আজব ফুলের কিসসা

আগের সংবাদ

একটি লাল টুকটুকে গাড়ি

পরের সংবাদ

চিহ্ন?

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ৯:২৭ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ৯:২৭ অপরাহ্ণ

অনলাইন প্রতিবেদক

এই মধ্যবয়সে এসে আকস্মিক এক দুঃসংবাদে কায়েস মাহমুদের সাজানো-গোছানো জীবন তছনছ হয়ে গেল। এতদিন বিরামহীন ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি। সেই যে কতকাল আগে, কী এক নেশায় তার দৌড়ের জীবন শুরু হয়েছিল, তারপর থেকে আর পেছন ফিরে তাকানোর অবসর মেলেনি। গ্রাম থেকে শহর, মফস্বল থেকে রাজধানী, দেশ থেকে বিদেশ, এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশ- এইরকম অবিরাম ছুটে চলা! কতকিছু ঘটে গেছে এর মধ্যে- সবার জীবনেই যেমনটি ঘটে আর কি- কত ঘটনা-দুর্ঘটনা, কত বিপদ-বিপর্যয়, কত মৃত্যু! কোনোকিছুতেই ভেঙে পড়েননি তিনি, থমকে দাঁড়াননি, এমনকি বিভিন্ন ঘটনায় যথার্থ সাড়াও দেননি। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে যে-রকম আচরণ তার কাছে প্রত্যাশিত ছিল, বা যা-কিছু তার করা উচিত ছিল, তিনি তার কিছুই করেননি। যেমন বাবার মৃত্যু কিংবা মায়ের মৃত্যুর কথা বলা যায়! বাবা না-হয় হঠাৎ চলে গেছেন, ইচ্ছে থাকলেও বিদেশ থেকে ফিরে শেষবারের মতো বাবাকে দেখা সম্ভব হতো না তার পক্ষে। কিন্তু এরপরও বহু বছর তিনি দেশে ফেরেননি। একটা মৃত্যু মানে তো একটা বিপর্যয়, অন্তত ওই পরিবারের জন্য- তখন পরিবারের সদস্যরা একে অপরের কাছে আশ্রয় খোঁজে, মমতা ও ভালোবাসা খোঁজে, নির্ভরতা খোঁজে। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে কায়েসের কাছেও সেটিই প্রত্যাশিত ছিল সবার, কিন্তু নিয়মিত টাকার জোগান দিয়ে গেলেও তার দেখা মেলেনি। শুধু তাই নয়, মা যখন মৃত্যুশয্যায়, বারবার দেখতে চাইতেন কায়েসকে, তখনও ‘সময় পাচ্ছি না’ অজুহাতে তিনি আসেননি। এসব বিষয়কে তিনি ভাবাবেগ বলেই গণ্য করতেন এবং ভাবাবেগকে প্রশ্রয় দেয়াকে অর্থহীন বলেই বিবেচনা করতেন। তার এই অনুপস্থিতি সবার কাছে যতই নিষ্ঠুরতা বলে মনে হোক না কেন, তিনি নিজে মনে করতেন- ভুল কিছু করছেন না! কিন্তু এখন, এই মধ্যবয়সে এসে, তিনি নিজেই যখন বিপর্যয়কর পরিণতির মুখোমুখি- ঘাতক ব্যাধি এসে বাসা বেঁধেছে শরীরে এবং ব্যাপারটি প্রাথমিক পর্যায়েও নেই, বরং নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে- তখন কেবলই পেছনে ফিরে তাকানো, কেবলই হিসেব মেলানোর চেষ্টা! বাংলাদেশের এক অন্ধকার অজপাড়াগাঁর স্কুল-শিক্ষক পিতার দরিদ্র ঘরদোর থেকে ইউরোপের এক আলো ঝলমলে গর্জিয়াস শহরে নয়নাভিরাম বাড়ি-গাড়ি-প্রাচুর্য- এর সবকিছুকেই একসময় সাফল্য বলে ভাবতে ভালো লাগলেও এখন মনে হচ্ছে অর্থহীন! সাফল্য মনে হতো, কারণ, এ সবকিছু তার নিজের চেষ্টায় করা, কারো সহযোগিতা তিনি নেননি কখনো কারো কাছ থেকে। জন্মসূত্রে কেবল অসাধারণ মেধাটুকু পেয়েছিলেন তিনি, আর সেটাকেই পুরোদমে কাজে লাগিয়েছেন সারাটি জীবন ধরে। তার বাবা হাইস্কুলের শিক্ষক হিসেবে গ্রামের মানুষদের কাছে সম্মান পেতেন বটে, কিন্তু সম্পদ বলতে কিছু ছিল না। বাইরে মধ্যবিত্ত জীবনের ভড়ং ধরে থাকতে হতো, কিন্তু সংসারে ছিল টানাটানি, সোজা কথায় নিম্নবিত্তের সংসার। মায়ের নিপুণ হাতে শাকপাতাটিও অতি সুস্বাদু হয়ে উঠতো, আর ওটিই ছিল ওই টানাটানির সংসারে একমাত্র আনন্দ। কায়েস সাহেব ওই দুর্দশাগ্রস্ত জীবনকে ভালোবাসতে পারেননি কখনো, বরং ঘৃণাই করেছেন। গ্রামের স্কুল থেকেই চমক লাগানো ফলাফল, তারপর ঢাকা কলেজের মতো নামজাদা কলেজে শিক্ষাজীবন শেষে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্বিত শিক্ষার্থী। তার নজর ছিল সর্বদাই ওপরের দিকে। ঢাকায় আসার পর বাবার কাছ থেকে একটা টাকাও নেননি তিনি কখনও। টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন, কখনো-বা মায়ের হাতে দু-চারশ’ টাকা দেবার বিলাসিতাও দেখিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে বেশি দেরি করতে হয়নি তার। দুর্দান্ত সব একাডেমিক রেজাল্ট থাকায় নামজাদা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আর্থিক সুবিধাসহ ভর্তির আবেদনপত্রগুলো ফেরত আসেনি। প্রায় সবগুলো থেকেই তিনি ইতিবাচক সাড়া পেয়েছিলেন। আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে কিছুদিন সেখানেই ছিলেন তিনি, তারপর ‘বেটার অপরচ্যুনিটি’র খপ্পরে পড়ে ইউরোপ। সেখানে তিনি ভালো সুযোগ পেয়েছেন বটে, কিন্তু তারচেয়ে বড়ো কথা- সুযোগ তৈরি করে নিয়েছেন, চোখ-কান খোলা রেখে সুবিধামতো সময় ও পরিস্থিতিতে সুযোগগুলো আদায় করে নিয়েছেন! ব্যস্ত থাকতে হয়েছে এজন্য, বলাই বাহুল্য। নিজেকে যোগ্যতার প্রমাণ না করতে পারলে ওখানে সুযোগ আদায় করে নেয়া কঠিন। আর যোগ্যতা প্রমাণের জন্য শুধু মেধায় কাজ হয় না, শারীরিক উপস্থিতি এবং পরিশ্রমেরও প্রয়োজন পড়ে। এতসব-কিছু করতে গিয়ে তার পেছনে ফিরে তাকাবার সময় হয়নি এবং এ নিয়ে তার কোনো অনুশোচনাও ছিল না। এর মধ্যে মা-বাবা তো গেছেনই, আকস্মিকভাবে বড় বোনটাও চলে গেছে অকালে। যতদিন মা-বাবা ছিলেন, ততদিন নিয়ম করে তাঁদের জন্য টাকা পাঠাতেন তিনি। পরিমাণে সেটা অল্প নয়, অন্তত তাদের নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য তো নয়ই, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতেও নয়। সত্যি বলতে কি, মা-বাবা কখনো এত টাকা একসঙ্গে চোখেই দেখেননি। তাঁদের মৃত্যুর পরও কেউ কোনো প্রয়োজনের কথা জানালে তিনি সেটা পূরণ করেছেন। খুব মায়া-মমতা থেকে যে কাজগুলো করেছেন তিনি, তা নয়। এমনকি, খুব একটা দায়িত্ববোধ থেকেও করেননি। এসব ব্যাপারে তিনি নিজের কাছে পরিষ্কার। কাজগুলো তিনি করেছেন ওপরওয়ালাকে খুশি করার অভিপ্রায়ে। ওপরওয়ালার প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস ও আস্থা। তিনি মনে করেন- তাঁর ইচ্ছা ছাড়া ওই গ-গ্রাম থেকে এই এতদূর আসা তার পক্ষে সম্ভব হতো না। অবশ্য ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানগুলো তার পক্ষে পালন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। নামাজ-রোজা-হজ-জাকাতের মতো আবশ্যকীয় পালনীয় কর্তব্যগুলো করতে পারেন না বলে তিনি খানিকটা অপরাধবোধেই ভোগেন, আর সেজন্যই অসহায়-দরিদ্র আত্মীয়-স্বজনকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে সেই অপরাধের ভার কমাতে চেয়েছেন। নিজে উপস্থিত থেকে এসব করতে হবে- এমন কোনো নিয়ম যেহেতু নেই, তিনিও তাই দেশে আসার প্রয়োজন বোধ করেননি!

কিন্তু এই এতদিন পর, শরীরে ঘাতকব্যাধির তীব্র-শানিত আক্রমণে জর্জরিত হয়ে তার মনে হলো- জীবনের শেষ দিনগুলো দেশে গিয়েই কাটাই, তারপর ঘুমিয়ে পড়ি প্রিয় দেশের কোমল-মায়াময় মাটির গভীরে। এই ধরনের ভাবনা তার জন্য ভাবালুতা মাত্র, কিন্তু পরিস্থিতি তাকে যুক্তি-বুদ্ধির ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে, ফলে তার একবারও মনে হয়নি- এভাবে ফেরা যায় না, ফেরা খুব কঠিন! জীবনের দীর্ঘ একটি সময় বিদেশে কাটিয়ে আচমকা দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত এত সহজে নেয়া যায় না! কারণ, ছেলেমেয়েরা জন্মের পর থেকে ‘দেশ’ দেখেনি, শুধু নাম শুনেছে; এমনকি বাবা-মায়ের ভাষাটিও তারা এতদিনে ভুলতে বসেছে। স্বভাবতই দেশ নিয়ে তাদের কোনো আবেগ নেই। তারা সেখানেই জন্মেছে, বড় হয়ে উঠেছে- তাদের কাছে ‘দেশ’ শব্দটি ভিন্ন অর্থ নিয়ে ধরা দেয়! বাংলাদেশ তাদের কাছে এখন বাবা-মা’র দেশ, নিজেদের নয়! এমনকি তার স্ত্রীও এই সিদ্ধান্তকে নিছক পাগলামি হিসেবেই গণ্য করেছে! কিন্তু তিনি অদম্য; স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের আপত্তি-আবদার-দাবিদাওয়া-কান্নাকাটি, কোনোকিছুই তাকে ফেরাতে পারেনি!
কায়েস মাহমুদের দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত তার ভাইবোনদের এবং তাদের ছেলেমেয়েদের- যাদের অনেককেই সে দেখেইনি- যথেষ্ট অবাক করলো! তার ভাস্তে-ভাস্তি-ভাগ্নে-ভাগ্নিরা- যারা কখনো দেখেনি তাকে, কেবল গল্প শুনে শুনে বড়ো হয়েছে- আনন্দিত হলো খুব, উত্তেজনায়ও ভুগতে লাগলো সবাই। আনন্দিত হলো ভাইবোনেরাও, কিন্তু দুশ্চিন্তাও ভর করলো তাদের মনে। ভাইজান- তারা তাকেই এই সম্বোধনেই ডাকে- যদি বেড়াতে আসতো, তাহলে শুধু আনন্দটুকু থাকতো, দুশ্চিন্তাটা নয়! এখন দুটোই কাজ করছে, কারণ ভাইজান আসছেন স্থায়ীভাবে থাকার জন্য, অথচ সঙ্গে ভাবি-বাচ্চারা কেউ আসছে না! তাহলে এসে কোথায় থাকবেন? মা-বাবা তো নেই যে, তাদের সঙ্গে থাকবেন। আর ভাইবোনরা যার-যার মতো সংসার পেতেছে, সবাই যে-যার মতো প্রতিষ্ঠিত, জীবন-জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত! সেই জীবনে সুখ ও আনন্দ যেমন আছে, সংকট ও বেদনাও কম নেই। সেখানে নতুন একজন মানুষের দায়দায়িত্ব স্থায়ীভাবে গ্রহণ করা কঠিন। বিশেষ করে সেই মানুষটি যদি হয় আপন হয়েও বেশ খানিকটা অচেনা, তার জীবন-যাপনের ধরন সম্বন্ধে যদি কিছুই জানা না থাকে- কী পছন্দ করে সে, অপছন্দই বা কী, কী খেতে ভালোবাসে, কী খেতে পছন্দ করে না; ঘুমানোর জন্য কেমন বিছানা তার প্রয়োজন, ক’টা বালিশ লাগে, সেগুলো নরম না শক্ত হতে হবে; গরম বেশি লাগে না কম, শুধু ফ্যানে চলবে নাকি এসিও লাগবে; মশার উৎপাত এড়াতে মশারি টানাতে হবে, না ¯েপ্র করে ঘর পরিষ্কার করতে হবে- ইত্যাকার নানাবিধ ভাবনা যখন তাদের ঘিরে ধরে তখন দায়িত্ব নেয়াটা ভীষণ জটিল একটা কাজ বলে মনে হয়! অথচ তারা অনুভব করতে পারছে- দায়িত্ব কাউকে-না-কাউকে নিতেই হবে। তারা চার ভাইবোন। ভাইদের মধ্যে কায়েসই বড়, তবে তার বড় আরো এক বোন ছিল, অকালে চলে গেছে সে। আরেকটি বোন আছে, মায়া, সে-ই দায়িত্বটা নিতে রাজি হলো। তার পক্ষে সেটা সহজও। সচ্ছল পরিবারের বউ সে, ঢাকায় বড়োসড়ো বাড়ি, সেখানে সহজেই একটা রুম ভাইয়ের জন্য ছেড়ে দেয়া যায়! দেখাই যাক না, কী হয়! এমন তো আর না যে, গরিব ভাইকে টানতে হচ্ছে! বরং এরকম বড় ভাই গৌরবই বাড়ায়! তাছাড়া, ভাইজান নিজেই হয়তো ব্যাপারটা নিয়ে ভাববেন। তখন তিনি যা ভালো মনে করেন, সেটাই করবেন।

২.
কায়েস মাহমুদ এসে উঠলেন মায়ার বাসাতেই। বিষয়টা নিয়ে যে তিনি ভাবেননি, তা নয়, কিন্তু এটা নিয়ে ভাইবোনের সঙ্গে ফেরার আগেই আলাপ করতে চাননি। ভেবেছেন- দেখা যাক, ওরা কী করে! পরে পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেয়া যাবে। মায়ার বাসায় উঠে খুশিই হলেন তিনি। ভগ্নিপতি এখন বেশ প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী, পৈতৃক সূত্রে পাওয়া এই জমিতে চমৎকার একটা বাড়ি করেছে। অভাব-দারিদ্র্য যে নেই, দেখলেই বোঝা যায়! সেটা থাকলে কায়েস বিব্রত হতেন, অস্বস্তিও বোধ করতেন, তিনি তো সারাজীবন ওগুলোকে ঘৃণাই করে এসেছেন। শুধু মায়াই নয়, শাহেদকে দেখেও তার ভালো লাগলো। সরকারি কর্মকর্তা সে, বিসিএস-এ ভালো করেছিল- সে খবর তিনি বিদেশে বসেই পেয়েছিলেন, এখন একটা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব। ইস্কাটনে তার সুন্দর সাজানো-গোছানো সরকারি বাসাটি দেখে মুগ্ধ হলেন কায়েস। বড় আপা অসময়ে চলে গেল, কিন্তু যাবার আগে একটা বড়ো স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদ পেয়েছিল। দুলাভাইও তার কলেজ-শিক্ষকতা পেশার শীর্ষেই উঠেছিলেন। অবসর নেয়ার আগে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। তাদের দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে বড়টা ছেলে- বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছে, চেষ্টা করছে উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে যাবার। মেয়েটা এখন ডাক্তারি পড়ছে। কায়েসের মনে হলো- তাদের পরিবারটিকে যে-কেউ এখন একটা প্রতিষ্ঠিত পরিবারই বলবে। বাবা দেখে যেতে পারেননি সন্তানদের এই প্রতিষ্ঠা, কিন্তু মা নিশ্চয়ই দেখে গিয়েছিলেন! কায়েসের আনন্দ হলো, গভীর আনন্দ। তার অনুপস্থিতিতেই ভাইবোনগুলো কী সুন্দর দাঁড়িয়ে গেছে!
এসব দেখে-শুনেই কয়েকদিন চলে গেল। ভাইবোনদের বাসায় বেড়িয়ে, ভাস্তে-ভাস্তি-ভাগ্নে-ভাগ্নিদের সঙ্গে মজার মজার গল্প করে বেশ উপভোগ্য সময় কাটছে তার! চিরকাল ছুটে চলার পর এই আনন্দময় অনন্ত অবসর বেশ চমৎকার লাগছে! যদিও এই প্রথমবারের মতো বাবা-মা আর আপার অনুপস্থিতি তীব্র হয়ে বুকে বাজছে, গভীর এক শূন্যতা তার বুকে হাহাকার তুলছে, তবে কাউকে বুঝতে দিচ্ছেন না। তার সখ্য ছিল আপার সঙ্গেই। আপা থাকলে হয়তো গল্পের ঝাঁপি, স্মৃতির ঝাঁপি সব খুলে বসা যেত। ছোট ভাইবোনগুলোর সঙ্গে তার একটু দূরত্ব ছিল আগে থেকেই, এখনও সেটা রয়ে গেছে বা আরো বেড়েছে- মন খুলে কথা বলার কেউ নেই আর। ফলে এ ক’দিনে সে ওইসব মৃত্যুর প্রসঙ্গ একবারও তুললো না- যেন ওগুলো কথা বলার মতো কোনো বিষয়ই নয়। ভাইবোনেরা তাতে অবাক হলো, তাদের ধারণা ছিল- ভাইজান ফিরে এসে যখন সব দেখবে, তখন ঠিকই ভেঙে পড়বে। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখা গেল না বলে তারা বিস্মিত হয়ে ভাবলো- ভাইজান কি তবে অনুভূতিশূন্য হয়ে গেছে? না, আচার-আচরণে তো তেমন মনে হচ্ছে না! আসলে তারা তাদের ভাইটিকে বুঝতেই পারছে না। পারবে কীভাবে, কায়েসই তো বুঝতে দিচ্ছেন না। খুব কৌশলে তিনি ঢেকে রেখেছেন তার সব মর্মবেদনা। নইলে, এত যে বাড়ির কথা মনে পড়ছে, বাড়িতে যেতে মন চাইছে, অথচ সেখানে যাওয়ার কোনো উপায় নেই, সেটি এখন পদ্মার অতল গর্ভে- এই করুণ-অভাবনীয় বেদনাটিও তিনি লুকিয়ে রাখতেন না! কয়েকদিন পর অবশ্য তিনি শাহেদকে জিজ্ঞেস করলেন- নতুন বাড়িটা কোথায় করেছিস?
মানিকগঞ্জেই।
মানিকগঞ্জের কোথায়?
তরা ব্রিজের কাছেই। যাবে তুমি ভাইজান?
হ্যাঁ, যাবো তো অবশ্যই। দ্যাখ না, সবাই মিলে একসঙ্গে যাওয়া যায় কি না!
হ্যাঁ, যাবে না কেন?
সবাই তো ব্যস্ত!
তাতে কী? ছুটির দিনে যাবো।
ঠিক আছে, তাহলে সবার সঙ্গে কথা বলে দিন ঠিক করে ফ্যাল।
সামনের শুক্রবারের যাবো ভাইজান। আমি সব ব্যবস্থা করছি।

৩.
নতুন বাড়িতে গিয়ে তার মন খারাপ হয়ে গেল। যদিও এ বাড়িটি খুবই সুন্দর করে তৈরি করা, একবারে ছবির মতো- বাগান-টাগান, ফুল-ফলের গাছ, নানারকম সবজির সমারোহ, দেশি হাঁস-মুরগির অবাধ বিচরণ, আর আধুনিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধাসহ একটা চমৎকার বিল্ডিং- তবু তার মন ভরলো না। মনে হলো- এ বাড়িটি আগের বাড়ির মতো হয়নি। বললো- এত ছোট জায়গায় বাড়ি করেছিস কেন?
ছোট কোথায় ভাইজান? সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই বিঘার মতো জায়গা!
আর আমাদের আগের বাড়িটা?
সেটা তো অন্য ব্যাপার। ছ-সাত বিঘা তো হবেই।
তাহলে? আরেকটু বড় জায়গা নিলি না কেন?
এখানে একদাগে এরচেয়ে বড় জায়গা আর পাওয়া যায়নি তখন।
তাহলে অন্য কোথাও খুঁজলেই পারতি!
সেটা করলাম না কারণ, আমাদের ওই গ্রাম ভেঙে যাওয়ার পর আমাদের চেনাজানা অনেক লোকই এখানে এসে বাড়ি করেছে। আমাদের তো আর এখানে থাকা হবে না। বাড়িটা দেখবে কে? চেনাজানা মানুষ আশেপাশে থাকলে সুবিধা হবে ভেবে…
হুম। সেটা ঠিকই বলেছিস। এখন যারা এ বাড়িতে থাকে, ওরা কারা?
ওরা আমাদের গ্রামেরই, তোমার মনে নেই বোধহয়। কেয়ারটেকার হিসেবে রেখেছি ওদের। দেখেশুনে রেখেছে।
তাহলে ভালোই হয়েছে। কিন্তু এটাকে নিজেদের বাড়ি বলে মনে হচ্ছে নারে…
তাই কি আর হয় ভাইজান? আমাদের সব স্মৃতি তো ওই বাড়িকে ঘিরে। ওটাই আমাদের আসল বাড়ি, আমাদের ঠিকানা। তবে বাচ্চারা কিন্তু এটাকেই নিজেদের বাড়ি বলে মনে করে। ওরা তো আগেরটি দেখেনি!
ওরা এই বাড়ি পছন্দ করে?
হ্যাঁ, খুব পছন্দ করে! এখানে আসার জন্য পাগল হয়ে থাকে। একসঙ্গে এলে কত যে মজা করে! আমরা ছোটবেলায় যেমন করতাম তেমনই। দেখছো না, এই রোদের মধ্যে কী রকম হৈ চৈ করে খেলছে!
হ্যাঁ তাই তো- সে দেখলো- বাচ্চারা কেউ ঘরে নেই। এসেই নেমে পড়েছে খেলাধুলায়। খুব ব্যস্ত এবং আনন্দিত। উচ্চকণ্ঠে হুল্লোড় করছে, সবার চোখেমুখে হাসি আর আনন্দ- এই অমলিন আনন্দমুখরতার সঙ্গে কতদিন তার দেখা হয় না! নিজের ছেলেমেয়ের জন্যও একটু মন খারাপ হলো তার- এই দেশ, এই সবুজ, এই নদী আর এই নির্মল আনন্দের সঙ্গে পরিচয়ই হলো না ওদের। দোষটা আমারই- তিনি ভাবলেন- পরিচয় করিয়ে দেয়ার দায়িত্বটা তো আমারই ছিল, আমি তা করিনি।

এই আত্মপীড়নে তিনি ভুগছেন আসার পর থেকেই। শুধু নিজের সন্তানদের জন্য নয়- ভাই-বোন, মা-বাবার জন্য। তার উপস্থিতিটা যে সবার কাম্য ছিল এবং তার উপস্থিত থাকাটা উচিতও ছিল- এই অনুভূতিটা যেন এতদিনে পূর্ণভাবে তার অনুভবের ভেতরে ধরা দিয়েছে। মর্মবেদনা চেপে রাখছেন তিনি, কাউকে কিছু বলছেন না, কেউ হয়তো কিছু বুঝতেও পারছে না। এমনকি, এই বাড়িতে এসে মা-বাবা এবং আপার কবরের পাশে যাবার মতো সাহসও হচ্ছে না তার- ভেঙে পড়ার সম্ভাব্য ভয়ে, সেটিও বুঝতে দিচ্ছেন না কাউকে। তাদের পরিবারে একটা রীতি ছিল- মৃতদের পারিবারিক গোরস্তানে কবর দেয়া। এরাও সেটাই অনুসরণ করছে।
অনেকটা সময় নিয়ে, নিজেকে খানিকটা দৃঢ় ও প্রস্তুত করে, বাড়ির এক কোণে পাশাপাশি অনন্ত-ঘুমে শুয়ে থাকা মা-বাবা আর আপার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি! নিজেকে প্রস্তুত করে এসেছেন, তবু মনে হলো সবকিছু ভেঙে পড়ছে, তার এতদিনকার আবেগ-প্রতিরোধী শক্ত দেয়ালটির কোনো অস্তিত্বই যেন নেই! মা বলে ডাক দিতে ইচ্ছে করলো তার, ইচ্ছে হলো বলতে- ‘মা আমি এসেছি!’- পারলেন না। বরং প্রায় ফিসফিস করে, যেমন করে ছোটবেলায় বাবার চোখ-কান এড়িয়ে মায়ের কানে-কানে কোনো আবদার করতেন তেমনভাবে, বললেন- ‘মা, আমিও আসছি এখানে, তোমার পাশেই ঘুমিয়ে থাকবো!’ ভেঙেচুরে আসা আবেগের ঝড় আর কান্নার স্রোত সামলে অনেকক্ষণ মায়ের কবর ছুঁয়ে বসে থাকলেন তিনি, সর্বস্ব হারানো মানুষের মতো। তারপর গিয়ে আপার কবরের পাশে বসে মাটি ছুঁলেন, চোখ ভরে উঠলো জলে, বললেন- ‘আমার সঙ্গে কথা না বলেই চলে গেলে আপা? আমি কিন্তু বেশি দেরি করিনি। চলে আসছি আপা, তোমাদের কাছেই চলে আসছি। ওপারটা কেমন আপা? আচ্ছা, আব্বার সঙ্গে তোমার দেখা হয়? দেখা হলে বলো, আমিও আসছি, খুব তাড়াতাড়িই আসছি। আমি তো কোনোদিনই আব্বার সঙ্গে সহজভাবে কথা বলার সাহস পাইনি, আজকেও পারলাম না। তুমি কিন্তু বলো আপা। বলো যে আমাকে যেন ক্ষমা করে দেন তিনি।…’
৪.
এখানে বাড়ি করার সুবিধাটা তিনি টের পেলেন কিছুক্ষণ পরই। তাদের আসার খবর পেয়ে এমন অনেকেই দেখা করতে এলো যাদের বাড়ি একসময় তাদের গ্রামেই ছিল। পদ্মার গ্রাসে সর্বস্ব হারানোর পর এখানে এসে মাথা গুঁজেছে। সবাই পারেনি, বলাইবাহুল্য। এখানকার জমির দাম বেশি, যারা একটু সচ্ছল ছিল শুধু তারাই এখানে জমি কিনে বাড়ি করতে পেরেছে। নিম্নবিত্তের মানুষগুলো কে-কোথায় ছিটকে পড়েছে, কেউ জানে না।
যারা এসেছে, কায়েস তাদের সবাইকে চিনতে পারলেন না। চিনবেন কীভাবে! প্রায় তিরিশ বছরের দীর্ঘ বিচ্ছেদ। যারা তখন ছোট ছিল, তারা এখন মধ্যবয়স্ক। যারা মধ্যবয়স্ক ছিল তারা বুড়ো হয়ে গেছে। অবশ্য এই লোকগুলোর সবাই তাকে চিনলো, বিশেষ করে বয়স্করা। তিনিও চিনলেন বয়স্কদের কাউকে কাউকে। কত কথা মনে পড়ে গেল! উদাসপুর নামের সেই মায়াময় গ্রামটিতে একই পরিবারের সদস্যদের মতো মিলেমিশে বাস করতেন তারা। বড়ো সম্প্রীতির গ্রাম ছিল সেটা। খুনোখুনি-মারামরি দূরের কথা, বড় ধরনের ঝগড়াঝাঁটিও হতো না। ছোটখাটো মনোমালিন্য হলেও সেটা কখনো শত্রুতার পর্যায়ে পৌঁছতো না। বাবাকে সবাই খুব শ্রদ্ধা করতো, ভালোবাসতো। যে-কোনো ব্যাপারে পরামর্শ নিতে আসতো, মহিলারা আসতো মায়ের কাছে তাদের সুখ-দুঃখের কথা বলতে! একজন স্কুল-শিক্ষকের যে সম্মান ও মর্যাদা ছিল তখন, এখন বোধহয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও সেটা পান না! তাদের গ্রামের সমাজ-জীবনটা আসলে প্রিমিটিভ-টাইপ ছিল! নইলে এরকম হবার কথা নয়! সমাজ যত আধুনিক হয়, ততই মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতা বাড়ে, অন্যকে সম্মান করার বদলে নিজেকে সম্মানিত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রতিযোগিতা বাড়ে। পিছিয়ে পড়া প্রায় আদিম সমাজ আর আধুনিকতার শীর্ষ ছুঁয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়া বিচ্ছিন্ন সমাজ- এই দুই ধরনের সমাজই তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন এবং দুটোর ভেতরেই জীবন-যাপন করেছেন বলে সহজেই তুলনাটা করতে পারলেন।
কায়েস অনেকক্ষণ ধরে কথা বললেন লোকগুলোর সঙ্গে। যাদেরকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন, তাদের কথাও মনে পড়ে গেল কথা বলতে বলতে। মনে হলো, স্মৃতি কিছুই ফেলে দেয়নি, সযতেœ তুলে রেখেছে বুকের গোপন কোটরে। এখন ডাক শুনে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। হয়তো এই দরজা-খোলা স্মৃতির ধাক্কাতেই কোরবান ভাইয়ের কথা মনে পড়লো তার, বহুদিন পর, তীব্রভাবে। তাদের বাড়িতে একসময় রাখাল ছিল এই কোরবান ভাই। বয়সে তারচেয়ে দশ/বারো বছরের বড়ো। তার ছোটবেলার অনেক উদ্ভট-অসম্ভব আবদার মিটিয়েছে লোকটা। কোরবান ভাইয়ের কথা মনে পড়তেই ছোটবেলার প্রায় মুছে যেতে থাকা স্মৃতিগুলো হুড়মুড় করে এসে দাঁড়ালো সামনে। কাকে ছেড়ে কাকে নেবেন তিনি? পদ্মা-তীরবর্তী গ্রাম ছিল বলে বর্ষায় পাড় উপচে উদাসপুরকে ভাসিয়ে দিতো পদ্মার জল। মাঠ-ঘাট ডুবে যেত। তখন পুরো গ্রামই পানির নিচে! কী যে অবর্ণনীয় রূপ ছিল সেই থৈ থৈ বর্ষার! ভেনিস কি সেই গ্রামের চেয়ে বেশি সুন্দর? নয় তো! সেই পানিতে মাছ ধরা, শাপলা-শালুক তোলা, নৌকা বাওয়া, যখন-তখন পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়া- কত যে স্মৃতি! তিনি প্রায় কাহিল হয়ে পড়লেন স্মৃতির ধাক্কাধাক্কিতে। বাদশাহ ভাই জানতে পারে ভেবে তিনি কোরবান ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করলেন তার কাছে, কিন্তু তিনি কিছু বলতে পারলেন না। বললেন- বাড়ি ভাঙার পর আর তার সাথে দেখা হয়নি। কোথায় যে বাড়ি করেছে বলতে পারবেন না। অবশ্য বাদশাহ ভাই না পারলেও হায়াত ভাই বললেন- কোরবান তো খাবাশপুর বাড়ি করছে। একটা কামে ওই দিকে গেছিলাম। দেখা হইছিল, তখন জিগাইছিলাম।
খাবাশপুরে কোন জায়গাটায়?
তা কইতে পারুম না! বাড়িতে যাই নাই তো!
গেলে খুঁইজা পাওয়া যাইবো না?
যাইবো না ক্যান? বাড়ি যখন আছে, তখন মানুষও খুঁইজা পাওয়া যাইবো।
কথাটা তাকে খুব স্পর্শ করলো। হ্যাঁ, তাইতো! বাড়ি মানে অ্যাড্রেস ও আইডেন্টিটি। বাড়ি মানে শেকড়। তাদের সেই শেকড়টাকে গিলে খেয়েছে পদ্মা। ইচ্ছে করলেও সেখানে ফেরার উপায় নেই। ওপরওয়ালাকে জীবনে এই প্রথমবারের মতো অবিবেচক ও নিষ্ঠুর বলে মনে হলো তার! নইলে কি আর এভাবে শেকড় কেড়ে নেয় কেউ?
সে ঢাকায় ফিরলো মন ভার করে। বাড়িটা যে তার পছন্দ হয়নি, তা নয়। বড়ো যতœ করে, বড়ো সুন্দর করে সাজানো-গোছানো একটা বাড়ি করেছে তার ভাইবোনেরা। কিন্তু এ বাড়িতে তো তার কোনো স্মৃতি নেই, বাবার হাতের স্পর্শ নেই, মায়ের সংসার নেই, দাদা-দাদির কবর নেই, তাদের স্মৃতিবিজড়িত বুড়ো গাছপালা নেই। বাড়ি মানে তো শুধু কয়েকটা ঘর নয়, বাড়ি মানে তো স্মৃতি ও সম্পর্কও। নতুন এই বাড়িটার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক অনুভব করতে ব্যর্থ হলেন তিনি। মা-বাবা আর আপার কবরগুলো না থাকলে বাড়িটা আর দশটা সাধারণ বাড়ির মতোই মনে হতো তার কাছে, যার সঙ্গে নিজের কোনো সম্পর্ক নেই, যেখানে নিজের কোনো স্মৃতি নেই।
ঢাকায় ফিরে কয়েকদিন চুপচাপ বসে রইলেন তিনি। বারবার বাড়ির কথা মনে পড়ছিল তার। নতুন বাড়ি নয়, স্মৃতিময় সেই বাড়ি। সেখানে ফেরার উপায় নেই বটে, তবু কি একবার ওই অঞ্চলে ঘুরে আসা যায় না? তিনি শুনেছেন- এখন আর পদ্মা ভাঙে না, আন্ধারমানিক পর্যন্ত এসে থেমে গেছে। বাঁধ দিয়ে পদ্মার স্রোতের মুখ ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে অন্যদিকে। তার মানে তো এই- এখনও এমন অনেক কিছু আছে সেখানে, যেগুলো তারই স্মৃতির অন্তর্গত।
দুদিন পরই তিনি সেখানে যাবার জন্য নিজের ইচ্ছের কথা বলতে লাগলেন, প্রায় শিশুদের মতো বায়না ধরে। তাতে কারো আপত্তি নেই। কিন্তু তাকে একা ছাড়তে কেউ রাজি নয়, বলে- এখন সব বদলে গেছে। কিছু চিনতে পারবে না।
চিনে নেব। আমি কি ছোট আছি নাকি যে, গেলে হারিয়ে যাবো?
তা হারাবে না। কিন্তু কোথায় যাবে, কোথায় রেস্ট নেবে, কোথায় খাবে…
সাথে গাড়ি তো থাকছেই, ওখানেই রেস্ট হয়ে যাবে। খাওয়া-দাওয়াও গাড়িতেই করা যাবে। এসব নিয়ে ভাবিস না তো! আমার মন ছুটে গেছে, ঘুরে আসি। কারো একটা গাড়ি একদিনের জন্য ফ্রি করে দে।
তার আবদারের কাছে হার মানলো সবাই। আর তিনি সত্যিই একদিন একাই রওনা দিলেন। মায়া তার ড্রাইভারকে পইপই করে বুঝিয়ে দিলো, কোন দিক দিয়ে যেতে হবে, কোথায় কী করতে হবে, ভাইজানের যেন কোনো অসুবিধা না হয় ইত্যাদি।
হরিরামপুর পৌঁছতে মাত্র আড়াই ঘণ্টা লাগলো দেখে তিনি অবাক হলেন। এমনকি যে পথে ড্রাইভার নিয়ে এসেছে সেটিও তার কাছে নতুন। দেশ ছাড়ার আগে ঢাকা থেকে হরিরামপুর যেতে হলে মানিকগঞ্জের পরে তরা ব্রিজ পার হয়ে বামদিকে ঢুকে যেতে হতো। তখন হরিরামপুরের কোনো সরাসরি বাস সার্ভিস ছিল না। ঝিটকা পর্যন্ত গিয়ে সেখানে থেকে নৌকায় করে যেতে হতো। জলমগ্ন অঞ্চল, বর্ষায় পথঘাট ডুবে যেত বলে বাস চলাচলের কোনো পথই ছিল না! এতটা পথ ঘুরে তারপর আবার জলপথে আসতে ছ/সাত ঘণ্টা লেগে যেত। এবার তিনি এলেন আমিনবাজার পার হয়ে হেমায়েতপুর থেকে বামে ঢুকে সিঙ্গাইরের ভেতর দিয়ে যে পথটি এসেছে সেটি ধরে। একটা ছোট্ট নদীতে ফেরি পার হয়ে বালিরটেক পৌঁছালেন তিনি, তারপর দশ মিনিটের মধ্যে হরিরামপুর। কত বদলে গেছে সবকিছু! নতুন নতুন রাস্তাঘাট, দালানকোঠা, বিদ্যুৎ। এসবের কিছুই তিনি দেখে যাননি। বহুদিন পর ঢাকায় ফিরে শহরের চেহারা দেখে একটা বড়ো ধাক্কা খেয়েছিলেন তিনি, এবার নিজের জন্ম-অঞ্চল দেখেও ধাক্কা খেলেন। সবই বদলে গেছে, ভীষণভাবে, এমনকি তার এই অন্ধকার গ্রামটিও!
উপজেলা সদর থেকে একটু এগিয়ে পাটগ্রাম স্কুলের সামনে গিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন কায়েস মাহমুদ। এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন তিনি আজ থেকে প্রায় তিন যুগ আগে। স্কুলটার বয়স প্রায় শতবছর হতে চললো। তার মতো এই স্কুলের কত হাজার হাজার ছাত্র সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে! যেন রূপকথার মায়ের মতো স্কুলটা, তার সন্তানদের পাঠিয়েছে বিশ্বজয় করতে! স্কুলে ঢুকে এক চক্কর ঘুরে এলেন তিনি, কিন্তু কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না, তার কাছেও কেউ কিছু জানতে চাইলো না! নিজের পরিচয় দিতে ইচ্ছে করছিল না তার। দিলেও কেউ চিনতো না, কাউকে খুঁজেও লাভ নেই- তিনি বুঝতে পারছিলেন। তার সময়ের শিক্ষকরা নিশ্চয়ই এখন আর নেই, কে চিনবে? তিনি একা একাই ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। যাত্রাপুর থেকে আন্ধারমানিক পর্যন্ত চক্কর দিলেন দু-বার, তারপর পদ্মার পাড়ে গিয়ে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। শূন্য চোখে তাকিয়ে রইলেন নিজেদের বাড়ি যেদিকে ছিল সেদিকে, সেখানে এখন অথৈ জল। পদ্মার সেই রাগি-ভয়ঙ্কর রূপ আর নেই। ভাঙন থেমেছে, চর জেগেছে- আগের সেই সমুদ্রের মতো ধু-ধু পদ্মার সঙ্গে এই শান্তশিষ্ট পদ্মাকে মেলানোই যায় না! সারা বিকেল তিনি ঘুরে বেড়ালেন এভাবেই। নতুন নতুন মানুষ সব, কেউ তাকে চিনলো না। একদিক থেকে এটাই ভালো- নিঃশব্দে তিনি দেখে যেতে পারলেন নিজের ফেলে যাওয়া শৈশব-কৈশোর, মায়ের হারানো সংসার, দাদা-দাদির ভেসে যাওয়া কবর। তারপর বিকেলের দিকে এলেন খাবাশপুরে। উদ্দেশ্য- কোরবান ভাইকে খুঁজে বের করা। খাবাশপুরে আজ সাপ্তাহিক হাট বসেছে। অনেক মানুষের ভিড়। তিনি দেখেশুনে একে-ওকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন কোরবান ভাইয়ের কথা। কিন্তু কেউই চিনতে পারলো না তাকে। সেটাই অবশ্য স্বাভাবিক। নদীভাঙা উদ্বাস্তু দরিদ্র মানুষ সে। এদেরকে কে-ইবা চিনতে চায়? মানুষ শুধু বিশিষ্টজনদের চিনে রাখে! অবশ্য একজন লোক চিনলো শেষ পর্যন্ত, বসে বসে শাক-সবজি বিক্রি করছিল সে- ব্যবসায়ী নয় বোঝাই যায়, কারণ কোনো দোকান নেই তার। খোলা জায়গায় বসেছে, হয়তো নিজের ক্ষেতের তরিতরকারি নিয়ে। সে বললো- ‘এট্টু অপেক্ষা করেন, বেচাবিক্রি শেষ অইলে সাথে কইরা নিয়া যামুনে। আমাগো বাড়ি একই পাড়ায়।’ তার একবার ইচ্ছে হলো, লোকটার সব সবজি একসঙ্গে কিনে নিয়ে তাকে ফ্রি করে দিতে। কিন্তু করলেন না। লোকটা ব্যাপারটা ভালো চোখে না-ও দেখতে পারে। তারচেয়ে অপেক্ষা করা ভালো। তার বেচাবিক্রি যখন শেষ হলো ততক্ষণে সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে, বললো- ‘আমার লগে চলেন, নিয়া যাই।’ কায়েস তাকে অনুসরণ করলেন। প্রায়-অন্ধকারে লোকটা সাবলীলভাবে চললেও অচেনা এই গ্রামের পথে, দীর্ঘদিনের অনভ্যস্ত পায়ে কায়েসের চলতে অসুবিধাই হচ্ছিল। তবু তিনি যথাসাধ্য দ্রুত তাকে অনুসরণ করলেন। যেতে যেতে টুকিটাকি কথাও হলো। বাড়ি কোথায়, কোরবান ভাইরে খোঁজেন ক্যান, বাড়ি ভাঙার পর এই এলাকা ছাইড়া গেলেন ক্যান- এইসব প্রশ্ন। তিনিও আন্তরিকভাবেই উত্তর দিলেন। তারপর, একসময় লোকটা বললো- ‘আইসা পড়ছি। এইটাই আমাগো পাড়া, বাড়িঘরের ভিতর দিয়াই যাইতে হইবো। সংকোচ কইরেন না। সবাই যায়।’ তার কোনো আপত্তি নেই। পৌঁছতে পারলেই হলো। লোকটা একের-পর-এক বাড়ি পেরিয়ে যাচ্ছিল আর কখনো চাচি, ফুপু, ভাবি, কখনো চাচা, ভাই, দাদা এইসব ডেকে ডেকে কুশল বিনিময় করছিল। যেতে যেতেই সে দেখলো এক বাড়ির উঠোনে এক জীর্ণ বুড়ো বসে আছে। পাশ দিয়ে যাওয়ার বুড়ো হাঁক দিলেন- কিরা যায়?
আমি হাশেম, কাকা।
সাথে কিরা?
বৈদেশি।
বৈদেশি তো বুঝলাম, বাড়ি কই?
বাড়ি নাই কাকা, আগে আছিল এই এলাকায়।
পদ্মা ভাঙুনি?
হ।
কই আছিল বাড়ি?
উদাসপুর।
এট্টু কাছে আসো তো বাবা- কায়েসকে উদ্দেশ্য করে বললেন বুড়ো। ডাকে সাড়া দিয়ে কাছে যেতেই বুড়ো বললেন- তুমি মতিন মাস্টার সাবের পোলা না?
হ। আপনে চিনলেন কেমনে?- কায়েস চমৎকৃত হলেন।
বুড়ো চুপ করে রইলেন।
চিনলেন কেমনে কাকা? আমি তো প্রায় তিরিশ বছর পর আইলাম, আমারে দেইখা আপনে চিনলেন কেমনে? আমি তো আপনেরে চিনলাম না! – কায়েসের বিস্ময় কাটেনি, তিনি তাই জিজ্ঞেস করেই চললেন।
তুমি আমারে চিনবা কেমনে? তুমাগো বাড়িতে যখন যাইতাম, তুমি তো তখন ছোট আছিলা।
তাইলে আমারে চিনলেন কেমনে? কী দেইখা চিনলেন?
দেইখা চিনি নাই বাপজান, গন্ধ শুঁইকা চিনছি!
গন্ধ শুঁইকা? কীসের গন্ধ?
তোমার শরীলের গন্ধ।
আমার শরীরের গন্ধ! আপনে আমার শরীরের গন্ধ চিনলেন কেমনে?

শোনো। আমি আছিলাম বেহারা। পালকি আছিলো আমাগো। দো-বেহারা, চার-বেহারা সবরকম পালকি। তখন তো এইরম রিকশা-উকশা আছিলো না, ভদ্দরলোকের স্ত্রীরা পালকি কইরা যাতায়াত করতেন। বিশেষ কইরা লঞ্চে কইরা ঢাকা বা ফরিদপুর থেইকা যারা আসতেন, তারা পালকিতে চইড়া বাড়িতে যাইতেন। তুমার মা-ও যাইতেন। তার বাপের বাড়ি আছিল দোহার, নারিশা। নৌকায় কইরা লেছড়াগঞ্জ ঘাটে আইসা নামতেন। তখন লেছড়াগঞ্জ তুমাগো বাড়ি থেইকা অনেকদূর আছিল। এতদূর হাঁইটা আসতে পারতেন না, তাই পালকিই ভরসা। মাস্টার সাব মানে তুমার বাপজান খবর পাঠাইলে আমি আর আমার বাপ পালকি নিয়া যাইতাম ঘাটে। তুমার মা যেদিন চড়তেন পালকিতে, সেইদিন সুগন্ধে ভইরা উঠতো পালকিডা। মাথায় ঝিম ধরানো সুগন্ধি। কী যে সুগন্ধি উনি মাখতেন, নাকি পরীরা আইসা তার গায়ে সুগন্ধি ঢাইলা দিতো আল্লাই মালুম! সেই গন্ধ আমি এখনো ভুলতে পারি নাই। সারাটা জীবন কাইটা গেল, এখন ঠিকমতো চোখেও দেখি না, তা-ও সেই গন্ধের কথা মনে আছে। তুমার শরীলে আমি এদ্দিন পর সেই সুগন্ধি পাইলাম বাবা। তুমার মার শরীলের গন্ধ তুমার শরীলেও আইসা পড়ছে মনে অয়…

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা