ঢাবির কেন্দ্রীয় মসজিদে অধ্যাপক মমতাজউদদীনের নামাজে জানাজা সম্পন্ন

আগের সংবাদ

অন্তিম বিকালে অনন্ত সকাল

পরের সংবাদ

জনসংযোগ এখনো বিকাশমান পেশা

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ১২:৪৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ৩:৪৪ অপরাহ্ণ

Avatar

বাংলাদেশে আজকের যে জনসংযোগ পেশা তার সূত্রপাত গত শতাব্দীর প্রথম দিকে, প্রথম বিশ্বাযুদ্ধের পর। তখন প্রতিষ্ঠিত হয় Board of Publicity, Central Board of Information (1921), Directorate of Public Information (1923), Directorate of Information and Broadcasting (1931). এর পথ ধরে উপমহাদেশে জনসংযোগ পেশার বিস্তার লাভ করে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর প্রতিষ্ঠিত হয় Publicity Department. পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে প্রচার বিভাগের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় Public Relations Directorate. শব্দটি এই প্রথম চালু হলো এ দেশে।
চল্লিশের দশক থেকে ষাট দশক পর্যন্ত অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তি প্রচার বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কাজী দীন মোহাম্মদ, আব্বাস উদ্দীন, জসীমউদ্দিন, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, জহুর হোসেন চৌধুরী, সলিমুল্লাহ ফাহমী, জয়নাল আবেদিন, খায়রুল কবীর, নাজির আহমেদ, আবুল হোসেন প্রমুখ।
এ যাবৎকালের এসবই ছিল মাত্র সরকারি কার্যকলাপের বিবরণ জনগণকে জানানো। বর্তমানে জনসংযোগ বলতে যা বুঝি তা তখনো শুরু হয়নি।

১৯৭২ সালের পর আবশ্য সমগ্র কর্মকাণ্ডে ব্যাপক পরিবর্তন শুরু হয়। প্রতিষ্ঠা করা হয় স্বতন্ত্র তথ্য মন্ত্রণালয়। এর অধীনে খোলা হয় স্বতন্ত্র দপ্তর গণযোগাযোগ অধিদপ্তর, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, তথ্য অধিদপ্তর। বেতার ও টেলিভিশনতো আগে থেকেই ছিল। এইসব সংস্থায় বর্তমানে যারা কর্মরত তারা অবশ্যই আপন আপন ক্ষেত্রে দক্ষ পেশাজীবী, নিছকই সরকারি কর্মচারী নন। প্রযুক্তি, কারুকৌশল, সুকুমার কলা, সৃষ্টিধর্মী উদ্ভাবনা এই সমস্ত কিছুর পরিমিত ও আবেদনময় সমন্বয়ই আধুনিক জনসংযোগ পেশার মূল ভিত্তি। বাংলাদেশে জনসংযোগ ক্রমান্বয়ে যোগাযোগ তথা গণযোগাযোগের অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠছে এবং বিকাশ লাভ করছে।
পথিকৃৎ : বাংলাদেশে এ পেশার পথিকৃৎরা হলেন সৈয়দ নুরুদ্দীন, খায়রুল কবীর, এ টি এম মেহেদী, মোতাহারুল হক চৌধুরী, আব্দুল ওহাব, মো. নুরুল ইসলাম, জহুরুল ইসলাম, আহমেদ কামাল, রকীব উদ্দীন আহমেদ, মজিবর রহমান ভূইয়া, এম এ খালেক ভূইয়া, সৈয়দ জাফর আলী, মোস্তাফিজুর রহমান, ফয়জুল কবীর, তোয়াব খান (মহমান্য রাষ্ট্রপতির সাবেক প্রেস সচিব ও সাবেক পিআইও), সৈয়দ নাজমুদ্দীন হাসেম, আহমেদ জামাল, জহুর হোসেন চৌধুরী, সৈয়দ বদরুল হক, আনিস চৌধুরী, যাহিদ হোসেন, এম তাজুল ইসলাম, আবুল কালাম আজাদ (সাবেক তথ্যমন্ত্রী) প্রমুখ।
মহিলা পথিকৃৎ : জনসংযোগ পেশা মহিলাদের জন্য খুবই চ্যালেঞ্জিং পেশা। সংখ্যায় কম হলেও এ পেশায় মহিলারা এগিয়ে আসছে। স্বাধীনতার পর এ পেশায় যেসব মহিলা আসেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সাদেকা শফিউল্লাহ, হোসনেয়ারা বেগম, মরিয়ম খাতুন, রোকেয়া সুলতানা, রাবেয়া ইসমাইল, রাশিদা মহিউদ্দিন, নাজমা বিনতে আলমগীর, ফেরদৌসী সুলতানা, মেরিনা ইয়াসমিন, হাশিমা গুলরুখ প্রমুখ। সাদেকা শফিউল্লাহ সত্তরের দশকের পথিকৃৎ জনসংযোগবিদ। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ জনসংযোগ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সম্পাদক।

তিনি জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্বকালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রচারকর্মে অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসেন। আর একজন সফল মহিলা জনসংযোগবিদ নাজমা বিনতে আলমগীর। তিনি বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রোসেসিং জোনস অথরিটির (বেপজা) জেনারেল ম্যানেজার (জনসংযোগ) হিসেবে কর্মরত আছেন। আশির দশকের শেষের দিকে তিনি বেপজার জনসংযোগ বিভাগে যোগ দেন এবং নিজের মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতাবলে শীর্য পদে অধিষ্ঠিত হন। আর একজন মহিলা জনসংযোগবিদ হলেন ফেরদৌসী সুলতানা। তিনি প্রাইম ব্যাংক লিমিটেডের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (জনসংযোগ) পদে দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে যান। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ জনসংযোগ সমিতির সহসভাপতি। অন্যতম পথিকৃৎ জনসংযোগবিদ মেরিনা ইসায়মিন মার্কিন দূতাবাসে প্রেস সেকশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাংলাদেশে বর্তমান অবস্থা : বাংলাদেশে জনসংযোগ পেশা এখনো বিকাশপর্বে রয়েছে। এ দেশে সময়ের বিবেচনায় এ পেশা খুব পুরনো নয়। তারপরেও বর্তমানে এ পেশা অনেক দূর এগিয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এ যুগে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি জনসংযোগ পেশাও নতুন মাত্রা পেয়েছে। দেশ, জাতি ও সরকারের সার্বিক সাফল্য বিশে^র কাছে তুলে ধরতে জনসংযোগ বিরাট ভ‚মিকা রাখছে। জনসংযোগ ও প্রচার মূলত গণতাত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো ও মুক্ত অর্থনীতির যৌথ ফসল। জনসংযোগ আপন বৈশিষ্ট্যের কারণেই আমাদের দেশে বিশেষায়িত পেশা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আর জনসংযোগবিদকে বলা হচ্ছে বিশেষজ্ঞ। জনসংযোগ আধুনিক পেশা। জনসংযোগ বাংলাদেশে মার্যদাপূর্ণ পেশায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯০ সালের পর দেশে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার ব্যাপক বিস্তারের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জনসংযোগ পেশার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে। বর্তমানে জবাবদিহিতা পূর্বের তুলনায় অনেক বেড়েছে।

সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান তাদের সাফল্য জনগণকে জানাতে চায়। দেশে পাস হয়েছে তথ্য অধিকার আইন। এ প্রেক্ষিতে জনসংযোগকর্মীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতি, বিশ্বায়ন, আকাশ সংস্কৃতি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ঝড়পরধষ গবফরধ) প্রতিটি সংস্থার কর্মকাণ্ড ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করছে। জনমতকে উপেক্ষা করে নয় বরং জনমত ও জনপ্রত্যাশাকে প্রাধান্য দিয়েই প্রণীত হচ্ছে কোনো প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ কর্মকৌশল। এর ফলে দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে পেশাদার জনসংযোগকর্মীর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে।
বাংলাদেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান, শায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, করপোরেশন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক, বিমা, এনজিও, বিদেশি হাইকমিশন/দূতাবাস, বহুজাতিক কোম্পানি, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় জনসংযোগ বিভাগ রয়েছে। তা ছাড়া বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোও জনসংযোগ বিভাগ খুলেছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রচার কাজের জন্য রয়েছে পৃথক পৃথক স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রেস উইং। এছাড়া প্রত্যেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর আছে একজন করে জনসংযোগ কর্মকর্তা। বাংলাদেশ সরকারের আছে একজন প্রধান তথ্য কর্মকর্তা।

মহামান্য রাষ্ট্রপতির আছে একজন প্রেস সচিব এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর রয়েছে একজন প্রেস সচিব ও একজন তথ্য উপদেষ্টা।
জনসংযোগ পেশাটি বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও বিভিন্ন নামে অবিহিত হয়ে আসছে।Public Relations Officer, Communication Officer, Corporate Relations Officer, Information Officer, Media Relations Officer, Media Officer, External Affairs Officer, Public Information Officer, Corporate Communication Officer, Advocacy Officer ইত্যাদি নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জনসংযোগ পেশা চালু আছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৮০০টি প্রতিষ্ঠানে জনসংযোগ বিভাগ চালু আছে।
বাংলাদেশ জনসংযোগ সমিতি : জনসংযোগ পেশার মানোন্নয়ন, পেশাজীরীদের প্রশিক্ষণ, নিজেদের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টি ও মর্যাদা বৃদ্ধিকল্পে কয়েকজন পথিকৃৎ জনসংযোগবিদের উদ্যোগে ১৯৭৯ সালের ২২ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জনসংযোগ সমিতি ((Public Relations Association of Bangladesh – BPRA)। ২৫ সদস্যের সমন্বয়ে তখন গঠন করা হয় একটি কার্যকরী কমিটি। মোট সাধারণ সদস্য ছিল ৯৬ জন। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মো. নুরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জহিরুল ইসলাম এবং কোষাধ্যক্ষ ছিলেন আহমেদ জামাল।

মহিলা সদস্য ছিলেন পাঁচজন। ঢাকার পূর্বাণী হোটেলে প্রথম জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে বিপিআরএ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। এ সম্মেলনে বিশেষ আমন্ত্রণে আন্তর্জাতিক জনসংযোগ সমিতির তৎকালীন সভাপতি ভারতের শ্রী সনৎ লাহিড়ী যোগদান করেছিলেন। বিপিআরএ-র দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী প্রমুখ প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান করে থাকেন।
বর্তমানে বিপিআরএ-র সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন মোস্তফা-ই-জামিল এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আছেন মনিরুজ্জামান টিপু। জনসংযোগ সমিতির উদ্যোগের ফলেই ১৯৮২ সালে তৎকালীন তথ্য সচিব এ বি এম গোলাম মোস্তফার উদ্যোগে একটি ডিও লেটার ইস্যু করা হয়। এতে জনসংযোগ পেশাকে বিশেষায়িত পেশা এবং জনসংযোগবিদকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এটা জনসংযোগ সমিতির একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
জনসংযোগ সংক্রান্ত প্রকাশনা : বাংলাদেশ জনসংযোগ সমিতির প্রথম জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে ১৯৭৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান শিক্ষক, বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও জনসংযোগ পেশায় বিশেষজ্ঞদের লেখা সংবলিত একটি স্মরণিকা বের করা হয়। এটি সর্বত্র ব্যাপকভাবে পশংসিত হয়েছিল। জনসংযোগ বিষয়ে কোনো সংকলন বা প্রকাশনা এটিই প্রথম।
শুধু প্রথম জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষেই নয়, প্রায় প্রতিটি জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে বিপিআরএ একটি করে স্মরণিকা প্রকাশ করে আসছে। সেগুলোতে দেশ-বিদেশের জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের উন্নতমানের লেখা স্থান পেয়ে থাকে। ১৯৯৩ সালে সমিতির একটি প্রতিনিধি দলের ভারত সফর উপলক্ষে একটি বিশেষ স্মরণিকা প্রকাশ করা হয় যা সর্ব মহলের প্রশংসালাভ করে। এসব স্মরণিকা জনসংযোগবিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চাহিদা পূরণ করে থাকে।
আন্তর্জাতিক জনসংযোগ সমিতি ও বাংলাদেশ : এক সময় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক জনসংযোগ সমিতির সদস্য ছিল। এর সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ ৪টি বিশ্ব কংগ্রেসেও যোগদান করে। এগুলো হচ্ছে ১৯৮২ সালে ভারতের বোম্বেতে অনুষ্ঠিত নবম বিশ্ব কংগ্রেস, ১৯৮৫ সালে নেদারল্যান্ডের আমস্টার্ডামে দশম বিশ্ব কংগ্রেস, ১৯৮৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত একাদশ বিশ্ব কংগ্রেস এবং ১৯৯১ সালে কানাডার টরেন্টোতে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ বিশ্ব কংগ্রেস। ভারতে ১০ সদস্য, নেদারল্যান্ডে ৪ সদস্য, অস্টেলিয়ায় ৪ সদস্য এবং কানাডায় ৩ সদস্যের প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণ করে।

বাংলাদেশে জনসংযোগ শিক্ষা : বাংলাদেশে প্রধান প্রধান পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় এবং বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসংযোগ বিষয়টি পাঠ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত আছে। এ ক্ষেত্রে অগ্রপথিক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করা যায়। ষাটের দশক থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জনসংযোগ বিষয়ে পাঠদান করে আসছে। এভাবে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত পেশাদার জনসংযোগবিদ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশে জনসংযোগ শিক্ষার পথিকৃৎরা হলেন অধ্যাপক আতিকুজ্জামান খান, অধ্যাপক কিউ এ আই এম নুরুদ্দিন, অধ্যাপক শাখাওয়াত আলী খান, অধ্যাপক ড. এম তৌহিদুল আনোয়ার, অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান, অধ্যাপক ড. সিতারা পারভীন, অধ্যাপক ড. আহাদুজ্জামান এম আলী প্রমুখ।
খ্যাতিমান অধ্যাপক কিউ এ আই এম নুরুদ্দিন দীর্ঘ তিন দশক ধরে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে গণযোযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এমএ শেষ বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের জনসংযোগ বিষয়ে পাঠদান করে গেছেন। সৃষ্টি করেছেন জনসংযোগ পেশায় শিক্ষিত পেশাদার জনসংযোগবিদ। জনসংযোগ শিক্ষার আর এক পথিকৃৎ অধ্যাপক ড. শাখাওয়াত আলী খান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চার দশক ধরে জনসংযোগ বিষয়ে পাঠদান করে যাচ্ছেন। অধ্যাপক ড. গোলাম রহমানও চার দশক ধরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসংযোগ বিষয়ে পাঠদান করে যাচ্ছেন। তবে বাংলা ভাষায় লিখিত পাঠ্য পুস্তকের অভাবের কারণে এ বিষয়ে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
জনসংযোগ বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান : বাংলাদেশে সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে চাকরি-পূর্ব ও চাকরিকালীন প্রশিক্ষণের সুযোগ তেমন নেই। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট ও জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট সরকারি সংস্থা হিসেবে জনসংযোগ বিষয়ে মাঝে মাঝে কোর্স পরিচালনা করে থাকে। এখন পর্যন্ত দেশে আলাদা কোনো জনসংযোগ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। বেসরকারি সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম এন্ড ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া অনিয়মিতভাবে জনসংযোগের ওপর কোর্স পরিচালনা করে থাকে। জনসংযোগবিদদের জন্য বিদেশে প্রশিক্ষণের তেমন সুযোগ নেই বললেই চলে।
জনসংযোগ পেশার কতিপয় সমস্যা : বাংলাদেশে জনসংযোগ এখনো বিকাশমান পেশা হিসেবেই অগ্রসর হচ্ছে। তাই এক্ষেত্রে কিছু সমস্যার বিদ্যমানতা রয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় কোনো সংস্থায়ই সুস্পষ্ট জনসংযোগ বা যোগাযোগ নীতিমালা নেই। ব্যবস্থাপনার ভুলের কারণে সৃষ্ট বিপর্যয় রোধে তাৎক্ষণিকভাবে জনসংযোগের ব্যবহার করা হয়। এটাকে বলা যায় Fire Alarm Approach. যেমন আগুন লাগার পর ফায়ার ব্রিগেডকে ডাকা হয়। ভুল সংশোধনের জন্য নয় বরং ভুল যাতে না হয় সেজন্য জনসংযোগ বিভাগের পরামর্শ নিতে হবে।
বাংলাদেশে জনসংযোগ পেশায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সাধারণত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, প্রকাশিত সংবাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা, সংশোধনী ও প্রতিবাদলিপির লেখক মনে করা হয়। এসব কাজের প্রয়োজনেই শুধু তাদের ডাকা হয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সভায় তাদের ডাকা হয় না। আর ডাকা হলেও কথা বলার সুযোগ থাকে না। অথচ তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষায়, ভাবমূর্তি নির্মাণে ও জন আস্থা অর্জনে শীর্ষ ব্যবস্থাপনাকে মূল্যবান পরামর্শ দিতে পারেন।
কখনো কখনো জনসংযোগ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন ও সাংবাদিকতায় অনভিজ্ঞ লোকজন চাকরি পেয়ে যায়। তারা জনসংযোগ কাজে ব্যর্থতার পরিচয় দেন এবং কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হয়ে পড়েন। তিনি কর্তৃপক্ষের ধমক খেয়ে খেয়ে অথবা ভুল করতে করতে জনসংযোগ পেশা আয়ত্তে আনার চেষ্টা করেন। এভাবে তারা এ পেশার মর্যাদাকে নিচু পর্যায়ে নিয়ে আসেন। তবে একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সনদপত্র মেধার বিকল্প হতে পারে না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, মেধা, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং ব্যাপক অধ্যয়ন জনসংযোগ পেশার জন্য অপরিহার্য।
কতিপয় সুপারিশ : বাংলাদেশে জনসংযোগ পেশা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তা থেকে উত্তরণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, বিভাগ ও সংস্থাকে উদ্যোগী ভ‚মিকা নিতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানে অবশ্যই সুসংজ্ঞায়িত এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন জনসংযোগ ও প্রচার নীতিমালা থাকতে হবে। যার লক্ষ্য হবে সংস্থার উদ্দেশ্য ও নীতিমালা এবং সাফল্য ও ভালো কাজ জনসমক্ষে তুলে ধরা।

জনসংযোগ কর্মকর্তাকে দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ দিতে হবে এবং দিতে হবে পর্যাপ্ত স্বাধীনতা। ইন্টারনেট সুবিধাসহ কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ব্যবহারের প্রাধিকার, যানবাহন, প্রয়োজনীয় বাজেট, ওয়েবসাইট ইত্যাদি থাকতে হবে।
ভাবমূর্তি বা সুনাম বৃদ্ধির জন্য একতরফা যোগাযোগ করলেই চলবে না। জনমত জানতে হবে এবং তাদের ঋববফ নধপশ নিতে হবে। এখানেই প্রয়োজন জনমত জরিপ ও গবেষণা। নিয়োগ দিতে হবে দক্ষ, যোগ্য, মেধাবী ও এ পেশায় আগ্রহী ব্যক্তিদের যারা ৯টা-৫টা অফিস সময়ের বাইরেও ২৪ ঘণ্টা কাজ করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবেন। জনসংযোগ কর্মকর্তাকে কোনো সত্য লুকানোর কাজে ব্যবহার না করে সততা, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা