সাধারণ মানুষের ঘরে ঈদ আনন্দ নেই : রিজভী

আগের সংবাদ

আগন্তুক

পরের সংবাদ

বাংলা ভাষা, বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ২:৩৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ২:৩৫ অপরাহ্ণ

Avatar

এক.
দেশ-নাম ও ভাষার বিকাশ
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। এর আদি নিদর্শন হিসেবে ভাষা সাহিত্যের পণ্ডিতেরা চর্যাপদকে চিহ্নিত করেছেন। বাংলা ভাষা ও বাঙালির বাসভ‚মি বঙ্গ বা বাংলা বহু জটিল পথ পরিক্রমার মধ্য দিয়ে বর্তমান রূপে স্থিত হয়েছে। এখন আমাদের ভাষার নাম বাংলা ভাষা, দেশের নাম বাংলাদেশ। একজন প্রখ্যাত পণ্ডিত বলেছেন : ‘ভাষা লইয়া দেশ। যে দেশের ভাষা বাঙ্গালা তাহাই বাঙ্গালা দেশ।’ বহু বিবর্তন ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আধুনিককালে বঙ্গ, বাংলা বা বাংলাদেশ নামগুলো ইতিহাসে স্থান লাভ করেছে। বাংলা ভাষা এবং দেশ নাম হিসেবে বঙ্গ বা বাংলার বিবর্তনেরও দীর্ঘ ইতিহাস আছে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার বলেছেন : ‘বাঙ্গালা ভাষার যখন উৎপত্তি হয় তখন সে ভাষা আধুনিক বাঙ্গালা দেশের সীমানা ছাপাইয়া বেশ খানিক দূর অবধি বিস্তৃত ছিল। বাঙ্গালা ভাষা যাহা হইতে অব্যবহিতভাবে উৎপন্ন সেই প্রত্নভাষা অর্থাৎ বাঙ্গালা-অসমিয়া, প্রত্নমৈথিল ও প্রত্ন-ওড়িয়া তাহার ক্ষেত্র আরও বিস্তীর্ণ ছিল’।
দেশ নাম বা অঞ্চল হিসেবে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের নাম অষ্টম-নবম শতক পর্যন্ত ছিল সুম্ম। আবার প্রায় একই সময়ে রাঢ় বা গৌড় নামেও পরিচিত ছিল এ অঞ্চল। আর আধুনিককালের পূর্ববঙ্গের পরিচয় ছিল বঙ্গ। অতএব, দেখা যাচ্ছে মূল বঙ্গ বলতে একালের পূর্ববঙ্গ এবং বর্তমান বাংলাদেশকেই বুঝাতো। ‘বঙ্গ’ নামটি ঋগবেদে নেই, তবে ঐতরেয় আরণ্যকে আছে। আড়াই তিন হাজার বছর আগে এ অঞ্চল জলাভ‚মি ও জঙ্গলময় ছিল। বাংলার ইতিহাসের বিবর্তনের ধারায় একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে বঙ্গ-শব্দজাত বঙ্গাল শব্দটি পাওয়া যায়। এ নাম পূর্ববঙ্গের, আর সমগ্র বাঙ্গালা দেশ বুঝাতে গৌড়বঙ্গাল শব্দটি ব্যবহৃত হতো। বাঙ্গালা নামটি মুসলমান অধিকারের গোড়ার দিকেই চালু হয়েছিল। ফারসি ‘বঙ্গালহ’ হতে পর্তুগিজ বেঙ্গালা (Bengala) এবং ইংরেজ আমলে বেঙ্গল (Bengal) হয়েছে। অষ্টাদশ শতকের আগে বাঙ্গালা ভাষার কোনো নাম ছিল না। সাধারণ শিক্ষিত লোকেরা জানতেন পণ্ডিতদের ভাষা সংস্কৃত আর আমজনতার ভাষা দেশি বা লৌকিক। সেটাই তাদের মাতৃভাষা। উনিশ শতকের প্রথম কয়েকটি দশকে পণ্ডিতেরা বাংলা ভাষাকে বলতেন গৌড়ীয় ভাষা। রাজা রামমোহন রায়ের ব্যাকরণ গ্রন্থের নামও গৌড়ীয় ভাষার ব্যাকরণ (১৮৩৩)। বাংলা ভাষাকে ‘বঙ্গভাষা’ হিসেবে প্রয়োগ করা হয়েছে মুসলিম অনুষঙ্গে। উমাচরণ মিত্র ও প্রাণকৃষ্ণ মিত্র ফার্সি গোলেবকাঅলি ইতিহাস (১৮৪২) অনুবাদ করতে যেয়ে ভূমিকায় বলেন : ‘পারস্ব হইতে এই ইতিহাস সার/ইচ্ছা হৈল বঙ্গভাষে করিতে প্রচার’। সেই থেকে খ্রিস্টান মিশনারিদের রচনায় বাঙ্গালী ভাষা (সম্ভবত Bengali Language অর্থে), এবং বাংলা ভাষার পর্তুগিজ ব্যাকরণবিদ আস্সুম্প্সাওঁয়ের লেখায় বাঙ্গালা ভাষা এবং আধুনিককালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নিয়মিত ব্যবহারের ফলে নামটি প্রমিত রূপে লাভ করেছে। বাঙ্গালা ভাষার নাম নিয়ে আর কেউ কোনো বিকল্প প্রস্তাব উত্থাপন করেননি। বঙ্গদেশের লোক বুঝাতে বাঙ্গালী শব্দের ব্যবহার অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিক থেকেই। সেই থেকে বঙ্গদেশের জনসংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীকে জাতি হিসেবে বাঙ্গালী (বর্তমান বাঙালি) এবং তাদের ভাষাকে বাঙ্গালী ভাষা (বর্তমানে বাংলা ভাষা) হিসেবে আখ্যাত করা হচ্ছে।

দুই.
জাতি তথা জাতিসত্তা গঠনে ভাষার ভূমিকাই প্রধান। বাঙালি জাতি গঠনেও বাংলা ভাষার অবদান অসামান্য। বাংলা ভাষা ভারতীয় আর্য (Indo-Aryan Language) ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তবে বঙ্গদেশের চতুর্দিকেই অনার্য ভাষাগোষ্ঠীর অবস্থান। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অস্ট্রোএশিয়াটিক দ্রাবিড়িয়, চীনা-তিব্বতি প্রভৃতি। এইসব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সহবাসের সুযোগে এদের ভাষার অনেক কিছুই বাংলা ভাষায় আত্মকৃত (Acculturated) হয়েছে। এতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধও হয়েছে। আর এই সংযোগ ও সহবাসের সুবাদে এই ভাষাগোষ্ঠীর লোকেরাও ধীরে ধীরে স্বীয় ভাষিক সত্তা হারিয়ে বাংলা ভাষার মূলধারায় মিশে গিয়ে বাঙালি হয়ে গেছে তবে এখনো যারা পাহাড়ে বসবাসরত তারা তাদের ভাষিক সত্তা বজায় রেখেছে।
এ সম্পর্কে M. H. Klaiman বলেন : Descendants of non-Bengali tribals of a few centuries past now comprise the bulk of Bengali speakers. In other words, the vast majority of the Bengali linguistic community today represents present or former inhabitants of the previously uncultivated and culturally unassimilated tracts of Eastern Bengal.

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়ে তা স্থায়ী রূপলাভ করে। আমাদের এই বদ্বীপের অব্যবহিত পশ্চিমের গাঙ্গেয় সমতলে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান অঞ্চলে পরিবর্তনশীল ফসল উৎপাদন shifting cultivation ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে স্থায়ী চাষাবাদের settled farming উদ্ভব ঘটানো হয়। এরা আগে বন কেটে বা বনের কোনো অংশ আগুনে পুড়িয়ে পারিবারিকভাবে বীজ ছিনিয়ে শুকনো ধানের (dry rice cultivation)) চাষ করতো। এ কাজ ছিল ছোট পরিসরের এবং সীমিত আকারের। নতুন ব্যবস্থার স্থায়ী চাষাবাদ বড় আকারের জমিতে এবং জলাভূমিতে (wet rice cultivation)। ফলে এ কাজ কোনো পরিবারের পক্ষে এককভাবে করা সম্ভব নয়। পরিবারের বাইরের নতুন শ্রমশক্তি এবং সামাজিক সহযোগিতাও এতে অপরিহার্য। এ পর্যায়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি চিহ্নিত করেছেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক দামোদর ধর্মানন্দ কোশাম্বি (D.D. Kusambi) তাঁর প্রাচীন ভারতের ইতিহাস ব্যাখ্যায়। তিনি বলেছেন : Brahmin rituals were accompanied by a “a practical calendar, fair knowledge of agricultural technique unknown to primitive tribal groups which never went beyond the digging stock or hoe”. এবং কোশাম্বিই প্রথম দেখান যে “প্রাচীন ভারতে প্রধান ঐতিহাসিক পরিবর্তন রাজবংশসমূহের মধ্যে ঘটেনি ঘটেছে গ্রামীণ স্থায়ী কৃষি ব্যবস্থার প্রবর্তনের মাধ্যমে। উল্লেখ্য যে, প্রাচীনকালে পূর্বভারতে বৌদ্ধ ধর্ম বিশাল সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত হলেও অনার্য তৃণমূলের সঙ্গে তাদের বিচ্ছিন্নতা ঘটে। কিন্তু মজার ব্যাপার ব্রাহ্মণ-পুরোহিতরা যদিও এই অনার্য বঙ্গবাসীদের স্লেচ্ছ এবং এদের বাসভ‚মিকে ট্যাবু বলে ঘোষণা করেছেন কিন্তু পঞ্চম শতাব্দীর পর থেকেই এদেশীয়দের মধ্যে বসবাস শুরু করেছেন। অনার্যরাও এ অঞ্চলে এই অভিবাসী ব্রাহ্মণদের গ্রহণ করেছে তাদের অগ্রসর কৃষি বিষয়ক জ্ঞানের জন্য। কারণ তখন বাংলায় কৃষক ও কৃষিভিত্তিক সমাজ ও অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রয়াস চলছিল। এজন্যই বলা হয়েছে,since the technological and social conditions requisite for the transition to peasant agriculture, already established in Magadha, had not yet appeared in the delta. এই ধারা দীর্ঘকাল ধরে ধীরে ধীরে আটশ বছরে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এসে বাংলার সামাজিক স্তর বিন্যাসে (social stratification) অন্তর্ভুক্ত হয়ে জলাভূমিতে ধান উৎপাদনে (wet rice cultivation) সক্ষমতা অর্জন করেছে। এ ব্যবস্থা ছিল প্রকৃতপক্ষে এক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও কৃষি বিপ্লবের নামান্তর। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়েই রচিত হয়েছে বাঙালি জীবন ও সভ্যতার নতুন ও শক্তিশালী ভিত্তি।
একজন সমাজবিজ্ঞানী বাংলার গ্রামীণ জনপদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন এভাবে : গ্রামের মুখ্য অধিবাসী ছিল কৃষিজীবী ও গ্রামীণ কারিগর শ্রেণি, পাশাপাশি তাদের সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পেশার কিছু লোক যেমন-শিক্ষক, পুরোহিত, পণ্ডিত, ঢালি, ঢুলি ইত্যাদি। প্রত্যেক গ্রামেই ছিল নিজস্ব কারিগ্রর শ্রেণি অর্থাৎ কামার-কুমোর, সুতোর, তাঁতি, নাপিত, ধোপা ইত্যাদি। কৃষক-গৃহস্থ ও অন্যান্য গৃহস্থের সারা বৎসরের কারুকর্মের চাহিদা অর্থাৎ প্রয়োজনীয় দা, খন্তা, লাঙল, লাঙলের ফলা, হাঁড়ি-কুড়ি, ঝুড়ি, পরিধেয় বস্ত্র ইত্যাদির প্রয়োজন এরাই মেটাত। অর্থাৎ সেকালের বাংলার গ্রাম ছিল স্বয়ং সম্পূর্ণ। দৈনন্দিন প্রয়োজনে গ্রামের বাইরে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন হতো না।

তিন.
বাংলার দুশ’ বছরের (১৩৪২-১৫৩৭) স্বাধীন সুলতানী আমলে দেশটির ‘বাংলা’ নাম এবং হিন্দু-মুসলমানসহ নানা জাতিগোষ্ঠীর মিশ্র জাতিসত্তা গঠন ও বাংলা ভাষা-সাহিত্যের বিকাশে তার প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। সে সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ নেই। পঞ্চদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় রাজসভা একই সঙ্গে পারসিক রোমাঞ্চ কাব্য এবং বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। সুলতান রোকনউদ্দীন বারবাক শাহ (১৪৫৯-৭৪), মালাধর বসুর শ্রীকৃষ্ণবিজয় এবং আলাউদ্দীন হোসেন শাহ (১৪১৩-১৫১৯) ও নাসিরউদ্দীন নুশরাত শাহর (১৫১৯-৩২) আমলে বিপ্রদাসের মনসাবিজয়, বিজয়গুপ্তের পদ্মাপুরাণ, যশোরাজ খানের কৃষ্ণ মঙ্গল এবং সংস্কৃত থেকে বিজয় পণ্ডিত ও রবীন্দ্র পরমেশ্বরের মহাভারত কাব্যগ্রন্থের অংশবিশেষ রচিত হয়। বিশেষ করে মঙ্গলকাব্য এবং ভারতীয় ধর্ম-দর্শন-পুরাণের বাংলায় অনুবাদ, চৈতন্য প্রভাবিত কূলপ্লাবী কীর্তন তথা বৈষ্ণবসাহিত্য গণ জাগরণের সংগীতের ধারা এবং বিপুলসংখ্যক মুসলিম কবি-সাহিত্যিকের বিশাল অবদানে শুধু বাঙালিত্বই পরিপুষ্ঠতা লাভ করেনি, সমন্বিত বাঙালি জাতিসত্তারও একধরনের শক্তিশালী মৌলিক ভিত্তি নির্মিত হয়েছে। এই সময়কে বাঙালির জাতিসত্তার উদ্ভব ও বিকাশের প্রাথমিক যুগ বলেও আখ্যায়িত করা যেতে পারে।
বাংলার এই স্বাধীনতা এবং ভৌগোলিকভাবে প্রান্তিকতা অর্থাৎ উত্তর ভারতের মূল শাসনকেন্দ্র দিল্লি থেকে পূর্ব ভারতের এক দূরবর্তী প্রান্তে অবস্থান বাংলাকে স্বকীয় সত্তা ও ভারতের কেন্দ্রীয় সত্তা থেকে পৃথক করেছে। বাংলায় এই স্বাধীন সুলতানী আমলের উত্থানকে এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনের রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। পূর্ব-বাংলার মানুষ তাদের বাঙালিত্ব ও ভাষার প্রতি ভালোবাসার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে তাদের স্বাধিকার চেতনা ও বাঙালি সত্তাকে বজায় রেখেছে। সুলতানী আমলেই তার উদাহরণ আছে। তবে রাজা গণেশ (১৪০০-২১) উপাধিধারী পরাক্রমশালী এক জমিদারেরও অবদান আছে বলে অনুমিত হয়। বাংলার পাল ও সেন আমলের শাসক পরিবার থেকে আসা এই রাজা তুর্ক-আফগান সুলতানী আমলের শাসননীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেন। এবং সুলতানদের পশ্চিম এশীয় ইসলামী শাসন নীতিকে নমনীয় অবস্থানে রেখে বাঙালি অভিজাতদের অবস্থা শক্তিশালী করেন এবং বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রবহমান ধারাকে শাসনকার্য, গণজ্ঞাপন ও গণসংযোগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় স্থাপন করেন। ফলে শাসকের ফার্সি ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রচার সরকারের কর্মকাণ্ডের অংশ হয়ে যায়। রিচার্ড ইটন বলেছেন :“Through the Sultanate alinged ideologically with the Middle East, it was rooted politically in Bengal”. এছাড়া বাস্তব সঙ্গত কারণেই সুলতানদের কোনো উপায় ছিল না। বাঙালি অভিজাতরা শাসক হিসেবে ছিলেন। তারা দেশকে এবং দেশের মানুষকে জানতেন। সুলতানরা উত্তর ভারত বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রশাসনের জনবল আনলে বাংলার ভৌগলিক অবস্থান ও জলকাদর পরিবেশে তারা টিকতে পারতেন না। তাই বাঙালি অভিজাতদেরই ট্রেজারি এবং রাজ্যশাসনে স্থান দিতে হয়। নেতাজী সুভাষ বোস যথার্থই বলেছেন বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমল ছিল হিন্দু-মুসলমানদের মিলিত শাসন।
তবে ষোড়শ শতকে বঙ্গদেশ মোগলদের অধিকারে আসার পর ‘সুবে বাংলা’ গঠিত হয়ে ভৌগোলিক ঐক্য ও সংহতির সৃষ্টি এবং কেন্দ্রীয় শাসনের অসাম্প্রদায়িক উদ্যোগে বাংলা সাহিত্য ও ভারতীয় ধর্ম-দর্শন মহাকাব্য বাংলায় অনুবাদ কর্ম সম্পাদন হলেও দেশজ বাঙালি মুসলমান সমাজের ভাষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি সমস্যারও সৃষ্টি হয়। ওই আমলে অভিজাত মুসলমানেরা উত্তর-ভারতের মুসলমানদের প্রভাবে নিজেদের ‘আশরাফ’ বা ‘অভিজাত’ ভাবতে শুরু করেন। এবং মাতৃভাষা বাংলার পরিবর্তে উর্দুকেই নিজেদের দৈনন্দিন কাজকর্মের ভাষা বলে পরিচয় দিতে থাকেন। ষোড়শ শতাব্দীতে কবি সৈয়দ সুলতান (১৫৫০-১৬৪৮) যখন বাংলায় শব-ই-মিরাজ (১৫৮৬) শীর্ষক কবিতা রচনা করেন, আশরাফ সম্প্রদায়ের লোকেরা সেজন্য তাঁকে ‘মুনাফেক’ হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু বাঙালি কবি নিজের মাতৃভাষায় ইসলামি বিষয়ে কবিতা লেখাকে নিজের অধিকার মনে করে লেখেন : ‘যারে যেই ভাষে প্রভু করিলেন সৃজন/সেই ভাষ হয় তার অমূল্য রতন’। স্বাধীনচেতা কবির এই প্রাজ্ঞ বক্তব্যের পরও যে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছিল, এমন মনে হয় না। যদি পরিবর্তনই হবে, তাহলে পরবর্তী শতাব্দীর কবি আবদুল হাকিম কেনইবা অত উগ্র ভাষার উচ্চারণ করবেন : “যে জন বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি”। তবে এই বাধা সত্ত্বেও বাঙালি মুসলমানেরা, বিশেষ করে চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, নোয়াখালীর সেকালের বিপুলসংখ্যক কবি মধ্যযুগের যে বিশাল কাব্যভান্ডার রেখে গেছেন, তাতে বোঝা যায়, বাঙালির মাতৃভাষাপ্রীতি এবং সাহিত্যসৃজন ক্ষমতার অসামান্যতায় বাঙালিত্ব মধ্যযুগেই শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। এমন প্রমাণ হিসেবে সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকান রাজসভা ও রোসাঙ্গ রাজসভায় মুসলমানদের হাতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যে বিকাশ ঘটে তা বিস্ময়কর। মগ অধ্যুষিত আরাকান অঞ্চলে বাংলা ভাষা সাহিত্যের বিপুল বিস্তার ও গভীরতা লাভের ফলেই কবি দৌলত কাজী (১৬০০-আনু. ১৬৫০), কোরেশী মাগন ঠাকুর (জন্ম-মৃত্যু-আনু. ১৬৬০), মহাকবি আলাওল (আনু. ১৬০৭-আনু. ১৬৮০) প্রমুখের আবির্ভাবকে বাংলা সাহিত্যের নবযুগের সূত্রপাত বলে মনে করা যায়। পূর্ব-বাংলা তথা চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের এই মাতৃভাষাপ্রীতি এবং এই ভাষার প্রতি প্রগাঢ় অনুরাগ বাঙালিত্ব ও বাংলা ভাষাভিত্তিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছে সে কথা বলা যেতেই পারে।
আধুনিককালেও বাঙালি মুসলমান বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেদের বাঙালির পরিচয় এবং বাংলাকে নিজেদের মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অঙ্গীকারদীপ্ত প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। আধুনিককালের প্রখ্যাত বাঙালি মুসলমান লেখক মীর মশাররফ হোসেন এ বিষয়ে পথিকৃতের ভ‚মিকা পালন করেছেন। দেশ এবং মাতৃভাষাপ্রীতি তাঁর নানা লেখায় দীপ্রভঙ্গিতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, “বঙ্গবাসী মুসলমানদের দেশভাষা বা মাতৃভাষা ‘বাঙ্গালা’/মাতৃভাষায় যাহার আস্থা নাই, সে মানুষ নহে।” অন্যত্র বলেছেন, ‘আমরা বাঙ্গালী, বাংলা আমাদের মাতৃভাষা।’ ১৯০০ সালে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বাঙালির জাতীয়তাবাদীর পণ্ডিত রেয়াজ্-অল্-দিন আহমদ মাশহাদী তাঁর ‘বিবাদ’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেছেন : “… বাঙ্গালি বলিয়া নিজের পরিচয় দিয়া সন্তুষ্ট হই। সহস্র বৎসর যে দেশে বাস করিয়া আসিতেছি, যাহার শীত-গ্রীষ্ম, সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য, প্রাচুর্য-দুর্ভিক্ষ, সুখ-সম্পদ, হর্ষ-বিষাদ সমভাবে ভোগ করিয়া আসিতেছি, সে আমার স্বদেশ নহে, তাহার বাহিরে আবার আমার এক নিজের দেশ আছে, এ কথা কখনো কেহ মনে করিতে পারে না। এজন্য আমি মোসলমান হইলেও বাঙ্গলাদেশ, বাঙ্গালা ভাষা ও বাঙ্গালি জাতি সম্বন্ধে কোনো কথা উপস্থিত হইলে তাহাতে আমার মতামত ব্যক্ত করিবার সম্পূর্ণ ষোলো আনা অধিকার আছে।” প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের খ্যাতনামা গবেষক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ১৩২১ সালে বলেছেন : “বাংলা ভাষা বাঙালি মুসলমানের শুধু মাতৃভাষা বা স্বদেশি ভাষা নয়, জাতীয় ভাষা।” তৃতীয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সম্মেলনের অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ বলেন : “দুনিয়ায় অনেক রকম অদ্ভুত প্রশ্ন আছে। ‘বাঙালী মুছলমানের মাতৃভাষা কি? উর্দ্দু না বাঙ্গালা?’ এই প্রশ্নটা তাহার মধ্যে সর্বাপেক্ষা অদ্ভুত। নারিকেল গাছে নারিকেল ফলিবে, না বেল?… পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন, Urdu and only Urdu shall be State Language of Pakistan. জিন্নাহর এই স্বৈরাচারী ঘোষণার মধ্য দিয়েই প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সূত্রপাত(This statement was the beginning of the end of united Pakistan)। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ পাকিস্তান সরকারের এই অপপ্রয়াসের প্রতিবাদে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতিসত্তার স্বরূপটি নির্ধারণ করেন এই ভাষায় : “আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তাঁর চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন দাগ মেরে দিয়েছেন যে মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-দাড়িতে তা ঢাকবার জোটি নেই।”
১৯৫১ সালের ১৭ মার্চ কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত বিশ^বিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষকদের সম্মেলনে তিনি বলেন : “পূর্ব-বাংলার বাঙালীদের উপর জোর করে বাংলা ছাড়া অন্য কোন ভাষা চাপালে তা হবে গণহত্যার (এবহড়পরফব) শামিল।” এই উক্তির ঠিক বিশ বছরের মাথায় বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তির সংগ্রামে নিয়োজিত গোটা বাঙালি জাতির ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে নজিরবিহীন গণহত্যা চালায় তাতে প্রাজ্ঞ বাঙালি পন্ডিত ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ভবিষ্যৎ বাণীরই প্রতিফলন ঘটেছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ছাত্র-জনতার প্রাণদানের ফলে বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ এবং বাঙালির মাতৃভাষার মর্যাদা শুধু রক্ষিতই হয়নি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তেইশ বছরের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছি আমার ভাষা এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষা, বাঙালিত্ব এবং বাংলাদেশকে কি অসাধারণ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন তার মূর্ত প্রকাশ ঘটেছে তাঁর এই বক্তব্যে : “ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।”