সুদানে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি, নিহত ১৩

আগের সংবাদ

কোনো লাভ নাই!

পরের সংবাদ

‘নিহত’ এর ঘেরে শহীদ নারীরা

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ৭:৪৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ৭:৪৮ অপরাহ্ণ

অনলাইন প্রতিবেদক

এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার ইতিহাসই আমাদের জাতীয় জীবনের সর্বোচ্চ গৌরবের ইতিহাস। এ-ইতিহাস নিয়ে আমাদের গর্ব আছে, অহংকার আছে, আছে পূর্বসূরিদের প্রতি এ-প্রজন্মের গভীর সম্মানবোধ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নির্মাণের সংস্কৃতির জারি থাকা ধরন এবং বর্ণনায় তাতে একদিকে যেমন উপেক্ষিত হয়েছে নিম্নবর্গের কণ্ঠস্বর তেমনি আড়াল করা হয়েছে নারীকেও। ত্রিশ লক্ষ শহীদ এবং দুই লক্ষ মা-বোনের ‘ইজ্জতের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা’- এই ধরনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে এক ধরনের প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে। আর এই ধরনের নির্মাণের মধ্য দিয়ে মুত্তিযুদ্ধের মৌখিক ইতিহাসের ভিত্তিও লিঙ্গ-পক্ষপাতহীন হবার পরিবর্তে হয়ে পড়ে লিঙ্গ-পক্ষপাতিত্বমূলক। ইতিহাসে নারী-পুরুষের অবদানকে দেখার ক্ষেত্রে এ-ধরনের লিঙ্গীয় দ্বি-বিভাজিত অবস্থান বস্তুত নারীর বহুমাত্রিক ভূমিকাকে গায়েব করার চেষ্টা করে।
লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, এ-প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ উপস্থাপিত হয়েছে পৌরুষ-দীপ্ত একটি যুদ্ধ হিসেবে। শুধুমাত্র তাই নয়, যুদ্ধের বিভিন্ন ধরনের বর্ণনা-বয়ানও নির্মিত হয়েছে একইভাবে। মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্বের একক দাবিদার পুরুষের জয়গানে গর্ব আছে, প্রশস্তি আছে, আছে এক ধরনের জয়ের নির্ভরতা। যুদ্ধের এই ধরনের পৌরুষদীপ্ততার পরিপ্রেক্ষিতে রচিত হয় ‘বাংলা মাকে রক্ষা করতে দামাল ছেলেরা যুদ্ধে যায়’, ‘মাগো ভাবনা কেন, আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে, তবু শত্রু এলে অস্ত্রহাতে লড়তে জানি’, ‘বাংলা মার দুর্নিবার আমরা তরুণ দল’, ‘আমায় গেঁথে দাও না মাগো একটা পলাশ ফুলের মালা, আমি জনম জনম রাখবো ধরে ভাই হারানোর জ্বালা’, ‘মাগো আর কেঁদো না, একটি সোনার ছেলে তোমার না হয় গিয়েছে চলে বিনিময়ে দেখ কত কোটি কোটি সন্তান তুমি পেলে’ এর মতো দেশপ্রেমের সবচেয়ে ভালো-ভালো গান।
তবে মুশকিল এই যে, এ-ধরনের নির্মাণ-মনস্কতায় মুক্তিযুদ্ধে নারীর সামগ্রিক ত্যাগের কোনো স্বীকৃতি মেলে না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের কাছে উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও নারীকে রাখা হয়েছে অগোচরে। যতটুকু জানা গিয়েছে তা হলো নারী-ধর্ষণ ও অপমানের কথা। নব্বইয়ের দশকে এসে কয়েকজন গবেষকের লিঙ্গ-নিরপেক্ষ উপলব্ধির কারণে নারীর কথা কিছুটা উঠে আসে। কিন্তু সেখানেও যতটুকু স্বীকার করা হয়েছে তা হলো মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করা, রান্না করা, কিংবা আশ্রয় দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখা কিংবা বাড়ির স্বামী বা ছেলে মারা যাওয়ার পর পরিবারে নারীদের দুর্বিষহ জীবন-সংগ্রামের কথা। এ-প্রক্রিয়ায় নারীর ইমেজ শুধুমাত্র মা-এর ইমেজে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তবে এখানে লক্ষ করার ব্যাপার হলো, প্রতীকী মা রক্ষা পেলেও এদেশে শহীদ নারীর কোনো তালিকা তৈরি করা হয়নি।
’৭১-এ বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি তৈরি হবার পর ‘মাতৃভূমি’র মতাদর্শের সঙ্গে ‘নারী’র সত্যিকার সংগ্রামের এক সংঘর্ষ তৈরি হয়, যা রাষ্ট্রের সঙ্গে নারীর অবস্থানের ডিলেমাকে পুনর্নির্মাণ করে। ‘মাতৃভূমি’ অথবা ‘মাদারল্যান্ড’ হিসেবে নিজেকে পরিচয় করালেও সে-রাষ্ট্রই ইতিহাসে নারীকে বাদ দেবার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে। ‘সহজ-সরল’ নারী চরিত্রের সঙ্গে বিপ্লবী নারী-সত্তার সামাজিক বৈরিতাকে রাষ্ট্র কাঠামো শুধু উপেক্ষাই করেনি বরং একে নতুন রূপ দিয়েছে। যার ফলে নারী যুদ্ধ-বিজয়ী হয়েছে কিংবা শহীদ হয়েছে এ-ধরনের বোধ থেকে রাষ্ট্র নিজেকে ক্রমশ দূরে ঠেলে রাখে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ইমেজটি যখন আমরা আমাদের সামনে মেলে ধরি তখন আমরা একটি পৌরুষ-দীপ্ত একটি ইমেজেই কল্পনা করি। কেননা, আমাদের মনে হয় যুদ্ধে যায় ছেলেরা, তাহলে তো শহীদ হবে ছেলেরাই। নারীর শহীদ হবার বিষয়টির সাথে আমরা একাত্ম হয়ে উঠতে পারিনি। এসব কারণ বাংলাদেশে নারী শহীদদের নাম খুব একটি কোথাও প্রকাশিত হয়নি, দ্বিতীয়ত, নারী শহীদদের সেভাবে ইতিহাসে না নিয়ে আসার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দোনোমনো বিষয়টি চাপা থাকেনি।

শুধু ইতিহাসেই নয়, স্মৃতিচারণায় এসেছে লিঙ্গীয় রাজনীতি। যেসব পরিবারে মা-বাবা উভয়ই শহীদ হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই মায়ের স্মৃতি অনেকটাই ভুলে গেছেন। কারণ হিসেবে তাঁরা উল্লেখ করেছেন যে মায়ের কথা যেহেতু কেউ খুব একটা জানতে চাননি, তাই তাঁদেরও বলতে হয়নি। স্মৃতিচারণা না করা এবং এই বিষয়ে চর্চা না থাকায় মায়ের স্মৃতি তাঁরা ভুলে গেছেন অনেকটাই। অর্থাৎ জীবিত অবস্থায় তো বটেই, একই ঘটনায় শহীদ হওয়ার পরও গুরুত্ব পেয়েছে পুরুষবাদ থেকেছেন নারী।
আমাদের দেশে অনেক নারীই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, বিভিন্ন জনের সাক্ষাৎকার থেকে এ-বিষয়ে কিছুটা তথ্য প্রকাশ পেলেও তা প্রকাশিত হয়েছে কারো না কারো স্ত্রী, মা অথবা বোন হিসেবে। ২৫ মার্চ সেই ভয়াল কালরাতে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শহীদ হন অন্তঃসত্ত্বা যোগমায়া দে ও রিনা রানী দে (শহীদ মধুসূদন দের কথা বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এলেও তাঁদের কোথাও স্থান দেওয়া হয়নি)। যেমন শহীদ মধুসূদন দে’র স্ত্রী শহীদ যোগমায়া দে’র কথা বলতে গিয়ে তাঁদের সন্তান প্রতিভা দে বারবারই বলেছেন তার বাবার স্মৃতি। যখন এর কারণ জানতে চাইলাম, যখন তখন প্রতিভা দে অত্যন্ত সরলভাবেই বলেছেন, মার কথাতো আমরা সেভাবে কোথাও বলিনি, মার কথা এসেছে বাবার মৃত্যুর কথা বলতে গিয়েই, তাই মায়ের কথা বলাতে আমাদের অভ্যাস নেই, একই বিষয় ঘটেছে অন্য নারী শহীদদের আত্মীয়দের ক্ষেত্রেও। সাইদুর রহমান, যার বাবা-মা উভয়ে শহীদ, বলেন, আমি যতোবার স্মৃতিচারণ করেছি , অথবা আমাকে করতে বলা হয়েছে সবই করেছি আমার বাবাকে নিয়ে। আমার মাকে নিয়েতো কেউ স্মৃতিচারণ করতে বলেনি, তাই আমিও অনেক কিছু ভুলে গিয়েছি। অথচ আমার মা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়ে মারা গিয়েছেন, তাঁকে জীবন্ত কবর দিয়েছিল বিহারিরা। অর্থাৎ একই ঘটনায় শহীদ হওয়ার পরও গুরুত্ব পেয়েছে পুরুষ, নারী নয়। ’৭১-এর মার্চের অসহযোগের প্রথম শহীদ যশোরের চারুবালাও স্থান পাননি ইতিহাসে। চারুবালার মৃত্যু সে সময় যশোরের নারীদের মিছিলে নিয়ে আসে এবং অসহযোগ আন্দোলনকে নতুন রূপ দেয় এবং যশাএর নারীরা ঝাড়– হাতে রাস্তায় নেমে আসে। মুক্তিযুদ্ধের আরেক শহীদ কবি মেহেরুন্নেসার বিষয়টি অনেকটাই বিস্মৃত প্রায়। এভাবেই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছেন অনেক শহীদ নারী। এমনকী হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বাংলাদিশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্রেও একই ঘটনায় শহীদ হওয়া পুরুষের ক্ষেত্রে লেখা হয়েছে শহীদ আর নারীর ক্ষেত্রে লেখা হয়েছে ‘নিহত’।
শহীদ নারীদের প্রতি রাষ্ট্রের উদাসীনতা আরও প্রকাশ পায় শহীদ নারীদের সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য দিতে কিংবা সংগ্রহে রাষ্ট্রের অস্বীকৃতি। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘স্মৃতি ১৯৭১’ এর বিভিন্ন খ-ে মাত্র চারজন নারী শহীদের কথা জানা যায়। তারা হলেন, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা হোসেন, শহীদ কবি মেহেরুন্নেসা, মাগুড়ার শহীদ লুৎফুন নাহার হেলেন এবং শহীদ ড. আয়েশা বদোরা চৌধুরী। পিরোজপুরের সাহসী নারী ভাগীরথীর কাহিনী মুক্তিযুদ্ধের অনেক ইতিহাসকেই হার মানায়। ভিক্ষুক সেজে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিভিন্ন খোঁজ-খবর তিনি এনে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের, পরবর্তীতে রাজাকারদের সহায়তায় তিনি ধরা পড়েন পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে। তাঁকে জিপের সঙ্গে বেঁধে হত্যা করা হয়। সেই ভাগীরথীরও স্থান মেলেনি শহীদদের তালিকায়। দিনাজপুরের পার্বতীপুরে আঞ্জুমান আরাকে মালবাহী ট্রেনের গরম কয়লার চুল্লিতে নিক্ষেপ করে মারে বিহারিরা, তাঁর এবং তাঁর স্বামীর অপরাধ, তাঁরা অন্য বাঙালিদের আশ্রয় দিয়েছিলেন তাঁদের বাড়িতে। সিলেটের বিয়ানী বাজারের খাসিয়া মেয়ে কাঁকেট প্রাণ দিয়েছিলেন পাকিস্তানিদের হাতে, মুক্তিবাহিনীর পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে। এ-রকম আরও কতো ইতিহাস রয়েছে! কিন্তু এটাই সত্য যে, পুরুষ শহীদদের তুলনায় নারী শহীদদের স্বীকৃতি হয়নি ইতিহাসে। এদের স্মৃতি-চারণের ক্ষেত্রেও রয়েছে সেই পুরুষতান্ত্রিকতার রাজনীতি। এপ্রিল মাসে দিনাজপুরে নিজের বাড়িতেই শহীদ হন সুরবালা দেবী। একই মাসে সৈয়দপুরে শহীদ হন সাংস্কৃতিক কর্মী ভ্রমর, সুফিয়া খাতুন, হোসনে আখতার (যাঁকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হয়েছিল) ও সরোজিনী মল্লিক। সিলেটের পাত্রখোলা চা-বাগানে শহীদ হন বাবনী রাজগৌড়, লসিমুন কুর্মী, রাঙামা কুর্মী, সালগী খাড়িয়াসহ অনেকে। সিলেটের বিয়ানীবাজারে বাঙালিদের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে প্রাণ দিতে হয়েছিল খাসি মেয়ে কাঁকেটকে। পটুয়াখালীতে হানাদারদের তা-বলীলায় শহীদ হন কনকপ্রভা গাঙ্গুলী, সোনাই রানী সমাদ্দার, বিদ্যাসুন্দরী দাস, সাবিত্রী রানী দত্ত, শান্তি দেবসহ আরও অনেকে। ফরিদপুরের ভাঙ্গায় মধ্য জুলাইয়ে শহীদ হন কিরণ রানী সাহা।

এ ছাড়া হানাদার ক্যাম্পে কত নারী নানা ধরনের অত্যাচারে মৃত্যুবরণ করেছেন কিংবা যাঁদের মেরে ফেলা হয়েছে, তাঁদের হিসাব কেউ জানে না, কিংবা জানার চেষ্টা করেনি। পরিবার ও সমাজের কাছে তাঁরা শহীদ হিসেবে জায়গা পাননি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, স্বাধীনতার অল্প কিছুদিন পর গণকবরগুলোতে বেশ কজন নারীর লাশ পাওয়া গিয়েছিল এবং নির্যাতন ক্যাম্পগুলোতে কাচের চুড়ি, শাড়ি ও নারীর হাড়-কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় বধ্যভূমিগুলো থেকেও তেমনিভাবে উদ্ধার করা হয় নারীর কঙ্কাল। যুদ্ধের সময় নারী শহীদ হওয়ার এত সব সাক্ষ্য থাকলেও কেন তাঁদের জায়গা হলো না ইতিহাসে, সেটি আজও প্রশ্ন। আশা করি, সরকার এ বিষয়ে নজর দেবে, তাঁদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করবে এবং যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদার ব্যবস্থা করবে।
তাই আজও নারী শহীদদের স্মৃতিকথা বিস্মৃত ও বিবর্ণ। বর্তমান সরকার এত বছর পর হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিয়েছেন। আশা করা যায়, এই সরকারের শাসনামলে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি শহীদদের তালিকাও চূড়ান্ত করা হবে। আমরা চাই, শহীদদের তালিকায় নারী শহীদদের নামগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হোক। নারী শহীদদের প্রকৃত সংখ্যা কত, তা সরকারকে আগ্রহ নিয়েই বের করতে হবে এবং তাঁদের যথাযোগ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। তা করা হলে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নির্মাণে লিঙ্গীয় পক্ষপাত কিছুটা হলেও দূর হবে। হ

 

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা