ঈদে জমজমাট অনলাইন কেনাকাটা

আগের সংবাদ

যাত্রীবাহী লেগুনার দোষ ছিল : পুলিশ

পরের সংবাদ

একটি শহীদ পরিবারের নিঃস্ব হওয়ার গল্প

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ২:০৫ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ২:০৮ অপরাহ্ণ

Avatar

কোচবিহার মহারাজ প্রজাদের পানীয় জলের সমস্যা সমাধানের জন্য খনন করেছিলেন বলে দীঘিটির নাম হয়েছে ‘রাজারদীঘি’। পঞ্চগড় জেলার বোদা বাজার সংলগ্ন রাজারদীঘির দক্ষিণ পাড়ে যে বাড়িটি এক সময় ছিল জমজমাট, বাড়ির মালিক ছিলেন সবার বিপদ-আপদের সহায়, এখন সে বাড়িটি আর আগের মতো নেই। বাড়ি ঘিরে ছিল অসংখ্য আম-কাঁঠালের গাছ। যেন বাগানের মধ্যে একটি বাড়ি। বাড়ির মালিক যতীন্দ্র মোহন সাহা। তারা তিন ভাই। বড়ো তিনি। তার ছোট দুই ভাই জীতেন্দ্র মোহন সাহা এবং বীরেন্দ্র মোহন সাহা, ডাকনাম বিশু।
যতীন সাহাদের আদিবাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়। তারা বোদায় গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন দেশভাগের আগে, চল্লিশ দশকের মাঝামাঝি। যতীন সাহা সেসময় ম্যাট্রিক পাস করে মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা বিষয়ে একটি ডিপ্লোমা কোর্স করেছিলেন। বোদায় গিয়ে তিনি চ্যারিটেবল ডিসপেনসারিতে কম্পাউন্ডার হিসেবে কাজ করতেন। কম্পাউন্ডার ছিলেন পাস করা ডাক্তারের সহায়তাকারী। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে তিনি নিজে ডাক্তারি করতেন। ‘চিকিৎসক’ হিসেবে তার যথেষ্ট সুনাম ছিল, পসার ছিল। তিনি আমার দাদাশ্বশুর। তার বড়ো মেয়ের ছোট মেয়েকে আমি বিয়ে করেছি।
যতীন সাহা মুক্তিযুদ্ধে বোদার প্রথম শহীদ। তিনি সরাসরি রাজনীতি করতেন না। তবে সত্তর-একাত্তরে বাঙালি মাত্রেই ছিলেন আওয়ামী লীগের সমর্থক। যতীন সাহা তার ব্যতিক্রম ছিলেন না।
একাত্তরের মার্চ মাসের পরিস্থিতি ছিল অগ্নিগর্ভ। উত্তাল। সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে শাসন ক্ষমতা দিতে পাকিস্তানের শাসকচক্র টালবাহানা করায় এবং ২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর আক্রমণ চালানোর পরিণতিতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
২৫ মার্চের পরও কয়েক দিন বোদা শত্রু মুক্ত ছিল। তবে পাকিস্তানি বাহিনী যেদিন বোদায় প্রবেশ করে সেদিন যতীন সাহাকেই প্রথম হত্যা করেছিল।
ওনাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে কারকুনবাড়ি যাওয়ার পথে গুলি করে হত্যা করা হয়। এখন যেখানে দীনুর মিল। তিনি একাই বাড়িতে ছিলেন। পাকিস্তানিরা যে কোনো সময় বোদায় এসে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে সেই আশঙ্কায় বাড়ির অন্য সবাই তার জামাই দীনেশ চন্দ্র সাহাসহ সীমান্তে চলে গিয়েছিলেন। আরো অনেক পরিবারই বোদা ছাড়া হয়েছিল। যতীন বাবুকে নেয়ার জন্য তার ছেলে সন্তু (জীবনকৃষ্ণ সাহা) মামা এলেও তিনি তাকে ফেরৎ পাঠিয়ে নিজে বাড়ি আগলে ছিলেন। ১৭ এপ্রিল সকাল ১০টার দিকে পাকবাহিনী স্থানীয় কিছু বিশ্বাসঘাতকের সহায়তায় তার বাড়িতে ঢুকে যতীন সাহাকে আটক করে। তিনি কি করেন জানতে চাইলে বলেছিলেন, কম্পাউন্ডার। পাকিস্তানিরা ভেবেছিল কমান্ডার। তার গায়ে একটি চাদর ছিল। ওই চাদর দিয়ে তার দুই হাত বেঁধে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। মরদেহ কিছু সময় ওখানেই পড়েছিল। পরে খবর পেয়ে তার ছোটভাই বিশু বাবু (বীরেন্দ্র মোহন সাহা) এবং ছেলে ঝন্টু (জয়ন্ত কুমার সাহা) স্থানীয়দের সহযোগিতায় বাড়ির পুব-উত্তর কোণায় মৃতদেহ কবর দেয়ার ব্যবস্থা করেন। সহায়তাকারীদের মধ্যে সম্ভবত মোশারফফ ভাইও (শিক্ষক) ছিলেন। পাকিস্তানিরা ফিরে যাওয়ার পথে বোদার পোস্টমাস্টার আব্দুল মান্নান এবং সাতখামারের লতিফ মেম্বারকে ধরে নিয়ে যায় এবং ১১ মাইলের দিকে নিয়ে হত্যা করে। অথচ লতিফ মেম্বার ছিলেন মুসলিম লীগার এবং পাকিস্তানিদের সহায়তাকারী। তিনি পাকিস্তানিদের হিন্দু এবং আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বাড়ি চিনিয়ে দিয়েছিলেন। এমন ‘খাদেম’কে পাকিসেনারা কেন হত্যা করেছিল তা এক রহস্য।
যতীন্দ্র মোহন সাহার জীবন ছিল মানুষের জন্য নিবেদিত। কত মানুষ যে তার কাছে চিকিৎসা সেবা পেয়েছে, কতভাবে উপকৃত হয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না। সাইকেল চালিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা করেছেন। ভিজিটের কথা কখনো মুখ ফুটে বলেননি। যার যেমন সামর্থ্য তেমন দিয়েছেন। কেউ আবার কলাটা-মূলাটা পৌঁছে দিয়েছেন তার বাড়িতে। খাওয়াপরার সমস্যা ছিল না। মাঠে ছিল আবাদি জমি। নিজে যে জমিজমার খুব তদারকি করতেন, তা-ও নয়। আধিয়াররা যা দিতো তাই তিনি খুশি মনে নিতেন। এমন উদার মনের মানুষ এখন পাওয়া দুষ্কর। যারা তার সান্নিধ্যে এসেছেন, যারা তাকে দেখেছেন তারাই স্বীকার করবেন যে কি অসাধারণ মানুষ ছিলেন তিনি। বাড়ির গাছের ফলফলাদি কখনো বাজারে বিক্রি হতো না। আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের বাড়ি বাড়ি বিলিবণ্টন হতো। আমি একবার কি কারণে যেন তার বাড়িসংলগ্ন ডিসপেনসারিতে গিয়েছিলাম। হয়তো কারো জন্য ওষুধ আনতে। বিনেপয়সায় ওষুধ দিলেন, আর মাথায় তুলে দিলেন ভোমা সাইজের একটি কাঁঠাল। জীবনে ওই একবারই সম্ভবত কাঁঠাল মাথায় বাসায় ফিরেছিলাম। তখন হয়তো বড়োজোর ফোর-ফাইভে পড়ি।
প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময়েই একবার আমার টাইফয়েড হয়েছিল, কিছুতেই ভালো হচ্ছিল না। যতীন বাবু, তখন আমি তাকে পিসেমশায় বলতাম। এই পিসেমশায় কি করে আমার দাদা শ্বশুর হলেন সে কাহিনী পরে। তাকে আমার অসুস্থতার খবর দেয়া হলো। বেশ মনে আছে, একদিন সকাল সকাল তিনি এলেন। বাইরে থেকেই বলতে থাকলেন, কোথায় বিভু, আজ ওকে এমন বড়ো সুই দিয়ে ইনজেকশন দেবো যে টাইফয়েডের বাবা পর্যন্ত পালিয়ে বাঁচবে! তিনি আমার ইনজেকশনভীতির কথা জানতেন। তাই ওই ভয় দেখানো। তিনি আমাকে দেখলেন। দেখলেন মানে নাড়ি টিপলেন, চোখ দেখলেন, থার্মোমিটার দিয়ে শরীরের উত্তাপ মাপলেন। তখন তো আর এতো টেস্টের সুযোগ ছিল না। তখন ডাক্তাররা টেস্ট ছাড়াই চিকিৎসা করতেন এবং রোগীরা ভালোও হতো। দেখেশুনে তিনি আমাকে একটি ইনজেকশন দেয়ার সিদ্ধান্তই নিলেন। আমি তখন হাফপ্যান্ট পরি। তিনি আমাকে প্যান্ট খুলতে বললে আমি তো লজ্জায় রাজি হই না। কিন্তু না খুলেও উপায় নেই। বাহুতে নয়, পাছায় ইনজেকশন দিয়ে তিনি আমাকে টাইফয়েডমুক্ত করেছিলেন।

যতীন বাবু ছিলেন ৯ সন্তানের জনক। পাঁচ মেয়ে, চার ছেলে। মেয়েদের নাম মায়া, ছায়া, লক্ষ্মী, চন্দনা এবং সাবিত্রী। ছেলেদের নাম জীবনকৃষ্ণ (সন্তু), জয়ন্ত (ঝন্টু), মন্টু এবং শম্ভু।
বড়ো দুই মেয়ে মায়া এবং ছায়া দেখতে-শুনতে ভালো ছিলেন। তারা বোদায় মোটামুটি সেসময় সমবয়সীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। ছোটজন ছায়াকে খুব পছন্দ করতেন আমার ছোট কাকা সুনীল চন্দ্র সরকার। কাকা মোটামুটি তার জন্য পাগলপারাই ছিলেন। কিন্তু বিষয়টি কেন যে পরিণতির দিকে আগায়নি সেটা আমার এখন আর মনে নেই। তবে এ নিয়ে কাকার মনে যে একটি চাপা দুঃখবোধ ছিল সেটা আমি জানি। আমি এই পরিবারের মেয়ে বিয়ে করার পর কাকা আমাকে অভিনন্দিত করে চিঠি দিয়েছেন। তখন তিনি ওপার বাংলায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
আমার শাশুড়ির নাম মায়া। যতীন বাবু তার দুই মেয়েকেই বিয়ে দিয়েছিলেন গাইবান্ধায়। আমার শ্বশুর দীনেশ চন্দ্র সাহা বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই গাইবান্ধা থেকে বোদায় গিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন এবং স্থায়ী আস্তানা গেড়েছিলেন। এখন তিনি বোদাবাসী।
সাহা বাড়ির বড়ো ছেলে জীবনকৃষ্ণ সাহা সন্তু লেখাপড়ায় মোটামুটি ভালো ছিলেন। পড়াশোনায় খুব আগ্রহী ছিলেন বলে মনে হয় না। তারা কয়েক বন্ধু ছিলেন বোদার যাকে বলে ‘দুষ্টের শিরোমণি, লঙ্কার রাজা’। নানা ধরনের খুচরা দুষ্টুমিতে তারা ওস্তাদ ছিলেন।
উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে রংপুর মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়ার সুযোগ পেয়েও পড়েননি, তার কোনো বন্ধু পড়ার সুযোগ না পাওয়ায়। বুঝুন কেমন বন্ধুপ্রীতি!
যতীন সাহার মৃত্যু ছিল তার পরিবারের জন্য বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো।
বোদার প্রথম শহীদ পরিবারটি নিয়ে লিখতে বসে এক ধরনের মানসিক পীড়া অনুভব করছি। পীড়িত বোধ করছি কারণ তার স্মৃতি রক্ষার কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি আজ পর্যন্ত। তার পরিবারের পক্ষ থেকে এক্ষেত্রে এক ধরনের অমার্জনীয় অবহেলা আছে। তার সন্তানরা কোনো উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এই পরিবারের আত্মীয় হিসেবে আমিও গ্লানি বোধ করছি এ কারণে যে আমি নিজে কেন কোনো উদ্যোগ নেইনি! বোদার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দল, ব্যক্তিরাই বা এ ব্যাপারে কিছু করার কথা ভাবেননি কেন?
মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধ শেষের পাওনা বুঝে নিতে যখন অনেকেই ব্যতিব্যস্ত ছিল, তখন যতীন্দ্র মোহন সাহার সন্তানরা কারো কাছে গিয়ে কিছু পাওয়ার আশায় ধরনা দেননি। বরং পরিবারের প্রধান অভিভাবককে হারিয়ে সবাই ছিল হতভম্ব, দিশেহারা। তিনি জায়গা-জমি যা রেখে গেছেন, তা রক্ষা না করে, সেগুলো বিক্রি করে খাওয়ার সহজ পথটি গ্রহণ করা হয়েছিল। চোখের সামনে সব ভেঙে পড়েছে। একটি মানুষের থাকা আর না-থাকা যে কত বড় বিষয় হতে পারে তা এই পরিবারের পরিণতি দেখে বোঝা যায়। দেশ মাতৃকার জন্য পরিবার প্রধানের জীবন উৎসর্গ করার গৌরব এই পরিবারের জন্য অশেষ বেদনার কারণ হয়েছে।
যতীন বাবুকে বাড়ির লাগোয়া জায়গায় সমাহিত করা হয়েছিল। সেখানে কোনো স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করার কথা কেউ ভাবেননি। সেই জায়গাটিও এখন তার পরিবারের হাতছাড়া হয়ে গেছে, বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। ভাবা যায়! সংকট কত প্রকট হলে পিতার সমাধিস্থলও সন্তান বিক্রি করে দিতে পারে!
আমি আশা করবো, বোদার সরকারি প্রশাসন, বোদা পৌরসভা এবং আওয়ামী লীগ বিষয়টি নিয়ে ভাববে এবং এলাকার প্রথম শহীদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করবে।
যতীন বাবুর বড়ো ছেলে জীবনকৃষ্ণ সাহা পিতার অবর্তমানে সংসারের দায়িত্ব পেয়ে যেন গভীর পানিতে পড়েছিলেন। তিনি ঠিক করতে পারছিলেন না কি করবেন? চাকরি এবং ব্যবসা দুটোই করার চেষ্টা করেন এবং কোনোটাতেই সফল হতে পারেননি।
সন্তু মামা পড়াশোনা শেষ না করেই সংসারের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে হিমশিম খেয়েছেন। তবে ভাইদের নিয়ে বাবার রেখে যাওয়া সহায়সম্পদ রক্ষা করে ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। যতীন বাবু থাকতে সাহাবাড়ি যে উচ্চতায় ছিল এখন তার বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই। এই পতন রোধযোগ্য ছিল। কিন্তু রোধ করা হয়নি বা যায়নি।
মুক্তিযুদ্ধের সুফল অনেকে ভোগ করছে, এটা তাদের সৌভাগ্য। এদের কেউ কেউ হয়তো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, কেউবা পাকিবাহিনীকে সহযোগিতাও করছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হোক তা-ও চায়নি। অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার যাবতীয় ঘি-মাখন তারা ঠিকই উদরে ঢুকিয়েছে। কিন্তু দেশকে স্বাধীন করার জন্য যারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, জীবন বিসর্জন দিয়েছেন, তাদের কারো কারো পরিবার যে অনাদর-অবহেলায় সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে বা যাচ্ছে তার সব খবরও আমরা রাখি না।
যতীন্দ্র মোহন সাহার পরিবার এ রকম বঞ্চনার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। যতীন বাবু শহীদ হয়েছেন, তার ছেলে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটনে সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করেছে, তার জামাই দীর্ঘদিন থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন, পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে যখন আওয়ামী লীগের চরম দুঃসময় তখন যিনি বুক আগলে দলকে রক্ষা করেছেন, দল যখন ক্ষমতায়, অনেকের জন্য যখন সুদিন তখন সেই দুঃসময়ের কান্ডারিরও চলছে দুঃসময়।
আগেই বলেছি যতীন বাবু আমার দাদা শ্বশুর। তার মৃত্যুর অনেক বছর পর তার নাতনিকে আমি বিয়ে করেছি। আমার শ্বশুর দীনেশ চন্দ্র সাহা যতীন বাবুর বড় জামাই। আমার শ্বশুর ঘোরতর আওয়ামী লীগার, বঙ্গবন্ধু ভক্ত। তার মতো নিঃস্বার্থ কর্মী আওয়ামী লীগে এখন খুঁজে পাওয়া ভার। তিনি অনেক বছর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল না। দল চালানো সহজ কাজ ছিল না। সাহায্য-সহযোগিতা করার লোক খুব বেশি পাওয়া যেত না। আমার শ্বশুরকে তখন দেখেছি পঞ্চগড় জেলা আওয়ামী লীগের একসময়ের প্রাণপুরুষ, সাবেক সংসদ সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম সংগঠক সিরাজুল ইসলামের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে বোদায় আওয়ামী লীগের ঝাণ্ডা সমুন্নত রাখতে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে কেউ নিজের সম্পদ বিক্রি করে নিঃস্ব বা একপ্রকার দেউলিয়া হয়েছেন- সেটা বললে কেউ হয়তো কেউ আর বিশ্বাস করবেন না। কিন্তু আমার শ্বশুর বাস্তবে তাই হয়েছেন। তিনি যতীন বাবুর জামাই হিসেবে বোদার প্রায় সবারই ছিলেন জামাইবাবু। আমিও তাকে জামাইবাবুই বলতাম। তো, তার কাছে সবারই ছিল নানা আবদার। অত্যন্ত সরল মনের মানুষ তিনি। দুহাতে খরচ করতেন। আয় কত করেন, সে হিসাব করতেন না। তিনি সবার কথা ভাবতেন। প্রয়োজন মেটানোর জন্য জমি বিক্রি করতেন। নিজের ভালো নাকি পাগলেও বোঝে, কিন্তু বোঝেননি আমার শ্বশুর। তাহলেই বুঝুন তিনি কত বড়ো পাগল!
আমার শ্বশুর একজন দরাজদিল মানুষ। দল করলেও তিনি নিকৃষ্ট দলবাজ ছিলেন না। আমি যখন তার মেয়েকে বিয়ে করব বলে ঠিক করি এবং সেটা কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদকে জানাই তখন তিনি খুবই বিস্মিত হয়েছিলেন। আমি ছিলাম পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী। নিয়ম অনুযায়ী বিয়ের আগে পার্টির অনুমতি নিতে হতো। কোন পরিবারে, কেমন মেয়ে, তাকে বিয়ে করে পার্টিজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি-না, এসব বিষয় পরিষ্কার করতে হতো। ফরহাদ ভাই আমার শ্বশুরকে চিনতেন। তিনি যে আওয়ামী লীগের নেতা তা-ও তার অজানা ছিল না। এমন একটি আওয়ামী লীগ পরিবারে বিয়ে করছি শুনে ফরহাদ ভাই অবাক হয়ে বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিলেন, কি আর করব, না করলে তো তুমি শুনবে না। যাও, আমি বোদা গেলে তোমার শ্বশুর যেন ভালো খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করেন।
আমার শ্বশুর মানুষকে ভালোবাসেন, মানুষকে খাওয়াতেও ভালোবাসেন। কাউকে খাওয়ানোর ক্ষেত্রে বললে নিজের খাবার আছে কি-না সেটা নিয়ে তিনি ভাবেননি।
শহীদ যতীন্দ্র মোহন সাহার পরিবার নিয়ে লিখতে বসে একটু খেই হারিয়ে ফেলছি। এই পরিবারের সঙ্গে আমার আত্মীয়তা থাকায় কিছু লিখতে গিয়ে সাতপাঁচ ভাবতে হচ্ছে। লিখতে গিয়ে পিছন ফিরে তাকাতে হচ্ছে। দেখতে হচ্ছে বর্তমানকেও। অনেক হিসাব মিলাতে পারি না। মেলে না। কি থেকে কি হয়ে গেল! ভাবলে কেমন জাদুর খেলা মনে হয়। যতীন বাবু জীবন দিলেন মুক্তির মন্দিন সোপান তলে। তিনি আকস্মিকভাবে চলে গেলেও তিনি তো নিঃস্ব ছিলেন না। সচ্ছল পরিবারই ছিল তার। অতো বড়ো সাজানো বাড়ি। মাঠে আবাদি জমিও কম ছিল না। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। অন্য ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করছিল, ছোট ছিল। কিন্তু এতো অল্প সময়ের মধ্যে সব তছনছ হয়ে গেল কেন, আমি এখনও বুঝতে পারি না। স্বাধীনতা লাভের বছর না পেরুতেই আমি ঢাকা চলে আসি। বোদার সঙ্গে আমার যোগাযোগ কমতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হলে বোদায় যেতাম, মাঝে মাঝে সাহাবাড়িতেও যাওয়া হতো। এ বাড়ির বড়ো ছেলে জীবনকৃষ্ণ সাহা সন্তু বয়সে আমার থেকে কয়েক বছরের সিনিয়র। তবে ছাত্র ইউনিয়ন সূত্রে আমাদের মধ্যে এক ধরনের ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এ বাড়ির আরেক ছেলে জয়ন্ত সাহা ঝন্টুও আমার বড় ছিলেন। তবে এক পর্যায়ে আমরা একসঙ্গেও পড়েছি। সম্ভবত ক্লাস এইট থেকে। তাই বলা চলে আমরা হয়েছিলাম বন্ধু। আবার সাহাবাড়ির বড়ো জামাই দীনেশ চন্দ্র সাহা ছিলেন তখন বোদার এক ধরনের ‘হিরো’ । ছোটবড়ো সবাই তাকে জামাইবাবু বলে, সবার সঙ্গে তার অত্যন্ত মধুর সম্পর্ক। আমি এই জামাইবাবুর ‘জামাই’ হলাম কীভাবে? ঘটনাটি মজার। তাই না হয় একটু বলি।
একটা সময় পর্যন্ত আমি সমাজ বিপ্লবের স্বপ্নে বিভোর ছিলাম। ভেবেছিলাম, বিপ্লবের আগে বিয়ে বা ঘরসংসার নয়। এমনকি সরকারি চাকরিবাকরিও করবো না। আমার মাকে বলেছিলাম, তোমার এগারোজন ছেলেমেয়ে। এর মধ্যে একজনকে হিসাব থেকে বাদ দাও। আমাকে আমার মতো চলতে দাও। বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক আমার খুবই শিথিল ছিল। বাবা-মা ধরে নিয়েছিলেন, আমি সত্যি সত্যি সংসারত্যাগী হবো। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংহ ঘোষণা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ হবে পৃথিবীর ১৫তম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা ছিল ১৪টি। তো, বাংলাদেশের দুয়ারে সমাজতন্ত্র কড়া নাড়ছে, আর আমি কি-না সংসারের মায়ায় বাধা পড়ব? আমি যখন বিপ্লবের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি, তখন আমার নিজের পরিবারে ঘটে যাচ্ছে একের পর এক বিপর্যয়! বাবার ব্যবসা মার খাচ্ছে। একভোরে বাড়ির কাছে একটি গাছের ডালে ঝুলতে দেখা গেল আমার বড়ো দাদা মন্টুরঞ্জন সরকারের দেহ। মৃত। আত্মহত্যা, নাকি তাকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল, সে রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। আমার এই দাদা ছিলেন অত্যন্ত আমুদে স্বভাবের। হাসিখুশি, বন্ধুবৎসল। প্রাণোচ্ছ¡ল। আমরা সব ভাইয়েরাই মূলত প্রায় একই স্বভাবের। যাহোক, আমার সেই দাদা কেন গাছের ডালে ঝুললেন বা ঝোলানো হলো সেই বিষয়টি আমাকে খুবই বিষণ্ণ করেছিল। যদিও আমি বাইরে কোনো বিচলিত ভাব দেখাইনি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমার প্রবল রক্তক্ষরণ হয়েছিল।
এর কয়েক বছর যেতে না যেতেই আমার ইমিডিয়েট ছোট ভাই নিরঞ্জন সরকার নির্মমভাবে নিহত হলো ডাকাতের হাতে। আমার এই ভাইটিও ছিল খুবই ভালো, যাকে এক কথায় বলা যায় ‘সোনার ছেলে’। মেধাবী ছাত্র ছিল। বোদা থানা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিল। বোদার ছোটবড়ো সবাই ওকে ভালোবাসতো, স্নেহ করতো। আমি সংসারের দায়িত্ব নেবো না, অথচ সংসারে সংকট- নিরঞ্জন পড়াশোনার পাশাপাশি উপার্জনের উপায় বের করে বাবার পাশে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ওকে রাতের অন্ধকারে খুন করা হলো। নিরঞ্জনের এমন মৃত্যু আমাদের পরিবারকে একেবারেই অসহায় করে দিয়েছিল। মা-বাবা খুবই ভেঙে পড়েছিলেন। এটা ১৯৮৪ সালের কথা। খবর পেয়ে আমি বোদা গিয়ে পরিবারের অবস্থা দেখে বিচলিত হয়ে পড়ি। আমার নিজের আশঙ্কা হয় যে, আমাদের কোনো ভাইয়েরই বোধহয় স্বাভাবিক মৃত্যু নেই। গুপ্তঘাতকের হাতে মৃত্যুই বুঝি আমাদের বিধিলিপি! কেউ বলতে পারবেন না, আমাদের পরিবারের কেউ কারো কোনো ক্ষতি করেছে, আমরা কখনো কারো অনিষ্ট চিন্তা করেছি। তাহলে আমাদের ওপর কেন এমন দুর্যোগ!
আমার বেঁচে থাকাটাও তখন আমার কাছে অর্থহীন মনে হয়েছিল। এক সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে বসে আমি ২৪টি ঘুমের বড়ি খেয়েছিলাম। অচেতন অবস্থায় আমাকে বাড়ি পৌঁছানো হয়েছিল। কিন্তু কি আশ্চর্য, মৃত্যু আমাকে গ্রহণ করলো না। ওই চরম মানসিক সংকটের সময়, আমার পরিবারের সেই ভয়াবহ দুঃসময়ে আমরা তেমন কাউকে আমাদের পাশে পাইনি। আমার রাজনীতির বন্ধুদের যতোটা কাছে পাবো বলে আশা করেছিলাম, ততটা পাইনি। আমার মধ্যে বড় ধরনের নিঃসঙ্গতাবোধ তৈরি হয়। মানুষের প্রতি বিশ্বাসে ফাটল ধরে। তবে তখন যতোদিন বোদায় ছিলাম, একজন মানুষ ছায়ার মতো আমাকে সঙ্গ দিয়েছিলেন, তিনি দীনেশ চন্দ্র সাহা।
পর পর দুই ভাইয়ের করুণ মৃত্যু আমাদের পরিবারকে সব দিক দিয়েই পঙ্গু করে দিয়েছিল। মা-বাবার জন্য এই বেদনাভার ছিল বহনঅযোগ্য। তাদের দুঃসহ দুঃখভার কীভাবে লাঘব করা যায় বুঝতে পারছিলাম না। তবে এটা বুঝছিলাম যে আমার তখন মা-বাবার পাশে দাঁড়ানো দরকার। সাহাবাড়ির বড় জামাই দীনেশ সাহা আমাকে সঙ্গ দিতেন এবং বলতেন মা-বাবার মানসিক শক্তি ফিরিয়ে আনার জন্য আমার কিছু করা দরকার। এমন কি তাদের তখন আর্থিক সহযোগিতাও দরকার।
আমি খুবই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়লাম। আমি তখন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘একতা’ পত্রিকায় মাসিক ছয়শ টাকা বেতনে চাকরি করি। ওই টাকায় নিজের খাওয়াপরাই ঠিক মতো চলে না। একতা অফিসে একটা লম্বা টেবিলে রাতে বিছানা-বালিশ ছাড়া ঘুমাই। সকালে নাস্তা না খেয়ে একটু বেলা করে খেয়ে নিতাম দুপুরের খাবার। রাতের খাবার সন্ধ্যার পর। তাতেই ছয়শ টাকা কাবার। এ অবস্থায় আমি বাবা-মাকে বা পরিবারকে সাহায্য করবো কীভাবে? বিষণ্ণ মনে ঢাকা ফিরে এলাম। এসে পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ভাইয়ের সঙ্গে কথা বললাম। এটাও বললাম যে, আমার একটা অন্য চাকরিতে ঢোকা দরকার। ফরহাদ ভাই সব শুনলেন। তবে তখনই কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে একতা সম্পাদক (এখন প্রথম আলো সম্পাদক) মতি ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে বললেন। বললাম। মতি ভাইও আমার সমস্যা শুনে শুধু বললেন, তুমি একতা ছাড়ার চিন্তা করো না। দেখি কি করা যায়। আমরা আছি। উপায় একটা হয়ে যাবে। এভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। আমার মধ্যে অস্থিরতা। বাড়ির জন্য চিন্তা। দিন পনেরো পরে বাড়ি থেকে জরুরি খবর, আমাকে সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি যেতে হবে। এভাবে ডেকে পাঠানোতে আমি বেশ ঘাবড়ে যাই। আবার কোনো অঘটন ঘটলো না তো! নানা দুশ্চিন্তা আমাকে পেয়ে বসে। মা-বাবার কিছু হলো না তো! রাতের কোচেই বোদা রওনা হই। সকালে বাড়ি পৌঁছে সব কিছু স্বাভাবিক দেখে ভয় কাটে, উদ্বেগ বাড়ে। তাহলে জরুরি তলব কেন? মার মুখে এক চিলতে হাসি। আমি জানতে চাই, এভাবে ডেকে আনলে কেন?
মা হাসেন। বলেন, বাবা এবার একটা বিয়ে কর। তোর বাবার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। কদিন থেকে তোর বিয়ের কথা বলছে। তোর মামা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তীর বাবা) একটি মেয়ে দেখেছে। তুই দেখলেই আমরা সব পাকা করবো।
বিয়ে! আমার? মেয়ে দেখা? মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো।
আমি তো বিয়ের কথা ভাবিনি। এ ব্যাপারে আমার কোনো পরিকল্পনাও নেই। আমি যখন খুব ছোট, তখন আমার এক পিসতুত বৌদি, গীতা বৌদি আমাকে তার কোলে বসিয়ে আদর করে গালে কপালে চুমু দিয়ে বলেছিলেন, তোকে মেয়েরা খুব পছন্দ করবে। দেখিস, মেয়েরা টপাটপ তোর প্রেমে পড়বে। প্রেম-ভালোবাসা-বিয়ে বিষয়টি যখন বুঝতে শিখি তখন আমি মেয়েদের এড়িয়ে চলতে শুরু করি। কারণ তারা যদি আমার প্রেমে পড়ে যায়! তাহলেই তো বিপদ। আমি তো বিয়ে করবো না। বিপ্লব করবো। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সংসার করা নয়। অবশ্য ঢাকা এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর এবং অনেক কমরেডদের বিয়ে-সংসার দেখে মন যে কেমন কেমন করতো না, তা কিন্তু নয়! গীতা বৌদি বলেছিলেন, মেয়েরা আমার প্রেমে পড়বে, তো সেই ভরসায় দুয়েকজন মেয়েকে টার্গেট করে একটু পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করে পুরো হতাশ হলাম। আমাকে কেউ কোনো পাত্তাই দেয় না। একজনের মাথায় ঘনকালো লম্বা চুল দেখে মনের মধ্যে গুনগুনিয়ে উঠেছিল, ‘কুন্তল বন্যা কে দিল তোমায় বলো কন্যা’- কিন্তু বলি বলি করেও কিছু বলা হলো না। শুধু গভীর রাতে মনে মনে আউড়াতাম ‘তোমার কাজল কেশ ছড়ানো বলে এই রাত মধুর এমন’। কিন্তু ওই পর্যন্তই। কয়েকদিন ধবলমুখি কালোকেশির পেছনে ঘুরঘুর করলাম, একদিনও ফিরে তাকালো না, রাগ করে একটু গালও দিল না।
পরে ভাবলাম, সুন্দরী মেয়ে আমাকে পছন্দ করবে না। দেখতে তেমন আকর্ষণীয় নয়, এমন কাউকে টার্গেট করতে হবে। পেলামও তেমন একজন। একেবারে হাড্ডিসার, গায়ের রঙ দুধে-আলতা নয়, কাজলকালো তবে চোখ দুটি মায়াবী। মেয়েটি একা একা ঘোরে। এমনকি কোনো মেয়েকেও ওর সঙ্গী হতে দেখি না। আমি তার সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করলাম। ওম্মা, ও মেয়েও দেখি দারুণ দেমাগি। আমাকে বলে কিনা আর একদিন পিছু নিলে ‘খবর’ আছে। লোক জানাজানির ভয়ে আর ও মুখো হইনি। অথচ আমার বন্ধুরা দেখি ঠিকই কাউকে না কাউকে পেয়ে যাচ্ছে।
আমার মেয়ে ভাগ্য খারাপ ধরে নিয়ে বিয়ের চিন্তা মাথা থেকে যখন ঝেটিয়ে বিদায় করেছি, তখন কি-না মা আমাকে বাড়ি ডেকে নিয়ে বিয়ে করার কথা বললেন।

মাকে কীভাবে বিয়ের ভাবনা থেকে নিবৃত্ত করা যায় ভাবছিলাম। একবার মনে হলো একটু রাগারাগি করে বাড়ি থেকে চলে যাই। আবার মনে হলো, না, এখন মাকে কষ্ট দেয়া ঠিক হবে না। একটা কিছু বুঝিয়ে এ যাত্রা পাড় পেয়ে যাই। ঢাকা ফিরে আর বাড়িমুখো হবো না।
মাকে বললাম, বিয়েটা তো আর ছেলে খেলা নয়। তাছাড়া বিয়ে করে বৌকে খাওয়াবো কি? আমি পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে যে ভাতা পাই, তাতে আমার একারই চলে না। সবচেয়ে বড় কথা, আমাকে তো বিয়ের আগে পার্টির কাছে অনুমতি নিতে হবে।
সবকিছু শুনে মা একটু নরম হলেন। বললেন, ঠিক আছে, তুমি মেয়েটা দেখো, দেখলেই বিয়ে করতে হবে তা তো নয়!
আমার তো ওই মেয়ে দেখা নিয়েই আপত্তি। আমাদের সমাজে মেয়ে দেখার যে রীতি আমি তার ঘোরতর বিরোধী। একটি মেয়েকে সাজিয়েগুজিয়ে সবার সামনে এনে, নানা ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে যখন তাকে অপছন্দের কথা জানানো হয়, তখন তা মেয়েটির জন্য যে কতটা অপমানের ব্যাপার হয় সেটা আমি বুঝি।
আমার এই মনোভাবও মাকে বুঝিয়ে বললাম। আমার মা খুবই রিজনেবল মানুষ। তিনি বললেন, ‘তুমি যেটা ভালো মনে করো সেটাই করো। কিন্তু আমি এবং তোমার বাবা- আমরা দুজনেই চাই, তুমি বিয়ে করো এবং সংসারী হও’।
মা আমাকে তখন এমন একটি কথা বললেন, যা আমাকে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করেছে। মা বললেন, বাবারে, আমি মূর্খসুর্খ মানুষ। কিন্তু সংসারী না হলে ভালো রাজনীতিও করতে পারবে না। সংসার কি রাজনীতির বাইরে? মার এই প্রশ্ন আমাকে তাড়িত করে।
বিকেলে বাজারে গিয়ে দেখা হয় দীনেশ সাহার সঙ্গে। তিনি আমাকে দেখে খুশি হলেন। বোদার সেসময়ের বিখ্যাত মিষ্টির দোকান ‘ছবি মিষ্টান্ন ভান্ডার’ এ নিয়ে চা-মিষ্টি খাওয়ালেন। এই মিষ্টির দোকানের মালিক জীতেন সাহা, সাহা পরিবারের আর এক সদস্য।
দীনেশ সাহার সঙ্গে আমার আলোচনা মূলত রাজনৈতিক বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তিনি থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। কথাবার্তা শেষে বিদায় নেয়ার মুহূর্তে তিনি আমাকে বললেন, ‘আমার ছোট মেয়েটার জন্য তোমার মতো একটা ছেলে জোগাড় করে দাও। ওকে বিয়ে দিয়ে দিবো’।
তাকে তাৎক্ষণিক কিছু না বললেও আমার মাথায় একটি ভাবনা এলো। বাড়ি গিয়ে মাকে বললাম, বিয়ে যদি করতে হয়, তাহলে আমি দীনেশ বাবুর মেয়েকে করবো।
শুনে আমার মা এবং বাড়ির সবাই একটু বিস্মিত হয়েছিল। আমি অবশ্য এটা বলেছিলাম, বিয়ের চাপ থেকে মুক্ত থাকার কৌশল হিসেবে। আমার ধারণা ছিল, অনেক কারণে এই বিয়েতে দুই পরিবার রাজি হবে না। তখন আমি বলার সুযোগ পাবো যে, আমি যাকে পছন্দ করলাম, তার সঙ্গে যখন হলো না, কাজেই আমি আর বিয়েই করবো না।
দীনেশ বাবুর মেয়ের সঙ্গে বিয়েতে পরিবারের সম্মত হবে না বলে আমি ধারণা করেছিলাম। কারণ : ১. মেয়েটির সঙ্গে আমার বয়সের ব্যবধান। ও তখন উচ্চ মাধ্যমিক পড়ে। বয়স ১৮ হয়নি। আর আমার তখন ৩১ চলছে।
২. আমাদের সম্পর্ক। যদিও রক্তের সম্পর্ক নয়, তবু দীনেশ বাবুকে আমি জামাইবাবু বলি, আর মেয়ে আমাকে বলে মামা।
৩. আমার আয়-উপার্জনের কথা জেনে নিশ্চয় আমার সঙ্গে মেয়ে দিতে চাইবে না।
আমার অনুমান-আশঙ্কা ভুল প্রমাণ করে ওই রাতেই দুই পরিবার বিয়ের দিনতারিখ পাকা করতে বসে গেলেন। আমার মাথা বাজ পড়লো। হায় হায় একি করলাম! মেয়েটিকে যে আমি ভালো মতো দেখিওনি।
নিজের ফাঁদে নিজে জড়িয়ে ফেঁসে গেলাম। শুধু কাকুতিমিনতি করে মেয়ের বয়স ১৮ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বললাম। না হলে বাল্যবিয়ের দায়ে মামলায় পড়ার আশঙ্কা আছে।
আমার অনুরোধ রাখা হলো এবং হিসাব করে বের হলো ১৯৮৬ সালের শুরুতে মেয়ের ১৮ পূর্ণ হবে। পাঁজি দেখে বিয়ের দিন ধার্য হলো হলো ১৩ জুলাই, ১৯৮৬।
এইভাবেই আমি সাহাবাড়ির জামাই হলাম। জামাইবাবুর জামাই হলাম এবং বালিকাবধূ নিয়ে ঢাকা শহরে অনিশ্চিত জীবনের পথে যাত্রা শুরু করলাম। অন্য নারী মুখ ফিরিয়ে নিলেও এই নারী আমাকে বিমুখ করেনি। আমার নারীভাগ্য ভালো না হলেও স্ত্রীভাগ্য চমৎকার।
আমার মতো একটি ছেলে খুঁজছিলেন আমার শ্বশুর। কিন্তু আমাকেই জামাই হিসেবে পেয়ে অখুশি হননি নিশ্চয়ই!
সাহাবাড়ির সদস্যদের বিষয়ে আর কিছু তথ্য উল্লেখ করে লেখাটি শেষ করতে চাই
শহীদ যতীন্দ্র মোহন সাহার ছেলে-মেয়েদের সম্পর্কে আরো কিছু সাধারণ তথ্য :
বড় মেয়ে মায়া সাহা, আমার শাশুড়ি, তার দুই মেয়ে, এক ছেলে। বড় মেয়ে দিপালীর বিয়ে হয়েছে ঠাকুরগাঁয়ের ভোমরাদহে। জামাই চিত্ত দাস হাই স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক। এখন অবসর জীবন করছেন। তাদের দুই ছেলে এবং এক মেয়ে। মেয়ে বড়, নাম সাথী। বিয়ে হয়েছে বোদার ঝলইশালশিরিতে, আইনজীবীর সঙ্গে। দুই ছেলে সবুজ এবং কল্যাণ। স্নাতক পাস করে চাকরি-বাকরি খুঁজছে।
দীনেশ-মায়া দম্পতির ছোট মেয়ে শেফালির সঙ্গে। আমার এক কন্যা ও এক পুত্র সন্তান।
তাদের একমাত্র পুত্র দীপঙ্কর। এখন দৈনিক প্রথম আলো’তে বিজ্ঞাপন বিভাগে কাজ করে। দীপঙ্কর বিয়ে করেছে। এক পুত্র সন্তানের জনক।
যতীন সাহার দ্বিতীয় মেয়ে ছায়া সাহা। তার বিয়ে হয় গাইবান্ধায়। তার তিন মেয়ে, এক ছেলে না। তিনি মারা গেছেন। রেখে গেছেন স্বামী এবং চার সন্তান। একজন ছেলে এবং তিনজন মেয়ে। তিন মেয়েরই বিয়ে হয়েছে। তারা সবাই চাকরিজীবী। একমাত্র ছেলে গৌতম, বাড়িতে থাকে। সেও বিয়ে করেছে। গৌতম কথা বলতে পারে না।
যতীন বাবুর বড় ছেলে জীবনকৃষ্ণ সাহারও তিন মেয়ে, এক ছেলে। সবারই বিয়েশাদি হয়েছে।
যতীন বাবুর আরো তিন ছেলে ঝন্টু, মন্টু এবং শম্ভু। ঝন্টুর দুই মেয়ে, মন্টুর এক মেয়ে, শম্ভুর দুই ছেলেমেয়ে।
যতীন বাবুর ছোট তিন মেয়ে সাবিত্রী, লক্ষ্মীও চন্দনা। সাবিত্রীর দুই ছেলেমেয়ে, লক্ষ্মীর দুই ছেলেমেয়ে এবং চন্দনার এক মেয়ে।
বিশাল পরিবার। সবাই বোদায় নেই। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এর মধ্যে জীবনকৃষ্ণ, ছায়া এবং লক্ষ্মীর জীবনাবসান হয়েছে।
সাহা পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের কারো কারো সঙ্গে আমার এখনো দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। তবে ওই পরিবারে মেয়ে বেশি হওয়ায় আমার শ্যালিকার সংখ্যা বেশি। কয়েকজন ‘শালি’র নাম বলতে পারবো, কারণ তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। আমার বাসায় এসেছে। আমার এই শালিরা সবাই খুব ভালো। জামাইবাবুর জন্য ওদের খুব টান। যতীন বাবুর বংশধরদের যে অবস্থা বা অবস্থানে থাকার কথা, তারা সবাই হয়তো তা নেই। তবে এই পরিবারের সব সদস্যই মানুষ হিসেবে চমৎকার। এদের সবার কাছে আমি যে স্নেহ-ভালোবাসা-সম্মান পাই তা ভোলার নয়।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা