পদ্মশ্রী

আগের সংবাদ

মরুবৃক্ষ

পরের সংবাদ

দীপাবলীর বাক্সবন্দী ইচ্ছেগুলো বাক্সেই ফিরে গেলো

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ৫:১১ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ১৭, ২০১৯, ৪:২৫ অপরাহ্ণ

Avatar

জীবনে প্রথমবারের মতো ব্যাঙ্গালোরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে দীপাবলী। উদ্দেশ্য একটি সেমিনারে অংশগ্রহণ। সাথে আছে বন্ধু অয়ন। একই প্রফেশনে থাকায় দুজনেই একসাথে যাচ্ছে। তাছাড়া যেহেতু প্রথমবারের মতো যাত্রা তাই রাস্তাঘাট চিনাজানারও একটা বিষয় ছিল কারণ অয়ন আগেও কয়েকবার এসেছে এই শহরে। অলিগলি মোটামুটি তার চিনা। কাঙ্ক্ষিত দিনে দুজনে বিমানে চেপে বসলো। প্রথম গন্তব্য ছিল দিল্লি। তারপর কানেক্টিং ফ্লাইটে ব্যাঙ্গালোর । চরম উত্তেজিত দীপা। সেমিনার টেমিনার আসলে উসিলা মাত্র। ভ্রমণপাগল দীপার কাছে ঘুরতে যাওয়াটাই ছিল মূল লক্ষ্য। কনজার্ভেটিভ না হলেও মধ্যবিত্ত পরিবারের যে নিয়ম সে অনুযায়ী দীপাকে কখনও একা কোথাও ভ্রমণে অনুমতি দেয়া হয়নি এমনকি বন্ধুদের সাথেও নয়। বিদেশে তো দূরে থাক দেশের ভিতরেও অনুমতি মিলতো না। একবার মনে আছে ছাত্রজীবনে তার সকল বন্ধুরা মিলে ঘুরতে যাচ্ছিল। অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও পরিবার থেকে অনুমতি না মিলায় যাওয়া হয়নি দীপার। এই এক বিষয়ে সে তাই নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল অথচ গৃহকোণ তাকে টানে না কখনই। কেবল স্বাধীনতার স্বাদ নেয়ার জন্য সে নিজের পছন্দের একজন সাথী বেছে নিয়েছিল পড়ালেখা শেষ করার পরপরই। পরিবারের অনেকটাই বিপরীতে গিয়েই সে বিয়ে করেছিল একটি আশায় যে সাথীটিকে নিয়ে সে কেবল ঘুরে বেড়াবে যখন যেখানে মন চায় সেখানেই। সে আমার স্বামী নয় হবে বন্ধু ও প্রিয়জন যে আমার না পাওয়ার বেদনাকে নিজের মধ্যে ধারণ করবে আর আমিও করবো তারগুলো। জীবনের বিশেষ দিনগুলো দীপার কাছে অত্যন্ত দামি ও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জন্মদিন। বন্ধুদের মাঝে দীপা একমাত্র জন্মদিনের বিষয়ে মারাত্মক সেনসিটিভ। কারণ সে বিশ্বাস করে যদি জন্মই না হতো তবে মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার গল্প আর দুনিয়াটাকে দেখতে চাওয়ার নেশা এসব আসতো কোথা থেকে? তার কাছে জন্মদিন তাই এই সুন্দর পৃথিবীকে দেখতে পাওয়ার উপায়। অথচ এ কথাটি দীপার সঙ্গীটিকে বলাই হয়নি কখনও। আসলে বলার মতো সুযোগই হয়নি আর সেও কখনও জানতেই চায়নি। জীবনে অর্থবিত্তের চাহিদা থাকলেও এ নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই দীপার। যতটা কেবল একটি সুস্থ জীবন কাটাতে প্রয়োজন ততটুকুই চাওয়া। আর অর্থ চাই দুনিয়া দেখতে। হয়নি সে আশা পূরণ। জীবনের কোনো কিছুই দীপার হিসাব অনুযায়ী এগুচ্ছিল না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অনেক হয়েছে। এবার নিজের দিকে তাকানোর সময়। জীবনের অর্ধেক সময় পার করে সে অনুভব করতে পেরেছে এতদিন কেবল নিজেকে অবহেলাই করেনি, গলা টিপে হত্যা করেছে জীবনের শখগুলোকে। শত কষ্টের মাঝে সান্ত্বনা খুঁজতে চেয়েছে এইতো হয়ে যাবে। সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে আবার শুরু করবো। কিন্তু সে গুছানো আর হয় না। অনেক বিশ্লেষণে বুঝা গেলো দীপার মতো করে গুছানো আর হবে না। সংসারের গাড়ির দুটি চাকাকেই সমান হতে হয়। সামান্য উঁচু নিচু হলে সে গাড়ি আটকে থাকে পথের মাঝে। পাশ দিয়ে ধুলো উড়িয়ে এগিয়ে চলে যায় বাকিরা। আর সে জন্যই সেমিনারের ডাক পেয়ে আর দুই মিনিট দেরি করতে চায়নি সে। ঘুরতে যাবার আর চারদেয়ালের বন্দী জীবন থেকে মুক্তির এক অদম্য নেশা তাকে পেয়ে বসেছিল। তোমার এখন কেন ব্যাঙ্গালোরে যেতে হবে? আর একা যাবা কেন? দীপার স্বামী কিরণ জানতে চাইলো। একা যাচ্ছিনা তো। সাথে অন্যরাও যাচ্ছে। অয়ন যাচ্ছে আমার সাথে। দীপার সরাসরি উত্তর। যত যাই হোক, দেখো এটা বাদ দিতে পারো কিনা? না। কেন বাদ দিব? যুক্তি দেখাও। দীপা তর্ক শুরু করে দেয়। শুনো, আমি যথেষ্ট ম্যাচিউরড একজন মানুষ। দুনিয়ার সবকিছু সম্পর্কে আমার জ্ঞান তোমার চেয়ে কম কিছু নয়। আর নিজের নিরাপত্তা নিজেই নিশ্চিত করার মতো শক্তি ও সাহস আমার আছে। দীপা একটানা বলে চলে। হঠাৎ করে টের পেলো তার সেই হারিয়ে যাওয়া উচ্ছ্বাস যেন ফিরে আসতে চাইছে। সেই দীপা যে একা চলতে পারতো। একাই নিজেকে টেনে এনেছিল জীবনের এতটা বছর। কিন্তু বাকি পথটা আরেকজনের সাথে হাত ধরে চলতে চাওয়ার বাসনা থেকেই যুক্ত হয়েছিল কিরণের সাথে।

 

অয়ন বেশ খোলামেলা ও বন্ধুবৎসল একজন মানুষ। মনেই হয় না যে সে একজন পুরুষ হিসেবে দীপার সাথে আচরণ করছে। নির্ভরতার সাথেই রওনা হয়েছিল তাই। দীপা এখন বিবাহিত কিন্তু কোনো সন্তান নেই তাদের। তার মনে রয়ে গেছে সেই বাচ্চা দীপা যে কেবল ছটফট করতে থাকে কখন কেমন করে উৎসব করা যায় আর জীবনকে উপভোগ করা যায়। আমাদের সমাজে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কগুলো কেবল স্বামী আর স্ত্রীতেই সীমাবদ্ধ থাকে। একে অপরের বন্ধু হতে পারে না বা হবার মতো চিন্তাও করে না। আর এই একটি কারণেই গোল বাঁধে সংসারে। প্রতিটা মানুষের কিছু ব্যক্তিগত বলে বিষয় থাকে বা থাকতেই পারে। সেই স্পেইসটুকু দেয়ার ক্ষেত্রে কেউ উদার হতে পারি না আমরা। একে অপরের জীবনকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। মানুষ জন্মে তার নিজের মতো করে এবং বেড়েও ওঠে তার নিজের মতো করেই। মানুষের বিশ্বাস, চাওয়া-পাওয়া সবকিছুই ভিন্ন।  দীপার জীবনসঙ্গীটিকে একজন উদার চিন্তার মানুষ হিসেবে বেছে নিয়েছিল যার কাছে প্রত্যাশা ছিলো দীপার সকল চাওয়াগুলোকে বুঝবে এবং পূরণ করতে না পারুক অন্তত অনুভব করবে, দীপার অধরা স্বপ্নগুলোকে পূরণে সাথী হবে। সেখানেও আছে দীপার চাপা এক কষ্টবোধ।

 

স্বপ্নকে মরতে দিতে চায়নি বলেই দীপা এমন একটি আমন্ত্রণকে ফেলতে পারেনি।

 

দিল্লি এয়ারপোর্টে দুই ঘণ্টার যাত্রাবিরতি। অয়ন আর দীপা বসেছিল। সামান্য ক্ষুধাও লেগেছিল। অয়নকে বলে তাই কিছু খাবার কিনতে যাচ্ছিল দীপা।

 

-তুই একা একা পারবি তো?

 

-কেন নয়? প্রথমবার যাচ্ছি বলে কি আমাকে এত বোকা মনে হচ্ছে তোর?

 

বলেই মুখটা একটা ভেঙচি কাটলো দীপা। চলে গেলো হনহন করে।

 

হাতে কিছু চিপস আর মমো নিয়ে ফিরে এলো।

 

-দেখ ব্যাটা, পেরেছি কি না আনতে। হুম।

 

-হ, পারছস দেখি। তুই মাইয়াটা বোকা হইলেও স্মার্ট আছিস।

 

অয়ন ছেলেটা এমনি। মুখে মুখে হাতি ঘোড়া মেরে উলটে ফেলে। আসলে কাজের বেলায় লবডংকা।

 

এভাবেই কেটে গেলো দুই ঘণ্টা আর নেক্সট ফ্লাইটের সময় হয়ে গেলো। দুজনেই দৌড়ালো ফ্লাইটের জন্য।

 

যথারীতি প্লেইনে উঠে বসলো অয়ন আর দীপা। ঘড়িতে হিসেব করা আড়াই ঘণ্টার কিছু সময় পরে প্লেইন ব্যাঙ্গালোর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এসে ল্যান্ড করলো। দীপার অস্থিরতা বাইরে প্রকাশ না পেলেও ভিতরে সে নিজে টের পাচ্ছিল। আহ!! কতকাল, কতকাল পরে একটু নিজের মতো করে চলতে পারছি। বুক ভরে দুনিয়ার বাতাস নিতে পারছি। আজকের এই ভ্রমণে আমার কারও কাছে দায়বোধ থাকবে না। এখানে একদম আমি আমার মতো করে থাকবো। নিজের ইচ্ছেয় খাবো, চলবো আর বেড়াবো। কারও সাথে মুখ কষাকষির কিছু নেই। কিরণের সাথে কোথাও যাওয়া মানেই কিছু না কিছু নিয়ে ঝগড়া হবেই। দীপা পছন্দ করে হাত পা খুলে দৌড়ে বেড়াতে, যখন যেমন মন চাইবে তেমন করে মজা করতে অথচ কিরণের আপত্তি আসে অনেক কিছুতে। ঘুরতে গিয়ে যদি নিজের মনের মতো করে নাই কিছু করা যায় তাহলে আর ঘুরতে যাওয়া কেন? গত দুইবারে দেশের ভিতরে ঘুরতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখের নয় দীপার।

 

-হেই দীপা, কেমন আছেন?

 

অবাক হয়ে পিছনে তাকালো দীপা। এই দূরদেশে এসে আবার কে এমন করে ডাকবে আমাকে?

 

-আরে দাদা!!!!! কেমন আছেন? কী খবর?

 

দেখা হয়ে গেলো কোলকাতার সতীশ দার সাথে। তিনি একজন চিত্রশিল্পী। অসম্ভব সুন্দর ছবি আঁকেন দাদা। পরিচয় ফেইসবুকে। আজকাল ফেইসবুকের যুগে দুনিয়া অনেক ছোট হয়ে গেছে। কানেক্টিভিটি পৃথিবীর এ প্রান্তের লোককে অন্যপ্রান্তের কাছে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।

 

দীপা নেটওয়ার্কিং করতে পছন্দ করে। অনলাইন জগতে সে মোটামুটি একজন পরিচিত নাম এবং অনেক বেশি অ্যাক্টিভ থাকে। সেই সূত্রেই সতীশ দার সাথে পরিচয় কিন্তু এভাবে ব্যাঙ্গালোরে এসে দেখা হয়ে যাবে এটা চিন্তারও বাইরে।

 

সতীশ দার সাথেই ছিলেন তাঁর আরও তিনজন সঙ্গী যারা নিজেরাও একেকজন শিল্পী। এখানেই একটি হোটেলে উনাদের একটি প্রদর্শনীতে আছে যেখানে দেশ বিদেশ থেকে অনেক চিত্র শিল্পীরা আসবেন।

 

বেল্টে ব্যাগ আসার আগ পর্যন্ত দীপা আড্ডা দিচ্ছিল সতীশ দা ও তার সঙ্গীদের সাথে। ম্যান্ডেটরি সেলফিও তুলা হয়ে গেলো। অয়নের সাথেও পরিচয় করিয়ে দিলো।

 

-এই দীপা, চল ব্যাগ চলে আসছে। অয়ন ডাক দিলো। সারা দিনের ভ্রমণে সামান্য টায়ার্ড ছিল অয়ন। তার টার্গেট কত তাড়াতাড়ি হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হওয়া যায়। দীপার অবশ্য কোনো ক্লান্তি আসেনি। হয়তো এসেছিল কিন্তু সে টের পায়নি ভ্রমণের উত্তেজনায়।

 

যথা সময়ে ব্যাগ নিয়ে দুজনে বের হয়ে এলো। বাইরে এসে ট্যাক্সি ভাড়া করে রওনা দিলো হোটেলের উদ্দেশ্য। ট্যাক্সি ড্রাইভার একজন নারী। নাম তার রীতা। রীতার সাথে টুকটাক আলাপ শুরু করলো দুজনেই। দীপার মানুষকে জানার আগ্রহ বরাবরই বেশি। প্রথমে হিন্দিতে শুরু করলেও ড্রাইভার রীতা চমৎকার ইংরেজিও বলতে ও বুঝতে পারে।

 

-আপ লোক কাহাসে হ্যায়? রীতা জানতে চাইলো।

 

-উই আর ফ্রম বাংলাদেশ। অয়ন হিন্দি বলতে চাইলেও সঠিক পারছিল না বলে ইংরেজিতেই চালাচ্ছিল। দীপাও।

 

রাস্তায় অনেক আলাপের মাঝে জানার চেষ্টা করছিল দীপা। ব্যাঙ্গালোর সম্পর্কে, ব্যাঙ্গালোরের মানুষ ও তাদের জীবনযাপন সম্পর্কে জেনেছে। ব্যাঙ্গালোর অনিল কুম্বলের শহর। আহা! যদি একবার চান্স পেতাম দেখার। ক্রিকেট পাগল দীপার সিনেমার নায়ক-নায়িকার প্রতি আগ্রহ একদম নাই তবে প্রবল টান অনুভব করে ক্রিকেট খেলোয়াড়দের প্রতি। ইচ্ছা আছে যদি জীবনে কোনোদিন সুযোগ হয় তাহলে বাইরের বিখ্যাত যেকোনো একটি ক্রিকেট মাঠে বসে লাইভ খেলা দেখবে।

-উই হ্যাভ রিচড স্যার এন্ড ম্যাডাম। রীতা জানালো।

 

নেমে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে অয়ন আর দীপা হোটেলে চেক ইন করতে গেলো।

 

অয়ন যেহেতু আগেও এখানে এসেছিলো সে সব নিয়ম আগে থেকেই জানে। তাই দীপার টেনশন কম ছিলো। চেক ইনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রুমের চাবি নিয়ে দুজনে চলে গেলো দুজনের রুমে। রুম সার্ভিসের লোক এসে সব বুঝিয়ে দিয়ে গেলো। বুঝে নিয়ে দীপা নিজের রুমে ঢুকে গেলো ফ্রেশ হতে।

 

লম্বা একটা গোসল দিয়ে ফেল্লো। ব্যাঙ্গালোরের পানি ঢাকার পানির চেয়ে অনেক ফ্রেশ। শ্যাম্পুর পর চুলগুলো ধরেই দীপা নিজের মনে উচ্চারণ করলো। গোসলের পর বুঝা গেলো সারাদিনের ভ্রমনের ক্লান্তি এখন তাকে ধাক্কা দিচ্ছে।

 

বাইরে আর যেতে ইচ্ছে করলো না তাই রুমেই খাবার অর্ডার করে অয়ন আর দীপা খেয়ে নিলো। একা ভ্রমন আর সঙ্গীসহ ভ্রমনের এটাই মজা যে কষ্ট বা সুখ সবকিছুই ভাগাভাগি করে নেয়া যায়। খাওয়া শেষ করে গুড নাইট বলে দীপা ঘুমাতে গেলো। পরেরদিন থেকে সেমিনার শুরু হবে। সকালে শুরু হয়ে প্রোগ্রাম শেষ হবে  ডিনার দিয়ে। প্রথম দিন তারা সকাল থেকে রাত পর্যন্তই ছিলো। দ্বীতিয় দিন সকালটা হাতে রাখলো। বিকেলের দিকে গেলো। দিনের বেলায় তাই দীপা ঘুরতে চায়। রুমে বিছানায় গিয়ে দীপা বাসায় তার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেলো। কথা শেষ করেই শুয়ে পড়লো।

 

সকালবেলা রুমের কলিং বেল বেজে উঠলো। দীপা ঘুম চোখে উঠে খুলে দেখলো অয়ন উঠে ব্রেকফাস্ট করে এসেছে। বেলা ১০ টার পর ব্রেকফাস্ট থাকেনা তাই জানাতে এলো আর কটায় বেরুবো সেটাই ফিক্স করলো।

 

ধুমাধুম রেডি হয়ে নীচে নামলো দীপা। ব্রেকফাস্ট করে এসে শাওয়ার নিয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে গেলো। বের হবার পর দীপার আস্থায় একটু ধাক্কা খেলো কারণ অয়ন আসলে তেমন কিছুই চিনেনা এই শহরের। অথচ ব্যাটা এমন ভাব নিলো যে সে সব চিনে আর দীপাকে সব দেখিয়ে ছাড়বে।

 

ব্যাঙ্গালোর হচ্ছে আইটি হাব। কিন্তু আফসোস এই ব্যাটা অয়নের পাল্লায় পড়ে কিছুই দেখা হলো না। সামান্য মন খারাপ হয়ে গেলো। ভ্রমনে যদি একজন যোগ্য সঙ্গী না পাওয়া যায় তবে সেই ভ্রমন আনন্দের চেয়ে প্যাড়ার হয় বেশী। প্রথম ধাক্কাটা খেলো দীপা। এদিকে নতুন বলে সে একাও কোথাও যেতে পারছেনা।

 

কী ফ্যাঁসাদে পড়লামরে বাবা, মনে মনে বল্লো দীপা।

 

যাই হোক এমন করে দুইদিন কাটলো। এদিকে হাতে মাত্র আর একদিন আছে। নাহ, আর বোধ হয় কিছুই দেখা হলো না।

 

কিছু বলাও গেলোনা কিন্তু কষ্টবোধ নিয়েই সেদিন কেটে গেলো। পরেরদিন সেমিনারে গেলো। অনেক দেশের অনেকের সাথেই পরিচিত হলো। সবাই এসেছে নিজ নিজ দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছে। বাংলাদেশ থেকেও গিয়েছে অনেকেই। দীপা চিনে কেবল দুই একজনকে। বাকিদের সাথে কখনও কথাও হয় নি।

 

সেমিনারেই পরিচয় হলো শিখড়ের সাথে। শিখড়ও বাংলাদেশ থেকেই তবে এর আগে দুজনের কখনই দেখা হয়নি বা নামও শুনেনি। প্রথম পরিচয়ে দুজন দুজনের অনেক কিছুই জেনে নিয়েছিলো। সমবয়সী দুজন তাই বন্ধুত্বও হয়ে গেলো দ্রুতই। সন্ধ্যায় সেমিনার থেকেই ঘুরতে গেলো দীপা, শিখড়সহ আরও তিনজনের একটি দল। কথায় কথায় জানা গেলো শিখড়ের কাছে এই শহর খুব পরিচিত এবং অনেক কিছুই জানে ও চিনে। দীপা মনে মনে ভাবলো এমন গল্প অয়নও দিয়েছিলো।

 

কিন্তু না, শিখড় আসলেই স্মার্ট একজন মানুষ।  সে জানে কোথায় গেলে একজন ভ্রমন পিয়াসু মানুষের ভালো লাগতে পারে। দীপার পছন্দ সমুদ্র। সমুদ্র কাছে হলেও তার কাছেই যাওয়া হয়নি অয়নের মত একজন রসকসহীন লোকের পাল্লায় পড়ে।

 

আহারে কেন যে এই শিখড়ের সাথে আগে পরিচয় হলো না। তাইলে অন্তত একটা দিন নষ্ট হতোনা। যাই হোক, সেদিন অনেকটা সময় তারা একসাথে কাটিয়েছিলো। ঘুরেফিরে খেয়েদেয়ে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিলো শিখড়। দীপার চোখে শিখড় একজন দায়িত্বশীল ও কেয়ারিং ব্যক্তি বলেই মনে হলো।

 

খুব অল্প সময় হলেও দীপার মনে দাগ কেটেছিলো শিখড়। রাতে রুমে এসে দীপা ভাবছিলো শিখড়ের মধ্যে কিছু একটা আছে যা তাকে আপন করে দেয়।

 

হঠাত কানে এলো হোটেলের নীচে কোথাও পাশে একটি বস্তি আছে। সেখানে স্বামী-স্ত্রী তুমুল ঝগড়া করছে। হিন্দিতে ঝগড়া করছিলো বলে ভাষা কিছুই বুঝা যায়নি তবে স্বরের উচ্চতা ছিলো অনেক। ১০ তলার রুমে বসেও স্পষ্ট শুনছিলো সবকিছু। ভাষা বুঝতে না পারলেও ঢের বুঝা গেলো যে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার রকম সবজায়গায় একই হয়। বাংলাদেশের বস্তিবাসীদের ঝগড়া আর ভারতের বস্তীবাসীর ঝগড়ায় কেবল ভাষাগত পার্থক্য পাওয়া গেলো।

 

মনে মনে হাসলো দীপা। অশিক্ষিত ও দরিদ্র লোকেদের ঝগড়ার তীব্রতা বেশী বলে বাইরের লোকে বুঝতে পারে কিন্তু এমন ঝগড়া কি দীপাদের মত মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তদের মাঝে নেই? সেখানেও পার্থক্য কেবল রেঞ্জেই হয়, আর কিছুতে না।

 

এইতো সেদিনও দীপার স্বামী দীপাকে কতনা কথা শুনিয়ে দিলো খুব ছোট একটি বিষয়ে। অথচ দীপা একজন উচ্চশিক্ষিত ও কর্মজীবী নারী যে নিজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে চলে। এ সমাজে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেও চিন্তাগত দিক দিয়ে স্বাধীন হতে পারছে কই? ঠুনকো সামাজিকতা নারীকে নিজের মত প্রকাশে বাধা দেয়। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, নারীরা কামাই রোজগার করুক আর যাই করুক সংসার করতে হলে স্বামী হচ্ছে সকল সুবিধার অধিকারী। আর স্ত্রীর সুবিধাও নির্ভর করে স্বামীর ইচ্ছা অনিচ্ছার উপরেই।

 

আহারে নারী। যখনই নিজের অধিকার, নিজের মত করে চলতে চাওয়ার কথা বলতে যায় তখনি স্বামীদের আসল চেহারা বেরিয়ে আসে। পরিবারের লোকেরাও ধরেই নেয় নিশ্চয়ই মেয়েটিরই সমস্যা। অথচ একটি সংসারে একজন নারী ও পুরুষ দুজনেরই সমান দায়িত্ববোধ থাকে বা থাকা উচিত এই চরম সত্যটি কেউ মানতে চায় না। স্বেচ্ছাচারিতা আর স্বাধীনতাবোধ এক বিষয় নয়। নারীর স্বাধীনতাকে দেখা হয় স্বেচ্ছাচার হিসাবে আর পুরুষের স্বাধীনতাকে দেখা হয় পৌরষত্বের প্রতিক হিসাবে। যুগে যুগে এভাবেই কত নারীর মানুষ হতে চাওয়ার স্বপ্নগুলো মৃত ভ্রুনের মত হারিয়ে গেলো পৃথিবীর আলো দেখার আগেই।  ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে দীপা। ভোরে উঠতে হবে। রিসেপশনে ফোন করে ওয়েক-আপ কলের নিশ্চয়তা আর ট্যাক্সির কনফার্মেশন অবশ্য অয়ন আগেই করে দিয়েছিলো।

 

পরেরদিন ভোরে উঠে অয়ন আর দীপা রওনা দিলো বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে। ব্যাঙ্গালোর শহরকে বাই বাই বলে প্লেইনে চড়ে বসলো।সন্ধ্যা নাগাদ তারা দেশের মাটিতে পা রাখলো।

 

দেশে ফিরে বেশ অনেকগুলো দিন কেটে গেলো। হঠাত করে দীপার মনে পড়লো শিখড়ের কথা। মনে করতেই তাকে কল দিলো দীপা।

 

-হাই, কী অবস্থা? কেমন আছো? – জানতে চাইলো দীপা।

 

-আরে কী খবর? তুমি কেমন আছো? আমি আছি ভালো। শিখড় জানতে চাইলো দীপার কাছে।

 

-কবে আসছো দেশে?

 

-এইতো তিনদিন হলো।

 

-তুমি?

 

-আমি গতকাল এলাম।

 

-এতদিন ছিলা?

 

-হুম, একটু কাজ ছিলো। এই শুনো, চলো আমরা একদিন কফি খাই একসাথে। দেশের মানুষ বিদেশে গিয়ে কফি খেলাম আর দেশে খাবো না?

 

-হ্যাঁ, খাওয়াই যায়। চলো তাইলে, কবে বলো।

 

ঠিক হলো তার পরেরদিন তারা মিট করবে। পরেরদিন দুজনে সন্ধ্যায় অফিসের পর মিট করলো। এটা সেটা আলাপ চল্লো।

 

এরপর থেকে দুজনে মাঝে মাঝেই ফোনে কথা বলতো। এভাবে করতে করতে দুজনের মাঝে একধরণের ভালোলাগার সৃষ্টি হলো।

 

আসলে দুজন মানুষের মাঝেই ছিলো একধরণের শূন্যতা। দীপার আর শিখড়ের ভালো লাগার জায়গাগুলো যেন এক মোহনায় এসে মিলে গেলো।

 

দুজনেই ঠিক করলো নিজেদের কষ্টগুলোকে নিজেদের মাঝে শেয়ার করবে। যে যার জায়গা থেকে চেষ্টা করবে একে অপরের শূন্যতাগুলোকে মিটিয়ে দিতে।

 

দীপা অত্যন্ত সচেতন ও বুদ্ধিমান একজন মানুষ। ভালোবেসে বিয়ে করলেও বিয়ের অনেকগুলো বছর পার করে এসে বুঝেছিলো সে আসলে ভালোইবাসেনি কাউকে। যেটা করেছিলো সেটা ছিলো একধরণের ভালোলাগা। যে সম্পর্কের মাঝে একে অপরকে জানতে চাওয়ার আঁকুতি থাকেনা সেটা কখনই ভালোবাসা হয় না। দীপা আর কিরণ একে অপরকে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলো কিন্তু কখনই কিরণ জানতে চায়নি দীপা কী পছন্দ করে, কেন করে? এই যে জীবনের এতগুলো বছর পার করলো তারা একসাথে একদিনের জন্যও কিরণ জিজ্ঞেস করেনি দীপা তুমি কী খেতে ভালোবাসো বা কোথায় ঘুরতে পছন্দ করো। জানতে চায়নি বা এ নিয়ে কোন আগ্রহও চোখে পড়েনি দীপার। যেহেতু কিরণের কোন আগ্রহ নেই এসবে তাই একপ্রকার আত্মগোপনেই রেখেছিলো নিজের বিষয়গুলো। মানিয়ে নিয়েছিলো। কষ্টগুলোকে বাক্সে বন্দি করে রেখেছিলো যাতে কোনভাবেই বেড়িয়ে এসে তাকে ছিন্নভিন্ন করতে না পারে। কিন্তু তারা থাকেনি। ভিতরে ভিতরে গুমড়ে মরতে চায়নি ইচ্ছেরা। তারা বিদ্রোহ করে বাইরে এসে দীপাকে সাহস দিতে থাকলো। জানালো অনেক করেছো এবার নিজেকে দেখো। নিজেকে ভালোবাসো। অন্যের জন্য বেঁচে কী লাভ যদি নিজেকেই বাঁচাতে না পারো।

 

শিখড়কে দেখার পর দীপার সেই ইচ্ছেরা যেন আরও একটু উস্কানী পেলো। শিখড় নিজেও মারাত্মক ঘুরতে বেড়াতে ও আড্ডা দিতে পছন্দ করে। দীপা বিশ্বাস করে বন্ধুত্বের কোন সীমা থাকে না। শুনো শিখড়, তোমার সাথে হয়তো আমার প্রেমের সম্পর্ক হবে না আবার হতেও পারে। বলা যায় না তাই এখানে আমি আগেই কোন ব্যাখ্যা রাখতে চাইনা। তবে আমরা দুজনেই যথেষ্ট বিজ্ঞা ও অভিজ্ঞ মানুষ। দায়িত্ববোধের জায়গায় কেউই কারও চেয়ে কম নয়। তাই আমরা জানি আমাদের জন্য কোন কাজটি সুখকর আর কোনটি নয়। আসলে কী জানোত, আমাদের জীবনে সকলেরই একজন করে এমন মানুষ থাকা দরকার যে হবে সকল কিছুর উর্ধে। যার কাছে গেলে জাগতিক অনেক কিছুই পাওয়া যাবেনা কিন্তু মানসিক শান্তিটুকু পাওয়া যাবে। এমন একটি জায়গা থাকা খুব প্রয়োজন যেখানে গেলে ভ্যান্টিলেশনের আরাম পাওয়া যায়। বুকের ভিতরের জমে থাকা কষ্ট, সুখ বা অনুভূতিগুলোকে ঝেরে ফেলে আবার সোজা হয়ে ফিরে আসা যায় প্রাত্যহিক জীবনে।

 

হুম্মম। একদম ঠিক বলেছো তুমি। শিখড় সায় দেয় দীপার কথায়। অথচ আমরা প্রত্যেকেই এই জায়গাতে একদম একা। যা কিছু আমাদের সুখ বা কষ্ট বা চাওয়ার আছে সেগুলোকে বলতে পারার মত জায়গাটিও নেই আমাদের। আমরা দুজনে কি দুজনের সেই বন্ধু হতে পারি?

 

কেন নয়? যদি দুজনেরই বোধের জায়গাটি এক হয় তাহলে কেন নয়? উত্তর দেয় দীপা।

 

শিখড়ের ভিতরেও লুকিয়ে ছিলো একটি অতৃপ্ত আত্মা। সেই আত্মাকে সে দীপার মতই বাক্সে বন্দী করে রেখেছিলো। হঠাত করে সেই আত্মাটাই জেগে উঠলো দীপার ছোঁয়ায়।

 

এভাবে দিন কাটতে লাগলো। দুজনের কথা হয় দেখা হয়। মাঝে মাঝে কাছে কোথাও ঘুরতেও যায় বন্ধুরা মিলে। স্বপ্ন দেখে দুজনে মিলে নিজেদের পছন্দের জায়গাগুলো এক্সপ্লোর করবে। মাথায় থাকেনা যে এ সমাজ একজন নারী ও পুরুষের বন্ধুত্বকে সাধারণ ও সোজা চোখে দেখেনা।

 

শিখড়ের উচ্ছাস দীপাকে আরও লোভী করে তোলে। প্রথম প্রথম দীপা অনেক হিসেব করলেও একটা সময় সে নিজেকে আর আটকে রাখতে পারে না। শিখড়ের বন্ধুত্বের লোভ তাকে অদম্য করে দেয়।

 

একদিন দীপা শিখড়কে বলেই ফেলে,”শিখড়, এই যে আমরা একসাথে মিশছি, আড্ডা দিচ্ছি আবার ঘুরতেও যাচ্ছি এগুলোকে কিন্তু সবাই সোজাভাবে নিবে না। তুমি পারবেতো সামলাতে?”

 

-কেন পারবো না? আমরাতো অন্যায় কিছু করছিনা। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজেদের ভালোলাগার জায়গাগুলোকে নিয়ে গল্প করবে একে অপরের স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করবে এতে অপরাধ হবে কেন? তুমি ভেবোনা।

 

-ঠিক বলছো তুমি? আমার মনে হয় তুমি আরেকটু সময় নাও। ভাবো নিজের মত করে। পরে কষ্ট পাওয়ার চেয়ে আগেই সামলে নেয়া ভালো।

 

-না। আমি পারবো। তুমি ভয় পাচ্ছো নাতো? ভয়ের কিছু নাই। আমি আছি তোমার পাশে।

 

দীপার হাত দুটো টেনে নেয় শিখড় নিজের কাছে। মুখের কাছে মুখ এনে বলে, “ছাড়বোনা”

 

সারা শরীর কেঁপে উঠে দীপার। এমন কখনও হয়নি আগে। মনে হলো যেন আকাশ বাতাস কেঁপে উঠলো।

 

আরও জোড়ে চেপে ধরে শিখড়। দীপার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। টের পেলো বুকের ভিতরে জমে থাকা কান্নারা সব বের হয়ে আসতে চাইছে। মনে মনে ভাবলো এমন দুটি হাতইতো চেয়েছিলাম যে কর্তা নয় বন্ধু হয়ে পাশে চলবে আর এভাবেই আমাকে আগলে রাখবে।

 

শিখড়ের কপালে আলতো করে চুমু খায় দীপা।

 

বাসায় ফিরার সময় হয়ে এলো অথচ দুজনের কারোই ফিরতে ইচ্ছে করছে না। দুজন দুজনের চোখের দিকে করুণ চাহনীতে তাকিয়ে থাকে। দীপা বুঝেছিলো শিখড়কে থামাতে হবে। উপরে শক্ত হলেও ভিতরে অসম্ভব নরম মানুষ সে। বাসায় একপ্রকার বন্দী জীবন কাটানো শিখড় তাই স্বাধীনতার স্বাদ পেতে আশ্রয় করে নিয়েছে দীপাকে।

 

-এই চলো উঠি।

 

-হুম্মম। উঠতেইতো হবে। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বলে শিখড়।

 

গাড়ীতে উঠে দুজনে চুপচাপ থাকে কিছুক্ষণ।

 

-আমি যা ভাবছি তুমিও কী তাই ভাবছো শিখড়?

 

-কী? জানতে চায় শিখড়।

 

-না। থাক। পরে বলবো।

 

-আরে ধুর, বলোত। আমার কাছে আবার তোমার লজ্জা কিসের? আজব মানুষ তুমি।

 

দীপা ভাবতে থাকে বলবে কী বলবে না। অনেক ভেবে পরে কথা ঘুড়িয়ে অন্য কথা বলে কারণ কিছু একটা না বলা পর্যন্ত শিখড় ছাড়ছিলোনা দীপাকে।

 

এ নিয়ে খুনসুটি করতে করতে রাস্তা ফুরিয়ে বাসার কাছে চলে আসে দুজনে। দীপাকে নামিয়ে দিয়ে গালে একটি চুমু দিয়ে বাই বলে চলে যায় শিখড়। এভাবেই কেটে গেলো প্রায় কয়েকটি মাস। সাত আটমাস কেমন করে কেটে গেলো দুজনের কেউই টের পায়নি। হঠাত করে একদিন হারিয়ে যায় শিখড়।

 

এরপর অনেকদিন আর কোন খোঁজ খবর থাকে না। দীপা ফোন করলে কেটে দেয়। মেসেজ দিলে উত্তর দেয় না। অস্থিরতা বেড়ে যায় দীপার।

 

কী হলো ছেলেটার? আজব মানুষ। অথচ এইতো সেদিনই দুজনের মাঝে চুক্তি হলো যদি কারও কোন প্রকার পরিবর্তন আসে তবে দুজনের কেউ কারো কাছে লুকাবে না। অকপটে স্বীকার করবে সব। যদি আর দেখা বা কথা বলতেও ভালো না লাগে তাতেও বলতে দ্বিধা করবেনা তারা।

 

কী এমন সমস্যা হলো যে একটা মেসেজও দিতে পারছে না সে? রাগে ক্ষোভে কান্না পায়া দীপার।

 

এভাবে এক সপ্তাহ কেটে গেলো। এক সপ্তাহ পরে শিখড় একদিন জানায় সে ঠিকাছে। কোন সমস্যা নাই। এমনিতেই সে পারিবারিক কাজে ব্যস্ত আছে বলে যোগাযোগ করতে পারছে না।

 

-তাই বলে তুমি আমাকে জানাবেতো? লিখে পাঠায় দীপা।

 

আর কোন উত্তর নাই। মেসেজ সিন করে রেখে দেয় শিখড়।

 

চরম অপমান লাগে দীপার। মেসেজ সিন করে উত্তর না দেয়া মানে সেই মানুষটিকে মারাত্মকভাবে অপমান করা। অথচ দীপাকে অপমান করতে পারে শিখড় এ কথা সে বিশ্বাস করতে চায় না।

 

সময় নিতে চায় দীপা। কিছুদিন চুপচাপ থাকে। কিন্তু শিখড়ের কোন পরিবর্তন আসেনা। সে কিছু জানায়ওনা আবার কথাও বলছে না। মাঝে মাঝে নিজের মন চাইলে ফোন দেয় আবার কিছুদিন বিরতিতে থাকে।

 

-তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে শিখড়। মেসেজ দেয় দীপা।

 

-কী কথা? বলো।

 

-না, আমি দেখা করতে চাই।

 

রাজি হয় শিখড়। ঠিক হয় পরের সপ্তাহের সোমবার তারা দেখা করবে।

 

এর মাঝে আর কোন কথাই দীপা বলেনি। মনে মনে কাঁদতে থাকে। কষ্ট পায়। রাগ হয়। আবার ভাবে নিশ্চয়ই কোন সমস্যা হয়েছে না হয় কেন সে এমন করবে?

 

এই শিখড়ের তাড়নাতেই দীপা এতদূর এসেছিলো। কেবল বন্ধুত্বের লোভে। কেউ একজন তাকে স্পেশাল্ভাবে ভাবে, কেউ একজন তার ভালোলাগা মন্দলাগাকে কেয়ার করে এবং সেগুলোকে নিজের মত করে ধারণ করছে এই লোভ দীপাকে বাস্তবিক অর্থেই শিখড়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিলো। কিরণের কাছ থেকে পাওয়া কষ্টগুলোকে যখন শিখড় মিটিয়ে দিতে শুরু করেছিলো তখন ভেবেছিলো সব ভাললাগারতো আর পরিণতি আসেনা, সকল সম্পর্কেরতো আর পরিণয় হবে এমন কথা নেই। এমন কিছু সম্পর্কও হতে পারে যেখানে কোন স্বার্থ থাকে না, থাকে কেবল ভালোবাসার হিসেব। দুজন মানুষ একে অপরকে কেবল অনুভবে বাঁচিয়ে রাখে। সে অনুভব বা অনুভূতির কোন নাম  দেয়া যাবে না। শিখড় এমনি একটি মানুষের নাম যাকে দীপা বাঁচিয়ে রাখতে চায় কেবল অনুভূতির মাঝে। তাকে পাবার কোন লালসা নেই। তবে তার বন্ধুত্বকে হারানোর বেদনা থাকবে। আর সেজন্যই দীপা চেয়েছিলো যদি আর কোনদিন শিখড়কে কাছে নাও পাই অন্তত একটি সুন্দর সমাধান যেন হয়। তিক্ততার মাঝে সম্পর্ক শেষ করতে চায়না দীপা। শ্রদ্ধা ও সম্মানের সম্পর্ক যেন কলুষিত না হয় সেটাই বলতে চায় শিখড়কে।

 

অবশেষে সেই সোমবার দীপা তাদের নির্ধারিত দেখা করার জায়গায় পৌছে যায় সময়ের আগেই। কিন্তু শিখড়ের কোন খোঁজ থাকে না। ঘড়ির কাটা ঘুরতে থাকে রাতের আকাশের তারাগুলো একে একে মিলিয়ে যেতে থাকে। গাছের পাতাগুলোও অস্থির হয়ে এলোমেলোভাবে বইতে থাকে। দীপার মনের ভিতরের খোঁজ যেন তারাও পেয়েছে। চারদিকে অন্ধকারেরা দীপাকে বলতে চায় কিছু।

 

দীপার দুচোখ ফেটে আসে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে উঠে চলে আসে। রিক্সায় উঠে আর পারেনা নিজেকে ধরে রাখতে।

 

দীপা বিশ্বাস করতে চায় না শিখড় থাকে ঠকিয়েছে। এ অসম্ভব। শিখড় আর যাই করুক দীপার সাথে বেঈমানী করতে পারে না। এমন  একজন মানুষ যে নিজে থেকেই দীপাকে কাছে টেনে নিয়েছিলো সে বিনা বাক্যে দীপাকে না বলে চলে যেতে পারে না। তুমি কেন এমন করলে শিখড়? দুজনের সমান আগ্রহেই কাছে এসেছিলাম আমরা। বন্ধুত্ব হয়েছিলো আমাদের। হাত ধরে কথা দিয়েছিলে, নিয়েছিলে। তবে আজ কী এমন হলো যে তুমি আমাকে অসম্মান করলে? লুকিয়ে বাঁচতে চাইছো? কার কাছ থেকে? আমার কাছ থেকে লুকালেই কি সব পেয়ে যাবে? এই যে এতগুলো দিন আমরা হেসে খেলে কাটালাম সেগুলো কি কেবল আমার একার চাওয়া ছিলো? তোমার ছিলো না? নাহ! আর ভাবতে পারছে না দীপা। মনে মনে ঠিক করলো আর কোন যোগাযোগ করবেনা সে। আজ যে জবাব শিখড় দিয়েছে এরপর আর কোন আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয় মেনে নেয়া।

 

তুমি ভালো থেকো শিখড়। আমি বিশ্বাস করতেই চাই যে তুমি ভিতরে ভিতরে একজন একা মানুষ। আমি তোমাকে অবিশ্বাস করে আমাকে অসম্মান করতে পারবোনা। তোমাকে অবিশ্বাসের খাতায় ঠাঁই দেয়া মানে আমাকেই অবিশ্বাস করা কারণ আমিইতো স্বেচ্ছায় মেনে নিয়েছিলাম তোমার বন্ধুত্বকে। যাকে প্রাণের মাঝে ঠাঁই দেয়া যায় তাকে কখনই ঘৃনার তালিকায় দেয়া যায় না। আমি পারিনা। পারবো না। আমার সাথে বন্ধুত্ব ছিন্ন করেও যদি তুমি তোমার জগতে ভালো থাকো তবে আমিত সেটাই চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি জানি তুমি পারবেনা ভালো থাকতে। যা করছো বা করবে সে কেবল অভিনয় ছাড়া আর কিছুই হবে না।

 

দীপা আবারও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। একেকটি দিন যাচ্ছে আর একেকটি ইচ্ছাকে হেঁচড়ে টেনে নিয়ে বাক্সে বন্দী করছে। থাক তোরা। এমন করেই একদিন মৃত ফসিল হয়ে যাবি তোরা। এ পৃথিবীতে আসলে স্বার্থহীন কোন সম্পর্ক হয় না। এটাই বুঝি জীবনের শিক্ষা আমার। তাহলে কী শিখড় বন্ধুত্বের বাইরে একজন নারীর কাছে সাধারণ অর্থে একজন পুরুষ যা চায় তাই চেয়েছিলো? মাথাটা ঘুড়ে উঠে দীপার। গা কেঁপে উঠে। জ্বর আসবে নাকি? কপালে হাত রাখে। শরীর বরফের মত ঠান্ডা অথচ শীত লাগছে। তবে কি সকল পুরুষই এক? চাহিদা ছাড়া সম্পর্কের কথা কি কেবল বলার জন্য বলা?

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা