কুমিল্লায় সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ পোশাক শ্রমিক নিহত

আগের সংবাদ

চাঁদ না থাকলে

পরের সংবাদ

রফিক আজাদ

রূপসী শব্দের জাদুকর

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ৮:৩৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ৮:৩৬ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

রূপসী শব্দের জাদুকর, কবি রফিক আজাদের (১৮৪৩-১৯১৬) জীবনেও প্রেম এসেছে বারে বার, বিভিন্ন বয়সে, বিভিন্ন রূপে, বিভিন্ন পথপরিক্রমায়, ব্যাকরণের নানা সূত্রে, কখনো সূত্রহীন ব্যতিক্রমী নিপাতনে সিদ্ধ উপাচারে।
প্রেমের কবিতা রচনায় যেমন তিনি সিদ্ধহস্ত, তেমনি ব্যক্তিগত প্রেম পারাবার পাড়ি দিতে গিয়ে অমৃতের চেয়ে গরলই পান করেছেন বেশি। সামাজিক গোত্রপ্রধানদের বেত্রাঘাতে জর্জরিত হয়ে বিষে নীলকণ্ঠ কবি রফিক আজাদের প্রেমের কবিতা অধিক তেজোদীপ্ত হয়েছে প্রণয়ের শক্তিতে, সাহসী উচ্চারণে, অমৃতের আহ্বানে- সাড়া ফেলেছে হৃদয় থেকে হৃদয়ে-
“যদি ভালোবাসা পাই আবার শুধরে নেবো
জীবনের ভুলগুলি;
যদি ভালোবাসা পাই ব্যাপক দীর্ঘ পথে
তুলে নেবো ঝোলাঝুলি।
যদি ভালোবাসা পাই শীতের রাতের শেষ
মখমল দিন পাবো;
যদি ভালোবাসা পাই পাহাড় ডিঙাবো আর
সমুদ্র সাঁতরাবো”।
(যদি ভালোবাসা পাই/ ক. স পৃ. ১২৫)

সত্যিকার অর্থে প্রকৃত ভালোবাসার জন্য তিনি আক্ষরিক অর্থেই পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়েছেন, কত যে কষ্টের নুনসমুদ্র পারি দিয়েছেন কত হাজার বার, তা বলে শেষ করা যাবে না। আমার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য যাই বলি না কেন, কাছে থেকে তার আনন্দ, দুঃখ-বেদনাভার সবই দেখবার সুযোগ হয়েছে আমার। তাঁর সঙ্গে আমি জীবন জড়িয়ে ছিলাম প্রেমের সুবাদে। দীর্ঘ পঁয়ত্রিশটি বছর কাটিয়েছি তাঁর আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-কষ্টের সহযাত্রী, সহমর্মী হিসেবে। একজন কবি হিসেবে জীবনসঙ্গী কবির বেদনাভার বুঝতে চেষ্টা করেছি তাঁর মর্মের গহিন তলদেশে প্রেমের আলো জ্বালিয়ে।
কতটুকু পেরেছিলাম জানিনে, তবে এই প্রচেষ্টায় ত্রুটি রাখিনি। আমি একজন ক্ষুদ্র কবি হিসেবে তাঁর পর্বতপ্রমাণ প্রতিভার মূল্যায়ন করতে পারবো না, তবে ভালোবাসায়, অনুপ্রেরণায় তাঁকে সৃষ্টিশীলভাবে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছি আপ্রাণ। বাংলা কাব্যসাহিত্যের প্রয়োজনের বোধ থেকে তা করেছিলাম। নিজের জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করেছি, তাঁর ভালোবাসার বেদিতলে নিজেকে উৎসর্গ করতে পেরে ধন্য মেনেছি এই জীবনকে।
ইদানিং কবির লেখা ডায়েরিগুলো খুঁজে দেখছি। তিনি যদিও নিয়মতান্ত্রিক ডায়েরি লেখক ছিলেন না। তবে কারু ব্যবহারে কষ্ট পেলে- বা কোনো আনন্দের ঘটনা মনে রাখবার মতো হলে তা লিখে রাখতেন। সে রকম একটি ডায়েরির পাতা থেকে উল্লেখ করছি- তাঁর প্রেমাস্পদকে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক লেখা:-

২৪/১০/৮৩
৩৩, পার্টি হাউজ,
আজিমপুর, ঢাকা

আজ অফিসে যাইনি। প্রত্যেকদিন ভোরেই অফিসে না যাওয়ার ইচ্ছে আমায় পেয়ে বসে। গোলামী ভাল্লেগে না।
শুধু কবিতা লিখে যদি চলতো তবে আর কোনোই চাকরি-বাকরি করতাম না। কিছু করতে আমার একদম ইচ্ছে হয় না। বহুদিন পর মনের মধ্যে প্রচুর ভাবনার মেঘ জমেছে, অঝোর বর্ষণ হতে পারে -কিন্তু সেই পরিবেশ কই! আমি গুছিয়ে ব’সে একাগ্র হ’য়ে বসতে চাই। কিন্তু চাকরী, টাকার চিন্তা, দারিদ্র্য, অসচ্ছলতা আমার ভেতরের পৎবধঃরাব ঁৎমবকে খেয়ে ফেলছে। প্রচুর কবিতা লেখার আছে। লিখতে ইচ্ছেও আছে। এতোটুকুন ছোট একটা কামরা। আমরা দু’জনই তো নই। তাছাড়া অসচ্ছলতা প্রধান অন্তরায়। সাজানো সংসার তো ছিল, ছিল লেখার জন্যে আলাদা ঘর কিন্তু ছিল না মানসিক স্থিরতা, শান্তি। জীবনে কল্যাণময়ী যতœশীল একজন নারীর কি দরকার তা আমার চেয়ে কে আর বেশি জানে।
যাক সে জীবন ফেলে এসেছি পেছনে। আমার প্রেম, আমার জীবন তৃষ্ণাকে ধারণ করে আছে বর্তমানে যে নারী, সে জানে প্রতিভার কদর, নিজে কবি সে কাজেই তাকে আর বিশেষ ক’রে কিছু বোঝানোর প্রয়োজন হয়নি হচ্ছে না। ও তো ভালোবেসেছে আমার কবিতা ও সমগ্র আমাকে: দোষত্রুটিসহ এই সম্পূর্ণ আমাকে। এই শান্তিটুকু আছে বলে আবার শিল্পে সাহিত্যে মন ফিরিয়েছি। যদি বড় কিছু হই তো তাতে ওরই অবদান বেশি থাকবে। ওর ভালোবাসা আমার বাকি জীবনের পাথেয়। আমি ওকে চাই বাংলাভাষার একমাত্র প্রতিভাবান (মহিলা) কবি হিসেবে দেখতে। আমরা দু’জনেই দাঁড়াবো সবার মাথার উপরে উঁচু হয়ে, এই আকাক্সক্ষা আমার। ও একটু কবিতায় মনোযোগী হ’লে আমার আর কিছু চাই না।
এরকম খ- খ- ডায়েরির পাতায় আমার প্রতি তাঁর আবিষ্টতা, আস্থা, প্রণয়-নিগূঢ় নানা অনুভূতিকে প্রকাশ করে প্রচুর চিঠি যেমন লিখেছিলেন তেমনি তার কিছুটা লিপিবদ্ধ আছে ডায়েরির পাতায়। এই ডায়েরির লেখাগুলোর সন্ধান তাঁর জীবদ্দশায় আমি পাইনি। এজন্যে পাইনি যে, আমরা পরস্পর দু’জন মানুষ প্রেমেজারিত মানব-মানবী হলেও অনেক ক্ষেত্রেই কিছু আদর্শ মেনে চলতাম। এর মধ্যে একটি ছিল আমরা কেউ কারু ডায়েরি পড়তাম না। ডায়েরি পড়াটা অসদাচরণ, এজন্যে কেউ কারু ডায়েরি ছুঁয়েও দেখেনি বলে এতোকাল পরে এসব লেখা উদ্ধার হলো- যখন তিনি আর এ জগতের বাসিন্দা নন।

সর্গ-২
আমাদের দু’জনার মধ্যে একটি বোঝাপড়া ছিল এরকম যে, দু’জনের কর্মজীবনের, কর্মস্থলের কোনো বিষয়েই পরস্পর হস্তক্ষেপ করবো না।
আমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে ইডেন কলেজে প্রায় পঁচিশ বছর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছি। এই সময়কালে কবি হিসেবে, কিংবা সাহিত্যের বিচারক হিসেবে অনেকে কবি সাহিত্যিক আমার নিমন্ত্রেণ এসেছেন কিন্তু রফিক আজাদ আসেননি। অনুরূপভাবে কবি যখন সাপ্তাহিক “রোববার” অথবা “ঘরে-বাইরে” এমন কি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক ছিলেন যখন, তখনও গ্রন্থকেন্দ্রের সে পত্রিকায় আমি কবিতা ছাপতে দিইনি। এই পারস্পরিক আদর্শ আমরা ধরে রেখেছি আজীবন।
জানি, শিল্পীর ক্ষেত্রে ছাড় দিলে পিছিয়ে পড়তে হয়। কিন্তু তা জেনেও আদর্শচ্যুত হইনি।
সময়কে তিনি দেখেছেন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে, জীবন নদীর হন্তারকরূপে। সারাজীবন রফিক আজাদ হাতে তাঁর ঘড়ি পরেননি। সময় পরিমাপক যতো ঘড়ি তিনি উপহার হিসেবে পেয়েছেন তাঁর ভক্ত, বন্ধু এবং স্বজনদের কাছ থেকে, দুই একদিনের বেশি কোনোটাই পরেননি। এখনো ঘরে জমা হয়ে আছে ৮/৯টি ঘড়ি। তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত স্মৃতিজুাদু ঘরে জমা থাকবে কবির ব্যবহৃত অন্যান্য তৈজসপত্রের সঙ্গে এই ঘড়িগুলোও।
এই সময় নিয়েই চমৎকার একটি কবিতা আছে কবির সশস্ত্রসুন্দর কাব্যগ্রন্থে। যার উল্লেখ না করলে লেখাটি অসম্পর্ণ মনে হবে।

সময়, তোমার সময় আছে নাকি?
-দাঁড়াও একটু আমার করিডোরে,
ঘরের ভেতর বন্দী আছি-থাকি,
তোমার মুখটি দেখবো প্রাণভরে।

সময়, তোমার বন্ধ করো ঘড়ি
বন্দী-জীবন ধন্য ক’রে মরি।
(প্রতিদ্বন্দ্বী, সশস্ত্র সুন্দর)
সময়ের বন্ধন থেকে মুক্তি কে না চায়? এই মুক্তি কেবলমাত্র মৃত্যুর ভেতর দিয়েই সম্ভব হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের জীবনে। কিন্তু কবি ও শিল্পীরা তাঁদের শিল্প সৃষ্টির মধ্যে দিয়েও এই মুক্তির রসাস্বাদন লাভ করে থাকেন। একইভাবে প্রণয়ের মধ্যে দিয়ে জীবনকে আস্বাদন করেন নিত্যনতুন করিডোরে।
নারী-পুরুষের ভালোবাসা চিরকালের অমর কাব্যের বিষয়। প্রাচ্য সাহিত্যের মহাকাব্য রামায়ণ, মহাভারতে, মধ্যযুগের গীতি কবিতায়, কাব্যে-গানে, উপন্যাসে, নাটকে সর্বত্র বিষয়বস্তু হিসেবে এসেছে নারী-পুরুষের প্রণয় বা প্রেম। রবীন্দ্রনাথ তার গানে বলেছেন,
“প্রেমকে আমার মালা করে গলায় তোমার দোলাবো
রূপে তোমায় ভোলাবো না ভালোবাসায় ভোলাবো”।
-রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক ভালোবাসা, প্রেমের উপলব্ধিজাত অনুভূতির কথা এভাবেই উঠে এসেছে তাঁর গানে, কবিতায়, কাহিনীকাব্যে, নাটকে, কাব্যনাটকে। রফিক আজাদও তাঁর প্রেমাস্পদের জন্যে যুগ-যুগান্তর প্রতীক্ষার কথা বলেছেন তাঁর কবিতায়, একটু ভিন্নভাবে:-
আমি তোমার জন্যে পথপ্রান্তে অশ্বথের মতো
প্রতীক্ষা করবো,
ঐ বৃক্ষ অনন্তকাল ধ’রে যোগ্য পথিকের
জন্যে প্রতীক্ষমাণ-
আমাকে তুমি প্রতীক্ষা করতে বোলো
আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবো অমল বিশ্বাসে,
দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে আমার পায়ে
শিকড় গজাবে
আমার প্রতীক্ষা তবু ফুরোবে না……..।
( কাব্যসমগ্র পৃ. ১৬১)

এই কবিতাটি রচনাকাল ১৯৮১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বরে। তখন আমাদের ভালোলাগা, ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে। পরস্পরকে কাছে পাবার দুরন্ত এক বাসনা বিপরীত স্রোতে বারবার যখন ধাক্কা খেয়ে টাইটানিকের মতো ডুবে যাবার উপক্রম, সে রকম একটা সময়ে তিনি লিখলেন এই কবিতাটি।
কেন আমি আমি এক পা এগুই তো দুই পা পিছিয়ে আসি, তা তিনিও জানেন ভালো। নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করি, অনেকদিন দেখা করি না, ভুলে যাবার ধ্যান রপ্ত করি। তবু কী ভুলতে পারি, পারি না। পারি না বলেই দু’জন দু’জনার জন্যে “প্রতীক্ষায়” অঙ্গীকারাবদ্ধ থেকেছি সমস্ত জীবন।

সর্গ-৩
আমাদের বিয়ে হয় ১৯৮৩ সালের মে মাসের ১২ তারিখে। ৮১, ৮২, ৮৩ সাল পর্যন্ত অসংখ্য চিঠি কবি আমাকে যেমন লিখেছেন, তেমনি বেশ কিছু কবিতাও আছে আমাকে নিয়ে। ১৯৮২ সালের জানুয়ারি মাসের ৩ তারিখে চিঠিতে লিখলেন কবি:-

৩/১/৮২
রাত ৩.১৫
দিলা, আমার দিলা,
তোমার মুখোমুখি, পাশাপাশি অনেকদিনই তো বসেছি, অনেক প্রয়োজনের, অপ্রয়োজনের কথা হয়েছে, হয়েছে আধুনিক কবিতা নিয়ে দীর্ঘ নিরবচ্ছিন্ন আলোচনা। মাঝে মধ্যে তোমার দু/একটি কথায় কষ্ট পেয়েছি; হয়তো আমার অগোচরে আমিও তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। কিন্তু পরস্পরকে আমরা কতোটা চিনতে পেরেছি বা প্রকাশ করতে পেরেছি? আমি কিন্তু সত্যি বাকপটু নই একটুও। নীরব ভাষায় নিজেকে যতোটা প্রকাশ করতে পারি, তারো চেয়ে অনেক কম পারি ভাষা ব্যবহারে। গভীর গোপন কোনো কথা কি ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব? আমার ধারণায় নেই, তোমার আছে?
তোমাকে আমার খুব ভয় হয়।
ভয় এই কারণে যে, পাছে তুমি আমায় ভুল বুঝে না বসো;
তা-হলে আমার বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। ভয় এই কারণে যে, আমার কোনো কথায়, কোনো ব্যবহারে তুমি আঘাত পাও, তা আমি চাই না।
তোমাকে ভয় এ কারণেও যে, তোমাকে আজো আমি পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারলাম না;- অথচ তুমি মোটেই রহস্যময় নও, নও মোটে অস্পষ্ট চরিত্রের মানুষ তুমি মোটামুটি খোলামেলা এবং দিবালোকের মতো পরিষ্কার। তবুও ভয়…….
তোমার সর্বাঙ্গীণ মঙ্গলই আমার কাম্য : আমি চাই কবি হিসেবে শক্তভূমিতে দৃঢ় পায়ে অন্য সবার মাথার উপর, অনেক উপর উঁচু হয়ে দাঁড়াও এবং সর্বোপরি ভালো থাকো। তোমাকে আমি সুখী দেখতে চাই, দেহ-মনে সুস্থ, প্রাণোচ্ছল, হাসিখুশি।
তুমি কতো সহজে সামান্য ব্যাপার নিয়ে কবিতা লিখতে পারো, আমি পারি না। তাৎক্ষণিক ব্যাপার আমার পক্ষে লিখে-ওঠা খুব কষ্টকর। তুমি নিজেই তো দেখেছো, তোমার খাতায় লেখা কবিতাটি। তুমিই তো মন্তব্য করেছিলে, ‘উপদেশ’। কিন্তু আমি মোটেই ওই অর্থে লিখিনি ওটা সেদিন। ‘জেগে-ওঠা’ বলতে আমি অন্যকিছু বোঝাতে চেয়েছিলাম, বোঝাতে পারিনি, আমারই ব্যর্থতা সেটা। ওটা তো কবিতা ছিল না, ঐ লেখাকে চিঠিই বলতে পারো। কিন্তু ঐ যে আমি বলেছি, ভাষা-ব্যবহারে কোথায় যেন একটা মধঢ় র’য়ে যায়। আমি কথা কম বলতে চাই ঐজন্যেই, চোখের ভাষায় বলতে চাই মনের কথা। একটি/দুটি ক্ষেত্র ছাড়া আমি প্রধানতই রূঢ়- আমাকে অন্য অনেকে নিষ্ঠুর গু-া প্রকৃতির লোক বলেই জানে, বুঝলে কোমল পাথর!
তোমার সঙ্গ আমাকে শান্তি দ্যায়। গ্রীষ্মকালে, দুপুরে শীতল পানীয়ের চেয়েও শান্তি প্রদায়িনী তোমার সঙ্গ। বলতে দ্বিধা নেই তোমাকে খুব করে কাছে পেতে চাই, আরো দীর্ঘ দীর্ঘক্ষণ; অথচ তোমাকে আঘাত করে নয়, তোমার দিক থেকে কোনো দ্বিধা বা অসম্মতি বা বিন্দুমাত্র তোমার মর্যাদা ও অভিমানকে আহত ক’রে নয়। আমি জানি, এ আমার অসঙ্গত, অসমীচীন চাওয়া। তুমি কি আহত হলে?
যাকগে। তুমি কবিতা লেখার জন্যে চাপ দিচ্ছিলে। কবিতা এবং জীবনে আমি কোনো পার্থক্য করি না। আমি যা ভববষ করি জীবন দিয়ে তাই লিখি, এজন্যেই না-পাওয়ার, বিষাদের, বেদনার কবিতায় আমার বই ভরপুর। ব্যর্থতা ছাড়া আমার কোনো মৌলিক আন্তরিক অভিজ্ঞতা নেই যে দিলা! ব্যর্থতার কথা লিখতে বড় কষ্ট হয়, হৃদয়তন্ত্রীতে ক্যানেস্তারার মতো ঝন্ঝন্ শব্দ ওঠেও আমি আর লিখতে চাই না; না-পাওয়ার কথায় আমার কবিতা বড়বেশি ভারী হয়ে আছে, আহত হয়েছি বারবার। ঐ ধরনের কবিতার সংখ্যা আর বাড়াতে চাই না। তার বিদ্রোহ বিপ্লবের কবিতা বরং লিখবো। সেক্ষেত্রেও কোনো নারীর আন্তরিক প্রেরণা আমার প্রয়োজন, কোনো বিপ্লবী পার্টির নয়।
তোমাকে আমি বিপদে ফেলতে চাই না, তোমার সম্মুখের সুন্দর জীবনকে আমি নষ্ট করতে চাই না। আমি চাই তুমি আরো সুন্দর হয়ে ফুটে ওঠো, আমি প্রাণভরে দেখি। তোমাকে খুব বড় প্রতিষ্ঠিত দেখতে চাই। তোমার মধ্যে যে বিপুল বিশাল সম্ভাবনা আছে, তাকে সম্ভব করে তোলো। উপদেশ নয়, আন্তরিক আকাক্সক্ষার কথাই বললাম।
আমার কিছু ভালো লাগে না। সারাজীবন এলোমেলো চললাম। ভেবেছিলাম সংসারে আবদ্ধ থেকে, বন্ধু সঙ্গ পেয়ে মোটামুটি কাটিয়ে দেবো কায়ক্লেশে জীবনটা। কিন্তু হলো কৈ! পরিবর্তে দিন-দিন নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছি। বাধ্য হয়েই আমি পানীয়ের শরণাপন্ন হয়েছি, বিলাস বা ফ্যাশানের কবলে পড়ে নয়। পানীয় আমাকে ভুলে থাকতে সাহায্য করে, অনেক অপমান, দুঃসহ যন্ত্রণা, কষ্টকর জীবনযাপনের গ্লানির হাত থেকে রক্ষা করে। আমাকে উদ্ধার করার জন্যে পানীয় ছাড়া অন্য কোনো সমুজ্জ্বল হাত এগিয়ে আসেনি তো।
আমার কিছু ভাল্লাগে না।
অনেক আবোলতাবোল লিখলাম।
নিজ গুণে ক্ষমা করে দিও। তোমার একটা স্পষ্ট, অ-দ্ব্যর্থক দীর্ঘ চিঠির প্রত্যাশায়।

তোমার
‘জীবন’
[ওটাই আমার ডাক নাম]

সর্গ-৪
এই সময় পরিসরে আমারও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব শিমুল তুলোর মতো খুব উড়তে শুরু করে দিলো। টাঙ্গাইল সরকারি কুমুদিনী কলেজ থেকে বদলি হয়ে ঐতিহ্যবাহী ইডেন মহিলা কলেজে যোগদান করেছি সবে। বিশাল ক্যাম্পাস, ক্যাম্পাস সংলগ্ন দুটি ছাত্রী হোস্টেল। তার একটিতে সহকারী হলসুপারের দায়িত্ব পেয়েছি আবাসন সুবিধাসহ। দুই কক্ষ বিশিষ্ট আমার আবাসনটি ছিল নতুন হোস্টেলের ছাত্রীকক্ষের গা-ঘেঁষে। কান পাতলে ছাত্র-শিক্ষক যে কারু কথাই পরস্পর শুনতে পারা যেতো। প্রথম মাসখানেক একা, এরপরেই মফস্বল শহর মানিকগঞ্জ থেকে দুই ভাই-বোনকে এনে, ঢাকার আজিমপুর গালর্স হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে শেলিকে, ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে ভাই শীতলকে ভর্তি করে দিলাম নবম শ্রেণিতে।।
প্রথমদিন থেকেই তৃতীয় বর্ষ অনার্স এবং এমএ ক্লাসের ছাত্রীরা আমার ক্লাস লেকচারে বিমুগ্ধ, অভিভূত। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মহাকাব্য “মেঘনাদবধ কাব্য” অতি সহজ ও তরল করে পড়াতে পেরেছি- এটাই আমার প্রাথমিক যোগ্যতা বিচারক ছাত্রীদের কাছে। অতঃপর সাহিত্যতত্ত্ব ও ছন্দ পড়িয়ে আরো জনপ্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠেছিলাম অল্পদিনেই। বিভিন্ন বিভাগের সিনিয়র সহকর্মীরা আমার জন্যে পাত্র খোঁজেন ভালোবেসে, তারা আড়ে-ঠাঁড়ে কথা বলেন বুঝতে পারি সব। কিন্তু শৈল চূড়ায় নীড় বাঁধার মতো আমার মনের মধ্যে যে বাসা বেঁধেছে শতবর্ষ সাধনার ধন “প্রেমরোগ”। এই রোগে আক্রান্ত আমি, সে কথা কারুকেই জানাতে পারি না আর।
কী করবো আমি? কি করা উচিত, বুঝতে পারছিলাম না যেন কিছুতেই। কবির প্রতি দুর্বার টান অধিকন্তু তাঁর অসহায়, পর্যুদস্ত অবস্থা বিবেচনায় এনে একজন নবীন কবি হিসেবে প্রতিভাধর বিখ্যাত এ একজন কবিকঅগ্রাহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। বারবার শক্তি হারিয়ে ফেলি, নিজের কাছে নিজেকেই খুব অচেনা মনে হয়। বাইরের কঠিন খোলস ভেদ করে ফুলের রেণুর মতো কোমল ও সোনালি হৃদয় নিয়ে বসে আছেন যে কবি, কী করে ফেরাই তাঁকে।
সারাক্ষণ মাথার মধ্যে একই চিন্তা, কী করে ফেরাই তাঁকে?
সংসার-জঞ্জালে বাঁধা যে জীবন তাকে নিয়ে আর যাই হোক সময়ক্ষেপণও সঙ্গত নয়। এ রকম শতমুখ কণ্টকে ছিন্নভিন্ন সময়ের প্রহরী দুজনেই আমরা। কোথাও নিরিবিলি বসবার মতো জায়গা নেই। প্রথম থেকেই একটি “রেস্তোরাঁ এ্যান্ড বার সাকুরা”ই ছিল আমাদের আলাপনের নিভৃতিস্থল। সেটি ছিল কবির উপার্জনের তুলনায় ব্যয়বহুলই বটে। তবু এছাড়া আর কোনো উপায়ও আমাদের ছিল না। এ যুগের মতো এতো সাহসী ছিল না সে যুগের সেই প্রেম। লুকিয়ে-চুরিয়েই নিজের পথ করে নিতে হতো তাকে। মধ্যযুগের “কাম” সবে আধুনিক যুগে এসে তবে না “প্রেম” নাম ধারণ করেছে। কাজেই দিন-ক্ষণ-সময়ের জন্যে অপেক্ষা করতে হতো আমাদের। ধরা পড়লে প্রাচীন যুগের মতো মৃত্যুদণ্ড হয়তো হতো না, কিন্তু সমাজের দণ্ডমুণ্ডদের সঙ্গে জীবনপণ লড়াইটিও কিছু কম নয়-যা জীবনরস শুষে নেয় অনেকটাই।
“সাকুরা”র বাইরে প্রথম সকাল দশটা থেকে ২টা অবধি ৪ ঘণ্টা আমরা সময় কাটিয়েছিলাম একসঙ্গে, বোটানিক্যাল গার্ডেনে। প্রস্তাবটি ছিল কবির দিক থেকে। না করতে পারিনি। এতো ভালোবাসা তো পাইনি জীবনে, এমন কী দেখিওনি অন্যের জীবনে। কাজেই না করবো কোন্ দুঃসাহসে।
ওর হাত ধরে সেই আমার প্রথম ঢাকার বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখা। নানারঙ বাহারি ফুলের সমাবেশ ছাড়িয়ে খুঁজে পেতে ঘন বাঁশঝাড়ের ছায়াচ্ছন্ন তলায় বসে, ঝরাপাতার কার্পেটের মর্মর ধ্বনি শুনে কাটিয়েছিলাম সময়টুকু। কথক আমি, ফুলঝুড়ির মতো কথা ছোটে আমার, কবি কেবলি নির্বাক শ্রোতা। সবিস্ময়ে কেবলি শুনলেন। বললেন খুব কম।
এর পরদিন তিনি দুটি কবিতা লেখেন “তোমাকে কাছে পেয়ে” এবং “একটি দুপুর”। কবিতা দুটোই কবির “একজীবনে” কাব্য গ্রন্থে ঠাঁই পেয়েছে। শুরুটা করেছিলেন এইভাবে:-

সমস্ত শরীরময় বেজে ওঠে সুখের সঙ্গীত,
ধমনীতে উদ্দাম নৃত্যের শব্দ শুনি,
শিরায়-শিরায় দ্রুত শিহরণ জাগে:
চতুর্দিক ব্যেপে আনন্দ, আনন্দ শুধু-
হৃদয়তন্ত্রীতে ওঠে গুঞ্জরিত সুরের লহরী;
সারা জীবনের সকল বিষাদ খেদ
মুহূর্তেই ঝ’রে যায়,-পাপ-তাপ, ব্যর্থতার গ্লানি
ধুয়ে মুছে যায়;
বেঁচে থাকা খুব অর্থময় হ’য়ে ওঠে
প্রকৃতিও অপূর্ব সৌন্দর্য তার মেলে ধরে আজ
এই হতদরিদ্রের চোখের সম্মুখে;
অকৃপণ উদারতা জেগে ওঠে হৃদয়ে আমার:
ধুলোকাদা থেকে আমি ভালোবেসে কোলে তুলে নিই
শত্রুর সন্তান;
অপরাহ্নে পেয়ে যাই ভোরের আস্বাদ,

তোমার কথার পাখি
খুশিতে বিহ্বল হ’য়ে ডানা ঝাপ্টে চ’লে আসে দ্রুত
আমার আকাশে
দিনমান ব্যেপে শুধু পাখি-ডাকা ভোর
জেগে রয় আমাদের ঘিরে;
আন্দোলিত হ’তে থাকে
বাতাসে উড্ডীন ভালোবাসার পতাকা;
মেদে-মাংসে স্থূলকায় এই দেহ ফিরে পায় দ্রুত
ব্যালে-শিল্পীর শরীর,
আনন্দে-আবেগে-প্রেমে জেগে উঠি সুখের সঙ্গীতে।।
(তোমাকে কাছে পেয়ে/ ক. স. পৃ ১৯৫)

বোটানিক্যাল গার্ডেনের সেই দুপুরকে নিয়েই রচনা করেন কবি “একটি দুপুর” নামক অপর কবিতাটিও। সেখানেও দিনমাসবর্ষব্যাপী প্রতীক্ষার পর কবির ব্যক্তি জীবনেই পেয়ে যান মানবেতিহাসের অনন্য একটি দুপুর। কবির ভাষায় :
কতো যে দুপুর গেছে আমার জীবন থেকে খ’সে
নিষ্পত্র বৃক্ষের মতো নিঃস্ব, রিক্ত, নিঃসঙ্গ, একাকী;
দিনমাসবর্ষব্যাপী প্রতীক্ষার পর উপহার পেয়ে যাই
তোমার কল্যাণে এই সবুজ দুপুর।

তোমার সমগ্রে আছে মন্দিরগাত্রের সোনাদানা,
তোমার ঔজ্জ্বল্যে কেটে যায় সকল আঁধার!
তোমার সান্নিধ্যে কাটে মানবেতিহাসের অনন্য
একটি দুপুর :
একটি দুপুর কাটে দীর্ঘক্ষণ
তোমার দু’চোখে খুব গভীর তাকিয়ে : অবাস্তব
এই বাঁশঝাড়ে আজ আমরা দু’জন প্রকৃতির
অবিচ্ছেদ্য অংশ হ’য়ে যাই-
দিনমাসবর্ষব্যাপী প্রতীক্ষার পর উপহার
পেয়ে যাই তোমার প্রশ্রয়ে এই অনন্য দুপুর।।
( ক. স. পৃ.-১৯৬)

সর্গ-৫
ভালোবাসার খোপে খোপে বাস করে মান-অভিমানের পায়রা। বাকুম বাকুম শব্দধ্বনিতে যেন ব্যঞ্জনা পায় অভিমানের আকাশ। চির বসন্তের এই দেশে যুক্তিহীনভাবে প্রেমে পাগল দু’জন মানব-মানবী বেজায়রকম স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে পরস্পরের প্রতি। এরকম মধুরপতর সময়ে অপ্রিয় সত্যকথন ভালো লাগে না কারু কিছুতেই। অধিকন্তু, ভাষা ব্যবহারে সামান্য এদিক ওদিক হলেই যেন আর রক্ষে নেই কারু। কবিতে কবিতে ভাষার ব্যবহার বলাই বাহুল্য, ধারে কাটে, নয়তো ভারে কাটে। আজো মনে আছে সেদিনটি ছিল ’৮২ সালের জানুয়ারি মাসের ১৭ তারিখ।
কবির অফিস ছুটির পরে বাংলা একাডেমির গেইট পার হয়েই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বরাবর দু’জনে হাঁটতে শুরু করেছি । লক্ষ্য হাঁটতে হাঁটতে “সাকুরা” গিয়ে বসবো কিছুক্ষণ।
নিরিবিলি কবিকে কিছু কথা বলার ছিল আমার- তা সে আগে থেকেই জানতেন, হয়তোবা অনুমানও করতে পেরেছিলেন যে, কী বলতে চাই আমি। কিন্তু এতো অপাঙ্ক্তেয় হবে সে কথা, তা কিন্তু বুঝতে পারিনি মোটেই আমি। নইলে কি আর এমন সত্য কথা বলে বিপদে পড়ি।
বাড়ি থেকে অনবরত বিবাহের চাপ আসছে- সেটি নিয়েই হয়তো কথা বলবো। কিন্তু না, হাঁটতে হাঁটতে মৃদুস্বরে কেবলি বলেছি “গতকাল আমাকে একজন পাত্র দেখে গেছে কিন্তু”।
আর যায় কোথা!!!
সঙ্গে সঙ্গে হাঁটা বন্ধ করে প্রায় বার/তের মিনিট সময় স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন আমার চোখের দিকে, আমিও স্থির দাঁড়িয়ে আছি তাঁর দৃষ্টির সম্মুখে যেন এক মস্ত ‘উঠপাখি’-সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার মতো “কোথায় লুকাবে, ধু ধু করে মরুভূমি, আজ দিগন্তে মরীচিকাও যে নেই / ক্ষয়ে ক্ষয়ে ছায়া মরে গেছে পদতলে শেষে মনে হলো হয়তো তিনিও সুধীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে চান- “তুমি বিনা তার সমূহ সর্বনাশ”।
সেদিন পরে সাকুরায় গিয়ে কিছুক্ষণ বসেছিলাম দু’জন। সুরের তাল-লয় কেটে গেলে যেমন হয়, আলাপ আর জমলো না তেমন। তাছাড়া আমিই তো বেশি বলতাম, কবি কেবল সবিস্ময়ে শুনে যেতেন আমাকে। উদ্যান পেরুতে গিয়ে হঠাৎ ওরকম দমকা হাওয়ার মতো ওকে বয়ে যেতে দেখে আমিও কেমন যেন একটুবা আড়ষ্ট হয়ে পড়েছিলাম ফলে সামান্য চা নাস্তা খেয়ে যে যার গন্তব্যের দিকে পালিয়ে বাঁচলাম। পরের দিন সদ্যরচিত কবিতা ‘এতো বড়ো দণ্ড কেন দিলে?’ আমাকে পড়ে শোনালেন টেলিফোনেই। এবার সেই আগের মানুষ, প্রেম-পিপাসু, প্রেমাস্পদন-

উদ্যান পেরুতে গিয়ে তোমার কথায়
বিমূঢ়, বিহ্বল, অন্ধ-জীবনে কখনো
যে শব্দ প্রয়োগ করবো না
সেই শব্দ উঠে আসে অজান্তে আমার:
কিংকর্তব্যবিমূঢ়!

মনে হয় এই তেরো মিনিটে আমি
তেরো বছরের দুঃখময় দিনগুলি
পারি দিয়ে এসেছি দুঃসহ
এই একদেহে একজীবনেই পঞ্চ-পা-বের
সমস্ত দুঃখের দিন, দিন যাপনের ক্লেশ
বারো বছরের নির্বাসন আর এক বছরের
অজ্ঞাতবাসের পর ধ্বস্ত, নিঃস্ব, রিক্ত, ক্লান্ত আমি
তোমার মুখের দিকে, দণ্ডদাত্রী, তাকাতে পারি না-
শেষ-বিকেলের আলো এসে পড়েছে তোমার মুখে……

কোমল পাথর, তুমি এতো বড়ো দণ্ড কেন দিলে?।
(ক. স. পৃ. ২০২)

এই সময় পর্বে কবি আমাকে “কোমল পাথর” বলে সম্বোধন করতেন চিঠি-পত্রে এবং কবিতায়ও। আমার হৃদয় কোমল কিন্তু মন কঠিন, কঠোর কখনো কখনো পাথরের মতো শক্ত। (এভাবেই ব্যাখ্যা করতেন তিনি)
কাজেই আমার নাম দিয়েছিলেন “কোমলপাথর”। দিলা, মানু, মুমু বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে ডাকতেন। তবে শেষের ৮/১০ বছর “মুমু” নামে ডেকেছেন সর্বদাই। কখনোই সন্তানের নামে, সন্তানের মা হিসেবে ডাকেননি তিনি। তাঁর সম্বোধনের মধ্যে, তাঁর কণ্ঠস্বরে সর্বদা একজন প্রেমিক পুরুষ বাস করতো। সর্বশেষ স্ট্রোকে আক্রান্ত কবি যখন সোফা থেকে উঠতে গিয়ে বাম দিকের পাটা টেনে তুলতে পারছিলেন না তখন আর্তস্বরে ও উচ্চকণ্ঠে দু’বার মুমু, মুমু বলে ডেকেছিলেন। সেটি তার শেষ উচ্চারিত ডাক। এরপর আর কথা বলতে পারেননি তিনি।

সর্গ-৬
তিন বছর প্রণয়ের পরে ১৯৮৩ সালের ১২ মে আমরা পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হই। গরিব কবির স্ত্রী যে হতে যাচ্ছি এই হিসেবে আমি ভুল করিনি। তবে কোনো একসূত্র থেকে কবি দশহাজার টাকা পেয়েছিলেন বলে আমার সঙ্গে বিয়েটা কবুল পর্যন্ত গড়াতে পেরেছে। বিবাহের জন্যে একটা শাড়ি ও আংটি কেনার জন্যে আমার হাতে উঠিয়ে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। আমি আমার বোনকে সঙ্গে নিয়ে নিউ মার্কেট থেকে অফ হোয়াট কালারের জরির পাড়ের একটা কাতান কিনেছিলাম আড়াই হাজার টাকায়। অনামিকার মাপে ছোট ছোট সবুজ পান্না পাথর বসানো একটা আংটি কিনেছিলাম হাজার খানেক টাকায়। বাকি টাকায় পেটিকোট, ব্লাউজসহ টুকিটাকি কেনাকাটা সেরে ইডেন কলেজ হোস্টেলের বাসায় ফিরে আসি। আমার বাবা, মা, ছোটবোন রানু ফেরদৌস, এক চাচাতো বোন চাহেনা আপা, জসীম দুলাভাই, আমার একমাত্র সিনিয়র বান্ধবী ক্যামেস্ট্রির শিক্ষক লতিফা আপা (তিনি হোস্টেল সুপার হিসেবে হলেই থাকতেন) এরাই ছিলেন বিয়ের দিনের উপস্থিত মেহমান। বরপক্ষে রফিক আজাদ ছাড়া তাঁর একমাত্র অনুজবন্ধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম মুস্তফা উপস্থিত ছিলেন। কাব্য জগতের অভিভাবক হিসেবে সৈয়দ শামসুল হক ভাইকে আমি জানিয়েছিলাম যে, আমরা বিয়ে করতে যাচ্ছি। তিনি সম্মতি দিয়েছিলেন এবং একজনের বেশি সন্তান না নিতে উপদেশ দিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত সে কথা মানতে পারিনি। আমাদের দু’জনের ইচ্ছেতেই দু’জন সন্তান নিয়েছি, তবে কন্যা সন্তানের আকাক্সক্ষা অপূর্ণ রয়ে গেছে।
অভিন্ন, অব্যয় দু’জন সন্তানের নাম তিনিই রেখেছেন। অভিন্নের জন্মের পর দীর্ঘ একটি কবিতা লিখেছেন, “পরিকীর্ণ পানশালা আমার স্বদেশ” শিরোনামে। নামকবিতার নামানুসারে কাব্য গ্রন্থের নামকরণ করেছেন কবি। ১৯৮৪ সালে ১৯ জুন মাসে অভিন্নের জন্ম হয় ডা. মেহেরুন্নেসার ক্লিনিকে। ঘষামাজা শেষে কবিতাটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় ৩০ জুন।

চাঁদরাতে উপচে-পড়া পানশালা গুঞ্জনে মুখর!
পাঁচদিন আগে বহু প্রতীক্ষিত পঞ্চম সন্তান
মায়ের শ্যামল কোল আলো ক’রে ভূমিষ্ঠ হয়েছে;
তোমরা কেউ ভিন্ন নও, অভিন্ন হে পুত্রকন্যাগণ,
কারু প্রতি বিন্দুমাত্র কম আবেগ আমার নেই,
আমি পিতা: তোমরা আমার খুব প্রিয় সন্তানেরা
ভিন্ন দুই ঠিকানায়, আপাতত, এখন রয়েছো;
প্রত্যেকের প্রতি আছে রক্তের উচ্ছ্বাসময় এক
অভিন্ন আবেগ :
(ক. স. পৃ. ২৮২)
১৯৮৪ সালের ডিসেম্বর মাস। অভিন্নের বয়স তখন ছয় মাসের মতো হবে। শিশুটিকে নিয়ে আমাদের গ্রামের বাড়ি গড়পাড়া যেতে ইচ্ছে হলো। ভাই-বোন দু’জন আমার কাছে থাকলেও মা-বাবা থাকেন গড়পাড়াতে। কাজেই বাবুকে ২/৩ দিনের জন্যে তার নানাবাড়ি দেখাতে নিয়ে গেলাম সেখানে। জীবন যেতে পারলো না। আমাকে সকালে মানিকগঞ্জগামী বাসে তুলে দিয়ে আজিমপুর পার্টি হাউজের বাসায় ফিরে এলো একা। ফিরে এসে সে ডায়েরিতে লিখলেন :

৬/১২/১৯৮৪
পার্টি হাউজ,
আজিমপুর
মানু বাবুকে নিয়ে গড়পাড়া গ্যালো। সকালেই তুলে দিয়ে এলাম। রাস্তায়, রিকশায় তেমন কিছু মনে হয়নি। কিন্তু ঘরে ফিরে অসম্ভব খারাপ লাগছিল। সবকিছু অর্থহীন। সবটা ঘর, এত্তোটুকুন তো ঘর, একদম ফাঁকা-ধু ধু প্রান্তরের মতো মনে হচ্ছিল। ভিতর থেকে মনমরা হয়ে গেলাম। যতোই মনকে বোঝাই মাত্র তো দুটো/তিনটে দিন। দেখতে দেখতে কেটে যাবে!
নাহ্, দম আটকে আসছিল। টেবিলপত্র গোছগাছ ক’রে লেখাপড়ায় মন দিয়ে দেখি। না, কিছুতেই মন বসছে না পড়ায়। লেখার তো প্রশ্নই আসে না। বাবুর দুষ্টুমিগুলো, মানুর নানা কথা, হাসির ধরন, পাগলামি সবকিছু মনে পড়ে আমাকে এলোমেলো ক’রে দ্যায় ভেতর থেকে। ওকে ছাড়া শুতে, খেতে, পড়তে কিছুই ভালো লাগছে না। এমতিতে অনেকদিন যায়, অথচ আজ খুব ইচ্ছে করছে ওকে পেতে একান্ত ক’রে। অসহায় লাগছে খুব। ছোটো বাচ্চার মতো নির্ভরশীল হ’য়ে পড়েছি যে কবে নিজেই জানি না। খেতে গিয়ে রাগ ধরে। একা খেতে বিষের মতো লাগে খাবারগুলো। আমি ওকে এতো ভালোবাসি?
আশ্চর্য! নিজের ব্যবহার, আচরণ, ভালোবাসার বোধ আমার নিজেরই অজানা ছিল। শুধুই অভ্যেস হ’লে কথা ছিল- বুকের মধ্যে এতোটা খারাপ লাগে কেন?- ভালোবেসে বহু লোক বিয়ে করে।-কিন্তু আমি হয়তো ঐ বহুলোকের বাইরে কেউ। আমি ভালোবাসার কাঙাল, ভালোবাসায় অন্ধ। আমি অন্ধভাবে, অযৌক্তিকভাবে ভালোবাসি। যদি, কোনোদিন ইবঃৎধু ক’রে, জানতে পারি, সম্ভবত ওকে আমি খুন করতে পারবো।
আমি ওকে ‘স্ত্রী’ হিসেবে চাই না, ও আমার সারাজীবনের প্রেমিকা। আমার এই প্রেম যুক্তির অতীত। ওর শরীরকে আমি শিখদের স্বর্ণমন্দিরের মতো ক’রে জানি। এইখানে কারু হাত পড়লে তার রক্ষা নাই। ও কি জানে আমি ওকে কতোটা ভালোবাসি? দূরে না গেলে এই উপলব্ধি আমার হতো না, ভালোই হলো।
ও রোববারে আসবে। ওর জন্যে নিজেকে পবিত্র করি। রাত এখন ৩-২২ মিনিট।
এই হলো কবি রফিক আজাদ। যিনি প্রেমের কাঙাল যথার্থ অর্থেই। রবীন্দ্রনাথের মতো প্রেমকে তার মালা করে পরিয়েছিলেন আমার গলায়। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে, মেয়েরা স্বামীর সংসার করে টাকা-পয়সা, গাড়ি-বাড়ি, বিত্ত-বৈভব-স্ট্যাটাসসহ অনেক কিছুই পায়। কিন্তু অধিকাংশ মেয়েরা যা পায় না, তা হলো সম্মান এবং আত্মমর্যাদা। রফিক আজাদের কাছে আমি সেই সম্মান পেয়েছিলাম, আত্মমর্যাদায় বলিয়ান হয়ে আত্মনির্ভরশীলভাবে পথ চলতে শিখেছিলাম। তাঁর কাছে শুধু কবিতা লিখতে শিখিনি, শিখেছি জীবনের পথ চলতে ও চালাতেও।
১৯৮৪ সালে প্রকাশিত “হাতুড়ির নিচে জীবন” কাব্যগ্রন্থের
“শুশ্রুষার হাত” নামক কবিতায় কবি তার উপলব্ধি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে :

শুশ্রুষার দু’টি হাত প্রসারিত আছে,
প্রণমনে তুমি নিয়ত জাগাচ্ছো আশা,
কোমল দু’হাতে দৃঢ়তায় ধরে আছো
সিংহের কেশর- তবে কি পরাস্ত নই?
এতো শক্তি তুমি কোথায় পেয়েছো, নারী?
পুরুষ-শাসিত এই সমাজের মুখে
জোড়া লাথি মেরে ভাঙাচোরা, আশাহত
উত্থান-রহিত এক সৈনিকের প্রতি
গভীর প্রণয়ে প্রজ্জ্বলিত ক’রে যাচ্ছো
সর্বদাই আশার প্রদীপ। একদিন
ন্যুব্জপীঠ আমি আবার কোমর বেঁধে
মার-খাওয়া কৃষকের মতো শেষবার
দাঁড়াবো নিশ্চয়।-দুই চোখে, পুনর্বার,
জ্বলতে থাকবে যুগপৎ ঘৃণা আর
হৃদয়-জাগানো ভালোবাসার আগুন-
যার যা পাওনা তাকে তাই দেয়া হবে:
শত্রুশিবিরের প্রতি, দ্রুত, ছুটে যাবে
জ্বলন্ত ঘৃণার গোলা, তোমাকেই শুধু
সমুদ্র-শোষণ ক’রে উপহার দেবো
‘ভালোবাসা’-অমৃতের দুর্লভ কলস।
( ক. স. পৃ-২৩২)

এই ঋষিতুল্য মানুষটির সঙ্গে আমি কাটিয়েছি প্রায় পঁয়ত্রিশটি বছর। তাঁকে ছাড়া অর্থহীন এই বেঁচে থাকার অপর নাম জীবন। হ

 

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা