ইংল্যান্ডকে ৩৪৯ রানের টার্গেট দিল পাকিস্তান

আগের সংবাদ

সুদানে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি, নিহত ১৩

পরের সংবাদ

কমলা ভট্টাচার্য

বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র নারী ভাষাশহীদ

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ৭:৪৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ৭:৪৫ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

প্রতিটি জাতির মাতৃভাষা সে জাতির অস্তিতের সাথে জড়িত। মাতৃভাষার স্থান আমাদের হৃদয়ের গভীরে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বেশ কয়েকজন বাঙালি শহীদ হন। ১৯৬১ সালের ১৯ মে ভারতের আসাম রাজ্যের শিলচরে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে ১১ জন শহীদ হন। আমাদের মাতৃভাষা বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সৃষ্টি হয়েছিল এক রক্তস্নাত অধ্যায়ের মহান দৃষ্টান্ত। ঠিক তেমনি ১১ জন ভাষাশহীদের রক্তের বিনিময়ে আসামে বাংলা ভাষা রাজ্যভাষা হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছিল ১৯ মে’র রক্তস্নাত অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে। সারাবিশ্বের বাঙালিদের জন্য এ এক গর্বের ইতিহাস। উনিশে মে’র ১১ জন ভাষাশহীদ সমগ্র বিশ্বের মাতৃভাষাপ্রেমী মানুষের গর্ব ও অহংকার। আমরা প্রায়ই গর্ব করে বলে থাকি একমাত্র বাংলাদেশের বাঙালিরাই ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে। কিন্তু আমাদের পাশের দেশ ভারতের আসামেও যে ভাষার জন্য রক্ত ঝরেছে সে ব্যাপারে আমরা অনেকটাই বেখবর রয়ে গেছি।
দেশবিভাগের পর আসামের শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে গড়ে ওঠে বাঙালি জনপদ। তাদের মুখের ভাষা এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির বাহন হিসেবে বাংলা ভাষা আসামের সমাজ ও রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এমতাবস্থায় ১৯৫০ সালে আসামে একসময় গড়ে ওঠে ‘বাঙাল খেদা’ আন্দোলন। এর নেতৃত্ব দেয় উগ্রবাদী অসমিয়া সম্প্রদায়। অসমিয়া জাতীয়তাবাদ সৃষ্টি এবং অসমিয়া ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যমে ও সরকারি ভাষারূপে প্রতিষ্ঠার ইন্ধন জোগাতে ব্রিটিশ ও মার্কিনদের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। ১৯৪৮ সালের মে মাসে গুয়াহাটি শহরে তারা বাঙালিদের ওপর আগ্রাসন চালায়। ১৯৬০ সালের ৩ মার্চ আসামের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিমলা চালিহা বিধান সভায় অসমিয়াকে আসাম রাজ্যের সরকারি ভাষা ঘোষণা করা হবে বলে জানান। ওই ঘোষণার প্রতিবাদে ১৯৬০ সালে ১৬ এপ্রিল শিলচরে বাংলা ভাষাভাষী বাঙালিরা এক নাগরিক সভা আহ্বন করে। সরকারি ভাষা-প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক নির্বচিত হন অধ্যাপক শরৎচন্দ্র নাথ।

এ ছাড়া শিলচরে ২ ও ৩ জুলাই চপলাকন্তের সভাপতিত্বে ‘নিখিল আসাম বাঙ্গালা ভাষা সম্মেলন’ নামে ভাষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয় এবং কাজী নজরুল ইসলামকে ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার’ গানটি গেয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা করা হয়। ১৯৬০ সালের ১০ অক্টোবর আসাম রাজ্যের সর্বত্র অসমিয়া ভাষা প্রয়োগের জন্য বিধানসভায় ভাষা বিল উত্থাপন ও পাস হয়। এভাবে আসমের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ লাখ লাখ বাঙালির মাতৃভাষা বাংলাকে সরকারি ভাষা করার মৌলিক অধিকারের দাবি অগ্রাহ্য করা হয়। এ আইনের প্রতিবাদে বাংলা ভাষার সপক্ষ শক্তি আরও ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখে। এই আইনের প্রতিবাদে পণ্ডিত রাজমোহন নাথের সভাপতিত্বে ১৮, ১৯, ও ২০ নভেম্বর শিলচরে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল সম্মেলন। সম্মেলনে গৃহীত এক সিদ্ধান্তে বলা হয়, ‘যদি এ আইন করে বাংলা ভাষাকে অসমিয় ভাষার সমমর্যাদা দেয়া না হয়, তবে বাঙালি সমাজের মৌলিক অধিকার ও মাতৃভাষা রক্ষার্থে আসামের বাংলা ভাষা-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর বৃহত্তর আসাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া অপরিহার্য হয়ে পড়বে। পরে শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে কাছাড় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে সরকারকে চরমপত্র দেয়া হয়। সংগ্রাম পরিষদ সিদ্ধান্ত নেয় ১৯৬১ সালের ১৯ মে থেকে সমগ্র কাছাড়ে বাংলাকে সরকারি ভাষা করার দাবিতে অহিংস অসহযোগ গণআন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে। পূর্ব সিদ্ধান্ত মতো ১৯৬১ সালের ১৮ মে রাত ১২টার পর থেকে প্রায় ১০ হাজার তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ শিলচর রেলস্টেশনে অহিংস অবস্থান ধর্মঘট করার জন্য সমবেত হতে থাকে।

অবশেষে আসে ১৯ মে। শুরু হয় তুমুল আন্দোলন। উত্তেজিত জনতার প্রতিরোধ সরকারের বাহিনী ট্রেন চালাতে ব্যর্থ হন। ১৯ মে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। পুলিশ এদের অনেকেই গাড়িতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। বিভিন্ন দফায় লঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে, বেলা আড়াইটার দিকে রেলস্টেশনে কর্তব্যরত বিএসএফের সদস্যরা হঠাৎ গেরিলার ভঙ্গিতে গুলিবর্ষণ আরম্ভ করলে গুলিবিদ্ধ হয়ে তৎক্ষণাৎ শহীদ হন নয়জন। তাঁরা হলেন- সুনীল সরকার, সুকোমল পুরকায়স্থ, কুমুদ দাস, চ-ীচরণ সূত্রধর, তরণী দেবনাথ, হীতেশ বিশ্বাস, শচীন্দ্র পাল, কমলা ভট্টাচার্য, কানাই নিয়োগী। পরদিন স্টেশনের পুকুর থেকে সত্যেন্দ্রকুমার দেবের বুলেট বিক্ষত দেহ উদ্ধার করা হয়। রাতে হাসপাতালে মারা যান বীরেন্দ্র সূত্রধর। মোট ভাষাশহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১। গ্রেপ্তার করা হয় প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মানুষকে। কিন্তু এতেও ক্ষান্ত হননি আন্দোলনকারীরা। তাঁদের রক্ত আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে অবশেষে ওই অঞ্চলের সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রশাসনিক স্বীকৃতি দিতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়। ১১ জন ভাষাশহীদের রক্তের বিনিময়ে অবশেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী প্রদত্ত সূত্রের ওপর ভিত্তি করে গৃহীত সংশোধনী আইনে কাছাড় জেলায় বাংলা ভাষা ব্যবহারে অধিকার স্বীকার করে নেওয়া হয়। এভাবেই আসাম রাজ্যে ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে এবং বাংলা ভাষা বিধানসভায় স্বীকৃতি পায়।
আসাম ছাড়াও বুলগেরিয়ায় নতুন বর্ণ ও ভাষা দিয়ে এক মহাবিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল। যদিও সেখানে কেউ হতাহত হয়নি তবে ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সামাজিক আন্দোলন মহা বিদ্রোহে রূপ নেয়।

“পৃথিবীতে আরও একটি দেশে ভাষা ও লিপি দিবস পালিত হয়। সেটি হচ্ছে বুলগেরিয়া। দীর্ঘকাল বুলগেরিয়া উসমানী তুর্কীদের শাসনের আওতায় ছিল, সে প্রায় পাঁচশো বছরকাল। বুলগেরিয়ার জনসাধারণ উসমানী তুর্কীদের শাসন সহ্য করেছে, কিন্তু সমর্থন করেনি। উসমানী তুর্কীরা মসজিদ এবং দুর্গ নির্মাণ করেছিল দেশের সর্বত্র, কিন্তু সাধারণ মানুষের চিত্ত জয় করতে পারেনি। প্রাচ্যে যেটা সম্ভবপর হয়েছিল, ইউরোপে তা সম্ভবপর হল না। প্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকার নির্যাতিত মানুষগুলো ইসলামের ছায়াতলে এসেছিল স্বেচ্ছায় এবং মানবিক আবেগে। ইসলাম প্রাচ্যে উপস্থিত কোনো পাঠ্যর ব্যবস্থা ছিল না। ইংরেজিতে যাকে বলে ইম্পজিশন, ইউরোপ এটা ছিল নিছক উপস্থাপন। উসমানী তুর্কীরা প্রশস্ত রাস্তা তৈরি করেছিলেন, অট্টালিক এবং দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন, কিন্তু তারা সাধারণ মানুষের চিত্তের কাছে পৌঁছাতে পারেননি। দীর্ঘদিন পর তুর্কী শাসন শ্লথ হয়ে এসেছে তখন ক্রমশ তুর্কীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রকাশ পেতে থাকে। এই প্রতিবাদের পথ খুলে দিয়েছিলেন খ্রিষ্টীয় যাজক সম্প্রদায়। এই যাজক সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দু’জন যাজক ভ্রাতা। এঁদের একজনের নাম কিরিল, অপরজনের নাম মেথোডিয়াস। এই দুই ভ্রাতার জন্ম হয় স্যালোনিকায়। স্যালেনিকা ছিল বাইজানটাইন সা¤্রাজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য শহর। এঁরা দু’জনেই খ্রিষ্টধর্মের যাজক। সাধারণ মানুষের অসুবিধার কথা তারা জানতে পেরেছিলেন এবং তাদের প্রত্যাশার কথাও অনুভব করতে পেরের্ছিলেন। এই দুই ভ্রাতা চিন্তা করতে থাকেন, কি করে সাধারণ মানুষদের অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তোলা যায়। গোপনে চিঠিপত্র আদান-প্রদানের জন্য তাঁরা একাট বর্ণলিপি উদ্ভাবন করে। এই বর্ণলিপির সাহায্যে তাঁরা এই বিদ্রোহের বাণী দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে দেন। পরবর্তীতে তুর্কী শাসনের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ কার্যকর হলো তার হোতা ছিলেন কিরিল এবং মেথোডিয়াস।
প্রথমে নতুন লিপিতে ধর্মীয় অনুশাসন লিপিবদ্ধ হত এবং সেগুলো এক গীর্জা থেকে অন্য গীর্জায় পাঠানো হত। তুর্কী গোয়েন্দারা এতে কৌতূহলবোধ করেনি এবং গুরুত্বও দেয়নি। ক্রমান্বয়ে ও সমস্ত অনুশাসনে বিদ্রোহের কথা লিখিত হতে থাকলো এবং দেশের সর্বত্র উসমানী শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ রূপ পেতে লাগলো। এ লেখাগুলো মানুষের মনে বিক্ষোভের ইন্ধন যুগিয়েছিল। উসমানী তুর্কীদের আমলে ইসলাম প্রচারিত হয়নি। কিন্তু তুর্কী শাসন প্রবর্তিত হয়েছিল মাত্র। বুলগেরিয়া ছিল সে সময় একটি বিরাট সাম্রাজ্যের শাখা। একটি ভাষার সাহায্যে বিদ্রোহকে উত্তেজিত করা। বর্তমানে প্রতিবছর বুলগেরিয়ায় ভাষা ও লিপি দিবস উদযাপিত হয় এবং একটি বিশেষ দিবসে সারা দিনরাতব্যাপী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

যাই হোক বুলগেরিয়ার ভাষা দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, যেমনভাবে আমাদের ভাষা দিবসটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। বুলগেরিয়ায় স্বাধীনতা আন্দোলনের পিছনে ভাষা ও লিপির একটি ভূমিকা ছিল, যেমন আমাদেরও আছে। যেহেতু বুলগেরিয়া দীর্ঘদিন ধরে এ উৎসবটি পালন করে আসছে, সুতরাং আমরা তাদের কাছ থেকে কিছু উপকরণ পেতে পারি। …বুলগেরিয়ার মানুষ তাদের ভাষার মাধ্যমে তা প্রতিবাদ করেছিল এবং যে প্রতিবাদের ফলে তারা মুক্তি পেয়েছিল, প্রতিবছর একটি বিশেষ দিবসে তারা বিশ্ববাসীকে মুক্তির সেই স্বাদটি দিতে চায়।” (সূত্র : একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় থেকে বিশ্বময়- আনু মাহমুদ, সালমা বুক ডিপো, পৃ. ৭৬-৭৭)

বুলগেরিয়ায় কেহ শহীদ হননি, বাংলাদেশ ও আসামে বীর বাঙালিরা জীবনদান করেছেন। আমাদের শিলচরে বাংলা ভাষার জন্য রক্তদানকারী ১১ জন শহীদ এবং শিলচরের ভাষা আন্দোলন আজও অনেকেরই অজানা। শিলচরের এই ১১ জন ভাষাশহীদের মধ্যে একমাত্র নারী ভাষাশহীদ ছিলেন কমলা ভট্টাচার্য। তিনি শুধু শিলচর তথা ভারতের প্রতিবাদী নারীই নন, মাতৃভাষার দাবিতে বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র ভাষাশহীদ হবার গৌরব অর্জন করেছেন। আমাদের জন্য আরও গর্ব ও অহংকারের বিষয় হলো উনিশে মে’র ভাষাশহীদদের সকলেরই জন্মস্থান ও আদিনিবাস ছিল বাংলাদেশে অর্থাৎ তারা সকলেই ছিলেন বাংলাদেশের গর্বিত সন্তান। কমলা ভট্টাচার্যের জন্ম সিলেটে দেশভাগের কারণে ১৯৫০ সালে তার পিতা বামর মন ভট্টাচার্য সিলেট ছেড়ে কাছাড়ে আসেন। তারা বসতি স্থাপন করেন শিলচর শহরের বিলপাড়ে, ভাড়াবাড়িতে। ভাষা আন্দোলনের পূর্বেই কমলার বাবা মৃত্যুবরণ করেন। পিতৃহীন কমলা ভাই শ্রী রামেন্দ্র ভট্টাচাযের্র সাথে বিলপাড়ের বাসায় থাকতেন। কমলা তিন ভাই চার বোনের মধ্যে তৃতীয়। উনিশে মে শহীদ হওয়ার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ষোল বছর। তাদের পরিবার সচ্ছল ছিল না, অভাব অনটনের মধ্যেই বেড়ে ওঠেন কমলা। কমলার পরিবারে আর্থিক অনটন এতটাই প্রকট ছিল যে তাকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে হয়েছিল অন্যের বই পড়ে। তার মৃত্যুর পর ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। কমলা ভট্টাচার্য দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। সে তার পরীক্ষার ফলাফল দেখে যেতে পারেননি। দারিদ্র্যপীড়িত মধ্যেও কমলার স্বপ্ন ছিল তিনি গ্র্যাজুয়েট হবেন। তার সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
তবে শিলচরের ভাষা আন্দোলনের এ রক্তস্নাত চূড়ান্ত পর্বটি একদিনের নয়। ১৯৫০ সালে আসামে বাঙ্গাল খেদা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট সূচিত হয়। ১৯৬০ সালে আসাম সরকার অসমিয়া ভাষাকে একমাত্র রাজ্যভাষা করার ঘোষণা দিলে শুরু হয় বাঙালির মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলন। গঠিত হয় সংগ্রাম পরিষদ, চলতে থাকে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, সভা-সমাবেশ, সিদ্ধান্ত হয় ১৯ মে ধর্মঘট পালন করা হবে। অবশেষে আসে ১৯ মে, সেদিন ছিল শুক্রবার। শুরু হয় তুমুল আন্দোলন। ত্রিশ হাজার সত্যাগ্রহী শিলচরে তৈরি করেছে সংগ্রাম পরিষদ। শিলচরের তারাপুর রেলস্টেশনে অভূতপূর্ব জন স্রোতে মিশে যান কমলা। এ প্রসঙ্গে গবেষক সালাম আজাদের ভাষ্য :

“উনিশে মে ভোরে বাড়ি থেকে না খেয়ে তারাপুর ষ্টেশনে গিয়েছিলেন কমলা। নিজের পরার মত ভাল শাড়ি ছিল না বলে দিদির শাড়ি পরে গিয়েছিলেন। বের হবার সময় মার কাছ থেকে একটা ন্যাকড়া নিয়ে বের হন। যদি টিয়ার গ্যাস ছোড়ে তাহলে এই ন্যাকড়া ভিজিয়ে চোখ মুখ মুছে নেবেন। মা যখন দুপুরে রেল ষ্টেশনে গিয়েছিলেন তখন ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত কমলা মায়ের কাছে খাবার চেয়েছিলেন, শরবত পান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মা তা দিতে পারেননি। তাঁদের বিলপাড়ের বাড়ির যে আর্থিক অবস্থা, তাতে কমলা ভট্টাচার্যের মা সুপ্রভাষিণী ভট্টাচার্যের পক্ষে মেয়েকে তা খাওয়ানো কিংবা শরবত পান করানোর সামর্থ্য ছিল না। তৃষ্ণার্ত কমলা, অতৃপ্ত কমলা ভট্টাচার্যের ডান চোখের পাশ দিয়ে একটি গুলি মাথায় ঢুকে যায়। তিনি লুটিয়ে পড়েন। মাতৃভাষার জন্য এর আগে পৃথিবীতে কোনো নারী শহীদ হননি। কমলা প্রথম নারী, যিনি মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিলেন, রক্ত দিলেন। শহীদ হলেন। দরিদ্র পরিবারের এই মেয়েটি যে কত বড় কাজটি করলেন, আগামী দিনে তার মূল্যায়ন হবে। শুধু বাঙালিদের মধ্যে নয়, ভারতবাসীরা তা মূল্যায়ন করবে। সারা পৃথিবীর মানুষ কমলা ভট্টচার্যকে স্মরণ করবে।” (সূত্র : উনিশে মে- সালাম আজাদ, নওরোজ কিতাবিস্তান, ফেব্রুয়ারি, ২০০৯)

লেখক গবেষক আখতারুন্নাহার আলো’র ভাষ্য :
“দেখা যায়, আসামের ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বহু নারী জড়িত ছিলেন। শিলচরের বিজন শংকর রায়ের (তখন কলেজের ছাত্র) কথায় জানা যায়, সংগ্রামের প্রস্তুতির জন্য যখন চাঁদা তুলতে গেছেন, তখন বাজারের ভিতরে এক মেয়ে দোকানী তাঁর হাতে দুই আনা পয়সা দিয়ে বলেছিলেন, বাবা, আমাদের ভাষা আসবে তো? এই দোকানীর হয়তো সারাদিনে উপার্জন হবে আট আনা। সেখান থেকে সে দুই আনা দিয়ে দিল। মাতৃভাষার প্রতি তীব্র ভালোবাসা না থাকলে এমনটি হওয়ার কথা নয়। মে মাসের প্রখর রোদে বিজন শংকর খোলা মাঠে বক্তৃতা করছেন। হঠাৎ অনুভব করলেন তাঁর গায়ে ঠা-া বাতাস লাগছে। তিনি অবাক হয়ে তাকাতেই দেখলেন একজন বৃদ্ধা মা তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস করে চলেছেন এবং তার পাশে একটি বাচ্চা ছেলে পানির গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবার শহরের দক্ষিণ প্রান্তে যখন সভা করতে গেলেন তখন একজন মা এসে তাকে মঙ্গল চ-ীর আশীর্বাদ দিলেন। এদিকে শহরের উত্তর প্রান্তে যখন বক্তৃতা করতে গেলেন তখন এক গ্লাস পানি চাওয়ার কিছুক্ষণ পর পাশের বাড়ি থেকে একটি কিশোরী মেয়ে শরবত নিয়ে এলো। তাদের দলেও ছিল সংগ্রামী ছয়টি মেয়ে। সুতরাং দেখা যায়, আসামে বাংলা ভাষার জন্য মেয়েরা মায়েরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমান তালে এগিয়ে এসেছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে আসামেরই মেয়ে কমলা ভট্টাচার্য একমাত্র নারী যিনি বাংলা ভাষার জন্য শহীদ হয়েছেন। (সূত্র : বরাকের ভাষা আন্দোলন- আখতারুন নাহার আলো, আসামে বাংলা ভাষা আন্দোলন- ভাষা আন্দোলন স্মৃতিরক্ষা পরিষদ, ১৯ মে, ২০১০)

কমলা ভট্টাচার্যের ছোটবোনের নাম মঙ্গলা ভট্টাচার্য। সে তখন ৫ম শ্রেণির ছাত্রী। ১৯৬১ সালের ১৯ মে সে কিছু না বুঝেই বন্ধুদের সাথে চলে যায় রেল স্টেশনে। শত শত নারী পুরুষের মাঝে সে খুঁজে নেয় তার দিদি কমলাকে। অবাঙালি সিআরপি পুলিশ যখন এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে, তখন তার দিদি রেল লাইন ধরে দৌড়াচ্ছিলেন। মঙ্গলাও কমলার পিছু পিছু দৌড়াচ্ছিলেন। দশ বার হাত দূর থেকে পুলিশ কমলা ও মঙ্গলাকে গুলি করে। দু’বোনই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কমলা সাথে সাথেই মৃত্যুবরণ করেন। মঙ্গলা তিন মাস শিলচরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে সুস্থ হয়ে শিলচর ছেড়ে তার রেলকর্মী দাদার কাছে গৌহাটিতে চলে আসেন। কমলার বড় দিদি বেনু ভট্টাচার্য বদরপুর রিটায়ার কলোনীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। তিনি নার্স-এর চাকুরি করতেন। প্রতি বছর উনিশে মে বদরপুরের বাড়িতে অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার সাথে তুলসীতলায় এক গ্লাস শরবত রাখতেন কমলার অতৃপ্ত আত্মার উদ্দেশ্যে। কমলা ভট্টচার্যের মা সুপ্রভাষিণী ভট্টাচার্য কমলার শোকে পাগল হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।”

বাংলা ভাষার মর্যাদা ও সম্মান আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও সমাদৃত। আমাদের অমর একুশে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। প্রতিটি বাংলাভাষী মানুষের জন্য এটা এক অনন্য প্রাপ্তি এবং আনন্দ ও গর্বের বিষয়। কিন্তু বাংলা ভাষার জন্য শিলচরে যে ১১ জন বীর বাঙালি প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, তাদের আত্মত্যাগের যথার্থ মূল্যায়ন আজও হয়নি। বিশেষ করে বিশ্বের প্রথম নারী ভাষাশহীদ কমলা ভট্টাচার্যকে আমরা কি মনে রেখেছি? বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে, বিশেষ করে নারী সমাজের প্রেরণার উৎস কমলা ভট্টাচার্যের স্মৃতি অম্লান হোক।

 

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা