এখনো বেতন পাননি অনেক পোশাক শ্রমিক

আগের সংবাদ

রাজস্ব ঘাটতি ছাড়াল ৫০ হাজার কোটি টাকা

পরের সংবাদ

আমরা অমৃতসর এসে গেছি

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ১:৫৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৩, ২০১৯, ১:৫৩ অপরাহ্ণ

Avatar

অমৃতসর স্টেশন ১৯৪৭
বগিতে বেশি যাত্রী নেই। সামনের বার্থে বসে সর্দারজি তার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা শোনাচ্ছেন।
যুদ্ধের সময় তিনি বার্মা ফ্রন্টে ছিলেন। তিনি গোরা সৈন্যদের নিয়ে ঠাট্টা মস্করা করছেন এবং যখন তখন হাসিতে ফেটে পড়ছেন। একই বগিতে আমাদের পাশে তিনজন পাঠান বেপারি, তাদের একজনের চোখে সবুজ চশমা, উপরের বার্থে ঠেস দিয়ে আছেন। তিনি মিশুক ধরনের মানুষ। আমার দিকে বসা একজন শুকনো পাতলা বাবুর সঙ্গে তিনি কৌতুক করে চলেছেন। এই চিকন ধাঁচের বাবুটিকে মনে হচ্ছে পেশোয়ারের লোক। কারণ তারা পশতু ভাষা ব্যবহার করছেন। আমার ডানদিকে এক কোণে এক বুড়ি, তার মাথা ও মুখমণ্ডল ঢাকা, তিনি জপমালায় হাত রেখে পুতি টানছেন আর জপছেন।
বগিতে যাত্রী একজনই। আরো দু’একজন যদি থেকেও থাকেন আমার মনে নেই।
ট্রেন আস্তে আস্তে চলছে, বগির যাত্রীরা গপসপ করছে। বেশ উৎফুল্ল আমার মন, কারণ আমি স্বাধীনতা দিবসের উৎসবে যোগ দিতে দিল্লি যাচ্ছি।
সেই সব দিনগুলোর কথা যখন মনে পড়ে আমি সন্দিহান হয়ে উঠি এ কি সত্য, না এ কি মায়া? ভবিষ্যৎ যখন আমাদের সামনে প্রকাশিত হতে যাবে এই মায়া আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে।
পাকিস্তান সৃষ্টির ঘোষণা হয়ে গেছে, ভবিষ্যৎ তাদের কপালে কি রেখেছে এ নিয়ে মানুষ হরেক রকম অনুমান করে চলেছে। কিন্তু তাদের কল্পনা বেশিদূর এগোতে পারে না। আমার সামনে বসা সর্দারজি বারবার একটা প্রশ্নই জিজ্ঞেস করছিলেন : পাকিস্তান হাসিলের পর জিন্নাহ সাহেব কি সেখানে চলে যাবেন না বোম্বেতে থাকবেন। প্রত্যেকবারই একই উত্তর এসেছে তিনি বোম্বে ছেড়ে একেবারে যাবেন না, পাকিস্তানে ঘন ঘন আসা-যাওয়া করবেন। তিনি সেখানে গিয়ে কেন স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন এর কোনো যুক্তি নেই।
মানুষ লাহোর আর গুরুদাসপুর নিয়ে অনুমান চালিয়ে যাচ্ছে এ শহর দুটো কি ভারতে পড়বে না পাকিস্তানে?
তারপর গল্পস্বল্প চলে, হাসাহাসি হয় এবং স্বাভাবিক সময়ের মতো কৌতুক চলতে থাকে। কেউ জানে না কোনটা সঠিক পদক্ষেপ আর কোনটা ভুল। পাকিস্তান যে সৃষ্টি হচ্ছে এ নিয়ে একদল মানুষের মধ্যে বেশ উত্তেজনা আছে, অন্য দল পাকিস্তানের জন্য স্বাধীনতা চাচ্ছে। এ নিয়ে অনেক জায়গায় দাঙ্গা হয়েছে, অনেক জায়গায় স্বাধীনতার উৎসব করার প্রস্তুতি চলেছে। এই অলীক বিশ্বাসের বাতাসে স্বর্ণরেণুর উপস্থিতি অনিশ্চিত আর এই অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে যে কেউ আগামীতে মানুষের মধ্যে সম্পর্ক কেমন দাঁড়াবে তার একটি ঝলক দেখতে পেয়েছে।
উপরের বার্থে বসা পাঠান যখন তার প্যাকেট খুলে তার সঙ্গীদের সিদ্ধ মাংস আর নানরুটি দিতে শুরু করল তখন ট্রেন সম্ভবত ঝিলাম স্টেশন ছাড়িয়ে গেছে। খাবার সময় কৌতুক করেই আমার পাশের বাবুটিকে এক টুকরো মাংস সাধলেন এবং বললেন, খেলে তাদের মতো শক্তিশালী হয়ে উঠবেন আর এটা তার স্ত্রী খুব পছন্দ করবেন ‘আপনি দুর্বল কারণ আপনি কেবল ডাল খান।’
বগির যাত্রীরা হাসতে শুরু করল। বাবু পশতুতে কিছু একটা বলে মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখলেন এবং মাথা ঝাঁকি দিতে থাকলেন।
অপর পাঠানও হাসতে থাকেন। ‘হে জালিম আপনি যদি আমাদের হাত থেকে খাবারটা না নিতে চান তাহলে নিজেই তুলে নিন। শপথ করে বলছি এটা ছাগলের মাংস অন্য কিছু নয়।’
উপরের বার্থে বসা পাঠান বললেন, ওহে মানবপুত্র, কেউ এখানে আপনাকে দেখছে না। আমরা আপনার স্ত্রীকে বলব না। আপনি আমাদের কাছ থেকে মাংস নিন, আমরা আপনার কাছ থেকে ডাল নেব।
এতেও সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল। চিকন বাবুটির মুখেও হাসি, তিনি মাথা নাড়লেন এবং পশতুতে কয়েকটি শব্দ উচ্চারণ করলেন।
‘এটা কেমন কথা আমরা খাচ্ছি আর আপনি দেখছেন’ পাঠানরা সবাই খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। স্থূল ও ভারী দেহের সর্দার খিলখিল করে হাসতে হাসতে বললেন, ‘তিনি খাবার নিচ্ছেন না কারণ আপনার হাত ধোননি।’ তার আধেক ঠেস দেয়া শরীরে ভুঁড়ির বড় অংশ সিটের বাইরে ঝুলে পড়েছে। তিনি আবার হাসিতে ফেটে পড়ছেন। সর্দারজি আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন এবং আবার হাসতে শুরু করলেন।
‘আপনি যদি মাংস না খান বাবু তাহলে মহিলাদের বগিতে চলে যান। এখানে কি করছেন?’
আবারও হাসির তোড়।
বগিতে আরো কিছু যাত্রী ছিলেন, কিন্তু তারা স্বল্প দূরের যাত্রী, ট্রেনে উঠছেন আর নামছেন। আর এই যাত্রী ক’জন একেবারে গোড়ার স্টেশন থেকে ট্রেন ধরেছেন ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে।
‘আসুন আমাদের সঙ্গে চলে আসুন জালিম, আমরা নিজেরা গল্পগুজব করব।’
ট্রেন একটি স্টেশনে থামল এবং বহু যাত্রী ঠেলে এই বগিতে ঢুকল।
কেউ একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্টেশনের নামটা কি?’
জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আমি বললাম, ‘সম্ভবত ওয়াজিরাবাদ।’ স্টেশন ছেড়ে যেতে ট্রেন কিছুটা সময় নিল, কিন্তু তার আগে কিছু একটা ঘটল। পাশের বগি থেকে একজন যাত্রী নেমে এসে পানি নেয়ার জন্য স্টেশনের ট্যাপ পর্যন্ত এলেন। কিন্তু লোটা ভরার আগেই তিনি তার বগির দিকে ছুটলেন। লোটা থেকে পানি ছলকে পড়ছিল, কিন্তু তিনি যেভাবে লোটা নিয়ে ছুটেছেন তাতে অনেক কিছু বোঝা যায়। ট্যাপের পানি নিতে আসা আরো তিন চারজন তাদের বগির দিকে ছুট দেয়। আমি এভাবে মানুষকে দৌড়াতে দেখেছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্ল্যাটফর্ম জনশূন্য হয়ে গেল। কিন্তু বগির ভেতর সেই ঠাট্টা-পরিহাস চলতেই থাকল।
সরু দেহের বাবু বললেন, ‘খারাপ কিছু একটা ঘটেছে।’
আমরা তখন প্ল্যাটফর্মের উল্টোদিকে, ট্রেনের দরজাতেই হইচই হচ্ছে। কেউ একজন বলল, কেন জোর করে ভেতরে ঢুকতে চাইছেন? এখানে তো এতটুকুও জায়গা নেই। আরো অনেক কণ্ঠে একসাথে চেঁচামেচি শব্দ : ‘দরজা বন্ধ রাখুন, সবাই ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে।’
যখনই একজন যাত্রী বগিতে ঢোকার চেষ্টা করছে ভেতরের যাত্রীরা তার প্রবেশ ঠেকাতে জোর প্রতিরোধ করছে। কিন্তু এই যাত্রী একবার ভেতরে ঢুকে পড়লে তার প্রতি বিরোধিতা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কারণ এই যাত্রীও তখন তাদের সাথে যোগ দিয়ে বলপ্রয়োগ করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করা যাত্রীদের প্রতিহত করছে, ‘না, এখানে জায়গা নেই, পরের বগিতে চেষ্টা করুন। এখানে আর ঠেলবেন না।’
দরজায় হইচই বেড়েই চলছিল। আমরা দেখলাম নোংরা পোশাক ও ঝুলন্ত গোঁফের একজন আমাদের বগিতে ঢুকছে। তার কাপড় ভীষণ নোংরা। বাধাদানকারীদের পাত্তা না দিয়ে দরজার দিকে মুখ করে লোকটি একটি কালো লোহার বাক্স ভেতরের দিকে টেনে আনছে। সে বাইরের আরো একজন কাউকে বলছে, ‘ভেতরে চলে এসো, তুমিও এসো।’
আমরা দেখলাম একজন সরু ও জীর্ণদেহের নারী ভেতরে ঢুকেছে তার পেছন পেছন কালো গায়ের রঙ এক বালিকা। মানুষ তখনো চেঁচিয়ে চলেছে। সর্দারজিকে বসতে হয়েছে নিজের নিতম্বের ওপর।
‘দরজা বন্ধ রাখুন, ভেতরে জায়গা আছে কি নেই না জেনে দরজায় ধাক্কা দেবে যেন তাদের বাপের দরজা। এদের ভেতরে আসতে দেবেন না। ঠেলে বাইরে বের করে দিন।’ অন্যরাও চেঁচাচ্ছে।
বাক্স টেনে যে লোকটা ভেতরে ঢুকল তার স্ত্রী ও কন্যা টয়লেটের দরজা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে।
আর কোনো বগিতে ঢুকতে পারেনি। এখানে ঢুকেছে, তো সাথে দুজন নারীও ঢুকিয়েছে।
লোকটি ঘামে ভিজে স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে, বাক্স টানছে, বাতাস টানার জন্য তার শ্বাস উঠে গেছে, বাক্সের পর টানছে দড়িতে বাধা একটি খোলা খাট।
‘আমার টিকেট আছে, আমি টিকেট ছাড়া আসিনি’, বগির অধিকাংশ যাত্রী চুপ হয়ে গেল, প্রতিবাদ করল না; কিন্তু উপরের বার্থে বসে পাঠান তার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘বেরিয়ে যাও। দেখতে পাচ্ছো না এখানে কোনো জায়গা নেই।’
পর মুহূর্তে লোকটাকে লাথি মারার জন্য নিজের একটা পা ছুড়ে দিল। কিন্তু তাকে আঘাত না করে লাথি গিয়ে পড়ল তার স্ত্রীর বুকে, সেই নারী বসে পড়ে যন্ত্রণায় কাঁদতে শুরু করল। যাত্রীদের এ নিয়ে দেন-দরবার করার ফুরসৎ তার নেই। সে কেবল তার জিনিসপত্র ভেতরের দিকে টানছে। বগির ভেতর হঠাৎ নীরবতা। কয়েকটি বান্ডিলে বাঁধা খোলা খাট ভেতরে ঢুকেছে। এতে পাঠান আরো অধৈর্য হয়ে পড়েছে। সে চিৎকার করতে শুরু করে, ‘ওকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দাও। সে কে?’ এ কথা শুনে নিজের বার্থে বসা অপর পাঠান বাক্সটা ঠেলে বগির বাইরে ফেলে দিল। সেখানে লাল পোশাকের একজন কুলি লোকটির জিনিসপত্র গাড়িতে তুলছিল।
মহিলাটির বুকে লাথির আঘাত লাগার পর যাত্রীরা নিশ্চুপ হয়ে গেছে। কেবলমাত্র বগিতে বসে থাকা বুড়িটা বলে যাচ্ছে, ‘তোমরা ঈশ্বরের সন্তান, ওদের বসতে দাও। আয় মা এদিকে আয়, আমার পাশে এসে বসে পড়, আমরা কোনোভাবে জায়গা করে নিতে পারব। মানুষ তোমরা পাষাণ হয়ো না, ওদের বসতে দাও।’
ট্রেন যখন ছেড়ে দিচ্ছে তাদের অর্ধেক মালামাল তখনো নিচে রয়েই গেছে। লোকটি তখন উন্মত্তের মতো বলছে, ‘আমার লাগেজ তো রয়ে গেছে।’ টয়লেটের কাছে দাঁড়ানো মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘বাবা আমাদের লাগেজ রয়ে গেছে।’
ক্ষ্যাপাটে কণ্ঠে লোকটি বলছে, ‘নেমে যা নেমে যা’ ট্রেনে তোলা লাগেজ একটার পর একটা আবার নিচে ফেলে নিজেই নেমে পড়ল। বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে প্রথমে মেয়েটি তারপর তার স্ত্রী ট্রেন থেকে নামল।
বগির সেই বৃদ্ধা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘তোমরা অন্যায় করেছ, তোমরা খুব অন্যায় করেছ। তোমাদের অনুভ‚তি মরে গেছে। তাদের সাথে একটা ছোট মেয়ে ছিল। তোমরা পাষাণ, তোমরা তাদের তাড়িয়ে দিয়েছ।’
ট্রেন ছেড়ে দিল। বগির ভেতর অস্বস্তিকর নীরবতা বিরাজ করছে। বুড়ি তার অনুযোগ থামিয়ে দিয়েছে। পাঠানদের বিরোধিতা করার সাহস তার নেই।
ঠিক তখনই কিছুটা সুগঠিত দেহের বাবু তার হাত আমার হাতের ওপর রেখে বলল, ‘দেখুন, আগুন জ¦লছে।’
ট্রেন প্ল্যাটফর্ম পেছনে ফেলে চলে এসেছে, শহরের বাইরে চলে যাচ্ছে। শহরের কোনো এক জায়গা থেকে আকাশে উঠে আসা ঘন ধোঁয়া ও আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছে।
‘অবশ্যই দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে। মানুষ প্ল্যাটফর্মে ছুটোছুটি করছে। অবশ্যই কোথাও না কোথাও দাঙ্গা লেগে গেছে।’
বগির সবাই জেনে গেছে শহরে আগুন জ¦লছে, জানালা পথে উঁকি দিয়ে জ¦লন্ত শহরের দৃশ্য দেখতে চেষ্টা করছে।
ট্রেন যখন শহর ছাড়িয়ে চলে গেল বগির ভেতর মৃতপুরীর নীরবতা। আমি চারদিকে তাকাই।
দেখি চিকন বাবুটির মুখমণ্ডল পাণ্ডর হয়ে গেছে। তার আতঙ্কগ্রস্ত মুখে ঘামের স্তর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমার মনে হলো এই বগির সকল যাত্রী এর মধ্যে পরস্পরকে মেপে নিয়েছে। সর্দারজি এসে আমার পাশে বসল। যে পাঠান যাত্রী নিচের বার্থে বসেছিল, উপরে উঠে বাকি দুজনের সাথে যোগ দিল। তখন সম্ভবত এরকম কিছু অন্য বগিগুলোতে ঘটে চলেছে। পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং লোকজন কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। উপরের বার্থে বসা তিন পাঠান চুপচাপ নিচের যাত্রীদের পর্যবেক্ষণ করছে। এই বগির প্রতিটি চোখ সন্দিহান অবস্থায় বড় হয়ে উঠেছে। একজন জিজ্ঞেস করল, ‘এটা কোন স্টেশন?’
অন্য একজন উত্তর দিল, ‘ওয়াজিরাবাদ।’
এই জবাবে ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো। পাঠানদের উত্তেজনা কমে এলো, কিন্তু হিন্দু ও শিখদের নীরবতা আরো আতঙ্কজনক হয়ে উঠল। পাঠানদের একজন তার পকেট থেকে নস্যির কৌটা বের করে এক চিমটি নিজের নাকে লাগল। অন্য দুজনও যার যার পকেট থেকে নস্যির বাক্স বের করে নস্যি টানল। বুড়ি তার জপমালার পুঁতিতে আঙ্গুল চালালো। মাঝে মাঝে তার ঠোঁট থেকে দুর্বল কাঁপা কাঁপা ধ্বনি বেরিয়ে আসছে।
পরের স্টেশনে যখন ট্রেন থামল এখানেও নিস্তব্ধতার রাজত্ব। একটি পাখিও দেখা গেল না। পানি বহনকারী এক ভিস্তিওয়ালা ট্রেনের দিকে এগিয়ে এসে যাত্রীদের খাবার পানি সাধল।
‘এদিকে এসো পানি চাই।’ লেডিস কম্পার্টমেন্ট থেকে নারী ও শিশুরা জানালা দিয়ে তাদের হাত বের করে দিল।
‘হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে। বহু মানুষ হয়েছে।’
মনে হলো এই হত্যাযজ্ঞের মধ্যে মানুষকে পানি খাওয়ানো এই মানুষটিই উত্তম সামারিটান (বাইবেলে বর্ণিত দুস্থের সেবক)। ট্রেন ছাড়তেই যাত্রীরা জানালার শাটার নামিয়ে ফেলতে শুরু করল। ট্রেনের চাকার ভারী ঘর্ষণের মধ্যেও শাটার নামানোর শব্দ শোনা যাচ্ছে। অজানা আতঙ্কে বিচলিত হয়ে সরু দেহের বাবু তার সিট থেকে থেকে উঠে দুই বার্থের মাঝখানের মেঝেতে শুয়ে পড়ল। তার চেহারায় ফুটে উঠেছে মৃত্যুর বিবর্ণতা। দুটোর একটি বার্থে বসে পাঠান তাকে টিটকারি দিতে শুরু করল। ‘ওই বেহায়া তুমি কি মর্দ না মাগি? বার্থ ছেড়ে মেঝেতে লুকিয়েছ? তুমি তো পুরুষ জাতির কলঙ্ক।’
পাঠানরা এসব গা জ¦লা কথা বলেই যাচ্ছে আর হাসছে। বাবু একেবারে চুপচাপ। অন্য যাত্রীরাও নিশ্চুপ।
পাঠান বলে চলেছে, ‘আমরা তোমার মতো পুরুষ মানুষকে এই বগিতে থাকতে দেব না বাবু তুমি সামনের স্টেশনে নেমে মহিলাদের বগিতে চলে যাও।’
কিন্তু বাবুর মুখ শুকিয়ে গেছে, তার সাড়া মিলছে না। কিছু একটা বিড়বিড় করতে চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারেনি, নীরবতায় ডুবে গেছে। কিছু সময় পর ফ্লোর থেকে সিটে উঠে বসে, গায়ে লাগা ধুলাবালি ঝাড়ে। ট্রেনে পাথর ছোড়া হতে পারে কিংবা আগুন লাগিয়ে দিতে পারে এই ভয়ে কি সে মেঝেতে শুয়ে পড়েছিল? হয়তো সে কারণেই জানালার শাটার নামানো হয়েছে।
আসল কারণটা কি বলা মুশকিল। কোনো বিশেষ কারণে কেউ একজন হয়তো শাটার টেনেছে, আর বাকিরা তাকে অনুসরণ করে অকারণেই শাটার নামিয়েছে।
এ রকম গম্ভীর ও অনিশ্চিত পরিবেশে ট্রেন চলছে। বাইরে অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে। যাত্রীরা অজানা আশঙ্কা নিয়ে চুপচাপ বসে আছে। মাঝে মাঝে যখন যখন ট্রেনের গতি কমে আসে যাত্রীরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকায়। ট্রেন থামলে বগির ভেতরে নিস্তব্ধতা আরো তীব্র হয়ে ওঠে। কেবল পাঠান ক’জন আয়েশ করে বসে আছে। তবে তারা কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে কারণ কেউ তাদের কথায় সাড়া দিচ্ছে না।
অন্য যাত্রীরা যখন সামনের শূন্যতার দিকে চোখ মেলে আছে, পাঠানরা তখন ঝিমুচ্ছে। বুড়ি সিটের ওপর পা গুটিয়ে মাথা ও মুখ কাপড়ে ঢেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। পাঠানদের একজন পকেট থেকে তসবিহ বের করে আঙ্গুল চালিয়ে জপতে শুরু করেছে।
হঠাৎ হঠাৎ কোনো যাত্রী ট্রেনের জানালা উঠিয়ে বাইরের প্রকৃতিতে উঁকি দিচ্ছে। চাঁদ উঠেছে। বাইরের চন্দ্রালোক পরিবেশকে আরো অনিশ্চিত ও রহস্যময় করে তুলেছে। কখনো চোখে পড়ছে শহরে আগুন জ¦লছে। ট্রেন গর্জন করে সামনে যাচ্ছে কিন্তু গতি কমিয়ে দিয়েছে এবং শ্লথ গতিতে মাইলের পর মাইল অতিক্রম করছে।
বাবু হঠাৎ জানালা দিয়ে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘ট্রেন হরবংশপুরা পার হয়ে গেছে।’
যে ভাবে সে চিৎকার করেছে তাতে বড় ধরনের উত্তেজনার আভাস। তার চিৎকারে বগির সব যাত্রী হতচকিত হয়ে পড়ে। বগির যাত্রী অনেকে তার কণ্ঠ শুনে নড়েচড়ে বসে।
তসবিহ জপতে থাকা পাঠান তাকে জিজ্ঞেস করে, ‘বাবু তুমি চেঁচাচ্ছো কেন? তুমি কি এখানে নেমে যাবে? আমি কি চেইন টানব?’ পাঠান হাসতে থাকে। এটা স্পষ্ট হরবংশপুরার পরিস্থিতি তার জানা নেই, কারণ হরবংশপুরা কোথায় এটাই সে জানে বলে মনে হয় না।
বাবু কিছু বলেনি, কেবল মাথা নেড়েছে। পাঠানের দিকে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে জানালা পথে তাকিয়ে রয়েছে। ট্রেন যে দিকে যাচ্ছে বাবু সেদিকটা দেখার জন্য উঁকি দিয়েছে।
বাবু আবার চিৎকার করে উঠে, ‘আমরা শহরে এসে গেছি, আমরা অমৃতসর পৌঁছেছি।’
একই কথা বারবার বলতে থাকে। সে তার সিট থেকে লাফিয়ে উঠে, সোজা দাঁড়িয়ে উপরের বার্থে দখলকরা পাঠানের দিকে সরাসরি তাকিয়ে চিৎকার করে, ‘ওই পাঠানের বাচ্চা, নেমে আয়, তোর মাকে…। নেমে আয়। যে তোকে জন্ম দিয়েছে আমি তোর মাকে…।’
বাবু পাঠানকে গাল দিয়ে যাচ্ছে। পাঠান এবার ঘাড় ঘুরিয়ে বাবুকে বলল ‘বাবু, তুমি কি আমাকে কিছু বলেছ?’
‘নিচে নেমে আয়। তোর মাকে…। তোর কত বড় সাহস হিন্দু নারীকে লাথি মেরেছিস? জারজ কোথাকার। তোর মাকে…।’ ‘ও বাবু, ঘেউ ঘেউ করিস না। শুকরের বাচ্চা, গালি দিবি না। বলে দিচ্ছি, তোর জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলব।’
‘তুই আমাকে গালি দিয়েছিস, তোর মাকে …’ বাবু চিৎকার করে ও লাফিয়ে প্রায় বার্থ পর্যন্ত উঠে যায়। মাথা থেকে পা পর্যন্ত তার সমস্ত শরীর কাঁপছে। সর্দারজি বলল, ‘থামুন, লড়াই করার সময় নেই। আমরা শেষ স্টেশনে এসে পৌঁছেছি শান্ত হয়ে বসুন।’
বাবু চিৎকার করে উঠে, ‘এটা তোর বাবার ট্রেন নয়। আমি তোর ঠ্যাং ভেঙে ফেলব।’
পাঠান বলল, ‘আমি ভুল কি করেছি? সবাই তো ওদের ঠেলে বের করতে চেয়েছে, আমিও তাই করেছি। সে যদি আবার গাল দেয় আমি তার জিহ্বা টেনে বের করে ফেলব।’
বুড়ি আবার মুখ খুলল, ‘তোমরা ঈশ্বরের সন্তান। চুপচাপ শান্তিতে বসো। মাথা ঠাণ্ডা করো।’
তার মুখ যখন খুলছিল মনে হয়েছে কোনো প্রেতদেহের মুখ, তার ক্ষীণ কণ্ঠের বিড়বিড় শোনা যায়।
বাবু তখনো চেঁচাচ্ছে, ‘তুই তো নিজের গুহায় থাকা সিংহের মতো করেছিস। এখন কথা বল। আমি তোর …।’
ঠিক তখনই ট্রেন অমৃতসর স্টেশনে থামে। প্ল্যাটফর্ম লোকে লোকারণ্য। প্ল্যাটফর্মের লোকজন বগিতে উঁকি দিচ্ছে। তারা যাত্রীদের বারবার প্রশ্ন করছে! ‘কি হয়েছে? কোথায় দাঙ্গা লেগেছে?’
প্ল্যাটফর্মের লোকারণ্যে সবাই একটা বিষয়েই আলাপ করছে : ওখানে কি হয়েছে? অনেক যাত্রী দু’তিন জন ঘিরে রেখেছে। হঠাৎ তারা ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত হয়ে উঠেছে। ঠিক তখনই তিন পাঠান আমাদের বগির সামনে আসে এবং ভেতরের দিকে উঁকি দিতে থাকে। ভেতরে পাঠান যাত্রীদের দেখে তারা পশতুতে কথা বলতে শুরু করে।
আমি মাথা ঘুরিয়ে দেখি বাবুটি নেই, নিরুদ্দিষ্ট হয়ে গেছে। এতক্ষণ তো সে ক্রোধে উন্মত্ত ছিল। ঈশ^রই জানেন সে কিসের পরিকল্পনা করছে। ততক্ষণে আমাদের বগির তিন পাঠান নিজেদের লাগেজ তুলে নিয়ে বগি থেকে নেমে যায়, প্লাটফর্মে অপর তিন পাঠানের সঙ্গে যোগ দেয় এবং অন্য কম্পার্টমেন্টের দিকে পা বাড়ায়। ফেরিওয়ালাদের ঘিরে থাকা জনতার ভিড় কমতে থাকে। যাত্রীরা তাদের বগির দিকে যাচ্ছে। তখন চোখ পড়ল বাবু বগির দিকে আসছে। তার চেহারাতে তখনো মৃত্যুর বিবর্ণতা, মাথায় এক গোছা চুল কপালের উপরে পড়ে কপালের একাংশ ঢেকে রেখেছে। যখন যে কাছাকাছি এল, দেখলাম সে একটি লোহার রড ধরে আছে। ঈশ^র জানেন এটা সে কোথায় পেয়েছে। বগিতে ঢোকার সময় রডটা পেছনে লুকিয়ে রাখে আর বসার সময় আস্তে করে বার্থের নিচে গলিয়ে দেয়। বসার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ পাঠানদের খুঁজে বেড়ায়, বার্থে না দেখে এদিক ওদিক চোখ ঘোরাতে থাকে।
‘কেটে পড়েছে নাকি ঐ জারজগুলো, তাদের মা… তারা সবাই।’ বাবু মাথা চাপড়ে আবার আমাদের দিকে চেঁচিয়ে উঠে, ‘আপনারা ওদের নামতে দিলেন কেন। সব শালা ধ্বজভঙ্গ আর মেরুদণ্ডহীন।’
ট্রেনের ভেতর আগের চেয়ে বেশি ভিড়, অনেক নতুন যাত্রী যে উঠেছে এটা কেউ লক্ষ করেনি।
ট্রেন যখন এগোতে শুরু করে সে এসে আমার পাশে বসে। তখন সে খুবই উৎকণ্ঠিত এবং বিড়বিড় করে কিছু বলছিল।
ট্রেন থেমে থেকে এগোচ্ছে। ট্রেনের পুরনো যাত্রীরা পুরি খেয়ে ক্ষিধে মেটাচ্ছে, তৃষ্ণায় পানি। এখন যে দিকটাতে জীবন ও সম্পদ নিরাপদ ট্রেন সেদিকেই যাচ্ছে।
ধীরে ধীরে ট্রেনের গতি বাড়ে। নতুন যাত্রী এতক্ষণ যারা গল্প করছিল ঝিমোতে শুরু করে। কিন্তু বাবু এখনো বড় বড় চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে। পাঠানরা কোথায় গিয়েছে এ প্রশ্ন আমাকে বারবার জিজ্ঞেস করছে। সে পাগল হয়ে গেছে।
আমি নিজেও ঝিমোতে শুরু করি। আমার শরীর ছড়িয়ে দেয়ার মতো এতটুকু জায়গাও নেই। ঘুমে আমার মাথা একবার নিচের দিকে, আবার ডানে কিংবা বাঁয়ে ঝুঁকে পড়ছে। যাত্রীরা হরেক রকম অস্বস্তিকর অঙ্গভঙ্গি করে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের শঙ্কিত দৃষ্টি দেখে মনে হয় এই বগিটি মৃতদেহে পরিপূর্ণ।
বাবু কখনো জানালা দিয়ে তাকায়, পিঠ সোজা করে বসে, সিটের পেছনে ঠেস দেয় তার পিঠ।
কোনো স্টেশনে যখন ট্রেন থামে, চাকার ঘর্ষণের শব্দ বন্ধ হলে চারদিকে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করতে থাকে। তারপর মনে হয় কিছু একটা প্ল্যাটফর্মে উপর থেকে পড়েছে, অথবা কোনো যাত্রী বগি থেকে নেমেছে। একটি ঝাঁকিতে আমি উঠে বসি।
একইভাবে একবার যখন ঝাঁকিতে ঘুম থেকে জেগে উঠি দেখি ট্রেনের গতি শ্লথ হয়ে আসছে। আমি যেখানে মাথা রেখেছিলাম সেখান থেকে চোখ তুলে জানালাপথে তাকাই, ট্রেনের একেবারে পেছন দিকে লাল সিগন্যাল চোখে পড়ে। তার মানে একটি স্টেশন ছেড়েছে এখনো গতি উঠেনি।
বগির বাইরের অস্পষ্ট শব্দ কানে আসে। দূরে অস্পষ্ট কালো ধোঁয়ার মতো কিছু চোখে পড়ে। ঘুম ঘুম চোখে এটাকে শনাক্ত করার চেষ্টা করে এক সময় ছেড়ে দিই। বগির ভেতরে অন্ধকার, বাতি নেভানো, কিন্তু বাইরে দিনের আলো ফুটে উঠছে। আমার পেছনে দরজায় কেউ একজন শব্দ করছে, শুনতে পাই। দেখার জন্য ঘাড় ঘোরাই। দরজা বন্ধ, শব্দটা আবার শুনি। কেউ একজন দরজায় লাঠি দিয়ে টোকা দিচ্ছে। জানালা দিয়ে দেখি একজন মানুষ ট্রেনের ফুটবোর্ডে উঠে পড়েছে। একটি গাট্টি তার কাঁধে ঝোলানো, হাতে একটি লাঠি। মুখে দাড়ি, পরনে জীর্ণ কাপড়। দৃষ্টি একটু নামিয়ে দেখি একজন নারী, খালি পা, মাথায় দুটি বান্ডিল ট্রেনের সঙ্গে দৌড়াচ্ছে, কিন্তু মাথার বোঝার কারণে ট্রেনের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না, পিছিয়ে পড়ছে। ফুটবোর্ডে দাঁড়ানো মানুষটি হাঁপাতে হাঁপাতে বলছে, ‘চলে এসো, চলে এসো, এখানে পা রাখো।’ দরজায় আবার আঘাত। ঈশ্বরের দোহাই দরজাটা খুলুন।
লোকটা নিঃশ্বাসের বাতাস নিতে পারছে না। ‘দোহাই ঈশ্বরের, দরজাটা খুলুন। আমার সাথে একজন মহিলা আছে। আমরা ট্রেন মিস করব।’
হঠাৎ বাবু তার সিট থেকে উঠে দরজার কাচের জানালা দিয়ে তাকিয়ে বলল, ‘কে ওখানে? এখানে জায়গা নেই।’
বাইরের মানুষটি নুইয়ে পড়ে বলছে, ‘ঈশ্বরের দোহাই, নতুবা আমরা ট্রেন মিস করব।’
লোকটি জানালা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দরজার হ্যান্ডেল খোঁজার চেষ্টা করল।
‘জায়গা নেই নেমে যাও’ বাবু আবার চিৎকার করে উঠলেও হঠাৎ সিট থেকে উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল।
দরজা খুলতেই পরম স্বস্তির সাথে বলল, ‘ওহ আল্লাহ।’ ঠিক তখনই বাবুর হাতের রডটি আমার চোখে পড়ে। সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে রড দিয়ে এই যাত্রীটির মাথায় আঘাত করে। ভয়ে আমার পা কেঁপে উঠে। মনে হলো এই আঘাতে কিছুই হয়নি। লোকটি দুই হাতে হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে আছে। কাঁধে ঝুলানো বান্ডিল হাতের কনুইর কাছে নেমে এসেছে।
ঠিক তখনই আমার চোখে পড়ে লোকটির মুখের ওপর দু’তিনটি রক্তের ধারা। আমি তার হাঁ-করা মুখ আর উজ্জ্বল দাঁত দেখতে পাচ্ছি। লোকটি আরো একবার কি দুবার আল্লাহকে ডাকল, তখন তার পা টলছে। সে তার আধবোজা চোখে বাবুকে দেখল এবং কেন এই লোকটি তার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করল তা অনুমান করতে চেষ্টা করল।
তার ঠোঁটজোড়া আবার মেলল এবং সম্ভবত সে কিছু বলতে চেষ্টা করল। আমার মনে হলো হাসছে, কিন্তু তার নিঃশ্বাস শেষ হয়ে এসেছে। ভূমিতে যে নারী দৌড়াচ্ছে সে অনুযোগ করছে, অভিশাপ দিচ্ছে। তখনো সে জানে না কি ঘটেছে। সে ভেবেছে তার স্বামী ঘাড়ের বোঝার কারণে ট্রেনে ঢুকতে পারছে না। মাথায় দুই বান্ডিল নিয়ে এই নারী দৌড়াচ্ছে কোনোভাবে স্বামীর পা-টা ধরতে পারলে ফুটবোর্ডে উঠে পড়তে পারবে।
ঠিক তখন লোকটির দুটি হাত ট্রেনের দরজার হ্যান্ডেল থেকে ফসকে গেল কুড়াল কাটা গাছের মতো লোকটি পড়ে গেল। সে পড়ে যাওয়ার সাথে সাথে সেই নারীও দৌড় থামিয়ে দিল; যেন তাদের সফরের শেষ প্রান্তে তারা এসে গেছে।
আমার কাছে দরজার ধারে বাবু মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল, তখনো রড ধরে আছে। আমার মনে হলো সে হাতের রডটা ছুড়ে ফেলতে চাইছে, কিন্তু পারেনি।
আমি স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছি না; আমি তার দিকে তাকিয়ে বগির একটি অন্ধকার কোণে এসে আছি।
বাবু তখন নড়েচড়ে উঠল, দরজা দিয়ে ট্রেনের পেছন দিক পর্যন্ত দেখল ট্রেন সামনের দিকে এগোচ্ছে, পেছনে অনেক দূরে তাকালে মনে হয় অন্ধকারের স্তূপ।
বাবু নড়েচড়ে রডটা বগির বাইরে ছুড়ে ফেলল। সে বগিতে চারদিকে চোখ মেলে তাকাল। সব যাত্রীই ঘুমোচ্ছে। সে আমার দিকে তাকাল না।
কিছুক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকার পর দরজাটা বন্ধ করে দিল। খুব সতর্কভাবে নিজের পোশাক একটা একটা করে দুটো হাত নাক পর্যন্ত তুলে পরীক্ষা করল কোথাও রক্তের গন্ধ নেই তো। তারপর ফিরে এসে আমার পাশে বসল।
ধীরে ধীরে ভোর হয়ে এল। উজ্জ্বল আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। জরুরি চেইন টেনে কেউ ট্রেন থামাতে চেষ্টা করেনি। রডের আঘাত লাগা দেহটা বহু মাইল পেছনে পড়ে আছে।
সর্দারজি ঘুম থেকে জেগে উঠে নিজের শরীর চুলকাচ্ছে। সামনের দিকে চোখ মেলে বাবু আমার পাশে বসে আছে। তার মুখের ওপর তার গজানো চুলের গোড়া আমি দেখতে পাচ্ছি, যেন রাতারাতি গজিয়েছে। সর্দারজি তার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল, ‘বাবু তুমি একটা সাহসী মানুষ। তুমি নিজে এত পাতলা কিন্তু ভীষণ সাহস তোমার। তোমার ভয়ে পাঠানরা এই বগি ছেড়ে চলে গেছে। যদি তারা থাকতো, আমি নিশ্চিত তুমি তাদের কারো মাথা ভাঙতে।’ সর্দারজি হাসতে শুরু করল।
বাবুও হাসল এক আতঙ্কের হাসি এবং সর্দারজির দিকে তাকিয়ে রইল।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা