নানা অনিয়ম চিহ্নিত করতে পারবেন এবং প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে। তাহলে আমাদের কর ফাঁকি রোধসহ নানাবিধ অনিয়ম রোধ করে দেশের রাজস্ব আহরণের মাত্রা শতকরা ৪০ ভাগ বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে এবং বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে।

অধ্যাপক ড. প্রিয়ব্রত পাল : অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।