যাত্রীবাহী লেগুনার দোষ ছিল : পুলিশ

আগের সংবাদ

সাধারণ মানুষের ঘরে ঈদ আনন্দ নেই : রিজভী

পরের সংবাদ

লাশ রহস্য

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ২:১২ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ২:১২ অপরাহ্ণ

Avatar

অ্যাম্বুলেন্সের সামনে লাল অক্ষরে লেখা ‘লাশবাহী গাড়ি’। অ্যাম্বুলেন্সটা গ্রামে ঢুকে দক্ষিণ দিকের রাস্তা দিয়ে উত্তর দিকে যাচ্ছে। ইসলাদিগড় গ্রামের তালুকদার বাড়িতে এসে থামল, তখনই ওই বাড়ির বৃদ্ধ মানুষটি হাউমাউ করে কান্না শুরু করলেন। মুহূর্তের মধ্যে বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেল। লাশ আসবে এই বাড়ির মানুষ ছাড়া গ্রামের অন্য কেউ জানত না। তালুকদার বাড়িতে অ্যাম্বুলেন্স দেখে অনেকে হাজির হলো। কয়েকজন তরুণ অ্যাম্বুলের পেছনে আরও একটি প্রাইভেটকার নিয়ে এসেছে। তারাই অ্যাম্বুলেন্স থেকে মৃতদেহ বের করে উত্তর দিকে মাথা রেখে শুয়ে রাখল। গ্রামের মানুষজন মৃত মানুষটার মুখ দেখে বুঝতে পেল এটা জুয়েল। এত এলাকায় জুয়েলকে মেধাবী জুয়েল বলেই জানতো সবাই। জুয়েল তো পড়ালেখা করার জন্য ঢাকায় গিয়েছিল। ওর মৃত্যু কী করে হলো? গ্রামের নানা জনের মনে বিভিন্ন রকমের প্রশ্ন জেগেছে কেউ ভাবছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে, কেউবা ভাবছে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির হাঙ্গামায় পড়ে মারা গেছে। নাকি নারীঘটিত কোনো কিছু হয়েছে কী না! মৃত্যুর কারণ জানার ইচ্ছা অনেকের কিন্তু এই মুহূর্তে কেউ কারণ জানতে চাচ্ছে না। জানার পরিবেশটা এখন না। একজন খুব করে জানার চেষ্টা করছেন। কিন্তু পারছেন না। জুয়েলের বন্ধুরা মুখ খুলছে না। জুয়েলের বড় ভাই রাকিব মৃত্যুর রহস্যটা জানেন। জুয়েলের লাশ আনতে গিয়েছিলেন সে। রাকিব অবশ্য তার বাবাকে জুয়েলের মৃত্যুর কারণটা প্রাথমিকভাবে বলেছিলেন। আর সেজন্যই তার বাবা সন্তানের লাশ দেখে প্রথমে কান্না করেছেন। জুয়েলের মা বেঁচে নেই। ওর মায়ের খুব ইচ্ছা ছিল শিক্ষিত পুত্রবূধর মুখ দেখার। কিন্তু সে সৌভাগ্য আর তার হয়নি। ব্রেস্ট ক্যান্সারে তার মা মারা গেছেন। জুয়েলের মা বেঁচে থাকলে হয়তো আজ সন্তানের মৃত মুখ দেখে তিনি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেতেন।
জুয়েলের পাশের বাড়ির ইন্টারমিডিয়েট পড়ুয়া শাপলা খুব গোপনে কান্না করছে। জুয়েল তার রক্তের আপন কেউ না। কিন্তু রক্তের সম্পর্কে না থাকলেও মনের ভেতর গভীর সম্পর্ক তৈরি করেছে শাপলা। তার জীবনের প্রথম কাউকে ভালো লাগা। শাপলা মনে মনে জুয়েলকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু কোনো দিন বলতে পারেনি। কারণ সে মনে মনে এটাও ভেবে রেখেছিল, আর কয়েক দিন পর ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকায় যাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে মনের জমানো কথাগুলো জুয়েলকে বলবে। কিন্তু সে বলাটা আর হলো না। মনের কথা মনে রেখে দিল। মনের ভেতরের মানুষটা দেহত্যাগ করে আত্মটা পাখিটা নিয়ে উড়াল দিয়েছে। মানুষের মনের ভেতর থেকে প্রাণ গেলে লাশ থাকে। আজ সেই লাশ হয়েছে গ্রামে এসেছে জুয়েল। শাপলার মনের আশা-আকাক্সক্ষা কিছুই পূরণ হলো না। জুয়েলের জন্য সে দোয়াই চাইল। আর মনে মনে ভাবল যে করেই হোক জানতে হবে জুয়েল মারা গেলেন কী কারণে, কীভাবে। মনের ভেতর তার বারবার প্রশ্ন জাগছে। কিন্তু উত্তর কার কাছ থেকে জানবে। এমন আপনজন তো তার কেউ নেই। শুধু অপেক্ষায় থাকা ছাড়া কোনো কিছু জানতে চাচ্ছে না শাপলা।
জুয়েলের গ্রামের বাল্যবন্ধু কাসেম ঢাকা থেকে যারা এসেছেন তাদের কাছ থেকে ঘটনাটা জানার চেষ্টা করল। কিন্তু ওরা কিছুই বলতে চাচ্ছিল না। জুয়েলের মুখে কাসেমের কথা অনেকে শুনেছে। তাই বিশ্বাস করে অবশেষে জুয়েলের মৃত্যুর কারণ কাসেমকে বলে দিল বিশ্ববিদ্যালের বন্ধুরা। কিন্তু অন্য কাউকে বলতে মানা করা হলো। কাসেম কাউকে বলবে না এই মর্মে সে স্বীকারোক্তি দিয়ে রাখল। জুয়েলকে কবর দেওয়ার আগেই তার মৃত্যুর খবরটা মনের ভেতর কবর দিয়ে রাখল কাসেম। এমন মৃত্যুর কথা গ্রামের লোকজনের কাছে না বলাই ভালো। হয়তো তারা এই মৃত্যুটা সহজে মেনে নিতে পারবে না। তাই কাউ বলতে চাচ্ছে না ওরা।
গ্রামের এক ডাক্তার। তার নাম সুমন। তিনি হঠাৎ জুয়েলের লাশের পাশে এসে কী যেন পরীক্ষা করে দেখলেন। একটু পর জোরে জোরে বললেন, ‘জুয়েলকে ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়েছিল। ট্যাবলেটের সংখ্যা বেশি হওয়াতে তার মৃত্যু হয়েছে।’
ডাক্তারের এমন উক্তি শুনে অনেকেই বিশ্বাস করে ফেল। তাহলে জুয়েলের মৃত্যু হয়েছে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে। কিন্তু গ্রামের ডাক্তারের মুখ থেকে যে কথাগুলো বলেছেন, কথাগুলো ডাক্তারকে শিখিয়ে দেওয়া কথা। কারণ ডাক্তারের সাথে রাকিরের একটা চুক্তি হয়েছে। চুক্তিটা হয়েছে টাকার বিনিময়ে। যেন ডাক্তার সত্যি কথা না বলে মিথ্যা কথা বলেন। গ্রামের মানুষের হাত থেকে বাঁচার একটা কৌশল। মানুষ বাঁচার জন্য কত রকমের কৌশল করে থাকে, এটা তাদের বংশের মান-সম্মান রক্ষার কৌশল।
ইসলাদিগড় গ্রামের রাশেদ খান। তিনি এক সাংবাদিক। রাশেদ খান জাতীয় পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি। রাশেদ খানের ছেলের বন্ধু হলো জুয়েল। সাংবাদিক হিসেবে জুয়েলের মৃত্যুর ঘটনাটা জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রথম থেকে সেই থেকে জানার চেষ্টা করছে কিন্তু ঘটনা উদ্ধার করতে পারছে না। জুয়েল কীভাবে মারা গেছে। লাশ নিয়ে যারা ঢাকা থেকে এসেছেন রাশেদ খান তাদের কাছে গেলেন। গিয়ে তাদের নানা ভাবে প্রশ্ন করলেন। জুয়েলের মৃত্যুর ঘটনাটা জানার জন্য। কিন্তু ওরা তাকে বলল না। রাশেদ খান কেন যেন জুয়েলের মৃত্যুর রহস্য আছে এটা বুঝতে পারেন। আর সে জন্য সে ধীরে ধীরে আরও কৌত‚হলী হয়ে পড়েন। চিন্তা করতে লাগলেন। মৃত্যুর মূল কারণটা কীভাবে বের করা যাবে। প্রথমে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন। ঢাকা থেকে জুয়েলের বন্ধুদের বলবেন। তিনি তার এক বন্ধুর কাছে গিয়ে জিগ্যেস করলেন। কিন্তু তিনি মূল ঘটনা না বলে তাকে এড়িয়ে গেলেন। তিনি বললেন সঠিক ঘটনা জানি না। সাংবাদিক রাশেদ খান বুঝতে পারলেন তিনি লুকাচ্ছেন। জুয়েলের বড় রাকিবকে একটু ফাঁকে ডাক দিয়ে নিয়ে বললেন, জুয়েল কীভাবে মারা গেছে, ঘটনাটা একটু আমাকে বলেন। থানা পুলিশ ঝামেলা করতে পারে। ঝামেলা যেন না করতে পারে সে দিকটা আমি দেখব। আমাকে আসল ঘটনাটা বলো প্লিজ।
জুয়েলের ভাই ভাবলেন সঠিক ঘটনাটা বললে কী না কি হয়, এই সমাজে। তিনি প্রকৃত ঘটনাটা না বলে বললেন, ‘আপনি একটু ধৈর্য ধরেন। আমি আপনাকে সব বলব।’
‘ঠিক আছে। অপেক্ষায় থাকলাম।’
সাংবাদিক মানুষ তাই ঘটনাটা জানার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রাশেদ খান আবার ঢাকা থেকে আসা এক জনের কাছে গেলেন। বললেন, আপনারা সঠিক ঘটনা জানেন কিন্তু আমাকে কেন বলছেন না। আমি সাংবাদিক বলে ভয় পাচ্ছেন। ভয় পাবেন না। আমি কারও কোনো ক্ষতি করি না। সব সময় মানুষের উপকার করার জন্যই কলম ধরি।’
‘মানুষ মানুষের জন্য। এ কথাটা তো জানেন। এই মানুষ কিন্তু মানুষের ক্ষতি করেন, এটাও তো জানেন রাশেদ ভাই।’
‘হ্যাঁ, তা জানি।’
‘আমি মানুষকে খুব কম বিশ্বাস করি। আপনাকে বিশ্বাস করতে পারছি না। তাও আবার আপনি সাংবাদিক।’
‘মানুষের উপকার করার জন্যই কিন্তু এই পেশায় এসেছি।’
‘কথাটা শুনে ভালো লাগল। কিন্তু আপনি যে সাংবাদিকতা করেন, নিয়মিত সব পত্রিকা দেখেন। পত্রিকার ছোট বড় সব নিউজ পড়েন। আমার মনে হয় আপনি শুধু প্রধান শিরোনাম আর মফস্বল পাতায় দেখেন আপনার পাঠানো নিউজটা ছাপা হলো কিনা। বাকি নিউজের আর কোনো খবর জানেন না। পড়েনও না। আপনি যে পত্রিকার প্রতিনিধি সে পত্রিকায় নিউজও হয়তো নিয়মিত মনোযোগ দিয়ে পড়েননি।’
‘কথাটা আসলে ঠিক কি না বলতে পারব না। আমি একটু বেশি ব্যস্ত থাকি তো। একটা টেলিভিশন, একটা দৈনিকে আর একটা অনলাইন এবং স্থানীয় দৈনিকেও কাজ করি। আসলে সব দিক দিয়ে সময় করে উঠতে পারি না।’
‘সে জন্য বললাম, আপনি নিয়মিত পত্রিকা পড়েন না। তার প্রমাণ আজ আমি নিজে পেলাম। আর এখনো সব পত্রিকা পড়া কয়েক মিনিটের ব্যাপার। মোবাইলে ইন্টারনেটে নিয়ে সব দেখতে পারেন।’
রাশেদ একটু লজ্জা নিজের দোষ দূর করতে পেয়ে বললেন, ‘আসলে আর কি গতকালে আমার মোবাইলে এমবি ছিল না। তাই সব কিছু দেখতে পারিনি। আসল ঘটনা কী বলেন।’
‘গতকালের পত্রিকা পড়ে দেখেন। জুয়েলের মৃত্যুর কারণ জানতে পারবেন। তবে আপনার জানার পর খবরটা আর কাউকে বলবেন না। বেশি মানুষকে না বলাই ভালো।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ এই বলে রাশেদ খান তার মোবাইলে গতকালের ইপেপার খুঁজে জুয়েলের মৃত্যুর খবর জানার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু ইন্টারনেট লাইন ডিস্টাব করছে। অবশেষে পত্রিকার ডানপাশে এক কলাম নিউজের শিরোনাম দেখতে পেলেন ‘আবাসিক হোটেলে তরুণ-তরুণীর লাশ, পাশে যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট।’
নিউজটা পড়ার পর রাশেদ খানের মনে হাজারো প্রশ্ন জাগল…

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা