গুচ্ছছড়া

আগের সংবাদ

একা এবং অপারাজেয়

পরের সংবাদ

ইস্তাম্বুলের বন্ধুরা

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ৩:১২ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ৩:১২ অপরাহ্ণ

Avatar

তুরস্কে আমার বন্ধুর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে গত বছর সুফীসাধক জালালউদ্দিন রুমীর ওপর প্রামাণ্যচিত্র (মিথাত্স ড্রিম) নির্মাণের পর থেকে ইস্তাম্বুল ও কোনিয়ায় আমার পরিচিতি অনেক বেড়েছে। গত বছর ‘মিথাত্স ড্রিম’ দেখার পর ইস্তাম্বুলের সুফী একাডেমি প্রস্তাব করেছিল তরুণ সুফী সঙ্গীত সাধক হাকান মেনজুসকে নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের জন্য। আমি বলেছিলাম যদি প্রযোজক জোগাড় করে দিত পার হাকানকে নিয়ে ছবি বানাতে আমি অবশ্যই আগ্রহী হব।
হাকান ইংরেজি বলতে না পারলেও গত বার ওর বন্ধু গিটারবাদকে বোরা ইয়েতের দোভাষীর কাজ করায় আড্ডা জমাতে অসুবিধে হয়নি। বোরা যেমন দিলখোলা আমুদে প্রকৃতির হাকান ওর উল্টো লাজুক, নম্রভাষী। হাকানের বাঁশি আগেই শুনেছি। দুবছর আগে কোনিয়ার তরুণ দরবেশ মিথাতকে নিয়ে যখন ছবি বানাচ্ছিলাম তখন ও হাকানের কথা বলেছিল। অল্প বয়সে বাঁশি বাজিয়ে দারুণ নাম করেছে। হাকানের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ইউটিউবে ওর বাঁশি আর বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হয়েছি। দরবেশ না হলেও হাকানের সঙ্গীত আর সাহিত্য সুফীদের মরমিয়াবাদের দ্বারা প্রভাবিত।
গত বছর হাকানের সঙ্গে বোরার যে গভীর বন্ধুত্ব দেখেছিলাম কেন জানি না সেখানে ফাটল ধরেছে। চিঠিতে হাকানের কথা বোরা এড়িয়ে চলে নাকি দুজনই ব্যস্ত, আগের মতো নিয়মিত দেখা হয় না। হাকানের কাছে যখন জানতে চাইলাম বোরা কেন ওর সম্পর্কে আমাকে জানাচ্ছে না তখন বুঝলাম মাঝখানে নারীর আগমন হয়েছে। হাকান গত বছরের মাঝামাঝি লিখেছিল এখন থেকে আমি যেন বোরার বদলে যেনেপের সঙ্গে যোগাযোগ করি। যেনেপ ওর সঙ্গীতের দলে নতুন যোগ দিয়েছে, ভালো গান গায়, অনেকদিন ইউরোপে ছিল, ইংরেজিও ভালো বলতে পারে। তারপর থেকে যেনেপের সঙ্গে পত্রালাপ। এরপর ছবির ব্যাপারে আলোচনার জন্য হাকান আমার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছে সাইপ্রাসের লেখক ও চিত্রনির্মাতা ফেরহাত আতিকের সঙ্গে। ফেরহাতকে চিঠি লিখতেই ও প্রথমে জানতে চাইল আমার সম্পর্কে। ‘মিথাত্স ড্রিম’-এর একটা কপি পাঠিয়ে ওকে লিখলাম যদি আরও জানতে চাও গুগল সার্চ করতে পার। আমাদের বয়সীরা তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলেও এতে অনেক কাজ এত সহজ হয়ে গিয়েছে যে কখনও অবিশ্বাস্য মনে হয়। এর জবাবে ফেরহাত লিখল আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য ও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
প্রথমে কথা ছিল এ বছর (২০১৯) মার্চে তুরস্কে যাব। ‘মিথাত্স ড্রিম’-এ ফরাসি সুফীসাধিকা ফ্লোরেন্সকে কোনিয়ায় এক ঝলক দেখে অনেকে ওর সম্পর্কে আরও জানতে চেয়েছেন। গত জানুয়ারিতে বঙ্গভবনে শেখ হাসিনার নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আলাপ হয়েছিল নতুন ফরাসি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে। তাকে বলেছিলাম, ফ্লোরেন্স অধ্যাপনা করতেন প্যারিসের সর্বোণ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সুফীবাদ নিয়ে গবেষণার জন্য তুরস্কে এসে থেকে গেছেন। সুফীবাদ তাকে এমনই আকৃষ্ট করেছে যে, প্যারিসের আরামদায়ক জীবনযাপন ত্যাগ করে তুরস্কের কাপাদোকিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে অশীতিপর এই ফরাসিনী তিরিশ বছর ধরে সুফী সাধিকার জীবনযাপন করছেন।
ফরাসি রাষ্ট্রদূত বললেন, আপনাদের বাংলাদেশেও এমন একজন ফরাসি মহিলা আছেন, যিনি লালনকে নিয়ে গবেষণা করতে এসে কুষ্টিয়ায় পড়ে আছেন কয়েক বছর ধরে। তিনি তখন নাম বলতে পারেননি। একদিন পর এক ইংরেজি দৈনিকের কাটিং পাঠিয়েছিলেন। তখন জেনেছি বাংলাদেশের দেবোরা জান্নাতের কথা। দেবোরা বয়সে ফ্লোরেন্সের মেয়ের বয়সী হলেও লালনভক্ত এক বাউলকে বিয়ে করে এখন কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে স্থায়ীভাবে আছেন। তখনই ঠিক করেছিলাম দুই ফরাসি সুফীপ্রেমিকা তুরস্কের ফ্লোরেন্স আর বাংলাদেশের দেবোরাকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র বানাব।
কথা ছিল মার্চে যাব, কিন্তু বিধি বাম। কিডনির সমস্যার জন্য স্বস্ত্রীক হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো। ডাক্তার বললেন, ওষুধে সারবে না, অপারেশন করতে হবে। স্ত্রী ডানার অবস্থা আরও খারাপ। মার্চে আর যাওয়া হলো না। বেচারা ফেরহাত মার্চের ১৪ তারিখে ইস্তাম্বুলে আমাদের বৈঠকে আসার জন্য আগেই টিকেট কেটে রেখেছিল, পুরোটা গচ্চা গেছে। আমি বিব্রত বোধ করে চিঠি লিখতেই ফেরহাত আমার স্বাস্থ্য সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিল, প্রিয় বন্ধু, তোমার আরোগ্য লাভের চেয়ে আড়াইশ ডলার কিছুই নয়।
এপ্রিলের মাঝামাঝি ডাক্তার বিদেশ ভ্রমণের সবুজ সংকেত দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তুরস্কের বন্ধুদের লিখলাম মে মাসের ৬ তারিখে যাচ্ছি। পুরনো বন্ধু কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড আদমিয়ের লিখলেন, ১৩ তারিখ তুরস্কের পিস কাউন্সিলের জন্য ফাঁকা রাখবে। তোমাকে নিয়ে সেমিনার করব। ফেরহাত লিখল ও ৭ তারিখে ইস্তাম্বুল আসবে। এ সময় হাকান আর যেনেপও ইস্তাম্বুল থাকবে।
গত বছরই হাকানরা সুফী শিল্পীদের ছোট একটা দল করেছে, যেখানে গাইয়ে, বাজিয়ে, নাচিয়ে সবই আছে। দল গঠনের পর থেকে এত জনপ্রিয় হয়েছে যে প্রত্যেক মাসে ৮/১০টা অনুষ্ঠান থাকে দেশে এবং দেশের বাইরে। ফেরহাত লিখেছিল আমার সঙ্গে দেখা করার জন্যই ও সাইপ্রাস থেকে ইস্তাম্বুল আসবে, আমি কোথায় থাকব জানতে চেয়েছে।
ইস্তাম্বুল গেলে আমি থাকি পর্যটকদের স্বর্গ সুলতানআহমেতের কোনো হোটেলে। এবার আমি আর ফেরহাত ছিলাম হায়া সোফিয়ার কাছে আর্মাগ্রান্ডি হোটেলে। আগে থাকতাম আশকিন হোটেলে, ব্লু মস্ক বা সুলতানআহমেত মসজিদ আর মর্মর সাগরের মাঝঝানে। বাঁ দিকের জানালা খুললে মর্মর সাগর, ডান দিকের জানালা খুললে অপরূপ স্থাপত্যের নিদর্শন, চারশ বছরের পুরনো বিশাল ‘ব্লু মস্ক’। গত দুবছর ধরে আশকিন হোটেল বন্ধ রয়েছে সংস্কারের জন্য।
ইস্তাম্বুলে পশ্চিমের সব পর্যটকের দর্শনীয় স্থানের তালিকার প্রথমেই থাকবে তিনটি স্থান ব্লু মস্ক, হায়া সোফিয়া আর টোপকাপি প্যালেস মিউজিয়াম। সবই সুলতানআহমেত-এ। ব্লু মস্কের ঠিক সামনেই হায়া সোফিয়া, দেড় হাজার বছর আগে বাইজেন্টাইন যুগে বানানো হয়েছিল গির্জা হিসেবে। সে সময় বিশ্বের বৃহত্তম ভবন ছিল বিশাল গম্বুজওয়ালা এই গির্জা। এক হাজার বছর পর অটোমানরা ইস্তাম্বুল দখল করে হায়া সোফিয়াকে মসজিদ বানিয়েছে। পাঁচশ বছর পর কামাল আতাতুর্ক অটোমান রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে তুরস্ককে ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো আধুনিক রাষ্ট্র বানাতে গিয়ে ১৯৩১ সালে হায়া সোফিয়ায় নামাজ পড়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিছু সংস্কারের পর ১৯৩৫ সালে হায়া সোফিয়াকে জাদুঘর ঘোষণা করে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এবার তুরস্ক গিয়ে শুনি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান নাকি বলেছেন হায়া সোফিয়াকে আবার মসজিদ বানাবেন।
ব্লু মস্ক মসজিদ হলেও নামাজের সময় ছাড়া সব ধর্মের পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত। শুধু পোশাকের ক্ষেত্রে কিছু শালীনতা মানতে হয় দর্শনার্থীদের। শট্র্স বা স্কার্ট পরে মসজিদে প্রবেশ নিষেধ। স্কার্ট আর শট্র্স পরিহিতদের আলাদা পোশাক দেয়া হয় মসজিদের প্রবেশদ্বারে। মসজিদ দর্শন শেষে সেই পোশাক ফেরত দিতে হয়। বাইরে থেকে যত না রাজকীয় ভেতরে গেলে চিনেমাটির নীল টালির অপরূপ শিল্পকর্ম, চোখ ধাঁধানো ঝাড়বাতি আর জানালার কাঁচের চিত্রকর্ম যে কোনো দর্শকদের অভিভ‚ত করবে।
মসজিদের বাঁ পাশে প্রাচীরের বাইরে বিরাট খোলা জায়গা, মাঝে দর্শনার্থীদের বসার জন্য কাঠের বেঞ্চ। এরপর বাগান আর ফোয়ারা, তারপরই হায়া সোফিয়া। হায়া সোফিয়া দেখতে গেলে ৬০ লিরা দিয়ে টিকেট কিনতে হয়। তুরস্কের লিরার দাম দিন দিন কমছে। গত বছর এপ্রিলে মুনতাসীর মামুনকে নিয়ে যখন তুরস্ক গিয়েছিলাম তখন এক ডলারে পেয়েছি চার লিরা। এবার তা কমে ছয় লিরা হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতির দিক থেকে তুরস্কের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থা অনেক ভালো। তবে সামাজিক মূল্যবোধের দিক থেকে মুসলমানপ্রধান দেশগুলোর ভেতর তুরস্ক অবশ্যই শীর্ষে।
এবার আমি তুরস্ক গিয়েছি রোজার মাসে। আগেও কয়েক বার রোজার মাসে যেতে হয়েছে। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণার পাশাপাশি সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার, রোজার মাসে হোটেল রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখার সামরিক ফরমান জারি করেছিলেন মোল্লাদের তুষ্ট করে অবৈধ ক্ষমতাদখলকে জায়েজ করার জন্য। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির এ ধরনের মৌলবাদীকরণ ও সা¤প্রদায়িকীকরণ নিয়ে কম প্রতিবাদ করিনি। তুরস্কে ক্ষমতায় ইসলামপন্থীরা, কখনও দেখিনি রোজার মাসে দিনের বেলায় রেস্তোরাঁ বা পানশালা বন্ধ রাখতে।

এমনকি ব্লু মস্কের ঢিল-ছোড়া দূরত্বে দারবিশ কাফেতে উন্মুক্ত স্থানে দিনের বেলা দিব্যি পানাহার চলছে। ২০১২ সালে মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতায় এসে এক বছরের ভেতর পানশালা, নৃত্যশালা সব বন্ধ করে অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে জনরোষে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। তুরস্ক সে পথে যায়নি বলে এরদোয়ানের দল একেপি টানা সতের বছর ক্ষমতায় রয়েছে।
৬ মে ইস্তাম্বুল যাওয়ার আগেই ফেরহাতের সঙ্গে ঠিক করেছিলাম ৭ তারিখে আমরা মধাহ্নভোজে মূল আলোচনা করব। আমরা বলতে ফেরহাত, হাকান, ওর সহশিল্পী ও বান্ধবী যেনেপ এবং অভাজন আমি। ফেরহাতের জন্ম হয়েছে ১৯৭১ সালে, হাকান আর যেনেপ আমার সন্তানদের বয়সী। মিথাতের মতো ওরাও আমাকে নাম ধরে ডাকে।
গতবার তাকসিমের এক রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে দেখেছি তরুণদের ভেতর হাকানের জনপ্রিয়তা। যদিও হাকান নিজেকে আড়াল করার জন্য মাথায় ক্যাপ আর সানগ্লাস পরে গিয়েছিল অটোগ্রাফ শিকারিদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। রেস্তোরাঁ থেকে বেরুবার পর ছেলেমেয়েরা সুদর্শন হাকানকে ছেঁকে ধরেছিল।
ফেরহাত আমার মতো রোজা রাখে না জানতাম। হাকানের ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম না। ফেরহাত জানাল হাকান যখন ট্যুর-এ থাকে তখন রোজা রাখে না, এমনিতে ইসলামের সব অনুশাসন মেনে চলে। ফেরহাত জানতে চেয়েছিল মধ্যাহ্নভোজ কোথায় হবে। আমি ওকে লিখেছিলাম, সুলতানআহমেত এলাকা আমি অনেক ইস্তাম্বুলবাসীর চেয়ে ভালো চিনি। সাত মে আমাদের হোটেলের কাছে বাগানঘেরা এক রেস্তোরাঁয় কাজের কথা, আড্ডা আর মধ্যাহ্নভোজ এক সঙ্গে সারলাম।
তুরস্কের জনপ্রিয় খাবার মানে প্রচুর মাংস, নানা ধরনের কাবাব, সঙ্গে তন্দুরি রুটি না হলে পাউরুটি। ভাত খেলে খুব সামান্য তবে নানারকম পোলাউ ওরা পছন্দ করে। পলাউকে ওরা বলে পিলাভ। তুর্কিরা মাছ কম খায়। অবশ্য ইস্তাম্বুলের গালাতা ব্রিজে মাছ শিকারির অন্ত নেই। ব্রিজের নিচে সব মাছের রেস্তোরাঁ, স্থানীয়দের চেয়ে বেশি ভিড় পর্যটকদের। হাকান আর ফেরহাত দু রকমের কাবাব আর সবজি নিয়েছিল। যেনেপ বড় এক বাটি চিকেন সালাদ, আমি সালাদ আর মাশরুমের স্টু। পানীয় হিসেবে তুরস্কে আমার পছন্দের তালিকায় আইরান থাকে এক নম্বরে। আমাদের দেশের বোরহানির মতো, তবে তত মসলা থাকে না। দইয়ের সঙ্গে পানি মিশিয়ে সামান্য লবণ, গোলমরিচ আর কী যেন এক মসলা মেশায় গরমের সময় অপূর্ব খেতে।
এবার প্রথম দর্শনে হাকান আমাকে অবাক করে ইংরেজিতে অভিবাদন জানিয়ে কোলাকুলি করল। কোলাকুলি সুফী সম্ভাষণের অংশ। মৃদু হেসে হাকান বলল, তোমার কথা মতো আমি ইংরেজি শিখছি।
গতবার হাকানকে বলেছিলাম, তোমার যা প্রতিভা, যদি ইংরেজি শিখতে পার আকাশ ছুঁতে পারবে।
ফেরহাত কাজের কথা পাড়ল শাহরিয়ার, হাকানকে নিয়ে তোমার ছবির স্ক্রিপ্ট লিখেছো?
আমি বললাম, প্রামাণ্যচিত্রের জন্য আমি কখনও আগে স্ক্রিপ্ট লিখি না। একটা আউটলাইন করি, কাজ করতে গিয়ে অনেক নতুন উপাদান যুক্ত হয়, পুরনো অনেক বিষয় বাদ হয়ে যায়। সম্পাদনার টেবিলে বসে আমি স্ক্রিপ্ট লিখি।
হাকান বলল, গতবার তুমি আমাকে বাংলা গান শিখতে বলেছিলে। তোমার দেয়া সিডি শুনেছি। বাঁশিতে সুর তুলতে পারব, তবে কথা খুব কঠিন।
গতবার হাকানকে লালনের গানের সিডি দিয়েছিলাম। বললাম, তুমি বাঁশিতে লালনের সুর বাজাবে, গান গাইবে যেনেপ। তোমরা যখন বাংলাদেশে যাবে তখন আবদুল হাকিম আর ফরিদা পারভীনের কাছে বাঁশি আর গান শিখবে।
এবার তুরস্ক যাওয়ার আগে ঢাকায় রাষ্ট্রদূত দেভ্রিম ওযতুর্ক আর দূতাবাসের প্রথম সচিব এনিস ফারুক এরদেমের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলাম। তুরস্কের ওপর আমার দ্বিতীয় ছবির পরিকল্পনার কথা তাদের বলেছিলাম। আমাদের শিল্পীরা রুমীর গান গাইবেন তুরস্কের শিল্পীরা লালন আর রবীন্দ্রনাথের গান গাইবেন। দুই দেশের বন্ধুত্ব বাড়াবার ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ওপর জোর দিয়েছিলাম।
ফেরহাত বলল, তুমি এখানকার টেলিভিশনের সহযোগিতা চেয়েছো। সাইপ্রাসে আমার নিজের একটা ফিল্ম ইউনিট আছে। তুমি যদি বলো আমার ইউনিট তুরস্কে তোমার শুটিংয়ের দায়িত্ব নিতে পারে।
আমি অভিভ‚ত হয়ে বললাম, তাহলে তো চিন্তার আর কিছুই থাকে না। গত এক বছর ধরে আমরা এ ছবির জন্য হন্যে হয়ে তুরস্কে একজন সহপ্রযোজক খুঁজছি।
ফেরহাত বলল, তুমি যদি চাও সাইপ্রাসে আমার স্টুডিওতে কাজও করতে পারো।
সম্পাদনার কাজ আমি বাংলাদেশেই করব। ফেরহাতকে বললাম, তুমি তাহলে এ ছবির সহপ্রযোজক হিসেবে থাকছো?
মৃদু হেসে ফেরহাত বলল, যেভাবে তুমি চাও। তোমার সঙ্গে কাজ করতে পারলে আমি খুশি হব।
ফেরহাত আমার ছবি ইউটিউবে দেখেছে। ওর কোনো ছবি ইউটিউবে নেই। উইকিপেডিয়ায় পড়েছি ওর ছবি একাধিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছে। এবার ইস্তাম্বুল আসার সময় ফেরহাত আমার জন্য ইংরেজি সাবটাইটেলওয়ালা ওর দুটো ছবির ডিভিডি আর সাইপ্রাস সম্পর্কে কয়েকটা বই আর অ্যালবাম এনেছে।
ছবির খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনার পর তুমুল আড্ডা। হাকানকে জিজ্ঞেস করলাম, যেনেপের সঙ্গে কীভাবে পরিচয়।
হাকান বলল, গত বছর অস্ট্রিয়ায় অনুষ্ঠান করতে গিয়ে।
বাধা দিয়ে বললাম, একটু অপেক্ষা করো। এই সুযোগে তোমার ক্যামেরা টেস্টটাও সেরে ফেলি। আমার ব্যাগ থেকে ছোট ডিভিডি ক্যামেরা বের করলাম। দুবছর আগে আমাদের নির্মূল কমিটির সুইডিশ শাখার সহসভাপতি অনুজ প্রতিম ডা. রানা খান আমাকে চমৎকার এই ক্যামেরাটি উপহার দিয়েছিল।
হাকানকে বললাম, এবার যেনেপের কথা বলো।
মৃদু হেসে হাকান থেমে থেমে বলল, গত বছর মে মাসের ১ তারিখে ভিয়েনায় প্রোগ্রাম করতে গিয়ে ওর সঙ্গে দেখা হয়েছে। ও আমাদের অনুষ্ঠান দেখতে এসেছিল। আলাপের এক পর্যায়ে শুনলাম ও গান গাইতে পারে। ওর গান শুনলাম। ওকে বললাম আমাদের দলে যোগ দিতে। আমাদের দলে একজন গায়ক থাকলেও কোনো গায়িকা ছিল না। যেনেপ আগ্রহের সঙ্গে রাজি হলো। তখন থেকে ও আমাদের সঙ্গে আছে।
হাকান যখন যেনেপের কথা বলছিল ও মুগ্ধ হয়ে হাকানের দিকে তাকিয়েছিল। হাকানকে বললাম, তোমার বাঁশি ইউটিউবে অনেক শুনেছি। এবার তোমার সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বলো। গত বছর তোমার একটা বইও বেরিয়েছে। কী নিয়ে লিখেছো?
একটা নয় আমি দুটো বই লিখেছি। সবই আমার ব্যক্তিগত ভাবনা। সুফীবাদের কথা আছে, জালাল উদ্দিন রুমীর কথা আছে, মানুষের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসার কথা আছে। পরিবেশের কথা আছে। খুবই ব্যক্তিগত বিষয়।
তোমার বই কী রকম বিক্রি হয়?
গত বছর যেটা বেরিয়েছে ওটার প্রথম সংস্করণ দশ হাজার কপি ৬ মাসে শেষ হয়ে গেছে। এখন দ্বিতীয় সংস্করণ চলছে।
বলো কী? আমি অবাক হয়ে বললাম, তাহলে তো বলতে হবে তুমি খুবই জনপ্রিয় লেখক। এর ইংরেজি অনুবাদ কবে বেরুবে?
লাজুক হেসে হাকান বলল, ইংরেজি অনুবাদ ইনশাল্লাহ এ বছরের ভেতরই বেরুবে। গত বছর ওটার ফারসি অনুবাদ বেরিয়েছে।
শুধু সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে নয়, লেখক হিসেবে হাকান কতটা জনপ্রিয় এর পরিচয় সেদিন বিকেলেই পেয়েছিলাম। যেনেপকে বললাম, হাকানকে তুমি গান শুনিয়ে মুগ্ধ করেছো। কী ধরনের গান গাও তুমি?
যেনেপ হেসে বলল, আমি সব ধরনের গানই গাই। তবে আধ্যাত্মিক গান গাইতে বেশি ভালোবাসি।
আধ্যাত্মিক মানে সুফী সঙ্গীত?
হ্যাঁ, সুফীদের লেখা গান। কিংবা তাঁদের উদ্দেশে লেখা গান।
রুমীর কোনো গান জানো?
জানি। বলে যেনেপ তুর্কি ভাষায় দুটো লাইন বলল।
জানতে চাইলাম, এর ইংরেজি কী হবে?
যেনেপ বলল, এসো, আমার দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত।
তুমি কি আমার ‘মিথাত্স ড্রিম’ দেখেছো?
শুরুটা দেখেছি, সবটা নয়।
ওখানে এ গানের ইংরেজি ভাষ্য আছে। ‘কাম, কাম হুএভার ইউ আর, ওয়ান্ডারার, ওরশিপার, লাভার অব লিভিং…। তুমি কি এর তুর্কি ভাষ্য গেয়ে শোনাবে?
একটু বিব্রত হয়ে যেনেপ চারপাশে তাকাল। রেস্তোরাঁয় তখন লোকারণ্য। অনেকে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। ওয়েটাররা ব্যস্ত হয়ে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ছুটোছুটি করছে।
আমি ক্যামেরায় যেনেপের কথা ধারণ করছিলাম। ওর বিব্রতভাব কাটাবার জন্য বললাম, বেশি নয় যেনেপ, এক লাইন গাও। তোমার স্ক্রিন টেস্ট হয়ে যাবে। আমার ছবিতে তোমাকে তো গাইতে হবে।
মৃদু হেসে যেনেপ খালি গলায় রুমীর গান দু লাইন গাইল। ও শুধু সুন্দরী নয়, সুকণ্ঠীও বটে। পাশের টেবিলে যারা বসেছিল তারা খাওয়া ফেলে মুগ্ধ হয়ে গান শুনল। দুজন ওয়েটার খাবার হাতে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গান শোনার জন্য দাঁড়িয়ে গেল। দু লাইন গেয়ে গান থামানোয় মনে হলো ওরা কিছুটা মনোক্ষুণ্ণ হয়েছে।
আমি ক্যামেরা রেখে যেনেপের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শুধু বললাম, অপূর্ব!
যেনেপ লজ্জায় লাল হলো।
ফেরহাত বলল, তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি যেনেপ তোমার ছবিতে গান গাইছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু রুমীর গান নয়, ওকে লালনের গানও গাইতে হবে। যেনেপকে বললাম, আমি তোমাকে লালনের গানের কথাগুলো রোমান হরফে লিখে পাঠাব।
ইস্তাম্বুলের রেস্তোরাঁয় সঙ্গীত পরিবেশন খুবই সাধারণ ব্যাপার। আমার হোটেলের এক পাশে দারবিশ কাফে, অন্যদিকে আরাস্তা বাজারের রেস্তোরাঁয় রোজ সন্ধ্যার পর শুধু গান বাজনা নয়, সুফীদের সেমা নাচও পরিবেশন করা হয়। তবে মঞ্চের মতো দলবদ্ধ নয়, একক নৃত্য। সেমা নৃত্যের সঙ্গে যন্ত্রসঙ্গীত থাকে, কখনও গানও থাকে, তবে সে গান মূলত হাম্দ ও নাত্ আল্লাহ-রসুলের বন্দনা।
রেস্তোরাঁয় খাওয়া আর আড্ডা শেষ হতে চারটা বেজে গেল। আড্ডার সময় বিরামহীন তুর্কি চা-পান আবশ্যিক বিষয়। ছোট ফুলদানির মতো পাতলা কাচের গ্লাসে সর্বত্র তুর্কি লাল চা পরিবেশন করা হয়। পিরিচে দুটো চিনির টুকরো থাকে, কেউ মেশায়, কেউ মেশায় না।
গ্র্যান্ড বাজারে কিংবা অন্য দোকানে দেখেছি, জিনিস কিনুন আর না কিনুন তাতে কিছু যায় আসে না, দোকানি আপনাকে তুর্কি চা পানে অনুরোধ জানাবে। আমার হোটেল থেকে গ্র্যান্ড বাজার ট্রামে মাত্র এক স্টপেজ দূরে, হেঁটে গেলে বেশি হলে দশ মিনিট। ইস্তাম্বুলের গ্র্যান্ড বাজার বিশ্বের সর্ববৃহৎ অ-উন্মুক্ত বাজার। বিশাল উঁচু ছাদের নিচে দোকানের সংখ্যা চার হাজারের বেশি। মন্দার সময়ও রোজ আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষের সমাগম নয়, ধাক্কাধাক্কির কোনো বালাই নেই। বেশির ভাগই দেখতে আসে। দেখার মতো জায়গা বটে।
ছ-সাত কাপ চা শেষ হওয়ার পর তরুণ তুর্কি বন্ধুদের বললাম, চলো ওঠা যাক।
মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানাবার জন্য বন্ধুরা বারবার ধন্যবাদ জানাল। ফেরহাত জানতে চাইল এবার কোথায় যাবে?
আর কোথায় যাব! চলো, সুলতানআহমেতের বাগানে কিছুক্ষণ সময় কাটাই। কিছু ছবিও তুলব।
ট্রাম লাইন ধরে হেঁটে আসতে পাঁচ মিনিটিও লাগেনি। ব্লু মস্ক আর হায়া সোফিয়ার মাঝেখানে বিশাল চত্বর, ফোয়ারা, বাগান দেশি-বিদেশি পর্যটকে গমগম করছে। চার চাকার সাইকেল ভ্যানে ইতস্তত ভুট্টা আর বাদাম বিক্রি করছে ফেরিওয়ালারা। তুর্কিরা ভুট্টা শুধু আগুনে ঝলসে খায় না, সেদ্ধ করেও খায়। ঝোলানো ট্রেতে কফি আর চায়ের কাপ সাজিয়ে অল্প বয়সীরা ফেরি করছে। কাঠের বেঞ্চে বসে দর্শনার্থীরা পান করছে। চা দুই লিরা, কফি তিন লিরা। বাগানে ফেরিওয়ালারা কফি পরিবেশন করে কাগজের গ্লাসে।
হায়া সোফিয়ার সামনে চমৎকার ফোয়ারা রয়েছে। ফোয়ারার চারপাশে যত্নে ছাঁটা সবুজ ঘাসের জমি, ফুলের গাছ আর কাঠের বেঞ্চ পাতা। সন্ধ্যের পর ফোয়ারার উৎক্ষিপ্ত পানির সঙ্গে নানা রঙের আলোর ছটা দর্শনার্থীদের বিমোহিত করে অপূর্ব উৎস। সবাই ফোয়ারার চারপাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে।
তুর্কি বন্ধুদের বললাম, চলো, ফোয়ারার সামনে তোমাদের ছবি তুলি।
ফেরহাত বলল, তুমি বাদ যাবে কেন। আমি সেলফি তুলছি।
কয়েকটা ছবি তোলার পর কাঁধে ক্যামেরা ঝোলানো এক তরুণ এসে হাকানকে কিছু বলে পকেট থেকে একটা নোটবই আর কলম বের করল। বুঝলাম হাকানের কোনো ভক্ত। প্রশ্ন করলাম, তুমি ইংরেজি বলতে পার?
মুখে সামান্য দাড়ি, মাঝারি গড়নের সুদর্শন তরুণ মৃদু হেসে বলল, সামান্য বলতে পারি।
তুমি হাকানকে চেনো কীভাবে? ওর বাঁশি শুনেছ?
তরুণ জবাব দিল, আমি ওর বই পড়েছি। ওর লেখা আমার খুব ভালো লাগে।
তোমার পরিচয় জানতে পারি?
আমার নাম ওবাই আলদারা। পাঁচ বছর আগে সিরিয়া থেকে এসেছি। এখন ইস্তাম্বুলে থাকি। ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার।
তুমি সিরীয় শরণার্থী?
ওবাই মাথা নেড়ে সায় জানাল। আমরা সিরিয়া বললেও ওরা বলে সুরিয়া। তুরস্ককে আমরা ইংরেজিতে বলি টার্কি, ওরা বলে তুর্কি। ওবাইর কাছে জানতে চাইলাম, শরণার্থী হিসেবে ও কোনো ভাতা পায় কিনা। ও বলল, যারা শরণার্থী হিসেবে শিবিরে থাকে তারা ভাতা পায়, যারা শিবিরের বাইরে থাকে তারা ভাতা পায় না, তবে বাইরে কাজ করতে পারে।
ওবাই আলদারার জন্ম দামাস্কে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফ্যাশন ডিজাইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর দুবছর ওকে বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক বাহিনীতে কাজ করতে হয়েছে। এরপর বোমা হামলার শিকার হয়ে বাবা-মা আর ছোট দুই ভাইবোনকে নিয়ে ইস্তাম্বুল চলে এসেছে। যারা লেখাপড়া জানে তারা দ্রুত তুর্কি ভাষা শিখে বিভিন্ন কাজে যোগ দিয়েছে। তুরস্কে সিরীয় শরণার্থীদের কাজ করার পারমিট দেয়া হয় নির্দিষ্ট কয়েকটি শহরে।
সুলতানআহমেত-এ ওবাই প্রায়ই আসে বিদেশি পর্যটকদের ছবি তোলার জন্য। আগে ছবি তুলত শখের কারণে, এখন ছবি তোলে জীবিকার প্রয়োজনে। ইনস্টাগ্রামে ওর তোলা ছবি দেখে ইস্তাম্বুলগামী পর্যটকদের কেউ কেউ ওর সঙ্গে যোগাযোগ করে। দুঘণ্টার শিফটে ও পঞ্চাশ ডলার নেয়। মাসে চার পাঁচটা কাজ পায়। অন্য সময় ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কাজ করে। তাকসিম স্কয়ারের কাছে একটা ছোট অ্যাপার্টমেন্টে থাকে।
সেদিন ওর সেশন ছিল বলে বেশি কথা বলতে পারিনি। ওকে আমার টেলিফোন নম্বর দিয়ে রাতে ফোন করতে বললাম।
ওবাইর সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম তখন হাকানরা নিজেদের মধ্যে আলোচনায় মশগুল ছিল। ওবাই চলে যাওয়ার পর ফেরহাত হেসে বলল, শাহরিয়ার, লেখার জন্য অনেক বিষয় পেয়ে গেছে।
আমি বললাম, আমি লেখার চেয়ে আরও বেশি কিছু ভাবছি। রাতে তোমার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলব।
গত বছর হাকানের সুফী একাডেমিতে একজন অংশীদার হিসেবে যোগ দিয়েছে ফেরহাত। সাইপ্রাসে এর শাখাও খুলেছে। ফেরহাত আগেই জানিয়েছিল ইস্তাম্বুলের চেয়ে সাইপ্রাসের সুফী একাডেমি বেশি জমজমাট। একাডেমির বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য ফেরহাত হাকানদের সঙ্গে চলে গেল। বলল, ডিনারের পরে ফিরব। বললাম রাত বারোটার আগে যদি ফেরো তাহলে আমার দরজায় টোকা দিতে পার। আমি বারোটা পর্যন্ত জেগে থাকব। ইস্তাম্বুলের রাত বারোটা মানে বাংলাদেশের রাত তিনটা।
বোরার সঙ্গে হাকানের সম্পর্ক ভেঙে গেলেও ই-মেইলে আমার সঙ্গে ওর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। রাতে বোরাকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। ঠিক রাত আটটায় এল। হাকানের চেয়ে বেশ লম্বা বোরা। মাথা ক্লিন শেভ করা, গালভরা কালো দাড়ি। কালো হালকা ওভারকোট পরা বোরা সুফী কায়দায় আলিঙ্গন করে গালে চুমো খেল। বলল, তোমার অসুস্থতার খবর শুনে খুব উদ্বিগ্ন ছিলাম। দেখে তো অসুস্থ মনে হচ্ছে না।
অসুস্থ নই বলেই ইস্তাম্বুল আসতে পেরেছি। হেসে বললাম, ডিনারে কোথায় যেতে চাও বলো।
বোরা বলল, সুলতানআহমেত আমার চেয়ে তুমি বেশি চেনো। তুমিই বলো, কোথায় যাব।
আমার ইচ্ছে কোনো রুফটপ রেস্টুরেন্টে যাই। আগে যে আশকিন হোটেলে থাকতাম ওদের ছাদে চমৎকার রেস্তোরাঁ ছিল। সকালের নাশতা, বিকেলের চা ছাদেই পরিবেশন করা হতো। ছাদে উঠলেই মর্মর সাগরের তাজা লোনা বাতাসে বুক ভরে যেতো। নাশতা খেতে বসলে সিগালরা পাশের ছাদে বসে থাকতো এক টুকরো রুটির অপেক্ষায়। একটা সিগাল এত ভক্ত হয়ে গিয়েছিল জানালা খুললে নির্ভয়ে কার্নিশে এসে বসতো। ওটাকে বাদাম খেতে দিতাম।
আশকিন হোটেল বন্ধ হলেও পাশের ব্লু হাউস হোটেল খোলা ছিল। ওটার ছাদের রেস্তোরাঁ থেকে সাগরের চেয়ে ব্লু মস্ক ভালো দেখা যায়। তবে তাজা বাতাসের কমতি নেই।
বোরাকে নিয়ে ব্লু হাউস হোটেলের ছাদের রেস্তোরাঁয় গেলাম। বোরা দেখতে লম্বা চওড়া হলেও খায় খুব সামান্য। আমরা দুজনেই দু প্লেট তুর্কি মানতি নিলাম। বানানোটা চীনা ডাম্পলিংয়ের মতো, তবে পরিবেশন করা হয় অনেকটা ভারতের চাট মাসালার মতো। চীনা মো মো-র চেয়ে তুর্কি মানতি খেতে ঢের বেশি সুস্বাদু ওদের মসলার গুণে।
ইস্তাম্বুলের এমিনোনুর স্পাইস বাজার দেখার আগে ধারণা ছিল আমাদের দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে বুঝি সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্যপূর্ণ মসলা পাওয়া যায়। সুলতানআহমেত থেকে ট্রামে তিন স্টপেজ পরেই মর্মর সাগরের তীরে এমিনোনু ইস্তাম্বুলে অলস সময় কাটানোর আরেকটি প্রিয় জায়গা। রাস্তার এক পাশে বসফরাস প্রণালী, অপরদিকে খোলা চত্বরে এখানে সেখানে বেঞ্চে বসে মানুষ গল্প করছে। চত্বরে প্রচুর কবুতর। ছোট ছোট দোকানে কবুতরের খাবার পাওয়া যায়, আমাদের কাউনের মতো দেখতে। একটু ছিটিয়ে দিলেই নানা রংয়ের কবুতর উড়ে এসে হাতে বসে নির্ভয়ে তেলো থেকে কাবার খুঁটে খায়।
চত্বরের এক দিকে তিনশ বছরের পুরনো বিশাল রুস্তম পাশা সমজিদ। অন্যদিকে স্পাইস বাজার, ইজিপ্সিয়ান বাজারও বলে। গ্র্যান্ড বাজারের মতো বড় না হলেও উঁচু ছাদের নিচে শত শত মসলা আর সুগন্ধীর দোকান। তুর্কি আতরও কম বিখ্যাত নয়।
তুর্কি মানতি আগেও খেয়েছি। খাবার হিসেবে খুবই জনপ্রিয়, দামও কম। বোরাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ড্রিংক কী নেবে? ও আইরান নিয়েছে। আমি নিলাম তাজা গ্রেপ ফ্রুন্ট জুস, নির্ভেজাল বাংলায় বাতাবি লেবুর রস। তুর্কি বাতাবি লেবু আমাদের দেশের মতো বড় হয় না। যেমন ওদের জলপাইও আমাদের জলপাইর চেয়ে আকারে অর্ধেক, স্বাদও ভিন্ন। তুর্কি গ্রেপ ফ্রুট বড় কমলার মতো, খোসা পাতলা, ভেতরটা টকটকে লাল। স্বাদে আমাদের বাতাবি লেবুর চেয়ে অনেক উপাদেয়।
খাবার শেষ করে চা-পানের সময় বোরাকে সরাসরি প্রশ্ন করলাম গত বছর তুমি হাকানকে নিয়ে এত উচ্ছ্বাস দেখালে, ওকে নিয়ে আমাকে ছবি বানাতে বললে, হঠাৎ এমন কী হলো যে ওর সঙ্গে তোমার কোনো যোগাযোগ নেই?
বোরা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ও আর আমি দুজনই আমাদের দল নিয়ে বেশি ব্যস্ত। আমি এখন আমাদের দলের ম্যানেজারের দায়িত্বও পালন করছি। আমাদের কয়েকটা নতুন গানের ভিডিও এনেছি তোমাকে দেখাবার জন্য।
হাকানের প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে বোরা আমাকে ওদের গানের ভিডিও দেখাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। গানের কথা না বুঝলেও সুরটা ভালো লাগল। দৃশ্যায়নও সুন্দর করেছে। বোরা বলল, এটা পুরনো দিনের প্রচলিত গান। আমরা সুরে কিছু ফিউশন করেছি।
বললাম, বেশি করোনি বলে ভালো লাগছে। আজকাল পুরনো গানের সঙ্গে হার্ড মেটাল আর ডেথ মেটালের ফিউশন করে কী যে বানাচ্ছে শুনলে মাথা ধরে যায়।
বোরা হেসে বলল, তুমি ডেথ মেটাল কোথায় শুনলে? বোঝ কিছু?
আর কোথায় শুনব, বাড়িতেই শুনি! এসব গান বোঝা আমার সাধ্যের বাইরে। আমার পুত্র গিটার বাজায়। কখনও বলে বাবা, এটা শুনে দেখ, গান কোথায় চলে গেছে বুঝবে। এতদিন জানতাম, যে গান ভালোবাসে না সে নাকি মানুষ খুন করতে পারে। আজকালকার ব্ল্যাক মেটাল শুনলে কেউ ক্ষেপে গিয়ে খুনও করতে পারে।
আমার কথা শুনে বোরা গলা খুলে হাসল। বলল, হাল আমলের ছেলেমেয়েরা এসব শোনে বটে। এর সামাজিক আর মনস্তাত্তি¡ক কারণও আছে। গানে মেলোডির বিপরীত ধারা এসেছে বিদ্রোহ বা প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার ধারণা থেকে। তবে আমরা এ ধরনের গান করি না।
বোরা গোটা চারেক গান শোনালো ওর আইফোনে। দুটো গানের দৃশ্যগ্রহণ সম্পর্কে সামান্য মন্তব্য করলাম সম্পাদনাটা এরকম না করে এমনটি করতে পারতে।
বোরা বিগলিত হয়ে বলল, এজন্যেই তোমাকে দেখাচ্ছি। এগুলো এখনও ইউটিউবে আপলোড করিনি। তোমার মন্তব্য জানা দরকার।
বোরা আমার কিছু মন্তব্য নোট করল। বললাম, যখন সম্পাদনা চূড়ান্ত করবে তখন ইংরেজি সাব টাইটেল অবশ্যই যোগ করবে।
বোরার সঙ্গে ঘণ্টা দুয়েক গল্প করে ওয়েটারকে বিল দিতে বললাম। ওয়েটার একটু অবাক হয়ে বলল, আপনাদের টেবিলের বিল তো পরিশোধ হয়ে গেছে।
বোরা লাজুক এসে বলল, আমি বিল দিয়ে এসেছি।
এটা ঠিক হলো না বোরা। আমি আপত্তি জানালাম তোমাকে আমি ডিনারে নেমন্তন্ন করেছি। তুমি কেন বিল দেবে?
বোরা বলল, ইস্তাম্বুলে তুমি আমাদের অতিথি। আমি যখন বাংলাদেশে যাব, তখন তুমি বিল দিও।
বোরাকে নিয়ে এটাই সমস্যা। গতবারও চায়ের সামান্য বিল পর্যন্ত আমাকে দিতে দেয়নি। দুবার লাঞ্চ করেছিলাম হাকানকে নিয়ে। দুবারই বোরা বিল দিয়েছে। অতিথি আপ্যায়নে তুর্কিরা আমাদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
বোরাকে বিদায় জানিয়ে হোটেলে ফিরলাম রাত সাড়ে দশটায়। কিছুই করার নেই। টেলিভিশনে ইংরেজি ছাড়া অন্য সব চ্যানেল আছে। সিএনএন আর ফক্স নিউজ পর্যন্ত তুর্কি হয়ে গেছে। চার বা পাঁচ তারকা হোটেল ছাড়া তুরস্কে কোনো ইংরেজি চ্যানেল দেখার জো নেই। ঘরের মিনি বার থেকে একটা তুর্কি বিয়ারের ক্যান নিয়ে ছাদে গিয়ে বসলাম। এ হোটেলটা ব্লু মস্ক আর হায়া সোফিয়ার প্রায় মাঝখানে। ছাদ থেকে সমুদ্রও চমৎকার দেখা যায়। ম্যানেজার বলছিল, ছাদে রেস্তোরাঁ করার অনুমতি চেয়ে দরখাস্ত করা হয়েছে। এ বছরের মধ্যেই ইনশাল্লাহ রেস্তোরাঁর সঙ্গে পানশালার অনুমতিও আমরা পেয়ে যাব।
শুনে মনে মনে হেসেছিলাম বার-এর অনুমতির জন্যও ইনশাল্লাহ বলতে হয়! লক্ষ করিনি মদ্যপানের আগে তুর্কিরা বিসমিল্লাহ বলে কি না। শুনেছি সৌদিরা নাকি বলে।
আর্মাগ্রান্ডি হোটেলের ছাদে আরাম কেদারায় শুয়ে বিয়ার পান করার সময় টেলিফোনে ফেরহাতের বার্তা পেলাম সকাল আটটায় প্রাতরাশের টেবিলে দেখা হবে। যার অর্থ ও রাত করে ফিরবে।
রাত এগারোটা নাগাদ ওবাই ফোন করল। বিচলিত কণ্ঠে বলল, ফোন করতে দেরি হয়ে গেছে বলে আমি কিছু মনে করেছি কি না।
ওকে আশ্বস্ত করে বললাম, তুমি ঠিক সময়ে ফোন করেছো। আগে করলে কথা বলতে পারতাম না।
ওবাই বিনীত কণ্ঠে জানতে চাইল কেন ওকে ফোন করতে বলেছি।
বিকেলে ওর সঙ্গে কথা বলার সময় আমার মনে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের শরণার্থী জীবনের কথা। সেই সঙ্গে হালের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কথা। গত দেড় বছরে একাধিকবার রোহিঙ্গা শিবিরে গিয়েছি, যে সব শরণার্থীর সঙ্গে কথা বলেছি দুজন ছাড়া কেউ ইংরেজি বলতে না পারলেও মাতৃভ‚মি থেকে উৎখাত হওয়ার বেদনা স্থান, কাল, পাত্র, বিত্ত-নির্বিশেষে সর্বত্র এক। বিকেলেই ভেবেছি ইস্তাম্বুলের সিরীয় শরণার্থীদের জীবন নিয়ে একটা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করা যেতে পারে। তাৎক্ষণিকভাবে নামও ভেবেছি ‘লস্ট ইন ইস্তাম্বুল’।
ওবাইকে আমার পরিকল্পনার কথা বললাম। ওকে সঙ্গে নিয়ে ইস্তাম্বুলের অবস্থানকারী সিরীয় শরণার্থীদের সঙ্গে কথা বলব। কেন, কীভাবে তারা দেশত্যাগ করেছে, শরণার্থী জীবনের বিড়ম্বনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এসব বিষয় জানতে চাইব।
ওবাই জানতে চাইল কবে শুটিং করব, কতদিন লাগবে।
শুটিং পরশু করতে পারি। কিংবা সেলজুক থেকে ফিরে এসে তের বা চৌদ্দ তারিখেও করতে পারি। দুদিনের বেশি লাগবে না।
এবার তুরস্ক যাওয়ার আগেই ঠিক করেছিলাম ইজমিরের প্রাচীন শহর সেলজুকে দুদিন নিরিবিলি সময় কাটাব। এফিসাসের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন দেখব আর তিন হাজার বছরের পুরনো গ্রিক গ্রাম সেরেঞ্জি দেখব।
ওবাই বলল, আমি কথা বলে দেখি। কাল জানাব।
ওকে উৎসাহ দেয়ার জন্য বললাম, ওবাই, তোমাকে আমি দুদিনের কাজের জন্য দুশ ডলার দেব। তবে আট/দশটা শরণার্থী পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে চাই, যারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ওবাই আগ্রহের সঙ্গে বলল, আমি কাল ১০টার ভেতর জানাব।
ওর সঙ্গে কথা শেষ করে মুরাতকে ফোন করলাম। মুরাত আমার দুটো ছবিতে ক্যামেরার কাজ করেছে। বিশেষভাবে ‘মিথাত্স ড্রিম’-এর পুরো কাজটাই ও করেছে। কট্টর কমিউনিস্ট মুরাতের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে দুবছর আগে। সুফীদের নিয়ে আমার ছবি করার কঠোর সমালোচক ও। শুটিং করতে গিয়ে কখনও ঝগড়া বেঁধে যেত। ওর ধারণা এসব প্রতিক্রিয়াশীল বিষয় নিয়ে আমি অযথা সময় নষ্ট করছি। ওকে নিয়ে অন্যত্র লিখেছি।
মুরাতকে ইস্তাম্বুল আসার আগে বলেছিলাম, এবার কোনো শুটিং করব না। তবে ওর সঙ্গে কিছু সময় কাটাতে চাই। ৬ তারিখ ইস্তাম্বুল এসেই ওকে ফোনে জানিয়েছিলাম ৮ তারিখ দুপুরে ওর সঙ্গে লাঞ্চ করব।
ফোনে একবার রিং হতেই মুরাত হ্যালো বলল। ভাগ্যিস ঘুমিয়ে পড়েনি। বললাম, এত রাত জেগে আছো?
মুরাত বলল, এমন কী রাত দেখলে! আমি এখন স্টুডিওতে কাজ করছি। ইস্তাম্বুল কখনও রাত দুটো/তিনটের আগে ঘুমোয় না।
তোমাকে আগে বলেছিলাম এবার কোনো শুটিং করব না। মনে হচ্ছে শুটিং হতেও পারে। তুমি কী ১৩-১৪ তারিখ ফ্রি আছো?
মুরাত বলল, তোমার জন্য আমি সব সময় ফ্রি আছি। এবার কী শুটিং করবে?
ভাবছি ইস্তাম্বুলের সিরীয় শরণার্থীদের নিয়ে কিছু করব।
ভালো হবে। সুফীদের ভ‚ত তোমার ঘাড় থেকে নেমেছে তাহলে!
না, নামেনি। তবে সুফীদের নিয়ে আমার অন্য পরিকল্পনা আছে। কাল বলব তোমাকে।
ঠিক আছে। কাল বারোটা থেকে একটার ভেতর তোমার হোটেলে আসছি।
এবার ইস্তাম্বুলে পুরনো বন্ধুদের ভেতর এদমিয়ের ছাড়া আর কারও সঙ্গে দেখা হয়নি। কবি ও নাট্যকার তারিক গুনেরসেল আন্তালিয়ায়, লেখক রেফিক এলগান আমেরিকায়, সুফী দরবেশ সায়ের সেমা প্রদর্শনের জন্য আঙ্কারায়।
পরদিন সকালে নাশতার টেবিলে সিরীয় শরণার্থীদের নিয়ে ছবি করার পরিকল্পনা ফেরহাতকে জানালাম। ফেরহাত বলল, খুবই ভালো হবে। তুমি এর সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের যুক্ত করতে পার। বাংলাদেশ আর তুরস্ক তাদের সীমিত সম্পদ নিয়ে শরণার্থীদের কী বিশাল বোঝা কাঁধে তুলে নিয়েছে!
আমি বললাম, দেশে ফিরে তুরস্কের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলব। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও কথা বলতে হবে। সরকারের অনুমোদন ছাড়া শরণার্থী শিবিরে শুটিং করা সম্ভব হবে না।
ফেরহাত ওর নিজের পরিকল্পনার কথা জানাল। এখন ও তুরস্কের প্রাচীনতম সভ্যতার নিদর্শন গোবেক্লি টেপের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে কাজ করছে। খ্রিস্টপূর্ব আট হাজার থেকে দশ হাজার বছর, অর্থাৎ বার হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার নিদর্শন তুরস্কে রয়েছে। গোবেক্লির কাছের শহর উরফা দেখার শখ আমার অনেক দিনের। ইন্টারনেটে দেখেছি ন হাজার বছরের পুরনো শহর। তুর্কিরা দাবি করে হযরত ইব্রাহিমের জন্ম এখানে। ইব্রাহিমের বংশধররা বর্তমান বিশ্বের তিন কিতাবি ধর্ম ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের জন্ম দিয়েছেন।
নাশতা খেতে খেতে ফেরহাত বলল, সেপ্টেম্বরে তোমাকে আমরা সাইপ্রাসে আমন্ত্রণ জানাব। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমার বক্তৃতার আয়োজন করব। তোমার ছবিও দেখাব। এরপর ফেরহাত এক অভিনব তথ্য দিল। আমাকে প্রশ্ন করল, তুমি কি জান সাইপ্রাসের সঙ্গে বাংলাদেশের এক অদ্ভুত সম্পর্ক আছে?
আমি অবাক হলাম না, জানি না।
১৯৮৩ সালে যখন ‘টার্কিশ রিপাবলিক অব নর্দান সাইপ্রাস’ গ্রিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করে তুরস্ক সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন দেশ হিসেবে একে স্বীকৃতি দেয়। তুরস্কের পর দ্বিতীয় দেশ ছিল বাংলাদেশ যে সাইপ্রাসকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে স্বীকৃতি দেয়ার পর জাতিসংঘের অনুরোধে বাংলাদেশ সেই স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে নেয়।
আমি খুবই অবাক হলাম আমরা তো জানি সাইপ্রাসের একটি অংশ গ্রিসের অপর অংশ তুরস্কের দখলে। জানতে চাইলাম, উত্তর সাইপ্রাস কি তুরস্কের অংশ নয়?
আমাদের মুদ্রা ও প্রতিরক্ষা তুরস্কের হাতে। অন্য সব বিষয়ে আমরা স্বাধীন। আমাদের আলাদা প্রেসিডেন্ট আছে, প্রধানমন্ত্রী আছে, পার্লামেন্ট আছে, জাতীয় পতাকাও আলাদা।
তোমার নাগরিকত্ব কোথাকার?
ফেরহাত হেসে বলল, আমার তিনটা পাসপোর্ট। একটা সাইপ্রাসের, একটা তুরস্কের, আরেকটা গ্রিসের।
বলো কী? তুর্কি হয়ে গ্রিসের পাসপোর্ট পেলে কী করে?
আমাদের পূর্বপুরুষরা তুরস্ক থেকে সাইপ্রাসে এসেছেন বটে, তবে আমরা তো জন্মগতভাবে সাইপ্রাসের নাগরিক। গ্রিস মনে করে সাইপ্রাস চিরকাল গ্রিসের অংশ ছিল এবং আগামীতেও থাকবে। সে জন্য সাইপ্রাসের অধিবাসীরা জন্মগতভাবে গ্রিসের নাগরিক। আমরা স্বাধীনতা ঘোষণা করেছি, সে জন্য আমি সাইপ্রাসের পাসপোর্ট পেতে পারি। আর সাইপ্রাসের তুর্কিরা চাইলে তুরস্কের পাসপোর্টও পেতে পারে। এতে আমার দেশভ্রমণ খুব সহজ হয়ে গেছে।
এর অর্থ হচ্ছে আমি তুরস্কের ভিসা নিয়ে গ্রিক সাইপ্রাসে যেতে পারব না, কিন্তু তুমি পারবে।
ঠিক বলেছো। গ্রিক সাইপ্রাস যেতে হলে তোমাকে ইউরোপের অন্য সব দেশের মতো শেংঘেন ভিসা নিতে হবে। তুমি আগে আমাদের সাইপ্রাস ঘুরে যাও। গ্রিক সাইপ্রাসে পরেও যেতে পারবে।
তোমার যখন ফিল্ম ইউনিট আছে তাহলে সাইপ্রাসকে নিয়েও তো একটা ছবি হতে পারে।
তুমি যদি বানাতে চাও আমরা সব রকম সহযোগিতা করব।
তোমাদের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে পারবে?
খুব পারব। আমি তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি।
ফেরহাতের সঙ্গে আলোচনায় তিনটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত হলো। একটা তুরস্কের হাকান আর বাংলাদেশের হাকিমদের নিয়ে, আরেকটা রোহিঙ্গা আর সিরীয় শরণার্থীদের নিয়ে এবং সর্বশেষ সাইপ্রাসকে নিয়ে। সাম্প্রতিককালে এমন ফলপ্রসূ সফর খুব কমই হয়েছে।
নাশতা সেরে ফেরহাত চলে গেল ওদের সুফী একাডেমিতে। আমাকে একবার গ্র্যান্ড বাজার যেতে হবে ডলার ভাঙাবার জন্য। গ্র্যান্ড বাজারে আমার চেনা কয়েকটা মানি এক্সচেঞ্জ আছে যেখানে ডলারের ভালো দাম পাওয়া যায়।
নাশতা সেরে ঘরে আসতেই ইস্তাম্বুলে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল ড. মুনিরুল ইসলাম ফোন করলেন। ১৩ তারিখ বিকেলে আমাদের কনসুলেটের নতুন ভবনে ‘মিথাত্স ড্রিম’-এর বিশেষ প্রদর্শনী, আলোচনা সভা এবং ইফতার ও নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছে।
জানতে চাইলাম, কারা আসবেন।
কনসাল জেনারেল বললেন, ইস্তাম্বুলের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক এবং পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমার বন্ধুদেরও আমন্ত্রণ জানাতে পারি।
সবার আগে মিথাতের কথা মনে হলো। ওকে ফোন করলাম। ইস্তাম্বুল আসার পর ওকে ফোন করা হয়নি। আমার ফোন পেয়ে কোনিয়ার তরুণ দরবেশ, আমার ছবির প্রধান চরিত্র মিথাত খুবই খুশি হলো। বললাম, ইস্তাম্বুল তো তোমার শ্বশুরবাড়ি। ১৩ তারিখে বৌ নিয়ে ইস্তাম্বুল চলে এসো। তোমার ছবির বিশেষ প্রদর্শনীতে অনেক গণমান্য ব্যক্তি আসবেন।
মিথাত দুঃখ প্রকাশ করে জানাল, ওদের দল নিয়ে এখন লম্বা সফরে আছে। এই মুহূর্তে অবস্থান করছে উরফায়। তের তারিখে দুদিনের জন্য কোনিয়া এসে আবার চলে যাবে কাপাদোকিয়ায়।
জানতে চাইলাম, ইব্রাহিম আসতে পারবে?
ফোন করে দেখতে পারেন। মনে হয় পারবে।
ইব্রাহিম কোনিয়ার মেরহাবা পত্রিকার প্রধান সম্পাদক। ছ বছর আগে প্রথমবার কোনিয়া সফরের সময় ওর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। খুবই দিলখোলা বন্ধুবৎসল পরোপকারী মানুষ। গত মার্চে স্টকহোম থেকে স্বস্ত্রীক ডা. রাণা খান কোনিয়া আর কাপাদোকিয়া ভ্রমণে গিয়েছিলেন। সেই সময় আমারও যাওয়ার কথা ছিল। আমি না থাকলেও আমার অনুরোধে ইব্রাহিম রাণাদের কোনিয়া আর কাপাদোকিয়া ঘুরে দেখিয়েছে, নিজের বাড়িতে নেমন্তন্ন করে খাইয়েছে।
মিথাতের সঙ্গে কুশল বিনিময় সেরে ইব্রাহিমকে ফোন করলাম। ও জানত আমি ইস্তাম্বুল আসব, এ যাত্রা কোনিয়া যাব না। ওকে আমার ছবি প্রদর্শনীর কথা বলে জানতে চাইলাম একদিনের জন্য ইস্তাম্বুল আসতে পারবে কি না।
বিনয়ের সঙ্গে ইব্রাহিম বলল, আপনি বললে অবশ্যই আসব। গত নভেম্বরে আপনাদের সফরের ওপর বড় প্রতিবেদন বেরিয়েছে আমাদের ম্যাগাজিনে। ওটা নিয়ে আসব।
২০১৮-এর নভেম্বরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এডভোকেট মোজাম্মেল হকের সঙ্গে ১৫ জনের এক বড় দলের সঙ্গে সরকারি সফরে ইস্তাম্বুল, আঙ্কারা আর চানাক্কালে গিয়েছিলাম তুরস্ক কীভাবে তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিগুলো সংরক্ষণ করেছে, কী ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করেছে সে সব দেখার জন্য। সরকারি কর্মকর্তাদের বাইরে ছিলাম আমি, মুনতাসীর মামুন, শিল্পী হাশেম খান, স্থপতি রবিউল হুসেইন আর কবি ও প্রকাশক তারিক সুজাত। সেবার তুরস্কের সংস্কৃতি মন্ত্রী, ইস্তাম্বুলের মেয়র আর চানাক্কালের গভর্নরের সঙ্গে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছিল। আমার অনুরোধে ইব্রাহিম ইস্তাম্বুল এসে আমাদের মন্ত্রীর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ওদের দৈনিকে ছেপেছে। মনে হয় কোনিয়ার ওপর ছবি বানিয়ে ওকে কিনে ফেলেছি। কোনিয়ার কথা বলার সময় ও উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে।
ইব্রাহিমের সঙ্গে কথা বলে প্রফুল্ল মনে গ্র্যান্ড বাজারে যাব এমন সময় ওবাইর ফোন এল। বিব্রত গলায় বলল, স্যার, আমি কয়েকজন সিরীয় শরণার্থীর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। কেউ ছবির জন্য কথা বলতে রাজি হচ্ছে না। ইস্তাম্বুলে বেশির ভাগ শরণার্থী অবৈধভাবে কাজ করে।
আমি একটু বিরক্ত হয়ে বললাম, তাহলে তো সিরীয় শরণার্থী নিয়ে ছবি বানাবার পরিকল্পনা এখনকার মতো স্থগিত রাখতে হবে।
আমার কথা শুনে ওবাই হতাশ হলো। বলল, আমি অনেক চেষ্টা করেছি। এক সপ্তাহ সময় দিলে শরণার্থী শিবিরে গিয়ে দেখতে পারি।
ওর হতাশার কারণ বুঝলাম দুশ ডলার আয় হাতছাড়া হয়ে গেল। আমার কিছুই করার ছিল না। বললাম এক সপ্তাহ আমি থাকতে পারব না। আর সরকারি অনুমতি ছাড়া শরণার্থী শিবিরের ছবিও তুলতে পারব না।
দুপুরে মুরাতকে নিয়ে লাঞ্চে গেলাম সমুদ্রের ধারে এক রেস্তোরাঁয়। মুরাত ধূমপান ও মদ্যপান দুটোই পছন্দ করে। আমি ধূমপান ছেড়ে দিলেও মাঝে মাঝে বন্ধুদের সঙ্গ দেয়ার জন্য সামান্য মদ্যপান এখনও করি। মুরাতকে বললাম, সিরীয় শরণার্থীদের নিয়ে এ যাত্রা শুটিং হবে না।
ওবাইর সমস্যার কথা শুনে মুরাত বলল, শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করে এমন কিছু এনজিও আমি চিনি। তুমি যদি চাও আমি ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারি।
মুরাতকে বললাম, কথা বলে দেখ। আমিও ঢাকায় কথা বলব। সব কিছু ঠিক হলে সেপ্টেম্বরে শুটিং করব।
মুরাতকে আমাদের পুরনো বন্ধু বেরকেরের কথা জিজ্ঞেস করলাম। মুরাতের আগে বেরকের আমার ছবিতে ক্যামেরার কাজ করেছে। ওকেও জুটিয়ে দিয়েছিলেন কমরেড এদমিয়ের। এরা সবাই কমিউনিস্ট, সরকারের কট্টর সমালোচক।
মুরাত জানাল, ও, বেরকের আর তার বান্ধবী মিলে নতুন প্রোডাকশন হাউস খুলেছে কাদিকোয়েতে। আমি যদি দেখতে যাই ওরা খুশি হবে।
বললাম তেরো তারিখ দুপুরে তো আমি কাদিকোয়ে যাচ্ছি কমরেড এদমিয়েরদের সেমিনারে। তখন যেতে পারি।
মুরাতকে মনে করিয়ে দিলাম ও যেন ‘মিথাতস ড্রিম’ দেখতে আসে। ক্যামেরার কাজ করলেও ছবিটা এখনও ওর দেখা হয়নি।
সুলতানআহমেত থেকে কাদিকোয়ে যাওয়া অত্যন্ত আনন্দদায়ক এক অভিজ্ঞতা। ট্রামে তিন স্টপেজ পর নামতে হয় এমিনোনুতে। সেখান থেকে ফেরি জাহাজে বসফরাস প্রণালীর অপর তীরে কাদিকোয়ে যেতে আধঘণ্টা লাগে। মর্মর সাগরে আধঘণ্টার এই যাত্রা অত্যন্ত সুখকর। ফেরিগুলো খুবই আরামদায়ক। খোলা ডেক-এ যেমন বসার ব্যবস্থা আছে ভেতরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বড় কেবিনেও গদিমোড়া চওড়া চেয়ার। ভেতরে খাবার দোকানও আছে। সরকারি বলে খাবার খুবই সস্তা। যাতায়াত ভাড়াও প্রতি ট্রিপে আড়াই লিরা, ইউরোপে যা কল্পনাও করা যায় না। বসফরাস প্রণালীর দুই পাশে ইস্তাম্বুল শহর। এক অংশ ইউরোপে, অপর অংশ এশিয়ায়। আমি থাকি ইউরোপে। আমাদের কনসুলেট এশিয়ায়।
তের তারিখে আমাকে কনসুলেটে নেয়ার জন্য কনসাল জেনারেল গাড়ি পাঠিয়েছিলেন। ওবাইকে আসতে বলেছিলাম। শুটিং হবে না জেনে ওর মন খারাপ হয়েছিল। ওর কথা ভেবে আমারও খারাপ লেগেছিল। ভাবছিলাম দূতাবাসের অনুষ্ঠানে অনেকে আসবেন, ওকে পরিচয় করিয়ে দেব। তাতে ওর কাজের সুবিধে হবে।
হোটেলে আসার পর ওকে আড়ং-এর একটা জামা আর ওর মায়ের জন্য গরম শাল উপহার দিলাম। তারপর পঞ্চাশ ডলার হাতে গুঁজে দিয়ে বললাম, আজকের অনুষ্ঠানের ছবি তুলবে তুমি। এটা তোমার আজকের অ্যাসাইনমেন্ট।
অযাচিত উপহার আর অ্যাসাইনমেন্ট পেয়ে ওবাই এমনই অভিভ‚ত হলো যে, মনে হলো কেঁদে ফেলবে। ধন্যবাদ বলে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
হোটেলে রহমতউল্লাহকেও আসতে বলেছিলাম। গত বছর কোনিয়ায় আমার ছবির উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে পরিচয় হয়েছিল। বাংলাদেশের ছেলে, উচ্চ শিক্ষার জন্য বৃত্তি পেয়ে তুরস্কে গেছে। পিএইচডির থিসিস জমা দিয়েছে। এখন ইস্তাম্বুলে কাজ করছে। দেখা হতেই লাজুক হেসে রহমতউল্লাহ সুখবর জানাল ও বাবা হতে চলেছে।
রহমতউল্লাহ ঢাকার পত্রিকায় নিয়মিত লেখে। নিজে একটা

অনলাইন পত্রিকাও বের করেছে। আগের দিন সেলজুক থেকে ইস্তাম্বুল ফিরে সানডে মার্কেটে রহমতউল্লাহর সঙ্গে লম্বা সময় কাটিয়েছি। রহমতউল্লাহকে বিশেষভাবে আসতে বলেছিলোম আমার দোভাষীর দায়িত্ব পালনের জন্য। আমি বলব ইংরেজিতে। অনুষ্ঠানে অনেকে আসবেন যারা ইংরেজি বোঝেন না। তাদের জন্য দোভাষী ছাড়া বক্তৃতা অচল। রহমতউল্লাহ তুর্কি ভাষায় অনর্গল বলতে পারে।
ইস্তাম্বুলে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মুনিরুল ইসলামের মতো করিৎকর্মা ক‚টনীতিক খুব কমই দেখেছি। গতবার মন্ত্রীর সঙ্গে যখন এসেছিলাম তখন দেখেছি কী দক্ষতার সঙ্গে আমাদের সফরের খুঁটিনাটি আয়োজন করেছেন, সংক্ষিপ্ততম সময়ে চানাক্কালে সফর এবং গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থাও করেছেন।
তেরো মে আমার ছবির প্রদর্শনীতে অনেক গণমান্য অতিথি এসেছিলেন। আলোচনার বিষয় ছিল বাংলাদেশ তুরস্কের ঐতিহাসিক সম্পর্ক। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দূতাবাসের কনসাল ও হেড অব দ্য চ্যান্সেরি বিদোষ চন্দ্র বর্মণ, কনসাল জেনারেল ড. মুনিরুল ইসলাম আর আমি ভাষণ দিয়েছি। ছবি দেখার পর ইস্তাম্বুলের বিদ্ব্যৎসমাজ যে ভাষায় প্রশংসা করলেন এখানে নাই বা বললাম।
অভ্যাগতদের ভেতর যারা ইংরেজি বলতে পারেন এসে আলাপ করলেন। নিজেদের কার্ড দিলেন। অনেকেই সিরীয় শরণার্থীদের নিয়ে ছবির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। বুঝলাম, তুরস্কে বন্ধুর সংখ্যা আগামীতে আরও বাড়বে।
রহমতউল্লাহ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দোভাষীর কাজ করেছে। সিরীয় শরণার্থী ওবাই এত জমকালো পার্টি আর নৈশভোজের প্রাচুর্য দেখে অভিভ‚ত হয়ে গেছে। মুনীরগিন্নী জানালেন, সব রান্না তিনি একা করেছেন। গতবারও তার রন্ধননৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়েছি। তুর্কি টেলিভিশনের এক তরুণী সাংবাদিক আমার পাশে বসেছিলেন। পায়েস খেয়ে এমনই উচ্ছ¡সিত যে রান্নার রেসিপি চেয়ে নিলেন।
ইব্রাহিম বলল, ইস্তাম্বুল না এলে এত চমৎকার একটা অনুষ্ঠান থেকে ও বঞ্চিত হতো। ঢাকা থেকে ইব্রাহিম, ওর স্ত্রী আর পুত্রকন্যাদের জন্য উপহার এনেছিলাম। ওগুলোর সঙ্গে মিথাত আর ওর মিষ্টি বৌ আসলার জন্য উপহার ইব্রাহিমের ব্যাগে গুঁজে দিলাম। বললাম, ফিরছ কখন?
ইব্রাহিম জানাল ভোরের ফ্লাইটে ও কোনিয়া যাবে। বাকি রাত এয়ারপোর্টে কাটাবে।
ইস্তাম্বুলের নতুন এয়ারপোর্টে কয়েক মাস হলো উদ্বোধন করা হয়েছে। শহর থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে। এত সুন্দর এয়ারপোর্ট ইউরোপে খুব কমই আছে।
আমাদের নৈশভোজ শেষ হলো রাত এগারোটায়। ইস্তাম্বুলে এবার ইফতারির সময় ছিল সাড়ে আটটায়।
রাতে শিক্ষামন্ত্রী ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্টে যাত্রাবিরতি করবেন। দূতাবাসের গাড়ি নিয়ে কনসাল বিদোষ আগেই চলে গেছেন। কনসাল জেনারেল বলেছিলেন ডা. দীপুমণি যেহেতু আমাদের বিশেষ বন্ধু, আমি যেন তার সঙ্গে বিমানবন্দরে যাই। প্রথমে সম্মতি জানিয়েছিলাম। পরে দেখলাম আমি চলে গেলে ইস্তাম্বুলে আমার তরুণ বন্ধুরা বেকায়দায় পড়বে। শহরের কেন্দ্র থেকে দূতাবাস বেশ দূরে।
কনসাল জেনারেলকে বললাম, আপনি মন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য চলে যান। আপনার ফিরতে ফিরতে রাত তিনটে বাজবে। অত রাত জাগতে পারব না। আমাকে বরং একটা ট্যাক্সি ডেকে দিন।

একটু পরে হলুদ ট্যাক্সি এল। অতিথিদের বিদায় জানিয়ে ইব্রাহিম, ওবাই আর রহমতউল্লাহকে নিয়ে আমি ট্যাক্সিতে উঠলাম। ইব্রাহিম বলেছে ওকে তাকসিম স্কয়ারে নামিয়ে দিলে ওর জন্য এয়ারপোর্ট যেতে সুবিধে হবে। ওবাই থাকে তাকসিমের কাছেই। রহমতউল্লাহ আমাকে হোটেলে না পৌঁছে বাড়ি ফিরবে না। কত বললাম, তোমার বৌ একা অপেক্ষা করছে, একা হোটেলে ফিরতে আমার অসুবিধে হবে না। তবু ও হোটেল পর্যন্ত এসে বিদায় জানাল।
পরদিন দুপুরে মসলার বাজারে ঘুরছি, ঈদের জন্য তুর্কি মসলা কিনব মিথাতের ফোন এল। ইব্রাহিম নাকি একটু আগে ওর উপহার পৌঁছে দিয়েছে। বার বার ধন্যবাদ জানিয়ে মিথাত জানতে চাইল আমার এবারের সফর কেমন হলো।
সফরের সবই তো ভালো ছিল। শুধু সিরীয় শরণার্থীদের শুটিংটা করতে পারলাম না। মিথাত বলল, আপনি কি জানেন আমাদের দলে এক সিরীয় শরণার্থী বালক আছে, মাত্র বারো বছর বয়স। চার বছর সেমার প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এখন আমাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচে। ওর বাবা একজন দরবেশ।
তুরস্কের মতো সিরিয়ারও সুফী ইসলামের ঐতিহ্য রয়েছে। আইএস আর আলকায়েদার আক্রোশের এটাও একটা কারণ। মিথাত জানাল গৃহযুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পর অনেক সিরীয় দরবেশ তুরস্কে চলে এসেছেন। কোনিয়ায় এখন সিরীয় শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় দুলাখ। গোটা তুরস্কে পঁয়ত্রিশ লাখের ওপর।
আমি অবাক হলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার প্রস্তাবিত ছবির কাঠামো পাল্টে ফেললাম। মিথাতকে বললাম, আগামী সেপ্টেম্বরে কোনিয়া এসে সিরিয়ার শিশু দরবেশ শরণার্থীর সঙ্গে কথা বলব। তুমি ছবিতে সূত্রধরের দায়িত্ব পালন করবে।
মিথাত বিনয়ের সঙ্গে বলল, আগামীবার কোনিয়া এলে আপনি দয়া করে আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করবেন।
আমার প্রামাণ্যচিত্রে মিথাতকে যারা দেখেছেন তারা সবাই ওর চরিত্রের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন। ওকে বললাম, তাহলে হযরত মেভলানার জন্মদিনেই আমাদের দেখা হতে পারে।
মিথাত বলল, ইনশাল্লাহ। সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ সুফীসাধক জালালউদ্দীন রুমীর জন্মবার্ষিকী। ২০ থেকে ৩০ তারিখ তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে বিশাল উৎসবে মেতে ওঠে কোনিয়া। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রুমী ভক্তরা কোনিয়া আসেন।
কোনিয়া আমাকে আবার ডাকছে। মিথাতের আতিথ্য উপেক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা