স্পিনারদেরও দায়িত্ব নিতে হবে

আগের সংবাদ

আজও আতঙ্কে আঁতকে ওঠেন রাঙ্গামাটির মানুষ

পরের সংবাদ

মমতার গদি নড়বড়ে!

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ১৩, ২০১৯ , ১২:৩১ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ১৩, ২০১৯, ১২:৩১ অপরাহ্ণ

Avatar

সুদীর্ঘ ৩৪ বছরের রাজনৈতিক জীবনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নানা প্রতিক‚লতার মধ্য দিয়ে গেলেও, এমন গাড্ডায় আগে পড়েছেন কিনা সন্দেহ। একে তো সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি হই হই করে রাজ্যের ৪২টির মধ্যে ১৮টি আসন দখল করেছে। তার ওপর দ্বিতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এসে দিল্লির নরেন্দ্র মোদি সরকার দিদির ক্ষমতার গোড়া ধরে টান মেরেছে। সরকার ২০২১ অবধি থাকে কিনা সন্দেহ।
রবিবার বিকেল বিকেল, রাজ্যের মন্ত্রী, আমলারা সোফায় গা-এলিয়ে ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ দেখার তোড়জোড় করছেন, এমন সময়ে দিল্লির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহয়ের দপ্তর থেকে পত্রবোমা। সংবিধানের বিশেষ ধারা মতে, ভারত সরকার জানাচ্ছে যে, রাজ্যে ভোট-পরবর্তী হিংসার ঘটনায় তারা বিশেষ উদ্বিগ্ন। কারণ ঘটনার রকমসকম দেখে মনে হচ্ছে যে, রাজ্য তার সাংবিধানিক দায়িত্ব আইনের শাসন বজায় রাখতে ব্যর্থ। ভারত সরকার জানাচ্ছে যে, এই মুহূর্তেই যেন কড়া ব্যবস্থা নেয়া হয়।
সরকারি মতে এটাকে বলা হয় উপদেশ। কিন্তু উপদেশের ভাষা দেখলে বোঝা যাবে, এটা নির্দেশ বা সাবধানবাণী। স্বাভাবিকভাবেই মমতা ব্যানার্জি রেগে আগুন হয়েছেন। সারাজীবন তিনি অন্যকে ধমকেছেন, ধমক খেতে অভ্যস্ত নন। তা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের রক্তগঙ্গা বওয়াটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে দল সরকারে থাকে সে বিরোধীকে দাবিয়ে রাখতে চায়। ভোটের হিসাবে গরমিল হলে, যেমন এবার হয়েছে, শয়ে-শয়ে লাশ পড়াটাই এখানে নিয়ম, যাতে শিক্ষা দেয়া যায়। মমতার তৃণমূল কংগ্রেস তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এই যা। পঞ্চায়েত ভোটে বহু জায়গায় বিরোধীরা প্রার্থী দিতে পারেনি। আর ভোটের পর শ’খানেক লাশ পড়েছে।
অতীতের দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকাররা এসব অন্যায় চেয়ে চেয়ে দেখেছে। মমতা বোধহয় ভেবেছিলেন এবারো তাই হবে। আর সেখানেই গণ্ডগোল। আগের থেকে আরো বেশি ভোট পেয়ে ক্ষমতায় আসার পর মোদি-শাহ জুটি হাত গুটিয়ে বসে থাকতে রাজি নন। ফলে শেষমেশ রাজ্যের পক্ষ থেকে সরকারি সিলমোহর দিয়ে যে উত্তর গেছে তাতে ধানাই-পানাই করে বলা হয়েছে যে, হিংসার ঘটনাগুলো বিক্ষিপ্ত ও সমাজবিরোধীদের কাজ। সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে।
নমনীয় না হয়ে উপায় ছিল না। কারণ ভাষায় স্পষ্ট, না মানলে দিল্লি থেকে আরো কড়া চিঠি আসবে। আর এ রকম বেশ কিছু চিঠি ফাইলবন্দি হলে, সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারেন। আইন মোতাবেক যথেষ্ট কারণ থাকলে, সরকার নিজের ক্ষমতাবলে রাজ্যে দুমাসের রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারেন। তার বেশি করতে গেলে সংসদের দুকক্ষের অনুমোদন চাই। এদিকে রাজ্যসভায় মোদি সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। এর মানে হলো, শুধু দুমাসের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে দিল্লির বিজেপি সরকার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করবে না। ওদের লক্ষ্য আরো বড়।
আসলে লোকসভা ভোটের পরে মমতা এখন চক্রব্যুহে বন্দি। লোকসভা ভোটের পর গত তিন সপ্তায় তার দল থেকে তৃণমূল স্তরের কর্মীরা গণহারে বিজেপিতে যোগ দিয়েছে। যত দিন যাচ্ছে তৃণমূল ততই ফাঁকা হচ্ছে। অবস্থা এমন যে, আরেকবার লোকসভা ভোট হলে মমতা হয়তো অর্ধেক আসন পাবেন না। এর কারণ হলো, মমতা ব্যানার্জির জনপ্রিয়তায় ভাটা। সাত বছর ক্ষমতায় থেকেই তৃণমূল বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের থেকে বেশি দুর্নাম কুড়িয়েছে। গণহারে দুর্নীতি এর একটা প্রধান কারণ। পার্টির দাদাদের ভাগ না দিয়ে গ্রামগঞ্জে কোনো কাজ হওয়াই মুশকিল। এ ছাড়া আছে ‘সংখ্যালঘু’ তোষণের অভিযোগ।
জনপ্রিয়তা গেলে রাজনীতিবিদদের আর থাকেটা কী? মমতারও নেই। কিন্তু প্রশাসন এখনো তার হাতেই। আর পশ্চিমবঙ্গের এতদিনের ধারা মেনেই উনি ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাবেন সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাতে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে দল ছাড়ার হিড়িক। তৃণমূল স্তরের কর্মীরা তো যাচ্ছেই, এবার নাকি মাঝারি আর বড়দের পালা। না গিয়ে উপায় নেই, লোকসভা ভোটের হিসাবে সব হেরে ভূত। তা ছাড়া কর্মী না থাকলে কাদের নিয়ে দল করবেন।
এরা সবাই বিজেপিতে যাবে কিনা এখনো পরিষ্কার নয়। বরং বলা ভালো, বিজেপি নেবে কিনা জানা নেই। না গিয়ে আলাদা দল করতে পারেন। আর কিছু না করলে, বিধানসভায় সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন। বিজেপিতে যোগ না দিলেও বন্ধু হতে তো বাধা নেই। রাজনীতিতে কত কিছুই তো হয়।
এ রকম অনেক কিছুই বোধহয় পশ্চিমবঙ্গে ঘটতে চলেছে। বিজেপি পেছনের দরজা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসতে রাজি নয়। তাতে মমতা ভোটারের সমবেদনা পেয়ে যেতে পারেন। কিন্তু মমতা দল ও সরকার ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন, আর ভোট এগিয়ে এসেছে, এমনটা হতেই পারে।
বিজেপি মনে করে পশ্চিমবঙ্গের লোকে ভোট দিতে পারলে আগামী নির্বাচনে সে ক্ষমতায় আসছেই। আর তাই যদি হয় তাহলে বিজেপির লক্ষ্য সীমিত নির্বাচনের সময়ে প্রশাসন যেন মমতার হাতে না থাকে। অর্থাৎ যদি রাষ্ট্রপতি শাসন হয়, তাহলে তখন ভোটও হবে। হাওয়ার গন্ধ বলছে ভোটটা বোধহয় ২০২১ সালের আগেই হবে।

(লেখক ভারতীয় সাংবাদিক)