ডিজিটাল বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা

আগের সংবাদ

দীপাবলীর বাক্সবন্দী ইচ্ছেগুলো বাক্সেই ফিরে গেলো

পরের সংবাদ

পদ্মশ্রী

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ৫:০৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ৫:০৬ অপরাহ্ণ

Avatar

ফাল্গুন মাসের একদিন দুপুরবেলায় দেবরামপুর গ্রামের লোকেরা পদ্মশ্রী নামের হারিয়ে যাওয়া গ্রামের সবচেয়ে রূপসী মেয়েটিকে হঠাৎ দেখতে পায়। গ্রামের লোকেরা তখন ভাবে, এতোদিন পর পদ্মশ্রী কোত্থেকে এলো?
অথবা কেউ কিছু ভাবে না, গ্রামের বয়স্ক, প্রবীণ লোকেরা, তাদের ছানিপড়া চোখের ঘোলাটে দৃষ্টি দিয়ে তাকায়, তাদের মনে হয়ত দু’একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খায় কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করে না। হারিয়ে যাওয়া কোনো মূল্যবান জিনিস হঠাৎ খুঁজে পেলে মানুষের যে অবস্থা হয়, বিস্ময় আর আনন্দমাখা অনুভ‚তি নিয়ে তারা পদ্মশ্রীর মুখের দিজে তাকায়। গ্রামের অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা কেউ কেউ তাদের বাবা-মার মুখে পদ্মশ্রীর কথা হয়ত শুনেছে অথবা শুনে নাই, তাদের স্বচ্ছ দৃষ্টি রাজ্যের কৌত‚হল। ‘পদ্মশ্রী আবার গ্রামে ফিরে এসেছে!’
এ খবর গ্রামের সর্বত্র বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়লে, গ্রামের ছেলে-বুড়ো সার্কাসের হাতি দেখার মতো ছুটে এসে শীলবাড়ি উঠোনে ভিড় জমায়। চারদিকে তখন কড়া রোদ, বাতাস উষ্ণ। বাড়ির দরজায় পুকুর পাড়ে প্রকাণ্ড শিমুল গাছে লাল হয়ে ফুটে আছে শিমুল ফুল। পত্রহীন শিমুল গাছের ডালে ডালে লাল লাল ফুলের বর্ণাঢ্য আভা দূর থেকে দৃষ্টি কেড়ে নেয়। শিমুলের ডালে শালিক, বনকোয়েল অথবা নাম না জানা একটি পাখি ‘তোফাল’ ‘তোফাল’ ‘তোফাল’ ঘনঘন কয়েকবার ডেকে শূন্য আকাশের দিকে উড়ে যায়। এছাড়া বসন্তকালের আর কোনো চিহ্ন কোথাও নেই।
বাজারে নরেশ শীলের সেলুন দোকান, নিত্যদিন সে ক্ষেরি করে বাড়ি ফিরে আসে এ সময়। প্রতিদিনের মতো আজো সে ধানকাটা খোলা মাঠের ধূরপড়া পথে কোনাকুনি হেঁটে এসে তাদের পুকুরপাড়ে উঠে। উঠোনে পা দিতেই পদ্মশ্রীকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের জমায়েত দেখে সে খুব অবাক হয়, তারপর ভিড় ঠেলে বারান্দায় পা রাখতেই স্থির হয়ে বসে থাকা পদ্মশ্রীর দিকে তার নজর পড়ে।
পদ্মশ্রীর মুুখ একবার দেখেই নরেশ চন্দ্রশীল যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়, পা দুটো যেন তার মাটির গভীরে গর্তে সেঁদিয়ে গেছে। সে চলৎশক্তি হারিয়ে, নির্বাক চোখে তাকিয়ে থাকে। তার শ্রমক্লান্ত পোড়া মুখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ঝরতে থাকে। জোড়া জোড়া চোখ তাকে দেখছে কিন্তু সে যেন চোখে কিছুই দেখছে না, মুহূর্তকাল তার দৃষ্টি অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
পদ্মশ্রী নরেশ চন্দ্রশীলের আপন বোন। একই মায়ের উদরে তাদের জন্ম কিন্তু সে জন্ম-জন্মান্তরের সম্পর্ক যেন আজ দূরাগত। মুক্তিযুদ্ধের পর কত বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, তার বাবা সমর চন্দ্রশীলকে পাকবাহিনী উঠোনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে, বিধবা মা আশালতা রানীশীল স্বামীর শোক আর মেয়ে পদ্মশ্রীকে হারানো বেদনা নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে শ্মশানে-স্বর্গে গেলো। সেই সব অশ্রæময় দিন এবং রাত্রি অতিক্রম করে, এতোদিন পর ভাই বোনকে দেখেও তাদের মধ্যে কোনো স্বাভাবিক আবেগ কাজ করে না। সময়ের দূরত্ব তাদের মধ্যে কেবল ব্যবধান রচনা করেনি, রক্তের বন্ধনও যেন শিথিল হয়ে পরস্পরকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।
নরেশ শীলের পা জোড়া ধুলোমাখা, পরনে ধুতি, গায়ে আধময়লা কোর্তা, গলায় তুলসী মালা ঘামে ভিজে গেছে। কানের দুপাশের চুল ছাপ দিয়ে পাক ধরেছে। কপালে বয়সের ভাঁজ, চোখে দু’টি কোঠরাগত। পদ্মশ্রী অনেকক্ষণ ধরে ভাইয়ের মুখ নিরীক্ষা করে অথবা স্মৃতি হাতড়ে বেড়ায়, ত্রিশ বছর আগে দেখা ভাইয়ের চেনা মুখের সঙ্গে মেলাতে চেষ্টা করে। তারপর হঠাৎ ‘ও ভাইগো ভাই’ বলে নরেশ শীলের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিলাপ করতে থাকে। সে কান্না শ্মশান ঘাটের রোদনের মতো অন্যদের চোখের কোণে অশ্রু হয়ে ঝরতে থাকে। দুঃখ কিংবা বিষাদ গ্রামের সরলপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে দ্রুত সঞ্চারিত হলে তাদের মধ্যে শীতল নিস্তব্ধতা নেমে আসে। গ্রামের লোকেরা রোরুদ্ধমান দুই ভাই বোনকে দেখে বিহ্বল হয়ে যায়। দেবরামপুর গ্রামের লোকদের জীবনে এমন বিহ্বল সময় আর কখনো আসেনি এবং আর কোনোদিন এমন দৃশ্যের অবতারণা হবেনা, হওয়ার সম্ভাবনা নেই কারো কারো মুখে এমন কথা উচ্চারিত হতে থাকে।
দেবরামপুর গ্রামের প্রবীণ লোকদের মধ্যে কুদ্দুসের বাপ কিংবা সাফির বাপ, যারা এখন গ্রামের বিচার-আচার করেন, পদ্মশ্রী গ্রামে ফিরে আসার ঘটনা, তাদের কাছে নানাজন নানাভাবে বর্ণনা করে। সে ঘটনা একজনের মুখ থেকে অন্যজনের মুখে বর্ণিত হতে হতে এক চাঞ্চল্যকর গল্পের জন্ম দেয় এবং গল্পের ডালপালা বিস্তার করে এক অবাস্তব মহীরুহে পরিণত হয়। পুরো গ্রামজুড়ে তখন তোলপাড় শুরু হয়, গল্প থেকে গুজব, গুজব থেকে ভয়ঙ্কর ভীতি ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের নারী-পুরুষদের মনে। গ্রামের লোকেরা শুনতে পায়, পদ্মশ্রী আকাশপথে গ্রামে প্রবেশ করেছে, কেউ বলে ঘোড়ায় চড়ে গ্রামে প্রবেশ করেছে, তারচেয়ে বরং প্রকাণ্ড শিমুুল গাছের ডাল থেকে নেমে এসেছে বললে গ্রামের লোকদের বিশ্বাস করতে কোনো আপত্তি থাকে না।
পদ্মশ্রীকে গ্রামে প্রবেশকালে কেউ দেখেনি। নির্জন দুপুরে তার আগমন হয়ত লোকচক্ষুর অগোচরেই হয়েছিল কিন্তু সে কথা গ্রামের লোকেরা কেউ বিশ্বাস করে না, তারা শুনতে পায়, পদ্মশ্রী যেদিন গ্রামে প্রবেশ করেছে, সেদিন থেকে গ্রামে অমঙ্গল শুরু হয়েছে। কারিগর বাড়িতে সেইদিনই কলেরা শুরু হয় এবং সেই রাত্রেই কলেরায় তিনজনের মৃত্যু ঘটে। চকিদার বাড়ির আব্দুল মজিদের ছেলে আব্দুল বারী আবুধাবি থেকে লাশ হয়ে ফিরে আসে, সেদিন থেকে গ্রামের গৃহস্থ বাড়ির হাঁস-মুরগিতে মড়ক লাগে এবং সপ্তাহখানিকের মধ্যে গ্রামের হাঁস-মোরগ সব মরে সাফ হয়ে যায়। দিনে-দুপুরে, কোনো ঝড়বৃষ্টি ছাড়া হাজি বাড়ির জোড়া নারকেল গাছের ওপর আকাশ থেকে বাজ পড়ে গাছ দু’টির মাথা পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
এসব অনির্ধারিত, অপ্রত্যাশিত ঘটনা হয়ত কাকতালীয়ভাবে ঘটেছে কিন্তু গ্রামের লোকেরা বাস্তবতার চেয়ে অলৌকিকতা অধিক পছন্দ করে এবং তাদের দৃষ্টিতে বিশ্বাস এমন অনঢ় যে, অকাট্য যুক্তি তাদের কাছে হাস্যকর। গ্রামের লোকেরা শুনতে পায়, পদ্মশ্রী গ্রামে আসার সময় অনেক সোনাদানা অথবা বস্তাভর্তি নগদ টাকা নিয়ে এসেছে এবং নরেশ চন্দ্রশীল সে টাকা গুপ্তধন পাওয়ার মতো করে গোপন রেখেছে। নরেশ শীলের ভাঙাবেড়া, চালাঘরের জায়গায় অল্পদিনের মধ্যে দোতলা পাকা ঘর উঠেছে এবং ভ‚মিহীন নরেশ শীল ইতোমধ্যে কিছু জমিজমা কিনে চাষবাস শুরু করেছে বলে গ্রামের লোকেরা শুনতে পায়। গ্রামের লোকেরা তখন ভাবে, নরেশ শীলের অবস্থা যদি এমন হয় রাতারাতি পাল্টে যায়, তার অবস্থার উন্নতি ঘটে, তবে মড়ক লেগে গ্রামের হাঁস-মুরগি সব সাফ হয়ে যাওয়ার ঘটনা কিংবা কলেরায় একরাতে তিনজন লোকের মৃত্যুর ব্যাখ্যা কী?
পদ্মশ্রী গ্রামে ফিরে আসার ঘটনা গল্প কিংবা গুজব নয়, সত্যি কিন্তু সেই সত্যি ঘটনার পরবর্তী ঘটনা গ্রাম থেকে অন্যগ্রামে এবং উপজেলা থেকে জেলা শহরেও ঢেউয়ের মতো পৌঁছে যায়। থানা থেকে পুলিশ আসে, উপজেলা চেয়ারম্যান স্বয়ং গাড়ি নিয়ে আসে, পরিদর্শন করে, পত্রিকার সাংবাদিক কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে গ্রামের পথে-ঘাটে ঘুরে, গ্রামের লোকজনকে নানা রকম প্রশ্ন করে, সে প্রশ্নের উত্তরে পদ্মশ্রী প্রসঙ্গ ছাড়িয়ে বাজ পড়ে দু’টি নারকেল গাছ মাথা ভেঙে পড়ে যাওয়ার ঘটনা বড় হয়ে উঠে। গ্রামের সমাজ ঠিক রাখার দায়িত্ব যাদের ওপর বর্তায়, এমন তোলপাড় করা ঘটনায় তাদের বসে থাকার উপায় থাকে না, তারা ভাবে, এ সময় তাদের কিছু একটা করা দরকার কিন্তু কী করবে অথবা কীভাবে করবে, এ কথা ভাবতে ভাবতে বেশ কিছুদিন গত হয়ে যায়। গ্রামে তখন টেলিভিশনের ক্যামেরাসহ সুবেশধারী সাংবাদিকরা আসতে শুরু করে এবং সচিত্র প্রতিবেদনে গ্রামের গৃহস্থ ঘরের বৌরা তাদের হাঁস-মুরগি সব মরে সাফ হয়ে যাওয়ার কথা আফসোস এবং কান্নাসহ বলতে থাকে।
চ্যানেলের লাইফ খবরে দিনেদুপুরে মেঘবৃষ্টি ছাড়া বাজ পড়ে নারকেল গাছ পুড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেশবাসী দেখতে পায়। পদ্মশ্রীর ঘটনা তখন নেপথ্যে চলে যায় এবং মূল ঘটনা গৌণ হয়ে পড়ে তখন ঘটনার পরবর্তী ঘটনা মূল চরিত্র ও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। আমেরিকায় থাকা ফজর আলীর নাতি, যে কি-না শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে লেখাপড়া শেষ করে এখন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চতর ডিগ্রির প্রয়োজনে অবস্থান করছে, সে নিজ গ্রামের কথা টিভি চ্যানেলের সচিত্র প্রতিবেদনে দেখে মূল ঘটনা কী, তা জানার জন্য বাড়িতে ফোন করে। ফজর আলীর ছেলে রমজান আলী তার পুত্র ইমরান আলী ওরফে খোকন মোবাইলে ভিডিও কল করে জানতে চায়- ‘পদ্মশ্রী কী সত্যি গ্রামে এসেছে? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে রমজান আলী তাদের হাঁস-মুরগি সব মড়ক লেগে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা সবিস্তারে বলতে থাকে এবং গ্রামে অমঙ্গল অথবা কুপা লাগার কথা কলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
একটা টিভি চ্যানেলের মহিলা সাংবাদিক ঘটনার মূল রহস্য উন্মোচনের জন্য দেবরামপুর গ্রামের সর্দার-মাতাব্বর শ্রেণির একজনকে খুঁজতে গিয়ে আব্দুল মজিদ কিংবা রুপিয়ার বাপের সন্ধানে চকিদার বাড়িতে যায় কিন্তু সেই সময় রুপিয়ার বাপ বাড়িতে না থাকায় মহিলা সাংবাদিক সারেংবাড়ির সাফিয়ার বাপের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। সাফিয়ার বাপের আসল নাম আব্দুল লতিফ কিন্তু এ নামে তাকে এখন আর গ্রামের কেউ চেনে না কিংবা একসময় ‘লতিফ’ অথবা ‘লতিফ্যা’ নামে যারা তাকে ডাকতো, সেই মুরুব্বিদের কেউ এখন আর বেঁচে নেই, ফলে এখন যারা তাকে চেনে, সাফিয়ার বাপ নামেই চেনে। সেই কোনকালে আব্দুল লতিফ বিয়ে করেছে, তার প্রথম সন্তারের জন্ম হওয়ার পর খুব শখ করে নাম রেখেছিল সাফিয়া বেগম কিংবা সাফিয়া খাতুন, সেই সাফিয়া ছোট থেকে বড় হয়েছে, বিয়ে দিয়েছে তার ঘরে ছেলেমেয়েরা বিয়ে-শাদি করে অন্য গ্রামে বসবাস করছে। সাফিয়া খাতুন ছাড়াও আব্দুল লতিফের আরো পাঁচ সন্তান হয়েছে, তারাও বিয়ে তা করে আলাদা আলাদা সংসার পেতেছে কিন্তু আব্দুল লতিফ তার পিতৃপ্রদত্ত নাম হারিয়ে গ্রামের মানুষদের কাছে রুপিয়ার বাপ নামেই স্থায়ী পরিচিতি লাভ করেছে। হয়ত সেই কারণে মহিলা সাংবাদিক প্রথমে-‘আপনার নাম কী? বলে প্রশ্ন করে তখন সাফিয়ার বাপ নিজ মুখে ‘আব্দুল লতিফ’ নামটি প্রথম উচ্চারণ করে। টিভি চ্যানেলের কল্যাণে দেবরামপুর গ্রামের অখ্যাত, অপরিচিত আব্দুল লতিফকে সারাদেশের মানুষ দেখতে পায়, তার মুখের সামনে টেলিভিশনের মাইক্রোফোন, সে বলে ‘ঘটনা অইলো গিয়া ১৯৭১ সালের জুন মাসের ২১ তারিখ দিবাগত রাইতে পাকবাহিনী আঙ্গো গেরামে আইছিল, আইয়া হইলা হরত্থ রফিক মাস্টরের বা’ইত ঢুইকছিলো। মাস্টরের হোলা মাসুদ্যা হেনি কলেজে পইড়তো। হেতে বা’ইতুন হলাই যাই মুক্তিবাহিনীতে গ্যাছে। গেরামের মাইনসে কতকতা ক’য়! বা’জি হেই রাইতে কতা কি কইতাম! কেয়ামতের রাইত, ইয়াকুব মালানা হাকিস্তানি মিলিটারি লই আই রফিক মাস্টরের বা’আইত আগুন দিই জ্বালাই দিলো! গেরামের হোলা-বু’য়া বেয়াক্কুন যার যার হরান লই বনেজঙ্গলে হলাইছে। মিলিটারি তার’ হরে শীলবা’ইত যাই হেতাগো দুয়ার ভাঙ্গি ঘরে ঢুকি সমর চন্দ্রশীল, তরণী চন্দ্রশীলেরে ধইরা উডানে খা’করাই একগুলিতে দু’জনেরে মারি হালাইছে। বাপেরে মাইত্তো দেখি মাইয়া পদ্মশ্রী চিৎকার দিয়া উইটছিল। পদ্মশ্রীরে ধরি জিপগাড়ি তুলি মিলিটারিরা লই গ্যাছে। বা’আজি তার হরেত্তুন পদ্মশ্রীর আর কুনো খোঁজখবর আছিল না। এতদিন হরে পদ্মশ্রী আচানক হেদিন গেরামে আই ঢুইকছে। তার হরেত্তুন কত ঘটনা…’
একটানা বিবরণ দিয়ে বুড়ো আব্দুল লতিফ যেন হাঁপিয়ে উঠে, তার চোখ-মুখ করুণ দেখায়, দুঃখ কিংবা যন্ত্রণায় তার বুক থেকে একটা গভীর দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। মহিলা সাংবাদিক মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ভিন্ন কোনো প্রশ্নের প্রস্তুতি নেয় কিন্তু বুড়ো আব্দুল লতিফ দ্বিতীয় কোনো জিজ্ঞাসার অপেক্ষা করে না। আব্দুল লতিফের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেবুড়োর দল, যারা এতক্ষণ তামাশা দেখছিল, তারা তখন হঠাৎ হৈচৈ শুরু করলে মহিলা সাংবাদিকের কণ্ঠস্বর তখন কিছুটা চাপা পড়ে যায়, মহিলা সাংবাদিক দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে
‘প্রিয় দর্শক, আপনারা এতক্ষণ গ্রামের প্রবীণ এবং সমাজের মাতবর আব্দুল লতিফের মুখ থেকে শুনছিলেন ১৯৭১ সালের হানাদার বাহিনীর লোমহর্ষক অত্যাচারের বর্ণনা।’- দেবরামপুর থেকে ফাল্গুনী আহামদ দীপিকা, এবিসি নিউজ।
দেশের মানুষের যখন টিভি নিউজে এই প্রতিবেদন দেখছিল তখন শীলবাড়িতে সুনসান নীরবতা। পুকুরঘাটে একটা তালগাছ যেমন ত্রিশ বছর ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, তেমনি আছে। বাড়ির আঙিনায় আম, জাম, কাঁঠালের ঝরেপড়া শুকনো পাতা যেমন পড়ে থাকে, তেমনি পড়ে আছে। নরেশ চন্দ্রশীল কিংবা তার ছেলে পূর্ণচন্দ্রশীল সেলুনের কাজে বাজারে থাকে। নরেশ শীলের স্ত্রী নমিতা রানী শীল মাছ কিংবা শাক ধোয়ার কাজে কখনো কখনো পুকুরঘাটে এলেও আজকাল সাংবাদিক অথবা অপরিচিত লোকদের প্রশ্নের ভয়ে শাক-মাছ ধোয়ার কাজটা উঠোনের পাশে চাপকলেই সেরে নেয়। এসব সতর্কতা সত্তে¡ও লোকজন বাড়ির আড়াল আচ্ছাদন ঠেলে ভেতর বাড়িতে ঢুকে যায়, তারা পদ্মশ্রীর সঙ্গে কথা বলতে চায়, তাদের কৌত‚হলী দৃষ্টি, অবিরাম জিজ্ঞাসার উত্তর পদ্মশ্রী দেয়, কিন্তু লোকজনের অনুসন্ধিৎসু মনের পিপাসা তাতে মেটে না, তারা আরো কিছু শুনতে চায়।
পদ্মশ্রী কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয়, কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয় না, চুপ করে থাকে। তার নীরবতা লোকজনের সহ্য হয় না, তারা ক্রমাগত জিজ্ঞাসার বাঁকা চিহ্ন পদ্মশ্রীর সামনে তুলে ধরে, তারা বলেÑ ‘আচ্ছা, তুমি যে কইছিলা, মিলিটারিরা তুমারে ক্যাম্পে কাপড় পড়তে দ্যায় নাই, এটা কি সত্যি?’ ৃপদ্মশ্রী প্রশ্নকর্তার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকায়, তার মুখ করুণ এবং বেদনায় ভরে উঠে। তার বুকের ভেতর দাউ দাউ আগুন জ¦লতে থাকে কিন্তু সে আগুনের লেলিহান শিখা প্রশ্নকর্তার দৃষ্টিগোচর হয় না। গ্রামের লোকজনের কাছে তখন পদ্মশ্রীর শরীর আর শরীর থাকে না, জ¦লন্ত কয়লা হয়ে উঠে। তারা দেখে পদ্মশ্রীর শরীর থেকে কেবল ধোঁয়া বেরুচ্ছে, সেই ধোঁয়া কেবল কুণ্ডূলি পাকিয়ে আকাশের দিকে উঠছে না, পুরো গ্রাম ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। হ

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা