চিহ্ন?

আগের সংবাদ

দুষ্ট ভূতের দল

পরের সংবাদ

একটি লাল টুকটুকে গাড়ি

ওমর কায়সার

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ৯:৩০ অপরাহ্ণ

নগর ভাসানো বৃষ্টি। বঙ্গের সাগর থেকে দ্রুত বেগে ধেয়ে আসছে বাতাস-দৈত্য। আর ধাক্কা দিয়ে উড়িয়ে নিতে চাইছে বড় বড় দালানগুলো। জামালখানের সড়কদ্বীপের গাছগুলো উল্লাসে প্রলয় নৃত্য করছে। দৃষ্টি ঝাপসা করে দেওয়া এরকম দিনে মনে হয় বহুদূরে কেউ যেন একা একা কাঁদছে। এই দুর্যোগের দিনেও ছেলেটা এসেছে। প্রতিদিনের মতো একই কাণ্ড শুরু করেছে। গত দুতিনমাস ধরে এরকম চলছে। মানুষ কি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হয়। অথচ ছেলেটা বের হয়েছে। আর যথারীতি এখানে চলে এসেছে আর প্রতিদিন যা করে তাই করছে। ছবি আঁকছে। তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ছবি আঁকছে। ব্যাপারটা অস্বস্তিকর। এর একটা বিহিত আজ হয়ে যাবে।
এখানে যারা আসে তাদের বেশির ভাগ বই কিনতেই আসে। কেউ কেউ বইয়ের খবর নিতেও আসে। কেউ আসে প্রিয় কিছু বই এখানে পড়ে নিতে। লেখক, সংস্কৃতিকর্মীরা বই কেনা ছাড়াও আসে আড্ডা দিতে।
কিন্তু বই ছাড়াও এখানে আসার অন্য উপলক্ষ থাকতে পারে কারও কারও। এটা কখনো ভাবেনি জুলিয়া।
সকাল এগারটা। কিন্তু মনে হচ্ছে পুবের আকাশে লাল রঙ ছড়িয়ে এখনো সূর্য ওঠেনি। কিংবা সূর্য অনেক আগে অস্তাচলে গেছে। তারপরও জমে গেছে বাতিঘর। বইপাগল মানুষেরা একে একে আসতে শুরু করেছে। এমন বৃষ্টির দিনেও মানুষ বই পড়তে আসে। এ সময়টা যারা আসে তাদের বেশিরভাগ স্কুল-কলেজ পড়ুয়া। বেশির ভাগ চুপচাপ বই পড়ছে। কেউ বই বাছাই করছে। আর এই ভিড়ের মধ্যে লম্বাচুলের ছিপছিপে দীর্ঘাঙ্গি ছেলেটি কাঁধের ব্যাগ থেকে বড় একটা ড্রইং খাতা বের করে আঁকতে শুরু করেছে। কী আশ্চর্য। এটা একটা বইয়ের বিপণি কেন্দ্র। এখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ আসে। এক ধরনের পাবলিক প্যালেস এটা। এটাতো কারও ড্রইং প্র্যাকটিস করার জায়গা নয়। ছবি আঁকুক। তাও কারও হয়তো আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু অনুমতি না নিয়ে কেউ তারই ছবি আঁকবে সেটা কী মেনে নেয়া যায়?
প্রথম প্রথম ব্যাপারটা ধরতেই পারেনি কেউ। জুলিয়াও না। মানুষ আসছে, মানুষ যাচ্ছে। বইয়ের খবর দেওয়া, খবর নেওয়া, বই বিক্রি করার নানা কাজে তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। এর মধ্যে কে এল, আর কে গেল এসবের হিসেব রাখা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট মুখ মনে থাকার কথা নয়। অবশ্য বই কেনা ছাড়াও প্রতিদিন আড্ডার মোহে চলে আসা কিছু মানুষকে চেনা হয়ে গেছে জুলিয়ার। তাদের সঙ্গে তার কথা হয় না। সৌজন্য বিনিময়ও হয় না। তারপরও তাদের সে চেনে। তাদের জানে। কিন্তু একটা মুখ গত কয়েকদিন ধরে দেখা যাচ্ছে। চেনা অচেনার মাঝামাঝি এক মুখ, পরিচয় অপরিচয়ের দ্বন্দ্বের ভেতর থাকা একটা মানুষ ইদানীং এখানে আসতে শুরু করেছে। এসেই ছবি আঁকে। বাতিঘরের বিভিন্ন কোণের ছবি। আর তার দিকে তাকায়। বারবার তাকায়। তখন মনে হয় তারই ছবি আঁকে। তখন তার কেমন অস্বস্তি লাগে। বুকটা দুরু দুরু কাঁপে। কেন সে তার ছবি আঁকে? কেন সে এমনভাবে তাকায়? দেখলেই মনে হয় আগে কোথায় যেন দেখেছে তাকে। কোথাও পরিচয় হয়েছিল তার সঙ্গে। না। হয়তো ভার্সিটির শাটল ট্রেনে, ক্যাম্পাসে অথবা কোথাও দেখেছে তাকে। কিন্তু বাতিঘরে কাজ নেওয়ার প্রায় দেড় বছর পর এখানে প্রথম যেদিন দেখে সেদিন তাকে খেয়াল করেনি জুলিয়া। খেয়াল করার কথা নয়। কিন্তু প্রায় প্রতিদিন দুপুরে যখন মানুষের ভিড় কমে আসে, তখন বেড়ালের মতো নিঃশব্দে এসে ব্যাগ থেকে খাতা খুলে আঁকা শুরু করে ছেলেটি। কেউ বুঝতে পারে না। ব্যাপারটা চলছেই। কেউ এটা নিয়ে মাথা ঘামায় না। বাতিঘরের অন্যরা ভাবে এটা ক্ষতি কি, এখানে প্রতিদিন তরুণেরা এসে সেলফি তোলে, কেউ দলবেঁধে ছবি তোলে। কেউ কেউ ভিডিও করে। এই মানুষটা না হয় বাতিঘরের ছবি আঁকল। তাতে তো আর বই বিপণি কেন্দ্রটির মূল কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে না? বিঘ্নিত হচ্ছে না ঠিক। কিন্তু বাতিঘরের ছবি আঁকতে গিয়ে কেউ যদি এর মানুষগুলোকেই তার ক্যানভাসের বিষয় করে তোলে তবে তাতো আপত্তি থাকবেই। আপত্তি না হয় থাকলো না। কিন্তু যাকে সে ছবির বিষয় করে তুলেছে তার তো অনুমতির প্রয়োজন আছে। সেই ন্যূনতম সৌজন্যবোধটুকু তো একজনের থাকা দরকার। সে শিল্পী হোক আর যাই হোক। অন্তত তাকে তো ভালো মানুষ বলা যাবে না। আর এই ভালো মানুষ নয় এমন শিল্পীর কর্মকাণ্ডকে আর প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। জুলিয়া ভাবে এর একটা বিহিত দরকার। সরাসরি তাকে গিয়ে বলতে হবে এটা ছবি আঁকার জায়গা নয়। আপনি আর এখানে ছবি আঁকবেন না। ছবি আঁকতে হলে আপনি নদীর ধারে, ফয়’স লেকে, পতেঙ্গা, ওয়ার সিমেট্রি, ডিসি পাহাড় এরকম কত জায়গা আছে। সেখানে যান। আপনি এখানে আর আসবেন না। এভাবে শিল্পীর কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে বারবার উদ্যত হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জুলিয়া পারে না। এর কারণ সে নিজেই। জুলিয়ার বিরুদ্ধে তার সহকর্মী থেকে শুরু করে বেশ কয়েকজনের অভিযোগ আছে। জুলিয়া সৌজন্য জানে না। একজন পরিচিত মানুষকে দেখলে তার দিকে মিষ্টি হেসে কুশল জিজ্ঞাসা করা, সম্বোধন করা, মানুষের খবরাখবর নেওয়া, ইত্যাকার অতি সাধারণ স্বাভাবিক আচরণগুলো তার মধ্যে দেখা যায় না। বয়সের চঞ্চলতা তার মধ্যে নেই। বন্ধুহীন। উচ্ছ্বাসহীন একটা জীবন তার। কাজের বাইরে অপ্রয়োজনে মানুষ কত কথা বলে, কিন্তু জুলিয়ার মুখ থেকে হিসেবের বাইরে যেন একটি শব্দও উচ্চারিত হয় না। বাতিঘরে বইয়ের ব্যাপারে কতজন কত অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে তাকে। জুলিয়া সেসব প্রশ্নের কোনো জবাব দেয় না। না শোনার ভান করে। একজন সেলসম্যানের এই প্রধান গুণটি তার নেই। এই জন্য তাকে সহকর্মীদের নানা কথা শুনতে হয়েছে। দীপংকরও তাকে এ নিয়ে বলেছে। দীপংকর বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা। কর্ণধার। চট্টগ্রামের মতো বড় একটি শহরে সবার জন্য দর্শনীয় এই কেন্দ্রটি দীপংকরের বহু পরিশ্রমের ফসল। দীপংকর জুলিয়াকে বলেছে, দেশ-বিদেশের বই সম্পর্কে তোমার ধারণা আছে। বইয়ের ব্যাপারে তোমার আগ্রহ আছে। কোন বই কোথায় আছে সে সম্পর্কে তুমি খুব জানো। লেখক প্রকাশক সম্পর্কেও তোমার ধারণা দারুণ। বইয়ের প্রতিষ্ঠানে এসব যোগ্যতা জরুরি। কিন্তু আরও বেশি জরুরি তোমার আচরণ ঠিক করা। মানুষের সঙ্গে সহাস্যে কথা বলাটাও জরুরি। এই কাজটা সে পারে না। কারও সঙ্গে সহজ হয়ে কথা বলতে সে কখনো পারেনি। সেই ছোটবেলা থেকে এক ধরনের মানসিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তার ভেতরে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে। তার জন্য বন্ধুত্বও হয়নি কারও সঙ্গে ভালোভাবে। কারও খুব কাছে আসতে গেলে, কারও সান্নিধ্যে এলে অনেক ছোটবেলার একটি মুখ জুলিয়ার মনে পড়ে যায়। একটা করুণ, কান্নামাখা বিষণ্ন মুখ জুলিয়ার সমস্ত আনন্দকে ম্লান করে দেয়। সে আর মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারে না। নিজের এই দোষের কথা সম্পর্কে জুলিয়া নিজে অবগত আছে। এখন যদি সে এভাবে কাউকে এখান থেকে বের করে দেয়, তবে নির্ঘাত দোষটা তার ওপর এসে বর্তাবে। সবাই তার নেতিবাচক আচরণের কথাই তখন তুলে ধরবে। তার চেয়ে বরং সে নিজে কিছু না বলে দীপংকরকেই কথাটা বলবে। সেই ব্যাপারটা সামলাবে। দীপংকরকে কথাটা বলার আগে জুলিয়া আরও কয়েকদিন ছেলেটাকে দেখে। মুখভর্তি দাড়ি, লম্বা চুল। জিন্সের প্যান্ট, গোল গলা কালো টি শার্ট। ছেলেটিকে দেখে মনে হয় না সে কোনো অপরাধ করতে পারে। চাহনি শিশুর মতো। আর এই শিশুসুলভ চেহারা দিয়ে সে কিনা আড়ালে আড়ালে একটা মেয়ের ছবি আঁকছে। জুলিয়া ভাবে আসলে মানুষের চেহারাটা বড় কিছু নয়। তার ভেতরটাই সব। এই উসকোখুসকো চুলের শিল্পী ছেলেটিকে দেখলে যতই স্মার্ট আর ভদ্র মনে হোক না কেন সে যে ভেতরে ভেতরে ভিজেবেড়াল তা তো সন্দেহ নেই। নইলে এরকম করে কেউ এমন ছবি আঁকে। নিজেকে সে কী ভেবেছে এতো? ছবি আঁকলেই কি সবাই নিজেকে ধন্য মনে করবে। জুলিয়া এরকম মেয়ে নয়। সেই স্কুল বয়স থেকে এখন বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে চাকরি জীবনে আসা পর্যন্ত কত প্রস্তাব, কত সম্বোধন সে ফিরিয়ে দিয়েছে। পারিবারিকভাবেও বিয়ের প্রস্তাব আসছে এখন। কিন্তু সে বিয়ে করবে না। বাবা মাকে সে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে। সেই ছোটবেলা থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর সে খুঁজে ফিরছে। একটা মুখের সন্ধানে সে আছে। সেই মুখের সন্ধান যতদিন সে না পায়, সেই প্রশ্নের উত্তর যতদিন সে না পায় ততদিন তার মনে শান্তি আসবে না। ততদিন কাউকে সে ভালোবাসতে পারবে না। তাই যতই ছবি এঁকে, কিংবা অন্যকিছু রংঢং করে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করুক না কেন, সে সাড়া দেবে না। সে আগে থেকেই মনের মধ্যে একটা বর্ম, একটা আগল তৈরি করে রেখেছে। সেই আগল ভেঙে কেউ তার দুয়ারে টোকা দিতে পারেনি। এই নাম না জানা শিল্পীও পারবে না। জুলিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে নিজে কিছু বলবে না। যা বলার সে তার প্রতিষ্ঠানের মালিককেই বলবে। কিন্তু বলবে বলবে করেও অনেক দিন চলে যায়।
ইতিমধ্যে বিনা প্রতিবাদে শিল্পী যেন আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আগে আড়ালে আবডালে তার দিকে তাকালেও এখন সরাসরি তার দিকে তাকায়। ব্যাপারটি এখন সবাই বুঝতে পারে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সবাই চুপ থাকে। কেউ কোনো কথা বলে না।
শেষ পর্যন্ত দীপংকরের কানে তুলল ব্যাপারটি। সব শুনে সে চুপচাপ ছিল। এভাবে হুট করে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলার লোক সে নয়। বেশ কিছুক্ষণ ভেবে জুলিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল- একটা ছেলে বাতিঘরে এসে ছবি আঁকছে। প্রতিদিন অনেকেই এসে ছবি তোলে, একজন না হয় ছবি আঁকল। তাতে তোমার সমস্যা কি? ও তো আর আমাদের প্রতিষ্ঠানের কোনো ক্ষতি করছে না। প্রতিষ্ঠানের প্রতিদিনের কাজের ব্যাঘাত করছে না। তাহলে আমি কীভাবে তাকে বাধা দেব, বা চলে যেতে বলব।
দীপংকরের কথা শুনে হতাশ হলো জুলিয়া। সে আসলে ব্যাপারটা বোঝাতে পারেনি। আর তাই সে এবার আসল কথাটিই বলে ফেলল- দাদা ও আমারই ছবি তোলে। আমার দিকে প্রায় সময় তাকিয়ে থাকে।
এবার হো হো করে হেসে ফেলল দীপংকর। এটা তো খুব স্বাভাবিক। বাতিঘরে এসে ছবি আঁকবে। আর তুমি বাদ যাবে তাতো হয় না। তুমি সুন্দরী, স্মার্ট। এরকম সুন্দরী স্মার্ট আমাদের চট্টগ্রাম শহরে অনেক আছে। কিন্তু তুমি এক্কেবারে আলাদা। তোমার উচ্চতা, তোমার আদল, লম্বা চুল, মুখের তিল, তোমাকে অনেক দূর থেকে চিহ্নিত করা যায়। তাই তোমার ছবি আঁকতে একজন শিল্পী আগ্রহী হতেই পারে।
-হুম, আঁকতে পারে দাদা, কিন্তু একটা সৌজন্য সে তো দেখায়নি। অনুমতি নেয়নি। যতবড় শিল্পী হোক, একটা মেয়ের ছবি তোলার আগে সে একটু জিজ্ঞেসও করবে না?
দীপংকর বুঝল মেয়েটি বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছে। একেবারে সিরিয়াস মুড নিয়ে সে কথা বলছে। এখন বিষয়টিকে আর হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। খুব কৌশলে তাকে ব্যাপারটি মোকাবিলা করতে হবে। কারণ জুলিয়ার বিষয়টি দীপংকর ভালোভাবে জানে। তার দায়িত্বজ্ঞান এবং সংবেদনশীলতা খুব প্রখর। কিন্তু তারপরও তার আচরণ স্বাভাবিক নয়। মানুষের সঙ্গে সে মেলামেশা করতে পারে না। বন্ধুত্বে তার একটা প্রবল অনীহা আছে। এই বয়সে মেয়েরা প্রেম করবে, প্রেম না করুক বন্ধুতা করে। অনেকের সঙ্গে মিশবে। হৈহল্লা করবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিক আচরণটা তার মধ্যে নেই। এক ধরনের সিজোফ্রেনিক সে। মানুষকে অকারণ সন্দেহ। অকারণে মানুষের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার। মুখে তার হাসি নেই। সবসময় মলিন। এ নিয়ে তার মা-বাবা খুবই উদ্বিগ্ন। মেয়েকে নিয়ে তারা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছেও গেছে। এরকম কেন হলো তাদের মেয়ে তা নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। চিকিৎসক জুলিয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন। মা-বাবার সঙ্গেও কথা বলেছেন। শেষে তিনিই সিদ্ধান্ত দিলেন মেয়েকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে দিন। তাকে এমন একটা জায়গায় কাজ দিন যেখানে মানুষের আনাগোনা থাকে। সেরকম কর্মক্ষেত্র এখন প্রচুর। ব্যাংক, মোবাইল কোম্পানি, বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির করপোরেট হাউস এরকম কত প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু সেখানে একটা অসামাজিক, সদাবিষণ্ন, মূক হয়ে থাকা সৌজন্যহীন একটা মেয়েকে তারা কেন রাখবে? অনেক ভেবে চিন্তে জুলিয়ার বাবা দীপংকরের শরণাপন্ন হয়। বাতিঘরের নিয়মিত ক্রেতা তিনি। নিজের গ্রামের মানুষ। বহুদিনের পরিচিত। তিনি দীপংকরকে স্নেহ করেন। দীপংকর তাই এই সাহায্যটা তাকে করল। মেয়েটাকে বাতিঘরে কাজ দিল। তাতে ক্ষতি হয়নি। মেয়েটি খুব সহজে কাজ বুঝে নিয়েছে। পরামর্শে, পরিচর্যায় সে আগের চাইতে অনেক স্বাভাবিক হয়েছে। ধীরে খুব ধীরে তার অগ্রগতি হচ্ছে। ঠিক এরকম একটা সময়ে বাতিঘরে এক আগন্তুক, অজানা শিল্পীর আগমন। এসেই পুরো ব্যাপারটাকে যেন অন্যদিকে নিয়ে গেল। ব্যাপারটার সমাধান তাকে খুব সাবধানে করতে হবে।
দীপংকর বেশ কতক্ষণ চুপ থেকেছে। কিন্তু উত্তরের আশায় বসে আছে মেয়েটি। মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে সে জবাব দেয়- নিশ্চয়, তোমার অনুমতি ছাড়া কেউ তোমার ছবি তুলবে তাতো হয় না। এমনিতে কিন্তু ছবি আঁকার বিষয়টি খারাপ না। তবে একটা ব্যাপার ..
কথা শেষ করার আগেই উদগ্রীব জুলিয়া প্রশ্ন করে বসল- কি ব্যাপার?
হুম- দীপংকর বলে যায়- ব্যাপারটা হলো, ছেলেটা যে তোমার ছবি আঁকে তার তো কোনো প্রমাণ নেই। সব অনুমানের ওপর তুমি বলছ। আর সে যদি সত্যি সত্যি তোমার ছবি আঁকে, তাহলে ধরে নিতে পারি, তোমার ভাব দেখে সে ভয় পেয়ে তোমাকে কিছু বলছে না। এমন হতে পারে না? তোমাকে সে ভয়ে কিছু বলছে না। সে আসলে তোমাকে ভালোবাসে।
না- হঠাৎ করে চিৎকার দিয়ে প্রতিবাদ করে উঠল জুলিয়া।
কিসের না? দীপংকর প্রশ্ন করে বসল- কেউ তোমাকে ভালোবাসতে পারে না? তুমি যেভাবে গম্ভীর হয়ে, মুখ গোমরা করে থাকো সেটা কিছুতেই তোমার বয়সের সঙ্গে মানায় না। তোমার ভাবগতি বুঝে হয়তো ছেলেটি ভয়ে আর এগিয়ে আসছে না।
দীপংকরের কথা শুনতে শুনতে মেয়েটি ফুঁপিয়ে উঠল। থরথর করে কাঁপতে লাগল। তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এসেছে। সেই ঝাপসা দৃষ্টি দিয়ে দীপংকরের দিকে তাকিয়ে সে বলল না, আমাকে কেউ ভালোবাসতে পারে না। আমি ভালোবাসার যোগ্য নই। কাউকে ভালোবাসার অধিকার আমার নেই।
এরকম একটা আবেগঘন মুহূর্তে দীপংকর কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। আপাতত মেয়েটিকে শান্ত করতে চায় সে। কিন্তু সে আসলে বুঝতেই পারছে না মেয়েটি কেন এমন কথা বলছে। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে- তুমি রূপে যেমন অনন্যা, তেমনি গুণেও অসাধারণ। তোমার মতো কয়টা মেয়ে আছে আমাদের দেশে? তুমি কী করে মাপলে তোমার যোগ্যতা। কীভাবে তুমি বুঝলে তোমার ভালোবাসার অধিকার নেই?
-দাদা, আমি একজনকে খুব কষ্ট দিয়েছি। কেউ যদি ভালোবাসার কথা বলে, কেউ যদি আমার সঙ্গে আপন হয়ে কথা বলতে চায়। তখন একটি মলিন মুখ আমার চোখে ভেসে ওঠে। আমি দেখি একটি ছেলেকে আমি তিরস্কার করে তাড়িয়ে দিচ্ছি, আর সে কেঁদে কেঁদে বারবার পিছন দিকে তাকাতে তাকাতে ফিরে যাচ্ছে।
দীপংকরের মনে হলো বহু দিনের জমে থাকা কুয়াশার আস্তরণ আজ বুঝি সরতে বসেছে। মানুষের প্রতি জুলিয়ার অদ্ভুত আচরণের রহস্যটা আজ সে নিজেই উন্মোচন করছে। যা এতটা বছর সে নিজেই লুকিয়ে রেখেছে। কাউকে বলেনি। ব্যাপারটি তার কাছে খুবই আশাব্যঞ্জক বলে মনে হলো। মেয়েটি কাঁদছে। মনে হচ্ছে বহু বহু যুগের একটি ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি যেন আজ জেগে উঠেছে। তার কান্নায় দীপংকরের ভেতরেও যেন ধস নেমেছে। দীপংকর বলল, কী হয়েছিল তোমার? কাকে তুমি কষ্ট দিয়েছ? আজ তোমার সব বলা উচিত। আমার মনে হয়, এই কথাগুলো তোমার অনেক আগে প্রকাশ করা উচিত। যাকে তুমি কষ্ট দিয়েছ, তার কাছে ক্ষমা চাও। তার সঙ্গে বন্ধুত্ব কর। তাকে ভালোবাসা দিয়ে কাছে ডাকো।
এবার আবেগে ভেসে গেল মেয়েটি, কোথায় পাবো তাকে? আমি তো তার নাম চেহারা সব ভুলে গেছি দাদা। আমি তাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছি। তাকে ছাড়া আমি আর কাউকে ভালোবাসতে পারব না।
-সে কোথায়?
-আমি জানি না।
-তবে যে বললে ভালোবাসো? তাকে ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসতে পারবে না?
-ঠিক। একদম ঠিক। আমি আমার ছোটবেলার সঙ্গীটাকে ভালোবাসি। তাকে আমি খুঁজে ফিরছি। সেই ছোটবেলায় দেখেছি। আর দেখিনি। এতদিনে সে নিশ্চয় আমার মতো বড় হয়েছে। আমি তাকেই চাই।
-কি হয়েছিল সেই ছোটবেলায়? -দীপংকর খুব কৌতূহলী হয়ে জানতে চায়।
জুলিয়ার আবেগও আজ যেন সব আবরণ ছেড়ে উঠে এসেছে। তারও মনে হলো নিজের ভেতর একটা কষ্টকে চাপিয়ে রেখে এতদিন সে ভুল করেছে। বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের এক অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটে গেছে। প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কত অচেনা মানুষের সঙ্গে মানুষে মানুষে বন্ধন হচ্ছে। এরই মধ্যে তার সেই ছোটবেলার বন্ধুও তো আছে নিশ্চয়। সেও নিশ্চয় অন্তর্জালছিন্ন মানুষ নয়। সেও তো অন্তত ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে পারত- বন্ধু আমি তোমাকে খুঁজছি।
দীপংকরের কাছে সে তাই সব রহস্য উন্মোচিত করে। ইতিহাসের অজানা অধ্যায় যেন বেরিয়ে আসছে গোপন কোনো সূত্র থেকে। অবশ্য পুরোপুরি উন্মোচন কখনো সম্ভব নয়। চলচ্চিত্রের ফ্ল্যাশব্যাকের মতো গতিময় নয় এই ঘটনা। বরং কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন স্থির চিত্রের সমন্বয়ে রচিত জীবনের এই পুরোনো পর্বটি, যা জুলিয়ার জীবনে বিরাট প্রভাব ফেলে রেখেছে। স্পষ্ট নয়। প্রাচীন চিত্রকলার মতো রহস্যে ভরা। শীতের কুয়াশায় ঘুমন্ত নদীর মতো। জুলিয়ার মনে পড়ে। সে সবে মাত্র স্কুলে যাচ্ছে। কিংবা তারও বেশি। দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণি। হুম এতটাই ছোট। পাশের বাসা। সে বাসায় তার বয়সী একটি ছেলে। তার ঘরভর্তি কত খেলনা। লাল গাড়ি। সেই খেলনাগুলোর প্রতি তার খুব আকর্ষণ। একদিন খেলতে খেলতে একটা গাড়ি বোধহয় সে নিজের অজান্তে নিয়ে এসেছিল। ঘটনা কিছুটা মনে পড়ে, আবার হারিয়ে যায়। মনে পড়ে মায়ের খুব কঠিন মুখ। থাপ্পড়। একটি গাড়ি জোর করে কেড়ে নিল মা তার কাছ থেকে। কেড়ে নিয়ে গাড়িটা যে ঘর থেকে এনেছিল হয়তো তাদের ফিরিয়ে দিয়েছিল। এরপর অন্য একটা চিত্র। বাইরের খোলা জায়গা। মন খারাপ করে শিশু জুলিয়া কাঁদছে। আরেকটা শিশু একটা গাড়ি নিয়ে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। গাড়িটি সে দিতে চায়। জুলিয়া কাঁদছেই। শিশুটি কাছে এসে জুলিয়াকে জড়িয়ে ধরে। জুলিয়ার খুব রাগ হয়। এক ঝটকায় সরিয়ে দেয়। ধাক্কা দেয়। তাড়িয়ে দেয়। শিশুটি মুখ মলিন করে। কেঁদে ফেলে। কাঁদতে কাঁদতে পিছন ফিরে ফিরে চায়। জুলিয়া মুখ ভার করে বসে থাকে।
মনে পড়ে আরও একবার শিশুটি একটা পুতুল নিয়ে তাকে দিতে চেয়েছিল। এবারও সে নেয়নি।
আরও একটা ছবি মনে পড়ে জুলিয়ার। বাসা থেকে বাবার সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিল। বাবার মোটরসাইকেলে উঠবে। এমন সময় তাকে দেখা গেল। সঙ্গে আরেকটা ছেলে, একই বয়সী। দুজনে তাকে দেখে কী যেন বলল। আঙুল দিয়ে তাকে দেখাল। তার দিকে তাকিয়ে আছে দুজন। একটু পর একজন তার দিকে আসতে লাগল। বাবা মোটরসাইকেল স্টার্ট দিল। ছেলেটি দাঁড়িয়ে গেল। মুখটা মলিন করে চলে গেল। তাও বারবার পেছন দিকে তাকাচ্ছিল।
এরপর? দীপংকর জানতে চায়।
এরপর আমাদের বাসা বদল হয়ে যায়, নাকি তারা চলে যায় আমি জানি না। আমার মনে নেই। আমিও ভুলে গিয়েছিলাম। ব্যাপারটা আমার মাথা থেকে চলে যায়।
-ভুলে গিয়েছিলে। আবার উঠে এল কি করে? যা তোমার জীবনের ওপর এতবড় প্রভাব ফেলল?
-আমি তখন অনেক বড় হয়েছি। ক্লাস ফাইভে পড়ি। একদিন আমি স্বপ্নে দেখি ছেলেটি একটা লাল টুকটুকে গাড়ি নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
-তারপর?
থ তারপর আমি সারাদিন সেই স্বপ্ন নিয়ে ভাবতে থাকলাম। এবং আমি কদিন পর পর সেই লাল টুকটুকে গাড়ি, সেই মলিন মুখ, সেই ভালোবাসার মানুষটাকে দেখতেই থাকলাম। আমি আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম। আমার আর কাউকে ভালো লাগল না। কারও সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হলো না।
দীপংকরের কাছে মনে হলো সে আসলে কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলছে না। আসলে সে একটা রহস্য উপন্যাসের চরিত্রের সঙ্গে আলাপ করছে। এরকম কি আসলে হয়? ছোটবেলার একটা ছোট ঘটনা কী এরকম দূরপ্রসারী কোনো প্রভাব কারও জীবনে ফেলতে পারে? হয়তো কখনো কখনো ফেলে। আর তার প্রমাণ তো সে নিজের চোখেই দেখল।
দীপংকর আসলে নিজেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে কোন বিষয়কে প্রাধান্য দেবে সে নিজেই বুঝতে পারছে না। অনেক ভেবেচিন্তে তাকে জবাব দিতে হবে।
বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে সে জুলিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, ছোটবেলার একটা ঘটনা, যা এখন শুধু স্বপ্ন তা নিয়ে এরকম নিজেকে দুনিয়ার সকল কিছু থেকে আলাদা করে ফেলা, এভাবে নিজেকে বঞ্চিত করে ফেলা কি উচিত? দেখ তুমি নিশ্চয় এ জীবনে বহু ছেলের বন্ধুত্বের, ভালোবাসার প্রস্তাব পেয়েছ। নিশ্চয় অনেকে তোমাকে ভালোবাসে। তুমি অবলীলায় সব প্রত্যাখ্যান করেছ। শুধু একটা কাল্পনিক চরিত্রের জন্য।
জুলিয়া বলে, কাল্পনিক নয় দাদা, সে তো সত্যি।
-সত্যি, কিন্তু রূপকথার চাইতেও বেশি কাল্পনিক। ছেলেটা কি মনে রেখেছে এই ঘটনা? তা ছাড়া তুমি স্বপ্নে দেখেছো ছেলেটাকে। মানুষ কত কিছু স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নে দেখে মানুষ পাহাড় থেকে পড়ে যায়, আকাশে ভাসে। সমুদ্রে সাঁতার কাটে। উদ্ভট উদ্ভট ঘটনা সব স্বপ্নে ঘটে। তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল ঘটাতে গেলে তো বিপর্যয় ঘটবে। একটা স্বপ্নের কথা মনে রেখে তুমি পুরো জীবনটাকে কেমন অস্বাভাবিক করে ফেলেছ।
একনাগাড়ে অনেক কথা বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মেয়েটার কান্না থেমেছে। কিন্তু চোখে, কপোলে অশ্রুর রেখা। কেমন অসহায় দেখাচ্ছে তাকে। দীপংকরের মনে হয় মেয়েটা তার কথাগুলোর গুরুত্ব দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে। এবার সে আসল কথাটি বলতে চায়। মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে স্নেহ ভরা কণ্ঠে বলে- তোমার বাস্তবতার রঙ বড় মলিন। বর্ণিল নয়। একা নিঃসঙ্গ জীবন তোমার। তাই রূপকথার মতো স্বপ্নের একটা ব্যাপার তোমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। বাস্তবতাকে ভালোবাসো। এই যে পৃথিবী, এখানকার মানুষ, দেশ, সমাজ, প্রতিদিনকার ঘটনা নিয়ে ভাবো। যে ছেলেটা তোমার ছবি আঁকে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব কর। তার সঙ্গে কথা বল। দেখবে তুমি অনেক অনেক ভালো থাকবে। আর কোনো স্বপ্ন তোমাকে তাড়া করবে না।

দীপংকরের এই সমাধানের পক্ষে হয়তো যুক্তি আছে। হয়তো এভাবেই সমাধান হতেও পারে। কিন্তু কেন জানি মন থেকে সায় পায় না সে। তার মনের জড়তা সে কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারে না। তবে একটা ব্যাপার সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। বিনা অনুমতিতে একটা মানুষ তার ছবি আঁকবে, সেটা তো তার অপরাধ। সেই অপরাধটুকু আমলে না নিয়ে দীপংকার দা এটা কী বলল? মনে মনে ভাবে জুলিয়া। কোথায় তাকে শাসিয়ে দেবে, তা না করে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে বলছে। জুলিয়া ছেলেটির দিকে তাকায়। আজ এখনো কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামায়নি। কনুইটা দিয়ে টেবিলে ঠেস দিয়েছে। আর করতল দিয়ে ঢেকে রেখেছে চিবুকসহ মুখটা। কী যেন ভাবছে। বাইরের জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে। ওখানে হাওয়া আর জলের তা-ব। চট্টগ্রামের বাতিঘরটা জাহাজের আদলে তৈরি। প্রকৃতির আজ এমন অবস্থা যেন মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি সে ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ কোনো সমুদ্রে ভাসমান। আর তার সমস্ত অস্তিত্ব নিয়ে জাহাজটা দুলছে। দীপংকর দা বলেছে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে। তার সঙ্গে কথা বলতে। সে ঠিক করেছে তার সঙ্গে ঝগড়া করবে। কোনটা সঠিক হবে? যদি সে ছেলেটা সত্যি সত্যি ভালোবাসে তবে তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে জীবনের এই পর্যায়ে এসে আরও একটি দুঃসহ স্মৃতি তৈরি করা ঠিক হবে? সেই ছোটবেলায় একজনের উপহার ফিরিয়ে দিয়েছিল। সেই ছেলে তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এখন এই যৌবনে এসে আরেকটি একইরকম ঘটনার জন্ম দেবে সে? বিচলিত হয়ে ওঠে জুলিয়া। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে বাইরে। তার আলো বাতিঘরে এসে ঢুকছে। কয়েক সেকেন্ড পর একটা প্রচ- শব্দ হবে। মেঘের রাজ্যে তোলপাড় চলছে। আর জুলিয়ার ভেতরেও তোলপাড়। না, দুর্ব্যবহার করা যাবে না। ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। সে স্থির সিদ্ধান্ত নেয়। কথা বলবে সে শিল্পীর সঙ্গে। শিল্পী বাইরে থেকে দৃষ্টি ঘরের ভেতরে আনে। অলস ভঙ্গিতে কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামায়। তারপর একটা মোটা খাতা বের করে। ব্যাগ থেকে বের করে আনে পেন্সিল। শুরু হলো তার আঁকা। জুলিয়া প্রস্তুত। এবার সে কাছে যাবে। কাউন্টার থেকে উঠে যাওয়ার আগে একবার পায়চারি করে। বুকটা কাঁপছে। বৃষ্টির প্রকোপে চট্টগ্রাম শহর ডুবে যাচ্ছে। জুলিয়াও যেন ডুবে যাচ্ছে। যাওয়ার আগে সে একবার ভেতরের একটা রুমে গিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করল। বাইরে এল। শিল্পী ফোনে কথা বলছে। দাঁড়াল। খাতাটা তার টেবিলে। কথা বলতে বলতে হাঁটছে। আর হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে গেল বৃষ্টির মধ্যে।
এমন ঝড়জলের দুর্যোগের মধ্যে কেউ বের হয়? একটু অপেক্ষা করতেই পারত। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টি। আর তাতেই ডুবে গেল একটা নগর। লণ্ডভণ্ড হলো অনেক কিছু। তোলপাড় একটা জীবন। ঝড় থেমেছে। কিন্তু জুলিয়ার ভেতর আরেকটা ঝড় শুরু হলো। এমন ঝড় জীবনে আর কখনো আসেনি। যে ঝড় বহু বছরের একটা অসমাপ্ত গল্পের পরিণতির ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে যেন। বৃষ্টিকে গ্রাহ্য না করে ছেলেটি কেন বেরিয়ে গেল? সে কি জুলিয়াকে এড়াতে চায়? জুলিয়া তার সঙ্গে কথা বলতে চায়, এটা কি সে টের পেয়েছে? ভিজে ভিজে ছেলেটি কোথায় গেল? খাতাটি কেন ফেলে গেল? ছেলেটি কী দেখাতে চায় এতদিন সে কী এঁকেছে? জুলিয়ার মনে কৌতূহল জেগেছে। নিজের অজান্তে গিয়ে কখন খাতাটি নিজের হাতে তুলে নিল। একটি অতি পুরাতন খাতা। বহুদিন পড়ে থাকার পর খুঁজে পাওয়া প্রাচীন পা-ুলিপির মতো। মলাট ছিন্নভিন্ন। ভেতরের পাতাগুলো অবিন্যস্ত। জোড়া লাগানো। মলাট উল্টায় জুলিয়া। আর সঙ্গে সঙ্গে যেন অতীতের একটা পর্বে পৌঁছে গেল। একটি লাল টুকটুকে গাড়ি। শিশুর হাতের আঁকা। মনে হয় আলাদা কোনও কাগজে আঁকা। এখানে সেঁটে দেওয়া হয়েছে। লৌকিক জীবনে এরকম অলৌকিক ঘটনা কীভাবে ঘটে? এটা কী সেই গাড়ি, যে গাড়ি তার জীবন চলার পথ অচল করে দিয়েছে? জুলিয়া ভাবতে পারে না। স্থান কাল পাত্র সবকিছু উহ্য হয়ে গেছে তার চারপাশ থেকে। নিমেষে পৃথিবীর এই প্রান্ত থেকে অন্য এক সীমানাবিহীন প্রান্তরে চলে যায়। তার হাতে কোনো তরুণের যা ইচ্ছা আঁকার কোনো খাতা নয়, এটা যেন তার নিয়তি। এটি যেন তার নিজেরই জীবনের বৃত্তান্ত। জুলিয়া জগতের সকল কিছু ভুলে গিয়ে একটা ঘোরের ভেতর পাতা উল্টাতে থাকে। আর উন্মোচিত হতে থাকে নিজেরই হারিয়ে যাওয়া অতীত। সে খাতায় দেখতে পায় একটি করুণ শিশুর মুখ। তার কপোলে জলের ধারা। এই ছবিটাও আলাদা কাগজে আঁকা। এখানে সাঁটানো। একটি পুতুল। এটা কী সেই পুতুল- যেটি তাকে সে দিতে চেয়েছিল? এটা কী সেই গাড়ি, যেটি মা তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল? এই খাতাটি তাহলে কী তার শৈশব? এই শিল্পী তো তাহলে সেই ছেলে, কাঁদতে কাঁদতে পেছন ফিরে তাকাতে তাকাতে যে চলে গিয়েছিল। আবার ফিরে এসেছিল স্বপ্নে। একি তাহলে সেই যাকে সে ভালোবেসে ফেলেছে। যার জন্য তার জীবন একরকম প্রতিবন্ধকতায় অচলায়তনে পরিণত হয়েছে? তাহলে এতদিন কোথায় ছিল সে? এতদিন কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল এই খাতা- যে খাতার পাতায় পাতায় তারই জীবন, তারই প্রতিকৃতি। প্রতিটি পাতায় তার অতীত। তার বর্তমান। একটি খাতায় যেন একটি পুরো জীবন। এরকম একটা জীবন নিজের কাছে আগলে রেখেছিল শিল্পী। আর একটা জীবনকে এভাবে ফেলে রেখে মেঘের দিনে কোথায় গেল সে। আবার আসবে তো? জুলিয়ার জীবনে নতুন একটা পর্ব শুরু হলো- সেটা অপেক্ষার পর্ব।

৩.
অনন্ত এরকম চায়নি। খাতাটা সে এভাবে ফেলে আসতে চায়নি। জুলিয়াকে সে খাতাটা দিতেই চেয়েছিল। কিন্তু এভাবে টেবিলের ওপর ফেলে রেখে নয়। জুলিয়া খাতাটা দেওয়ার আগে একটা ভূমিকার দরকার ছিল। একটা প্রস্তুতির। সেই প্রস্তুতিই সে নিচ্ছিল। সেই প্রস্তুতি পর্ব শেষ হওয়ার আগেই খাতাটি তার হস্তগত হয়ে গেছে। এর জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। এখন যে নাটকের মুখোমুখি হয়েছে তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না সে। জুলিয়া তার জীবনে এভাবে উপস্থিত হবে সে ভাবতে পারেনি। জুলিয়াকে শৈশবে প্রথম দেখেছিল মামার বাড়িতে। সে ছিল মামাতো ভাই সুতনুর বন্ধু। পাশের বাসার মেয়েটির সঙ্গে সুতনু সারাদিন খেলত। সুতনুর পুতুল খেলার, গাড়ি খেলার সঙ্গী ছিল। দুজনের মধ্যে ছিল অদ্ভুত এক ভাব। আবার সারাক্ষণ ঝগড়া লেগেই থাকত। পরের দিন আবার ভুলে যেত। অনন্ত যেবার মামার বাড়িতে গিয়েছিল তখন তাদের ঝগড়ার পালা চলছিল। তার জন্য সে কয়দিন সে সুতনুদের বাসায় যায়নি। সুতনু বেশ কয়েকবার বন্ধুর রাগ ভাঙাতে চেয়েছিল। এমনকি একটা গাড়ি, একটা পুতুলও দিতে চেয়েছিল। কিন্তু শৈশবের এরকম বহু ঘটনা তো মানুষের জীবনে ঘটেই থাকে। এরকম কত তুচ্ছ তুচ্ছ গুচ্ছ ফুলের মালা দিয়েই তো জীবন রচিত হয়। এ কথা মনে রাখার বা থাকার কারণ কি? কীভাবে অনন্ত মনে রাখল। এই ঘটনা অনন্তের মনে থাকার বা মনে পড়ার বিশেষ কারণ আছে। ছোটবেলা থেকে অনন্তের মতো সুতনুও ছবি আঁকত। জুলিয়ার সঙ্গে যেদিন তার ঝগড়া হয়েছে, সেদিন সে জুলিয়ার ছবি এঁকেছে। সেই ছবিতে জুলিয়ার আদল বোঝা না গেলেও সুতনু সেটি জুলিয়াকেই একেছে। ছোটবেলার ছবি সেরকমই হয়। যে গাড়িটি জুলিয়া তাদের বাসায় নিয়ে গিয়েছিল, আবার তা মা ফেরত দিয়েছিল সেটিরও ছবি এঁকেছিল। এসব কথাও মনে থাকার কথা নয়। মনেও ছিল না। কিন্তু একটা ঘটনা তাকে সব মনে করিয়ে দিল। শৈশবে দুই তিনবার দূর থেকে দেখা জুলিয়াকে বড় হয়ে প্রথম দেখে ভার্সিটিতে। দেখে তার চিনতে ভুল হয়নি। বড় হয়েছে কিন্তু মুখের আদল পাল্টায়নি। তা ছাড়া ডান গালে একটা তিল তাকে সহজে শনাক্ত করা বা চিহ্নিত করা খুবই সহজ ব্যাপার। তাকে দেখে তার সঙ্গে কথা বলার কিংবা পরিচিত হওয়ার ইচ্ছা কখনো জাগে না অনন্তের। সুতনুকে তার শৈশবের বন্ধুকে দেখেছে বলে বলতে গিয়েও ভুলে কিংবা বলার প্রয়োজন মনে করেনি। তাছাড়া সুতনু পড়ে ঢাকায়। তাও চারুকলায়। জুলিয়াকে দেখার অপ্রয়োজনীয় কথাটি কেন যে প্রথমদিন সে সুতনুকে বলেনি তার জন্য এখন তার অপরাধবোধ। সেই অবুঝ বয়সে কার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে, কার সঙ্গে পুতুল খেলেছে তাকে নিয়ে সুতনুর কোনো আগ্রহ থাকতে পারে সেটা তার মাথায় আসেনি। জুলিয়ার কাছে গিয়েও মামাত ভাইয়ের শৈশবের খেলার সঙ্গীর সঙ্গে পরিচিত হয়নি। কারণ সে স্থির নিশ্চিত যে মেয়েটা এটাকে একটা অজুহাত ভাববে। তাই এইচএসসি পাসের পর ভার্সিটিতে ভর্তিপরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় যেদিন প্রথম শাটল ট্রেনে চড়েছিল সেদিন তাকে দেখেও ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেয়নি অনন্ত। অনন্ত ভর্তি হয়েছিল চারুকলায়। তার জীবনের লক্ষ্য সে বড় শিল্পী হবে। চারুকলার ক্লাস হয় নগরে। প্রতিদিন শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরের ক্যাম্পাসে যাওয়ার ঝক্কি তার নেই। এর পর থেকে তার সঙ্গে আর কখনো দেখা হয়নি জুলিয়ার। কিন্তু দুজনের ছাত্র জীবন পার হয়ে যাওয়ার আবারও খুঁজে বের করতে হলো জুলিয়াকে। তার মামাত ভাই সুতনু এখন আর পৃথিবীতে নেই। একটা দুর্ঘটনা তার বাবা-মায়ের কোল খালি করল। পত্রিকার পাতায় খবর উঠেছে দুর্ঘটনায় কেড়ে নিল তরুণশিল্পীর প্রাণ। পত্রিকার পাঠক পড়েছে একটি ছোট খবর। কিন্তু আসলে ওটা ছিল তার মামা-মামির জীবনের বড় বিপর্যয়। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে ওরা জীবনের স্বাভাবিকতাকে হারিয়েছে। তার মা সুতনু সব স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে সারাদিন বিলাপ করে। সুতনুর জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শত শত ছবি, সুতনুর ছোটবেলার খেলনা, তার আঁকা ছবি, নার্সারিতে পড়ার সময় আইডি কার্ড, প্রতিটি পরীক্ষা ফলাফল বিবরণী সব জাদুঘরের সম্পদের মতো গুছিয়ে রেখেছে তার মা। এখন মনে হচ্ছে সেগুলো সংরক্ষণ করাই হয়েছে মস্ত ভুল। সেই সব স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে প্রতিদিন মায়ের কান্না অনন্তের সহ্যের বাইরে। সুতনুর মৃত্যুর পর তার পড়ার ঘরে পাওয়া গেছে একটি খাতা। সেখানে লাল টুকটুকে গাড়ির ছবি। কান্নারত মেয়ের ছবি। চলচ্চিত্রের ছবির মতো সব মনে পড়ে যায় অনন্তের। খাতার এক কোণে সুতনুর সাইন। কোথাও নাম লেখা নেই। তবে একটা প্রতিজ্ঞা লেখা আছে, এই খাতা ভরিয়ে দেব তোমার ছবিতে ছবিতে। সুতনু কি তার শৈশবের বন্ধুটিকে ভুলতে পারেনি। সুতনু কি মেয়েটিকে সেই ছোটবেলাতেই ভালোবেসেছিল। তা কি করে হয়? মানুষ কি এত ছোট বয়সের কথা মনে রাখে। তাহলে ছোটবেলার সেই খাতাটি কেন সে রেখে দিয়েছিল। অনন্ত ভাবতে পারে না। সুতনু যত না তার ভাই, তার চেয়ে বেশি বন্ধু। বন্ধুর ইচ্ছা ছিল মেয়েটির ছবি আঁকবে। বন্ধুর সেই অপূর্ণ ইচ্ছাটি সে নিজেই পূরণ করতে উদ্যত হয়। সে নানা চেষ্টা তদবির করে মেয়েটির ঠিকানা পায়। সে বাতিঘর নামে একটি বইয়ের দোকানে কাজ করে। অনন্ত পরিকল্পনা করে মেয়েটির ছবি এঁকে তার হাতেই খাতাটি তুলে দেবে আর বন্ধুর কথা মনে করিয়ে দেবে। কিন্তু তার এই ইচ্ছা পূরণ হলো না। ছবি আঁকতে আঁকতে খাতার পাতা শেষ হলো না। তার আগেই মেয়েটির হাতে খাতাটা চলে গেল। এখন সব হিসেব নিকেশ পাল্টে দিল সেদিনের ঝড়বৃষ্টি। অনন্ত প্রবল বৃষ্টির মধ্যে খবর পেল তার মামি খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। খাতাটা ফেলে সে সবকিছু ভুলে মামির কাছে যাওয়াটাকে কর্তব্য মনে করেছে। এক সপ্তাহ হাসপাতালে কাটিয়ে কিছুটা সুস্থ হয়ে মামিকে নিয়ে বাসায় যায়। তারপরের দিন বাতিঘরে ফেলে আসা খাতাটি আনতে যাবে। কিন্তু সে জানত তার জন্য অপেক্ষা করছে অন্য নাটক। জুলিয়া তাকেই মনে করেছে তার শৈশবের সেই সুতনু। জুলিয়া তাকে প্রবলভাবে জড়িয়ে ধরেছে সবার সামনে। অঝোর ধারায় কেঁদে ফেলেছে। চিৎকার করে বলেছে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি সুতনু। অনন্ত সুতনু নয়। এ কথা তাৎক্ষণিকভাবে বলাটা কঠিন ছিল। সুতনু মারা গেছে এ সংবাদটা তার মায়ের জন্য বাবার জন্য স্বাভাবিক। কিন্তু এই মেয়েটির জন্য স্বাভাবিক হবে না। সেটা অনন্ত বুঝে গেছে। এত বড় দুর্ঘটনার কথা তাকে কী বলা যাবে? তাহলে কী সে সুতনু হয়েই থাকবে তার কাছে। বন্ধুর ভূমিকায় অভিনয় করে যাবে সারা জীবন? এই প্রশ্নের উত্তর সে কার কাছে পাবে?