সম্প্রতি

আগের সংবাদ

ওরে কর্ণফুলীরে সাক্ষী রাখিলাম তোরে...

পরের সংবাদ

সপ্তম কাহিনী

মঈন আহমেদ

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ৫:২৫ অপরাহ্ণ

বিজ্ঞ জজ সন্দিগ্ধ চোখে অনেকক্ষণ আসামির দিকে চেয়ে থাকলেন। নেকাবে আবৃত মহিলাকে বেশ চেনা চেনা লাগছে। তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বিশ্বস্ততার সাথে বলছে তোমাকে ইতোপূর্বে আমি দেখেছি।
কোথায়! কোথায়! তার মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো দ্রুততার সাথে কাজ করতে লাগল।
মাননীয় বিজ্ঞ আদালত আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি
এডভোকেট জানে আলম বিচারকের স্তম্ভিত চেহারার দিকে চেয়ে থেকে আরজি পেশ করতে লাগলেন। উকিলের কথায় বিজ্ঞ জজের মস্তিষ্কে স্ফুরণ ঘটল। তাইতো, এই মহিলাকে তো তিনি চেনেন। মাত্র পাঁচ বছর আগে গজারিয়ায় দায়রা জজ থাকাকালীন এই মহিলাই কেঁদে কেঁদে তার স্বামীর বিরুদ্ধে নালিশ করে তালাক চেয়েছিল।
সেদিন দয়া পরবশ হয়ে দেনমোহরের পাঁচ লক্ষ টাকা বাদীকে পনের দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে আসামিকে হুকুম দিয়েছিলেন। অন্যথায় ছয়মাসের বাড়তি জেল খাটতে হবে। আর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করার জন্য একলক্ষ টাকা জরিমানাও করেছিলেন। অনাদায়ে পৃথকভাবে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড।
মহিলার স্বামী, কী যেন তার নাম! না মনে আসছে না নামটা, একদম বোকা বনে গিয়েছিল। সে বারবার অনুনয় করছিল যে তার স্ত্রী সত্য কথা বলছে না। সে তার দ্বিতীয় স্বামী। এই মহিলাটি তার সাথে প্রতারণা করছে। প্রথম স্বামীর বিরুদ্ধেও এই রকমই অভিযোগ দায়ের করেছিল। পুরুষটির উকিল বারবার করে অনুরোধ করছিল জজ মহোদয়ের কাছে। কিন্তু তিনি বিচারকের আসনে বসে তাদের কথা আমলে নেননি। মহিলার পক্ষের চার পাঁচজন উকিল ন্যায়বিচার চেয়ে এমন হুলস্থুল করল যে তিনি অনেকটা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে খসখস করে রায় লিখে দিয়েছিলেন।

মহিলাটি সেদিন বোরকা বা নেকাবের মধ্যে ছিল না। উত্তল কুচের হলুদ বরণ মহিলাকে দেখে ঊনিশ বছর আগে তার সুন্দরী বান্ধবী ইউনার কথা মনে পড়ে যায়। গা-গতরে রূপ-রঙে যেন অবিকল ইউনা তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাঁর ইউনা এভাবে প্রতারিত হবে আর তাঁর কাছে এসে বিচার পাবে না! এ তো হতেই পারে না। ইউনাকে তিনি পাননি। তাতে কী?
সৈয়দ মোহাম্মদ আখন্দ থেকে পাঁচ বছরের ছোট ছিল ইউনা। আখন্দ যখন বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যাই যাই করছে সেই সময় ইউনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে দুধরাজ বুলবুলির মতো গলায় প্যাঁচানো ওড়নাটার একপ্রান্ত পিঠের পিছনে দুলিয়ে ঘুরে বেড়াতো। ইউনার সহপাঠী ছেলেরা হুমড়ি খেয়ে পড়ল। ইউনার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য নানা রকম কসরত চলল কিন্তু ইউনা কাউকেই পাত্তা দিলো না। কমবয়সী ছেলেরা বন্ধু হতে পারে প্রেমিক নয়, এটা ছিল ইউনার আদর্শ। অনেকেই ব্যর্থ মনোরথে স্বমেহনের আশ্রয়ে নিজেদের শরীর হালকা করতে লাগল।
ইউনার সাথে আখন্দকে তার খালোতো বোন সিমাভ পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। ত‚র্য তখন বিসিএস পরীক্ষার প্রবল প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রেম করবে না পড়া করবে! বিপদে পড়ে গেল আখন্দ। এতো সুন্দরী মেয়ে যেন সাক্ষাৎ অপ্সরা। এই সময় ইউনা নিজেই একদিন আখন্দকে উদ্ধার করল।
তুমি পড়ালেখায় মনোযোগ দাও। আমাকে পেতে হলে তোমাকে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। নইলে আমার মা-বাবার সম্মতি পাওয়া দুষ্কর হবে। আমার দিক থেকে তুমি নিশ্চিন্ত থাকো।
ইউনা কথা দিয়েছিল আখন্দকে, ঘরণি হবে।
রূপে রসে সৌরভে ভরপুর ইউনাকে তিনি হারিয়েছেন। ইউনার বাবা-মা তাকে সঙ্গে করে আমেরিকায় বেড়াতে নিয়ে যান। আখন্দকে ইউনা জানিয়েই গিয়েছিল।

ইউনাকে হারানোর অনেক পরে আখন্দ শুনেছিল, আমেরিকায় ড্রাইভার ওয়েটার থেকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারদের লাইন পড়ে যায় ইউনাকে বিয়ে করার জন্য। ইউনা প্রত্যেককে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু তার আপত্তি ধোপে টিকছিল না।
বাবা-মার সাথে মানসিক যুদ্ধে পরাজিত হয়ে একদিন শনিবার রাতে ইউনা একা একটা লিমোজিনে চড়ে চলে গিয়েছিল নিউইয়র্ক থেকে লাস ভেগাস। তার ইচ্ছার প্রাধান্য না দেওয়ায় মা-বাবার ওপর প্রতিশোধ নিতে সে এই কর্মটি করে ফেলে। ভেবেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশে সে নিজের অবস্থান নির্বিঘ্নে করে নিতে পারবে। তারপর কিছুদিন এই-সেই কর্ম করে অর্থ জমিয়ে দেশে ফিরে আসবে। অর্থ উপার্জনও করেছিল সে। করণীয় জানতে আখন্দকে পরপর তিনটা চিঠিও দিয়েছিল ইউনা। কিন্তু কোনো উত্তর না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ে সে। কেলেঙ্কারি করে মা-বাবার কাছে ফিরে যেতে পারেনি। ফিরলে ভালোই হতো। উদার মানসিকতার আখন্দ তাকে ঠিকই গ্রহণ করতো।
আখন্দের কোনো দোষ ছিল না। সে তখন এদিক সেদিক ঘুরে ঘুরে প্রশিক্ষণ নিয়ে বেড়াচ্ছে। যখন একটু থিতু হয়ে তার খালাতো বোন সিমাভের কাছে ইউনার কথা জানতে চাইল তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।
ইউনা নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এক সুইডিশ পুরুষকে বিয়ে করেছিল। কিন্তু বিয়েটা টেকেনি। প্রতারিত হয়েছিল ইউনা।
ইউনারা এভাবেই প্রতারিত হয়। সেদিন বিচারকের আসনে বসে কেবল এই কথাটি মনে হচ্ছিল বিচারক সৈয়দ মোহাম্মদ আখন্দের। তিনি আর সাত-পাঁচ না ভেবে আইনের ছকে ফেলে পুরুষটির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেছিলেন। আজকে বোধহয় ভুল সংশোধনের সময় এসেছে। তিনি হুকুম করলেন মুখ থেকে নেকাব সরানোর।
একজন উকিল দাবি করে বসল, পরহেজগার, আব্রুশীল মহিলার অবয়ব থেকে পর্দা সরানো কি খুব জরুরি, হুজুর?
হ্যাঁ জরুরি। পর্দার আড়ালে যিনি আছেন তাকে স্বচক্ষে দেখতে হবে।

এটা আইনের কোনো বিধিতে নেই বিজ্ঞ আদালত।
কিন্তু আদালত তার অবয়ব না দেখে কোনো শুনানি করবে না।
তাহলে আমাদের অন্য আদালতের স্মরণাপন্ন হতে হবে হুজুর।
আপনাদের সে এখতিয়ার আছে কিন্তু এই মুহূর্তে যেহেতু আদালত একটি হুকুম করেছে সেটা পালন না করলে আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত হবেন।
অতঃপর উকিলদের চাতুরি আর চলল না। মহিলাকে অবগুণ্ঠন উন্মুক্ত করতে হলো। মুখ থেকে ঘোমটাটা সরানোমাত্র আখন্দ চমকে উঠল।
একি! এতো সেই মহিলা। যাকে পাঁচ বছর আগে গজারিয়ার এজলাসে দেখেছে। হুবহু ইউনা। সম্বিৎ হারিয়ে ফেলার অবস্থা। আখন্দের সন্দেহটা সঠিক প্রমাণ হয়। সেই মেয়েটিই তো! ইউনার প্রতিবিম্ব যেন। এই পাঁচ বছরে একটুও শরীরের রসে কষ ধরেনি। সেদিন যেমনটি ছিল আজও তেমনটি রয়েছে। অদ্ভুত!
ইউনা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার দশ বছর পর আখন্দকে একটা সেমিনারে যোগ দিতে আমেরিকায় যেতে হয়েছিল। তিন দিনের সেমিনার ছিল। সুদূর আমেরিকাতে গিয়ে শুধুমাত্র তিন দিনে কেউ ফেরত আসে? আখন্দ পাঁচদিনের বাড়তি ছুটির অনুমতি নিয়ে গিয়েছিল। যে ক’দিন সেমিনার চলে সে ক’দিন সরকারি খরচে হোটেলে থেকে ছুটি কাটাতে তার এক ল্যাংটা কালের বন্ধুর বাসায় উঠল। বন্ধুটা ঢাকা থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে এক মেয়েকে বিয়ে করে শ্বশুরের খরচে বউ নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যায়। সেখানে তারা পড়াশোনা শেষে প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন স্বামী-স্ত্রীতে দুই সন্তানদের নিয়ে বেশ সুখেই দিন কাটাচ্ছে। আখন্দ সেই বন্ধুর আতিথেয়তা গ্রহণ করে।
বন্ধু আর বন্ধু পত্নী একদিন তাকে একটা ক্যাসিনোতে বেড়াতে নিয়ে যায়। দৈবক্রমে সেখানে বার এটেন্ডার রূপে ইউনাকে দেখতে পায় আখন্দ। তার ক্যাসিনো ঘুরে দেখার লোভটা মুহূর্তে উবে যায়। ইউনা কিন্তু আড়ষ্ট হয়নি। সে একটা কোনা দেখিয়ে তাদের অপেক্ষা করতে বলে। আধা ঘণ্টা পরে ইউনা তার সাথে দেখা করতে আসে।
ইউনা কোনো বৃত্তান্ত বলেনি। কোনো কৈফিয়ত দেওয়ার চেষ্টা করেনি। কোনো অনুকম্পাও চায়নি। শুধু বলেছিল, আমি বেশ আছি। আমি একক আছি। অর্থাৎ স্বামী বা ছেলে বন্ধু তার কেউ নেই। এই তথ্য পরিবেশন করার পিছনে কি কোনো উদ্দেশ্য ছিল! হয়তবা। কিন্তু বিচারক সৈয়দ মোহাম্মদ আখন্দের ইউনার প্রতি কোনো অনুকম্পা বা আগ্রহ দেখানোর সাহস হয়নি। আখন্দ তখন দেশে একজন নীতিবান বিচারকের পদে আসীন। তাঁর স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। ইউনার প্রতি আগ্রহান্বিত হয়ে নিজের স্খলন করতে চায়নি।
ইউনার কি আগ্রহ ছিল? কে জানে? কিন্তু ইউনা নিজেকে দমন করে রেখেছিল। পুরানো কোনো স্মৃতিকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেনি। বলেছিল, সে ভালো আছে, খুব ভালো আছে। কিন্তু জজ সাহেবের বাজ-দৃষ্টিতে একদম সেটা মনে হয়নি।
আজ আবার ইউনার সেই মলিন চেহারা ভেসে উঠল স্মৃতির পটে। ইউনা যদিও বলেছিল ভালো আছে কিন্তু আদতে কি সে ভালো ছিল? পোশাকের বাইরে থেকে যৌবনের দ্যুতি ছিটকে বেরোচ্ছিল ঠিকই কিন্তু সেখানে না সুরভি না পবিত্রতা কিছুই ছিল না।
কোর্ট স্ট্যাম্পের ওপরে মেয়েটির নাম জরিনা লেখা রয়েছে। অদ্ভুত তো ইউনা আর জরিনা। আচ্ছা মেয়েটির নাম যদি ইউনা হতো? তাতেই বা কী?
বিচারক সৈয়দ মোহাম্মদ আখন্দ একটু নড়েচড়ে বসলেন। জরিনাকে আর একবার ভালো করে দেখলেন। মনের ভিতরে আফসোসের চাঁদোয়া ছড়িয়ে আকাশের মতো রোমাঞ্চিত শূন্যতার সৃষ্টি করল। তিনি দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়তে দিলেন না। কলমের খোঁচায় পরবর্তী রবিবারে শুনানির দিন ধার্য করে নথিটা পেশকারের দিকে ঠেলে দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

জরিনা ঠিকই চিনতে পেরেছিল বিচারক সৈয়দ মোহাম্মদ আখন্দকে। তাই সে নিজেকে অবগুণ্ঠনের মধ্যে রাখতে চেয়েছিল। হিতে বিপরীত হওয়ার ভয়ে সে নেকাবটা সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়।
জরিনার যখন প্রথম বিবাহ হয় তখন তো সে এরককম ছিল না। স্বামীর সাথে সুখে জীবন কাটাতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই স্বামীর ঘর করতে সে পারেনি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সমায় সে প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে এক ধনীর দুলালের হাত ধরে ঘর থেকে পালিয়ে যায়। গাজীপুরের এক কাজী সাহেব এই অনাচার থেকে রক্ষা করতে তাদের বিয়ে দিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মর্যাদা দেন। কিন্তু তার এই বিয়ে টেকেনি। মাসখানেক সেই ছেলেটার সাথে থেকে ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে যায়। জরিনার বাবা তখন বেঁচে ছিলেন। মেয়ের এই কাণ্ড সমাজে জানাজানি হওয়ার ভয়ে তিনি তড়িঘড়ি করে একটি পছন্দসই ছেলে দেখে মেয়ের বিধিসম্মত বিয়ে করিয়ে দেন। ইউনার প্রথম স্বামীর বিষয়টা সময়ের সাথে ধামাচাপা পড়ে যায়।

তার স্বামীর স্বভাব ভালো ছিল না। তার স্বামী ছিল মদ্যপ। জরিনা সেটা মেনেও নিয়েছিল কিন্তু স্বামীটি রাতে মদ খেয়ে এসে যখন তার ওপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করল তখন জরিনা সেটা মানতে পারেনি। তার প্রতি অবজ্ঞা বা দৈহিক অতৃপ্তি এমনকি শাশুড়ি ননদের গঞ্জনা সবই মেনে নিয়েছিল জরিনা। কিন্তু সরাসরি শারীরিক নির্যাতন মেনে নিতে পারেনি। এমনিতেই কোনো নারীর পক্ষেই শারীরিক নির্যাতন মেনে নেওয়াটা কষ্টকর। তার ওপর সে নারী যদি সুন্দরী হয়! সুন্দরী নারীদের ঘিরে মধু আহরণকারীদের আবর্তন সবকালেই থেকেছে। জরিনার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।
জরিনা পথ খুঁজতে থাকে বর্তমান স্বামীর কবল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য। দৈবক্রমে একজন শুভাকাক্সক্ষী জুটিয়েও নেয় সে। তারই প্ররোচনায় সাহস পেয়ে এক ভোরে স্বামীহারা মায়ের কাছে স্বামীকে ত্যাগ করে উপস্থিত হয়। সেই শুভাকাক্সক্ষীর ইন্ধনে শিশু ও নারী নির্যাতন আদালতে মামলা ঠুকে বিজয়ী হয়ে কিছু টাকাও পেয়ে যায়।
প্রথম স্বামীর কাছ থেকে দেনমোহর ও ভরণ-পোষণের জন্য সর্বমোট পাঁচ লক্ষ টাকা পায়। প্রথম স্বামীর কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করে সে। কিন্তু ছয় মাস না যেতেই এই স্বামীর পরিবারের লোকজন তাকে মানসিক যন্ত্রণা দিতে থাকে। স্বামী মুখে কুলুপ দিয়ে থাকে। সে দিনের পর দিন স্বামীকে এর প্রতিবাদ করতে বলে। স্বামীটি পড়ে যায় বিপাকে। সে পরিবারের অন্য সদস্যদের কিছু বলে না। এটা জরিনা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। এক সময় তার দানাবাঁধা ক্ষোভগুলো বিস্ফোরিত হয়। এবং সেটা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। সে তার স্বামীর বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের আইনে মামলা করে জয়ী হয়ে আরও ছয়লাখ টাকা পায় যার রায় বিচারক সৈয়দ মোহাম্মদ আখন্দ সাহেব দিয়েছিলেন।
জরিনা পরপর দুইজন স্বামীকে ত্যাগ করার পর অনেকটাই উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়ে। রূপ তার তখনও অটুট ছিল। সে বেপরোয়াভাবে চলাফেরা শুরু করে। সম্ভ্রম বা গ্লানির কোনো অনুভ‚তি তার হৃদয়ে অবশিষ্ট ছিল না। তার বাবা একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। মৃত্যুর আগে জীবন ধারণের জন্য তেমন কিছুই রেখে যাননি। পেনশনের টাকায় তার মা ছোট বোনকে নিয়ে কোনোভাবে দিন গুজরান করছিলেন। এমনই দিনে জরিনা এরকম কাণ্ডঘটাতে থাকে। তার মা চিন্তিত হন, জরিনাকে নিয়ে নয় বরং তার ছোট বোন মোহনাকে নিয়ে, মোহনার ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে। জরিনার হাতে নগদ এগারো বারো লাখ টাকা চলে আসায় সে মুক্ত বিহঙ্গের মতো আকাশে উড়তে থাকে। জরিনার বোধহয় জানা ছিল না যে, বিহঙ্গরা উদার আকাশে বাধাহীন মুক্ত উড়ে বেড়ায় সেরকম মাটির বুকে কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আর সে যদি নারী হয় তাহলে তো আরও দুষ্কর।
জরিনার ক্ষেত্রেও সম্ভব হয়নি। সে মুক্ত থাকতে পারেনি। সে এক কোটিপতির খপ্পরে পড়ে যায়। কোটিপতি দশ লক্ষ টাকা দেনমোহরের লোভ দিয়ে তাকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী রূপে গ্রহণ করে। পাঁচ লক্ষ টাকা নগদ দেনমোহর দিয়ে জরিনার সাথে কাবিননামায় নাম লেখায়।
জরিনা আশা করল তার সাংসারিক জীবন বোধহয় শুরু হলো। তার নতুন স্বামী তাকে অভিজাত এলাকায় ভাড়ার ঘরে বসবাস করার ব্যবস্থা করে দিলো। ভালোই চলছিল তার সংসার জীবন। কিন্তু কিছুদিন পরে আবারও বিভ্রাট বাধলো। তার স্বামী একরাতে প্রৌঢ় এক ব্যক্তিকে নিয়ে ঘরে উপস্থিত হলো। জরিনা অতিথিকে স্বাভাবিকভাবে খাতির যত্ন করল। রাত দশটার দিকে তার স্বামী সেই প্রৌঢ় ব্যক্তিকে ঘরে রেখে ‘এখনি আসছি’ বলে সেই যে বাইরে গেল আর ফিরল না। জরিনা একা হয়ে গেল। সে প্রথমে বুঝতে পারেনি পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে। যখন সে বুঝতে পারল তখন মধ্যরাত হয়ে গেছে। সে পুরুষটার কাছে অনেক অনুনয় করল কিন্তু পুরুষটা মানবে কেন? শর্তপূরণ করতেই তো স্বামীটি তার কাছে জরিনাকে সঁপে দিয়ে গেছে।

অনেক সময় ধরে জরিনা পুরুষটাকে মানানোর চেষ্টা করে এক সময় হাল ছেড়ে দিয়ে সম্মতি দিয়েই দেয়। জরিনা ভাবে এর মধ্যে তো তার জীবনে চারজন পুরুষ এসেছে যদি পঞ্চম জন আসে তাতে কীইবা তার ক্ষতি হবে। চামড়ার শরীর যদি স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষের সংস্পর্শে আসে তাহলে ক্ষয়ে তো যাবে না।
পুরুষ তো পুরুষই। তাদের নারীর নরম শরীর দরকার উপভোগ করার জন্য। এতে নারীর শরীর-মনের কী হয় সে-খোঁজ রাখে কজনা।
না জরিনার শরীর ক্ষয়ে যায়নি। কিন্তু স্বামীর পরিবর্তন হয়।
এক্ষেত্রেও স্বামীর কাছ থেকে প্রতাপশালী প্রৌঢ়ের মধ্যস্থতায় আপস রফায় দেনমোহরের অবশিষ্ট টাকা পেয়ে যায়। এবং প্রৌঢ়কে বিয়ে করে সে লন্ডনে চলে যায়।
এই প্রৌঢ় স্বামীটি লন্ডনে নিয়ে গিয়ে রীতিমতো তাকে দিয়ে বেশ্যাবৃত্তি করায়। তাকে সর্বতোভাবে বঞ্চিত করে এমনকি সে দেশে ফেরত আসার অর্থও জোগাড় করতে পারছিল না।
পশ্চিমা দেশে নারীদের নাকি অনেক মর্যাদা দেওয়া হয়। বিভিন্নভাবে জরিনা এই জ্ঞান ধারণ করেছিল। কিন্তু তার জানা ছিল না যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল পুরুষের প্রকৃতি একই। সেখানেও সে বড়রকমের প্রবঞ্চিত হয়ে দিশেহারা হয়ে যায়। দেশের ভিতরে একে-তাকে ধরে একটা বিহিত করতে হয়ত পারতো কিন্তু বিদেশের সমাজের সাথে সে পরিচিত ছিল না। অল্প শিক্ষার জন্য বাইরের কোনো মানুষের সাথে মিশতেও পারতো না। সেখানের কোনো বাঙালি পরিবারই তাকে গ্রহণ করতে পারেনি। কেউই সহায়তার হাত বাড়ানো তো দূরের কথা দুঘণ্টার জন্যও তাকে আশ্রয় দেয়নি। সকল নারীই তাকে ভয়ে, অবজ্ঞায় দূরে ঠেলে রাখে। কারণ সেই পুরুষই। সব পরিবারেই তো পুরুষের অস্তিত্ব রয়েছে।
পুরুষরা সুন্দরী নারীদের সহায়তা করতে রাজি থাকে যদি সে সেই নারীর সঙ্গ পায়। এটা জরিনার জানা ছিল। সে দেহকে হাতিয়ার বানিয়ে সমাজের সাথে সংঘর্ষে নামে। সে এই পুরুষের সাথে ক’দিন ওই পুরুষের সাথে ক’দিন থাকতে থাকতে একজনকে আয়ত্তে করে ফেলে। এভাবে তিন মাস কাটিয়ে কিছু পাউন্ড উপার্জন করে দেশে প্রত্যাবর্তন করে। সে ভেবেছিল আর কোনো পুরুষের সংশ্রবে আসবে না। দিন যাপনের জন্য এটা ওটা সেটা করার চেষ্টা করে। কিন্তু যেখানেই যায় সেখানেই সে নানা রকম ইঙ্গিত আর প্রস্তাব পেতে থাকে। পুরুষ ছাড়া কোনো নারীকে এই সমাজ মেনে নেয় না। একসময় জরিনার ভিতরে জেদ দানা বাঁধে। মনে মনে স্থির করে পুরুষের হাতের পুতুল না হয়ে পুরুষদের সে শায়েস্তা করবে। জরিনা পেয়েও যায় এ রকম এক পুরুষকে। যাকে সে এখন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
জরিনা বিচারক সৈয়দ মোহাম্মদ আখন্দের চেম্বারে গিয়ে সবকিছু অকপটে স্বীকার করে তার নারকীয় জীবনের বিবরণ দেয়।
বিচারক বলেন, কিন্তু এই পুরুষ তো তোমার সাথে প্রতারণা করেনি।
না এখনো করেনি।
তাহলে একে তুমি কেন বিপদে ফেলার চেষ্টা করছো।
এই পুরুষ আমার সাথে কোনো ব্যত্যয় ঘটায়নি এটা ঠিক কিন্তু অঘটন ঘটাতে কতক্ষণ। আমি আর কোনো পুরুষকে বিশ্বাস করি না।
ত‚র্য জরিনাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু জরিনা কোনোভাবে বুঝ মানতে চায় না। তার ভিতরটা অর্থ পিপাসায় তৃষ্ণার্ত থাকে।
নারীদের জন্য সংরক্ষিত আইন এতোই শক্ত যে জরিনার বিস্তার করা জাল থেকে তার নিরপরাধ স্বামীকে মুক্ত করা বিচারকের পক্ষে সম্ভব হয় না।
তবে জরিনা বিচারক সৈয়দ মোহাম্মদ আখন্দকে একটা প্রতিশ্রæতি দিতে বাধ্য হয়। বর্তমান ডিভোর্সটা কার্যকর হয়ে গেলে সে আর কখনও কোনো পুরুষের ঘর করবে না। বিচারক তাকে অনেক বোঝানোর পরে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই স্বামীর ঘর করতে তোমার আপত্তি কেন? জরিনা উত্তর দিয়েছিল এই স্বামীর প্রতি তার কোনো অনীহা নেই কিন্তু তার দেনমোহরের টাকা খুব প্রয়োজন। বলেছিল- আমার বিশ্বাস হয় না কোনো পুরুষকে। আজকে ভালো আছে কাল তার মোহ কেটে গেলে সে যে পূর্ববর্তী পুরুষের মতো আচরণ করবে না এর নিশ্চয়তা কে দেবে, আপনি দেবেন?
বিচারক মহোদয়ের মুখে আর কোনো বুলি আসেনি।
জরিনা বলেছিল, যদি আপনি এই ডিভোর্স মামলার নিষ্পত্তি না করেন তাহলে আমি অন্য আদালতের দোরে গিয়ে কড়া নাড়বো তার চেয়ে ভালো আপনিই এর নিষ্পত্তি করে দেন। যে পুরুষসমাজ আমার দেহ মন নিয়ে খেলা করেছে আমি তার প্রতিশোধ নিতে চাই।
বিচারক মহোদয় বলেছিলেন, ঠিক আছে আমি এই মামলার ফয়সালা করে দেবো কিন্তু তার আগে আমার কাছে তোমাকে একটা অঙ্গীকার করতে হবে।
কী সেই অঙ্গীকার?
তুমি কি আমাকে কথা দিতে পারো যে তুমি আর এরকম আচরণ করবে না। তুমি পুনরায় বিয়ে করে নিজে প্রতারিত হবে না বা কোনো পুরুষকে প্রতারিত করবে না।
জরিনা ভাবল, এই অঙ্গীকারে যদি মামলার নিষ্পত্তি হয়ে যায় তাহলে তার অঙ্গীকার করতে আপত্তি থাকবে কেন? সে কথা দিয়েছিল যে সে আর বিয়ে করবে না। যদি আবার তাকে বিয়ে করতেই হয় তাহলে সে অবশ্যই বিচারক সৈয়দ মোহাম্মদ আখন্দের কাছে আসবে।
পরের এজলাসে বিচারক মহোদয় মামলার নিষ্পত্তি করে দেন।
কিন্তু জরিনার পুরুষ ছাড়া চলবে কিভাবে!