বড় সংগ্রহের পথে পাকিস্তান

আগের সংবাদ

ইংল্যান্ডকে ৩৪৯ রানের টার্গেট দিল পাকিস্তান

পরের সংবাদ

জেল থেকে স্ত্রীকে লেখা

আলাউদ্দিন আল আজাদের চিঠি

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ৭:৪১ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ৭:৪১ অপরাহ্ণ

কাগজ প্রতিবেদক

Alauddin Al Azad
C/O : D.I.G., I.B., E.P
Security Prisoner
Dacca Central Jail
17.08.1961

কবিতা আমার,
গত তিনদিনে পর পর তোমার চারখানা চিঠি পেলাম। কি যে ভালো লাগল তা কি দিয়ে প্রকাশ করব। ভাবার সে ক্ষমতা নেই। এখন সত্যি মনে হচ্ছে তুমি দূরে নও, আমার কাছেই রয়েছ, হাত বাড়ালে যেন ছুঁতে পাব। শরীরের নশ্বর ক্ষমতায় আমি একান্ত বিশ্বাসী, একজন শ্রেষ্ঠ লোকায়তিকের মতোই; কিন্তু এই সঙ্গে আত্মারও যে সজীব চঞ্চল অভিসার, তার মূল্য কোন অংশে কম? ভালোই হলো যে বাধ্যতামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়েছি, নইলে আগুনের শিখার মতো দাউ দাউ করে জ¦লা এই আবেগকে হয়তো এতটা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারতাম না।
তোমার ব্যাকুলতা, তোমার সান্ত¡না-বাণী আমার প্রাণে সুধাবর্ষণ করেছে; নিমেষে অনেক বিক্ষোভ, অনেক জ¦ালা সরে গিয়ে নীল আকাশের নিবিড়তায় আমাকে আচ্ছন্ন করেছে। এ তো বৃথা যেতে পারে না। এ যে ফসল জাগানো মৌসুমী হাওয়া, সামুদ্রিক বৃষ্টির কলরব। তোমার কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে পনেরোই আগস্ট থেকে রোজ পাঁচ ঘণ্টা নিয়মিত লিখব বলে পরিকল্পনা করেছিলাম, এখন দেখি আরো বেশি সময় দিতে পারব। রোজ সাত ঘণ্টা করে লিখলে কি স্বাস্থ্যহানি ঘটবে? মনে হয় হবে না। মাঝে মাঝে খেলাধুলা ও বিশ্রামের ব্যবস্থা রেখেছি। এই ধরো নাশতা খাওয়ার পর সকাল সাড়ে আটটা থেকে সাড়ে এগারোটা, তিনঘণ্টা লেখা। সাড়ে এগারোটায় উঠে গোসল করার পর বারোটায় দুপুরের খাওয়া; সাড়ে বারোটা থেকে তিনটা পর্যন্ত বিশ্রাম, সাড়ে তিনটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত আরো এক ঘণ্টা লেখা- মোট হলো চার ঘণ্টা; এরপর পাঁচটা থেকে সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত ভলিবল খেলা এবং রাত আটটায় খাওয়া-দাওয়ার পর সাড়ে আটটা থেকে সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত আরো তিন ঘণ্টা লেখা। সর্বমোট সাত ঘণ্টা। এর মাখঝানে পত্রিকা ও বইপত্র নাড়াচাড়া করতে হবে। দুদিন তো প্রোগ্রাম অনুসারে কাজ করলাম, মোটেই কষ্ট লাগেনি।
সাধনা না করলে, বিশেষত শিল্পসাহিত্য-ক্ষেত্রে সফলতা অসম্ভব। তোমার একটি কথায় যেন হেঁচকা টানে জেগে উঠলাম- সত্যি সময় তো চলে যাচ্ছে। লেখবার, সৃষ্টি করবার এই তো উপযুক্ত কাল? এখন যেক’টি বই মাথায় এসেছে সেগুলো লিখতে পারলে আমাদের সাহিত্য ঐশ্বর্যমণ্ডিত হবে।
তুমি ভালো আছ, ভালো থাকবে জানতে পারলেই আমি দুশ্চিন্তামুক্ত হই। কারাবাসের জন্য মনের শান্তি কত প্রয়োজন সে তো বুঝতেই পারো?
কিছু খবর দিই। শরীর এখন মোটামুটি ভালো। ওজন একশ চৌত্রিশ পাউন্ডে এসে ন যথৌ ন তস্থৌ। বুকের ব্যথার জন্য এককোর্স ভিটামিন ইনজেকশন নিয়েছি; ভিটামিন ট্যাবলেট এবং একটি মিকচারও খাচ্ছি। দুর্বলতাটা একটু কমেছে। বাঁ হাতের মধ্যম আঙুলটা এখনো সম্পূর্ণ সারেনি, টিপলে ব্যথা পাই, ব্যান্ডেজ করে নিয়ে খেলতে হয়। তিনদিন আগে বল ধরতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম একজনের ধাক্কা লেগে, বাঁ পায়ের গোড়ালিটা একটু মচকে গিয়েছিল; আয়োডেক্সে মালিশ করাতে এখন ভালো। দ্বারদেশে আবার দুটি গুটির মতো দেখা দিয়েছে, একটু চুলকায়। ডাক্তারকে বলব কিনা ভাবছি। আচ্ছা, সাব-রেজিস্ট্রারের ওষুধে আগের চিকিৎসাটা কি এখন চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়?
কলেজের চাকরির জন্য মোটেই মাথা ঘামাই না; কিন্তু আমি যে তোমার কাছে থাকতে চাই। তোমার রান্না খেতে খুব ইচ্ছে করে, ইলিশের মরশুম কি শেষ হয়ে গেছে? তুমি যে অনুরোধ করেছ সে সম্বন্ধে ভাবছি। কখন কি করেছি, ছাইভস্ম কিছু মনে আছে নাকি? লোকে ডেকেছে, কোনো কোনো সভা-সমিতিতে গিয়েছি- এসবের প্রতি এর বেশি গুরুত্ব তো কোনোদিন দিইনি। আমি শিল্পী, এটাই আমার যথার্থ পরিচয়; আমি তো চোর-ডাকাত নই যে, গায়ে পড়ে অন্যকে নিজ জীবনের ফিরিস্তি জানাতে হবে।
তোমার চাকরি করার ব্যাপারে আমার মতও নেই, অমতও নেই। একটা কিছু নিয়ে থাকা প্রয়োজন, এটা বুঝি। তোমার ব্যাপারে এখন তোমরাই ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারো; সুবিধে মতো কাজ পেলে নেবে কিনা সেও তোমারই বিবেচ্য। আমাকে জেলে লালন করবার জন্য তুমি কষ্ট করবে, যদিও এতে তোমার আনন্দ, আমি তা চাই না। এখন যা আছে, তা দিয়েই চলবার চেষ্টা করা ভালো; আরো কিছুকাল দেখা যাক না।
আজ সকালে টেকস্ট বুক বোর্ডের লোক এসেছিল। তাদের দলিল ও বিলে আমি স্বাক্ষর করেছি। দু’একদিনের মধ্যেই তুমি টাকা পেয়ে যাবে। য়ুনিভার্সিটির বিলটাও সই করে পাঠিয়েছি। কর্ণফুলীর দলিল করতে তোমার কাছে যাবে সর্দার। পাইওনিয়ারে দেয়া বইটার কি হলো একটু খোঁজ নিয়ে দেখো। সংবাদ-এর একটা প্রবন্ধে মানচিত্রের উল্লেখ দেখে খুব খুশি লাগল। ভালো কথা, টেবিলের ওপরে ফাইলে অথবা কাগজের ব্যাগের মধ্যে ‘সারাক্ষণ’ এর একটি পরিচ্ছেদ ও ‘অরণ্যের ছয়ঋতু’ উপন্যাসের দুটি পরিচ্ছেদের কাটিং আছে; এগুলো একটা লম্বা খামের মধ্যে পুরে আমার ঠিকানায় পোস্ট করে দিও। বই দুটো শেষ করার তাগিদ অনুভব করছি। এখন একটানা লিখে যেতে পারব। এখন আসি? আমার অফুরন্ত ভালোবাসা ও আদর নিও।

বি: দ্র: মানচিত্র যাতে সমালোচনার জন্য দেয়, তার ব্যবস্থা করো। ওরা না দিয়ে থাকলে বই আনিয়ে সংবাদ, ইত্তেফাক, সমকাল ও দেশ পত্রিকায় পাঠিও। প্রতি কাগজে দুটি করে কপি এবং প্রতি কপিতে ‘সমালোচনার জন্য’ কথা কয়টি লিখে দিতে হবে। রেডিও পাকিস্তান ঢাকায় দুই কপি দিও। সমালোচনা হলে বই বিক্রি হবে।

ইতি
তোমারই আজাদ
আলাউদ্দিন আল আজাদ
ঢাকা সেন্ট্রাল জেল
৬.১০.১৯৬১

 

 

শ্যামলী,
কবিতা সম্পর্কে আমার অক্লান্ত ভাবনার একটি কারণ এই যে, এর মধ্যে আমার আত্মমুক্তির একটি দিগন্ত খুঁজে পেতে চাই। তবে তার মানে এই নয় যে, প্রচলিত রীতির ঊর্ধ্বে এক চমকপ্রদ বিশল্যকরণী আবিষ্কার করে এবং তাকেই আঁকড়ে ধরে থাকব। ব্যাপারটা উল্টো। যে কোনো শিল্পীকে তার ঐতিহ্যের ঋণ শোধ করতেই হয় আর এর মধ্যে দিয়ে আসে স্বকীয়তার রূপ। এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে নন্দনতত্ত্বের বাঁধাধরা বুলি-সকলকে পছন্দ করিনে। প্রতিষ্ঠিত বিধানকে অস্বীকার করেও একটি লেখা অতি সামান্য কারণে স্মরণীয় হতে পারে। সে জন্য পেশাদার সমালোচকদের তৌলদণ্ডের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাকেই ফর্মায় ফেলে ভালো-মন্দের ছাড়পত্র দেওয়াই যে তাদের অভ্যাস!
আমার বিবেচনায়, নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষার অর্থ কঠিন সিদ্ধান্তে পৌঁছে স্থবির হয়ে যাওয়া নয়; বরং সৃষ্টির সম্ভাবনার ক্ষেত্রকে অধিকতর প্রসারিত করা। এ এক জীবন্ত প্রবাহ, এক তীর থেকে অন্য তীরে অবিরাম সচল হয়ে যাওয়াই তার লক্ষ্য। যে তীরকে যখন স্পর্শ করবে, তাকে যেন ফুল ফসল দেয়ার মতো সঞ্জীবনী থাকে। এবং তা যে অসম্ভব নয়, আমাদের চোখের সামনে রবীন্দ্রনাথ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ‘রবীন্দ্র প্রতিভার অত্যাশ্চর্য গুণ হচ্ছে তাঁর প্রণালীর অদ্ভুত অস্থৈর্য, তাঁর অশেষ পরিবর্তন ও অনবতুল বৃদ্ধি।’
শেষ লাইনটি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের লেখা থেকে তুললাম। তাঁর প্রবন্ধে, গত চিঠির আলোচনায় যা স্পষ্ট করতে পারিনি, কাব্যের নববিন্যাসের দ্বারা আমি কি চাই- সে অনুচ্চারিত প্রশ্নেরও খানিকটা উত্তর পেয়েছি। নিজের ভাষায় তেমন করে বলতে পারব না, তাঁর কথাগুলোই উদ্ধৃত করছি : কাব্যের রূপ কী, তা নিয়ে অনেকে তর্কে নেমেছেন, কেউ মীমাংসায় পৌঁছাননি। কাজেই সে প্রসঙ্গে বৃথা বাক্য না বাড়িয়ে শুধু এইটুকু বলা নিরাপদ যে, কল্পনামূলক সাহিত্যমাত্রেই যখন বৈচিত্র্য-ব্যতিরেকে বাঁচে না, তখন বৈচিত্র্যের উপেক্ষা কাব্যের পক্ষে অকল্যাণকর। অর্থাৎ প্রত্যেক উৎকৃষ্ট কবিতাই কালোপযোগী; কিন্তু শ্রেষ্ঠ কবিতার আরো একটা বাড়তি গুণ আছে, যেটা কালাতিরিক্ত।
সুযোগ যেমন আসে, তেমনই যায়; সুতরাং তার সহযোগ ভিন্ন যদি শ্রেষ্ঠ কাব্য অলিখিতই থাকে, তবে মহাকবির পক্ষে এমন কোনো মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা আয়ত্তে আনা চাই, যাতে অতীত সুযোগ প্রয়োজন মতো পুনর্জীবন পায়। মহৎ কাব্যের এই ঐন্দ্রজালিক লক্ষণটিকেই আমি উপরে বৈচিত্র্য নাম দিয়েছি। এই বৈচিত্র্য পশ্চিম দেশের ঐকতান সঙ্গীতের মতো; একটা সমষ্টিগত রূপ নিশ্চয়ই আছে, এবং সেটাই সর্বপ্রথমে শ্রোতাকে বিস্ময়বিমুগ্ধ করে। কিন্তু এইখানে তার আবেদনে পূর্ণচ্ছেদ পড়ে না; বহুবার শুনে যখন তার সমগ্র রূপরেখা শ্রোতার স্মৃতিপটে ফুটে ওঠে, তখন শুরু হয় তার বিশ্লেষণ, প্রত্যেক অঙ্গের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার, প্রত্যক যন্ত্রের স্বরসঙ্গতির বিবরণ, প্রত্যেক সুরের সার্থকতার পরিমাপ। যে শিল্পসৃষ্টি এই দ্বিজত্বে পৌঁছাতে পারে, তাতে হয়তো সাময়িক শিল্পের আপাত-রমণীয়তা মেলে না, কিন্তু একটা আত্মসমাহিত উৎকর্ষ তাকে অতি পরিচয়ের অবজ্ঞা থেকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখে।’
এই উপলব্ধি ও বিশ্লেষণ এতই সম্পূর্ণ যে এর ওপরে মন্তব্য হঠকরিতা। সে আমি করবও না। তবে একটি প্রশ্ন থাকে, এই বৈচিত্র্য অর্জনের জন্য কি ধরনের শিল্পীচরিত্রের প্রয়োজন। তার উত্তরও তিনি দিয়েছেন : ‘অগত্যা এই ধারণা আজ আমার মধ্যে বদ্ধমূল যে, নৈরাত্ম্য আর বৈচিত্র্য অন্যোন্যনির্ভর; এবং যে কবিতা নৈর্ব্যক্তিক নয়, তা অনেক সময়ে বিপদের বটে, তথাচ তাতে অমৃতের আস্বাদ নেই। অর্থাৎ ব্যক্তি সর্বসময়েই সীমাবদ্ধ : তার মজ্জায় মজ্জায় যত বিদ্রোহই থাকুক না কেন, স্থানকালের দাসত্ব তার অবশ্য কর্তব্য। উপরন্তু মনস্তাত্ত্বিকদের কাছে শোনা যায় যে একটা ঐকান্তিক একাগ্রতা ছাড়া ব্যক্তিত্বের আর কোনো মানে নেই। ফলে নিজের ভিতর থেকে সাহিত্যিক-বৈচিত্র্যের পথ্য সংগ্রহ কবির সাধ্যাতীত; এবং কাব্যকে চিরন্তনের প্রকোষ্ঠে ওঠাতে চাইলে, কেন্দ্রাপসারণ ছাড়া তার গত্যন্তর নেই। অবশ্য বিশ্বও অমিত না; কিন্তু মানুষের শক্তির পরিমাণ এত নগণ্য যে এই সংকীর্ণ জগৎই তার কাছে অনন্ত ঠেকে; ঘটনার ঘুরন্ত চাকার দিকে সে যখন তাকায়, তখন তার এমনই ঘোর লাগে যে একই ঘটনা বার বার ফিরে আসছে কিনা, তা বোঝবার সামর্থ্য থাকে না।’
এবং এরপর, আমার প্রথম কথাগুলোকে আরো সুন্দর করে বলেছেন : ‘কাজেই যে কবির বক্তব্য ব্যক্তিকে ছেড়ে বিশ্বের আশ্রয় নেয়, তার সাহিত্যে বৈচিত্র্যের পরিমাপ অপেক্ষাকৃত অধিক; এবং শ্রেষ্ঠ কাব্যের ব্যঞ্জনা যেহেতু বিষয়ের সঙ্গে দুশ্ছেদ্য সূত্রে আবদ্ধ, তাই এই জাতীয় বিশ্ববান্ধব মহাকবিদের রচনায় শিল্পপ্রকরণের কোনো গতানুগতিক আকার ধরা পড়ে না। যাঁরা সমত্ববোধকে কাব্যের যজ্ঞাবলে আহূতি দিতে পেরেছেন, নিরর্থ প্রথা তাঁদের কাছে স্বভাবতই তুচ্ছ। মহতের বিসদৃশ নিয়ম লঙ্ঘনই রসিক সমাজে আর্য প্রয়োগ নামে পরিচিত; এবং প্রাচীন গ্রিস থেকে প্রাচীন ভারত পর্যন্ত এই প্রয়োগ একদিক যেমন প্রশ্রয় পেয়েছিল, আধুনিক পশ্চিম থেকে আধুনিক প্রাচ্য পর্যন্ত আজও তার তেমনই সমাদর।’

ইতি
তোমারই আজাদ

 

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা