চেনা-অচেনা এই শহরে

আগের সংবাদ

ম্যাসেঞ্জার

পরের সংবাদ

ঢাকার যত পুর

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ৪:৪৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ৪:৪৩ অপরাহ্ণ

Avatar

কোনো কিছু দেখে বা শুনে মানুষ তার একটা নামকরণ করার চেষ্টা করে। এটাই হয়তো স্বাভাবিক। কারণ সেই নামের মধ্য দিয়েই সবার কাছে বিষয়টি উপস্থাপিত হয়ে থাকে। সেই নামকরণের ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয় নির্ভর করে। নামটি নানাভাবেই প্রভাবিত হতে পারে। যেমন- ব্যক্তি, ধর্মীয় বা অন্য যে কোনোভাবে এর নামকরণ করা হয়ে থাকে। স্থাননাম হচ্ছে কোনো একটি স্থানের শনাক্তকারী বর্ণনা। আর নামকরণের উদ্দেশ্য হচ্ছে সংশ্লিষ্ট স্থানের নিজস্ব একটা পরিচয় তৈরি করা এবং আশপাশের অন্যান্য স্থানের পরিচয় থেকে আলাদা করা। তাই স্থাননামকে এক ধরনের বর্ণনামূলক শনাক্তি বা বর্ণনামূলক পরিচয়পত্র বলা যেতে পারে। সত্যি কথা বলতে কী, ঢাকা শহরের রাস্তাঘাটগুলোর নাম খুবই বৈচিত্র্যপূর্ণ। সেই স্থাননামের শেষে ‘পুর’ রয়েছে এমন নামের সংখ্যাও কিন্তু নেহাত কম নয়।
আমাদের দেশে স্থাননামকরণের ক্ষেত্রে ‘পুর’ সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি শব্দ। পুর শব্দের অর্থ নগর, শহর, গ্রাম লোকালয় ইত্যাদি। জেলা-উপজেলার নামকরণে ব্যক্তি, রাজন্যবর্গ বা অন্যান্য শব্দ কিংবা প্রত্যয়ের শেষে পুর শব্দটি যুক্ত হয়ে অনেকগুলো জেলা-উপজেলার নামকরণ হয়েছে। আমাদের দেশে মোট ৬৮টি উপজেলা এবং ১২টি জেলার নামের শেষে রয়েছে ‘পুর’ শব্দটি। ঠিক যেমনটি ঢাকার অনেকগুলো স্থাননামের শেষে রয়েছে এই শব্দটি।

আজিমপুর
৬২ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত আজিমপুর এলাকাটি বর্তমানে বেশ অভিজাত আবাসিক এলাকা হিসেবেই পরিচিত। এলাকাটি আয়তনেও বেশ বিশাল, প্রায় আড়াই বর্গকিলোমিটার। আর লোকসংখ্যা প্রায় দেড় লক্ষাধিক। যদিও আজিমপুর শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে লোকালয়; তবে মজার বিষয় হচ্ছে, ১৮৫০ সালের সার্ভেয়ার জেনারেলের ম্যাপে আজিমপুর এলাকাটিকে একটি বসতিহীন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে ধারণা করা হয়, ঢাকা নগরী ব্রিটিশ শাসনের পর পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়ে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের রাজধানী হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের থাকার জন্য সরকারের তরফ থেকে যেমন কলোনি নির্মাণ করা হয়েছে, তেমনিভাবে প্রায় চারশ বছর আগে মোঘল শাসনামলে শায়েস্তা খাঁ যখন লালবাগ দুর্গ নির্মাণ করেন তখন রাজকর্মচারীদের বাসস্থানের জন্য বর্তমানের আজিমপুরকে নির্বাচিত করা হয়। সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র সুবাদার শাহজাদা মোহাম্মদ আজমের শাসনামলে এটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল বলে তাঁর নাম থেকে এলাকাটির নামকরণ করা হয় আজিমপুর। অবশ্য ভিন্ন একটি মতানুসারে, আওরঙ্গজেবের নাতি শাহজাদা আজিম-উশ-শানের নামানুসারে এই মহল্লাটি আজিমপুর নামে অভিহিত হয়। ব্রিটিশ যুগে এই এলাকায় ছোট দায়রা শরিফ, রামবাগ আখড়া, ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুল, স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা, চড়কঘাটাসহ বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য ও ঐতিহাসিক স্থাপনা গড়ে ওঠে। এছাড়া ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় কবরস্থান আজিমপুর গোরস্থানও এই এলাকায় অবস্থিত। এছাড়া এই এলাকাতে রয়েছে ইডেন কলেজ, হোম ইকোনমিক্স কলেজ, আজিমপুর গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ, অগ্রণী স্কুল এন্ড কলেজসহ দেশের বিভিন্ন নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

আজবপুর
পুরান ঢাকার সূত্রাপুর থেকে যে রাস্তাটি বাম দিক দিয়ে নর্থব্রুক হলের দিকে চলে গেছে তার গোড়াতেই ফরাশগঞ্জের অবস্থান। ঢাকার তৎকালীন নিমতলী কুঠির নায়েবে নাজিম বা উপ-নবাব নবাব নওয়াজিশ মোহাম্মদ খানের অনুমতি নিয়ে ১৭৮০ সালে ফরাসিরা একটি গঞ্জ বা বাজার প্রতিষ্ঠা করে। নামকরণ করা হয় ফ্রেন্সগঞ্জ। তবে সাধারণ মানুষ এটিকে প্রথম প্রথম বলতো ফরাশিগঞ্জ এবং একসময় এটি লোকমুখে ফরাশগঞ্জ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে ১৭৮৪ সাল নাগাদ ঢাকার ফরাসি কুঠি উঠে গেলে এই এলাকায় ফরাসি আধিপত্য কমে যায়। তবে অনেক স্মৃতিবিজড়িত ফরাশগঞ্জ আজো রয়ে গেছে। অবশ্য ১৮৫৯ সালের একটি সার্ভেম্যাপে এলাকাটি ‘আজবপুর’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু কেন বা কী কারণে এই নামকরণ তা জানা যায়নি। তবে এই নামটি এখন আর কারো কাছে পরিচিত নয়।

ইসলামপুর
ঢাকার প্রথম মোঘল সুবাদার ও মোঘল বাহিনীর প্রধান ছিলেন ইসলাম খান চিশতি। তিনিই মূলত মোঘল ঢাকার গোড়াপত্তন করেন। ফতেপুর সিক্রির সুবিখ্যাত শেখ সেলিম চিশতির পৌত্র এবং শেখ বদরুদ্দিন চিশতির পুত্র ইসলাম খান চিশতির পূর্বনাম ছিল শেখ আলাউদ্দিন চিশতি। সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁকে ‘ইসলাম খান’ উপাধি দেন এবং সেইসাথে ১৬০৮ সালে তাঁর ওপর বাংলা জয়ের দায়িত্ব অর্পণ করেন। সেই সময় তিনি ছিলেন বিহারের সুবাদার। নানা ধরনের বিদ্রোহ দমন করে তিনি বাংলার বিজয় চ‚ড়ান্ত করেন এবং ১৬১২ সালের ১২ এপ্রিল ইসলাম খান রাজমহল থেকে প্রশাসনিক দপ্তর সরিয়ে মোঘল সামরিক বাহিনীর প্রধান ঘাঁটি স্থাপন করেন ঢাকায়। তখন আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকার নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। স্বল্প সময়ের শাসনামলে ইসলাম খান ঢাকাকে একটি আধুনিক শহর হিসেবে গড়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তিনি মোঘল অমাত্য ও পেশাজীবী মানুষের বাসস্থান নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। তাঁর আমলে বস্ত্রশিল্প মোঘল রাজদরবারে সমাদৃত হয়। ইসলাম খান শিকার করতে খুব পছন্দ করতেন। ১৬১৩ সালে ঢাকার অদূরে ভাওয়ালে শিকার করতে গিয়ে রহস্যজনকভাবে তাঁর মৃত্যু হয়। ঢাকা হাইকোর্টে তাঁর সমাধি হলেও পরে তাঁকে ফতেপুর সিক্রিতে পিতামহের সমাধির পাশে সমাহিত করা হয়।
ঢাকার রাজধানীর মর্যাদালাভ, ঢাকার সত্যিকারের প্রতিষ্ঠা ইসলাম খান চিশতির মেধার ফলশ্রুতি হলেও তাঁর নামে ঢাকার কোনো স্মরণীয় স্থানের নামকরণ করা হয়নি। তবে পুরান ঢাকার একটি এলাকা ‘ইসলামপুর’ নামে আজও তাঁর শাসন আমলকে মনে করিয়ে দেয়। ইসলাম খান ঢাকার যে মহল্লায় তাঁর বাসভবন নির্মাণ করেছিলেন, তাঁর নামানুসারেই সেই এলাকার নামকরণ করা হয় ইসলামপুর।
এখানে একসময় কাঁসা-পিতল, ঘড়ি, বই-পুস্তক প্রভৃতি পণ্যের ব্যবসার জন্য বিখ্যাত ছিল। বর্তমানে ইসলাম খানের বাড়ির কোনো চিহ্নই আর নেই। আর স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ইসলামপুরের শতাব্দী প্রাচীন প্রকাশনা ব্যবসা পাশের বাংলাবাজার এলাকায় স্থানান্তর হলে ধীরে ধীরে এলাকাটি কাপড়ের পাইকারি ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। কয়েকশ কাপড়ের পাইকারি দোকানে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার কাপড় কেনাবেচা হয়ে থাকে। ঢাকার প্রথম সুবাদার ইসলাম খান শত শত বছর আগে বিগত হলেও ইসলামপুর নামটির মধ্য দিয়ে তিনি যেন আজো বেঁচে আছেন আমাদের মধ্যে।

বাবুপুরা
এমন একটি কথা প্রচলিত রয়েছে যে, নবাব সিরাজউদ্দোলার মীর মুন্সী মহম্মদ দেওয়ান পালকিতে চড়ে মুর্শিদাবাদের রাজপথ দিয়ে যাবার সময় নবাব সিরাজের খণ্ড-বিখণ্ডদেহ ধুলায় পড়ে থাকতে দেখেন। তা দেখে তার মধ্যে বৈরাগ্যের ভাব দেখা দেয়। ফলে তিনি সংসারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে নানা ধর্মস্থান ঘুরে অবশেষে আজিমপুরের একস্থানে স্রষ্টার ইবাদতে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। মহম্মদ দেওয়ানের বংশধরের একটি শাখা যেখানে বাস করতে আরম্ভ করে সেই বংশের বাবু খাঁ দেওয়ানের নামানুসারের ঐ এলাকার নামকরণ করা হয় ‘বাবুপুরা’। বাদশা আমলগীরের আমলে অঞ্চলটি বেশ জনবহুল ছিল।

কল্যাণপুর
এমন আরো বেশ কয়েকটি নাম রয়েছে পুর দিয়ে যার উৎপত্তি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় না। যেমন- আসাদগেট থেকে যে রাস্তাটি সোজা চলে গেছে গাবতলীর দিকে সেটি শ্যামলী হয়ে সামনের একটি জনপদের নাম ‘কল্যাণপুর’। এই নামের উৎপত্তি সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। একসময় এখানে বিশাল জলাভ‚মি এবং একটি যোগাযোগ সেতু ছিল। জলাভূমি ভরাট করার কারণে সেতুটি এখন ঢাকা-আরিচা রোডের দুই পাশের আবাসিক এলাকার সাথে মিশে গেছে। বর্তমানের একটি জনবহুল এই এলাকাটিতে আবাসিক এলাকার পাশাপাশি রয়েছে বাণিজ্যিক ও অন্যান্য স্থাপনা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট, বিআরটিসি বাস ডিপো, বাংলাদেশ বেতারের ট্রান্সমিটার কেন্দ্র ইত্যাদি।

মিরপুর
ঢাকার ‘মিরপুর’ নামটি সবার কাছেই পরিচিত একটি এলাকা বা মহল্লা। এই এলাকায় একসময় মীর সাহেবের বসত ছিল বলে ধারণা করা হয়। সেই মীর সাহেবের নামানুসারেই এলাকাটি মিরপুর নামে পরিচিতি লাভ করে। অবশ্য এ সম্পর্কে সঠিক বা বিস্তারিত আর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। মোঘল আমলে এর নদী বন্দর শাহ বন্দর নামে খ্যাত ছিল। পাক আমলে মিরপুর এলাকাটি অবাঙালি অধ্যুষিত ছিল। মিরপুর এখন স্টেডিয়াম, চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, টাউন হল, বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ইত্যাদির জন্য বিখ্যাত। তবে মিরপুর এলাকাটি একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ এলাকা হিসেবে গড়ে উঠলেও অনেকের কাছে এর মূল্যায়ন ভিন্ন। কারণ এখানেই রয়েছে খ্যাতনামা হযরত শাহ আলী বোগদাদীর মাজার। তাঁকে নিয়ে অনেক ধরনের গল্পগাথা প্রচলিত রয়েছে।

মহম্মদপুর
ঢাকার মহম্মদপুর এলাকাটি আমাদের সবার কাছেই বেশ পরিচিত। এখানকার বাড়িঘরগুলো অনেক সুবিন্যস্ত। রাস্তাগুলোও বেশ প্রশস্ত এবং আঁকাবাঁকা কম, সোজা। ১৯৪৭ সালে যখন ভারত বিভক্ত হয় তখন অনেক উদ্বাস্তু তৎকালীন পাকিস্তানে চলে আসে। তারই জের হিসেবে অনেক বাঙালি-অবাঙালি নিজেদের ভিটেমাটি ত্যাগ করে চলে আসে ঢাকায়। প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে তখন ঢাকার ওপর সঙ্গত কারণেই বেশ চাপ ছিল। বিষয়টিকে মাথায় রেখে তৎকালীন হাউজিং সেটেলমেন্ট দপ্তর লালমাটিয়ার পাশে প্রধানত অবাঙালি উদ্বাস্তু, যাদের মোহাজিরও বলা হতো; তাদের জন্য একটি আবাসিক এলাকা গড়ে তোলে। শান্তির দূত মহানবী হযরত মোহাম্মদের নামানুসারে এই আবাসিক এলাকাটির নাম রাখা হয় ‘মহম্মদপুর’।

১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত এখানকার বাসিন্দারা প্রধানত অবাঙালি ছিলেন। ১৯৭১ সালের পর থেকে অবাঙালিরা এই জায়গা ছেড়ে চলে যান। ধীরে ধীরে এখানে স্কুল-কলেজসহ নানা ধরনের আবাসিক ও বাণিজ্যিক অট্টালিকায় ভরে ওঠে। ব্রিটিশ যুগে এই এলাকাটি ছিল কিছুটা চাষাবাদী, অনেকটা জঙ্গলাপূর্ণ এবং অনেকটা ছিল জলাভ‚মি। বর্তমানে মহম্মদপুর এলাকাটি রাজধানীর একটি ব্যস্ত এবং সুসজ্জিত এলাকা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

নবাবপুর
নবাবপুর ঢাকার একটি অতি প্রাচীন এলাকা। ইসলাম খানের আমল থেকেই নবাব বাহাদুর এই রাস্তা দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করতেন বলে এর নামকরণ করা হয়েছে ‘নবাবপুর’। সময়ের সাথে সাথে অনেক স্থানের নামেরও বদল হয়। যেমন নবাবপুর আমাদের সবার কাছেই বেশ পরিচিত একটি এলাকার নাম। নবাবপুর রাস্তার পূর্বনাম কী ছিল তা কি আমাদের জানা আছে? হয়তো নেই। এর পূর্বনাম ছিল উমরাপাড়া। মোঘল আমলের শেষ দিকে এখানে আমির-উমরাগণ বসবাস করতেন বলে এলাকাটি উমরাপাড়া বা উমেরপুর নামে পরিচিত ছিল। এই নবাবপুর এলাকার মধ্যেই আবার টাকারহাট এবং মহাজনপুর নামে দুটি ভাগ ছিল। মোঘল আমলের শেষদিকে এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলে ধার দেওয়া; মানে ঋণ প্রদান আর বন্ধকী ব্যবসা ও সোনা-রুপা টাকায় পরিবর্তনের কাজ কারবার হতো টাকারহাট এলাকায়। আর মহাজনপুরে ছিল ঐসব ব্যবসার অর্থ বিনিয়োগকারী অর্থাৎ মহাজনদের বাসস্থান।
উনিশ শতকের চল্লিশের দশকের পর ঢাকায় ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হলে এসব ব্যবসায় ভাটা পড়ে। ফলে মহাজনপুর বা টাকার হাট এই নামগুলো আস্তে আস্তে হারিয়ে যায়। ফলে সুপরিচিত হয়ে ওঠে নবাবপুর নামটি। প্রায় ৪০০ বছর আগে এখানে জনবসতি গড়ে উঠেছিল। সেকালে ঢাকার তাঁতি আর বসাক শ্রেণির মানুষেরা নবাবপুরে বসবাস করতো। ঢাকার ঐতিহাসিক মসলিন এবং কাসিদা কাপড় তৈরির অন্যতম স্থান ছিল এটি। অথচ সেসব আজ কেবলই স্মৃতি। বর্তমানে এখানে নানা প্রকার মেশিনারিজ, ইলেট্রনিক ও স্যানিটারি সামগ্রীর বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে। নবাবপুর সংলগ্ন রাস্তাটিই নবাবপুর রোড নামে সুপরিচিত।
শাহজাহানপুর
ঢাকার মতিঝিল থানার অধীন একটি বর্ধিষ্ণু এলাকা হিসেবে পরিচিত শাহজাহানপুর। এলাকাটি বেশ পুরনো সেটি বলাই বাহুল্য। এখন যদিও উত্তর এবং দক্ষিণ শাহজাহানপুর নামে এটি পরিচিত তবে শুনতে অবাক হলেও সত্যি যে, এটি একসময় ঢাকা শহরতলির অন্যতম গ্রাম ছিল। এর নামকরণের কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না; তবে ঐতিহাসিক কিংবদন্তি রয়েছে যে, মোঘল সম্রাট আকবরের পৌত্র সম্রাট জাহাঙ্গীরের মহিষী ছিলেন জগৎজ্যোতি নুরজাহান। এই নুরজাহানের জামাতা ছিলেন শাহজাদা পারভেজ। অন্যদিকে সম্রাট জাহাঙ্গীরের শক্তিমান পুত্র ছিলেন শাহজাদা খুররম, যিনি পরবর্তীকালে সম্রাট শাহজাহান নামে পরিচিতি লাভ করেন। পারভেজ ও খুররমের মধ্যে ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার নিয়ে দ্ব›দ্ব দেখা দিলে নানা ঘটনার জালে খুররম পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। তখন পিতা সম্রাট জাহাঙ্গীর ক্ষমার অযোগ্য এই বিদ্রোহ দমনে নিজের ঔরসজাত পুত্র খুররমের বিরুদ্ধে মোঘল বাহিনী প্রেরণ করেন।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৬২৪ সাল নাগাদ শাহজাদা খুররম তার অনুগত বাহিনী নিয়ে দাক্ষিণাত্য থেকে সুবা বাংলার রাজধানী ঢাকায়ও এসেছিলেন। শোনা যায়, তিনি বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থান করেছিলেন। যুদ্ধে শাহজাহা পারভেজের পরাজয় হয় এবং শাহজাদা খুররম ঢাকা অধিকার করে এখানে বেশ কিছুকাল অবস্থান করেন। তখন বাংলার প্রকৃতিকে তাঁর খুব ভালো লেগে যায়, বিশেষ করে এখানকার ছনের তৈরি ঘরগুলো তাঁর বিশেষ পছন্দের ছিল। তাই ঢাকার একটি স্থানে তিনি ছনের তৈরি বাড়িতে বাস করতেন। কিছুকাল পরে শাহজাদা খুররম ঢাকা ত্যাগ করেন এবং একসময় দিল্লির পরাক্রমশালী সম্রাট হয়ে সারা বিশ্বে সম্রাট শাহজাহান নামে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। সম্রাট শাহজাহান ঢাকার যে স্থানে ছনের ঘর তৈরি করে বসবাস করেছিলেন পরবর্তীকালে সেই জায়গাটির নাম হলো ‘শাহজাহানপুর’। বর্তমানের শাহজাহানপুর এলাকাটি ঢাকা শহরের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এখানে বহু বিশিষ্ট লোকের বসবাস, কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনাও রয়েছে।

সুজাতপুর
আজ থেকে বেশ কয়েকশ বছর আগে ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল চিশতিয়ান মহল্লা বা সুজাতপুর। বর্তমানের রমনা এলাকায় ছিল এর বিস্তার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, নীলক্ষেত অঞ্চল ও হাইকোর্ট এলাকার অংশবিশেষ এর অন্তর্গত ছিল। ১৬০০ থেকে ১৬০৮ সাল পর্যন্ত বাংলার বারো ভুঁইয়াদের দমনের জন্য মোঘলরা একটি অভিযান পরিচালনা করেন। সেই অভিযানে মোঘল সৈন্যবাহিনীকে যিনি পরিচালনা করেছিলেন তাঁর নাম সুজাত খান রুস্তমে জামান। তিনি ছিলেন নবাব ইসলাম খাঁর একজন বিশ্বস্ত ও সুদক্ষ সেনাপতি। সুজাত খান নিজে এবং সম্ভবত চিশতি সম্প্রদায়ের আরো কিছু লোকজন এ মহল্লায় বাস করতেন। আর তাঁর নামানুসারেই এলাকাটির নামকরণ করা হয় ‘সুজাতপুর’। শত শত বছরের ব্যবধানে নানা পরিবর্তনের ধারায় পুরনো কাগজপত্রে সুজাতপুরের নাম উল্লেখ থাকলেও পরবর্তীকালে এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

সূত্রাপুর
একটি সময় ছিল যখন আমাদের এই রাজধানী ঢাকা শহরটি নৌকা ও কারুশিল্পের জন্য বেশ বিখ্যাত ছিল। এই দুটি শিল্পই ছিল কাঠনির্ভর। এই কাঠের কাজ যারা করত তারা সূত্রধর নামে পরিচিত ছিল। ঢাকা শহরের ক্রমবিকাশের সময়টিতে ঘর-বাড়ি তৈরির জন্য ঢাকায় প্রচুর সূত্রধরদের আগমন ঘটে। এই সূত্রধরেরা ঢাকার যে এলাকাটিতে বসবাস করত সেই এলাকাটি একসময ‘সূত্রাপুর’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। তবে দেশ বিভাগের আগেই এলাকাটি রূপলাল দাস লেন নামে নামকরণ করা হয়। কিন্তু সূত্রাপুর নামেই এলাকাটি এখনও সর্বসাধারণের কাছে পরিচিত হয়ে আছে। ঢাকার প্রাচীন মহল্লাগুলোর মধ্যে সূত্রাপুর অন্যতম। এখানকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও বেশ গৌরবময়। এখানে মিল ব্যারাকের পাশেই রয়েছে বেগ মুরাদের প্রাচীন দুর্গ। এখানে সূত্রাপুর নামে একটি থানা রয়েছে।

রোকনপুর
প্রাক মোঘল আমলে গড়ে ওঠা বর্তমানের সূত্রাপুর থানার অন্তর্গত ঢাকার একটি প্রাচীন জনপদের নাম ‘রোকনপুর’। কথিত আছে যে, এখানে সুলতানি আমলে রোকন উদ্দিন চিশতি নামে একজন দরবেশ বাস করতেন। তাঁর নামানুসারেই এলাকাটির নামকরণ করা হয় রোকনপুর। এই এলাকায় তাঁর নামে একটি মাজারও রয়েছে। সেই মাজারে কালো পাথরের একটি ফার্সি শিলালিপিতে দরবেশ রোকন উদ্দিন চিশতির পরিচয় লিপিবদ্ধ ছিল। রোকনপুর এলাকাটি আগে তিনটি লেনে বিভক্ত ছিল। বর্তমানে পাঁচ ভাই ঘাট লেন, কুঞ্জ বাবু লেন এবং কাজী আ. রউফ রোড একসময় রোকনপুরের অন্তর্গত ছিল। ১৮৭৩ সালের কলকাতা গেজেটে দেখা যায়, তৎকালীন ঢাকার কালেক্টর ডি আর লায়ালের নির্দেশে মাত্র ৫০০ টাকার বিনিময়ে ২০৮৬ বর্গফুট জমির একটি প্লট সরকারিভাবে অধিগ্রহণ করা হয়। এই সম্পত্তির ভিত্তিতে দেখা যায় যে, এর দক্ষিণ ও পশ্চিমে ছিল সরকারি রাস্তা, পূর্বে ছিল নকি দপ্তরির বাড়ি, আর উত্তরে ছিল টুকানি চাপরাশির বাড়ি। উনিশ শতকে সরকারি কর্মচারি ছাড়াও রোকনপুর এলাকাটিতে বাস করতেন অভিজাত শ্রেণির লোকেরা। ১৯২১ সালে স্থানীয় জনসাধারণের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মহল্লা সর্দার এবং স্থানীয় বিবাহ রেজিস্ট্রার কাজী আব্দুর রউফের নামে রোকনপুরের একটি অংশের নামকরণ করা হয়।

কমলাপুর
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থানের নামের শেষে ‘পুর’ রয়েছে এমন সংখ্যা অনেক আছে। তবে বহুল পরিচিত সড়কের মধ্যে রয়েছে কমলাপুর, ধলপুর, নবাবপুর, ইসলামপুর, মিরপুর, মহম্মদপুর, সুজাতপুর, রোকবনপুর, কল্যাণপুর, একরামপুর, কালাচাঁদপুর, মুরাদপুর, শাহজাহানপুর, ইব্রাহিমপুর ইত্যাদি। তবে এসব নামের অনেকগুলোরই নেপথ্য ইতিহাস জানা যায় না। যেমন ধরা যাক কমলাপুর। মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে যে রাস্তাটি পীরজঙ্গি মাজার পর্যন্ত চলে গেছে সে এলাকাটি ‘কমলাপুর’ নামে পরিচিত। এখানে অবস্থিত আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় রেলওয়ে স্টেশন। কিন্তু এই নামের উৎপত্তি সম্পর্কে জানা যায় না। তবে কারো কারো মতে এই এলাকায় এক সময় কমলা উৎপাদিত হতো। আর তা থেকেই কমলাপুর নামকরণ করা হয়েছে।
স্থাননামের শেষে ‘পুর’ শব্দটি রয়েছে এমন আরো কয়েকটি জায়গা রায়েছে। যেমন- কালাচাঁদপুর, মহাজনপুর, মুরাদপুর, ইব্রাহিমপুর প্রভৃতি। এসব নামের নেপথ্য ইতিহাস সঠিকভাবে পাওয়া যায় না। জানা যায় না সঠিক উৎপত্তি ইতিহাস। যেমন- সায়েদাবাদ থেকে যে রাস্তাটি পৌর কর্পোরেশনের দপ্তরের দিকে চলে সেটি ‘ধলপুর’ নামে পরিচিত। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি রাস্তার নাম ইব্রাহিমপুর। এসব নামের নেপথ্য ইতিহাস জানা যায় না।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা