চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ জরুরি

আগের সংবাদ

বাজেটে চমক নেই তবে কিছু বিষয়ের প্রশংসা নিশ্চয়ই হবে

পরের সংবাদ

তামাকের ওপর করারোপ বাড়িয়ে রোধ কি সম্ভব হচ্ছে?

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ১৪, ২০১৯ , ৮:৩৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ১৪, ২০১৯, ৮:৪৩ অপরাহ্ণ

স্বপ্না রেজা

কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

তামাকের ওপর করারোপ বাড়িয়ে তামাক ব্যবহার রোধ করা কিঞ্চিত সম্ভব হলেও তামাক চাষ রোধ করা যাবে না। আগে তামাক চাষ রোধ করতে হবে। উচ্চবিত্তরা বিদেশি ব্র্যান্ডের তামাক ব্যবহার করেন। সেখানে বেশি কর আরোপ করে রাজস্ব আয়ের চিন্তার চেয়ে তামাক আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা উত্তম। তাহলেই সম্ভবত বাংলাদেশ তামাকমুক্ত হবে।

প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক খরচের একটি মোটা অঙ্কের অর্থের জোগান হয় এই রাজস্ব আদায় থেকে। সরকার তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এই জোগান সচল রাখতে রাজস্ব আদায়ের মাত্রা প্রতি বছর বাড়িয়ে দেয়। অনেক কিছুর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রাজস্ব আয়ের মাত্রা বাড়াতে হয়। উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত কিংবা উন্নয়নকে আরো সম্প্রসারিত করার বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট থাকে। এমনই অভিব্যক্তি প্রকাশ করে এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়। নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগের জন্য প্রবল অসন্তোষ, অক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জনগণ সেই-ই আরোপিত বাড়িয়ে দেয়া কর মেনে নিতে বাধ্য হন এবং পরিশোধ করেন নিয়মিত বাধ্যতামূলক। কারণ কর প্রদান না করলে প্রচলিত আইনে শাস্তির বিধানও আছে। হয়রানির আশঙ্কা আছে।

মানসম্মান খোয়া যাওয়ার ভয় থাকে। কর প্রদানের সনদপত্র না থাকলে রাষ্ট্রের যাবতীয় সুবিধা থেকে কঠোরভাবে বঞ্চনার ইঙ্গিত থাকে। যতদূর জানা যায় যে, সাধারণ জনগণ মানসম্মান রক্ষার তাগাদায়, ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগের জন্য কর পরিশোধে বেশি তৎপর থাকেন। কষ্টসাধ্য হলেও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ তার সীমিত আয়ের ওপর নির্ধারিত কর পরিশোধ করে থাকেন।

যদিও ধনসম্পত্তির আলোকে দেশের সর্বোচ্চ করদাতাকে পুরস্কৃত করা হয়, সেই তথ্য রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দেয়া হয়। কিন্তু সেই তুলনায় স্বল্প আয়ে যেই ব্যক্তি নিয়মিত কর পরিশোধ করছেন, তাকে পুরস্কৃত করার, তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার মানসিকতা রাষ্ট্রের থাকে না। যাই হোক, জনগণই রাষ্ট্রের অর্থ তহবিলের অন্যতম দাতা। সেই জনগণই যদি স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে ঝুঁকিতে থাকেন, নিরাপদ না থাকেন, তাহলে তার কর্মক্ষমতা, কর্মযোগ্যতা, উপযোগিতা থাকে কী করে? থাকার তো কথা নয়। আবার স্বাস্থ্যগত অসুস্থতা, অনিরাপত্তার কারণে কাজ করতে না পারায় আশানুরূপ রাজস্ব আদায় করার বিষয়টিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এই হিসেবে রাজস্ব আদায়ের জন্য সুস্বাস্থ্যের জনগণই আগে। অর্থাৎ সোজা হিসাব, আগে জনগণের সুস্থতা, তারপর রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি। আগে শেকড়, তারপর ফল। তাই নয় নাকি?

বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উদযাপিত হলো। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকারের তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ২২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। আর তামাক ব্যবহারের কারণে জনগণের চিকিৎসা ব্যয় ও উৎপাদনশীলতা কমে সরকারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ জনগণের স্বাস্থ্যের ক্ষতি ও তার চিকিৎসা ব্যয়, রাজস্ব আয়ের চেয়ে বেশি। কী লাভ হলো তাহলে ক্ষতি দিয়ে রাজস্ব আয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার? আবার এই বাস্তবতায় তামাক ব্যবহারে জনগণকে নিরুৎসাহিত করার জন্য সচেতন অনেকেই মনে করেন যে, অর্থবছরের বাজেটে তামাকের ওপর কর আদায় ও তামাকের দাম বাড়িয়ে দেয়া প্রসঙ্গিক। এতে তামাক ব্যবহারে জনগণের আগ্রহ কমবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে গবেষণার ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ। যার মধ্যে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৪৮ শতাংশ তামাক ব্যবহার করেন। যেখানে অতি উচ্চবিত্তের মধ্যে এ হার ২৪.৮ শতাংশ। মূলত গ্রামে তামাকের ব্যবহার বেশি। বেশি তামাক ব্যবহারের জায়গাটিতে কিন্তু জনগণের চিকিৎসার সুবন্দোবস্ত, আর্থিক সামর্থ্য যেমন নেই, তেমন নেই কর প্রদানের সক্ষমতা। এই জায়গাটিতে কিন্তু রাজস্ব আয়ের চিন্তা দিয়ে তামাক ব্যবহারে মানুষকে নিরুৎসাহিত করা যাবে না। কারণ অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠী মূল্যবান তামাক গ্রহণ করেন না। এরা শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশের যেসব অঞ্চলে তামাক চাষ হচ্ছে, সেই সব অঞ্চলের তামাক চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত জনগোষ্ঠী। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধরা তামাক ব্যবহার করে থাকেন। মারাত্মক রকম পরিবেশ দূষণ হয়। পরিবেশ দূষণ ও তামাক ব্যবহারের কারণে নানা ধরনের মরণমুখী শারীরিক অসুস্থতায় তারা আক্রান্ত হন। ওইসব এলাকায় শিশুদের স্কুলগামিতা নেই। শিশুরাও পরিবারের বড়দের সঙ্গে এই পেশায় যুক্ত হন।

১২ মে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন কর্তৃক ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস ২০১৯’ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান ছিল। পিকেএসএফের পর্ষদ চেয়ারম্যান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. খলীকুজ্জমান আহমদের সভাপতিত্বে এই আয়োজিত অনুষ্ঠানে একটি তথ্য প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে, তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণে বিকল্প আয়বর্ধনমূলক ফসল উৎপাদন সম্ভব। যা থেকে পেশার পরিবর্তন ঘটিয়ে ক্ষতির হাত থেকে একাধারে তামাক চাষে সংশ্লিষ্টদের, তামাক ব্যবহারীদের এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রকে রক্ষা করা সম্ভব।

ইতোমধ্যে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন সেই কাজটি করছে তার সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে। তামাক চাষ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন এমন ক’জন কৃষকও তাদের অভিজ্ঞতার কথা বললেন। আগে তারা তামাক চাষ করতেন। তার পর শুরু করেছেন ভুট্টার চাষ। তাদের উপলব্ধি ও প্রচেষ্টা বলে দেয় যে, ক্ষতিকর পেশার পরিবর্তন করে নিজেকে রক্ষা করা যায়, পরিবেশ রক্ষা করা যায় এবং রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা যায়। কিন্তু অনুষ্ঠানের এসব আলোকপাতের মধ্যে প্রধান অতিথি হিসেবে আসন গ্রহণকারী কৃষিমন্ত্রীর তামাক পণ্যে সরকারের রাজস্ব আয়ের চেয়ে জনগণের ক্ষতির পরিমাণ বেশি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে, সরকারের ক্রমবর্ধমান বাজেট প্রসঙ্গ টেনে তামাক পণ্যে রাজস্ব আয়ের ওপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করলেন।

বর্তমানে তামাকপণ্য থেকে যে রাজস্ব আদায় হয় অতীতে সেই পরিমাণ অর্থই নাকি মূল বাজেটের সমপরিমাণ। কৃষিমন্ত্রীর কথাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, তিনি রাজস্ব আয়কে ছোট করে দেখতে চাইছেন না। বরং তিনি হয়তো মনে করছেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য, যাবতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ক্ষতিকর এই রাজস্ব আয় দরকার। অত্যন্ত হতাশ বলছি, মানতে পারছি না। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসম্মত ফসল আবাদ করে একটি দেশের স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করা সম্ভব, এটা বিশ্বাস করতে হবে। প্রয়োজন শুধু উন্নত চিন্তা-চেতনার।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সবাই মিলে চেষ্টা করলে ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রীর এই স্বপ্নকে পূরণ করতে হলে প্রথমেই তার সরকারের প্রতিটি সদস্যকে এই বিষয়টি আত্মস্থ করতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে যে, ২০৪০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করা সম্ভব। আর এই বিশ্বাসই তাদের প্রকৃত উন্নয়ন চেতনার দিকে ধাবিত করতে পারে। যাতে তারা বুঝতে সক্ষম হন যে, জাতির জন্য ক্ষতিটা আসলে কিসে হয়। কারণ বিবিএসের তথ্যমতে বাংলাদেশে ২০০৬ সালে ৭৮ হাজার একর জমিতে ৪৩ হাজার টন তামাক উৎপাদন হয়েছিল। যেই চিত্র ২০১৭ এসে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ২৯৭ একর জমিতে ৯১ হাজার ৫৭৩ টন তামাক উৎপাদন।

এই অবস্থা কি বলে দেয় যে, ২০৪০ সালের মধ্যে দেশটিকে তামাকমুক্ত করা সম্ভব? ব্যাপকভাবে বিকল্প আয়বর্ধনমূলক ফসল চাষে কৃষকদের সম্পৃক্ত করতে না পারলে, তা আদতেই সম্ভব নয়। তামাকের ওপর করারোপ বাড়িয়ে তামাক ব্যবহার রোধ করা কিঞ্চিত সম্ভব হলেও, তামাক চাষ রোধ করা যাবে না। আগে তামাক চাষ রোধ করতে হবে। উচ্চবিত্তরা বিদেশি ব্র্যান্ডের তামাক ব্যবহার করেন। সেখানে বেশি কর আরোপ করে রাজস্ব আয়ের চিন্তার চেয়ে তামাক আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা উত্তম। তাহলেই সম্ভবত বাংলাদেশ তামাকমুক্ত হবে।

স্বপ্না রেজা: কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক।