যুদ্ধাপরাধ মামলার আপিল শুনানি কবে?

আগের সংবাদ

ভারতের লোকসভা নির্বাচন ও একটি পর্যালোচনা

পরের সংবাদ

ধর্মের ব্যবহার কি ক্ষমতার জন্য

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৯, ২০১৯ , ১০:৫৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৯, ২০১৯, ১০:৫৫ অপরাহ্ণ

অনলাইন প্রতিবেদক

রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবহারের কারণে দারিদ্র্য কমছে না বরং দরিদ্র মানুষকে শোষণ করা হচ্ছে ধর্মীয় বেড়াজালে আবদ্ধ করে। রাষ্ট্র শাসকরা ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে নিজেদের ভাগ্য পাল্টাচ্ছেন আর কৌশলে জনগণকে রাখছেন ধর্মীয় চেতনায় মাতোয়ারা। সাধারণ মানুষ রাষ্ট্র শাসকদের বেঁধে দেয়া ধর্মীয় চেতনার বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে পারছে না মনস্তাত্ত্বিক কারণে।
ধর্মীয় মোড়কে শোষণটা বন্ধ হয়নি।

সারা পৃথিবীর রাজনীতিতে ধর্ম এখন বড় ফ্যাক্টর। দুনিয়াজুড়ে রাজনীতির প্রচ্ছদ যে ধর্মীয় মোড়কে আচ্ছাদন করা হচ্ছে তাতে কি ধর্মের উৎকর্ষতা সাধিত হবে, নাকি ধর্মকে রাজনীতির রণকৌশলের বর্ম বানিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ পরিষ্কার করাটাই মুখ্য হয়ে যাবে? আর এই কারণে ধর্মীয় মূল আর্দশটাই বিচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি পরিষ্কার যে, ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় যাওয়াটাই এখন মুখ্য বিষয়। ধর্মীয় বিষয়গুলো অনুশীলন এখানে অনেকটা গৌণ। ধর্মের ব্যবহার শুধু রাজনীতিবিদরাই করে ক্ষান্ত নন, পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখতে ব্যবসায়ীরাও ধর্মকে পণ্য বিক্রির জন্য ব্যবহার করছে। ব্যবসা-বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই রাজনীতির মতো ধর্মের ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে। ধর্মের ব্যবহারের মাধ্যমে অনুশীলন করা রাজনীতি সমাজে কোনো প্রকার শান্তি আনতে পারে না এটা সবারই জানা, কারণ প্রত্যেক ধর্মানুসারীরাই নিজের ধর্মটাকে বড় মনে করে। এই মনে করাতেই সৃষ্টি হয় সংঘাতের। আর এ ধরনের রাজনীতির কারণে সাধারণ মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ভারতের সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বড় অনুঘটকের কাজ করেছে ধর্ম। জুশনে মোহাম্মাদ নামে ইসলাম ধর্মের একটি জঙ্গি সংগঠন এবারের ভারতের নির্বাচনে বিজয়ী মোদির পালে হাওয়া জুগিয়েছে। সংগঠনটির নেতা আজহার মাসুদ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাতময় পরিবেশ সৃষ্টি করেন। এই জঙ্গি ভারত ও পাকিস্তানের চির বৈরী সম্পর্কের আগুনে ঘি ঢালেন। জঙ্গি নেতার ঘি ঢালায় পাকিস্তান-ভারত ঘৃতাগ্নিতে পুড়তে থাকে, যদিও এই অনল তেমন একটা ছড়ায়নি, স্বল্প সময়ের মধ্যেই থেমে যায়। ভারত ও পাকিস্তানের সংঘাত থেমে যাওয়ার পর জঙ্গি নেতা আজহার মাসুদ আশ্রয় নেন চীনে। ভারত রাষ্ট্র সংঘের কাছে দাবি করে চীন যেন আজহার মাসুদকে ভারতে ফেরত দেয়। চীন মাসুদকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। গণচীন সমাজতান্ত্রিক দেশ, দেশটির ক্ষমতায় চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংগঠন। পৃথিবীর কোনো রাজনৈতিক সংগঠনে এত সংখ্যক সদস্য নেই যত সংখ্যক সদস্য চীনের কমিউনিস্ট পার্টিতে রয়েছেন। এমনকি পৃথিবীর অনেক দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য সংখ্যা বেশি। চীনের কমিউনিস্ট পার্টিতে একটা নিয়ম আছে তা হলো কমিউনিস্ট পার্টির কোনো সদস্য প্রকাশ্যে কোনো ধর্মানুসারী হতে পারবেন না। অর্থাৎ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কোনো সদস্য কোনো ধর্মেরই অনুসারী নন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে ধর্মনিরপেক্ষ একটি রাজনৈতিক দলের শাসনাধীন চীনে ধর্মীয় জঙ্গি নেতা আজহার মাসুদ কী করে নিরাপদে ঠাঁই পান? বাস্তব প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায় চীন এই অঞ্চলের ভৌগোলিক রাজনীতিতে স্বীয় আধিপত্য অক্ষুণ্ন রাখতে পাকিস্তানের মতো একটি উগ্র মৌলবাদী রাষ্ট্রকে সহায়তা করে। বর্তমানে এশিয়া অঞ্চলে শিল্প ক্ষেত্রে চীনের পাশাপশি ভারত অগ্রসরমান একটি দেশ। চীনের শাসকরা নিজের বাজারকে সুসংহত রাখতে নানা রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করে থাকেন। তার কারণেই নিজেরা ধর্মনিরপেক্ষ হয়েও জঙ্গি নেতাকে ঠাঁই দিচ্ছেন। সুতরাং সার্বিক প্রেক্ষাপটে ধর্মটা একটি উপকরণ, যা ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের আধিপত্য বজায় রাখছে বিভিন্ন দেশের ক্ষমতাসীনরা বিভিন্ন দেশে দেশে বা নিজ দেশে। আর এ ধরনের নিয়মে রাজনীতিতে ধর্ম ব্যবহারের কারণে দারিদ্র্য কমছে না বরং দরিদ্র মানুষকে শোষণ করা হচ্ছে ধর্মীয় বেড়াজালে আবদ্ধ করে। তাই দরিদ্র মেহনতি মানুষও পাচ্ছে না তার ন্যায্য পাওনা। রাষ্ট্র শাসকরা ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে নিজেদের ভাগ্য পাল্টাচ্ছেন আর কৌশলে জনগণকে রাখছেন ধর্মীয় চেতনায় মাতোয়ারা। সাধারণ মানুষ রাষ্ট্র শাসকদের বেঁধে দেয়া ধর্মীয় চেতনার বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে পারছে না মনস্তাত্ত্বিক কারণে। অন্যদিকে আবার তারা নিজের নায্যটাও বুঝে নিতে পারছেন না শাসকদের কাছ থেকে ধর্মীয় বেড়াজালে মাতোয়ারা হয়ে থাকার কারণে।
সরকার ধর্মীয় খাতে অকাতরে অর্থ ব্যয় করছে। চলতি অর্থবছরে সরকারের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে দুই থেকে তিনটি করে মসজিদ উন্নয়নের জন্য লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে টাইলসসহ সৌন্দর্যবর্ধন এবং নানা সংস্কারের কাজ করেছে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মসজিদ এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। সেইসঙ্গে দেশের হিন্দু ধর্ম পালনকারীদের উপাসনালয় মন্দিরের উন্নয়নের কাজ করছে সরকারের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্যাগোডা, গির্জার উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ হয় সরকারিভাবে। দেশের প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি আরেকটি শিক্ষা ব্যবস্থা সরকারিভাবেই চলছে। তা হলো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা। বাংলাদেশের ইসলাম ধর্ম পালনকারী মানুষের সংখ্যা বেশি। এর পরের স্থানে রয়েছে হিন্দু ধর্ম পালনকারীর সংখ্যা। তারপর অন্য ধর্ম পালনকারীরা। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মসজিদ ও মন্দিরভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য রয়েছে প্রকল্প। বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক। আর প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়টিও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এখানে প্রশ্ন হলো, প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক থাকার পরও কেন মন্দির বা মসজিদভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখার প্রয়োজন? এই প্রকল্পে সরকারিভাবেই অর্থ ব্যয় হচ্ছে। অন্যদিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, প্রতি বছরই কৃষক তার উৎপাদিত ধান সরকারিভাবে বেঁধে দেয়া দামে বিক্রি করতে পারছে না। এই বিক্রি করতে না পারার কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র নেই। সরকার দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় খাদ্য গুদামও স্থাপন করতে পারছে না। এ বছর সরকার নিজে থেকেই ঘোষণা করেছে দেশের খাদ্য গুদামগুলোতে খাদ্য মজুত রাখার মতো স্থান নেই। তাই সব ধান সরকারের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়।
লালসালু উপন্যাসের কোনো এক জায়গায় মসজিদ নির্মাণের বিষয়টিও উঠে এসেছিল, লালসালু উপন্যাসটির প্রেক্ষাপটটা কল্পনার হলেও সেই সময়ের সমাজ ব্যবস্থার একটি প্রতিবিম্ব হিসেবে গণ্য করা যায়। সময়ের পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন কতটা হয়েছে? সবই শক্তির নিত্যতার সূত্রের মতো। এক রূপ থেকে অন্যরূপে রূপান্তর হয়েছে মাত্র। কিন্তু ধর্মীয় মোড়কে শোষণটা বন্ধ হয়নি। বিশ্বের দেশে দেশে রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় থাকার জন্যও মাঝে মাঝে মুঘল স¤্রাট আকবরের মতো সব ধর্মকেও একীভূত করে ফেলার চেষ্টাও করেন। তাই সব ধর্মের নামে চলে নানা গুণগান। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলে গেছেন, মানুষ এনেছে ধর্মগ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ। সুতরাং মানুষের উন্নয়ন বাদ দিয়ে যারা রাজনৈতিক কারণে ধর্মের উন্নয়নের নামে লোক দেখাচ্ছেন তারা প্রকৃতার্থে মানুষের কল্যাণ চান না। তারা ক্ষমতার মোহে বা ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে ধর্মকে নানাভাবে ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় উত্থান ঘটেছে ধর্মীয় রাজনীতির। সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকে বিচ্যুত হওয়ার ফলেই আজকে কৃষকসহ মেহনতি মানুষের দুরবস্থা। তারা মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের সুফল ভোগ করতে পারছে না। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনায় ফিরতে হলে, রাজনীতি থেকে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। আর এটা করতে না পারলে কৃষক ও মেহনতি মানুষের জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন হবে না।

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন : কলাম লেখক।