বাংলা ও বাঙালি বিদ্বেষী কার্জন

আগের সংবাদ

পরিবহন ও সড়কে শৃঙ্খলা নেই: কাদের

পরের সংবাদ

প্রতিশোধ

ববি লায়লা

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ৫:৫৪ অপরাহ্ণ

শেষবিকেলে তমাদের গাড়ি গিয়ে থামল শিকদার বাড়ির গেটে। ১০ বছর পর আবার তমার পা পড়ল এ বহরমপুরের শিকদার বাড়িতে। তমাকে ১০ বছর আগে এ বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। যারা বের করে দিয়েছিল, তমার স্বামী ছাড়া এখন তারা সবাই তমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তমা যেদিন চলে যায় সেদিন যেমন খুশি ছিল ওরা আজ তমার ফিরে আসায় ঠিক তেমনি খুশি সবাই। সবার আচরণ এ ১০ বছরে যতটা পরিবর্তন হয়েছে বহরমপুরের রাস্তাঘাটও তত পরিবর্তন হয়নি।
তমা সবার চোখে একবার করে চোখ রেখে সামান্য হেসে কোনো কথা না বলে সামনে পা বাড়াল। ওরাও কেউ কিছু জিজ্ঞেস করল না। দোতলার সিঁড়ির কাছে যেতেই বড়জা বলল, ওদিকে না। আসিফের ঘর এখন নিচে। ডাক্তারের কাছে আনা-নেয়া কষ্ট হয় তাই নিচের ঘরে দেয়া হয়েছে। দেখিয়ে দেয়া ঘরের কাছে যেতেই বিশ্রী গন্ধে বমি চলে আসছিল। কোনোরকমে নিজেকে সংযত করে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল তমা। খুব সাধারণ একটা চকির ওপর শুয়ে আছে আসিফ। বিছানায় তোষক নেই, কেমন পুরনো এক বিছানার চাদর বিছানো। সেখান থেকে আসছে প্রস্রাবের তীব্র ঝাঁঝাল গন্ধ। আসিফের সামনে দাঁড়াতেই অদ্ভুত একটা শব্দ করল, প্যারালাইজড হওয়ায় মুখ এমনভাবে বাঁকা হয়ে গেছে যে কথা বলতেও পারে না আর বললেও বুঝা যায় না। আসিফের দুচোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে অনর্গল। আসিফের চোখে এত পানি ছিল? অবাক হয়ে ভাবছে তমা। পেছনে শাশুড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, আসিফের শব্দ শুনে বলল, ছেলেটা কিযে বলে সারাদিন কিছু বুঝি না।
তমা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ আসিফের দিকে। এই কি সেই আসিফ? কতটা আর সময়? ১০ বছর? তার মধ্যেই কত চেঞ্জ। কিছুদিন আগেও আসিফ মানেই বাড়িতে এক আতঙ্কের নাম। বাইরে থেকে আসিফের বাড়ি ফেরার শব্দ পেলেই বাচ্চারা যার যার ঘরে পালিয়ে যেত। এই আসিফকে দেখে কেউ কি এ কথা কল্পনা করতে পারে? কতটা ভয়ঙ্কর আর নিষ্ঠুর মনের আসিফ।
বহরমপুরের তিন পুরুষের নাম করা বংশ, শিকদার বংশ। আশপাশের এলাকায় এমন কেউ নেই এ বংশর কাউকে চিনে না। বিষয় সম্পত্তি ছাড়াও শিকদার বংশ নামকরা। কারণ এ বংশের সব ছেলেমেয়েই উচ্চশিক্ষিত, অনেক বড় বড় জায়গায় তারা নিজ নামে পরিচিত। তাই অহংকারটাও মাত্রা ছাড়া। এতকিছু ‘আছে’ র ভিড়ে শুধু বিনয়টাই শিকদার বংশে ছিল না।
তমার সাথে আসিফের বিয়েটা হয় হঠাৎ করে। আসিফের যোগ্যতা বলতে নামকরা বংশের ছেলে আর প্রচুর টাকার মালিক আসিফরা। তাই বিয়ের প্রস্তাব পাওয়া মাত্রই তমার বাবা রাজি হয়ে যায়। তমা কেবল স্কুলের পর্ব শেষ করে কলেজে পা দিয়েছে। এর মধ্যেই বিয়ে। এত তাড়াতাড়ি বিয়ের ইচ্ছে না থাকলেও বাবার ওপর কথা বলার সাহস পায় না তমা।
বিয়ের রাতেই তমার ইচ্ছে হচ্ছিল পালিয়ে যায়। সাতকাহনে যেমন দীপাবলি পালিয়ে বেঁচেছিল। কিন্তু সাহস পায় না। ভাবে ঠিক হয়ে যাবে হয়ত। কিন্তু না ঠিক হয় না। যতদিন আসিফের সাথে থেকেছে প্রতিরাতেই তমার এক অসহ্য যন্ত্রণায়, ভালো না লাগায় রাত পার হতো। কারণে-অকারণে তমার গায়ে হাত তুলতো আসিফ। আর কি যে বীভৎস ছিল আসিফের আদর করা। সমস্ত কাপড় বিবস্ত্র করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকতে হতো তমাকে। এমনটা মাঝেমাঝেই করতে বাধ্য করত আসিফ। ততদিনে আসিফের আর তমার এক মেয়ে হয়। ৫ বছর বয়স। নাম মুমু।
মুমুর জন্য ভয় লাগত তমার। কখনও যদি ঘুম ভেঙে যায় মেয়েটার। তাহলে এ বিবস্ত্র অবস্থায় তমাকে দেখে ওর শিশুমনে খারাপ প্রভাব পড়বে। একদিন তমার ভীষণ শরীর খারাপ। একটু পর পর গলা ভেঙে কাশি আসছে। বাইরে কোথাও বেড়াতে যেতে বলে আসিফ। তমা যেতে চায় না, সে রাতে পুরোরাত তমাকে বেডের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় এক মিনিটের জন্যও বসতে দেয়নি আসিফ। তমাও কোনো প্রতিবাদ করেনি দাঁড়িয়েই ছিল। বিনাবাক্যে, বিনাকাপড়ে। আসিফের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। হয়ত সেটাই তমার মৌন প্রতিবাদ। এমন প্রায়ই হতো তমার সাথে।
আসিফদের যৌথ পরিবার। আসিফের মাসহ ছোট বোন, দুই ভাই ও তাদের পরিবার। তাদের প্রত্যেকেই আসিফের এ আচরণের কথা জানত। কিন্তু ছেলেরা একটু এমনি হয়। মেনে নিয়ে চলতে বলত। আসিফ তখন দুহাতে টাকা ইনকাম করত। টাকার তেমন অভাব কারো না থাকলেও সব চেয়ে বেশি ইনকাম করায় পরিবারের প্রত্যেকের আসিফের ওপর বিশেষ এক দৃষ্টি ছিল। সবচেয়ে বেশি যত্নটা পেত মেঝভাবির কাছ থেকে আসিফ। বাড়ির প্রত্যেকে চলত ঘড়ির কাঁটার হিসাবে কিন্তু মেঝভাবি চলত আসিফের হিসাবে। এই অবৈধ সম্পর্কের কথা বাড়ির সবাই জানত কিন্তু তমার ভালো লাগত সবার অভিনয়। শাশুড়ি ননদ জা সকলে সব দেখেও কেমন না দেখার ভান করত। তমা কখনো এটা নিয়ে কিছু বলতো না। কারণ ও জানে শুধু মেঝভাবির সামনে হাসির পাত্রী হবে ও। আর আসিফকে আপন করে পাবার কোনো ইচ্ছেও করতো না তমার। শুধু অর্থের একটা নিশ্চিত প্রবাহ সবাইকে অন্ধ করে দিয়েছিল। মেঝভাবির সাথে আসিফের সম্পর্ক থাকলেও তমাকে বাড়ির কেউ কিছু বলার সাহস ছিল না। এই ব্যাপারটা তমাকে খুব অবাক করত। এতো অমানবিক অত্যাচার অথচ অন্য কেউই তমাকে অসম্মান করতে পারতো না।
আসিফের এমন অদ্ভুত আচরণের কারণ কি প্রায়ই ভাবত তমা। কতদিন চলে যাবে বাবার বাড়ি ভেবেছে। নতুন করে জীবন শুরু করবে কিন্তু মেয়েটার জন্য সে ভাবনায় ছেদ পড়ত। মেয়েটার সামনেই কি যে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করত আসিফ। একসময় দেখা গেল আসিফের দেয়া ক্ষতগুলো আর ততটা যন্ত্রণাময় লাগছে না। ৫ বছরের মুমু সে ক্ষতগুলোয় মলম দিত। যত আসিফ তমাকে অত্যচার করত তত মুমু তমার খুব কাছে যেত। মুমু আসিফকে যে ঘৃণা করা শুরু করেছে তমা বুঝতে পারত। এই একটা কারণেই তমা আসিফের কাছে থেকে গেছে। যদিও এখানে তমার কোনো হাত নেই। কিন্তু ওর মনে হতো একমাত্র মুমুর জন্যই ও বেঁচে থাকবে। কিন্তু সেখানেও ঘটে গেল এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। একেবারেই অপ্রত্যাশিত।
অন্যান্য দিনের মতো মুমু বাড়ির অন্য বাচ্চাদের সাথে খেলতে বাইরে যায়। আসিফ বাড়ি ছিল না। অনেকক্ষণ মুমুকে না দেখতে পেয়ে তমা মুমুকে খুঁজতে থাকে। কোথাও খুঁজে পায় না। এ বাড়ি ও বাড়ি কোথাও না। সন্ধ্যার কিছু আগে পাওয়া যায় মুমুকে। বাড়ির পাশের এক ডোবায়। কখন কিভাবে মুমু ওখানে গেছে কেউ জানে না। আসিফ বাড়ি ফিরে সব শুনে কাউকে কিছু না বলে দাফনের কাজ স্বাভাবিকভাবেই করা হলো। তমার সামনে দিয়ে কি কি হলো যেন ও কিছুই দেখতে পেল না। একদম চুপ হয়ে গেল তমা। আসিফ ফিরে জানতে চাইল মুমু বাইরে গেল তুমি দেখ নাই? এ প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না তমার কাছে। চুপ করেছিল। আসিফ সে সন্ধ্যায় সবার সামনেই তমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল। তমা একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। বাড়ির সবাই স্পষ্ট করে না বললেও আকারে ইঙ্গিতে বুঝালো তমার মুমুর প্রতি আরও যত্ন নেয়া উচিত ছিল। সে রাতেই তমা চলে গেল তমার বাবার বাড়ি।
# এই ছিল তমার শিকদার বাড়ি ত্যাগের কাহিনী। আজ আবার ১০ বছর পর কেন ফিরে এলো?
আসিফ যতই তমার ওপর অত্যাচার করুক তমা চলে যাওয়ার পর আর বিয়ে করেনি। বেশ ক’মাস পর আসিফ গিয়েছিল তমাকে আনতে। কিন্তু তমা দেখাও করেনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তমাদের বাড়িতে অপেক্ষা করে আসিফ ফিরে আসে। তমার এ শক্ত আচরণের কথা জানত আসিফ। কখনো প্রতিবাদ না করলেও চুপ থাকাটাই প্রতিবাদ তমার।
মাসখানেক আগে হঠাৎই আসিফ স্ট্রোক করে। প্রায় সাথে সাথেই ডাক্তারের কাছে নেয়া হয় কিন্তু আর উঠতে পারে না। শরীরের ডান অংশ প্যারালাইজড হয়ে যায়। মানুষের শরীর এক অদ্ভুত জিনিস। নিজের শরীরটাই মানুষের একান্ত আপন অথচ এর ওপর কারো কোনো কন্ট্রোল নেই। কখন কি হবে কেউ জানে না। এই এক মাস আসিফকে ওর মা দেখাশোনা করে কিন্তু একসময় আর পারে না। ভাই-ভাবিরা যার যার সংসারের বাহানায় ব্যস্ত। একদিন অনেক আশা নিয়ে আসিফের মা যায় তমাদের বাড়ি। তমার কাছে অনুনয় বিনয় করে। যদিও মনে মনে জানত তমা রাজি হবে না। তমাদের বাড়ির প্রত্যেকেই প্রচণ্ড বিরক্ত। সবাইকে অবাক করে দিয়ে তমা রাজি হয়। আসিফকে দেখাশোনার জন্য। এতোটা অবাক কেউ তমা চলে যাবার দিনও হয়নি আজ আবার তমার ফিরে আসায় যতটা হয়েছে।
রাতে আসিফকে অনেক যত্ন করে খাইয়ে মুখ মুছিয়ে দিল তমা। আজ অনেকদিন পর আসিফের মা নিশ্চিন্ত হলো আসিফ দেখে। অনেক খুশি মনে ঘুমাতে গেল। বাড়ির সবাই ঘুমাতে গেলে তমা খুব কাছঘেঁষে আসিফের পাশে বসল। এতো কাছে বসতে দেখে আসিফ কেমন একটা শব্দ করল। তমা বলল, খুব অবাক হচ্ছো না? বিয়ের পর কখনো আমাকে এভাবে বসতে দেখনি তাই না? আমি তো বসতে চাইতাম তুমি এমনভাবে মারতে আমাকে আমার শরীরের চেয়ে মনে কষ্ট থাকত বেশি তাই বসা হতো না। এ কথা শোনার পরই আসিফের দুচোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। তমা পানি মুছে দিতে দিতে বলল আহ! কাঁদছো কেন? চোখের পানি তুলে রাখো। এখন প্রাই তোমাকে কাঁদতে হবে। আসিফ শিকদার তুমি কি ভাবছো এই পঙ্গু তোমাকে আমি সেবা করতে এসেছি? না। এই ভুল ভাবনা মাথা থেকে তাড়িয়ে দাও। আমি আসছি প্রতিশোধ নিতে? তুমি মারা যাবার আগে আমার হাতে শতবার মরবে। ভেবো না তোমার যত্নের অভাব হবে। আমি নিজ হাতে তোমার সব সাফ করব। তোমাকে তিলে তিলে শেষ করব অন্য উপায়ে। সকাল পর্যন্ত ভালো থাকো। আর আজকের রাত তোমার আরামে ঘুমানোর শেষ রাত। ঘুমিয়ে নাও আসিফ শিকদার।
আসিফ অনেকক্ষণ থেকে তাকিয়ে আছে তমার দিকে। তমা ফোনে কথা বলছে আর খিলখিল করে হাসছে। একসময় ফোন রেখে আসিফের দিকে তাকিয়ে বলল, আমাকে কেমন দেখাচ্ছে বলত? তুমি তো কখনো আমাকে একটু সাজতেও বলতে না। সাজলে আমাকে কেমন দেখায় তাও জানি না। আমার মেয়েটা সাজতে খুব পছন্দ করত, কিন্তু ও তোমাকে এত ভয় করত যে সাজাতে বসলেই বলত বাবা বকা দিবে। তুমি তো ওকে কখনো বকা দিতে না তবু কি প্রচণ্ড ভয় করত তোমাকে। না জানি তোমার ভয়ে মেয়েটা আমার কত কি করতে শখ করেও বলত না। কারণ ও জানত কোনো ভুল হলে তুমি আমাকে মারবে। অতোটুকু মেয়ে আমাকে বাঁচাতে চাইত। জীবন দিয়েই বাঁচালো আমাকে। তমা আনমনে কথাগুলো আসিফকে বলছিল আর কাঁদছিল। হঠাৎ তাকিয়ে দেখে আসিফও কাঁদছে। প্রচণ্ড রাগে তমার শরীর কাঁপতে থাকে। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে, আজকে অবশ্য তোমার জন্য সাজিনি, নাহিদ আমাকে সাজতে বলছে। একটু পর আসবে। তোমাকে দেখতে। আর আমার সাথে নাকি কথা আছে।
নাহিদ আসিফের বিজনেস পার্টনার। বয়স ৩০-৩৫র হবে। অবিবাহিত। প্রায়ই তাকে আসিফের সাথে দেখা করার জন্য এ বাড়িতে আসতে হয়। এখন অবশ্য আসিফের চেয়ে তমার সাথে দেখা করাটাই মূল উদ্দ্যেশ্য। অনেকক্ষণ থেকে বসার রুমে অপেক্ষা করছে। তমার মতো এমন সুন্দর একজনের জন্য অবশ্য সব ছেড়ে সারাক্ষণ বসে থাকা কঠিন কিছু না। তমার সাথে পরিচয় প্রায় কয়েক মাস হয়ে গেল। নাহিদের তমাকে ভালো লাগলেও সাহস হতো না সে কথা জানানোর কিন্তু তমা ও নাহিদকে একসময় ইঙ্গিতে বুঝায় নাহিদকে ভালোবাসে। বয়স আর কত মেয়েটার? শরীরের তো একটা চাহিদা আছে, নাহিদের এটা বুঝা উচিত ছিল আগেই। আজ কোথাও বেড়াতে যাবার প্লান করতে হবে। এই সুখ স্বপ্নের মধ্যে তমা এসে হাজির। কেমন লাগছে আমাকে? সবুজ আমার প্রিয় রং। নাহিদ সুযোগ পেলেই তমার সৌর্ন্দযের প্রশংসা করতে ছাড়তো না। কখনো কখনো সে প্রশংসা রূপ থেকে শরীরের দিকে মোড় নিত। তমা হাসি হাসি মুখ নিয়ে শুনত সেসব। ভালোবাসার কোনো রং রূপের সাথে তমার পরিচয় নেই। ভালোবাসার সংজ্ঞা তমার কাছে সবসময় বীভৎস রূপেই এসেছে। আসিফ যা করত তা মনে পড়লেও গা শিউরে ওঠে। আর নাহিদের মতো কীটেদের কাছে ভালোবাসা বলতে লকলকে জিহ্বর লালা ঝরানো আহ্বনকেই দেখে তমা। সত্যিই কি ভালোবাসার রূপ এত নোংরা?
ওদের কথার মাঝেই তমার শাশুড়ি এসে বলে, তমা তোমরা দুজন কি কথা বল এতো। নাহিদ প্রায়ই আসে তোমার সাথে কথা বলে। আসিফ একলা থাকে ও ঘরে? নাহিদ উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল, তমা বসতে বলে নাহিদকে। হাসি চেপে রেখে বলে কেন মা এ তো আপনার পরিচিত দৃশ্য। একসময় মেঝছেলের বউ এমন পরপুরুষের সাথে গল্প করত তখন তো কিছু বলেননি। নিজের ছেলেকে যে শাসন করতে পারেন না অন্যের মেয়েকে সে শাসন করবেন না। তমার শাশুড়ি কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।
আসিফকে রাতের খাবার খাওয়াতে হবে তাই তমাও উঠতে চায়। নাহিদ অধৈর্য হয়ে বলে তুমি তো তোমার স্বামীকে ভালোবাসো না। আমাকে ভালোবাসো। তাহলে ওকে এতো সময় দাও কেন? তমা হাসতে হাসতে বলে, তুমি আমাকে খুব ভালোবাসো তাই না? তাইলে মাঝেমাঝে যে মেয়েটাকে নিয়ে ঘুরতে যাও সে কে? কাল বিকেলেও তোমরা ঘুরেছো। নাহিদ চুপসে যায়। তমার ভীষণ হাসি পায়। আরে ব্যাপার না তুমি ৫টার সাথে প্রেম করো সমস্যা নেই। আমাকে যে তোমার মন ও শরীর চায় আমি জানি। নাহিদ যেন হাপ ছেড়ে বাঁচে এ কথা শুনে। হঠাৎ তমার হাতটা ধরে নাহিদ, তুমি বুঝো আমি তোমাকে চাই? তমা হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, বুঝবো না কেন? সব বুঝি। নাহিদ আকুল আবেদনের সুরে বলে, তাহলে দূরে থাকো যে? তমার শরীরটা ঘৃণায় রিরি করে ওঠে। শোনো নাহিদ আমি এতোগুলো দিনের কষ্ট ভুলে যেয়ে আবারও আসিফের কাছে এসেছি তার কারণ আছে। আমি তো কাঁচা কাজের পাত্রী না। তোমার পিছনে আমার সবসময় লোক লাগানো আছে, তুমি কি কর না কর সব হিসেব ক্ষণে ক্ষণে আমি ঘরে বসে পাই তাই আগে দেখি তুমি আমার জন্য কি কর তার ওপর নির্ভর করবে তোমাকে আমার মন ও শরীরে কতটুকু জায়গা দিব। এতটুকুতেই নাহিদ চুপ করে গেল।
নাহিদ চলে গেলে তমা মনে মনে অনেকক্ষণ হাসল। এই গাধাটা এতো অল্পতে ভয় পেয়ে গেছে। পৃথিবী সব নাহিদই তমাদের কাছে কখনো ভালোবাসা চায় না। চায় অন্যকিছু।
আসিফ তখনো ঘুমায়নি। যেভাবে হুইল চেয়ারে রেখে গিয়েছিল তেমনি বসে আছে। তমা ঘরে এসে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো, এখনো ঘুমাওনি? নাহিদ এতো মজার গল্প করে, উঠতেই পারছিলাম না। আসিফ একভাবে তমার দিকে তাকিয়ে ছিল। তমা বাঁকা হাসি ঠোঁটে নিয়ে বলল, খারাপ লাগছে? আমারও এমন খারাপ লাগতো তুমি যখন তোমার ভাবির ঘর থেকে ডিনার করে আসতে। আমার কথা আমার মেয়েটার কথা চিন্তাও করতে না। মুমু একটু একটু করে বুঝতে পারত। ওর বাবা দেরি করে বাসায় আসছে মানেই মেঝচাচির ঘরে আছে।
তমা সারাদিনে যা কিছুই করুক প্রতিদিন একবার করে মুমুর কবরের কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকত। ঘরে সারাদিন এটা ওটা কাজ করতে করতে মনে হতো মুমু পাশে আছে। আসিফকে নিয়মিত ব্যায়াম, গোসল খাওয়াতে তমার ভালো লাগত কারণ, মুমু পুরোটাই আসিফের চেহারা পেয়েছিল। হঠাৎ করে যেন মুমুকে দেখতে পায়।
এর মধ্যে ঘটে অবাক ঘটনা। আসিফ কিছুটা কথা বলতে পারে, অস্পষ্ট তবুও বুঝা যায়। ডান হাতেও কিছুটা শক্তি ফিরে এসেছে। ডাক্তার বেশ আশাবাদী আসিফের উন্নতিতে। বয়স অল্প আসিফের ভালো চিকিৎসা পেলে আসিফ সুস্থও হতে পারে। তমার হঠাৎ মনে হয় দেশের বাইরে নিয়ে গেলে আসিফ সুস্থ হবে। কি ভেবে তমা বাড়িতে এসেছিল আর কি হচ্ছে। এই ১০ বছরে মুমুকে হারানোর জন্য সবসময় তমা আসিফকে দোষ দিত। অথচ প্রতিদিন একটু একটু করে তমা আসিফের কাছে চলে যাচ্ছে সব রাগ ভুলে। মাঝেমাঝেই আসিফ তমার হাত শক্ত করে ধরে থাকে তমা কোনো কথা বলতে পারে না তন্ময় হয়ে বসে থাকে। শরীরে এক ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। পা দুটো স্থির হয়ে নড়তে ভুলে যায়। এটাই কি ভালোলাগা?
প্রতিদিন একটু একটু করে আসিফের শক্তি ফিরে আসছে। এর মধ্যে ওরা ইন্ডিয়া যায় চিকিৎসার উদ্দেশে। আগের চেয়ে এখন বেশ ভালো আসিফ। সারাদিন ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি করে বিকেলে রুমে ফিরে। শেষ বিকেলের মরা আলোয় হোটেলের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছিল তমা। কাঁধে হাতের স্পর্শ পেয়ে তাকিয়ে দেখে আসিফ খুব কাছে দাঁড়িয়ে। সূর্যাস্তের সোনালি নরম আভা আসিফের পুরো মুখে মেখে আছে। ভালো লাগছে দেখতে আসিফকে। যা কোনোদিন করেনি তমা সেই সন্ধ্যায় তাই করে বসল। আসিফের বুকে মাথা রেখে কেঁদে ফেলল। আসিফ শক্ত করে তমাকে বুকে ধরে রেখেছে। চারদিকে ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে যায় নতুন আলো উঠবে বলে। হ