স্মৃতি থেকে সংগ্রহ

আগের সংবাদ

গোলাপ বাগান

পরের সংবাদ

আদিবাসী উৎসবে আনন্দে কৃতজ্ঞতায়

সঞ্জীব দ্রং

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ৩:৪৯ অপরাহ্ণ

গারোদের শস্য উৎসব ওয়ানগালা মানুষের কৃতজ্ঞতার সংস্কৃতির এক অনন্য প্রকাশ। গারোরা নিজেদের ‘মান্দি’ বলে। মান্দি মানে মানুষ। মানুষ সৃষ্টির কাছে কৃতজ্ঞ। মানুষ সৃষ্টির জন্য কৃতজ্ঞ। মানুষ প্রকৃতির কাছে, নদীর কাছে, পাহাড়-বন-আকাশ-বাতাস সবার কাছে কৃতজ্ঞ। ফসলের কাছে, সূর্যের আলোর কাছে, বৃষ্টির কাছে, ফুল-পাখির কাছে, জলবায়ুর কাছে, বনের কাছে, ঝর্ণার কাছে কৃতজ্ঞ এই মান্দিরা। মানুষ তার বেঁচে থাকার জন্য, জীবনের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা জানায়। ওয়ানগালা ধন্যবাদের উৎসব। আমি একবার আমেরিকায় থ্যাঙ্কস গিভিং ডে-তে উপস্থিত ছিলাম। নভেম্বর মাসে। প্রতি বছর নভেম্বরের চতুর্থ বৃহস্পতিবার এই দিবস পালিত হয়। জাতীয় ছুটি থাকে। তখন আমি ছিলাম ওয়াশিংটনে। একটি পরিবারে আমাদের নিমন্ত্রণ ছিল। এই থ্যাঙ্কস গিভিং ডে-তে আমেরিকার কর্মপাগল ব্যস্ত মানুষ ঘরে ফেরে। বহু দূরের শহর থেকে পরিবারের সদস্যরা ঘরের টানে ফিরে আসে। হাইওয়েতে যানজট লেগে যায়। টিভিতে লাইভ দেখানো হয় ঘরে ফিরছে মানুষ প্রিয়জনের কাছে। সবার সঙ্গে দেখা হয়। আনন্দ উৎসব হয়। খাওয়া দাওয়া চলে। এই দিবসের বড় আয়োজন হয় টার্কি দিয়ে। টার্কি ছাড়া থ্যাঙ্কস গিভিং ডে ভাবা যায় না। গারোরা যেমন শুকরের মাংস ছাড়া বিয়ে, সামাজিক উৎসব, বড়দিন এসবের কথা ভাবতে পারে না, তেমনি থ্যাঙ্কস গিভিং ডে টার্কি ছাড়া অসম্পূর্ণ। আমি একটি আমেরিকান পরিবারে থ্যাঙ্কস গিভিং ডে-তে টার্কি মাংস খেয়েছিলাম। এটি আস্ত রান্না করতে হয়। আমেরিকা বা কানাডায় যে থ্যাঙ্কস গিভিং ডে পালিত হয়, সেটিও এই কৃতজ্ঞতার সংস্কৃতির প্রকাশ।

ওয়ানগালা যেমন শস্য উৎসব, থ্যাঙ্কস গিভিং ডে তেমনি হারভেস্ট ফেস্টিভাল। এই থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’র সূচনাও হয়েছে আদিবাসী মানুষদের দিয়ে। তারা ন্যাটিভ আমেরিকান, যাদের অনেকে রেড ইন্ডিয়ান বলে থাকে। আমেরিকার থ্যাঙ্কস গিভিং ডে নিয়ে গল্প আছে। ১৬২১ সালের কাহিনী। একদল সাদা মানুষ অভিবাসী হয়ে ইংল্যান্ড থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে নেদারল্যান্ডসে আসে। সেখান থেকে তারা সমুদ্র পথে বড় জাহাজে (সেই কালে নৌকায়) আমেরিকায় যাত্রা করে। এই অভিবাসী দলে মোট ১০২ সাদা মানুষ ছিল। ১৬২০ সালের ১১ ডিসেম্বর এই অভিবাসীদের জাহাজ আমেরিকায় নোঙ্গর করে। তখন প্রচণ্ড শীত ও বরফে ঢাকা আমেরিকা। বসন্তকাল আসার আগেই এই ১০২ জনের মধ্য থেকে ৪৬ জন মারা যায়। বাকি ৫৬ জন সাদা অভিবাসী বেঁচে থাকে এবং ন্যাটিভ আমেরিকান আদিবাসীদের সাহায্য ও অনুগ্রহে তারা জীবন ফিরে পায়। প্রচণ্ড শীত হলেও ওই বছর ক্ষেতে খুব ভালো ফসল হয়। তাই কৃতজ্ঞতার প্রকাশ স্বরূপ এই ৫৬ জন অভিবাসী এবং ৯১ ন্যাটিভ আদিবাসী মিলে প্রথম আমেরিকার বুকে থ্যাঙ্কস গিভিং ডে উদযাপন করে। এই উৎসব ও খাওয়া-দাওয়া তিনদিন স্থায়ী হয়। কানাডায় থ্যাঙ্কস গিভিং ডে পালিত হয় প্রতি বছর অক্টোবরের দ্বিতীয় সোমবারে। যেহেতু শনি ও রবিবার ছুটি থাকে, তাই থ্যাঙ্কস গিভিং ডে’র সোমবার যোগ দিয়ে লং হলি ডে ভোগ করে কানাডাবাসী। অভিবাসী নিয়ে আটলান্টিক পার হওয়া যে জাহাজের কথা আমি বললাম, তার নাম মে ফ্লাওয়ার। হুমায়ূন আহমেদ মে ফ্লাওয়ার নামে একটি বই লিখেছেন।

দুই.
গারোদের ওয়ানগালা নিয়েও অনেক কাহিনী আছে। ইন্টারেস্টিং মিথ ও গল্প আছে। যেমন ওই কুমড়া বা আকখারুর গল্প। যত গল্পই থাকুক, আমি বলি, যা কিছু আছে মান্দিদের শস্য, ফসলাদি, সম্পদ, ফলমূল, তাই দিয়ে এই কৃতজ্ঞতার অর্ঘ্য-উপহার উৎসব নিঃসন্দেহে আজকের ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীতে কয়টি জাতি আছে যাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শস্য উৎসব বা হারভেস্ট ফেস্টিভাল আছে? আমরা দেখছি, আজকাল মানুষ অনেক বেশি চায়। চারদিকে শুধু চাই চাই ভাব আর কলরব। রাজনীতিতে এটি আরো বেশি প্রকট। পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী সমাজে অল্পতে সুখী ও সন্তুষ্ট এমন মানুষের বড় অভাব এখন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, ‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভ‚রি ভ‚রি’ কথাটি এখন সবচেয়ে সত্য। তাই মানুষের চাওয়ার আর আকাক্সক্ষার কোনো শেষ নেই, সীমা পরিসীমা নেই। তাই সমাজে মানুষের মনে শান্তিও নেই, If there is to be any peace, it will come through being, not having (Henry Miller). যার চাওয়ার শেষ নেই, অভাবের শেষ নেই, তার কৃতজ্ঞ মন থাকা সম্ভব নয়। এই দিক দিয়ে মান্দিদের ওয়ানগালা উৎসব ও সংস্কৃতি অত্যন্ত শক্তিশালী, মূল্যবান ও সুন্দর। আমরা সব কিছুর জন্য কৃতজ্ঞ। আমি দেখি আধুনিক গারোরা ভাত খাওয়ার আগে ভাতকে ধন্যবাদ দিয়ে প্রার্থনা করে। আমি একটি ভিডিও দেখেছি, মধুপুর বনে সামাজিক উৎসবে এক মান্দি বৃদ্ধ চু বা মদ খাওয়ার আগে গ্লাস থেকে কয়েক ফোটা মদ মাটিতে ঢেলে বললো, এই মাটিরও প্রাণ আছে, সেও তৃষ্ণার্ত, তাকেও কয়েক ফোঁটা দিলাম। এমন ভাবনা আর কোন সমাজে আছে? মান্দিরা ওয়ানগালার দিনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি আগামী দিনে ক্ষেতের ফসলাদি যাতে ভালো হয়, যেন ঠিকমতো বৃষ্টি হয়, রোদ হয় ফসলের মাঠে, পোকামাকড় থেকে ফসল যেন রক্ষা পায়, জমি যেন উর্বরা হয়, এসবের জন্য প্রার্থনা করে। আমি শুনেছি সন্তান-সম্ভবা নারীর জন্যও আদিবাসীরা প্রার্থনা করে। আদিবাসী নারী যেন উর্বরা হয়, সন্তানাদি যেন সুখে থাকে, তার জন্যও তারা প্রার্থনা করে। আমি সংসারেক গারো মানুষের প্রার্থনা শুনেছি। আমি দেখছি, মান্দি জাতি নির্মল আনন্দ-উৎসব করতে পারে, ফুর্তি করতে পারে, দলবদ্ধভাবে উৎসবের সুখ ভোগ করতে পারে। মানুষের জীবন অতি ক্ষণস্থায়ী। এই ক্ষণকালের জীবনকে আধুনিক মানুষ শুধু শুধু জটিল করে তোলে। এই জীবনে হাসি-গান, আনন্দ উপভোগ, গল্প, পানাহার, যা আছে তাই নিয়ে বেঁচে থাকা, এই তো জীবন আদিবাসীদের। এই কঠিন প্রতিযোগিতাপূর্ণ ছুটে চলা জীবনে একটু থেমে পেছনে ফিরে নিজেকে প্রকৃতির কাছাকাছি, মাটি-বন-জলরাশি আর আকাশের মায়ায় সৃষ্টিকর্তার নিকট জীবনকে সমর্পন করার উৎসবের অপর নাম ওয়ানগালা।

তিন.
আমি ২০০৯ সালের ১৬ মে জন এফ কেনেডী এয়ারপোর্ট থেকে একটি বই কিনেছিলাম। আমি জাতিসংঘ অধিবেশন শেষে ফিরছিলাম নিউইয়র্ক থেকে দেশে। আমি এই তারিখ বলতে পারছি এ কারণে যে, আমি বইয়ের পাতায় সাধারণত লিখে রাখি কবে কোথা থেকে বইটি কিনেছি। এই বইয়ের নাম Attitude of Gratitude। লেখক এম জে রায়ান। বইয়ে লেখা আছে, দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে অন্যকে আনন্দ দিতে হয় এবং আনন্দ পেতে হয়। বইটি পড়ার আগে একটি উদ্ধৃতি আছে, Life will bring you pain all by itself. Your responsibility is to create joy. উদ্ধৃতিটি মিল্টন এরিকসনের। কৃতজ্ঞ মানুষের আনন্দপূর্ণ জীবনের কথা আছে বইটিতে। সহজ সরল কৃতজ্ঞভরা জীবনের কথা আছে এখানে। যে ব্যক্তি সব কিছুতে কৃতজ্ঞতার সংস্কৃতি চর্চা করে, বিশ্বাস করে, সে একজন আনন্দিত সুখী মানুষ। এমনকি এই কৃতজ্ঞতাবোধ সুস্বাস্থ্যের জন্যও উত্তম। ওয়ানগালা গারোদের কৃতজ্ঞতার চর্চা শেখায়। মান্দি সমাজের মানুষের সরলতা, কৃতজ্ঞতাবোধ, অল্পতে সুখী হওয়ার চেষ্টা, পরস্পরকে সহযোগিতা ও সহভাগিতার যে মুক্ত সংস্কৃতি, তার অন্যতম উপাদান ওয়ানগালা উৎসব।

চার.
আমি অবাক বিস্ময়ে দেখি এই ঢাকা শহরে কয়েকবছর ধরে তিনটি ওয়ানগালা উৎসব হয়। তবে এই ওয়ানগালার সঙ্গে মূল গারোদের ওয়ানগালার পার্থক্য আছে। শহরের ওয়ানগালা একটু অন্যরকম হবে, এটিই স্বাভাবিক। এখানে ফসলের মাঠ কোথায় পাবেন? আদি সংসারেক খামাল বা পুরোহিত তো নেই। এখানে হয় সামাজিক উৎসব ধরনের। কিছু আলোচনাসভাও হয়। লটারি হয়। তাতে বিপুল আগ্রহ মানুষের। অনেক দোকান বা স্টল থাকে। বেচাকেনা হয়। থাবুচুল, মিচেং, কুচিয়া, সুপফুরু কত কী খাবার সামগ্রী মেলে? এখানে মানুষের এক সম্মিলন ও মিলনমেলা হয়। শিশুরা ছোটাছুটি করে বেড়ায়। অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। মনে হয় কত আনন্দ এই শহরে। সব ওয়ানগালাতেই বিপুল জনসমাগম হয়। টিকেট কেটে মান্দিরা ভেতরে ঢুকে হাজারে হাজার। সারাদিন কেটে যায় আনন্দে উৎসবে। মান্দিদের মতো এমন আয়োজন এখনো অন্য আদিবাসী জাতির মানুষেরা এই ঢাকা শহরে করতে পারে না। আমি দেখছি অনেক তরুণ মান্দি, শিশু ও কিশোর এই উৎসবে আসে। অনেকে নাচগানসহ নানা আয়োজনে অংশগ্রহণ করে। আমাদের এই শিশু-কিশোর-তরুণদের নিয়ে ভাবতে হবে গভীরভাবে। বাস্তবতা হলো এই প্রজন্ম শহরে বেড়ে উঠছে। যে মান্দি শিশু কিশোরদের আমি ওয়ানগালায় দেখি, হয়তো এদের সবার জন্ম এই শহরে। মান্দিদের গ্রাম, গ্রামের উৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠান এরা বেশি দেখেনি। অনেকে হয়তো বাংলায় বেশি পারদর্শী গারো ভাষার চেয়ে। এরা হয়তো বাংলা চর্চা বেশি করে এবং এটি স্বাভাবিক। কেউ কেউ হয়তো ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে। এই ছেলেমেয়েরা যাতে শহরে থেকেও মান্দিদের শেকড় একেবারে ভুলে না যায়, তার জন্য সবাইকে ভাবতে হবে। এরা বাংলায় দক্ষ হোক, ইংরেজি শিখুক, অন্য ভাষাও শিখুক। অনেক ভাষা আয়ত্ব করা ভালো এবং এতে সুবিধা অনেক। কিন্তু ছেলেমেয়েরা যেন গারো ভাষা অবশ্যই শিখে। এজন্য পরিবারে, ঘরের মধ্যে, স্বজনদের মধ্যে গারো ভাষার চর্চা করতে হবে। পরিবারের লোকজন ঘরে গারো ভাষা বললেই ছেলেমেয়েরা সহজেই শিখে ফেলবে। কম বয়সী ছেলেমেয়েরা দ্রুত যে কোনো ভাষা আয়ত্ব করতে পারে। আমার মেয়ে অদ্রি গারো ভাষা পারে। ইংরেজিতে পড়েছে। এখন পড়ছে জার্মান ভাষায় জার্মানিতে। ওখানে গিয়ে ফ্রেঞ্চ ভাষায় আরো দক্ষতা অর্জন করেছে। এখানেই শিখে গিয়েছিল। রাশিয়া ভাষাও পারে। হয়তো এখন স্প্যানিশও কিছু পারে। ডাচ ভাষাও কিছু পারে যেহেতু জার্মানির সঙ্গে কিছু মিল আছে। কিন্তু নিজের মাতৃভাষা গারো সবার আগে।

পাঁচ.
আমরা তো হারিয়েছি অনেক কিছু। আমাদের ভ‚মি, প্রথাগত বন, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অধিকার আমরা হারিয়েছি। উৎসব-সংস্কৃতির অনেক কিছু হারিয়ে গেছে কালের স্রোতে। অনেকে দেশান্তর অনেক আগেই। আমাদের সময়ে, স্কুলজীবনে গারো অঞ্চলে কোনো ওয়ানগালা হয়নি। মধুপুর বনে ওয়ানগালা হয়ে থাকতে পারে, আমার জানা নেই। আমি ওয়ানগালা দেখি প্রথম বিড়ইডাকুনীতে। তখন সম্ভবত আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। আশির দশকের প্রায় মাঝামাঝি সময়। সেই ওয়ানগালা উদযাপন করা হয়েছিল অনেকটা খ্রিস্টান মতে। এখনো কাথলিক মান্দিরা কোথাও কোথাও খ্রিস্টরাজার পর্বকে কেন্দ্র করে ওয়ানগালা পালন করে। আমরা আসকিপাড়ায় ওয়ান্না উৎসব করি ২০০৩ সালে। বেশ বড় করে। এখনো আসকিপাড়ায় ও হালুয়াঘাটের অন্যান্য কিছু মান্দি গ্রামে ওয়ানগালা উদযাপিত হয়। মধুপুরের কিছু গ্রামে হয়। কাথলিক প্যারিশগুলোতে হয়। খবর পেলাম সিলেট অঞ্চলে এই উৎসব হয়ছে এ বছর। গারো তরুণদের উন্নতি আর এগিয়ে চলা দেখে ভালো লাগে। তরুণদের আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র নিষ্ঠুরভাবে অবহেলা করে। তরুণরা যেটুকু এগিয়েছে, বেশির ভাগ নিজেদের চেষ্টায়। আদিবাসী তরুণদের প্রতি অবহেলা আরো বেশি। তারপরও তরুণ বন্ধুরা এগিয়ে চলেছে। নিজের চেষ্টায় কত জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে এরা। আমি দেখছি মিডিয়াতে মান্দি তরুণরা ভালো করছে।
আগে শুধু এনজিওতে মান্দিদের পদচারণা ছিল। এখন সরকারি চাকরিসহ বেসরকারি করপোরেট জগতে মান্দিরা প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কলসিন্দুরের মারিয়া মান্দারা এককভাবে কত দূর পথ পাড়ি দিচ্ছে। ওর পরিবারের কথা আমি জেনেছি তার এগিয়ে চলার পর। হয়তো অনেক তরুণ আছে মান্দি সমাজে, কঠিন পথ মারিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা খবর জানি না। আমি ভেতরে ভেতরে অনুপ্রাণিত হই, শিহরিত হই। আমি চেষ্টা করেছি, জীবনের সঙ্গে জীবন মেলাবার কথা বলতে চেয়েছি। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করেছি। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে আলোর স্কুলে বক্তৃতা করেছি। পত্রিকায় কলাম লিখেছি হাত খোলে। জীবনের কথা বলতে চেয়েছি টক শোতে, নানা বক্তৃতায়, কঠিন পরিস্থিতিতেও। চলতে চলতে জীবনের এই দীর্ঘ পথ তো পাড়ি দিলাম। অর্ধশতক পেরিয়ে এসে মনে হচ্ছে এই জীবন, এই পথ চলা, জীবনের এই আলো-হাসি-গান, সংসারের রঙ্গ ও সংগ্রাম, ক্লান্তি-অবসাদ, যোগ-বিয়োগের হিসাব নিকাশ মন্দ নয়। মনে হয়, এখনো পৃথিবীতে কত রূপ-রস-আলো-হাসি-গান। এখনো রাতের অন্ধকার শেষে আলো ঝলমল ভোর হয়। বনে পাখি ডাকে। রঙিন ফুল ফোটে। আমাদের মান্দি ছেলেমেয়ে স্মার্ট ফোনে কথা বলে। পৃথিবীর খবর রাখে। মোবাইল ফোন, ফেসবুক, ইস্টাগ্রাম, ইউটিউব, কত কী? বিউটি পার্লারের মেয়েরা গ্রামে দালান ঘর তোলে, বাবা-মায়ের বন্ধকী ঋণ শোধ করে। শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা পার্লারের বিউটিশিয়ান মেয়ের ভালোবাসার কাঙাল হয়ে ঘোরে। বেশ রোমাঞ্চিত হই। ভালো লাগে শুনতে। এখন কত আনন্দের খবর চারপাশে। ফাহমিদা নবী গারোদের সেরেনজিং গান গেয়েছেন। যাদু রিছিল, শ্যাম সাগরের দল গান গেয়ে জীবন পার করার সাহস রাখে। দেখলাম মেয়েদেরও একটি ব্যান্ড দল হয়েছে। বুঝতে পারি বদলে যাচ্ছে অনেক কিছু। আমরা আমাদের কৈশোরে সাইকেল চালিয়ে চলে যেতাম অনেক দূর। আমি মান্দি এলাকায় দূরের ওয়ানগালায় তরুণ সময়ে সাইকেল চালিয়ে গেছি ধুলোমাখা পথে। কী অফুরন্ত প্রাণশক্তি ছিল তখন। আজ মনে পড়ে। বুকটা কেমন হাহাকার করে ওঠে। আবেগ জমে অজান্তে মনের মধ্যে। ভাবি, Some days I wish I could go back in life, not to change anything, but to feel a few things twice.

ছয়.
বুঝতে পারি অনেক কিছু বদলে যাচ্ছে। সময় বয়ে যাচ্ছে। খুশি হবো যখন দেখবো আদিবাসী তরুণ বন্ধুরা প্রচুর পরিশ্রম করছে, একটু উচ্চাকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে মনে, পজিটিভ চিন্তা করছে, জ্ঞান অর্জন করছে, জানার আকাক্সক্ষা প্রবল তাদের আর অনেক বেশি যোগ্য হয়ে উঠছে। প্রযুক্তির যে উন্নতি হয়েছে, তার সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসী তরুণদের তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের উৎসব আমাদের আত্মপরিচয় ও বন্ধন দৃঢ় করুক। আমরা যেন কৃতজ্ঞতার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে পারি। তবেই পৃথিবীতে শান্তি ফিরে আসবে। মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা বাড়বে। মানুষ মানুষকে আরো বেশি ভালোবাসবে। স্বপ্ন দেখি এখনো, একদিন আমাদের দেশে আদিবাসী ও বাঙালি শিশু হাতে হাত ধরে পথ চলবে, জীবনের জয়গান গাইবে। পাহাড় ও সমতলের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে উঠবে। তখন সব কিছু ছাপিয়ে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’ – কথাটি সত্যি হবে। প্রিয় জন্মভূমি দেশ হয়ে উঠবে আরো মানবিক, উদার, আরো সুন্দর। পাহাড় অরণ্যের বুকে নতুন সূর্যের ভোর আসবে।