কুমু আসবে এই শহরে

আগের সংবাদ

পঞ্চাশ বছর পরে

পরের সংবাদ

ভালোবাসার রূপান্তর

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৬, ২০১৯ , ১:০৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ১০, ২০১৯, ৬:১৬ অপরাহ্ণ

এক.
একটানা কয়েকদিন শাহানাকে একাই থাকতে হবে মস্ত বড় বাড়িটিতে। অবশ্য একা বললে একটু ভুলই বলা হয়। বাড়িতে কাজের মানুষ আছে পাঁচ জন। একজন ড্রাইভারও আছে। শাহানার আম্মা আজই ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে গেছেন।
বিদায় জানানোর পরই শাহানা তার আম্মার ঘরে ফিরে এল। কারুকাজ করা বড় দুটি কাঠের আলমারি, বহু পুরনো খাট, ড্রেসিং টেবিল এবং নানান প্রাচীন জিনিসে ঠাসা শাহানার আম্মার ঘর। এই প্রথম তার আম্মা আলমারির চাবিগুলো শাহানাকে দিয়ে গেছেন।
থার্ড ইয়ার ফাইনাল শেষে ইকোনমিক্সের ছাত্রী শাহানা এখন বেশ ক’দিনের জন্য মুক্ত স্বাধীন। আম্মা চেয়েছিলেন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে টুরে যাবেন, কিন্তু মেয়ে রাজি হয়নি। তাঁর ইচ্ছে, নিজেদের বাড়িতেই কয়েকটি দিন আলস্যে আরামে স্বাধীনভাবে কাটাবে শাহানা। শাহানার আম্মা ফারহানা রহমান ফিনাও মেয়ের সঙ্গে জোর-জবরদস্তি করেননি।
শাহানা আম্মার অনুপস্থিতিতে একটি রহস্য উন্মোচন করতে চায়। কিন্তু নানান দ্বিধা শাহানাকে বারবার আটকে দিচ্ছে। শাহানার সামনে দুটি আলমারি। সে জানে তার আম্মার কিছু গোপন সম্পদ এই আলমারি দুটিতে সুরক্ষিত আছে। কোনো অলঙ্কার নয়, বিরল কোনো শাড়ি বা জামাকাপড় নয়, আলমারি দুটিতে এমন কিছু আছে যা একান্তই ফারহানার সম্পদ। বহু বছর ধরে ফারহানা সেই সম্পদ সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আড়াল করে রেখেছেন।
শাহানার মনে আজ অদম্য কৌত‚হল। সে দেখেছে আব্বাও কখনো আম্মার আলমারিতে হাত দেননি। আম্মার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও কখনো তারা আলমারির গোপনীয়তা নিয়ে কথা বলেনি। ফারহানা শুধু তাদের মনে কৌতূহলই তৈরি করেছে, কিন্তু অসতর্ক হয়ে কখনো আলমারি খোলা রাখেননি। কিন্তু আজ সকালে ফারহানা বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে হঠাৎ করে আলমারি দুটির চাবি মেয়ের কাছে রেখে গেছেন। একবারও তিনি বলেননি, সাবধান আলমারিতে হাত দিস না, আমার জিনিস ঘাঁটাঘাঁটি করিস না।
শাহানার আজ বারবারই মনে হচ্ছে, আম্মা কি কিছু বলতে চায়? আম্মা কি চায় তার মেয়ে আলমারি রহস্য ভেদ করুক।
পুরনো চাবির গোছা একেবারেই পছন্দ করে না শাহানা। চাবির গোছার মধ্যে স্বার্থপরতা আর অবিশ্বাসের গন্ধ খুঁজে পায় সে। কিন্তু আম্মা আঘাত পায় এমন কথা সে কখনো বলে না। একগুচ্ছ চাবির মধ্যে দুটি চাবি লম্বা, একই মাপের, একটু ময়লাটে সোনালি রঙের চাবি। শাহানার ডান হাতের তালু ঘামছে। সে কি অন্যায় কিছু করতে যাচ্ছে?
শাহানা কোনোকিছু নিয়ে একটু নার্ভাস হলেই শাহেদকে ফোন করে।
মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে শাহেদের নাম ভাসছে। কল বাটন প্রেস করতে গিয়ে তর্জনী ফিরিয়ে নিল শাহানা। এই ব্যাপারটা শাহেদের সঙ্গে শেয়ার না করাই ভালো।
শাহানা কাঁপা কাঁপা হাতে চাবি ঢুকিয়ে আলমারির তালা খোলার চেষ্টা করছে। একবার দুইবার তিনবার। না খুলছে না। সে বুঝতে পারছে না কীভাবে কোন দিকে চাপ দিলে তালা খুলবে। ডান দিকে চাবি ঘুরিয়ে বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো সে। দুটি চাবি দিয়ে দুটি আলমারির কোনোটিই খুলল না। পুরনো কাজের মানুষ হাবিব চাচাকে ডাকতে গিয়েও আবার আম্মার ঘরে ফিরে এল একা। এখন একবার শেষ চেষ্টা করবে সে। সোনালি রঙের ভারী চাবিটা শক্ত করে ধরে ডান দিকে তিনবার ঘোরাতেই আলমারি খুলে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে ঘরটা পুরনো গন্ধে ভরে উঠল।
শাহানার সামনে চরম কোনো রহস্যের দ্বার খুলে গেল। শাহানার মনে হলো, কোনো অতীত জগতের পুরনো সুবাস তার চোখেমুখে লাগছে। সে অবাক হয়ে হয়ে দেখতে লাগল সেগুন কাঠের ভারী তাকগুলোতে থরে থরে সাজানো সুগন্ধির বোতল, নানান মেটালে তৈরি নানা আকারের আইফেল টাওয়ারের রেপ্লিকা এবং আরও অনেক স্যুভেনির, ওয়ালেট, মেকাপ আর গয়নার বাক্স।
শাহানা আর এগুতে পারছে না। একটু দমে গেল সে। শুধু এইসব জিনিসের জন্য তার আম্মা কি আলমারি দুটির চাবি নিজের কাছেই রেখে দিতেন। তার আম্মা খুব সাধারণ মানুষ নন। নিশ্চয়ই আরো কিছু আছে। একটি আলমারির নিচের তাকগুলোতে নকশীকাঁথা আর ভ্যানিটি বাগ। উপরের তাকগুলোতে শুধুই পারফিউম। আরেকটি আলমারিতে ফ্রান্সের নানান জিনিশ আর ছোট একটি কাঠের বক্স। কাঠের বক্সকে প্রথম দেখাতে বই বলে মনে হয়। শাহানা ভাবছে, এই বক্সে কী আছে?
কাঠের ছোট্ট বক্স নিয়ে শাহানা আম্মার বিছানার উপরে আরাম করে বসে পড়ল। অদ্ভুত সুন্দর বক্স। রহস্যময়। বক্সে কোনো তালা নেই। উপরের অংশটি ঢাকনার মতো। ঢাকনা খুলতেই পুরনো কাগজ খামের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল ঘরের মধ্যে। বক্সের মধ্যে যত্ন করে সাজানো নীল রঙের কিছু খাম। বিদেশি খাম। ফ্রান্সের ডাক টিকেট লাগানো সুন্দর একেকটি খাম।
শাহানার গলা শুকিয়ে আসছে। খামের রঙ আর স্কেচ দেখেই বোঝা যায় সে এখন অজানা এক প্রেমের পুরাতন গন্ধের মুখোমুখি। খামের উপরে লেখা কি আম্মার নাম ফরিদা রহমান রিনা। নাঃ, এ তো খালার চিঠি। রিনা খালার চিঠি আম্মার আলমারিতে কেন! শাহানার মাথা ঘুরে গেল। একটি খামের উপরে ইংরেজি হরফে লেখা Je t’aime—কোনো মানে বোঝা গেল না। শাহানার মনে হলো, ফ্রান্স থেকে আসা ইনভেলাপের উপরে ইংরেজি লেখা থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। এটা নিশ্চয়ই ফরাসি ভাষা। শাহানা মোবাইল ফোনের গুগল ট্রানসেলেটরে গিয়ে ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ চেক করল। Je t’aime মানে ও I love you.. উচ্চারণটাও শুনে নিল শাহানা জো তেম। জো মানে আমি, তেম মানে তোমাকে ভালোবাসি। পুরো কথাটা মানে দাঁড়াচ্ছে আমি তোমাকে ভালোবাসি। ফরাসি ভাষায় ভালোবাসার কথাটা জানতে পেরে শাহানা একটু উষ্ণ হয়ে উঠল। মনে হলো শাহেদকে এক্ষুনি ফোন করে রোমান্টিক গলায় বলে দেবে জো তেম।
শাহানা সিদ্ধান্ত বদলে ফেলল। সে ফোন করল না। কিন্তু মেসেঞ্জারে টেক্সটা লিখে নিল Je t’aime. শাহেদকে সেনড করতে গিয়েও থেমে গেল শাহানা। অনার্স ফাইনালে উঠে যাচ্ছে সে, এখন এসব মানায় তাকে?

দুই.
চার বছর আগে রিনা খালা না ফেরার দেশে চলে গেছেন। কিন্তু খালার চিঠি আম্মার কাছে কেন? খালা ছিলেন ঘরকুনো নারী। তিনি কি ফ্রান্স প্রবাসী কোনো ছেলের সঙ্গে প্রেম করতে পারেন? শাহানা জানে, নানা ছিলেন ভারী গম্ভীর নামকরা মানুষ। ব্যবসা আর আভিজাত্য ছাড়া আর কিছু বুঝতেন না তিনি। তিনি তো আম্মা আর খালাকে নিজে দেখেশুনেই বিয়ে দিয়েছিলেন। পাত্র পছন্দ নিয়ে আম্মার আপত্তি ছিল শুনেছি, কিন্তু খালা তো প্রেম করেননি। তাহলে?
শাহানা একটি খামের ভেতর থেকে চিঠি বের করল। এপিঠ-ওপিঠ মিলিয়ে চার পৃষ্ঠার চিঠি। চিঠির শিরোনামে কোনো নাম নেই, শেষেও কোনো নাম নেই। কে কাকে লিখেছে? খামের উপরের লেখা থেকে বোঝা যায়, রাহাত আহমেদ রাদ প্যারিস থেকে লিখেছেন। প্রাপক ফরিদা রহমান রিনা।

ভেতরে অদ্ভুত এক অনুভূতি খেলা করছে। সে আজ পর্যন্ত হাতের লেখা চিঠি পড়েনি। কেউ তাকে কারণে অকারণে কখনো চিঠি লেখেনি। শাহানা বড় হয়ে দেখেছে অফিসিয়াল চিঠি আসে বাড়িতে। এ ফোর সাইজের কাগজে ছাপানো চিঠি সেসব। ছাপানো চিঠিতে প্রাণ থাকে না। এই প্রথম একটি চিঠিতে হাত রেখে সে প্রাণের ছোঁয়া পেল। মনে হলো, কত যত্নে লেখা একেকটি অক্ষর শব্দ বাক্য। শাহানার মনে হলো, এখন কোনোকিছুতেই কারো কোনো অপেক্ষা নেই। কোনো কিছুতেই কারো কোনো আড়াল নেই। কোনো কিছুই এখন আর প্রকাশ করে ফেলতে কেউ লজ্জা পায় না, সংকোচ করে না।
শাহানার আর দেরি সইছে না। তাকে চিঠিগুলো পড়ে উদ্ধার করতেই হবে, এই চিঠির প্রকৃত প্রাপক কে? খালা নাকি তার আম্মা? চিঠি পড়তে শুরু করে শাহানা।
“আজ আর কোনো সম্বোধন না করে সরাসরি তোমার প্রশ্ন আর উদ্বেগের উত্তর দিয়েই শুরু করছি। বিশ্বাস করা না করা তোমার ব্যাপার। কিন্তু সত্যিটা তোমাকে জানানো আমার দায়িত্ব। তুমি জানতে চেয়েছ আমি কোনো ফরাসি মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকায় কিনা।
কী বলব বলো? আমি কি প্যারিস শহরে চোখ বুজে হাঁটি? আমরা ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পাশাপাশি বসে ক্লাস করি। ইউনিভার্সিটিতে কে ছাত্র কে ছাত্রী এই ভাবনাটাও এক সময় থাকে না। আমাকে তো সব সময়ই ফরাসি মেয়েদের সঙ্গে চলতে-ফিরতে হয়। আমি মেয়েদের দেখি, মেয়েরাও আমাকে দেখে। কিন্তু ওই দেখা পর্যন্তই। কোনো একজন ফরাসি মেয়ের দিকে ভালো করে তাকালেও আমি সেখানে তোমাকেই দেখতে পাই। কিন্তু বুঝতে পারি না, তুমি আসলে কী? তোমার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত আমার সম্পর্কটা কী? তোমার আব্বার ঠিক করা পাত্রটির সঙ্গে দেখা হল? সে দেখতে কেমন? খুব মজা করে কথা বলে? ঘুরতে যাও তার সঙ্গে? নাকি এখনো পাকা কথা হয়নি?”
চিঠির এটুকু পড়ে শাহানার বুঝতে বাকি রইল না, এই চিঠি প্রথম চিঠি নয়। কাঠের বক্সে নিশ্চয়ই প্রথম চিঠিটিও পাওয়া যাবে। সে প্রথম থেকেই চিঠিগুলো পড়তে চায়। চিঠির উপরে লেখা তারিখ দেখে দেখেই সে আবিষ্কার করতে পারবে কোনটি প্রথম আর কোনটি শেষ চিঠি।
শাহানা চিঠির রহস্য থেকে নিজেকে একটু সরিয়ে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। জুলাই মাসের আকাশ। যখন তখন বৃষ্টি হচ্ছে ঢাকায়। বৃষ্টির ছাঁট এসে শাহানাকে ছুঁয়ে দিল। সে ভাবছে, শাহেদ কেমন উদাস ছেলে। সব সময় ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তিত। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আজকের দিনগুলোকেও সে নষ্ট করে ফেলছে।
বৃষ্টি দেখতে শাহানার ভালো লাগে, অথচ শাহেদ বৃষ্টি দেখলেই বিরক্ত হয়। শাহেদ আর শাহানার মধ্যে কত অমিল, তবু ওরা দুজন দুজনকে ভালোবাসে। দুজনে মিলে সুন্দর একটি জীবন গড়তে চায়। শাহেদ রোমান্টিক নয়, কিন্তু মানবিক, দায়িত্ববান। মেয়েরা হয়তো বা শেষমেষ একেকজন দায়িত্ববান পুরুষকেই জীবনসঙ্গী করতে চায়। কিন্তু শাহানা ঠিক বাঁধাধরা নিয়মমানা মেয়ে নয়। শাহানা মাঝে মাঝেই ভাবতে থাকে বিপরীত মেরুর মানুষটিকে সে ভালোবাসে কীভাবে?
বৃষ্টি নামছে। তুমুল বৃষ্টি। দুটি শালিক ঘরের বারান্দার কোণায় এসে আশ্রয় নিয়েছে। শাহানা নিরাপদ দূরত্বে সরে আসে। শালিক দুটিকে নিশ্চিন্ত জায়গা দিয়ে ঘরে ফিরে যায় শাহানা।

তিন.
বৃষ্টি এখন বিরতি নিচ্ছে। কিন্তু শাহানা বিরতিহীন। সে একে একে কাঠের বক্স থেকে চিঠিগুলো বের করতে করতে প্রথম চিঠিটি খুঁজে পায়।

প্যারিস। ১৯ জুলাই ১৯৭৭
‘এখনো ভাবতে পারছি না, আমি তোমার কাছ থেকে বহু দূরে চলে এসেছি। মনে হচ্ছে, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তুমি অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে কত জড়তা নিয়ে বিদায় জানাচ্ছ আমাকে। তোমরা এসেছিলে এয়ারপোর্টে। তুমি সেদিন একটি কথাও বলোনি। তোমার হয়ে সব কথা বলছিল তোমার ছোট বোন।’
শাহানা এতোটুকু পড়েই থেমে গেল। সে সিদ্ধান্তে এসে গেছে। চিঠিগুলো রিনা খালার নয়। সে নিশ্চিন্ত হয়ে যায়, চিঠিগুলো তার আম্মাকেই লেখা।
কে এই রাহাত আহমেদ রাদ? নামটা খুব চেনা চেনা লাগে। শাহানা তবু মেলাতে পারে না। সে ভাবতে থাকে, গত বছর বইমেলায় দেখা হয়েছিল যে লেখকের সঙ্গে, ইনি কি তিনি? রাহাত আহমেদ, প্রবাস জীবন তার। কয়েকটি উপন্যাস লিখেছেন। রাহাত আহমেদ শাহানাকে নিশ্চয়ই চেনেন, না চিনলে শাহানাকে অতোটা গুরুত্ব দেবেন কেন?
শাহানা আরেকবার চিঠি পড়তে শুরু করে।
‘‘নতুন এক জীবনের মধ্যে প্রবেশ করছি। অচেনা শহর। চারদিকে অচেনা সুর। প্যারিসের গাছপালা পাখি এবং রাতের আলো সবই আমার কাছে নতুন এবং ভিন্ন বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু আমার এখন এসব নিয়ে ভাবলে চলবে না। আমাকে নতুন করে জীবন শুরু করতে হবে। জানি না, কীভাবে কেমন করে শুরু করব সেই জীবন। সময়ই সবকিছু বলে দেবে।
নতুন এক স্বপ্ন নিয়ে এসেছি। কিন্তু আগের কোনো স্বপ্নই পুরনো বাতিল হয়ে যায়নি। নতুন কিছু গ্রহণ করার জন্য অপেক্ষা করছি, কিন্তু এখনো রমনা পার্ক, ধানমন্ডি, শাহবাগ আর তুমি মনের মধ্যে নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠছে। আমার প্রতিদিনের জীবনে তুমি ঠিক আগের মতোই থাকবে। জানি না নতুনকে আমি কতোটুকু গ্রহণ করতে পারব, তবে তোমাকে মনের মধ্যে রেখেছি খুব যত্ন করে। দেশ থেকে বহু দূরদেশে এসেও তুমি আমার অবলম্বন হয়ে আছ। আমার চিঠির উত্তর এখনই দিতে হবে না। যে ঠিকানা থেকে লিখছি তোমাকে, এই ঠিকানায় কদিন থাকব জানি না। তবে মনে কোরো না আমি উদ্বাস্তুর জীবনযাপন করছি।
তোমার আব্বার দেখা পাত্রের সঙ্গে কি তোমার দেখা হলো? দেখতে কেমন সে? নিশ্চয়ই আমাকে ভুলে যাবার মতো সুন্দর? আজ আর কথা বাড়াচ্ছি না। খুব ভালো থেকো।”
প্রথম চিঠি পড়ার পর শাহানার কাছে রাহাত আহমেদ রাদকে খুব বেশি রোমান্টিক মনে হলো না। মনে হয়, মানুষটি তখন তার আম্মাকে নিয়ে কল্পনায় ভাসেননি। খুব একটা আবেগভেজানো কথা নেই চিঠিতে। পরের চিঠিগুলিতেও সেই সময়ের উথাল-পাথাল আবেগ উদ্বেগ থাকবে বলেও মনে হয় না শাহানার। কিন্তু সে পরের চিঠিগুলো পড়ার আগ্রহও দমন করতে পারে না। মনে হয়, শাহেদের সঙ্গে কোথাও একটা মিল আছে রাহাত আহমেদের।
দ্বিতীয় চিঠিটা সামনে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে শাহানা। আম্মার কাছে লেখা প্রেমিকের চিঠি পড়তে চাওয়াটাও অন্যায়। সে ভাবতে থাকে, প্রেম কি অন্যায়? যে প্রেম স্বীকৃত, কিন্তু অপরিণত সেই প্রেম নিয়ে রহস্য থাকতেই পারে। আর সেই রহস্য ভেদ করার মধ্যে কি কোনো অন্যায় আছে? তাছাড়া, আম্মাও নীরবে তার চিঠিগুলো পড়তে দেয়ার একটি সংকেত দিয়ে গেছে বলেই অনুমান করছে শাহানা। আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে দুপুর পার হয়ে বিকেল হয়ে আসছে ঢাকার বারিধারায়। শাহানার ইচ্ছে হল আরেকবারটি বারান্দায় গিয়ে জোড়া শালিক দেখে আসবে। না, বারান্দায় এখন আর তারা নেই। পাখিরা বড়ই চঞ্চল হয়। বিশেষ করে শালিক তো খুবই চঞ্চল প্রকৃতির।
বৃষ্টি ভিজে বারান্দাটি শীতল হয়ে গেছে। বাগান থেকে ঘাস আর ফুলের ঘ্রাণ এসে বারান্দাটিকে প্রকৃতির কাছাকাছি করে তুলেছে। বেতের চেয়ারগুলো ভেজা ভেজা। কাউকে ডেকে চেয়ারগুলো মুছতে বলবে কি বলবে কিনা ভাবছে শাহানা। না, কাউকে ডাকতে ইচ্ছে হলো না, হালকা ভেজা একটি চেয়ার টেনে নিয়ে বাগানের দিকে মুখ করে বসল সে।
রাহাত আহমেদের চিঠিগুলো শাহানাকে টানছে। আজকের বৃষ্টিময় বিকেলটাও ত্রিশ বছর আগে লেখা চিঠির দিনগুলোকেই ডেকে নিয়ে আসছে। শাহানা দ্বিতীয় চিঠিটি বারান্দায় বসেই পড়তে শুরু করল।
“প্যারিস থেকে একেকটি চিঠি ঢাকায় পৌঁছতে প্রায় দুই সপ্তাহ লেগে যায়। কিন্তু আমি তো সব সময়ই তোমাকে মনে করি। তুমিও সব সময়ই আমাকে মনে করো জানি। প্রথম চিঠি পাবার পর উত্তর লেখার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছ নিশ্চয়ই। কিন্তু আমার যে এখনো স্থায়ী ঠিকানা হয়নি। তাছাড়া আমার মনে হয়, তোমার চিঠি পাবার জন্য আমার আগ্রহ খুবই কম। কিন্তু তুমি আমার চিঠির জন্য পশ্চিমমুখী হয়ে বসে থাকো তেমনটাই জানি আমি। রমনা পার্কে নৌকায় বসে এরকম কথাই বলতে আমাকে। বিদেশে লেখাপড়া করতে আসার ব্যাপারে প্রথমত তুমি বাধা দিয়েছিলে। কিন্তু পরে তুমি আর আপত্তি করোনি। অদ্ভুত ব্যাপার। তুমি কখনো বিদেশে আসতেও চাওনি। কলেজে যাও তো? নাকি আগের মতোই লেখাপড়ায় ফাঁকি দিচ্ছ? ক্লাস ঠিকমতো না করলেও তুমি তো পরীক্ষার ব্যাপারে সিরিয়াস। লেখাপড়া নিয়ে তোমাকে কিছু বলতে চাই না।

আমি কাজ এবং লেখাপড়া নিয়ে খুব চাপের মধ্যে আছি। ফরাসি ভাষা শেখার ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। নতুন দেশ নতুন মানুষ এবং আমার নতুন স্বপ্ন নিয়ে ডুবে আছি। কিন্তু তোমাকে এবং ঢাকার গাছপালা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিছুতেই ভুলতে পারি না। ভুলতে চাইও না। এখানে এসে বুঝতে পারছি, ঢাকা আর প্যারিসের মধ্যে যেমন বড়ো ব্যবধান আছে, তেমনি ফরাসি আর বাংলাদেশি বন্ধুত্বের মধ্যেও পার্থক্য আছে। অল্প কয়েকদিনেই বুঝে গেলাম এরাও কফি পান করতে করতে কথা বলে। আড্ডায় অনেক সময় পার হয়ে যায়। কিন্তু কারো কণ্ঠস্বর খুব একটা উঁচুতে ওঠে না। আরেকটা জিনিস দেখছি, এখানে মনে হয় কেউ গোপনে প্রেম করে না। তুমি তো আমার চোখের দিকেই তাকাতে না। তোমার হাত ধরতে গেলেও মনে হতো, তুমি ভয়ে কাঁপছ। আচ্ছা তুমি কি ভয়ে কাঁপতে, নাকি আবেগে? প্যারিসে প্রেমিক প্রেমিকার দেখা হলেই একে অপরে চুমু খায়। রাস্তায় সবার সামনে দাঁড়িয়ে দুটি ছেলেমেয়ে অনেকক্ষণ ধরে চুম্বন করে। দুজন দুজনকে শক্ত করে জাপটে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। মা-বাবার সামনেও প্রেমিক প্রেমিকারা চুমু খায়। এই দেশের এইসব দৃশ্য দেখতে ভালোই লাগে। তুমি যদি প্যারিসে আমার সঙ্গে চলে আসতে। তারপর আমি যদি এখানকার পার্কে ক্যাফে বারে রাস্তায় তোমার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে চাইতাম তুমি তখন কী করতে? জানি, তুমি এখানে এসেও লজ্জা পেতে। ঢাকায় তুমি কখনো আমার সাথে একলা দেখা করোনি। সব সময় তোমার বোন রিনা অথবা অন্য কোনো বান্ধবীকে সাথে নিয়ে এসেছ। নিজের কথাটি সরাসরি খুব কমই বলেছ আমায়। ছোট বোনের মুখ দিয়ে তোমার কথা আমাকে বলতে তোমার কেমন লাগত? আমি কিন্তু কখনো কখনো কোনটা রিনার কথা আর কোনটা ফিনার কথা গুলিয়ে ফেলতাম। আমি মনে হয়, চিরকাল এমনই বোকা থেকে যাব।
ভালো থেকো। ভেবো না, কোনো ফরাসি সুন্দরীর প্রেমে পড়ে যাব। আর সে রকম ঘটনা যদি ঘটেও তোমাকে জানিয়েই ঘটাব। তোমার জন্য আরো পাত্র দেখা হচ্ছে? নাকি তোমার আব্বা সেই ছেলেটিকেই ঠিক করে ফেলেছেন? আমি সময় মতো সব জেনে নেব। তোমাকে কিছুই জানাতে হবে না। ভালো থেকো। বিদায়।”
বৃষ্টি থামেনি। কিন্তু শাহানা এখন ঘামছে। মনে হচ্ছে, ত্রিশ বছর আগের দুটি মানুষকে সে এখন অক্ষরে অক্ষরে পড়তে পারছে।

চার.
কিছুতেই ঘুম আসছে না শাহানার। ফেসবুকে ঢুকে শাহেদের সর্বশেষ স্ট্যাটাস খুঁজল সে। আজ সারা দিন শাহেদ কোনোকিছুই লেখেনি। এমনিতেও সে খুব কম সময় ফেসবুকে উপস্থিত থাকে। মাঝে মাঝে চমৎকার কিছু লেখে। বিশেষ করে সমাজ সচেতনমূলক কিছু ছবি লেখা মাঝে মাঝেই থাকে শাহেদের টাইম লাইনে। মেসেঞ্জারে পাওয়া গেল শাহেদকে। শাহেদকে কিছু লিখতে গিয়ে থেমে গেল শাহানা। কিছু লিখতে গেলেই আম্মার প্রাক্তনের কথাপ্রসঙ্গ আসতেই পারে। কিন্তু শাহানা বিষয়টিকে নিজের কাছেই রাখতে চায়। তার আম্মা যদি শেয়ার করে তবেই সে রাহাত আহমেদের কথা তুলবে।
শাহানার হঠাৎ মনে হল, ফেসবুকে বয়স্ক লোকও তো আছেন। একবার কি খুঁজব রাহাত আহমেদ রাদকে? কৌত‚হল দমন করা গেল না। সে দ্রুত রাহাত আহমেদ লিখে সার্চ দিল ফেসবুকে। রাহাত আহমেদ নামের একশ চৌত্রিশ জনকে খুঁজে পাওয়া গেল। রাহাত আহমেদ রাদ নামেও পাওয়া গেল এগারো জনকে। হয়তো আরও অনেককে পাওয়া যাবে। ছবি দেখে দেখে শাহানা প্রথমত বাছাই করতে চাইল বয়স্ক কোনো মুখ। না, ষাটের কাছাকাছি বয়সী কোনো মুখ পাওয়া গেল না।
হঠাৎ একটি ছবিতে আটকে গেল শাহানা। বিশ একুশ বছর বয়সী একটি শাদাকালো ছবি। লম্বাটে মুখ, ধারালো চোখ। শাহানা মেধাবী। উপস্থিত বুদ্ধিতে সব সময় সে পরিচিত সবার চেয়ে এগিয়ে। শাহানার অনুমান সঠিক। শাদাকালো ছবির রাহাত আহমেদ প্যারিসে বাস করেন। দ্রুত টাইম লাইন ভ্রমণ হয়ে গেল শাহানার। ভদ্রলোক প্রোফাইল পিকচারে রেখেছেন ছাত্রজীবনের ছবি। টাইম লাইনে তাঁর প্রচুর কাজের খবর পাওয়া গেল। রাহাত আহমেদ লেখেন, ব্যবসা করেন, সংগঠন করেন, নানান দেশে ঘুরে বেড়ান কাজে-অকাজে।
বাংলাদেশে এখন বর্ষাকাল, ফ্রান্সে এখন গ্রীষ্ম। বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্সের গ্রীষ্মকালীন সময়ের ব্যবধান চার ঘণ্টা। বাংলাদেশে এখন রাত সাড়ে বারোটা, ফ্রান্সে রাত সাড়ে আটটা। আম্মার কাছে লেখা রাহাত আহমেদের চিঠির রহস্য একটু হলেও দমে গেল। শাহানা রাহাত আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য মরীয়া হয়ে উঠল।
মেসেঞ্জারে ছোট্ট একটি অনুরোধ রাখল শাহানা
প্রিয় লেখক রাহাত আহমেদ, নিশ্চয়ই ভালো আছেন। আমি শাহানা। বইমেলায় আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আপনি আমাকে সময় দিয়েছিলেন। অবশ্য আরো আরো অনেককেই হয়তো এভাবে সময় দিয়েছেন, তাই আমাকে হয়তোবা মনে নাও থাকতে পারে। তবুও মনে হচ্ছে, আপনি হয়তো আমাকে মনে রেখেছেন। আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে পারি? ভয়ে ভয়ে জানতে চাইছি, আপনি কি ফরিদা রহমান রিনা নামের কাউকে চিনতেন? আমি খুব সরলভাবেই জানতে চাইছি। আপনি সঠিক উত্তর দেবেন বলেই বিশ^াস করি।
ইচ্ছে করেই শাহানা তার আম্মার নামটি উল্লেখ করল না। রিনা খালাকে চেনা মানেই তো তার আম্মাকে চেনা। কিন্তু ভদ্রলোক কি সহজে ধরা দেবেন?
মেসেজটি রাহাত আহমেদ রাদের ইনবক্সে জমা রইল। তাঁকে এখন অফলাইন দেখাচ্ছে। হয়তো অবসর মতো তিনি মেসেজটি পড়ে নেবেন। শাহানার মোবাইল ফোনে আম্মার কল।
হ্যালো আম্মু, ভালোভাবে পৌঁছাইছ? তুমি না পৌঁছেই ফোন করবা। ফোন করলা না ক্যানো?
তুইও তো ফোন করিস নাই।
কেমনে যে দিনটা চলে গেল বুঝলাম না। তোমার কোনো সমস্যা হয় নাই তো?
না, কোনো সমস্যা হয় নাই। বৃষ্টির জন্য একটু দেরি হইছে। সব ঠিকঠাক আছে। তুই কী করিস?
শাহানা একটু দমে গেল। আম্মার কাছে সত্যিটা লুকাতে হবে তাকে। সে কিছুতেই ধরা দেবে না। চিঠির কথা বলে আম্মাকে বিব্রত করতে চায় না সে। শাহানা বলল সব ঠিক আছে আম্মু। আজ আর কোথাও যাইনাই। বারান্দায় একটানা বৃষ্টি দেখছি।
কথা আরো বাড়তে পারত। শাহানা ইচ্ছে করে বেশি কথা বলে নতুন সত্যের মুখোমুখি হতে চাইল না। ফারহানা মেয়েকে এটা-ওটা নির্দেশ দিয়ে ফোন রেখে দিলেন। শাহানার চোখ এখন ল্যাপটপে। রাহাত আহমেদ অনলাইনে এলেই সে কথা বলতে চাইবে।
রাত তিনটা। কিছুতেই ঘুম আসছে না শাহানার। রাহাত আহমেদ কি সাড়া দেবেন? কী অদ্ভুত ব্যাপার, আম্মার প্রাক্তনের খোঁজখবর পাওয়ার জন্য সে এত অস্থির হয়ে আছে কেন? শাহেদের জন্য কখনো কি এভাবে সে অপেক্ষা করেছে?

পাঁচ.
শাহেদ চাইছিল আজ দুপুরে কোনো রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ করবে। শাহানার একটুও ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু শাহেদ কোনো ওজর আপত্তি মানতে নারাজ। শাহানা বলতেও পারছিল না, গত রাতে সে ঘুমাতে পারেনি। সে যদি বলত, কাল ঘুম হয়নি, তাকে একগাদা প্রশ্নের মুখোমুখি পড়তে হতো। শাহেদের সিরিজ প্রশ্নের মুখে পড়তে চায় না শাহানা।
বনানীর একটি রেস্তোরাঁয় বসেছে শাহেদ আর শাহানা। মিক্সড সবজি ভাত ছাড়া আর কিচ্ছু খাবে না শাহানা। শাহেদের ইচ্ছে ছিল মাটন বিরিয়ানি খাওয়ার। কিন্তু এক টেবিলে দুরকম খাবার নিতে চায় না সে।
তোমার কী হইছে বলো তো?
কেন, কী দেখলা?
বুঝছি তো, মন তো এইখানে নাই। তোমারে কি আমি জোর করে খাইতে ডাকলাম।
জোর তো করছই।
তোমার সাথে কি আমার জোরজবরদস্তির রিলেশান?
আমি কি তাই কইছি?
আসল বিষয়টা চাপা দিতাছ। থাক আর কিছু জানতে চাইব না।
কিছুক্ষণ নীরবতা। শাহেদই আবার কথা বলতে বাধ্য হলো।
বারবার ইনবক্সে ঢুকে কী দেখো?
নিশ্চয়ই কিছু আছে।
কারে খোঁজো?
একজন পরিণত বয়স্ক পুরুষকে।
আমি কি অপ্রাপ্তবয়স্ক?
গতকাল থেকে শাহানা গম্ভীর হয়ে ছিল। এবার তার গাম্ভীর্য ভাঙল। একটু বেশি জোরেই হেসে ফেলল সে। শাহেদ একটু বিব্রত হলো। মনে হলো, সে কিছু একটা অনুমান করার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই ঠাঁই পাচ্ছে না। শাহানাও নিজেকে একটু রহস্যময়ী করে তুলল। সে শাহেদকে আরো একটু ধাঁধার মধ্যে ফেলতে চাইল।
শাহানার প্লেটে ভাত পড়ে আছে, সবজি শেষ। শাহেদ জোরাজুরি করছে আরেকবার সবজি নাও। শাহানা রাজি না। শাহেদ উঠে গিয়ে হাত ধুয়ে ফিরে এল, তার তাড়া আছে। কিন্তু শাহানা কখন টেবিল ছাড়বে? কী হলো শাহানার?
শাহানাকে এখন ভীষণ অপ্রস্তুত দেখাচ্ছে। শাহেদকে আড়াল করে সে ইনবক্সে কারো প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।
তুমি কি কাউরে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিছ? এইখানে আসবে?
শাহেদের অনুমান সঠিক। শাহানা তাকে অনুমান করতে সাহায্য করেছে এতক্ষণ। সে গোপন করল না। বলল শাহেদ, আমি একজনের সঙ্গে দেখা করব।
শাহেদ কোনো প্রশ্ন করল না। কিন্তু তার চোখে মুখে প্রশ্নচিহ্ন পরিষ্কার। শাহানা নিজের থেকেই বলল আমি এক আঙ্কেলকে সময় দিছি। কাকতালীয়ভাবে উনি আজই ঢাকায় এসেছেন।
উনি কি বিদেশে থাকেন?
ঠিক।
তুমি কি এতক্ষণ তার জন্যেই একটু অস্থির হইছিলা?
পরে তোমাকে সব বলব। আমি উঠি। গুলশানে দুয়ে যাব।
দেখো আমার কাজ আছে। তারপরও আমি কিন্তু তোমারে সময় দিতে পারব। মনে হইতাছে তুমি একজন অচেনা মানুষরে অ্যাপয়েন্ট দিছ।
ভয়ের কিছু নাই। তুমি আমারে গুলশান দুয়ে ওয়েস্টিনের সামনে নামায় দিও।
বুঝে শুনে যাইতাছ তো?
ধুর। ওঠো তো।

ছয়.
লবিতে ঢুকেই বোঝা যায় একজন মাঝবয়সী সুপুরুষ অপেক্ষা করছেন। শাহানা প্রথম দেখাতেই অনুমান করতে পারল, কে রাহাত আহমেদ। মজার ব্যাপার হলো, রাহাত আহমেদ শাহানাকে চিনতে পারছেন না। রাহাত একবারই মাত্র বইমেলায় দেখেছেন শাহানাকে। এতক্ষণে অবশ্য ফেসবুকের প্রোফাইল ছবি দেখে নিয়েছেন তিনি। কিন্তু সেই ছবির সঙ্গে বাস্তবের শাহানাকে মেলাতে একটু সময় তো লাগবেই। শাহানা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থেকে রাহাত আহমেদকে দেখে নিচ্ছিল। রাহাতের চোখে চোখ পড়ল শাহানার। রাহাতের ধাঁধা কেটে গেল, শাহানাকে বোকা বানিয়ে রাহাত নিজেই এগিয়ে এলেন। দাঁড়ালেন শাহানার সামনে।
শাহানার বুঝতে বাকি রইল না, ইনিই রাহাত আহমেদ।
সালাম শুভেচ্ছা বিনিময়ের পরে ওয়েস্টিন হোটেলের রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসল দুজনে।
রাহাত আহমেদ সরাসরি কথায় চলে এলেন।
কাল রাতে দুবাইয়ে আমার ট্রানজিট ছিল। দুবাইয়ে ল্যান্ডিংয়ের পরই তোমার মেসেজ পেয়েছি। আমি খুব একটা অনলাইনে থাকি না। থাকা হয় না। কাল তোমাকে বুঝে নিচ্ছিলাম। একটু সময় লেগেছে। সকালে ঢাকায় পৌঁছেই ভেবেছি, আজই তোমার সঙ্গে দেখা করব।
আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। কাল থেকে আমি একটা ঘোরের মধ্যে আছি।
বলো, তুমি আমার কাছে কী জানতে চাও?
আমার কিছু প্রশ্ন আছে। খুব সাধারণ বোকা বোকা প্রশ্ন। আমি সবকিছু জানতে চাই না। দুতিনটি প্রশ্ন মাত্র।
কিন্তু আমি যে তোমাকে সবকিছু বলতে চাই।
আপনি কি কনফেইস করতে চান?
না না। আমার কোনো অপরাধ বোধ নেই। আমার কোনো দুর্বলতা নেই। আমি কিন্তু তোমার আম্মুকে কখনো কথা দিইনি।
আমার মনে হয়, আপনাদের বোঝাপড়াটা চমৎকার ছিল।
সেটা ছিল বলেই আজো আমি তোমার সাথে সহজভাবে দেখা করতে এসেছি।
আপনি জানেন, আমার আব্বু আর নেই।
জানি। আমি তাঁর কবর দেখেছি।
শাহানা ভীষণ অবাক হয়ে গেল। খুবই চমকে গেল সে। কী বলছেন রাহাত আহমেদ? তার মানে তিনি এতদিন গোপনে গোপনে তাদের সব খবর রাখতেন।
শাহানা বলল আম্মু খুবই সাহসী বুদ্ধিমতি। নানান সব বিজনেস আম্মু একাই সামলায়।
তোমার আম্মু এতাটা সাহসী মানুষ ছিল না।
আপনি হয়তো ভুল করছেন। আম্মু বরাবর সাহসী।
হয়তো তাই, আমিই হয়তো তাকে দুর্বল লাজুক ভেবেছি। সে কখনো সাহস করে আমার জন্য একা বাড়ির বাইরে আসত না।
আপনাদের রিলেশানটা শেষ পর্যন্ত ম্যাচিউর হয়নি কেন?
সরাসরি প্রশ্ন করল শাহানা। রাহাত বললেন সব বলছি। আগে বলো কী খাবে?
শাহানা বলল লাঞ্চ করে এসেছি, আমি জুসটুস খেতে পারি।
রাহাত আহমেদ শাহানার পছন্দমতো আপেল জুস নিয়েছেন। গত রাতে তাকে আচমকা এলোমেলো করে দিয়েছে শাহানা। মেয়েটিকে দেখার পর থেকে তিনি আরো নরম হয়ে পড়েছেন। রাহাত আহমেদ আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন তার গভীর অতীতে।
শাহানা এখন পেছনের গল্প শুনতে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সে এরই মধ্যে জানতে চেয়েছে কেমন আছেন রাহাত আহমেদ। তার সংসারে কে আছেন? তিনি কতটা সময় প্যারিসে থাকেন, কতটা ঢাকায়? প্রবাস জীবনে তিনি কতটা সুখী মানুষ, সাকসেস মানুষ?
শাহানা আবার প্রশ্ন শুরু করল আপনি হঠাৎ করে প্যারিসে চলে গিয়েছিলেন?
না। আমি আগে থেকেই বিদেশে লেখাপড়া করতে যাব বলে প্রস্তুত ছিলাম। আমরা তখনো আমাদের সম্পর্ক নিয়ে ভাবিনি কিছু। আনন্দে কৌতূহলে আমরা দেখা করতাম। আড্ডা দিতাম। আমি ছুটে যেতাম ধানমন্ডি শাহবাগ রমনা পার্কে। তখন ঢাকা ছিল ছিমছাম পরিচ্ছন্ন সুন্দর শহর। কোথাও কোনো ভিড় ছিল না। ফিনা তোমার খালা রিনাকে নিয়ে দেখা করতে আসত। আমরা খুব একটা কথা বলতাম না। ফিনার মুখ থেকে সহজে কথাই বের হতো না। সে এতই আস্তে আস্তে কথা বলত যে আমি পৃথিবীর সব শব্দ ঢেকে রেখেও তার কথা শুনতে পেতাম না। ফিনার কথা বুঝিয়ে বলে দিত রিনা।
আম্মু নিশ্চয়ই প্রথম থেকেই আপনাকে বিয়ে করবে বলে মনে মনে ফাইনাল ডিসিশান নিয়ে রেখেছিল।
এখানেই আমার সঙ্গে তার একটা গ্যাপ ছিল। আমি তারুণ্যের উদ্যামে আনন্দে বুঝতেই পারিনি, ওই বয়সের মেয়েরা প্রথম থেকেই বিয়ের কথা ভাবে। তখন এমনটাই স্বাভাবিক ছিল।
কখন বুঝতে পারলেন, এবার আপনাকে একটা ডিসিশানে আসতে হবে?
যখন আমি প্যারিসে চলে যাব বলে সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছিলাম ঠিক তখনই একদিন ফিনার মুখোমুখি হই। আমরা সেদিন রমনা লেকে নৌকায় ঘুরছিলাম। ছোট্ট নৌকা। লেকের পানি খুবই স্বচ্ছ ছিল। সামান্য বাতাস ছিল। পানিতে ছোট ছোট ঢেউ খেলা করছিল। রিনা আমাকে বলল, আপুর জন্য আব্বা একটা পাত্র দেখেছে। কথাবার্তা চলছে। আপু তোমার কথা জানতে চায়। তুমি বললেই আমরা পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামব। আমরা যেভাবেই হোক আব্বাকে বোঝাব। তোমাকে তেমন কিছু করতে হবে না। বলো, তুমি বিদেশ থেকে লেখাপড়া শেষ করে ফিরবে। আপু অপেক্ষা করবে।
আমি হঠাৎ করেই সেদিন বড় হয়ে গেছিলাম। সেই মুহূর্তের আগে আমি এসব নিয়ে একটুও ভাবিনি। মনে হলো, আমার সামনে বড় একজন মানুষ বসে আছে। দায়িত্ববান মানুষ। সেই মানুষটির মধ্যে আমি আছি। আমি সেই দায়িত্ববান মানুষটি হয়ে সেদিন বলেছিলাম, আমি এখনো বিবাহ সংসার পরিবার এসব নিয়ে ভাবতে শিখিনি। আমি কিছুই না বুঝে না ভেবে একজনকে ভালোবেসেছি। ভেবেছি, সময়ই একদিন বলে দেবে আমরা কখন কী করব? কিন্তু সেই সময় যে হঠাৎ আজই এসে পড়বে ভাবিনি। আমি কাউকে অপেক্ষা করতে বলব না। আমি এই সম্পর্কটাকে অস্বীকারও করছি না। কিন্তু আমি ফিনাকে কথা দিতে পারব না।
সেদিনের সেই বিকেলবেলায় আমাদের ভালোবাসা উচ্ছ্বাস মুক্ত আনন্দ আবেগ সব থমকে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ আগেও আমরা লেকের পানি ছোড়াছুড়ি করে আনন্দ করছিলাম, সেই পানিতেই যেন হঠাৎ রিনার দুচোখ ভরে উঠল। আমি খুব নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। আমি ভীষণ একলা মানুষ হয়ে সেদিন রমনা পার্ক থেকে বাসায় ফিরেছিলাম।
তারপর একদিন বিদায়ের সময় এল। তেজগাঁও এয়ারপোর্টে আত্মীয়স্বজন বন্ধুদের মধ্যে একপাশে ফিনা রিনা আর তাদের এক বান্ধবীও দাঁড়িয়েছিল। বিদায়ের দিনে রিনা আমাকে একটা বই গিফট দিয়েছিল। বইটির প্রথম পৃষ্ঠায় গোটা গোটা অক্ষরে সে লিখে দিয়েছিল চোখের আড়াল হলেই মনের আড়াল হয় না।

সাত.
ঢাকার আকাশ এখন মেঘে ঢাকা। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। শাহানা অনেকক্ষণ চুপ হয়ে আছে। রাহাত আহমেদ ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। দুদিন পরই তিনি প্যারিসে ফিরে যাবেন। আজো তার বেশকিছু কাজ ছিল, কিন্তু তিনি আজ কিছুই করবেন না। সব অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করে তিনি আজ এবং আগামীকাল শুধু শাহানাকেই সময় দেবেন।
রাহাত আহমেদ শাহানাকে বললেন তোমার আর কিছু জানতে চাওয়া থাকলে আজই বলো। কাল কিন্তু তোমাকে নিয়ে শুধুই ঘুরব। অতীত নিয়ে কোনো প্রশ্ন শুনব না।
শাহানা বলল আমিও আর পেছন ফিরে তাকাতে চাই না। আমি এখন আপনাকে অন্য একটি কথা জানাব।
রাহাত আহমেদ আন্তরিক চোখে শাহানার দিকে তাকালেন। দেখতে পেলেন, শাহানার মধ্যে অন্য একটি সাহসী জেদি দৃঢ় চরিত্র লুকানো আছে।
রাহাত দরদভরা গলায় বললেন তুমি আমাকে সব খুলে বলতে পারো।
শাহানা বলতে গিয়ে থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। তারপর বাইরের দিকে মুখ করে বলে ফেলল
আমি একজনের কাছ থেকে পালাতে চাই। আপনি আমাকে একটু সহযোগিতা করবেন?
তোমার আম্মুর কাছ থেকে পালাতে চাও?
না।
কাউকে ভালোবাসো?
হ্যাঁ। পাগলের মতো ভালোবাসি একজনকে।
তাহলে পালাতে চাও কেন?
আমি ওকে বিয়ে করলেই ভালোবাসাটা শেষ হয়ে যাবে।
খুব ভালো বলেছ তো। ফরাসি লেখক জঁ পল সাঁত্রের সঙ্গে মিলে গেল।
আমি সত্যিই পালাতে চাই। আমি আমার দেশকেও ভালোবাসি, ভালোবাসি আমার মনের মানুষটিকে। কিন্তু দেশ আর আমার ভালোবাসাকে শুধরে নিতে পারব না, আমি তাই পালাতে চাই।
একে তুমি পালানো বলছ কেন?
হয়তোবা এই পলায়নকে বলা যায় প্রেমের রূপান্তর। আমার জন্য আপনাকে কিছুই করতে হবে না। শুধু ভাবতে চাই প্যারিসে আমারও একটা ঠিকানা আছে।
রাহাত কখনো গভীরভাবে ফিনাকে স্পর্শ করেননি। আজ ত্রিশ বছর পর ফিনার মেয়েকে সস্নেহে কাছে টেনে নিলেন, আদর করে শাহানার কপালে চুমু এঁকে দিলেন। মেঘগুলো আরও নিচু হয়ে নেমে এল, তুমুল বৃষ্টির শব্দে চারদিকের সকল কলরব নীরবে ঢেকে গেল।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা