সম্প্রতি জীবন

আগের সংবাদ

ভালোবাসার রূপান্তর

পরের সংবাদ

কুমু আসবে এই শহরে

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৬, ২০১৯ , ১২:৪৯ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ১০, ২০১৯, ৬:১৬ অপরাহ্ণ

আজ কুমু আসবে। আসবে নিউইয়র্ক শহর থেকে। বেড়াতে গিয়েছিল বড়ো মেয়ের ওখানে। ছিল দুবছর। দুবছর পর আসছে আবার নিজের দেশে। আমার কাছে যেসব তথ্য আছে তাতে জানতে পারি তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলায় কিন্তু সে স্বামী সন্তান নিয়ে থাকে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের কোথায় থাকে বলতে পারবো না। আসলে জানি না বা জানার প্রয়োজন মনে করিনি। কুমুর সাথে পরিচয় বেশিদিনের নয়। ফেসবুকের মাধ্যমে চেনা-জানা। প্রশ্ন আসতে পারে যার সাথে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয়, যাকে কোনোদিন দেখা হলো না তাকেই আজ উপজীব্য করে লিখতে হবে কেন?
আমি কবি বা কোনো লেখক নই বলেই যে লিখতে পারবো না তা কে বলেছে? আমারও অধিকার আছে মানুষ সম্পর্কে জানার বা লিখার বা যে কোনো ধরনের আবেগ প্রকাশ করার। কিন্তু তাকে নিয়ে আমার আবার কিসের আবেগ? কেনইবা অতো ঘটা করে লিখতে হবে? আবারো বলছি আমি কবি না। কবিরা নাকি ঈশ্বরের প্রেরিত প্রতিনিধি। তারা অনেক জানেন বুঝেন এবং তাই নিজেদের ভাষায় তুলে ধরেন নান্দনিকতার প্রলেপে। তাদের কথার উপমা চিত্রকল্প ছন্দ তাল লয় নাকি সাধারণের মতো নয়। একটু ভিন্ন চোখ তাদের আর তাই তারা সমাজের দর্পণ-সম্মানিত এবং মেসেজ দাতা। আমার ভাষাজ্ঞান নেই যা দিয়ে কুমুকে নিয়ে ভালো লিখতে পারি বা জানাতে পারি। তবে এটা ঠিক তার জন্যই আমার সংসার ডুবতে বসেছে। তাই সে আমার উপজীব্য এবং মনের ভেতরে বারবার তার কথাই বাজে।
ফেসবুকে আমার বন্ধু সংখ্যা প্রায় ৬০০শর কাছাকাছি। প্রতি মাসেই ওই বৃক্ষটির ডালাপালা না কাটলে এতদিনে ৫০০০ ছাড়িয়ে যেতো। কিন্তু মাঝে মাঝে দিনে ও মধ্যরাতে ওদের বাজে কমান্ড, বাজে প্রস্তাব, ভাল্গার ছবির জ্বালায় কেটে কুটে ৬০০ রেখেছি। এখানে বেশির ভাগই সাহিত্য সাংবাদিক কবি ও সরকারি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আছেন। মাছে মাঝে তাদের সাথে চ্যাট করি, অনেক কিছু জানি-জানাই। একেক সময় মনে হয় এই ডিজিটাল মাধ্যমটি সত্যি মানুষকে কাছে এনে দিয়েছে আবার মনে হয় এটি না হলেই ভালো হতো। এসব ভাবনায় ডুবে থাকতেই একদিন দেখি ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট এসেছে সেই আমেরিকার নিউইয়র্ক শহর থেকে। প্রোফাইল ঘেঁটে বুঝার চেষ্টা করি সে সত্যিকারের ছেলে নাকি মেয়ে। অনেক ফেক অ্যাকাউন্ট আছে যারা ছেলেমেয়ের অন্তরালে প্রতারণা ফাঁদ তৈরি করে। তাই কুমুকে কয়েকদিন একটানা জেরার মধ্যে ফেলে বিশ্বাসের চারাটাকে তরতাজা করে বড়ো করি।
এভাবেই চলছিল আমাদের কথাবার্তার পর্বটি। এক সময় নিজেদের মোবাইল নাম্বার আদান-প্রদান হয়। আমাকে সে ফোন দিয়ে বসে একদিন। আমি তখন মতিঝিল পাড়ায় অফিস করি। ব্যস্ততার ভেতরও অফিসের জানালা দিয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতির বাসস্থানের অভ্যন্তরের গাছগাছালি আর বাগানের পাখি দেখি, হরিণ শাবক দেখি আর পুকুরের ঘোলাজল দেখি। পাখিরা সকালের দিকে জটলা করে জনসভার মতো বক্তৃতা করে নির্বোধ প্যাচালে বিরক্ত হই। অনেক পাখি আসে-তাবলিগ জামাতের মতো ভিড়। বায়তুল মোকাররমে মিটিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে অনেকদিন। ওখানে এখন কোনো পাখিও ঢুকতে পারে না। তাই এখানে গোপনে মিটিং চলে। নাম না জানা কিছু দীর্ঘদেহী পাখিও আসে যেন জঙ্গি বা আইএসের এজেন্ট। ওদের কেউ ধরার নেই, বাধা দেয়ার নেই। কোথা থেকে আসে এরা?
আমি জানালার স্ক্রিন সরিয়ে হরিণের বিচরণ দেখছি। ওরা একেবারে কাছে এসেছে, ধরতে ইচ্ছে করে কিন্তু ধরি না জানি ওই অদূরেই সৈনিকের চৌকিতে পাহারায় আছে নিরাপত্তাকর্মী। দেখছি আর ভাবছি এলোমেলো কিছু অমনি মোবাইল বেজে ওঠে। টেবিল থেকে মোবাইলটি হাতে নিয়ে বুঝতে পারি এটি লোকাল কল নয়। একটু বিব্রত বোধ করছি। জানি না কার কল। অনেক আত্মীয়-স্বজনই আছে বাইরে। তবু ধরে হ্যালো বলি মি. শাওন আসগর আমি কুমু।
আমার ভেতর কেঁপে ওঠে। পাশের গাছগাছালি কেঁপে ওঠে। হরিণ শাবকগুলো দৌড়ে নাচানাচি করে। গাছের ডালে পাখিসব ওড়াউড়ি করে আর এই ডাল থেকে ওই ডালে গিয়ে বসে। কোথা থেকে যেন হালকা শিশির পড়ার মতো বৃষ্টি হলো। আমি দম নিয়ে শ্বাস নিয়ে বলি হা আপনি কুমু বলছেন। কেমন আছেন?
-ওহ গড্ মি. শাওন। শাওন ভয় পেয়েছেন মনে হচ্ছে। তা যাক। আপনার কণ্ঠ বেশ ভরাট। খুশি হলাম। বেশ ভারী কণ্ঠ আপনার। আবৃত্তির জন্য এই কণ্ঠই দরকার।
-কিন্তু আমি তো কবিতা লিখতে পারি না। কবিদের মতো কোনো সম্মানিত মানুষও নই।
-এভাবে বলবেন না। পৃথিবীর সবাই কবি আবার কেউই কবি নন। জানেন এটা আমার কথা না জীবনানন্দের কথা।
-এবার বলুন কেমন আছেন?
-হ্যাঁ বেশ ভালো অনেক ভালো।
-অনেক ভালো কেন?
-এই যে আপনার সাথে কথা বলছি তাই ভালো লাগছে। তাছাড়া আজ অন্যরকম একটা দিন আমার।
-কেমন?
-আজ অনেকদিন পর আমি চোখের সামনে হরিণ পাখি জল গাছ দেখছি।
-আপনি কি এখন কোনো চিড়িয়াখানায় বেড়াতে গেছেন, কোনো বান্ধবী আছে সাথে? বলেই সে হাসে।
-আরে না কি যে বলেন। আমি আমার অফিসে। অফিসটি রাষ্ট্রপতির ভবনের দেয়াল ঘেঁষে।
-তাই বলুন। আমি ভাবছিলাম আবার ডিস্টার্ব করলাম না তো।
কুমু প্রথম বারে আমার মনোযোগ কেড়ে নিলো। কারণ আমার সাথে বান্ধবী থাকলে আমি বিরক্ত হতে পারি তা সে বুঝে ভদ্রভাবেই মনে করিয়ে দিলো। এটি একটি এটিক্যাট-শিষ্টাচার। সে বাইরে থাকে বলেই এসব জানে। আমরাও জানি কিন্তু প্র্যাকটিস করি না। অন্যদের কষ্ট হবে এমন কাজ আমরা অহরহ করি কিন্তু বিরত থাকার সবকও জানি তবে সবাই তা থেকে নিজেকে বিরত রাখি।
-তারপর মি. শাওন লেখালেখি কেমন চলছে।
-আমি তো লেখক নই। খেটেখাওয়া মানুষ সময় কোথায় বলুন। আর আমার দ্বারা ওসব হবে না।
-তবে যে আপনার প্রোফাইলে মাঝেমধ্যে দুয়েকটি চরণ দেখি? ভালোই তো লাগে।
-লজ্জা দেবেন না কুমু। ওসব আজকাল পথে ঘাটের ছেলেমেয়েরাও পারে। লিখতে হলে অনেক পড়তে হয়। আমি বরং আপনার কবিতার ভক্ত। প্রায়ই আপনার কবিতা পড়ি। দেখি মনোযোগ দিয়ে।
-বলেন কী। তবে যে কোনো কমেন্ট করেন না?
-হ্যাঁ তা করি না অন্য কারণে। বলা যাবে না।
-তা হলে কী লাইন কেটে দেবো।
-কেন?
-আপনি নিশ্চয়ই আমাকে কোনো কিছু লুকাতে চান। কেন, আমি কী আপনাকে কোনো জ্বালাতন করেছি বা অন্যরকম কিছু মিন করছেন?
-অ্যাবসুলেটলি নট। তারপরও বলতে চাই না।
-প্লিজ বলুন। না হলে শান্তি পাবো না সারাদিন। জানেন এখানে এখন সকাল। ভোরেই মনে হলো আপনার সাথে কথা বলি। আজ মন ভালো নেই আমার। প্লিজ আর মনটা খারাপ হউক চাই না। বলুন কি সমস্যা?
-আসলে আমার স্ত্রী।
-কী? স্ত্রী আপনাকে সন্দেহ করে?
-না তা নয়। তার সাথে আমার ফেসবুক লিংক করা। সব সময় সে আমারগুলো দেখে। তাই ইচ্ছে করেই কোনো মেয়ে মানুষের ধারেকাছে যাই না। কিন্তু আপনার কবিতার প্রতি দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছি। তাই প্রায়ই কবিতা দেখি আর পড়ি। অতো সুন্দর করে লিখেন কী করে। মনে হয় যেন আপনি আমার জন্য কবিতা লিখছেন।
বেশ কিছুক্ষণ কুমু চুপচাপ থাকে। কিন্তু লাইন কাটে না। একটু পরে বলেÑ শাওন, আপনার জন্য আফসোস হয়। দুঃখ পেলাম। আমরা মেয়েরা আসলে জেলাসি খুব। নিজেরা নিজেদের সম্মান দিতে পারি না। কেবলই সন্দেহ আর সন্দেহ। এই সন্দেহের পোকা আমাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। একদিন এভাবেই সংসার জীবন বিষময় হয়ে ওঠে এবং শেষমেশ কাট্ কাট্ কাট্। ওকে শাওন আজ আর নয়। তবে বলে রাখি একটি বিষয় আপনি ঠিকই ধরেছেন। সম্প্রতি যে দু’চারটি কবিতা পোস্ট করেছি তা আপনাকে নিয়েই লেখা। আপনি যেমন আমার কবিতার ভক্ত তেমনি কিছু ঋণ শোধ করছি। তবে এখানে কোনো ইমোশন নেই, প্রেম নেই, ভালো লাগা নেই। শ্রেফ কাব্য। কাব্য সৃষ্টি করা। ভালো থাকুন।
তারও ক’দিন পর কুমু আমার মোবাইলে একটি কবিতার কিছু অংশ এসএমএস করেছিল। আমি দেখতেও পারিনি। কিন্তু সকাল সকাল ঘুম ভাঙার সাথে সাথে কী মনে করে আমার স্ত্রী লিয়া হাত দিয়ে বসে। আমার অনুমতি ছাড়াইÑ এটাও ঠিক নয়। আমি কোনোদিন তার অনুমতি ছাড়া মোবাইল টাচ করিনি। কিন্তু সে করে, প্রায়ই করে। হয়তো আমাকে নজরে নজরে রাখে। এটা কী সুখের না আরো দূরত্ব বাড়ায় জানি না। তবে এই কালচারটি আমার পছন্দ নয়। কুমু হয়তো অন্য কোনো কবিতা বা কোনো মেচ্যুইরড্ ডায়লগ পোস্ট করেছে। আমি যেহেতু দেখিনি তাতে আমার অপরাধ খুঁজে পাই না। তবু লিয়া এ নিয়ে কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে দিয়েছে। কুরুক্ষেত্র নয় রীতিমতো যুদ্ধ অশান্তি ভাঙচুর ছেঁড়াকাটা ঘর ছাড়া গলাবাজি সব-সব করেছে সে। সর্বোপরি একজন নারীর সর্বশেষ ডায়লগও বলে ফেলেছে এবং মীমাংসার জন্য তার বাপ-ভাইকে নিয়ে মিটিং বসিয়েছে। সবাই তার এই অনভিপ্রেত কর্মে আমার কাছে করজোড়ে ক্ষমা চাইলে লিয়া তার পাঁচদিনের মাথায় আবার লঙ্কাকাÐ বাধিয়ে দেয়। তাকে কুমুর ঠিকানা নাম্বার সব দিতে হবে। সে কথা বলবে কুমুর সাথে। আমি অস্থির হয়ে পড়ি। অশান্তির বিষম জ্বালায় জীবন আমার অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। আমার সন্তান সংসার অফিস জীবনের সব রুটিন উল্টে যায়।
আর ঘরে ফেরা হয় না ঠিকমতো। আমাদের বিছানা আলাদা হয়। আমাদের বাথরুম আলাদা হয়। পেস্ট সাবান আলাদা হয়। খাবারের সময় পাল্টে যায়। একটি ফেসবুকের কারণে আমার পৃথিবী বদলে যায়। আমি বদলে যাই। যে আমি সবার কাছে স্মার্ট সাবলীল সেই আমি বিমর্ষ রোগীর মতো হয়ে উঠি।
সেই কুমু আজ আসবে। আজ তার বিমান নামবে বিকেল চারটায়। আমাকে থাকতে বলেছে। আমি কী করবো? আমি তো কবি নই যে সাইবেরিয়া থেকে আগত অতিথি পাখিকে বলবো কুমুকে আকাশেই কর্ডন দিয়ে নিয়ে আসো। কী করে বলবো আজ যেন শহরে কোনোভাবেই লোডশেডিং না হয়। যাত্রাবাড়ী থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত সড়কপথে যেন কোনো ট্রাফিক জ্যাম না থাকে। কী করে বলবো মাননীয় মেয়র আজ অন্তত আজ শহরের ফুটপাথ থেকে হকারদের উচ্ছেদ করুন। না হয় আজ শহরের সকল অলিগলি পথের ফুটপাথের দোকান বন্ধ ঘোষণা করুন। ওদের ছুটি দিন।
আমি কবি হলে বলতে পারতাম প্রিয় ঢাকাবাসী আপনাদের বাড়ির দেয়ালগুলোতে যে পুরনো শ্যাওলা পড়ে আছে তা দূর করুন। সবাই সাজগোজ করে ভালো পোশাক পরুন। ট্রাফিক ভাইয়েরা-আজ অন্তুত কোনো রিকশাভ্যান বা অন্য কোনো গাড়ি আটকিয়ে পয়সা হাতিয়ে নেবেন না। আজ খুব বলতে ইচ্ছে করে-ও আকাশ দাও, দাও এক টুকরো জল ফেলে পথের সব ধুলোবালি ময়লা সাফ করে দাও। আজ কুমু আসবে এই শহরে।
এই শহর যেনতেন শহর নয়। এই শহরে আছে রেসকোর্স ময়দান। আছে সালাম জব্বারের শরীরের রক্তাক্ত স্মৃতি। আছে আমাদের শহীদ মিনারের করুণ ইতিহাস। বলতে চাই শহরের মানুষগণ তোমরা অভিবাদন জানাও কুমুকে। আমার তো কোনো লালগালিচা নেই। বাহন নেই। গাড়ি নেই। আমার কিছুই নেই। কুমু এসে কি ভাববে? তবে কী আমি যাবো না এয়ারপোর্টে .. . আমার ভেতরে কষ্টের আগুন. . .
আমি ফায়ার সার্ভিসের কাছে যাই। বলি আপনারা তৈরি থাকুন। আমি পথে পথে ঘুরি। ঘুরতে ঘুরতে যাই শাহবাগ- যাই এয়ারপোর্ট রোড ধরে নিকুঞ্জের কাছে।

. . .আমি কোথাও যাই না। আমি ভণ্ড প্রতারক শঠ শাওন আসগর। আমি আসলে এতোক্ষণ সময় নিয়ে আপনাদের ঘুরিয়েছি। আপনাদের মূল্যাবান সময় নষ্ট করেছি। দিন। কী শাস্তি দেবেন দিন। আমার সাজা হওয়া প্রয়োজন। আমার স্ত্রী আমাকে সাজা দিয়েছে বিনা অপরাধে কোনোদিন তা মুখে উচ্চারণ করতে পারবো না। আপনারাও আমাকে সাজা দিন। আসলে কুমু নামে আমার কেউ নেই। কোনোদিন ছিল না। কোনোদিনই ছিল না।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা