ঈদযাত্রায় সড়কে বিকেলে চাপ বাড়তে পারে : ওবায়দুল কাদের

আগের সংবাদ

রেগুলেটর / শাহীন রেজা রাসেল

পরের সংবাদ

ডগরিব

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ১:১০ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৯, ২০১৯, ৮:৫১ অপরাহ্ণ

Avatar

নাম জিজ্ঞেস করতেই বলল, কুকুর।
একটু চমকে গেলাম, আমাকে কুকুর বলল না তো!
ভাবলাম, অন্যমনস্কতার জন্য হয়ে থাকতে পারে। কিংবা কুকুর নিয়ে ভাবনায় ছিল লোকটি। আবার সামনে কুকুর টুকুর কিছু দেখে থাকবে।
বললাম, কোথায় কুকুর?
বলল, এই তো।
এই তো মানে?
এই তো মানে, এই তো।
মশাই আপনার নাম কি?
বলল, বললাম তো।
বললেন মানে?
বললাম তো কুকুর।
আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। বললাম, মানুষের নাম কি করে কুকুর হয়?
বলল, কেন, মানুষের নাম কুকুর-বিড়াল পশু-পাখি ঝোপ-ঝাড় সবই হতে পারে। সোজাসুজি না হলেও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নাম কি? বুশ মানে তো ঝোপঝাড়। ময়না-টিয়ার নাম তো মেয়েদের শখ করেই রাখে বাবা-মা। এমনকি পশু নামেও মানুষ আছে। আরবি শূকর বাংলা করলে শুয়োর হয়ে যায়। সরাসরি গরু নামে মানুষ দেখা না গেলেও গোবর্ধন ও মহিষ নামে অনেকেই রয়েছে। মানুষের নাম সাপও হতে পারে। রামায়ণ-মহাভারতের নাগরাজের সাথে দেবতাদের যে যুদ্ধ হয়েছিল তা মূলত মানবজাতির গোত্রভিত্তিক বিভাজন ছাড়া আর কি। এখনো ডগরিব নামে কানাডায় আদিবাসী মানুষ বাস করে। যারা মনে করে কুকুর থেকে তাদের পূর্বপুরুষের ধারায় আগমন ঘটেছিল। দুনিয়াজুড়েই এ ধরনের অনেক টোটেম রয়েছে।
তার এই যুক্তিতে আমি বেশ ধন্ধেই পড়ে গেলাম। তাই তো মানুষের নাম কুকুর হতে পারেÑ তা তো কখনো ভাবিনি। এত কথা সে জানলই বা কোথা থেকে সে! তবে লোকটার নাম কুকুর হলেও তাকে কুকুর ভাবতে মন সায় দিল না কিছুতেই। একজন লোককে কিভাবেই বা কুকুর নামে ডাকা যায়। ভাবলাম, মাথায় কোনো গণ্ডগোল আছে। তবে হাবভাবে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। যদিও হাঁটার সময় সামনের দিকে একটু হেলে থাকে। হয়তো বয়সজনিত কারণে। চুলগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে বড় হলেও পরিপাটির অভাব রয়েছে। পোশাকও অবিন্যাস্ত। কিন্তু সরাসরি চোখের দিকে তাকালে প্রখরতা লক্ষ করা যায়। মনে হয় কি যেন লুকিয়ে রেখেছে; মানুষজনকে এড়িয়ে যেতে চায়।

দুই.
গল্পটার একটু পটভ‚মি বলে নেয়া ভালো। বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। তখন সবে আমি দক্ষিণবঙ্গের ভবানীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপকের চাকরি নিয়ে গেছি। জায়গাটা এতই চমৎকার যে কেবল জায়গার প্রেমে এখানকার চাকরি কবুল করেছিলাম। পুরনো জমিদার বাড়ির ভগ্নাবশেষের ওপর কলেজটির ভিত্তিপ্রস্তর করা হয়েছিল। বিশাল জায়গার ওপর বড় বড় কয়েকটি দীঘি। শতবর্ষী আমবাগানের মাঝখানে ব্র্যাঘমূর্তিত ফটকের মাঝখানে কলেজের মূল ভবন। কর্তৃপক্ষ এখনো প্রত্নকীর্তিগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হতে দেয়নি। যার নামে কলেজটি তার প্রতি সম্মানবশত আর কিছুটা প্রত্নসম্পদের প্রতি কলেজ-কর্তৃপক্ষের দায়িত্ববোধই এর প্রধান কারণ। কলেজ সম্প্রসারণের জন্য যতটুকু প্রয়োজন আগের কাঠামো ঠিক রেখে ততটুকু করা হয়েছে। তাছাড়া সরকারের প্রত্ন-বিভাগের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে, যাতে এটি পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়।

কিন্তু একটা বিষয়ে আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম দক্ষিণবঙ্গে এত বিশাল আমবাগান দেখে। মূলত মাটি ও আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশের এ অঞ্চলটিতে খুব একটা আমবাগান দেখা যায় না। আমগাছ দেখা গেলেও পাকার আগে আমের ভেতর পোকা হয়ে যায়। স্বাদও তেমন ভালো নয়। তবে শুনেছি জমিদার মশাই মালদহ থেকে মাটি এনে এই আমবাগানটি গড়ে তুলেছিলেন। যদিও কাল কোনো কিছুই সংগ্রহ করে না। হয়তো এই বাগান আর প্রাসাদের ভগ্নাস্ত‚পটিও অতি দ্রুতই কালের গর্ভে বিনাশ হয়ে যাবে। একদিন এখানকার ছাত্ররা জানতেও পারবে না কোনো একজন লোকের বাহ্যিক কীর্তির ধ্বংসাবশেষের ওপর তাদের জীবনের গতি প্রেম স্মৃতি ও শিক্ষা কিছুদিনের জন্য পল্লবিত হয়েছিল। তাছাড়া এই জায়গাটি আমার বেশি করে ভালো লাগার কারণ কলেজটির প্রায় পাশ দিয়েই একটি খরস্রোতা নদী। ধান নদী খাল- এই তিনে বরিশাল। রাস্তাঘাট থাকুক না থাকুক- এ অঞ্চলে নদী না থাকলে জীবনের গতি বোঝা যায় না। নদীটি ঠিক কলেজ থেকে দেখা যেত না। মাঝখানে বন্যানিয়ন্ত্রণ বোর্ডের একটি উঁচু রাস্তা তার কিছুটা সম্প্রতি পাকাও করা হয়েছে। প্রতিদিন বিকাল বেলা রাস্তা থেকে নদীর ঢাল পর্যন্ত অনেকেই বেড়াতে আসে।
তবে ভবনটি যতই হৃদয়গ্রহী হোক না কেন এর পুরনো প্রাচীরে রয়েছে সাপখোপের বাস। দিনের বেলা তত ভয় না থাকলেও রাতে সাপ তাড়ানোর জন্য কার্বলিক এসিডের বোতল রাখা হয়। এখানে যে তুলনায় বিষধর সাপের আনাগোনা সে তুলনায় আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা নেহায়েত কম। এখানকার লোকজন বলে এগুলো বাস্তুসাপ, এখানকার বাসিন্দাদের চিনতে পারে। খুব একটা আক্রান্ত না হলে কাউকে কিছু বলে না। অবশ্য এটা ঠিক, সাপ থাকাতে অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণীর উৎপাত কিছুটা কম। অসামাজিক এইসব প্রাণিকুলকে বাদ দিলেও বেশ কিছু নেড়িকুত্তা রয়েছে এখানে। কুকুর সামাজিক জীব হলেও এরা তেমন পাত্তা পায় না। মানুষের উচ্ছিষ্ট খেয়ে বাঁচে। বাসাবাড়ির চেয়ে কলেজ হোস্টেলগুলো কুকুরের জন্য অপেক্ষাকৃত নিরাপদ; খাবার-দাবারও একটু বেশি পাওয়া যায়। তাছাড়া দুষ্টপোলাপানের চেয়ে কলেজপড়–য়া ছেলেমেয়েরা কুকুরদের প্রতি কিছুটা সহানুভ‚তিশীল হয়। কখনো কখনো খাবার দাবার দেয়। আসলে তারুণ্যে নব সম্পর্কের জন্য মানুষ পৃথিবীর সকল কিছুকে একটু মায়াময় দৃষ্টিতে দেখে। বিশেষ করে জগতের অসহায়দের প্রতি তরুণকালে পক্ষপাতিত্ব তৈরি হয়। আর সেই ভালোবাসা থেকে কুকুরও বাদ যায় না।

তিন.
এরপর থেকে কুকুর নিয়ে কুকুর-মানুষের কাছে অনেক কথাই জেনেছিলাম। তবে আমি তাকে কুকুর নামে কখনো ডাকিনি। মোটের ওপর একজন মানুষকে কিভাবে কুকুর নামে ডাকা সম্ভব। এতকাল দেখেছি কোনো খারাপ কাজের জন্য মানুষকে কুকুর বলে গালি দেয়া হয়। কিন্তু মানুষের নামের প্রতি তার রয়েছে প্রচণ্ড ঘৃণা। মানুষকে কুকুর বললে কুকুরকে অপমান করা হয়। তার মতে কেবল প্রচণ্ড ভালো মানুষকে কুকুর নামে সম্বোধন করলে তাও তো কিছুটা মানায়। কুকুরের যেসব ভালো গুণ তার কোনোটাই তার দৃষ্টিতে মানুষের মধ্যে নেই। অবশ্য সে বলেছিল, মাঝে মাঝে শীতকালে হুজুররা ওয়াজ করতে এসে তাদের কিছু ভালো গুণের স্বীকৃতি দিয়ে থাকে; যেমন গাছের কিংবা কোনো মাটির ডিবির আড়ালে পা তুলে পেচ্ছাপ করার বিষয়টি। হুজুরদের মতে আজকের প্যান্টপরা তরুণদের দাঁড়া হয়ে পেসাব করার চেয়ে কুকুরও অনেক ভালো। আবার ময়লাদ্রব্য খাওয়া, প্রকাশ্যে মিলিত হওয়ার বিষয়টিকে- তারা তরুণ-তরুণীদের অভ্যাসের সঙ্গে তুলনা করে থাকে। অল্পতেই সন্তুষ্টি, প্রভুভক্তি, পরিশ্রমী সবই কুকুরের মধ্যে আছে। মানুষ বাদে আর যে কোনো নামে ডাকলে তাই তার কোনো আপত্তি নেই। আমি তাকে কুকুর না ডেকে ডগরিব বলে ডাকা শুরু করলাম। যদিও সে ডগরিব মানে জানত না। যে কথা আমি আগেই বলেছি, কানাডার আদিবাসী এক গোত্রের নাম। যারা মনে করে কুকুর জাতীয় প্রাণী থেকেই তাদের উৎপত্তি হয়েছে। এখনো এ গোত্রের কয়েক হাজার মানুষ কানাডায় বাস করে। এমনকি তাদের ভাষার অভিধানও রয়েছে।
কুকুর নিয়ে তখন আমরা অনেক কথাই বলাবলি করেছিলাম। যেমন হুজুররা কুকুরকে ধর্মীয় চেতনায় অপবিত্র মনে করলেও পবিত্র কোরানে কুকুরের বেহেস্তে যাওয়ার কাহিনিও বর্ণিত আছে। আসহাবে কাহফের সেই কুকুর যে প্রভুদের সাথে নির্বাসনে গিয়েছিল- অত্যাচারী রাজার হাত থেকে বাঁচার জন্য। প্রভুদের যত্নে গোহামুখ পাহারা দিয়েছিল। শেষমেশ খেয়ে না খেয়ে সেখানেই মারা গিয়েছিল। পুণ্যবান মানুষের জন্য আত্মত্যাগকারী কুকুরটির প্রতি প্রভুর রয়েছে অপরিসীম দয়া। কিন্তু আর কোনো কুকুর এমন সৌভাগ্য অর্জন করবেন না বলেই তারা বলে। ইসলামে কুকুর পোষা কেবল নিষেধই নয়, কুকুর পুষলে প্রতিনিয়ত সঞ্চিত পুণ্য কমতে থাকে। এই প্রাণীটির উপস্থিতিতে নামাজ দুরস্ত হয় না। তবে কেউ কেউ বলে নিরাপত্তার জন্য কুকুর পোষা যেতে পারে। এতটা হ্যাপা পেরিয়ে কে-ই বা কুকুর পালনে আগ্রহী হয়। তাছাড়া মুসলিম সমাজে দুনিয়া কিংবা আখেরাতে লাভ ছাড়া কোনো কাজ উৎসাহী করা হয় না। তবে কুকুরের প্রতি দয়া দেখাতে কিন্তু নিষেধ করেনি মহানবী। হাদিসে আছে, পিপাসিত কুকুরকে জলদান করে এক বেশ্যা আরামসে বেহেস্তে চলে গিয়েছিল। ডগরিব বলেছিল, এ প্রসঙ্গে ধর্মপুত্র যুধিষ্টিরের কুকুরের কথাও বলা যায় সেও প্রভুর সঙ্গে সশরীরের স্বর্গারোহন করেছিল।

চার.
কুকুর নিয়ে আমার এত কথার কারণ ডগরিব। তার সঙ্গে পরিচয় না হলে হয়তো একটা সামান্য কুকুর নিয়ে আমার এই গল্প বলার কোনো প্রয়োজনই হতো না। আমি নিজেও কুকুর সম্বন্ধে যথেষ্ট কৌত‚হলী হয়ে উঠেছিলাম। কারণ দু’একটা নেড়িকুত্তা ছাড়া আমার এই প্রবাস-জীবনে তেমন কাউকেই সময় দিইনি। কারো সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেনি। এ কথা বলতে আমার দ্বিধা নেই শিক্ষক সহকর্মীদের সঙ্গেই আমার সবচেয়ে নিকৃষ্ট দিনগুলো কেটেছিল। পেশা হিসেবে মহত্ত্বের ধারণাই বঞ্চনার কারণ। শিক্ষকদের মধ্যে আত্মভাবনা ও আত্মশ্লাঘার মতো বস্তুটি আর সব পেশার চেয়ে বেশি। কেবল রাজনীতিক, সাংবাদিক ও মৌলবী সাহেবদের সঙ্গে তাদের অবস্থানের কমবেশি তুলনা চলতে পারে। ফলে মাঝে মাঝে নেড়িকুত্তাকে খাবার দেয়া ছাড়া, তাদের সঙ্গে দুএকটি ভালোমন্দের ভাব আদান-প্রদান ছাড়া অবসর সময়ে আমার কোনো বিনোদন ছিল না।
কুত্তা নেড়ি হোক আর গৃহপালিত হোক স্বভাব তো একই। দু’এক দিন দুএকটু খাবার দিলে, একটু প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকালে কুকুরের বাচ্চাগুলো কতই না খুশি হয়! পায়ের কাছে শুয়ে পড়ে আকাশের দিকে পা তুলে কি যে অদ্ভুত ভঙ্গি করে যারা কুকুরের প্রতি সুপ্রসন্ন নন তারা কখনো বুঝতে পারবে না। কুকুরের প্রতি ভালোবাসা অনেকটা শিশুদের মতো। শুরুতে একদম কোনো কিছু মনে হয় না। কিন্তু তাদের সঙ্গে কিছুটা ভাব জমার পরে এড়িয়ে চলা সম্ভব হয় না। যে সব বয়স্কব্যক্তি নাতি-নাতনির সঙ্গে খেলাধুলা করে সময় পার করেন, তারা যদি কখনো একা হয়ে যান কুকুর পুষে দেখতে পারেন, কোনো অংশেই কম আনন্দদায়ক হবে না। বরং মানব শিশুর সঙ্গে ভাব জমানোর চেয়ে কুকুরের প্রতি মনোনিবেশ দেয়া আরও বেশি আনন্দদায়ক। কারণ শিশুরা খুব শিগগির বড় হয়ে যায়; এবং দ্রুত তাদের স্বভাব পরিবর্তন হয়ে যায়। নতুন নতুন খেলার সঙ্গী জুটে যাওয়ায় দাদা-দাদিদের আর সময় দিতে চায় না। কিন্তু কুকুর-শাবক কখনো বড় হয় না। বলা হয়ে থাকে, একটা পূর্ণবয়স্ক কুকুরের বুদ্ধির মাত্রা দুই বছরের শিশুর সমপরিমাণ। তবে কুত্তার গড় বয়স দশ/বার বছরের বেশি না হওয়ায় প্রায়ই মালিককে কাঁদিয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করেন। কোনো প্রাণী পুষতে চাইলে একটির বদলে এক জোড়া ধরে পোষাই উত্তম। একটি পুষলে প্রাণীটি যেমন একা হয়ে পড়ে তেমনি তাদের স্বভাবের পুরোটা জানাও হয় না। তদুপরি প্রাণী অধিকার কিছুটা খর্বও তো হয়; নাকি।

পাঁচ.
কুকুর সম্বন্ধে আমার সকল জ্ঞানের উৎস ছিল ডগরিব। আমার সঙ্গে খাতিরের ঘনত্বের ফলে কুকুর ছাড়াও মানুষের নামেও তার অপত্তি ছিল না। যদিও ডগরিব সম্বন্ধে এখানে শিক্ষকরা আমাকে আগেই সতর্ক করে দিয়ে বলেছিল ওর মাথায় সিট আছে। দু’একজন এমনও বলেছিল, স্যার ও মানুষ না। সত্যি সত্যি কুকুর, মানুষের রূপ ধরে থাকে। একবার এক ছেলেকে এমনভাবে কামড়ে দিয়েছিল ঠিক কুকুর যেভাবে কামড়ায়। এমনকি ছেলেটিকে জলাতঙ্কের চৌদ্দটি ইনজেকশনও দেয়া লেগেছিল। ডাক্তাররা ভেবেছিল, কুকুর পোষার কারণে ডগরিবও জলাতঙ্কে আক্রান্ত। কিন্তু বছর তিনেক পাবনা মানসিক হাসপাতালে থাকার পরে ডাক্তার সার্টিফিকেট দিয়েছিল- ডাগরিব পুরোপুরি সুস্থ। ওর মধ্যে যে যত সামান্য মানসিক বিকার আছে তা বাইরে ঘুরে বেড়ানো প্রতিটি মানুষের মধ্যে বিরাজমান।
তবে ডগরিবকে মানুষের ভয় পাওয়ার কারণ তার কুকুর সঙ্গীতা। কখনো তাকে একা দেখা যেত না। যখনই তাকে দেখা যেত কয়েকটি কুকুর তাকে ঘিরে থাকত। এ কুকুরগুলোর একটিও তার পোষা নয়। তাই কুকুরের সংখ্যা ও নির্দিষ্টতা ঠিক থাকত না। তবু এরাই তার অবৈতনিক পাহারাদার হিসেবে নিয়োজিত থাকে। কি যেন এক সম্পর্কের দ্বারা তারা আবদ্ধ গভীরভাবে লক্ষ না করলে বোঝার উপায় নেই। ডগরিব নিজেও এই কলেজচত্বরের পুরনো ভবনের কোনো এক কক্ষে থাকত। তার এই থাকা নিয়ে কারো আপত্তি ছিল না। প্রথমত ওর দ্বারা কেউ উত্ত্যক্ত হয়নি। সাপ-বেজির সঙ্গে ওর বসবাস। অনেক সময় রাত-বিরেত ওদিক দিয়ে কেউ যাওয়ার সময় কয়েকটা কুকুরের সঙ্গে ডগরিবকে দেখে তারা কিছুটা সাহস পায়। অন্ধকার নির্জন রাত বড়ই বিচিত্র। নানা রকম ভয়ের রূপ ধরে মানুষের কাছে আসে। দুনিয়ার কোনো ভয়ের সঙ্গে তার তুলনা হয় না। তাই রাতের বেলা অন্ধকারে নির্জন পথে অনেক সময় একটি চোর দেখলেও বুকে কিছুটা সাহস আসে। আর যাই হোক মানুষের দ্বারা পৃথিবীর অজানা রহস্যময় ভয়ের কারণ থাকে না। তাছাড়া ডগরিবের পূর্বপুরুষ এই জমিদার বাড়িতেই কাজ করত। তার দাদার বাপ ছিল ছোট জমিদারের দেওয়ান। কাচারির হিসাবপত্র যুগ যুগ ধরে তারাই রাখত। এমনকি দেশ বিভাগের আগে জমিদার সপরিবারে কোলকাতা চলে গেলে প্রকৃতপক্ষে তার পিতামহ এই জমিদারির মালিক হয়ে ওঠেন। ইচ্ছে করলেই পুরো জামিদারিটাই তার নামে নিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু প্রচলিত সম্পদ অর্জনের পথে তিনি অগ্রসর হননি। সেদিক দিয়ে ডগরিব এ বাড়িরই আদি বাসিন্দা। তার পিতা পিতামহরাও এখানে বাস করে গেছেন। এই ইতিহাসটুকু এখনো বিলুপ্ত না হওয়াই কলেজ কর্তৃপক্ষ তার দিকে কিছুটা সমীহের দৃষ্টিতে তাকায়। ডাগরিব ছাড়াও বেশ কয়েক বাসিন্দা এই পোরো জামিদার বাড়ির আশ্রিত। তারা ছোটমোট কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। দু’এক বিঘা জমি এখনো অব্যবহৃত; যেখানে তারা শাকটা লতাটা ফলায়। আর মেয়েরা এই কলেজের হোস্টেলে ঝিয়ের কাজ করে।

ছয়.
ডগরিবের সঙ্গে আমার পরিচয় খুব অল্প দিনের। এর আগে তার সঙ্গে একদিনই মাত্র দেখা হয়েছিল জমিদার বাড়ির বড় জলদীঘিতে। অপরাহ্নে পড়ন্ত বেলায় আমি তখন একায় ভাঙা ঘাটলার চৌতলায় বসেছিলাম। শুরুতে খেয়াল করিনি। দেখি একজন লোক দাঁড়িয়ে পানিতে পা ধুচ্ছে। সেদিনে ওই কথপোকথটি এই গল্পের শুরুর দিকে সংযুক্ত করেছিলাম। এর পরে অনেক দিন তার সঙ্গে দেখা নেই। কিন্তু মনে মনে তার সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ ছিল। দু’একজন- যার কাছে জানতে চেয়েছি; সেই বলেছে, ওর মাথায় গণ্ডগোল আছে। কেউ বলেছে ও তো কুকুর। কেউ আবার তাকে জিন-ভূত বলেও জানে। তাই ভয়ে কেউ কাছে যায় না। অনেকেই মনে করে ও দিনের বেলা মানুষের রূপ ধরে থাকে রাতের বেলা বিরাট কুকুর হয়ে যায়। এই বাড়ি, এই জমিদারি পাহারা দেয়। এ সব কথা শোনার পর তার সম্বন্ধে আমার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়।
দ্বিতীয় দিনে তার দেখা মিলল শীত সকালের কুয়াশার মধ্যে দর-দালানের একটি ভাঙা কক্ষে। সকালবেলা প্রকৃতির ডাকে আমার রুম থেকে একটু দূরে বেরিয়ে আসতে হয়। যদিও খোলা মাঠে নয়, তবু মূল বাসভবন থেকে কিছুটা দূরে পুরনো ভবনের সংলগ্ন কয়েকটি বাথরুম একই সঙ্গে যুক্ত। প্রাকৃতিক কর্ম সেরে ফেরার সময় লক্ষ করলাম দরোজা-জানালাবিহীন একটি কক্ষে কে যেন বাচ্চা আদরের মতো মুখ দিয়ে শব্দ করছে। তার ভাষা অস্পষ্ট, গভীর, কিছুটা কণ্ঠের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা গোঙানির মতো। মানুষ বলেই কেউ একজন হবে বলে মনে হলো। আবার ভাবলাম, এই শীতের ভেতর এখানে মানুষ কিভাবে থাকবে। ভোরের আলো যেহেতু ফুটে উঠেছে সেহেতু চিনতে অসুবিধা হলো না- এই তো আমাদের ডগরিব (যদিও নামটি তখন পর্যন্ত স্বীকৃতি পায়নি)। তাই বললাম, ওখানে কি করো?
বলল, নাতিপুতি দেখাশোনা করি। আমার মেয়ে বাচ্চা দিয়েছে।
তাকিয়ে দেখলাম, সদ্যপ্রসূত কয়েকটি কুকুরের বাচ্চার পাশে ডগরিব শুয়ে আছে। পাশে কুণ্ডুলি পাকানো মা কুকুর আমাকে দেখে সতর্ক হয়ে চোখ মেলল। বললাম, মেঝেতে শুয়ে আছ ঠান্ডা লাগবে না? তোমার নাতিপুতিরও তো ঠান্ডা লাগতে পারে।
বলল, মেঝেতে খড় বিছিয়ে দিয়েছি। কুকুরদের খালি গায়ে থাকার অভ্যাস আছে। কুকুরদের তো হাত নাই যে লেপ বানাবে।
ডাগরিব সম্বন্ধে আগেই শুনেছিলাম তার মাথায় সিট আছে। আবার অনেকেই বলেছে, সে মানুষ না, কুকুর। তাদের কথা সত্যতা মিলল- হয় তার মাথায় সিট আছে, না হয় সে মানুষরূপী কুকুর। মানুষের আত্মাবদলের অনেক কাহিনি শুনেছি। কিন্তু সত্যি সত্যিই তা ঘটে- এমনটি বিশ্বাস করিনি। এখনো করতে চাইনি। বলল, কয়টা নাতি, কয়টা নাতনি তোমার?
বলল, দুটি পোলা, তিনটা মাইয়া। তবে একটা নাতনির চোখ ফোটেনি, ওর স্বাস্থ্যটা ভালো যাচ্ছে না। যাই হোক, সেখানে থেকে দ্রুত চলে আসলাম। ভাবলাম, পৃথিবীতে কত কিসিমের মানুষই না হয়!
কিন্তু এই ঘটনার পর ডগরিবকে নিয়ে আমার কৌত‚হল বেড়ে গেল। কিভাবে একজন মানুষ কুকুরে রূপান্তর হয়। কুকুরের ভাষা বোঝে। মা কুকুর স্বভাবত অপরিচিতজনদের সদ্যজাত বাচ্চাদের কাছে ভিড়তে দেয় না। কিন্তু ডগরিবের কথা আলাদা। এরপর থেকেই আমি ডগরিব ও তার নাতিপুতিদের খোঁজ-খবর রাখতে রাখলাম। এবং তাদের কিছুর দরকার আছে কিনা তাও জানার চেষ্টা করতে থাকলাম। এইভাবে ডগরিবের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ হওয়া। ডগরিবও লোকজন না থাকলেই আমার ঘরে আসতে থাকে। যদিও সে কথাবার্তা খুব একটা বলত না; তবু তার মুখের অভিব্যক্তিতে অনেক কথা ফুটে উঠত। তবে কিছু অসঙ্গতিও লক্ষ করতাম। আসলে কুকুরের সঙ্গে থাকতে থাকতে তারও স্বভাব-চরিত্রে কুকুরের ভাব এসে গিয়েছিল। মানুষের প্রতি অবিশ্বাস ও ভালোবাসায় দুটিই কুকুর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।
ডগরিব এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল প্রাণিকুলের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও অভিশপ্ত মানুষ। সে অহেতুকই নিজেকে সেরা মনে করে। আর এই সেরা মনে করার পেছনে তার একমাত্র কারণ দুটি হাতের যাচ্ছেতাই ব্যবহার করতে পারা। পৃথিবীর প্রায় অধিকাংশ প্রাণী নিজের উদরপূর্তির পরে কাউকে বঞ্চিত করে না। মানুষ কেবল মানুষকে বঞ্চিতই করে না; সঞ্চিতও করে। ভাবজগতেরও মালিক হতে চায়। সে যাই হোক, সে কিভাবে কুকুর হয়ে উঠেছিল সেই গল্পটিই সে একদিন আমায় শুনিয়েছিল।

সাত.
সদ্য প্রসূত কুকুর ছানাগুলোর মাকে সে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিল ডগরিব। রাস্তার ধারে কয়েকটি মানব সন্তান একটি দেশি কুকুরের বাচ্চাকে বারবার পুকুরের পানিতে ফেলে দিয়ে মজা পাচ্ছিল। বাচ্চাটি যতই বাঁচার জন্য ক‚লে ওঠার চেষ্টা করছিল, দুষ্ট ছেলেগুলো পা দিয়ে আবার তাকে পানির মধ্যে ছুড়ে মারছিল। এ রকম জীবন সন্ধিক্ষণে কুকুর ছানাটিকে সে মানব শিশুদের নির্মম খেলা থেকে রক্ষা করেছিল। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল।
কুকুর ছানাটির তখনো অপুষ্ট শরীর। পাগুলো সরু। তখনো নিজেকে বহন করার ক্ষমতা তার ছিল না। তবু বয়সের তুলনায় সে ছিল যথেষ্ট সুন্দর। তার কাছে মনে হয়েছিল, পৃথিবীতে যত স্তন্যপায়ী বাচ্চাপ্রসব করে কুকুরের বাচ্চাই তার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর চেহারার হয়ে থাকে। এমনিতেই কোলে তুলে নিতে ইচ্ছে করে। অবশ্য ছাগলও ভেড়ার বাচ্চাও কম সুন্দর নয়। গ্রামে মহিলাদের এই দুই জাতীয় বাচ্চা স্নেহবশত কোলে নিতে দেখা যায়। কিন্তু কুকুরের বাচ্চা সুন্দর হলেও আমাদের দেশে কেউ তাকে কোলে নেয় না। শিশুকালে দু’একজন শখ করে কুকুর পুষতে বায়না করলেও অভিভাবকদের নিরুৎসাহে শেষ পর্যন্ত সে ইচ্ছে পরিত্যাগ করে। কেবল ত্যাগই করে না, কালক্রমে সেও কুকুর বিদ্বেষী হয়ে ওঠে।
ডগরিবেরও কুকুর পুষতে শুরুতে বেগ পেতে হয়েছিল। কিন্তু বাপ না থাকায় শেষ পর্যন্ত মা হাল ছেড়ে দেয়। শুরুতে মায়ের নামাজ ও রান্নার ঘর ছাড়া সবখানেই তার যাতায়াত ছিল। অবশ্য কিছুদিনের মধ্যেই কুকুর ছানাটি তার মায়েরও নিকটাত্মীয় হয়ে ওঠে। তার নাম রাখা হয় রিনা।
মানুষের কুকুর পোষার ইতিহাসটি অনেক পুরনো। কিন্তু আজ তার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। কুকুরই একমাত্র প্রাণী যে কোনো কারণ ছাড়াই মানুষের কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসে। যেদিন মানুষের পৃথিবী এতটা সহজ ছিল না, সেদিন কুকুর এনে দিয়েছিল তার জন্য নিরাপত্তা বোধ, খাবার সংগ্রহ, পশুপালন ও যানবাহনের উপায় হিসেবে। অথচ তাদের যে-সব পূর্বপুরুষ এখনো জঙ্গল ও বরফের ভেতরে স্বাধীন শিকার করে জীবিকা ধারণ করে তাদের মূল্য পরাধীন কুকুরের চেয়ে ভালো।
একটা কুকুর ঠিক কুকুর না হয়ে হায়েনা হতে পারত, শেয়াল হতে পারত, চুরি করে গেরস্তের মুরগি খেতে পারত, হায়েনার মতো হিংস্রতার মাধ্যমে জীবন ধারণ করতে পারত কিংবা নেকড়ে হতে পারত, শুধু কি এক টুকরো খাবার জন্যই মানুষের পায়ের কাছে কুকুরের পূর্বপুরুষ বাসা বেঁধেছিল। আসলে মানুষের অসহায়ত্ব কুকুর ভালোবেসে ফেলেছিল। কিন্তু মানুষ আজ সে ইতিহাস ভুলে গেছে।
অনেকেই খাদ্যের প্রাচুর্য ও বেশিদিন বাঁচাকেই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য মনে করে। কিন্তু একটা প্রাণ যেহেতু একটা রূপে পৃথিবীতে একবারই বিরাজ করবে, তার লয় যেহেতু অনিবার্য সেহেতু স্বাধীনতার মূল্যটিই সবচেয়ে বেশি। জীবনে স্বাধীনতাই যদি না থাকল তাহলে সমৃদ্ধি দিয়ে কি হবে!
রিনা একটা মেয়ে কুকুর হলেও তার ছিল বেজায় সাহস ও কৌত‚হল। খুব অল্পদিনের মধ্যেই সে গন্ধ শুঁকেই বাড়ির প্রতিটি জিনিস আলাদা করে চিনতে শিখল। এমনকি ডগরিবের চোখের দিকে তাকিয়ে সে শত্রু মিত্র নির্ণয় করতে পারত।
একটা কুকুরের তো আর কোনো কাজ নেই তার প্রভুকে সন্তুষ্ট করা ছাড়া। কুকুরের মাংস তো আর মানুষ খায় না, তাহলে কি জন্যই বা মানুষ কুকুর পুষবে। অবশ্য বেড়াল বাদর ময়না অনেক কিছুই মানুষ পুষে থাকে। সবারই রয়েছে কিছু নির্দিষ্ট কাজ। আনন্দ দান সৌন্দর্যবর্ধন সে সবও তো কম নয়। যদিও এসব ধারণা সংস্কৃতি-ভেদে আলাদা।
কুকুরের বিকাশকালটিও কম সুন্দর নয়। রিনা যখন বেড়ে উঠছিল তখন তার পা থেকে কোমর অব্দি এক নির্মেদ সৌন্দর্য ঝরে পড়ছিল। দেশি কুকুররা অতটা স্লিম না হলেও রিনার শরীরে কোনো অতিরিক্ত মেদ ছিল না। দক্ষিণাঞ্চলে এখনো পর্তুগিজদের কুকুরের বংশধর দেখতে চাওয়া যায়। কয়েক’শ বছরের কুকুর-যাত্রায় কেউ আর নির্ভেজাল থাকতে পারেনি। এই অঞ্চলের দেশি কুকুরের সঙ্গে ইউরোপীয় পর্তুগিজ কুকুরের মিথস্ক্রিয়া ঘটেছে সহজেই। ফলে ভিনদেশি কুকুরের ক্ষিপ্রতা এবং কোনো অংশের গঠন রিনার জন্য স্বাভাবিক ছিল।
সামনে চেয়ে পেছনের দিকটা ছিল কিছুটা উঁচু। মেদবিহীন পেটটা অনেকটা পিঠের সঙ্গে লাগানো। কুকুরের জননস্থান নিয়ে মানুষের দ্বিধা ও লজ্জা রয়েছে। জন্মগতভাবে লেজ বাঁকানো পিঠের দিকে উঠে থাকায় জননাঙ্গের পুরোটাই নগ্ন হয়ে থাকে। বিশেষ করে মেয়ে কুকুরের। তাই অনেকেই কুকুরের পেছনের দিকে সরাসরি তাকাতে পারে না।
ডাগরিব আমাকে জানিয়েছিল, যারা কুকুরের সান্নিধ্যে যায়নি, তারা দুনিয়ার সব কুকুরকে একই রকম মনে করে। কিংবা যারা কুকুর পালন করতে চায় তারাও ভাবে একটি কুকুর হলেই হয়। অন্তত একই জাতের সব কুকুর একই রকম। কিন্তু মোটেও তা নয়। প্রতিটি কুকুরই আলাদা। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, প্রত্যুৎপন্নমতিতা, টিকে থাকার ক্ষমতা, চাতুরতা ও দক্ষতা- সব আলাদা রকম। তাছাড়া কুকুরের দক্ষতা নির্ভর করে তার শৈশবের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ওপর। যে কুকুর মানুষের সান্নিধ্য পায় সে তার প্রবৃত্তি চারিপাশির্^ক পরিবেশ ও তার মায়ের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করে থাকে। কিন্তু শৈশবে যারা মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছে তারা মনিবের শিক্ষাদানের পদ্ধতির ওপর নিজেকে দক্ষ করে তোলে। তবে সকল কাজেই মানুষের সমর্থন কুকুরের জন্য অতীব প্রয়োজন।
যদিও রিনা ছিল একটি বেওয়ারিশ কুকুর ছানা, তবু তার চালচলনের মধ্যে আভিজাত্যের কমতি ছিল না। আবার সে কোনো গৃহপালিত পোষা কুকুরও নয়। প্রতিদিন প্রাতঃরাশের পরে পুরো কলেজ চত্বর ছাড়া আশপাশের রাস্তা ধরে কিছুটা বেরিয়ে আসত। আবার দুপুর হতেই সে আসত ফিরে। কিছুটা ডগরিবের সাথে, কিছুটা তার মায়ের সাথে, এ ঘর ও ঘর শুঁকে শুঁকে একটু আদার নিয়ে সন্ধ্যার আগে আরও একবার পাড়ায় বেড়িয়ে আসত। কুকুররা রাতেও মানুষের মতো ঘুমিয়ে কাটায় না। তাদের ঘুম অতিশয় পাতলা। দূর থেকে পল্লব পতনের শব্দও তারা পায় টের। ডাগরিবের মা বলত মেয়েটা হয়েছে পাড়া বেড়ানো স্বভাব। পায়ে নেই দড়ি।
তবে অন্য কুকুরদের সঙ্গে মেলামেশার ব্যাপার তার ছিল বেশ ছুঁচিবায়ুতা।
কৈশোরের শুরুতে পাড়ার এক ষন্ডকুকুর তার পিছ নিয়েছিল। তখন তার বাড়ি ফেরার সময়। ডগরিব তার অপেক্ষা করছিল। সে অনেকক্ষণ লক্ষ করল ষন্ড কুকুরটি বারবার পিছন শোঁকার চেষ্টায় তাকে বিরক্ত করে তুলছে। রিনা বেশ কায়দা করে তাকে এড়িয়ে বাড়ি আসার চেষ্টা করছিল। কিন্তু কুকুরটি কিছুতেই রিনার পাছ ছাড়ছিল না। দু’একবার ঘেউ করে সাবধান করে দিল। তখন কার্তিক মাস কুকুরদের মৌসুম। হয়তো পুরুষ কুকুরটির মাথায় ওই এক চিন্তা ছাড়া কিছু ছিল না। একবার দুবার, হয়তো রিনার ইচ্ছে ছিল না। এর আগে কখনো তার জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরিও হয়নি। তবে এখন তার যৌবন কাল। এ বছর পাল খেতে পারে। কথা আছে কুকুর সাবালক হলে ঠ্যাং তুলে পেচ্ছাপ করে। ডগরিব লক্ষ করল, রিনা ষন্ড কুকুরটার পেছনের পায়ের রানের দিকে এমন জোরে দাঁত বসিয়ে দিল যে কুকুরটি খ্যাঁক করে দৌড়ে পালাল।
এর আগেও লক্ষ করেছি, আমার কাছে নতুন কেউ আসলে রিনার মেজাজ ঠিক থাকত না। সর্বদায় আমাকে পাহারা দিতে থাকে। হয়তো কোথাও নদীর ধারে বেড়াতে গেছি। কোথায় যে গেছে- অনেকক্ষণ তার দেখা নেই। অপরাহ্নে বেড়াতে আসা পরিবারগুলোর সঙ্গে ভাব জমানোর চুটিয়ে চেষ্টা করছে। বিশেষ করে শিশুদের প্রতি রিনার ছিল অত্যন্ত কৌত‚হল। শিশুরা তার কান মলে দিলে, গা থেকে ছাল ছাড়িয়ে নিলেও সে রা-টি করতো না। এমনকি যে সব দুষ্ট রিনার সঙ্গে খেলাচ্ছলে পানিতে বল ছুড়ে মারত; রিনা দৌড়ে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে বল তুলে আনত। দুষ্টরা তাকে কিছুতেই রেহাই দিত না; গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে নদীতে ছুড়ে মারত। কিন্তু রিনার যেন তাতেই সুখ। একটা কুকুর মানব শিশুকে আনন্দ দিতে পারছে- কুকুর জীবনে এরচেয়ে বড় আনন্দ আর কি হতে পারে।
একবার তো রাতে বাড়ি ফেরার পথে রিনা হঠাৎ করে সামনে এসে পড়ল। মুখে একটা মরা সাপ। তখনো সাপের শরীরটা নড়ছে। হয়তো আমার কোনো বিপদ বুঝতে পেরেছিল। গরমের দিনে সাপ অনেক সময় গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে আছে। পথের ধারে কুণ্ডুলি পাকিয়ে শুয়ে থাকে। কোনো চলনশীল বস্তু দেখলেই ছোবল মারে।

আট.
কিন্তু ওই বছরই একটি ঘটনা ঘটল। সময় সব কিছুকে পরিবর্তন করে দেয়। রিনারও মন-মেজাজে পরিবর্তন ঘটল। চঞ্চলতা বেড়ে গেল। শরীরে কেমন যেন আলগা সৌন্দর্য চুইয়ে পড়তে থাকল। মাঝে মাঝে ঘর থেকে বেরিয়ে যেত, হয়তো দুই একদিন ঘরে ফিরে আসত না। রিনা শিকারি কুকুর হলেও শৃঙ্খলিত নয়। ও সম্পূর্ণ স্বাধীন। ওর ব্যক্তিত্বের ওপরে, ওর স্বাধীনতার উপরে কখনো আমরা হাত দিইনি। তবু ও রাতে না ফিরলে আমাদের সহজে ঘুম আসত না। মা খাবার নিয়ে অপেক্ষা করত। রাতে উঠে দেখে আসত। ভাবত বারান্দায় হয়তো কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে আছে রিনা। ফিরে এসে বলত, ও একটা নষ্ট হয়ে গেছে।
আসলে রিনার না-ফেরা নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু ভয় ছিল ওর নিরাপত্তা নিয়ে। কারণ চারদিকে কুকুরবিদ্বেষী মানুষ, স্বাধীনতাবিরোধী মানুষ। কুকুরের নিজস্ব ভাষা ঘেউ ঘেউ করার স্বাধীনতাটুকু কেউ দিতে চায় না। অথচ এই জাতি একদিন তার নিজের ভাষার অধিকার নিয়ে লড়াই করেছিল। প্রায়ই পাড়া-প্রতিবেশীর কেউ না কেউ এসে অভিযোগ করে যাবে তোমাদের কুকুরের জন্য কি আমরা একটু শান্তিতে থাকতে পারব না। বাড়ি থেকে বেরুলেই ছুটে এসে গায়ের সঙ্গে মুখ লাগিয়ে অপবিত্র করে দেবে। তোমাদের তো আল্লাহ-খোদা নেই। তোমরা যদি জানতে কুকুরের ছোঁয়া লাগলে অজু ভেঙে যায়। কি জানি কুকুরের কি অপরাধ। কুকুরকে তো কখনো ঘুষ খেতে দেখিনি কেউ। কাউকে খুন করতে, সম্পদ লুণ্ঠন করতে, জমা করতে কখনো তো কুকুরকে দেখা যায় না।
মাঝে মাঝে রিনার হঠাৎ করে উধাও হওয়ার কারণ, রিনার প্রথম মাতৃত্বের সময় এসেছে। পুরুষ সঙ্গের প্রয়োজন। অবশ্য কুকুর হোক আর মানুষ হোক প্রকৃতি নারী জাতিকে এমন সম্পদ দিয়েছে পুরুষ জাতি এমনিতেই ছুটে আসে। আমরা দুএকবার রিনাকে মিলিত হতে দেখেছি। কিন্তু বাধা দিইনি। কারণ সব প্রজাতির মিলন একটা মৌলিক অধিকার সঠিক সুযোগ তৈরি না হলে প্রাণের বিকাশ ঘটবে কিভাবে। কুকুরের মিলন এক অদ্ভুত প্রক্রিয়া। এমন কষ্ট ও আনন্দের মিলন প্রাণিক‚লে আর ঘটে বলে মনে হয় না।
যাই হোক, এই ঘটনার মাস তিনেক পরে রিনা গোটা চারেক বাচ্চা দিল আমাদের ঘরের বারান্দার এক কোণে। মা খড়কুটো দিয়ে বিছানা করে দিয়েছিল। মাঘ মাসের শীত থেকে বাঁচাতে ঘরে তৈরি একটি কাঁথাও দিয়েছিল। কিন্তু বাচ্চাদের ছেড়ে রিনা কোথাও যেতে চায় না। এমনকি আমরা কেউ গেলেও সতর্ক চেয়ে থাকে।
কিন্তু রিনা তার বাচ্চাদের সাবালকত্ব দিয়ে যেতে পারেনি। বাচ্চাদের বয়স দুই সপ্তাহ না হতেই রিনা মারা গিয়েছিল। হয়তো প্রতিবেশীরা তাকে মারতে চেয়েছিল। হয়তো প্রতিবেশীরা তাকে মেরে ফেলেছিল। কারণ কুকুরের মতো প্রভুভক্ত, পরোপকারী, কৃতজ্ঞ জীব অথচ অপ্রয়োজনীয় প্রাণীর বেঁচে থাকার অধিকার নেই এই সমাজে। যার মাংসের দাম নেই তার বাঁচার অধিকার নেই।
বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আর বাচ্চাদের কাছে ফিরে আসতে পারেনি রিনা। বাড়ির পাশে মাঠের মধ্যে মরে পড়ে ছিল।
রিনা মারা যাওয়ার মাস তিনেকের মধ্যে মাও মারা গেল। তখন থেকেই রিনার বাচ্চা পালনের দায়িত্ব আমার ওপর বর্তায়। কুকুরের বাচ্চা বেশিদিন বাঁচে না। মা মরার কয়েকদিনের মাথায় মাতৃহীন তিনটি বাচ্চা মারা গেল। বাকিটিকে আমি কন্যা স্নেহে বড় করে তুললাম। রিনার সঙ্গে মিলিয়ে বেঁচে যাওয়া কুকুর কন্যার নাম রাখলাম বীণা। এই বীণাবিনা আমার জীবনে কোনো মানে থাকল না। এই বীণাই এখন আমার নাতি-পুতির মা হয়েছে।

নয়.
ডগরিবের গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। আমাদের দু’জনের মধ্যে এমন একটা ভাব জমে গিয়েছিল যে, আমার ঘরে ঢুকতে ওর কোনো বাধা ছিল না। না আসলে আমারও ভালো লাগত না। আমিও ওর অপেক্ষায় থাকতাম। ঘর বলতে আর তেমন কিছু না। একটা টেবিল, একটা আলমিরা আর একটি শোবার মতো খাট। যদিও এই ভবনেরই আমেনা নামের একটি মেয়ে এসে বিছানাপত্র গোছগাছ করে দিয়ে যেত। খাবার-দাবারও একই নিয়মে চলে। তবে আমার খাবারের নতুন ভাগিদার ডগরিবকে আমেনারও পছন্দ নয়। তবে ডগরিব কখনো আমার সামনে খাদ্য গ্রহণ করেনি। কিছু একটা দিলে সে তার সঙ্গে থাকা পাত্রে ঢেলে নিয়ে যেত। আসলে এর অন্যতম কারণ, নাতিপুতি ছাড়া তার খাদ্য রোচে না।
সেদিন বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। শরতের গুমোট রাত। গরমটাও বেশ ভাপসা। আকাশে চাঁদ থাকলেও মেঘের আড়ালে জোছনা অধিকাংশ সময় আড়াল হয়েছিল। এই সময়টা সাপের উপদ্রব একটু বেশি। পুরনো দালান, সাপের বসতি থাকলেও যেহেতু সাপের কামড়ে এখানে কেউ মারা যায়নি; সেহেতু সব-সময় কারবলিক এসিড দেয়া হয় এমন নয়। কারবলিকের গন্ধে সাপ দূরে থাকে। তাছাড়া কক্ষের দরোজা সব সময় বন্ধ করা হয় না। ডাগরিবও আমাকে সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ করে।
রাতের খাবার পরে যা ছিল ডগরিব নিয়ে গিয়েছে। আমি একটা বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছি। এমনিতেই এ এলাকায় কারেন্ট থাকে না। হয়তো মেঘে রাত্রিও অন্ধকার হয়ে আছে। কিসের যেন গোঙানির শব্দে ঘুম ভাঙল। মনে হলো একটি কুকুর কিসের সঙ্গে যেন প্রবল ধস্তাধস্তি করছে। পিঠের লোমগুলো ফুলে খাড়া হয়ে আছে। অনেক উঁচু। সাধারণত কুকুর এতটা উঁচু হয় না। বিশেষ করে আমাদের দেশের কুকুর তো নয়ই। আবার এ বাড়িতেও আগে এ ধরনের কুকুর দেখিনি। মনে হলো কুকুরটি মুখে করে কি যেন প্রবল বেগে ঝাঁকি দিচ্ছে। ঘাড় এদিক ওদিক করছে। মাথা ডুলছে। বেশ কয়েক মিনিট ধরে। কিছুক্ষণ ফোঁস-ফোঁস শব্দ শুনলাম। আমি কে কে বলে চিৎকার করছি। হাতের কাছে আলো খুঁজে পাচ্ছি না। দরোজা খোলা ছিল। খানিকটা ভয়ও পেয়ে গেলাম। একবার ডাগরিব বলেও ডাকলাম।
অনেকটা আমার আর্ত-চিৎকারের মধ্যে বিধ্বস্ত ডগরিব এসে হাজির হলো। ওর জিভ দিয়ে তখন লালা ঝরছিল। শরীরে কাঁপুনি ছিল। হাঁপাচ্ছিল। বলল, স্যার আমি ডগরিব। আমি বললাম, তুমি এতরাতে এখানে কি করছ?
বলল, আপনার ঘরের দিকে একটা কুলিন সাপ আসছিল। আমি আমার ঘর থেকে দেখতে পেয়ে তার পিছে পিছে চলে এসেছি।
বললাম, সাপটা কই?
ও হাত দিয়ে দেখাল, একটি মৃত সাপ রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে আছে। আমার মনে হলো সাপের সারা শরীরে ধারালো দাঁতের আঘাত।
আমি বললাম, তোমার সঙ্গে কি তোমার মেয়ে ছিল?
বলল, না আমি একাই। ওরা ঘুমাচ্ছে।
তারপর একটু কেমন যেন হেসে বলল, স্যার এখন আর কোনো সমস্যা নেই। আমি আছি, আপনি শুয়ে পড়েন।
বাকি রাতে ঘুম এলো না। এই ঘটনার পর আমি আর একদিনও ভবানীগঞ্জ থাকিনি। মেডিকেল লিভ নিয়ে চলে এসেছি। এমনকি আমার কাপড়-চোপড়, যতসামান্য আসবাবপত্র এখনো ওখানেই পড়ে আছে।
যদিও ডাগরিব থেকে পালানোই আমার উদ্দেশ্য, তবু মনে হয় না আমার বাকি জীবন তার থেকে দূরে থাকতে পারব। এক রাতের দুঃস্বপ্ন আর ডগরিব নামের এক কুকুর-মানুষের ভালোবাসা আমার জীবনকে সারাজীবনের জন্য তছনছ করে দিয়েছে।
অনেকবার মনে হয়েছে ফিরে যাই। ওর কাছ পড়ে থেকে কুকুর হওয়ার শিক্ষা নিই। কিন্তু আমাদের মতো ভীতুরা কখনো এক জীবন থেকে আরেক জীবনে সশরীরে যেতে পারে না।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা