গলে যাওয়া সময়ের অদৃশ্য সাক্ষী

আগের সংবাদ

চিহ্ন?

পরের সংবাদ

আজব ফুলের কিসসা

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০১৯ , ৯:০০ অপরাহ্ণ | আপডেট: জুন ৯, ২০১৯, ৮:১১ অপরাহ্ণ

অনলাইন প্রতিবেদক

১৯৯৫ থেকে ২০০১, ছয় বছর আমি ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের কানিহারী ইউনিয়নে বারইগাঁও গ্রামে মৎস্য চাষে নিয়োজিত ছিলাম, সে সময় প্রতি সপ্তাহে দু’দিন আমি বারইগাঁওয়ে মীনশিশুদের সাথে সময় কাটাতাম। গ্রামের যে ক’টি বনেদি বাড়ি, তাদের দু’টিতে ছিল আমার অবস্থান। দুই বাড়ির তিনটি পুকুর ছাড়াও অন্য দু’টি পুকুরে ছিল আমার মৎস্যবিষয়ক পাগলপনার কর্মক্ষেত্র। দু’বাড়ির দু’জন ছাড়াও অন্য আরও একজন ছিলেন আমার সহকর্মী। দু’বাড়ির যেটিতে আমার বেশি সময় কাটতো, সেটি ম্যানেজার সাহেবের বাড়ি। সোনালি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত ম্যানেজার ছিলেন আলহাজ মো. আবদুল লতিফ। বড়ই করিৎকর্মা ছিলেন ম্যানেজার সাহেব। বাড়িতেই তাঁর ডেইরিফার্ম ছিল; দশ-বারোটা উন্নতজাতের গরু তিনি পুষতেন, গরুর গোবর দিয়ে তিনি নিজ বাড়িতেই তৈরি করেছিলেন বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট; গ্রামে তখন বিদ্যুৎ আসেনি, সেই গ্যাসে তাঁর বাড়িতে বাতি জ্বলতো-চুলাও জ্বলতো। ম্যানেজার সাহেবের বড় ছেলে ছিলেন আমার পার্টনার। শীতের ছুটিতে নানার বাড়িতে বেড়াতে আসা ম্যানেজার সাহেবের ছোট মেয়ের দিকের দুই নাতনি আর মোশাররফ সাহেবের ছোট ছেলের সাথে কাটানো কোনো এক সপ্তাহের দু’দিনের ঘটনা নিয়ে এই ‘আজব ফুলের কিসসা’।

১.
কালিঘাটের জঙ্গলের পাশে বসে অনেক রাত ধরে নদীর সাথে কথা বলেছি; নদীর সাথে পরামর্শ করেই এ গল্পের কাঠামো তৈরি করেছি। নদীর সাথে আমার কথা বলার বিষয়টি অনেকেই বিশ্বাস করতে চায় না, ওরা-ও-বিশ্বাস করেনি। শেষ পর্যন্ত ওদের কথা দিতে বাধ্য হয়েছি যে নদীর সাথে কথা বলার পদ্ধতিটা ওদের শিখিয়ে দেবো।
সিফাত-রিফাত ওরা দু’বোন। একজন দশ বছরের আর ছোট জনের আট। সিফাত অবশ্য নিজের বয়স দশ মানতে রাজি নয়। ও বলে “আম্মু বলেছে আমি এগারোতে পা দিয়েছি।” সিফাত-রিফাতের এক ভাই রাফি। রাফি ছোট, তিন পুরো হয়নি। ভাঙা ভাঙা শব্দে দু’চারটি কথা বলতে শিখেছে। সিফাত-রিফাতের গল্পের সাথে রাফির কোনো অংশগ্রহণ নেই, তবে ওদের বড় মামার ছোট ছেলে তারেক জড়িত।
তারেকের আব্বু মোশাররফ সাহেব আমার বন্ধু এবং মৎস্য চাষের পার্টনার। মোশাররফ সাহেব সম্প্রতি কবিতাচর্চায় অংশ নিয়ে বেশ কাজ করছেন এবং বেশকিছু ভালো কবিতাও লিখে ফেলেছেন। মৎস্য চাষের সুবাদে আমাকে সপ্তাহে দু’দিন কাটাতে হচ্ছে এ এলাকায়। শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়, কিন্তু পথের দুর্দশা ভয় পাইয়ে দেবার মতো। বিশ কিলোমিটার যেতে কী যে গলদঘর্ম হতে হয়, সেটা সশরীরে না গেলে বোঝা মুশকিল। সাধারণত আমাকে স্টেশন মোড় থেকে টেম্পোতে সুতিয়াখালী বাজার পর্যন্ত যেতে হয়, তারপর রিকশায় বাকি পথ; ভাবখালিবাজার হয়ে কালিরবাজার অতঃপর বারইগাঁও। কখনো রিকশাচালক টানে, আবার কখনো আমাকে ধাক্কা দিয়ে রিকশাটাকে পার করে দিয়ে হয় কর্দমাক্ত মাটির পথ। বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। সেদিন বিকেলে মোশাররফ সাহেবের বাড়িতে গিয়ে প্রথম সিফাতের সাথে দেখা। খোঁজ নিয়ে ওর পরিচয় জানলাম আমার আরেক সহকর্মী মোতালেব খাঁর কাছে। খাঁ সাহেব সম্পর্কে এখানে কিছু বলতে চাচ্ছি না, সুযোগ এলে অন্যত্র বলবো। আপাতত শুধু এটুকু বলি, বর্ণপরিচয়হীন একজন মানুষ কীভাবে গ্রামের সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে, তার উদাহরণ হতে পারেন মোতলেব খাঁ। কিছুক্ষণ পর রিফাতের সাথে দেখা। মুখ ভার-গম্ভীর। ওকে নাম জিজ্ঞাস করতেই চোখে-মুখে ঝামটা দিয়ে বললো-“ছাতা”! আমি অবাক হবার অভিনয় করে বললাম, “তোমার নাম ছাতা”? রিফাত ওর ডান হাতটা আমার হাত থেকে একঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে বললো “আপনার মাথা!” আমি আগের মতোই অবাক হবার ভান করে বললাম, “আপনার মাথা কোনো নাম হলো?”
“একটা কথাও বলবেন না আপনি আমার সাথে!” রিফাত চলে যেতে থাকে। আমি ওকে ফেরাবার চেষ্টা করে বলি, “ঠিক আছে কথা বলবো না। কিন্তু আমি যে রাক্ষসের একটা গল্প জানি সেটা কাকে বলবো?” রিফাত আগের সুরেই বললো, “আপনার মাথাকে!” রিফাত আর দাঁড়ালো না। ওর মামির কাছে জানলাম, সিফাত আর তারেক ওকে রেখে বাজারে চলে গেছে তাই ওর মন খারাপ। আমি রিফাতের মুখোমুখি হয়ে ওর সুন্দর চোখের প্রশংসা করলাম, সুন্দর জামার প্রশংসা করলাম, কিন্তু রিফাতের এক জবাব “ছাতা!” ওকে বাজারে নিয়ে যাবার প্রস্তাব করলাম কিন্তু কিছুতেই তাকে খুশি করতে পারলাম না। রিফাতের সোজা কথা “আপনি পচা আপনার সাথে যাবো না!” শেষ পর্যন্ত আমার আরেক পার্টনার আমিন সাহেব ওকে সাইকেলে চড়িয়ে বাজারে নিয়ে গেলেন।
সন্ধ্যায় আবার দেখা হলো ওদের সাথে, এবার রিফাতকে কিছু না বলে সিফাতকে বললাম, “সিফাত আমি তো আজ রাক্ষসের একটা গল্প বলবো, তুমি কি শুনবে?” সিফাত ওর বুদ্ধিদীপ্ত চোখ নাচিয়ে বললো, “না-বাবা আমি রাক্ষসের গল্প শুনি না । ভূতের গল্প শুনতে পারি।” আমি সুযোগটা হাতছাড়া না করে বললাম, “ভূতের গল্পও আছে। তুমি কী সত্যি গল্প শুনবে, না মিথ্যা গল্প?” সিফাত চোখ বড় বড় করে বললো, “আপনি কি সত্যি সত্যি ভূত দেখেছেন?” আমি দৃঢ়তার সাথে বললাম, “কতদিন দেখলাম! একদিন তো ভূতের সাথে আমার রীতিমতো কুস্তি লড়তে হয়েছে!” সিফাত আগ্রহ নিয়ে আামর কাছে এগিয়ে এলো। সাগ্রহে বললো, “ভূতের সাথে কুস্তির ঘটনাটা আগে বলুন।” আড়চোখে তখনি একবার রিফাতকে দেখে নিয়ে বললাম, “ঘটনাটা সবার সামনেই বলবো?” সিফাত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, “অসুবিধা কি?” আমি আরেকবার রিফাতকে দেখে নিলাম। রিফাতের অবস্থা তখন ‘আরেকবার সাধিলেই খাইব’। আমি বললাম, “আমার তো অসুবিধা নেই, কিন্তু রিফাত কি আমার গল্প শুনবে? ও তো রাগ করেছে আমার সাথে। ওকে জিজ্ঞেস করে দেখ, ও শুনবে কি-না?”
এবার তারেক এগিয়ে এলো। বললো, “রিফাত না শুনলে না শুনবে। আমরা শুনবো!” সিফাতের দেরি সইছিল না, কোনো ভূমিকা ছাড়াই রিফাতকে প্রশ্ন করলো, “তুমি কি ভূতের ঘটনা শুনবে?” এবার রিফাত এগিয়ে এলো আমার কাছে। আমি সুযোগটা গ্রহণ করে বললাম, “আসলে তো রিফাতের সাথে আমার কোনো ঝগড়া নেই, এমনিতেই আমাদের মন খারাপ ছিল তাই। এখন তো খাতির। তাই না রিফাত?” রিফাত সম্মতিসূচক মাথা দুলিয়ে আমার পাশে গা ঘেঁষে বসলো।
আমরা গল্প বলার জন্য তৈরি হয়ে বসলাম। আমি মনে মনে গল্পটাকে সাজিয়ে নিচ্ছি, তারেক এর মাঝেই কথা বলতে শুরু করলো, “কালিবাড়ির ঘাটে যে একটা ভূত আছে না, ওটা তো একদিন…….।” তারেকের কথার মাঝখানে ধমকে উঠলো রিফাত, “থামো! তুমি বড্ড বেশি কথা বলো! ঘটনাটি শুনতে দাও না আগে!” তারেক থেমে গেল, আমি মনে মনে গল্পটাকে আরেকবার সাজিয়ে নিলাম। সিফাত, রিফাত আর তারেক ভূতের গল্প শোনার জন্য আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার মুখের দিকে।

২.
আমার মেয়েকে এক সময় ঘুমাবার আগে প্রত্যেক দিন অন্তত দু’টো গল্প বলতে হতো। মজার ব্যাপার হলো কোনো শোনা গল্পই আমার মনে থাকে না, অগত্যা তাৎক্ষণিকভাবে বানিয়ে বানিয়ে তাকে গল্প বলেছি এবং গল্পগুলো আমার নিজের কাছে তত মজার না হলেও আমার কন্যা খুব মজা পেতো। পরবর্তী সময়ে সে বায়না ধরলো, তাকে বলা গল্পগুলো নিয়ে একটা বই লিখতে হবে। বইটির নাম হবে ‘আজব ফুলের কিসসা’। নামটি সে কোত্থেকে আবিষ্কার করেছিল জানি না, তবে তার আবদার আমি পূরণ করতে পারিনি।
সিফাত-রিফাত আর তারেকের আগ্রহ দেখে একবার ভাবলাম আমার মেয়েকে যে গল্পগুলো বলেছি, তার থেকেই একটা গল্প শুনিয়ে দিই, কিন্তু স্মৃতির পাতা খুঁজে একটা গল্পও পেলাম না। মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রিফাত বিরক্ত হয়ে উঠছে বোঝা যাচ্ছে। ভাবলাম, অনেক চেষ্টায় বিরোধটা ভেঙেছে আবার সম্পর্কে ফাটল ধরাবো? রিফাত ঝাঁঝ মেশানো গলায় বললো, “কি হলো গল্প বলছেন না কেন?” আমি এক গাল হেসে স্বাভাবিক গলায় বললাম, “ভাবছি কোন গল্পটা বলবো? রিফাত এবার বিরক্ত হয়ে বললো, “গল্প বলতে কে বলেছে আপনাকে? আপনি তো সত্যি ঘটনা বলবেন!” আমি একটু সামলে বললাম, “হ্যাঁ সত্যি ঘটনাই তো বলবো, কিন্তু ভাবছি কোন ঘটনা বলবো? না-কি ভূতের বাচ্চা যে খরগোশ হয়েছিল, সেই গল্পটা বলবো?” ততক্ষণে ওরা কিছুটা বিরক্ত, সিফাত বললো, “ভূতের সাথে কুস্তির ঘটনা বলবেন!” আমি আবার মনে মনে গল্প সাজাবার চেষ্টা করে খাতির ভাঙার ভয়ে গল্প শুরু করে দিলাম।

সেদিন শনিবার। রাতের ট্রেনটা অনেক লেট। অন্যদিন রাতের ট্রেন দশটার মধ্যেই পৌঁছে যায় পিয়ারপুর স্টেশনে, সেদিন রাত সোয়া বারোটা বেজে গেল। আমি ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফরমের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। অন্যদিন কাউকে সঙ্গী পেয়ে যাই, সেদিন কেউ এলো না। অপেক্ষা করে করে যখন স্টেশন ফাঁকা হয়ে গেল, তখন একাই রওনা হবো ভাবছি। হঠাৎ লক্ষ করলাম একজন বুড়ো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আমার দিকে আসছে। আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম লোকটার জন্য, কিন্তু তার পথ যেন আর ফুরায় না। এক সময় আমি বিরক্ত হয়ে ভাবলাম, বুড়োর সাথে এতো ধীরে হেঁটে পোষবে না। তারচেয়ে একাই চলে যাই। বুড়োকে রেখে হাঁটতে শুরু করলাম। আমাকে রেললাইন ধরে এক মাইল হাঁটতে হবে। কিছুটা হাঁটার পর ঘন অন্ধকার। যতদিন আমি রাতে এই পথে গেছি ততদিনই আড়াইটার কাছে এসে আমার গা ছমছম করে উঠেছে, আর আমি সঙ্গীদের সাথে আলাপে মশগুল হয়েছি। “আজ কি হবে! আজ তো গল্প করার কেউ নেই।” মনে মনে সে কথা ভেবে শরীর একবার শিউরে উঠলো। আমি একটা সিগ্রেট ধরিয়ে লম্বা টান দিয়ে দ্রুত হাঁটতে চেষ্টা করলাম। বুকের ভেতর একবার ধড়মড় করে উঠলো। পেছনে কার পায়ের শব্দ? একবার ভাবলাম পেছনে তাকিয়ে দেখি! আবার ভাবলাম দরকার নেই পেছনে তাকিয়ে, তারচেয়ে হাঁটতে থাকি। পা বাড়ালাম। যতই এগিয়ে যাই পেছনে পায়ের শব্দ ততই স্পষ্ট হতে থাকে। শেষে কায়দা করে কেশে নিয়ে থু থু ফেলবার ছলে পেছনে তাকিয়ে দেখি বুড়ো লোকটা আমার চার-পাঁচ হাত পেছনে হাঁটছে। আমার ভেতরে কোথায় যেন কি হলো, গা শিরশির করে উঠলো, মুহূর্তে সমস্ত শরীর ঘেমে গেল। হাত-পায়ের শক্তি যেন কমে গেল। বারবার মনে হচ্ছে বুড়োটা বোধহয় আমার কাঁধে চড়ে বসবে। আমি দ্রুত পা চালাতে চেষ্টা করলাম কিন্তু পা যেন এগোতে চায় না, সিগ্রেটে জোরে দম দিলাম, প্রায় শেষ হয়ে গেল সিগ্রেট। হাঁটতে হাঁটতে পকেট থেকে আরেকটা সিগ্রেট বের করে ওটাতে আগুন ধরালাম। আমার জানা ছিল হাতে আগুন থাকলে ভূত-প্রেত কিছু করতে পারে না।
হাঁটতে হাঁটতে একসময় খেয়াল করলাম পেছনে পায়ের শব্দ নেই। তাকিয় দেখি বুড়োটাও নেই। মনে মনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। গলা ছেড়ে একটা গান গাইতে গাইতে হাঁটতে থাকলাম, গন্তব্যের খুব কাছাকাছি এসে গেছি, তখন হঠাৎ পাশের ঝোপ থেকে মস্ত বড় একটা পাখি উড়ে যাবার শব্দ হলো। আমি চমকে উঠলাম। মনে হলো একটা ছায়া আমার শরীরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লো এবং আমাকে জাপটে ধরলো। খেয়াল করলাম হাতের সিগ্রেটটা কখন যেন ফেলে দিয়েছি। নিজের ওপর খুব গোস্সা হলো। নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার খুব চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। এক সময় মাটিতে পড়ে গেলাম। পড়ে যাবার শব্দে মনে হলো দু’জন পড়ে গেছি। আমি শরীরের সমস্ত শক্তি জড়ো করে চেষ্টা করলাম এবং নিজেকে মুক্ত করে নিলাম। কিন্তু না, ছায়াটা আবার এগিয়ে এলো। আমি চিৎকার করতে চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না। উঠে দাঁড়িয়েছি। হঠাৎ পেছন থেকে প্রচ- একটা হেঁচকা টানে আবার মাটিতে পড়ে গেলাম; মাথায় প্রচ- আঘাত পেয়েছি, অন্ধকারেও চোখে একটা অন্যরকম অন্ধকার অনুভব করলাম; বুকের ওপর কে যেন চেপে বসেছে, দেখা যাচ্ছে না কাউকে, কিন্তু অনুভব করছি, বুকের ওপর কেউ বসে আছে; সামান্য দূরে টর্চের আলো দেখা গেল; কিছু বুঝে ওঠার আগেই বুকের ওপর থেকে ভারটা সরে গেল; উঠে দাঁড়ালাম, আমার মুখের ওপর টর্চের তীব্র আলো এসে পড়লো; কোত্থেকে আজিজ ভাই ভাঙা গলায় ডাকলেন, “কে ছোট ভাই নাকি?” আমি দ্রুত আজিজ ভাইয়ের কাছে সরে এলাম। আজিজ ভাই আমাকে প্রায় বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। আমি কোনোরকমে দৌড়ে বারান্দায় উঠলাম, স্পষ্ট শুনলাম পেছন থেকে কে যেন বললো, “আজ বেঁচে গেলি! আরেক দিন পেয়ে নিই!”
গল্প শেষ করে একটা দম নিলাম। সিফাত আর তারেক তখন আমার গা ঘেঁষে বসেছে। রিফাত আমার কোলে। আমি বললাম, “গল্প শেষ, এবার ছুটি। কাল কথা হবে।” রিফাত প্রতিবাদ করে বললো, “না খরগোশের গল্পটা বলতে হবে।” আমি দেখলাম উপায় নেই, খরগোশের গল্পটা বলার জন্য তৈরি হলাম, এমন সময় বিদ্যুৎ চলে গেলো। আমি সুযোগ পেয়ে বললাম “আলো নেই, গল্প হবে কি করে?” তিনজন একসাথে প্রতিবাদ করে বললো, “আমরা অন্ধকারে বসি, আলো এসে যাবে।” অগত্যা আলোর জন্য অপেক্ষা। আলো এলে খরগোশের গল্পটা বলতে হবে।

৩.
মায়াময় সুন্দর রাত। শুক্লপক্ষের উজ্জ্বল ত্রয়োদশী চাঁদ আলো করে আছে আকাশ আর পৃথিবীকে। শাদা শাদা বিচ্ছিন্ন মেঘের খ-গুলো চাঁদের আভায় চকচক করছে। মেঘের এক একটি খ-কে মনে হচ্ছে এক একটি বিশাল বরফের চাঁই, যেন স্থির সমুদ্রের নীল পানিতে ভাসছে। সময়টা চমৎকার, মোটেই গরম নেই, শীত নেই একটুও। ডানপাশের কালিঘাটের ঝোপে কিছু জোনাকের নিঃশব্দ ওড়াউড়ি চোখে পড়ে। সন্ধ্যার পর থেকেই বসে ছিলাম কালিঘাটের পাশে কংক্রিটের বেদির ওপর। নদীর মুখোমুখি বসে থাকতে আমার ছোটবেলা থেকেই ভালো লাগে। বসে বসে নদীর ঢেউয়ে চাঁদের আলোর খেলা দেখছিলাম। নদীর ছোট ছোট ঢেউয়ে জোছনা পড়ে অপূর্ব ছবির সৃষ্টি হচ্ছে, ওপাড়ে কাশবনে শাদা শাদা ফুলের সমাবেশে চাঁদের আলো পড়ে আরো মনোরম করে তুলেছে ছবিটিকে; নদীর সাথে অনেকক্ষণ ধরে কথা বলছি।
আমার গল্প বলা থামিয়ে দিয়ে সিফাত মৃদু প্রতিবাদের সুরে বললো- “নদীর সাথে কথা বলছিলেন মানে? নদী কি কথা বলতে পারে?” আমি জোরের সাথে বললাম, “নিশ্চয়ই! নদী যে কথা বলতে পারে তোমরা কেউ শোনোনি?” রিফাত ঠোঁট-চোখ উল্টিয়ে বলল, “না তো!” আমি আবার বললাম, “কোনোদিন শোনোনি?” এবার তারেক বললো- “আমি শুনেছি, আমার আব্বার সাথে কথা বলে নদী, কবিদের সাথে কথা বলে।” সিফাত অবাক হয়ে বলল, “বড় মামা কবি নাকি? রিফাত, বড় মামা কবি নাকি?” রিফাত সিফাতের সাথে যোগ করলো- “কই আমাদের বইয়ে তো বড় মামার কবিতা নেই!” আমি তর্ক থামানোর জন্যে বললাম- “সব কবির কবিতা তো বইয়ে ছাপা হয় না। কবি অনেক বড় হলে তবে তার কবিতা বইয়ে ছাপা হয়।” সিফাত আমার কথায় প্রতিবাদ করলো, “বড় মামা কি ছোট নাকি?” মহাবিপদে পড়লাম, ভাবছি কি বলবো, শেষ পর্যন্ত রিফাত আমাকে উদ্ধার করলো- “খরগোশের গল্পটা বলছেন না কেন?” আমি তাড়াতাড়ি বললাম, “এই তো খরগোশ আসার সময় হয়ে গেছে, কিন্তু তোমরাই তো নদীর সাথে কথাবলা নিয়ে তর্ক বাধিয়ে গল্পটা থামিয়ে দিলে।” “নদী কিভাবে কথা বলে বলুন!” সিফাত সরাসসি প্রশ্ন করলো। আমি বিষয়টাকে পাশ কেটে যাবার জন্য বললাম- “সে তো আরেক গল্প। তোমরা কি এখন নদীর সাথে কথা বলার গল্প শুনবে নাকি ভূতের বাচ্চা যে খরগোশ হয়ে গেল সে গল্প শুনবে?” এবার সিফাত দু’চোখ নাচিয়ে বলল- “এখন তো খরগোশের গল্পই শুনবো, কিন্তু নদীর সাথে কথা বলাটা শিখিয়ে দিতে হবে।”
নদীর সাথে কথা বলার কৌশল শিখিয়ে দেয়ার কথা দিয়ে আবার গল্প শুরু করলাম, এমন সময় সিফাত-রিফাতের বড় মামি- আমার জন্য চা আর সবার জন্য মুড়ি ভাজা নিয়ে এলেন। তারেক ওর মা’র কানে কানে কি যেন বললো। ওর মা চোখের ভাষায় বকলেন তারেককে, মুখে বললেন- “মুড়ি খাও!” তারেক অগ্যাতা আমার কাছে এসে বসলো। আমরা এবার মুড়ি খেতে খেতে গল্প বলা শুরু করলাম-
নদীর দিকে তাকিয়ে থেকে লক্ষ করিনি চাঁদটা কখন একখ- মেঘের আড়ালে লুকিয়েছে। যখন চারদিকে মেঘের ছায়া ছাড়িয়ে পড়েছে, তখন চাঁদটাকে আবিষ্কার করলাম একখ- মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আকাশে চমৎকার এক দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। শাদা মেঘের চার কিনারে চাঁদের আলো পরিয়ে দিয়েছে সোনার মুকুট। আমি অবাক চোখে মেঘ আর চাঁদের লুকোচুরি খেলা দেখছি। হঠাৎ কালিঘাটের ঝোপের দিকে চোখ গেল, মনে হলো বিশাল এক ছায়ামূর্তি জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসছে। আমার গা ছমছম করে উঠলো। মনে মনে ভাবলাম, হয়তো মনের ভুলে কি দেখতে কি দেখেছি। চোখ ফিরিয়ে নিতে চাইলাম কিন্তু নিজের অজান্তেই দৃষ্টি চলে গেল ঝোপের দিকে। ছায়ামূর্তিটা ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। একবার আশপাশ দেখে নিলাম। কোথাও কোনো সাড়া-শব্দ নেই, দূরে নদীর কিনার ঘেঁষে ছোট বাড়িটিতে সামান্য আলো দেখা যাচ্ছে। নিজেকে শক্ত করবার চেষ্টা করলাম, মনের ভয়টাকে ঝেড়ে ফেলতে চাইলাম। ছায়ামূর্তিটা আমার থেকে হাত বিশেক দূরে। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। আমি মনে মনে ভাবলাম চাঁদটা যদি মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতো, কিন্তু না, মেঘের কোনো নড়াচড়া টের পেলাম না। নিজের অজান্তেই কখন উঠে দাঁড়িয়েছি, টের পাইনি। ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসছে, আমি বিপরীত দিকে হাঁটতে থাকলাম। যতই দ্রুত হাঁটতে চাই, পা যেন নড়ে না, পথ ফুরায় না। একটু এগিয়েই বাঁ দিকে মোড়। আমি মোড় ঘুরতে ঘুরতে পেছনে দেখলাম ছায়ামূর্তিটা এগিয়ে আসছে। মোড় ঘুরে দৌড় দিতে চাইলাম, কিন্তু আমার শরীরের সমস্ত শক্তি কে যেন কেড়ে নিয়েছে। দৌড়াতে পারলাম না; দ্রুত পা বাড়ালাম, কিছুক্ষণ হেঁটে পেছনে তাকালাম, না কেউ নেই। আমার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। নিজেকে বোঝালাম, সত্যি হয়তো ভুল দেখেছি। মেঘের আড়াল থেকে ত্রয়োদশী চাঁদ তখন বেরিয়ে এসেছে। হাতের ডানে চমৎকার বেগুনের টাল। ক্ষেতের মাঝখানে মানুষের আকৃতির কাকতাড়–য়া দাঁড়িয়ে আছে দু’হাত দু’দিকে প্রসারিত করে। মাটির কালো হাঁড়িতে চুন দিয়ে চোখ-মুখ এঁকে কাকতাড়–য়ার মাথা বানানো হয়েছে। গলায় পুরোনো ঝাড়– আর ছেঁড়া জুতোর মালা পরানো। পাশে মরচে পরা টিনের একটা বোর্ড লাগানো আছে, তাতে চুন দিয়ে লেখা হয়েছে ‘মাশআল্লাহ’। পথচারীর নজর লাগা থেকে ক্ষেতটিকে বাঁচানোর জন্য এ আয়োজন। আমি দাঁড়িয়ে বেগুন ক্ষেতটা ভাল করে দেখার চেষ্টা করছি। কিছুক্ষণ আগেই যে ছায়ামূর্তির ভয়ে আমি পালিয়ে এসেছি সে কথা আর মনে নেই। কাকতাড়–য়াটা রাস্তার প্রায় পাশেই। কাকতাড়–য়া নির্মাণ প্রযুক্তি দেখছিলাম যতœ করে। হঠাৎ বাঁশ, খড় আর ভাঙা হাঁড়ির তৈরি কাকতাড়–য়াটা যেন নড়ে উঠলো। কাকতাড়–য়ার গায়ের তেলচিটে ছেঁড়া পাঞ্জাবির আস্তিন কে যেন গুটিয়ে দিল। মুহূর্তে আমার চোখে একটু আগে দেখা ছায়ামূর্তিটি ভেসে উঠলো। আমি দ্রুত একবার আকাশে চাঁদের অবস্থান দেখে নিলাম। না চাঁদের গায়ে মেঘের কোনো আঁচড় নেই, যেন বিশাল এক নীল লেকের বুকে ভাসছে ত্রয়োদশী চাঁদের সাম্পান। আবার তাকালাম কাকতাড়–য়ার মুখের দিকে। কাকতাড়–য়া আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো; আমার শরীরের ভেতরে ভীষণ শীতল রক্ত প্রবাহিত হয়ে গেল যেন। পেছনে দূরে তাকিয়ে দেখলাম ছায়ামূর্তিটা বুকের ওপর দু’হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। আবার ঘামতে শুরু করলাম। পা দু’টি নাড়াবার শক্তি হারিয়ে ফেললাম। মাথার ওপর দিয়ে তিনটি বাদুড় উড়ে গেল। বাদুড় তিনটি এতো নিচ দিয়ে উড়ে গেল যে, ওদের পাখার বাতাস দিব্যি আমার গায়ে লাগলো। বাদুড় তো কখনো এত নিচ দিয়ে উড়ে যায় না। কি যেন এক অশুভ চিন্তা মনটাকে দুর্বল করে দিল। এমন সময় কাছেই কোথাও চিৎকার করে পেঁচা ডেকে উঠলো। আমি চারপাশ দেখে নিয়ে ভয়ে ভয়ে আবার তাকালাম কাকতাড়–য়ার দিকে; আমার ধারণা ছিল কাকতাড়–য়া এবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়বে এবং হেঁটে এসে সরাসরি জাপটে ধরবে আমাকে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সে একটুও হাসলো না। আবার আমি যত্নে তাকালাম কাকতাড়–য়ার মুখের দিকে- না সব ঠিক আছে। চারপাশে তাকালাম, কোথাও কেউ নেই; পেছনে ছায়ামূর্তিটিও নেই। নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিলাম- “ভয় পাচ্ছিলাম কেন? সত্যি কি ভূত এসেছিল? ভূত আবার কি? আমি কি ভূত বিশ্বাস করি না-কি? ধুত্তোর!” মাথাটা দু’বার ঝাড়া দিয়ে পা বাড়ালাম।

বেগুন ক্ষেতের কোনায় দু’টি খরগোশের বাচ্চা। দু’জনে কি যেন গল্প করছে। আমি যে ওদের এতো কাছাকাছি এসে গেছি ওরা টেরও পায়নি। আমার অনেক দিনের শখ খরগোশ পুষবার। ঝাঁপিয়ে পড়লাম, একটি টের পেয়ে পালালো আর অন্যটিকে বুঝবার আগেই ধরে ফেললাম। বাচ্চাটি আমার হাতে শরীর মোচড়াতে থাকলো। দ্বিতীয়টিকে খুঁজলাম কিন্তু কোথাও দেখলাম না। একবার ভাবলাম একটা নিয়ে কি হবে তার চেয়ে ছেড়ে যাই, আবার ভাবলাম নিয়ে যাই দেখি! পা বাড়ালাম। মুহূর্তে কোত্থেকে এক প্রচ- দমকা বাতাস আমাকে টলিয়ে দিলো। প্রায় পড়ে যাচ্ছিলাম, অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম।
হঠাৎ চেয়ে দেখি কাকতাড়–য়াটা দু’হাত ছুড়ছে দু’দিকে, চারপাশের গাছগুলো বাতাসের ধাক্কায় নুয়ে পড়ছে, দূর থেকে ছায়ামূর্তিটা ছুটে আসছে আমার দিকে। আমি তৃতীয়বারের মতো ভয় পেয়ে খরগোশের বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিয়ে ছুটতে থাকলাম বাড়ির দিকে। পেছনে ছুটে আসছে ছায়ামূর্র্তি।
বাড়ির কাছে পুকুর পাড়ে হোঁচট খেয়ে উপুড় হয়ে পড়লাম। তারপর কি হলো বলতে পারবো না। জ্ঞান ফিরলে টের পেলাম শীত শীত লাগছে, কে যেন নাকি সুরে বলছে, “আজকে ছেড়ে দিলাম আর কখনো আমার বাচ্চাকে ধরলে তোঁকে চিবিয়ে খাঁবো।” সবকিছু মনে করতে চেষ্টা করলাম। সব মনে এলো একে একে। তবে কি খরগোশের বাচ্চা দু’টি ভূতের বাচ্চা ছিল! আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে গেলাম। সেদিন রাতে আমার প্রচ- জ্বর এলো।
গল্প বলা থামালাম। রিফাত ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাস করলো, “তারপর কি হলো” “কি আর হবে ক’দিন পর জ্বর ভালো হয়ে গেল।” আমার কথা শেষ হতেই সিফাত-রিফাতের বড় মামি এসে খাবার জন্য ডাকলেন। সিফাত আর তারেক এক সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠলো, “এখন যাওয়া যাবে না। এখন আমরা নদীর সাথে কথা বলা শিখবো!”
আমি বললাম, “নদীর সাথে কথা বলা কালকে শেখাবো।” এবার তিনজনের প্রতিবাদ, “না আজই শেখাতে হবে!” আমি বললাম, “আচ্ছা ঠিক আছে তোমরা খেয়ে আস, আমিও খেয়ে নিই, তারপর নদীর সাথে কথা বলা শেখাবো।”
সকালে শিশির ভেজা ঘাসের ওপর হাঁটছি। ঘাসের মাথায় শিশিরের মুকুট চক চক করছে। সিফাত-রিফাত আর তারেক এসে হাজির, আমি পুকুর পাড়ে পড়ে থাকা কাঁঠাল গাছের কর্তিত খ-টির ওপর বসলাম। ওরাও আমার পাশে বসলো। আমি প্রাতঃকালীন কুশল বিনিময়ের জন্য প্রশ্ন করলাম, “তোমরা ভালো আছো তো?” সিফাত ঘাড় কাৎ করে জানালো- “ভালো।” রিফাত মুখে বললো- “হ্যাঁ ভালো।” তারেক বললো, “রাতের ভূতগুলো সারারাত বাড়িতে ঘোরাঘুরি করেছে। সকাল হতেই আবার চলে গেছে। রাতে তো আমি বাইরে যেতেই পারিনি।” আমি ভাবলাম, এবার আসল কথাটি বলে দিই। সিফাত হঠাৎ বলে উঠলো, “কিন্তু মামা নদীর সাথে কথা বলাটা তো শেখালেন না?” তারেক বললো, “আরেকটা ভূতের গল্প বলুন!” আমি পাশ কেটে যাবার জন্য বললাম, “দিনের বেলা আবার ভূতের গল্প হয় না-কি?” রিফাত আমাকে সমর্থন দিয়ে বললো, “না-না দিনের বেলা ভূতের গল্প নেই! নদীর সাথে কথাবলা শিখিয়ে দিন।” আমি আবার পাশ কাটতে বললাম, “ঘুম থেকে উঠে তোমরা কি নদীর পাড়ে গিয়েছিলে?” রিফাত ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, “না! আমাদের কে নিয়ে যাবে?” বললাম, “ঐ তো নদী, এখান থেকে দেখা যায়। তোমাদের কি আবার নিয়ে যেতে হয় না-কি? এইটুকু পথ একা একা তিনজন মিলে যেতে পারো না?” সিফাতের মনে কথাটা একটু খোঁচার মতো লাগলো। চেহারায় সামান্য অভিমান মিশিয়ে বললো, “একা তো যেতে পারি কিন্তু আম্মু বলবে ছোট মানুষ একা যেতে পারবে না! আচ্ছা মামা, বাসায় যখন কোনো কাজের কথা বলা হয়, যদি না পারি অমনি আম্মা বলবে, অতো বড় মেয়ে এই কাজটাও করতে পারো না! যদি বলি, নদীর পাড় থেকে একটু ঘুরে আসি? বলবে- বাচ্চাদের একা একা কোথাও যেতে নেই! কোন কথাটি ঠিক?” সিফাতের বিস্তৃত প্রশ্নে আমি একবার হাসলাম। বললাম, “আম্মু যখন তোমাকে ছোট বলেন তখন তুমি ছোট, যখন বলেন বড়, তখন বড়।” আমার কথায় সন্তুষ্ট হতে পারলো না সিফাত, “এটা একটা কথা হলো! একই মানুষ কখনো একবার ছোট আবার বড় হয়?” আমি আবার হাসলাম, হাসতে হাসতে বললাম, “হয়। ঠিক আছে তোমরা এখন নদী দেখে আসো পরে বলবো একই মানুষ কিভাবে একবার ছোট একবার বড় হয়।” রিফাত বললো, “কিন্তু আম্মু যে একা একা নদীর পাড়ে যেতে নিষেধ করেছেন?” মুচকি হেসে বললাম, “তোমরা তো একা যাচ্ছো না তিনজন মিলে যাচ্ছো। তাছাড়া ঐ দেখ তোমাদের তুষার ভাইয়া আর তুহিন ভাই যাচ্ছে নদীর পাড়ে। ওদের সাথে চলে যাও।” তিনজন সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে উঠলো। দৌড় শুরুর আগে হঠাৎ থেমে গেল। সিফাত বললো, “নদীর পাড় থেকে এলে কিন্তু নদীর সাথে কথা বলা শিখিয়ে দিতে হবে, আর কিভাবে ছোট-বড় হয়।” আমি ঘাড় কাৎ করে সম্মতি জানালাম। রিফাত বললো, “আজ সন্ধ্যায় কিন্তু ভূতের গল্প বলতে হবে। কাল সকালে আমরা চলে যাবো।” আমি আগের মতোই সম্মতিসূচক ঘাড় কাৎ করলাম। ওরা তিনজন ছুটলো তুষার আর তুহিনকে ধরতে।

৪.
দুপুরের পর থেকেই আসরের তাগাদা চলছিল। আমি “ভূতের গল্প সন্ধ্যার আগে হয় না” বলে ঠেকাচ্ছিলাম; বিকেলে রিফাত একবার এসে জিজ্ঞাসা করলো সন্ধ্যা হতে আর কত দেরি? আমি স্বাভাবিক গাম্ভীর্য বজায় রেখে বললাম, “করবার কিছু নেই, অন্ধকার হলেই বুঝবে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। অগত্যা কিছুটা মন খারাপ করেই চলে গেল। সত্যি সত্যি যখন সন্ধ্যা হলো তখন ‘ত্রিরতœ’ কোত্থেকে এসে হাজির একসাথে। ওদের উপস্থিতির ধরনই আমাকে বলে দিল ওরা সন্ধ্যার অপেক্ষায় প্রস্তুত হয়েই ছিল।
সন্ধ্যার বিষণœ আলোয় তিনজনের চেহারা দেখে আমার মায়া হলো। সিফাত-রিফাত আর তারেক আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চললো ঘরের দিকে। আমি অগত্যা উঠলাম। সারা দিনে আমি চেয়েছি, অন্তত তিনটি ভূতের গল্প সাজাতে, কিন্তু যতবার সাজাতে চেয়েছি বারবার ভাবনাগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। শেষে ভেবেছি তাৎক্ষণিকভাবে যা মনে আসবে বলে দেবো। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে আরেকবার চেষ্টা করলাম একটা গল্প গুছিয়ে নিতে।
গল্প বলার জন্য আমরা তৈরি হয়ে বসলাম। সিফাত কথা বললো, “আজ ফাঁকি দিতে পারবেন না।” আমি অবাক হয়ে বললাম- “আজ ফাঁকি দিতে পারবো না মানে কি? তবে কি তুমি বলতে চাও গতকাল ফাঁকি দিয়েছি?” রিফাত সিফাতের কথাটিকে সংশোধন করে বললো, “কাল ফাঁকি দেননি তবে মাত্র দু’টি ঘটনা বলেছেন। আজ অন্তত দশটা ঘটনা বলতে হবে।” হাসতে হাসতে বললাম, “দশটা ঘটনা বলতে গেলে তো সারারাত পার হয়ে যাবে।” “হোক।” সিফাত দৃঢ়তার সাথে বললো। আমি আরেক দফা অবাক হবার ভান করে বললাম, “ঘুমোতে হবে না!” তারেক বললো, “আজ ঘুমাবো না। আমার তো সারারাত জেগে থাকতে কোনো অসুবিধা হয় না। রিফাত অবশ্য একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়বে।” রিফাত তারেকের দিকে একবার কটমট করে তাকালো। আমি সামান্য হেসে বললাম, “ঠিক আছে আজ বেশ ক’টা ঘটনা বলবো। তবে সারারাত ধরে বলা যাবে না। তোমাদের ঘুম না পেলেও আমার ঘুম পাবে। আর তোমরা যদি আজ না ঘুমাও তাহলে কাল তো গাড়িতে বসে বসে ঘুমাবে।” সিফাত প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে বললো- “গাড়িতে ঘুমালে অসুবিধা কি?” বললাম- “অসুবিধা তেমন নেই, তবে গাড়িতে ঘুমালে পথে গাড়ির জানালায় যে সুন্দর সুন্দর গ্রাম পার হয়ে যাবে তাদের তো দেখতে পাবে না। ছবির মতো গ্রামগুলো দেখা থেকে বঞ্চিত হবে।” সিফাত যেন কি ভাবলো এক মুহূর্ত তারপর বললো, “ঠিক আছে দেখা যাবে। এখন কথা না বলে গল্প শুরু করুন। গল্প শুরু করলাম।
১৯৭১ সাল। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বাংলাদেশের মানুষ যখন ঘুমিয়ে আছে পাকিস্তানি বাহিনী তখন আক্রমণ করলো ঢাকায়। নির্বিচারে গুলি করে মারলো এদেশের অসংখ্য মানুষ। সেই দিনগুলোর কথা তোমরা ভালো জানো না, তোমাদের বইপত্রেও সেসব দিনের ইতিহাস বিস্তারিত লেখা হয় না। তোমরা কি জানো মুক্তিযুদ্ধ কি?
সিফাত-রিফাত আর তারেক চোখ চাওয়া-চাওয়ি করলো। রিফাত বললো- “মুক্তিযুদ্ধ কি?” রিফাতের প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি একটু চিন্তায় পড়লাম। আমাকে চুপ থাকতে দেখে সিফাত বললো, “কথা বলছেন না কেন?” আমি বললাম, “দেখ প্রশ্নটা ছোট হলেও উত্তরটা ছোট নয়। তোমরা বড় হয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়বে। আপাতত আমি তোমাদের খুব ছোট করে বলি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামে একটি দেশ তৈরি হয়। দেশটির দু’টি অংশ, এক অংশের নাম পূর্ব পাকিস্তান অন্য অংশের নাম পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের দূরত্ব ছিল প্রায় ১২শ মাইল। নেতারা বলতো আমরাও মুসলমান তোমরাও মুসলমান, আমরা ভাই ভাই- আমরা একদেশ। পাকিস্তানের রাজধানী হলো পশ্চিম পাকিস্তানে। এখন আমরা যে দেশটাতে আছি সেটাই ছিল পূর্ব পাকিস্তান। মুখে ভাই-ভাই বললেও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের সাথে পশ্চিমা নেতারা খারাপ ব্যবহার শুরু করে, তারা চায় আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে। প্রতিবাদ হলো- গুলি হলো। ভাষার জন্য মানুষ প্রাণ দিলো। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ দিবস হয় না? এটা ঐ ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছিল তাদের স্মরণ করার জন্য, তাদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। তারপর পাকিস্তানের নেতারা করলো কি, পূর্ব পাকিস্তানের টাকা নিয়ে খরচ করতে লাগলো পশ্চিম পাকিস্তানে। তখনও প্রতিবাদ হলো। ধীরে ধীরে অবস্থা চরমে উঠলো। আমাদের নেতা তখন পাকিস্তানের শাসকদের কাছে ৬-দফা দাবি তুললেন; জেগে উঠলো বাংলাদেশ; নেতাকে বন্দি করা হলো। ১৯৬৯-এ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ নেতার মুক্তি আর নিজেদের অধিকারের প্রশ্নে বিশাল আন্দোলন শুরু করলো। ছাত্রদের ১১-দফা দাবি যুক্ত হলো ৬-দফার সাথে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জন্য বাঙালির নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ৬-দফা দাবি দিয়েছিলেন ১৯৬৬-তে। ১৯৭০-এ নির্বাচন হলো। নির্বাচনে বাঙালির জয় হলো কিন্তু পাকিস্তানের চক্রান্ত্রকারীরা বাঙালিকে দেশের দায়িত্ব দিতে চাইলো না। তারা টালবাহানা শুরু করলো, কি করে বাঙালিকে ফাঁকি দেয়া যায়। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঢাকার রেসকোর্স মাঠে বিশাল জনসভায় ভাষণ দিলেন। এখন যার নাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। সেটাই তখন ছিল রেসকোর্স ময়দান। বিশাল রেসকোর্স মাঠে লাখো বাঙালির জনসভায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিলেন অসহযোগ আন্দেলনের। বললেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” তারপর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়লো ঘুমন্ত বাঙালির ওপর, শেখ মুজিব স্বাধীনতার ডাক দিলেন, তারপর শুরু হলো যুদ্ধ। বাঙালি যুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে নিলো। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিলো নতুন দেশ যার নাম বাংলাদেশ। বাঙালির সেই মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদাররা ত্রিশ লাখ মানুষকে খুন করেছে, বহু ঘরবাড়ি, গ্রাম-বাজার পুড়িয়ে দিয়েছে, মা-বোনদের নির্যাতন করেছে। আমাদের ইতিহাসের এসব ঘটনা তোমাদের জানতে হবে। তোমরা বড় হয়ে বইপত্র পড়ে বাঙালির গৌরবের ইতিহাস পড়বে-জানবে। ত্রিশ লাখ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে আমরা যে দেশ পেয়েছি সে দেশকে গড়ার দায়িত্ব আমাদের। আমরা যদি দেশের জন্য কাজ না করি তাহলে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মা কি শান্তি পাবে? তাদের আত্মা আমাদের অভিশাপ দেবে না?”
সিফাত-রিফাত আর তারেকের মুখ গম্ভীর হয়ে আছে। আমি পরিবেশটাকে চাঙা করতে প্রশ্ন করলাম “কি তোমরা পড়বে না মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস?” রিফাত আর তারেক একই সাথে উচ্চারণ করলো। “হ্যাঁ পড়বো”। সিফাত মুখে কিছু বললো না, গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়লো। আমি পাশের ঘরে চায়ের কাপে চামচের শব্দ পেয়ে বললাম, “আমাদের আজকের প্রথম গল্প সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঘটনা। কিন্তু মুড়ি আর চা না হলে জমে?” ওরা আমার সাথে সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো। এমন সময় চা আর মুড়ি নিয়ে হাসতে হাসতে ঢুকলেন তারেকের আম্মা।

কার্তিকের প্রায় শেষ। বিস্তীর্ণ মাঠ সবুজের আর সোনালি রঙে মোড়া। আমাদের পরিবার তখন মুক্তাগাছার সৈয়দ গ্রামে। সৈয়দ গ্রামের নামটি তখন আমি ভালোভাবে জানতাম না। গ্রামের লোকেরা জিজ্ঞাসা করলে বলতো শহীদ গ্রাম। গ্রামের নাম কি করে হলো জানতে চেষ্টা করে জেনেছি, আগে এর নাম ছিল চান্দেরগাঁও। গ্রামের বাজারের নাম এখনো চন্দেরবাজার। পাকিস্তানে এরকম অনেক নাম-ই বদলানো হয়েছে যেমন কালিরবাজার বদলে করা হয়েছে ফাতেমা নগর, সেনবাড়ি বদলে আহম্মদবাড়ী, বালীপাড়া বদলে আউলিয়া নগর ইত্যাদি। পাকিস্তানিরা সবই করেছে এ দেশের মুসলমানদের ধোঁকা দেয়ার জন্য। তোমরা আরো বড় হলে বুঝবে, ধর্র্মের দোহাই দিয়ে আজো কিভাবে আমাদের দেশে মানুষকে ধোঁকা দেয়া হয়।
যাক যে কথা বলছিলাম, চন্দেরগাঁও আমার বাবার মামার বাড়ি। এপ্রিলের ২২ তারিখ পাকিস্তানি বাহিনী ময়মনসিংহ শহরে ঢুকে গেলে আমরা শহর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম চান্দেরগাঁও আমার বাবার মামার বাড়িতে। ২৫ মার্চ রাতের পর থেকেই সারা শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল ভয়। আমরা রেললাইন থেকে পাথর এনে জড়ো করেছি বাসায়, পাকসেনাদের সাথে লড়বার জন্য। শেষ পর্যন্ত ২১ এপ্রিল সন্ধ্যার পর ওদের গোলার শব্দ এতো প্রবল হয়ে উঠলো যে মনে হলো কিছুক্ষণের মধ্যেই সারা শহর ধ্বংস হয়ে যাবে। সেই রাতেই পায়ে হেঁটে আমরা পালিয়ে গেলাম জীবন বাঁচাতে। প্রায় দশ মাইল পথ অন্ধকারের মধ্যে হেঁটে যাবার কষ্ট মোটেই টের পেলাম না। হেঁটে যাই আর এক একবার আঁতকে উঠি গোলার শব্দে। মনে হয় যেন ঠিক আমাদের একশ গজের মধ্যে গোলা পড়লো। সেই থেকে দশই ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমরা সৈয়দ গ্রামেই ছিলাম। মাঝে অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে শহরেও এসে থেকেছি কিছুদিন।
মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে আমাদের কাজ ছিল বড়শিতে মাছ ধরা আর রাতে পুকুর পাড়ে বাঁশের মাচায় বসে গল্প বলে কাটানো। রেডিওতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শোনা আর নিয়মিত নামাজ পড়ে বঙ্গবন্ধুর জীবন এবং মুক্তিবাহিনীর বিজয় প্রার্থনা করা। সময় এতো দুশ্চিন্তায় কেটেছে আমাদের অভিভাবকদের তা বলে বোঝানো অসম্ভব। আমরাও বুঝতাম, যে কোনো দিন রাতের অন্ধকারে ওরা এ গ্রাম আক্রমণ করতে পারে। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে সমস্ত গ্রাম। যে কোনো দিন আমাদের মরতে হতে পারে। সিফাত চোখ বড় বড় করে প্রশ্ন করলো- “ওদের কি দয়া-মায়া নেই?” আমি মাথা নেড়ে বললাম “ওরা শয়তানের চেয়েও খারাপ। না হলে কেউ কি অসহায় মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মারতে পারে? গুলি করে মারতে পারে?” সিফাত মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানালো। রিফাত অসহায় চোখে আমার দিকে তাকালো, মৃদু স্বরে বললো, “কিন্তু মামা ভূতের ঘটনা তো বলছেন না! বললাম “এইতো আসল ভূতের গল্প শুরু হবে। ভূতের আগে শয়তানের গল্প বলে নিলাম।” তারেক ইতিউতি করছে দেখে জিজ্ঞাসা করলাম তুমি কি কিছু বলবে? ও আস্তে করে বললো- পেচ্ছাব করবো। বললাম যাও। কিন্তু তারেক নড়লো না। ভাবলাম গল্প থেকে বঞ্চিত হবে তাই যেতে চাইছে না। ওকে আশ্বস্ত করে বললাম “ভয় নেই তুমি এলে ভূতের গল্প শুরু করবো। তবু যাচ্ছে না দেখে বললাম “তুমি কি ভয় পাচ্ছো?” এবার তারেক সম্মতি সূচক মাথা নাড়ালো। প্রশ্ন করলাম কাকে ভয় পাচ্ছো? এবার তারেক অসহায় হেসে বললো- পাকিস্তানি সৈন্যদের।” আমি ওকে সাহস দিয়ে বললাম, “দূর বোকা ছেলে! পাকিস্তানি সৈন্য কি আজো আছে নাকি! আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ওদের তাড়িয়ে দিয়েছে না! ওদের তাড়িয়েই তো আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। অবশ্য ওদের কিছু প্রেতাত্মা আজো আছে এদেশে! প্রেতাত্মাগুলোকে তাড়াবার দায়িত্ব আমাদের। আমরা তাড়াতে না পারলে তোমাদের তাড়াতে হবে। ভয় পেলে চলবে নাকি।” এবার তারেক পেচ্ছাব করতে গেল। আমি অবশ্য টের পেলাম পাশের ঘর থেকে ও তার মাকে নিয়ে গেল সাথে করে। তারেক ফিরে এলে আবার গল্প শুরু হলো।

কার্তিকের শেষ। প্রতিদিনের মতো সেদিনও আমরা সন্ধ্যার পর পুকুর পাড়ের বাঁশের মাচায় বসে গল্প করছিলাম। আকাশে চমৎকার উজ্জ্বল চাঁদ। সোনালি ধান ক্ষেতে আরো কিছু রুপালি আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। আমরা কথা বলছিলাম, সেদিন দুপুরে সৈয়দ গ্রামের মাটির সড়ক দিয়ে চলে যাওয়া জিপটাকে নিয়ে। দুপুরে একটা জিপ এসেছিল। দূর থেকে জিপটাকে দেখে সবাই অস্থির হয়ে উঠলো। তাড়াতাড়ি আমাদের সবাইকে লুঙ্গি পরিয়ে মাঠে পাঠিয়ে দেয়া হলো কৃষিকাজে। কেউ কেউ ছুটলো আড়ায়। শেষ পর্যন্ত জিপটা পার হয়ে গেল, আমরা দেখলাম জিপে কোনো সৈন্য নেই। সেদিন সন্ধ্যায় জিপ দেখে অহেতুক ভয় পাওয়া নিয়ে গল্প হচ্ছিলো। ভয়ের গল্প থেকেই এক সময় উঠলো ভূতের গল্প। ওমর নামের এক ছেলে বয়সে আমাদের কিছু বড়, সে বললো মেছো ভূতের এক ঘটনা। ওমর যে ভূতের ঘটনা বলেছিল, এখন আমি তোমাদের সে ঘটনাই বলবো।
ভূতের ঘটনার আগে ওমর সম্পর্কে শোনো। ওমরের বয়স বিশ-একুশ। বয়স বিশ-একুশ হলেও ওমরের মাথার চুল প্রায় সবই শাদা। বাঁশ দিয়ে সে চমৎকার জিনিসপত্র বানাতে পারতো। বিশেষ করে মাছ ধরার বাইর-বোচনা-পলো ইত্যাদি। ওমরের ছিল মাছ ধরার খুব নেশা। ওমর যেভাবে ঘটনাটা বলেছিল আমিও তোমাদের সে ভাষায়ই বলছি ঘটনাটা-
আশ্বিন মাস। বৃষ্টির দাপট কমেছে- তখনো শীত পড়েনি। মাঠে তেমন কাজ নেই। সেদিন বিকেলে আমরা গল্প করছিলাম বটগাছটার ছায়ায় বসে। আমি যে শেকড়ের ওপর বসেছিলাম তার পাশে বেশ ক’টি লতা নেমে এসেছে ওপরের ডাল থেকে। কয়েকটি লতাকে শিকড়ের সাথে বেঁধে চমৎকার একটা বসার ব্যবস্থা করেছি আমি, অনেকটা ইজি চেয়ারের মতো, গা এলিয়ে দিয়ে বসা যায়- শোয়াও যায়। বিকেলে যখন আমরা গল্পের আসরে বসি, এ আসনটি আমার জন্য নির্ধারিত। আমাদের দলের আমি দলপতি বলে নয়, দলের মধ্যে আমি-ই কলেজে ভর্তি হয়েছি বলেও নয়; আসনটি আমার তৈরি বলে কেউ আমার উপস্থিতিতে আসনটি নিয়ে কাড়াকাড়ি করে না। বটগাছটির বয়স কত হবে জানি না, তবে খুব ছোট থেকে আমি যখন প্রথম বাজারে গিয়েছি তখন থেকেই গাছটিকে একই রকম দেখছি। এই গাছকে ঘিরেই আমাদের গ্রামের ছোট্ট বাজার, সপ্তাহে দু’দিন বিকেলে হাট বসে বটের ছায়ায়। সপ্তাহের বিশেষ দু’টি দিন ছাড়া বাকি দিনগুলোতে আমাদের বৈকালিক গল্পের আসর বসে পুরোনো এই বটের ছায়ায়। বটগাছটাকে নিয়ে আমরা বয়স্কদের মুখে নানান গল্প শুনেছি। বিশেষ করে সন্ধ্যায় বটের শেকড়ে বসে গল্প করার জন্য অনেকে সাবধান করে বকেছেন। আমরা কোনোদিনই গাছে খারাপ কিছু আছে বিশ্বাস করিনি।
সেদিন বিকেলে আমরা যখন গল্প করছিলাম তখনও মকবুল মেম্বার বারবার বলছিলেন- “মুরব্বিগণ কথা তো হুনবা না, যেইদিন ধরবো হেইদিন ধরবো, হেইদিন কাইন্দাও কুল পাইবা না!” ওপাশ থেকে মঞ্জু হাসতে হাসতে বললো- “মামু সবাই যে খালি কন ধরবো, কিন্তু ধরবোডা কেডা? আইজ পর্যন্ত তো তেমন কিছু দেখলাম না!” মঞ্জু আমার থেকে বেশ খানিকটা দূরে বসেছিল সেদিন। এমনিতে ওর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা সবচেয়ে বেশি, কিন্তু সেদিন কী কারণে জানি না মঞ্জু আসন্ন নির্বাচনে নৌকা মার্কার পরাজয়ের কথা বলেছিল। আমি বঙ্গবন্ধুর ভক্ত, মঞ্জু নিজেও নৌকার পক্ষে কাজ করতো। সেদিন কী হয়েছিল ওর জানি না, আমার সাথে তর্ক করে দূরে বসেছিল মুখ গোমড়া করে। আমাদের কোনো আলাপেই অংশ নিচ্ছিল না। অনেকক্ষণ পর মকবুল মেম্বারের সাথে কথা বললো। মকবুল মেম্বার আমাদের কাছ থেকে বেশ কিছুটা দূরত্ব রেখেই বললেন, “কেডা ধরবো, ধরলে পরে বুঝবা! আমার সাবধান করার দরকার, সাবধান কইরা দিলাম।” মঞ্জু দমবার পাত্র নয়, সে আবার তর্ক তুললো, “আর সাবধান তো সবাই করতেছেন! আমি জিগাই আপনে নিজে কিছু দেখছেন কি বটগাছে?” মকবুল মেম্বার হাসতে হাসতে বললেন, “খালি আমি একলা না-হি গেরামের মেলা মাইন্সেই দেখছে।” আমরা সবাই মঞ্জুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। মকবুল মেম্বার হাতের চুরুটে আলিশান একটা টান দিয়ে হাঁটতে লাগলেন। মঞ্জু গাছের মগ ডালের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো, “আইজ একটা কিছু না দেইখ্যা উঠতাছি না!”
সন্ধ্যায় আমাদের আসর ভাঙলো। সবাই যার যার মতো উঠে গেল। আমি মঞ্জুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। অনেকক্ষণ পর আমি উঠে মঞ্জুর হাত ধরে টেনে উঠলাম। মঞ্জু আসতেই চায় না, শেষে আমার জোরাজুরিতে উঠলো। হাঁটতে হাঁটতে ওকে বললাম, “বিলে নাকি খুব মাছ ধরা পড়ছে? মঞ্জু হঠাৎ করে উৎসাহী হয়ে উঠলো। কথা হলো খুব ভোরে মঞ্জু এসে আমাকে নিয়ে যাবে।
ভোরে মাছ ধরতে যাবো ভেবে রাতে আমার ভালো ঘুম হলো না। শেষ রাতের দিকে ক্লান্তিতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। মঞ্জুর ডাকে ঘুম ভাঙলো। উঠে বসলাম। মনে হলো রাত এখনো শেষ হয়নি। ভাবলাম হয়তো ভুল শুনেছি, হয়তো স্বপ্নে মঞ্জুর ডাক শুনেছি। রাতের স্তব্ধতা ভেঙে মঞ্জু আবার ডাকলো, “কিরে উমর উডছ নাই?” আমি চৌকি থেকে নামতে নামতে বললাম, “উঠছি তো! রাইততো শেষ অয় না।” মঞ্জু ধমকের সুরে বললো, “আইন্ধার থাকতে থাকতে যাইতে পারলেই তো লাভ। মাছ মাইর পড়বো বেশি।” আমার কিছুটা আলসেমি লাগলেও অগত্যা রওনা হলাম দু’জন।
বিলের পাড়ে গিয়ে আমার চোখ গোল হয়ে গেল। মনে হচ্ছে বিলের সমস্ত মাছ এখানে দলবেঁধে লাফাচ্ছে। মঞ্জু পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বললো, “কি রহম কইছিলাম! দেখছস তো মাছের অবস্থা! মাছ ধইরা আইজ লুডাইয়া ফালমু!” আমি একবার মঞ্জুর হাতের খালইটার দিকে ইঙ্গিত করে বললাম, “কিন্তু এত মাছ ধইরা রাখবো কই? এই খালই-এ কয়ডা মাছ ধরবো?” মঞ্জু হেসে বললো, “আগে খালই ভইরা ল তারপর দেহা যাইবো।” আমি আর কথা না বাড়িয়ে জাল নিয়ে নেমে গেলাম পানিতে।
জাল টেনে তুলতে পারছিলাম না। প্রতিটানে হরেক জাতের মাছ। পুঁটি, মাগুর, মলা, কৈ, বৈচা, টাকি নানান রকম মাছ। মঞ্জু বললো, “অহন ইকটু পানিতে নাম্ না! কিনারে কি অহনও মাছ বইয়া রইছে?” মঞ্জু হাতের খালই রেখে ওপাশে পেচ্ছাব করতে বসলো। আমি এতক্ষণ ধরে হাঁটু পানিতে নেমে জাল টানছিলাম। হঠাৎ মনে হলো এতোক্ষণ ধরে এতো মাছ ধরলাম, খালই কি এখনো ভরেনি? একবার মঞ্জুকে দেখে পানি থেকে উঠে গেলাম। খালইয়ের ভেতরে তাকিয়ে আরেকবার আমার চোখ দু’টো গোলা হয়ে গেল। ভাবলাম ভুল দেখেছি। আবার তাকালাম। খালই ফাঁকা। একটা মাছও নেই, শুধু ক’টা কাঁটা পড়ে আছে তলায়। আমার মাথা ঘুরছে মুহূর্তে মনে হলো কি বিপদে আমি পড়েছি। “তাহলে কি মঞ্জু আসলে মানুষ নয়? মেছো ভূতে পেয়েছে আমাকে? তবে কি মঞ্জুর রূপে ভূতই আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে এখানে এনেছে! তাই কি ও আমাকে বারবার বেশি পানিতে নামতে বলছে?” আমার শরীর ঘেমে ভিজে গেল, মনে হলো- আজই আমার জীবনের শেষ দিন। চারপাশে একবার তাকালাম কোথাও কেউ নেই। সমস্ত গ্রাম ঘুমিয়ে আছে। মনে মনে ভাবলাম, একবার অন্তত শেষ চেষ্টা করে দেখি বাঁচতে পারি কি না!
দ্রুত নেমে গেলাম হাঁটু পানিতে। আমি যে সব টের পেয়েছি, মঞ্জু ভূতকে তা বুঝতে দিলাম না। ওপাশ থেকে মঞ্জু যখন উঠে দাঁড়ালো, আমিও তখন পানি থেকে পাড়ে উঠে এলাম। মঞ্জু অবাক হয়ে বললো- “কিরে উমর কি অইলো? উইঠ্যা আইলি ক্যা?” আমি স্বাভাবিক গলায় বললাম, “সইলডা হঠাৎ খারাপ লাগতাছে, একখান বিড়ি খাইয়া লই। তুই ততক্ষণ জালডা ইকটু টান।” মঞ্জু অবাক হয়ে বললো, “বিড়ি খাস কবেত্যে তুই?” আমি স্বাভাবিক গলায় বললাম, “কলেজে দুই একটা খাই। কথা না বাড়িয়ে পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে আগুন জ্বালালাম। মঞ্জু একটুক্ষণ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে জাল নিয়ে পানিতে নামলো। আমি সিগারেট ধরানোর সময় আড়চোখে মঞ্জুর পা দু’টি দেখে নিলাম। পা দু’টি উল্টো। আমি শুনেছি ভূতের পা উল্টো থাকে এবং ভূতেরা আগুন থাকলে কাছে ঘেঁষে না। তাইতো সিগারেটের অভ্যাস না থাকলেও যখনই গ্রামে আসি তখন পকেটে সবসময় সিগারেট আর দিয়াশলাই রাখি। মনে মনে নিজেকে ধন্যবাদ জানালাম। মঞ্জু জাল টানছে, আর বারবার আমাকে দেখছে ঘাড় ঘুরিয়ে। আমি নিজেকে মনে মনে তৈরি করে নিয়ে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালাম। মঞ্জুকে কিছু না বলে, কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সোজা বাড়ির দিকে ছুটলাম। খুব সাবধানে হাতের জ¦লন্ত সিগারেটটাকে ধরে রাখলাম। একটু পরে টের পেলাম মঞ্জুও ছুটছে আমার পেছনে। আমি আর দৌড়াতে পারছি না- পা দু’টি অবশ হয়ে আসছে।
যখন মনে হচ্ছে আর দৌড়াতে পারবো না ঠিক তখন- যখন মনে হচ্ছে আর দৌড়াতে পারবো না ঠিক তখন-ই একটা কিছুতে হোঁচট খেয়ে উপুড় হয়ে পড়লাম মাটিতে। পেছন থেকে মঞ্জুভূতের এগিয়ে আসা টের পেলাম। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। শেষবারের মতো আল্লাহর নাম স্মরণ করে মৃত্যুকে মেনে নিলাম। সিফাত চোখ বড় বড় করে বিস্ময়মাখা কণ্ঠে প্রশ্ন করলো, “লোকটা মরে গেল?” আমি এক মুহূর্ত চুপ করে থাকলাম। রিফাত সলজ্জ হেসে বললো, “মরবে না তো! মরলে আবার গল্পটা বলছে কি করে!” আমি এবার হেসে বললাম, “রাইট! মরা মানুষ কি পরের বছর গল্প বলতে পারে?” এবার তারেক বললো, “লোকটা যে পড়ে গিয়ে মরে গেল!” আমি আবার হাসতে হাসতে বললাম, “মরে যায়নি, মৃত্যুকে মনে মনে মেনে নিয়েছে। ওমরের গল্প বলাতো শেষ হয়নি তখনো!” সিফাত এবার মৃদু ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো, “শেষ হয়নি- তবে থামলেন কেন?” আমি অপরাধীর মতো বললাম- “কি মুশকিল দমও ফেলবো না! গল্পের মধ্যে দাড়ি কমাও থাকবে না! আর মজার ব্যাপার কি জানো, সেদিন ওমর যখন আমাদের ঘটনাটা বলছিল, ঠিক এখানে এসেই থেমে গিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। আমরা বরং এই ফাঁকে একটা কাজ করে নিতে পারি! ওমর তো অজ্ঞান হয়ে পড়েই আছে।” সিফাত আবার চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞাস করলো- “কি কাজ?” উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করলাম, “বলতো কী কাজ?” সিফাত ঠোঁট উল্টালো, রিফাতের দিকে তাকালাম, রিফাত মাথা নেড়ে বললো, “জানি না।” পাশ থেকে তারেক বলে উঠলো, “আমি জানি।” সবাই তাকালাম তারেকের দিকে। তারেক দুষ্টামির হাসি হেসে বললো- “আরেক কাপ চা হলে গল্পটা জমতো!” আমি এবার হো হো করে হেসে উঠলাম।
পাশের ঘর থেকে তারেকের আম্মা হাসিমাখা কণ্ঠে প্রশ্ন করলো, “এতো হাসি কেন?” আমি হাসি থামিয়ে তারেককে অনুকরণ করে বললাম- “আরেক কাপ চা হলে গল্পটা জমতো।” সবাই মিলে একবার হেসে নিলাম। পাশের ঘরে চামচের শব্দ হলো চায়ের কাপে। মুহূর্তের মধ্যে ধূমায়িত চা হতে ভাবি হাজির। একগাল হেসে বললেন, “চা-তো আমি এমনিতেই তৈরি করেছিলাম।” আমি মৃদু হেসে বললাম- “আপনজনেরা প্রয়োজনের কথাটি যথাসময়েই টের পেয়ে যায়।” মৃদু হেসে চায়ে চুমুক দিলাম। সিফাত-রিফাত আর তারেক তাগাদা দিলো। চায়ের কাপে আরো একটা চুমুক দিয়ে ওমরের অসমাপ্ত গল্প আবার শুরু করলাম।
যখন আমার জ্ঞান ফিরলো তাকিয়ে দেখি মঞ্জু আমার পাশে বসে আছে। কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া সবগুলো ঘটনা ধীরে ধীরে আমার মনে ভেসে উঠলো। মঞ্জুকে পাশে বসা দেখে শরীরের শিরা উপশিরার রক্ত চলাচল যেন থেমে যেতে চাইলো, মনে হলো দেহের সমস্ত রক্ত ঠা-া হয়ে আসছে, হাত পা যেন বিকল হয়ে যাচ্ছে, চিন্তাশক্তি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। আমি চিৎকার করতে চাইলাম কিন্তু জিহ্বা যেন পাথর হয়ে গেছে। ঠোঁট জিহ্বা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। গলা থেকে গোঁ গোঁ একটা গোঙানির শব্দ বেরোলো। অসহায় চোখে আমি মঞ্জুর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। দু’চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। মঞ্জু আমাকে যতেœর সাথে নাড়া দিয়ে প্রশ্ন করলো, “কিরে ওমর কি অইছে? অত রাইতে গেছিলি কই? দৌড়াইয়া আইলি কুনত্যে?” মঞ্জুর প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে পরলাম না। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলাম মঞ্জুর দিকে। ফজরের আজান হলো তখন। আমার মনে হলো, “কে কথা বলছে, আসল মঞ্জু না ভূতমঞ্জু?” ডান হাতটা ধীরে ধীরে উপরে তুললাম। মঞ্জু আমাকে টেনে তুললো মাটি থেকে। তারপর ওর কাঁধে ভর দিয়ে বাড়িতে পৌঁছলাম। সেদিন তেমন কোনো কথা হলো না। আমাকে গরম পানি করে গোসল করানো হলো, তারপর ঘুমিয়ে পড়লাম। সাতদিন জ্বরে ভুগলাম একটানা। তারপর আর কোনো দিন শেষ রাতে মাছ ধরতে যাইনি।
ওমর গল্প শেষ করলে, আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আসলে মঞ্জু কি সত্যিই এসেছিল মাছ ধরতে?” ওমর আবার পেছনের ঘটনাটা বললো, যে মঞ্জুর সাথে ওমর মাছ ধরতে গিয়েছিল ওটি ছিল মেছো ভূত। মঞ্জু সেজে এসে ওমরকে নিয়ে গিয়েছিল বিলে। ঘণ্টাখানেক পর আসল মঞ্জু ওকে ডাকতে এসে শুনলো ও মাছ ধরতে গেছে, মঞ্জুর সাথে। মঞ্জুর তখন মূল ঘটনা বুঝতে দেরি হলো না। কাউকে কিছু না বলে চললো বিলের দিকে। পথে দেখলো ওমর ছুটে আসছে পেছনে একটা ছায়ামূর্তি। মঞ্জুকে দেখে ছায়ামূর্তিটি থেমে গেল। তখনই ওমর মাটিতে উপুড় হয়ে পড়লো। আর একটু দেরি হলেই দুর্ঘটনা ঘটে যেতো।
ওমরের গল্প শেষ হবার পর আমরা কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলাম। তারপর ধীরে ধীরে দেখা গেল প্রত্যেকেই একটা করে ভূতের ঘটনা শুরু করলো। সেদিন রাতের আসরে শুধু ভূতের গল্পই হলো। এবার আমি তোমাদের আরেকটি ঘটনা বলবো যেটা বলেছিলেন আমার এক ফুপাতো ভাই।

৫.
গল্পের শুরুতেই রিফাত আপত্তি করে বসলো, “আপনার গল্পগুলো ভালো না।” আমি অবাক চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম, “ভালো না মানে?” “ভালো না মানে ভালো না। ভূতের গল্প শুনে যদি ভয় না করে তাকে কি ভালো গল্প বলা যায়?” রিফাতের বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর। আমি একটু চিন্তিত হয়ে পড়লাম। একটুক্ষণ চোখ বন্ধ করে চুপ করে থাকলাম। গম্ভীর হয়ে বললাম, “এ গল্পটা শোনো, এটি আমার এক ফুপাত ভাই বলেছিল। আমার মনে হয় এ গল্প শুনে তোমাদের কিছুটা ভয় লাগতে পারে। আর যদি ভয় না লাগে তাহলে শেষে বলবো আমার নিজেরই একটা ঘটনা। ওটা শুনলে তো রাতে ঘুমাতেও পারবে না, খেতেও পারবে না। বাইরে যাবার তো প্রশ্নই ওঠে না।” ওরা তিনজন একসাথে উৎসাহী হয়ে উঠলো, “তা হলে আপনার ঘটনাটাই আগে বলুন।” আমি মাথা নেড়ে বললাম, “না ওটা হচ্ছে শেষ গল্প- শেষ ঘটনা। ওই গল্পটা এতোই ভয়ঙ্কর যে, ওটির পরে আর গল্প চলে না।” কিছুক্ষণ নীরবতা। শেষ পর্যন্ত রিফাতই বললো, “আচ্ছা শুনি আগের গল্পটা।” আমি গল্পটাকে মনে মনে গুছিয়ে নিতে থাকলাম, মাঝখানে হঠাৎ সিফাত প্রশ্ন করলো, “শেষের গল্পটা কি খুবই ভয়ের?” আমি কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু চোখ বন্ধ করে মাথা দুলাতে থাকলাম। তারেক প্রশ্ন করলো, “বড়রা শুনলেও কি ভয় পাবে?” এবারও আমি কথা বললাম না, শুধু মুচকি হেসে মাথা দুলাতে থাকলাম। রিফাত বললো, “আচ্ছা মামা ভয়ের গল্পটা দিনের বেলায় শুনলেও কি ভয় করবে?” আমি এবার একটু শব্দ করে হাসলাম, তারপর বললাম, “আগেই তো বলেছি ভূতের গল্প দিনের বেলায় বলা যায় না।” তারেক ভয়ে ভয়ে একবার ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে কয়েকবার চোখ মিট মিট করে বললো, “শেষ গল্পটা শোনার আগে আম্মাকে ডেকে আনবো। আম্মাও একটা গল্প শুনবেন বলেছেন।” তারেকের মনের কথাটা বুঝতে আমার অসুবিধা হলো না। মনের কথাটা আমিও ওকে বুঝতে না দিয়ে বললাম, “ঠিক আছে শেষ গল্প শুরুর আগে বলবো, তোমার আম্মাকে ডেকে এনো। এখন কি আগের গল্পটা শুরু করবো?” ওরা তিনজনই ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো। গল্প শুরু করলাম-
আমার অনেক দিনের শখ একদিন শ্মশানঘাটে একা একা রাত কাটাবো। সেদিন আমার মন ভালো নেই, বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন নিজের অজান্তেই চলে গেছি শ্মশানঘাটে। নদীতে পানি কম। বাঁধানো ঘাটের বেশ অনেকগুলো সিঁড়ি নেমে গেলে নদীর পানি। বাঁধানো ঘাটের পাশে বিশাল এক বেলগাছ ঘাটের ওপর চমৎকার ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। গাছে বেশ কিছু অপরিণত বেল, পাতার আড়ালে লুকিয়ে আছে। আমি সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে গেলাম। নদীর খুব কাছাকাছি বসলাম। ইচ্ছা হলে হাত বাড়ালেই নদীর পানি ছুঁয়ে দিতে পারি; ওপারে বিশাল কাশবন। কাশবনে পাখিদের বৈকালিক সমাবেশ। বসে বসে পাখিদের গান শুনছি। ওদের কোলাহল থেকে পাখিদের বিবাদ-বিসম্বাদ আবিষ্কারের চেষ্টা করছি। কাশবনের সোজা উপরে উজ্জ্বল নীল আকাশে কয়েকটি শকুন চক্কর দিয়ে উড়ছে। কখনো শকুনগুলো ছোট হতে হতে বিন্দুতে এসে যাচ্ছে, আবার ধীরে ঘুরে ঘুরে নিচে নেমে আসছে। এবার চেনা যাচ্ছে নীল আকাশের কালো বিন্দুগুলো আসলে একেকটা শকুন। আকাশ-কাশবন-পাখির গান আর নদীর বয়ে চলার মাঝে হারিয়ে গিয়েছিলাম। কখন সন্ধ্যা হয়েছে টেরও পাইনি। শ্মশানঘাটের ডোম যখন ডেকে বললো, “এই বাবু ঘরে ফিরবেন না। রেইত তো হইয়ে এলো।” হঠাৎ করে দেখলাম সত্যি সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমি ডোমকে ডেকে দশটা টাকা দিয়ে এক প্যাকেট সিগারেট আর ম্যাচ আনতে বললাম। ডোম আমাকে সিগারেট আর একটা ম্যাচ দিয়ে চলে গেল। যাবার সময় ওর হাতে একটা টাকা ধরিয়ে দিলাম।
মনে মনে ঠিক করে ফেললাম আজ রাতটা শ্মশানেই কাটিয়ে দেবো। সন্ধ্যার বেশ কিছুক্ষণ পর আকাশে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ উঠলো। নদীর উপরে গ্রামের মাথায় যখন চাঁদ উঠলো আমি যেন হঠাৎ চমকে উঠলাম। চাঁদটাকে আমার খুব পরিচিত মনে হলো। চাঁদের মুখে যেন এক গোপন বেদনা ছড়িয়ে আছে। শম্ভুগঞ্জ ব্রিজের ওপর কে যেন গানে টান দিলো, “বঁধু তোমার আমার এই যে বিরহ এক জনমের নহে-।”
চাঁদটা উঠে এসেছে নদীর ওপর। নদীর বুকে ভাসছে চাঁদের ছায়া। ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেঙে যাচ্ছে চাঁদমুখ। চাঁদের আলো-খেলা ছড়িয়ে যাচ্ছে ঢেউয়ে ঢেউয়ে। পানিতে সোনালি আলো খেলা করছে। আমি সারারাত শ্মশানে কি কি ঘটনা ঘটতে পারে এসব বিষয় মনে মনে ভেবে নিচ্ছি। দূর থেকে মৃদু গুঞ্জরণের শব্দ শোনা গেল। টের পেলাম শব্দটা ধীরে ধীরে শ্মশানের দিকে এগিয়ে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্পষ্ট হলো “হরি হরি বোল। বোল হরি!” ধ্বনি। টের পেলাম একদল লোক মরদেহ নিয়ে শ্মশানে ঢুকছে। আমি ঘাটের সিঁড়ির এতো নিচে বসেছি যে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। মনে মনে ভাবলাম- “আমি যেহেতু ওদের দেখছি না নিশ্চয়ই ওরাও আমাকে দেখছে না।” নিচে বসে বসে ওদের মরদেহ সৎকারের আয়োজন টের পাচ্ছি। শবদাহ করতে কি কি লাগবে, কি কি আনা হয়েছে- কি আনা হয়নি জোগাড়-যন্ত্র চলছে শববাহী দলের মধ্যে দু’জন কি তিনজন একটানা কেঁদে চলেছে বুক খুলে। দু’একজন সৎকারের পুণ্যের ব্যাপারে অতি উৎসাহী হয়ে আয়োজন করছে। টের পেলাম ডোমের সাথেও কিছু ব্যাপারে ওদের বচসা হলো। শেষ পর্যন্ত ডোম ব্যাটা ওদের খুব একটা পাত্তা না দিয়ে চলে গেল। যাবার সময় জোরালো কণ্ঠে বলে গেল, “আমার কি আছে! আমার ডিউটি আছে লাশ জুড়াইয়া দেওয়া! হুকুম দিলেই কাম করিয়ে দিব। মগার রেইতের ব্যাপার! আমারও বুঝিয়া শুনিয়া ডিউটি করতে হবে। যাকগা বাবু সব কিছু আনিয়া আমাকে হুকুম দিলে চইলে আসবো।”
আমি নিচে ছিলাম ওরাও আমাকে কেউ দেখেনি- টেরও পায়নি। আমিও ওদের কাউকে দেখিনি কিন্তু টের পাচ্ছিলাম ওদের কর্মকাণ্ড। হঠাৎ ঘটলো এক দুর্ঘটনা। টের পাচ্ছি ঘাটের সিঁড়ি ভেঙে কেউ নিচে নেমে আসছে। আমি মনে মনে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলাম। নিশ্চয়ই নদী থেকে পানি নিতে পাঠানো হয়েছে কাউকে। ভাবছি যিনি নেমে আসছেন, তিনি হঠাৎ আমাকে দেখে কি করবেন?
একজন যুবক মাটির একটা হাঁড়ি হাতে নেমে এলো। আমি ঘাটের যে পাশটাতে বসে ছিলাম তার বিপরীত পাশ থেকে হাঁড়িটা ভরে নিল, নদীতে একটা ডুব দিয়ে ওঠে। ঘাটের উপরে একজন কিছু পাঠশোলায় আগুন ধরিয়ে অপেক্ষা করছে যুবকের জন্য। যুবক ডুব দিয়ে উঠেই আমাকে দেখেছে টের পেলাম। যুবক হঠাৎ স্থবির হয়ে গেছে। আমি যুবককে সাহস দিতে দ্রুত বললাম, “দেখুন আমি সন্ধ্যার আগেই এখানে বসেছিলাম-” আমার কথা শেষ হবার আগেই যুবক হাতের হাঁড়ি ফেলে, বাবাগো বলে কোনো রকমে প্রাণ নিয়ে উপরে উঠে গেল। আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। টের পাচ্ছি উপরে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে আমাকে নিয়ে। ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে দেখলাম পালানোর কোনো পথ নেই। উঠে দাঁড়ালাম। উপরে তাকিয়ে দেখি কয়েকজন সাহসী যুবক হাতে আগুনের মশাল নিয়ে নেমে আসছে আমার দিকে।
যুবকদের নিচে নামতে দেখে আমি আরেকবার ডানে-বাঁয়ে তাকিয়ে পালানোর কথা ভাবলাম এবং অগ্যতা নিজেই ভয়ে ভয়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে এলাম।
গল্প থামিয়ে দিয়ে তারেক প্রশ্ন করলো-“ওরা কি আপনাকে মারবে?” সিফাত ধমকে উঠলো, “তোমার বুদ্ধি কি কমলো নাকি! এটি তো মামার নিজের গল্প না, উনার ফুপাত ভাইয়ের গল্প।” আমি হেসে বললাম, “তার মানে তুমি আমার গল্প বুঝতে পারছো না। না হয় অন্য চিন্তা করছো। গল্পটা আমার এক ফুপাত ভাই বলছিলেন, এখন আমি তার গল্পটাই বলছি।” তারেক কিঞ্চিৎ লজ্জিত হয়ে বললো- “বুঝেছি। আমি আসলে ভুলে গিয়েছিলাম।” রিফাত হঠাৎ প্রশ্ন করলো, “আচ্ছা, মামা ডোম কি?” রিফাতের প্রশ্নের সাথে সাথে সিফাত আর তারেকও চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকালো। বুঝতে পারলাম তিনজনের একজনও ডোম কি বুঝতে পারেনি। আমি এক মুহূর্ত ভেবে বললাম, “ডোম মানে একজন মানুষ। মানুষের একটি বিশেষ সম্প্রদায়। যেমন ধরো, মেথর, মুচি, কামার, কুমার, নাপিত, জেলে ইত্যাদি। ডোমদের কাজ মরা পোড়ানো, লাশকাটা এসব। কোনো হিন্দু মানুষ মারা গেলে তাকে শ্মশানে পোড়ানো হয়, এটি হচ্ছে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় রীতি। মরদেহ পোড়ানোর জন্য সব শ্মশানে একজন ডোম থাকে।” ডোম সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা ওরা কতটা বুঝলো বুঝতে পারলাম না। প্রশ্ন করলাম- “বুঝছো ডোম কি?” তিনজন এক সাথে মাথা কাৎ করে সম্মতি জানালো। রিফাত এবার তাড়া দিয়ে বললো, “ওপরে আসার পর কি হলো?” আমি চোখ বুজে মাথা নাড়িয়ে বললাম, “আবার বলছি শোনো।”

ওরা চারজন। আমাকে এমন করে ধরে নিয়ে চললো যেন চোর ধরেছে। আমাকে টেনে নিয়ে যেখানে লাশ পোড়ানোর আয়োজন চলছে তার পাশেই দাঁড় করানো হলো। যে ক’জন হাউমাউ করে কাঁদছিল তারা ছাড়া প্রায় সকলেই ধীরে ধীরে আমাকে ঘিরে দাঁড়ালো। জটলা দেখে যারা কাঁদছিল তাদের কান্না থেমে গেল। ওপাশে কংক্রিটের পাটাতনের ওপর এক যুবতির লাশ ধোয়ানো হচ্ছিল, জটলা দেখে লাশ স্নান করানোর কাজ থেমে গেছে। আমি ওদের বোঝাতে চেষ্টা করলাম, আমি কোনো অপরাধী নই, আমার কোনো দোষ নেই। ওরা কেউ আমার কথা শোনে না। সবার রাগারাগিতে আমি রীতিমতো ভয় পাচ্ছি- যে কোনো মুহূর্তে মারধর শুরু হয়ে যেতে পারে। ডোম লোকটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার সে জড়ানো কণ্ঠে বলল, “এ বাবুরা ও বাবুকে আপনি লোক বকছেন কেন? ও বাবু তো হামার লোক, সাম্বাদিক আদমি।” ডোমের কথায় মন্ত্রের মতো কাজ হলো। মুহূর্তে জটলার ভিড় কমে গেল। যুবতির লাশের কাছে ব্যস্ত কমলেশ এতক্ষণে আমাকে দেখে চিনতে পেরে এগিয়ে এলো “প্লেটো তুমি!” আমার ব্যাপারে অতি উৎসাহীদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল, “আরে যাও যাও কাজ কর। ও আমার বন্ধু প্লেটো- সাংবাদিক।” কমলেশ আমার হাত ধরে এক পাশে টেনে নিয়ে গেল। কমলেশ এক চমৎকার ছেলে। নিয়মিত পান খায়, সুন্দর তবলা বাজায়। যদি শোনে কেউ মারা গেছে শ্মশানে যেতে হবে- কমলেশ যাবেই শ্মশানবন্ধু হয়ে। শ্মশানবন্ধু হবার পুণ্য ও কখনো হাত ছাড়া করে না। কমলেশের আরেকটা বিশেষ কাজ হলো প্রতি অষ্টমী স্নানে আর নববর্ষের দুপুরে পথচারীদের শরবত খাওয়ানো। কমলেশের কাছে মৃতের খোঁজখবর জেনে আমি ফিরে গেলাম। আমি একটা গাছের নিচে বেদিতে বসলাম আর কমলেশ সৎকারের কাজে লেগে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যে মরদেহ দাহের আয়োজন শেষ হলো। মুখাগ্নির পর মুহূর্তে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো চিতা। আগুন জ্বলছে ধীরে ধীরে শ্মশান ফাঁকা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত থাকলো মাত্র চারজন, ডোমসহ পাঁচজন এবং আমি। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকে লক্ষ করলাম আকাশের অবস্থা থমথমে। কিছুক্ষণের মধ্যে টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হলো। আমি পাশের ছাউনিতে আশ্রয় নিলাম। সৎকারের কাজে যারা ব্যস্ত ছিল তারা আরো ব্যস্ত হলো, আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে ছাউনির এক কোনায় কিছু খড়ের ওপর বসে পিলারে হেলান দিলাম। এক সময়ে তন্দ্রায় চোখ বন্ধ হয়ে এলো।
যখন তন্দ্রা কাটলো তখন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। বেশ শীত শীত লাগছে। তাকিয়ে দেখি শ্মশান ফাঁকা। কাজ শেষ করে সবাই কখন চলে গেছে টের পাইনি। নিজেকে বড় অসহায় মনে হলো। বৃষ্টির দাপট বাড়ছে। একবার ভাবলাম বৃষ্টিটা একটু দেখি।
হঠাৎ কানে একটা মেয়েলী সুর এলো। যেদিক থেকে সুরটা ভেসে এসেছিল সেদিকে তাকিয়ে দেখি কিছু নেই- অন্ধকার। মনের ভুল ভেবে একটা সিগারেট জ্বালালাম। আবার শুনলাম মেয়েলী সুরের কথা, এবার স্পষ্ট। “কি দাদা সবাই চলে গেল আপনি যে বসে আছেন!” আমি অবাক হয়ে পেছনে তাকালাম, কেউ নেই। অন্ধকার ভেঙে হাসির শব্দ জাগলো বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে। উঠে দাঁড়ালাম। পায়চারী করার ছলে বুকের ভয়টাকে কাটিয়ে উঠতে চাইলাম। আবার অন্ধকারে কেউ আছে কি-না আবিষ্কার করতে চেষ্টা করলাম গোপনে। “দাদা কি ভয় পাচ্ছেন?” আবার স্পষ্ট শুনলাম নারী কণ্ঠের প্রশ্ন। আমি মাথা থেকে দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে পায়চারি শুরু করলাম এবং ঘন ঘন সিগারেট টানতে থাকলাম। এবার অন্ধকারের পর্দা ভেঙে খিল খিল হাসির শব্দ এলো। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত শ্মশান আলো করে বিদ্যুৎ চমকালো পাশাপাশি বজ্রপাত হলো বিকট শব্দ করে। বিদ্যুতের আলোয় একবার পলকের দেখায় মেয়েটিকে চেনা গেল না তবে চেহারাটা খুব পরিচিত মনে হলো। আবার অন্ধকার, আবার স্তব্ধতা, শুধু একটানা ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ। আমার পায়চারী দ্রুত হলো। মনে মনে বিদ্যুৎ চমকানোর জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম।
এবার আমার সমস্ত শরীরের পশম খাড়া হয়ে গেল ভয়ে। বিদ্যুতের চমকে মেয়েটির মুখ স্পষ্ট। কিছুক্ষণ আগে যে মেয়েটিকে পোড়ানো হলো সেই মেয়েটি বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ভিজছে। আমি যন্ত্রচালিতের মতো এগিয়ে গেলাম ছাউনির শেষ প্রান্তে। মেয়েটি আমার থেকে মাত্র হাত তিনেক দূরে অন্ধকারে মিশে আছে। আবার আমি বিদ্যুৎ চমকের অপেক্ষা করছি, হঠাৎ মনে হলো আমার পকেটে তো ম্যাচ আছে। পকেট থেকে ম্যাচ বের করে একটা কাঠি জ্বালালাম যখনই আগুনের আলোয় মেয়েটিকে দেখতে চাইলাম তখনই ধপ করে আগুন নিভে গেল। পর পর পাঁচবার আগুন জ্বালালাম, বারবারই নিভে গেল। আবার একটু ভয় লাগলো। মনে হলো মেয়েটির দীর্ঘশ্বাসেই দিয়াশলায়ের আগুনটা বারবার নিভে যাচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ চমকালো, মেয়েটিকে এবার দেখলাম খুব কাছে থেকে। আবার অন্ধকার এবং বুক কাঁপিয়ে বজ্রপাতের শব্দ। মেয়েটির চোখে যেন কি দেখলাম-আমার সমস্ত ভয় কেটে গেল সহসা। মেয়েটি এবার স্পষ্ট উচ্চারণে প্রশ্ন করলো-
: দাদা আপনি কি আমাকে সত্যি সত্যি ভয় পাচ্ছেন? তাহলে বারবার ম্যাচের কাঠি জ্বালাচ্ছেন কেন?
: না মানে ম্যাচের কাঠি ভয়ে জ্বালাচ্ছি এ কথাটা ঠিক নয়। আসলে আমি তোমাকে একটু দেখতে চাইছি।
: দেখা তো হয়েছে বিদ্যুতের আলোয়। আর কথা বলতে চাইলে তো অন্ধকারেও বলা যায়।
: হ্যাঁ-হ্যাঁ কথা অবশ্য অন্ধকারেও বলা যায়, কিন্তু মুখ দেখে কথা বলার আনন্দই তো আলাদা।
: আনন্দের উল্টো পিঠে বেদনা থাকে তা-ও মনে রাখবেন।
: তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু তুমি এখন কেন এসেছো?
: শুনলাম আপনি নাকি সাংবাদিক, তাই আপনার সাথে কথা বলতে এলাম।
: তোমার কাছে কি কোনো সংবাদ আছে?
: নিশ্চয়ই!
কিছুক্ষণ চুপচাপ। একটানা বৃষ্টির শব্দ- আমিই নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন করলাম-
: কি হলো চুপ করে গেলে কেন? বল কি সংবাদ আছে তোমার কাছে?
: আপনি কি জানেন আমার মৃত্যুর কারণ?
: হ্যাঁ কমলেশ বলেছে।
: কি বলেছে কমলেশ দাদা? আমার বাতজ্বর হয়েছিল?
: হ্যাঁ তাই তো বললো।
: না, কথাটা ঠিক নয়। কমলেশদা জানেন না।
: তাহলে?
: আমাকে খুন করা হয়েছে।
: কে খুন করেছে তোমাকে?
: তা বলতে পারবো না। বিশ্বাস করুন আমি মরতে চাইনি।
আবার বিদ্যুৎ চমকালো। আমি অবাক হয়ে দেখলাম মেয়েটার শরীরে আগুন জ্বলছে। মেয়েটি ধীরে ধীরে মোমের মতো গলে যাচ্ছে। মেয়েটি চিৎকার করে বলছে, “দাদা আপনি খোঁজ নিয়ে জানবেন কেন আমাকে মরতে হলো!” মেয়েটি গলতে গলতে আমার চোখের সামনে মাটিতে মিশে গেল। নিজের চোখ দু’টিকে আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। দু’হাতের পিঠ দিয়ে নিজের চোখ দু’টিকে একবার ঘষে দিয়ে বুঝতে চাইলাম, আমি এতোক্ষণ ধরে যা দেখছি তার সবটাই ঘোর। আবার বিদ্যুৎ চমকালো। বিদ্যুতের তীব্র আলোয় দেখলাম ব্রিজের দিক থেকে একদল শুয়োর গোঁৎ গোঁৎ করতে করতে ছুটে আসছে আমার দিকে। অন্ধকার হলো, অন্ধকারের মধ্যেই আমি পরিস্কার দেখলাম শুয়োরের দল ছুটে আসছে আমার দিকে। ওদের চেহারায় আক্রমণের প্রস্তুতি। আমি আবার ভয় পেলাম। নিজেকে শক্ত করে দাঁড় করিয়ে রাখলাম। শুয়োরের দল ছুটে আসছে। ওরা অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছে। সমস্ত শক্তি এক করে আমি চিৎকার করলাম “বাঁচাও! কে কোথায় আছো আমাকে বাঁচাও।” কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না। বিদ্যুৎ চমকালো। বিকট শব্দ করে বজ্রপাত হলো, বিদ্যুতের আলোয় আমাকে আক্রমণ করবে। হঠাৎ একদল বাদুড় কোত্থেকে উড়ে এসে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। পাখার ঝাঁপটা অস্থির করে তুললো আমাকে। আমি আরেকবার চিৎকার করে মেঝেতে পড়ে গেলাম। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই।
যেদিন হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে বাসায় ফিরলাম আমার কাছে সব এলোমেলো ঠেকলো। সবার সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম, আমার জীবন থেকে তিন মাস দশ দিন সময় আমি হারিয়ে ফেলেছি। অনেক চেষ্টা করেও আমি কিছু মনে করতে পারলাম না। কমলেশের সাথে কথা বলে পরে জেনেছি, মেয়েটির মৃত্যু সত্যিই রহস্যজনক ছিল। আমি চেষ্টা করেও মেয়েটির মৃত্যুর কারণ আবিষ্কার করতে পারিনি। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম সেদিন সারারাত বৃষ্টি হয়েছিল। ভোরে বৃষ্টি থামলে শ্মশানের ডোম আমাকে আবিষ্কার করে। আমি ছাউনির মেঝেতে পড়ে আছি, আমার মুখ থেকে ফেনা ঝরছে। শেষ পর্যন্ত শ্মশানের ডোমই আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

আমি গল্প শেষ করে ওদের দিকে তাকালাম। সিফাত রিফাত আর তারেক অবাক চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। সিফাত প্রশ্ন করলো, “আপনার ফুপাত ভাই কি এখনো বেঁচে আছেন?” আমি মাথা নেড়ে বললাম, “হ্যাঁ বেঁচে আছেন।” রিফাত এবার প্রশ্ন করলো, “আসলে সেদিন রাতে কী হয়েছিল?” তারেক প্রশ্ন করলো, “শুয়োর আর বাদুড়গুলো কি ভূত ছিল?” আমি মাথা নেড়ে বললাম, “বলতে পারবো না। আমার ভাইকেও আমি প্রশ্ন করেছি, কিন্তু উনিও কিছু বলতে পারেন না। এমনও হতে পারে সেদিন তিনি যা দেখেছিলেন সবই তার মনের ভুল, আবার সবকিছু সত্যিও হতে পারে।”
সিফাত, রিফাত আর তারেক কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলো। আমিও কিছুক্ষণ কোনো কথা বললাম না। হঠাৎ প্রশ্ন করলাম, “গল্পটা শুনে তোমরা কি ভয় পেয়েছো?” তিনজন একসাথে উত্তর দিল, “একটু একটু।”
আমি চোখ বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইলাম। ওদের কথায় আমার হাসি পেলো। মনে মনে ভাবলাম সম্ভবত ভূতের গল্প আমি ঠিকমতো গুছিয়ে বলতে পারছি না। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমার ভাই যেদিন গল্পটা বলেছিলেন, আমার মনে আছে আমি ভেতরে ভেতরে খুব ভয় পেয়েছিলাম।
রিফাত আমার নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন করলো, “এবার তো আপনি নিজের গল্পটা বলবেন। যেটা খুব ভয়ের। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, “হ্যাঁ এবার আমি আমার নিজের একটা ভয়ঙ্কর ভয়ের গল্প বলবো এবং এটিই শেষ গল্প।” তারেক বললো, “আম্মাকে ডাকি?” সম্মতি দিয়ে বললাম, “ডাকতে পারো তবে এক শর্তে।” ওরা সবাই আমার মুখের দিকে প্রশ্ন নিয়ে তাকালো। আমি হেসে বললাম, “তোমার আম্মা আমার গল্প শুনতে পারবেন, তবে সঙ্গে আমার জন্য এক কাপ চা নিয়ে আসতে হবে।” আমার কথা শেষ হতেই তারেক লাফ দিয়ে নেমে গেল ওর আম্মাকে ডাকতে। একটু পরই ফিরে এলো তারেক হাসিমুখে। বিছানায় উঠে বসতে বসতে বললো, “আম্মা আসছেন।” আমি শেষ গল্প বলার প্রস্তুতি নিতে থাকলাম। মনে মনে মাথায় গল্পটাকে সাজাতে থাকলাম। ওপাশের ঘরে চায়ের কাপে চামচের শব্দ হলো এবং অল্পক্ষণের মধ্যে দু’হাতে দু’কাপ ধূমায়িত চা নিয়ে হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলেন তারেকের আম্মা। হাসতে হাসতে বললেন, “কিসের গল্প বলেন যে আমাকে পাহারাদার নিয়োগ করতে হলো?” আমার কাপে শেষ বারের মতো চামচ নেড়ে এগিয়ে দিলেন। আমি হাসতে হাসতে বললাম, “গল্পের আগে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আপনাকে আনা হলো।” ভাবি আবার মৃদু হেসে বললেন, “আমি কি ভয়ঙ্কর কিছু না-কি?” আমি ভাবির কথায় অপ্রস্তুত হলাম মুহূর্তের জন্য তারপর নিজেকে সহজ করে নিয়ে বললাম, “না ঠিক তা নয়, তবু ভয়ের ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দেয়ার জন্য এটি শেষ প্রচেষ্টা। দেখা যাক পার পেতে পারি কি না!” ভাবিও এবার হাসতে হাসতে বললেন, “ঠিক আছে বলুন আপনার গল্প। দেখি বুড়ো বয়সে ভূতের গল্প শুনে ভয় পাই কিনা।”

৬.
আমার এ গল্পের শুরু আমার জন্মের বহু আগে, এমনকি আমার বাবার জন্মেরও আগে।
গল্পের শুরুতে একেবারে সাঁড়াশি আক্রমণ। তিনজন এক সাথে প্রশ্ন করলো, “আপনার গল্প আপনার বাবার জন্মের আগে শুরু হয় কীভাবে? আমি ওদের তিনজনের সমবেত প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চায়ের কাপে লম্বা করে একটা চুমুক দিলাম। আমার পক্ষে ভাবি কিছুটা প্রশ্নের উত্তর দিলেন কিছুটা শাসনের সুরে, “গল্প শুরু করতেই যদি তোমরা প্রশ্ন শুরু করে দাও তাহলে কি গল্প বলা যাবে?” রিফাত মৃদু প্রতিবাদ ও সমীহের সুর মিশিয়ে বললো, “তুমি তো জানো না মামি, মামা বলেছেন, শেষে ঘটনাটি উনার নিজের ঘটনা এবং ভীষণ ভয়ের!” তারেকও কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু ওর মায়ের ধমকের ভয়ে থেমে গেল। সিফাত মধ্যস্ততার সুরে বললো, “ঠিক আছে মামা শুরু করুন আপনার গল্প। আমি চায়ের কাপ পিরিচে নামিয়ে রাখলাম এবং ভাবিকে মনে মনে ধন্যবাদ জানালাম, আমার পক্ষে ওকালতি-দারোগাগিরি করার জন্যে। প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার নতুন করে গল্প শুরু করলাম। সত্যি সত্যি আমার এ ভয়ঙ্কর গল্পটির সূত্রপাত আমার জন্মের বহু বছর আগে, এমনকি আমার বাবার জন্মেরও আগে। আমার দাদার এক ফুপু। তাঁর মুখে একটা ঘটনা শুনে আমি তো অবাক, প্রথম তো কোনো মতেই আমি বিশ্বাস করি না তাঁর কথা। পরে কিছু কিছু কথা তাঁর ঘটনার সাথে মিলে যাচ্ছে দেখে আমি বিস্ময়ে হতবাক। দাদার ফুপুকে আমরা বড়মা বলে ডাকতাম। বড়মা’র বিয়ের কিছুদিন পর তিনি স্বপ্ন দেখলেন, কে যেন উনাকে ডেকে বলছেন- “দুপুরে ঘর দরজা লেপে পবিত্র হয়ে তুমি নামাজে বসবে।” ঘুম ভেঙে গেল- স্বপ্ন ভেঙে গেল। কথাটা তিনি কাউকে বললেন না। পরদিন সারাদিন গেল উনি শুধু ছটফট করেন। ঘর-দুয়ার লেপে দুপুরে আর জায়নামাজে বসা হলো না। রাতে আবার একই স্বপ্ন দেখলেন। একেবারে শেষ রাতে আবার পরদিন কাটলো তিনি কাউকে কিছু বললেন না। তৃতীয় রাতেও তিনি একই স্বপ্ন দেখলেন। তৃতীয় রাতে অবশ্য উনি সাহস করে প্রশ্ন করলেন, “আপনি কে! কেন আমাকে একই কথা বলছেন প্রত্যেক দিন?” উত্তর পেলেন গম্ভীর কণ্ঠে, “ভয়ের কিছু নেই, যা বলছি, তাই কর। তোমাকে পুরস্কার দেয়া হবে।” ঘুম ভেঙে গেলে বড়মা ভাবলেন, “কেন আমাকে পুরস্কার দেয়া হবে! কি এমন কাজ করেছি যে আমাকে পুরস্কার দেয়া হবে?” সারা সকাল ধরে তিনি এসব ভাবলেন কিন্তু কাউকে কিছুই বললেন না। বাড়ির সবাই মাঠের কাজে চলে যাবার পর বড়মা ঘর-দরজা লেপতে বসলেন। যতœ করে ঘর-দরজা পরিপাটি করলেন। বড় যতেœর চেয়েও যতœ করে। দুপুরে ঘরে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে জায়নামাজে বসলেন বড়মা। দীর্ঘক্ষণ জায়নামাজে বসে থেকে যখন কোমর ধরে গেল তখনো কোনো আলামত তিনি টের পেলেন না। চতুর্থ রাতে আবার সেই একই স্বপ্ন তিনি দেখলেন। স্বপ্ন ভেঙে গেলে অনেকক্ষণ ধরে তিনি বিছানায় বসে বসে কাঁদলেন। কাঁদতে কাঁদতে বড়মা ক্লান্তিতে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। পরদিন নতুন উদ্যমে তিনি আবার ঘর-দুয়ার পরিপাটি করলেন। দুপুরে আবার তিনি গোছল করে ঘরের দরজা লাগিয়ে জায়নামাজে বসলেন। অনেকক্ষণ ঘরে তিনি নামাজ পড়লেন। একবার সিজদা থেকে উঠে তো তিনি হতবাক। জায়নামাজের পাশ থেকে হুড় হুড় করে বিরাট এক পিতলের কলসি মেঝে ফেটে বেরিয়ে এলো। একটু পর আরেকটা। বড়মা সালাম ফিরিয়ে কলসের মুখের ঢাকনা সরিয়ে হতবাক হয়ে পড়লেন। কলস ভর্তি সোনার মোহর। বড়মা আবার নতুন করে নামাজ শুরু করলেন। আরো একটি পিতলের কলস ভেসে উঠছে ধীরে ধীরে। তৃতীয় কলসটি যখন অর্ধেক জেগেছে মাটির উপর, ঠিক এমনি সময় বলা-কওয়া নেই দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলেন পাশের বাড়ির এক মহিলা। চোখের পলকে কলস তিনটি হারিয়ে গেল মাটির তলায়। বড়মা কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেললেন। পাশের বাড়ির মহিলা কলসগুলো মাটির তলায় ঢুকে যেতে দেখেছেন, কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি। বড়মা কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে জায়নামাজের ওপর লুটিয়ে পড়লেন। প্রতিবেশী মহিলার ডাকাডাকিতে বাড়ির অন্যান্য লোক এসে বিছানায় শোয়ালেন বড়মাকে। সন্ধ্যার আগে বড়মা’র সংজ্ঞা ফিরলো কিন্তু কোনো কথা বললেন না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। মোহরভর্তি কলস পাবার ঘটনা বাড়ির সবার অজানাই থেকে গেল। প্রতিবেশী মহিলার বিবরণ থেকে বিষয়টি সম্পর্কে কিছু নিশ্চিত হতে পারলো না কেউ, তবে ঘরের মাঝামাঝি মেঝেটার পরিবর্তন নজরে পড়লো।
পারিবারিক বৈঠকে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো ঘরের মেঝে খুঁড়ে দেখা হবে সেখানে কিছু আছে কি-না। ঘরের মেঝে খুঁড়ে দেখা হলো কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না। বড়মা কোনো কথা বলেন না কেবল ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন ঘরের মেঝের দিকে। মাস তিনেক কেটে গেল। সবাই ভাবলো বড়মা পাগল হয়ে গেছেন। কেউ কেউ বলে তাকে জিনে ধরেছে। কেউ কেউ বলে বাতাস লেগেছে। নানান জায়গা থেকে কবিরাজ এনে ঝাড়-ফুঁক করা হলো, বিচিত্র সব চিকিৎসার আয়োজন করেও বড়মাকে সুস্থ করা গেল না। এক লম্বা দাড়ি জটাচুল কবিরাজ এসে বাড়ি মাথায় তুলে ফেললো। বিকাল থেকে বাড়িতে এমন সব আয়োজন করা হলো তার নির্দেশে, যে সন্ধ্যার পর জিন দেখার জন্য বাড়িতে ভিড় জমে গেল। রাতে সবাইকে অবাক করে দিয়ে বড় একটা সাদা বোতলে কয়েকটা জিনকে বন্দি করে নিয়ে গেল। উপস্থিত সবাই বিস্ময়ের সাথে দেখলো বোতলে জিনদের বন্দি করার সাথে সাথে বোতলের শাদা পানি লাল হয়ে গেল এবং আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে জিনদের আহাজারি ধ্বনিত হলো। শেষ পর্যন্ত কবিরাজ নিজস্ব ভিজিট, বকশিশ এবং জিন রাজার দরবারের শিরনির আয়োজন নিয়ে বিদায় হলো। বড়মা অবশ্য কবিরাজের কর্মসূচির কিছুই জানলেন না। কবিরাজের সাথে তার দেখাও হলো না। পরদিন সবাই অবাক হয়ে লক্ষ করলো, বড়মা স্বাভাবিক নিয়মে শয্যা ছাড়লেন এবং অসুস্থ হবার আগে যা তার নিয়মিত কর্মতালিকা ছিল তার সবই তিনি নিয়মমাফিক করে যাচ্ছেন। সব কথাই বড়মা বলতে পারছেন, শুধু অসুস্থতাকালীন সময়ের কিছু বলতে পারেন না। মোহরের কলস পাওয়ার ব্যাপারটা কেউ কেউ বিশ্বাস করলো, কেউ করলো না। অধিকাংশই বিষয়টিকে জিনে ধরা রোগীর অসুস্থতা ভেবে পাশ কেটে গেল। সারা গ্রামে জটাধারী কবিরাজের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো, সবাই বাহবা দিতে থাকলো কবিরাজকে।
সুস্থ হবার দশদিন পর সকালে ঘুম থেকে উঠে বড়মা বাড়ির সবাইকে ডেকে বসলেন। বড়মা’র ডাকার ধরন দেখে সবাই, অবাক হলো। সবাই পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে থাকলো। একটুক্ষণ চুপ থেকে বড়মা তাঁর ভাষণ শুরু করলেন।
“আপনারা কিছুদিন ধরে আমাকে নিয়ে যে অস্থির সময় কাটালেন, তাতে আমি বড়ই চিন্তিত। কখনো আপনারা ভাবছেন আমি পাগল হয়ে গেছি, কখনো ভাবছেন আমাকে জিনে-ভূতে ধরেছে, আবার বুদ্ধিমান কেউ কেউ হয়তো ভেবেছেন আমার ভেতরে কোনো সংকট দেখা দিয়েছে। আমাকে সুস্থ করে তোলার জন্য আপনাদের যে আগ্রহ তা দেখেও আমি বড়ই উতলা। যে সমস্যাটি দেখা দিয়েছিল তিন মাস আগে আমি আশঙ্কা করছি আবার সেই একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।” কথা বলতে বলতে বড়মা দম নেয়ার জন্য একটু থামলেন। বড়মা’র কথা বলায় কেউ প্রতিবাদ করতে পারছে না, কথার মধ্যে কি যেন এক সম্মোহন। তাঁর শ্বশুর একবার চোখের ইশারায় কি যেন বলতে চাইলেন তাঁর স্বামীকে; কিন্তু বাবার চোখের ভাষা বুঝতে পারলো না ছেলে। দেবর উঠে দাঁড়াতে চাইলেন এরই মধ্যে বড়মা আবার বলতে শুরু করলেন। বাধ্য হয়েই দেবর বসে পড়লেন চুপ করে।
“ঘটনাটি নিয়ে আমিও খুব চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন ছিলাম। অমন এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে গেল আমার জীবনে যা আমি নিজেই বিশ্বাস করতে পারি না, আপনাদের বিশ্বাস করতে বলি কি করে! ঘটনাটিকে যে অবিশ্বাস করবো তেমন গ্রহণযোগ্য কারণও খুঁজে পাচ্ছি না। আমি আপনাদের যে কথাটা আজ বলতে চাই তা হচ্ছে, এতদিন যা যা ঘটেছে তার সবটুকুই আমি সচেতনভাবে লক্ষ করেছি। আপনারা যা করেছেন তাতে আপনাদের আন্তরিকতা ছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু কাজ কিছুই হয়নি। শুধু উৎকণ্ঠা আর অর্থনাশ। গতরাতে যে আলামত আমি টের পেয়েছি, তাতে মনে হচ্ছে আবারো সেই পুরনো সংকট দেখা দিতে পারে। আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ আপনারা আমার কোনো কাজে বাধার সৃষ্টি করবেন না, আমার ওপর বিশ্বাস আর আস্থা রাখবেন। সব কথা খুলে বলার সুযোগ নেই, বললে সব হারানোর ভয় আছে। শুধু বলি, একবার যা পেয়েও হারিয়েছি আবার তেমনটি হলে আমি বাঁচবো না।” বড়মা তাঁর ভাষণ থামালেন।
সকলেই আবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি শুরু করলেন। কারো মুখে কথা সরে না। বড়মা আবার কথা বললেন, “আমার আপাতত আপনাদের আর কিছু বলার নেই। আমাকে অনুমতি করলে যেতে চাই।” বড়মার শ্বশুর বললেন, “যাও মা তুমি যাও। আমি একটু বসবো।” মাথাটা নিচু করে অত্যন্ত ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন বড়মা। বড়মা বেরিয়ে যেতেই যেন সবাই বাকশক্তি ফিরে পেলেন। বড়মার শাশুড়ি চড়া গলায় বললেন, “ব্যাপরটা কি ঘটলো। কিছুই তো বুঝতে পারলাম না! বউমা যে এতোগুলো কথা কইয়া গেল কাওর মুখে তো আওয়াজ বার হইলো না!” বড়মার দেবর তার মায়ের কথার প্রতিবাদ করলেন, “মাইয়া তুমি কিছু বুঝতে চাও না! ভাবি কথাগুলি কি কইলেন! আমি তো রীতিমতো আট্টাশ লাইগা রইলাম! ভাবির মুখের ভাষাইতো বদল হইয়া গেছে!” বড়মার স্বামী এবার তাঁর ছোট ভাইয়ের কথায় সম্মতি দিয়ে বললেন, “আমি তো কিছুই বুঝলাম না, এই ভাষা উ শিখলো কবে! কথাতো কইলো শিক্ষিত মানুষের মতো। বড়মার শ্বশুর বৈঠকের সমাপ্তি টেনে বললেন, “যাক গা, অহন আর বইসা থাইকা কাম নাই। যার যার কামে যাও সবাই। বউমারে একটু চোক্ষে চোক্ষে রাখতে হইবো। চোখ কান সবাই একটু খুলা রাইখো, কুনডাত্তে কুনডা হইয়া যায়!”
বৈঠক সেদিনের মতো ভাঙলো, কিন্তু বাড়িতে সবার চলাফেরা ও আচরণের মধ্যে বিরাট এক পরিবর্তন দেখা গেল। সেদিন ভোরের আজানের শব্দে ঘুম ভাঙলো বড়মার দেবরের। কি এক শব্দে তাঁর মনে সন্দেহ জাগলো। তিনি নিঃশব্দে শয্যা ছেড়ে উঠলেন। দরজা সামান্য ফাঁক করে দেখলেন তার ভাবি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন একা একা। দেবর কাউকে কিছু না জানিয়ে তার ভাবিকে অনুসরণ করলেন নিরাপদ দূরত্ব রেখে। বড়মা ভোরের সামান্য আলোয় পানের বরজকে পাশে ফেলে আলপথে ধানক্ষেত পার হয়ে কিছুটা গেলেই মাঝিপাড়া। মাঝিপাড়া পার হয়ে বড়মা এসে দাঁড়ালেন সাগরদীঘির উত্তর পাড়ে। পানির খুব কাছাকাছি বসলেন বড়মা। একটুক্ষণের মধ্যে পানি থেকে উঠে এলো সুন্দর একটি মেয়ে! মেয়েটি একগাল হেসে বললো, “আজ আপনার সাথে কথা হবে না সই। আমি চলে যাচ্ছি। আপনার পেছনে লোক লেগেছে। আগামী শনিবার সূর্যাস্তের সময় আসবেন, আসি সই।” মেয়েটি ধীরে ধীরে ডুবে গেল পানির নিচে। দেবর মাঝিপাড়ার পুরনো আমগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে দেখলেন পানিতে ডুবে যাচ্ছে একজন মানুষ। দেবর চুপচাপ লুকিয়ে রইলেন গাছের আড়ালে। বড়মা ফিরে গেলে দৌড়ে গেলেন দেবর দীঘির পাড়ে। সমস্ত দীঘিতে ঘুরিয়ে আনলেন চোখ, কাউকে পেলেন না, চিন্তিত মুখে দেবর ফিরলেন বাড়িতে, ঘটনাটি বাড়ির অন্য কেউ জানলেন না।
সেদিন থেকে দেবরের সতর্ক দৃষ্টি ভাবির ওপর। শনিবার- সন্ধ্যায় দীঘির ঘাটে যাবার বিষয়টি ভেবে শুক্রবার রাতে বড়মা মনে মনে এক কর্মসূচি তৈরি করলেন। শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই বড়মা তার দেবরকে বললেন, “ছোট মিয়া আমি একটু নন্দীবাড়ি সইয়ের বাড়ি যাবো, আপনি কি আমাকে দিয়ে আসবেন?” দেবর কি যেন ভাবলেন মনে মনে, তারপর প্রশ্ন করলেন, “মিয়া ভাইকে নিয়া যান না কেন? দেবরের প্রশ্নের তেমন উত্তর না দিয়ে তিনি আবার বললেন, “আপনি শুধু আমাকে দিয়ে আসবেন, ফিরবার সময় আমি সইয়ের ছেলেকে নিয়ে চলে আসবো।” শেষ পর্যন্ত দেবরই তাকে পৌঁছে দিয়ে এলেন নন্দীবাড়ি সইয়ের বাড়ি। দেবরের মনে ভাবির হঠাৎ নন্দীবাড়ি যাওয়াটা নিয়ে প্রশ্ন জাগলো, কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারলেন না। মনে মনে ভাবলেন, পরদিন একবার গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসবেন।
সন্ধ্যার কিছুটা আগেই বড়মা তাঁর সইয়ের বড় ছেলে হাবিবকে নিয়ে রওনা করলেন। সাগরদীঘির কাছাকাছি এসে হঠাৎ বললেন, “বাবা, সন্ধ্যা তো প্রায় হয়েই এলো, তুমি বরং বাড়ি চলে যাও, আমি এখন একাই যেতে পারবো।” হাবিব মাথা চুলকিয়ে বললো, “না-না খালা আমি তোমারে বাড়িতে দিয়াই যাবো- অসুবিধা নাই!” বড়মা নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “ঠিক আছে বাবা, আমি মাঝিপাড়ায় একটু বসবো, তারপর একজন কাউকে নিয়ে চলে গেলেই হলো।” হাবিব আর কথা না বাড়িয়ে অগত্যা চলে গেল। বড়মা একবার সঙ্গোপনে আশপাশ দেখে সাবধানে দীঘির উত্তর পাড়ে পানির কাছাকাছি বসলেন। মনে মনে পানির সেই সুন্দরী মেয়েটিকে স্মরণ করতে থাকলেন, ঠিক তখনি সন্ধ্যার আজান হলো মসজিদে। আজান শেষ হবার সাথে সাথে দীঘির সমস্ত পানিতে সোনালি আলো ছড়িয়ে দিয়ে মেয়েটি ভেসে উঠলো।
সোনালি আলো বড়মার মুখে ছড়িয়ে দিয়েছে এক অপূর্ব দ্যুতি। অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটি কোনো ভূমিকা ছাড়াই বললো, “হাতে সময় খুবই কম সই। তোমার পিছে লোক লেগেছে। তোমার পরিবারের লোকেরা যদি তোমাকে বিশ্বাস করতে না পারে, তাহলে খুবই অসুবিধা। যে বিপুল সম্পদ এ দীঘিতে আছে তা রক্ষা করা তোমার পক্ষে খুব কষ্টকর হবে সই।” বড়মা আরো একটু কাছে ঘেঁষে গলা নামিয়ে বললেন, “কথাটা কেউ যদি জেনে যায় তাহলেই হাত ছাড়া হয়ে যাবে সব?” মেয়েটি নিঃশব্দে মাথা নাড়লো। বড়মা আবার বললেন, “এ সম্পদ আমি না পেলেই কি? আমার পরিবারের যদি শান্তি নষ্ট হয় তাহলে কি করবো আমি সম্পদ দিয়ে?” মেয়েটি বড়মার কথায় মুচকি হাসলো। তারপর বললো, “মানুষের কল্যাণেই তোমার এ সম্পদ পাওয়া প্রয়োজন সই। এ দীঘিতে আছে এক অশুভ শক্তি! এখানে যে বিপুল ঐশ্বর্য আছে তা যদি কোনো সৎ মানুষের কাছে হস্তান্তর করতে না পারি তাহলে সমস্ত সম্পদ ও শক্তি অশুভ শক্তির দখলে চলে যেতে পারে। আর এ ঐশ্বর্য এবং শক্তি যদি অপশক্তির দখলে চলে যায়, তাহলে মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করতে অশুভ শক্তির কোনোই অসুবিধা হবে না। সই, আগামী মঙ্গলবার পূর্ণিমা। এ পূর্ণিমার রাত দ্বিপ্রহরে তুমি আসবে একা, তখন আমি এখানকার সমস্ত ঐশ্বর্য তোমার কাছে হস্তান্তর করবো। সাবধান সই, তুমি যখন আসবে তোমার শরীরে যেন কোনো অলঙ্কার না থাকে; এমনকি কোনো ধাতব বস্তুও থাকতে পারবে না। আর তোমার সাথে যেন অন্য কেউ না আসে! তৃতীয় কোনো ব্যক্তি যদি তোমার হাতে ঐশ্বর্য দেখে ফেলে তাহলে কিন্তু সবই হাতছাড়া হয়ে যাবে।” বড়মা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন মেয়েটির কথা। এবার প্রশ্ন করলেন, “বিপুল এ ঐশ্বর্য আমি নিয়ে যাবো কিভাবে আর ওগুলো রাখবোই বা কোথায়?” মেয়েটি এবার এক গাল হাসলো বড়মার কথায়। বললো, “ভয় নেই সই, এগুলো তোমার নিয়ে যেতে হবে না। সব এখানেই থাকবে। একটা একটা করে তুমি হাতে নিয়ে ছেড়ে দেবে পানিতে। পরবর্তীতে এগুলোকে তুমি কিভাবে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করবে তা ওরাই তোমাকে বলে দেবে। আমি সবগুলো জিনিসকে ছোট বানিয়ে তোমার হাতে দেবো।” বড়মার চোখ দেখেই বোঝা গেল তিনি বিষয়টি ভালো বুঝতে পারেননি। মেয়েটি আবার বললো, “মনে কর এখানে বিরাট একটা পাতিল আছে সোনার, ওটাকে আমি খেলনা পাতিলের মতো ছোট বানিয়ে তোমার হাতে দেবো, তুমি পাতিলটি বুঝে নিয়ে আবার পুকুরেই রেখে যাবে। বাটি চামচ গামলা সব দেবো, নৌকা-বৈঠা দেবো।” বড়মা চোখ বড় করে বললো, “এগুলো দিয়ে মানুষের কি উপকার হবে? মেয়েটি হেসে বললো, “মনে কর একজন সৎ গরিব মানুষের মেয়ের বিয়ে, তুমি দীঘিতে এসে পাতিল-থালাবাটি চামচ-গামলাকে ডাকলে, ওরা এসে হাজির হবে তোমার সামনে তুমি তোমার নির্দেশ ওদের বলে দিলে, পরদিন ওরা নিজেই চলে যাবে গরিব লোকটির বাড়িতে, অতিথি আপ্যায়নের জন্য কোনো চিন্তা করতে হবে না। পাতিল খুলে যে খাবার চাইবে তাই পাবে, যতটা প্রয়োজন সবটাই পাবে। তবে অপ্রয়োজনে অপচয় করলে অথবা অবহেলা করলে ঠকবে। বর-কনেকে পৌঁছানোর দরকার, নৌকা-বৈঠাকে ডাকবে এবং নির্দেশ করবে, ওরা তোমার নির্দেশ শুনবে। বড়মা ইতস্তত করে বললেন, “এতো বড় কঠিন দায়িত্ব আমাকে দিচ্ছো কেন? এছাড়া আমার নিজের লোকের—” বড়মা কথা শেষ করতে পারলেন না, মেয়েটি বললো, “অনেক ভেবেচিন্তেই তোমাকে নির্বাচন করা হয়েছে। সই, তুমি ভয় পেয়ো না। আমি জানি তুমি পারবে। তুমি সৎ-নির্লোভ! তুমিই তো পারবে! মঙ্গলবার পূর্ণিমা। রাতের দ্বিপ্রহরে একাকী আসবে অলঙ্কারহীন। এখন রাত হয়ে যাচ্ছে, বাড়িতে চলে যাও। মনে রেখো সই, অশুভশক্তি তোমাকে নানাভাবে ভয় দেখাতে চেষ্টা করবে- তুমি ভয় পেয়ো না। মনে রেখো আমি তোমার পাশে পাশেই আছি। ওরা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।” বড়মা উঠে দাঁড়ালেন, ফেরার জন্য ঘুরতেই মেয়েটি কান্না ভেজা কণ্ঠে ডাকলো, “সই শোন।” বড়মা চমকে ঘুরে দাঁড়ালেন এবং দ্রুত পানির নিকটবর্তী হলেন। মেয়েটির চোখ কিছু বলছে না দেখে বড়মাই প্রশ্ন করলেন, “কি হলো সই ডাকলে কেন? তুমি কি আরো কিছু বলবে?”
মেয়েটি কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে বললো, “সই, আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। এতদিন আমি এই ঐশ্বর্য পাহারা দিয়ে রেখেছি। তোমাকে সব বুঝিয়ে দিয়ে আমি মরে যাবো। দীর্ঘ দুশো বছর আমি অভিশপ্ত ছিলাম। আগামী পূর্ণিমায় আমি অভিশাপ মুক্তো হব। আমি চাই আমার মৃত্যুর পর আমার এ ঐশ্বর্য যেন মানুষের উপকারে আসে। সই, আমি অভিশাপ মুক্ত হচ্ছি কিন্তু আমার আনন্দ নেই। সুন্দর এ পৃথিবী ছেড়ে আমার যেতে হচ্ছে। যদি আরো কিছুদিন থেকে যেতে পারতাম পৃথিবীর মানুষের সাথে!” বড়মা অপলক তাকিয়ে দেখছেন মেয়েটিকে। নিঃশব্দে তাঁর চোখ থেকে অশ্রু গড়াচ্ছে, মেয়েটি বলে চলছে, “কেউ যদি তোমার ঐশ্বর্য গ্রহণের দৃশ্য দেখে ফেলে তাহলে ওগুলো আর তুমি মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে পারবে না। আবার দু’শো বছরের শৃঙ্খলে আটকে যাবে এবং অশুভ শক্তির দখলে চলে যাবে। তুমি যদি তোমার পরিবারের লোকদের বোঝাতে না পারো তাহলে আমার সমস্ত চিন্তা নষ্ট হয়ে যাবে। এ ঐশ্বর্য চলে যাবে অশুভশক্তির হাতে। সেক্ষেত্রে অবশ্য আমি ওগুলোকে সরিয়ে দেবো এ এলাকা থেকে। দীঘির উত্তর-পশ্চিম কোণ দিয়ে ওরা বেরিয়ে যাবে নালা খুলে। হয়তো আরো দুশো বছর পর অন্য কোনো এলাকার মানুষ পাবে এ ঐশ্বর্য। সই, খুব সাবধান, কেউ যেন তোমাকে অনুসরণ না করে। এখন যাও সই।” বড়মা একটুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “না আমি যাবো না। তুমি যদি সত্যিই আমার সই হয়ে থাকো তাহলে আমি শুনবো তোমার পরিচয়!” মেয়েটি নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, “এখন দেরি করলে সব কিছু ভেস্তে যাবে। তুমি চলে যাও সই। রাতে দক্ষিণে শিয়র দিয়ে ডান কাতে ঘুমাবে, আমি তোমাকে ঘুমের মধ্যে সব ঘটনা বলে আসবো। যে কেউ এসে পড়তে পারে! তুমি এখন যাও সই।” অগত্যা বড়মা উঠে গেলেন। মাঝিপাড়া পর্যন্ত এলেন। মনে হলো কে যেন পেছন থেকে আলো ধরে পথ দেখালো। মাঝিপাড়া থেকে সুভাষ মাঝিকে নিয়ে বাড়িতে পৌঁছালেন বড়মা। বাড়ির সবাই অবাক চোখে বড়মার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিন্তু কেউ কিছু বললেন না।

রাতে ঘুমাবার আগে কুয়োতলায় গেলে পাশের তেঁতুল গাছ থেকে একটা বিরাট আকৃতির বাদুড় নেমে এলো। দু’পাশে পাখা দু’টি ছড়িয়ে দিয়ে বাদুড়টি হেঁটে হেঁটে এগিয়ে এলো বড়মার দিকে। মনে হলো বিরাট এক খ- কালো মেঘ এগিয়ে আসছে তার দিকে। বড়মা প্রথম ভয় পেলেন কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো দীঘির মেয়েটির কথা। মনে মনে সাহস সঞ্চার করে বললেন, “দূর হ শয়তান, আমি তোকে মোটেই ভয় পাইনি! ভালো চাস তো দূর হ! আমি তোকে অভিশাপ দেবো!” বড়মার কথা শেষ হতেই বাদুড়টি পালিয়ে গেল।
রাতে বড়মা দক্ষিণ শিয়রে ডান কাত হয়ে শুয়ে পড়লেন কাউকে কিছু না বলে। বড়মার স্বামী হঠাৎ শিয়র পরিবর্তনে চিন্তিত হলেন কিন্তু কিছু বললেন না। অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে গেলেন বড়মা। ঘুমের মধ্যে দীঘির মেয়েটি নিঃশব্দে এসে বসলো বড়মার দু’চোখ জুড়ে।
তুমি আমার গল্প শুনতে চেয়েছিলে সই। আমি পাতালপুরীর রাজকন্যা। শয়তান রাক্ষসের দল তন্ত্রমন্ত্র তপস্যায় পাতালপুরীতে যাবার বর পেলো। সবার অজান্তে ওরা একদিন ঢুকে গেল আমাদের পাতালপুরীতে। পাতালপুরীতে আমাদের সুখের দিনগুলো ধীরে ধীরে দুর্বিষহ হয়ে উঠতে থাকলো। আমি যে গল্প বলছি, তা আজ থেকে প্রায় পাঁচশ বছর আগের কথা। পাতালপুরীর গল্প শুনে তোমার কাছে হয়তো রূপকথার মতো লাগছে, কিন্তু এ ঘটনা কোনো রূপকথার কিসসা নয়। তবে এ এক ভিন্ন জীবনের গল্প- যে গল্পের সাথে তোমাদের জীবনের কোনো মিল নেই। পাতালপুরীতে আমাদের জীবন ছিল দীর্ঘ। কেউ কেউ হাজার বছরের আয়ু নিয়ে জন্মাতো। আমি জন্মেছিলাম সাতশ বছরের আয়ু নিয়ে। আগামী পূর্ণিমায় আমার সাতশ বছর পূর্ণ হবে। আমর বয়স যখন দু’শো বছর তখন রাক্ষসেরা আমার বাবার রাজ্য এবং সমস্ত ধন-দৌলত দখল করে নেয়। রাক্ষসেরা আমার বাবা, মা, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে হত্যা করে। আমার এক শিক্ষাগুরু ছিলেন সিদ্ধপুরুষ। তিনি আমাকে রাক্ষসের হাত থেকে রক্ষা করলেন এবং কিছু ঐশ্বর্যসহ তিনশ বছরের জন্য ঘুম পাড়িয়ে রাখলেন। তিনি যে আয়োজন করেছিলেন তাতে আমি তিনশ বছর পর ফিরে পেতাম আমার বাবার রাজ্য। কিন্তু আমার দীর্ঘদিনের একাকীত্ব আমাকে প্রায় উ™£ান্ত করে তুলেছিল- আমি জানি না আমার ঘুমের মধ্যেও আমি টের পেতাম রাক্ষসদের অত্যাচার, টের পেতাম আমার একাকীত্ব। তিনশ বছর পর যখন আমার ঘুম ভাঙলো, আমি আমার শিক্ষাগুরুর সাথে আমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে ফেললাম। আমাদের উত্তেজিত কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি আমাকে অভিশাপ দিলেন, আরো দু’শো বছর জলাশয়ে বন্দি থাকতে হবে এবং আমার ঐশ্বর্যগুলো পাহারা দিতে হবে। আগামী পূর্ণিমায় আমি অভিশাপমুক্ত হবো, একই সাথে আমি আমার জীবনের আয়ুও পূর্ণ করবো। আয়ু ফুরিয়ে গেলে তো আমার আর বেঁচে থাকার সুযোগ নেই সই। আমি আমার ঐশ্বর্যগুলো তাই এ পৃথিবীর মানুষের কল্যাণে লাগিয়ে দিয়ে যেতে চাই। আমার বিশ্বাস তোমার দায়িত্বে থাকলেই ওগুলোর একটা ব্যবস্থা হবে। আমার মনে হয় আমি এখন যেতে পারি। তুমি ঘুমাও।
সোনালি জলকন্যা বড়মার ঘুমের মধ্যে এসে ঘুমের মধ্যেই গল্প বলে চলে গেল। পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে বড়মা রোজকার মতো সংসারের যাবতীয় কাজ করলেন। অন্যদিনের চেয়ে তাঁকে প্রফুল্ল মনে হলো। সবাই অবাক হয়ে বড়মাকে দেখলেন। নতুন করে তাঁকে দেখার মতো কি ছিল, তা কেউ আবিষ্কার করতে পারলেন না। সেদিন সকালে বড়মা আবার এক পারিবারিক সভা আহ্বান করলেন।
সভায় বসে সবাই যথারীতি পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে থাকলেন। বড়মা কথা শুরু করলেন, “মানুষের নিজস্ব গ-িতে তার পৃথিবী। নিজের জ্ঞানের বাইরে যে আয়োজন তা তার উপলব্ধির বাইরে। তাকে নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। আমি আপনাদের অনুরোধ করেছিলাম আপনারা আমার ওপর আস্থা রাখবেন, আমাকে সন্দেহ করে কেউ আমার পিছু নেবেন না। যে বিপুল ঐশ্বর্য আমি পেতে যাচ্ছি, তা আপনারা সন্দেহের আগুনে পুড়িয়ে দিলে বঞ্চিত হবে পৃথিবীর মানুষ! আপনারা হয়তো ভাবছেন মেয়েটির সব কথা তো পরিষ্কার বুঝতেই পারছি না! আপনারা শুধু আমার ওপর আস্থা রাখুন- আমাকে বিশ্বাস করুন। কেন আপনারা আমাকে অবিশ্বাস করছেন! কেন আপনারা আমার পিছু নিয়েছেন!” সবাই এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিলেন বড়মার কথা, এবার কথা বললেন বড়মার শ্বশুর। তাঁর স্বামী বাবার কথায় সুর মিলিয়ে বললেন, “আমরা তোমারে সন্দেহ করছি এই কথা সত্যি নয়।” বড়মা আবার বলতে শুরু করলেন, “সন্দেহ আপনি করেননি সে আমি জানি। কিন্তু অন্য কেউ করছে। আমি বাইরে গেলে আমার পিছু নিচ্ছে। বিশ্বাস করুন, আমি নিজেও বুঝতে পারছি না বিপুল ঐশ্বর্য কেন আমি পাবো। দয়া করে কেউ পিছু নিয়ে পৃথিবীর মানুষকে ঐশ্বর্য থেকে বঞ্চিত করবেন না। আমি আপনাদের সহযোগিতা চাই-দোয়া চাই।” বড়মা উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “আমাকে ক্ষমা করবেন, কাজটা শেষ হবার পূর্বে এর বেশি কিছু আমি বলতে পারছি না।” কথাগুলো বলে বড়মা আর দাঁড়ালেন না। সংসারের কাজে চলে গেলেন। সারাদিন ঘর গৃহস্থলির নানা কাজে ব্যস্ত থাকলেন। তাঁর আচরণে মনে হলো না পরিবর্তন কিছু হয়েছে। ঘর থেকে বড় মা বেরিয়ে যাবার পর পরিবারের সবাই আলোচনা করে রায় ঘোষণা করলেন, মেয়েটি হয়তো পাগল হয়ে যাবে। তাকে বেশি বিরক্ত করা ঠিক হবে না। বড়মার দেবর অবশ্য কাউকে কিছু বললেন না। পরদিন কাটলো স্বাভাবিক, কিন্তু মঙ্গলবার সকাল থেকে বড়মার চেহারা পাল্টে গেল। সবাই অবাক হয়ে লক্ষ করলেন তাঁর চেহারায় এক বাড়তি গাম্ভীর্য! এক অপূর্ব ব্যক্তিত্ব! অদ্ভুত এক দ্যুতি ছড়াচ্ছে চোখ দু’টো থেকে।
মঙ্গলবার সকাল থেকে বড়মার চলাফেরা কথাবার্তায় গাম্ভীর্য লক্ষ করে তাঁকে কেউ কিছু বললো না। কুয়োতলায় একবার দেবরের সাথে চোখাচোখি হলো। দেবর মনে মনে ভেবেছিলেন বড়মাকে একবার জিজ্ঞাসা করবেন, কি আছে সাগরদীঘিতে। বড়মার চোখের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তে নিভে গেল তার সাহস, চলে গেলেন কুয়োতলা থেকে। কুয়োতলায় কাজ করতে করতে বড়মা লক্ষ করলেন দেবর আর শাশুড়ি নিচু গলায় কি যেন আলোচনা করছেন। তাঁদের কথা কিছুই স্পষ্ট নয়, তবে দু’জন যে বড়মাকে নিয়েই আলোচনায় ব্যস্ত তা বোঝা যাচ্ছে।
দুপুরে খাবার পর বড়মা যখন থালাবাসন নিয়ে কুয়োতলায় ব্যস্ত, বাড়ির অন্য সবাই তখন বড়মাকে নিয়ে আলোচনায় মগ্ন। সবার মুখ থমথমে। কেউ কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছেন না যেন। সকলের মুখে তাকিয়ে শাশুড়ি গলায় ঝাঁঝ মিশিয়ে বললেন, “তুমগর সবার ভাব নমুনা তো বালা ঠেকে না আমার কাছে। বাড়ির একজন মানুষ আতেক্কা এমন বদলাইয়া গেল আর কাউর যেন গায়ে বাতাসই লাগে না!” বড়মার স্বামী মায়ের কথায় মৃদু প্রতিবাদ করে বললেন, “আমি তো বুঝি না মাইয়া কি এমন পরিবর্তন তুমি পাইলা তুমগর বউয়ের মধ্যে!” শাশুড়ি ফোঁস করে উঠলেন, “তুইতো কইবি-ই। বউয়ের মাথাডা তো খাইলি তুই নিজে। অত লক্ষ্মী বউ আমার, কি সুন্দর কতা কইতো, আর অহন কি অইলো, ক্যামনে কতা কয় ক্যামনে হাডে-চাইয়া থাহে, যত যাই কছ বাপ, আমার কিন্তু বালা ঠেকতাছে না!” শ্বশুর এতক্ষণ কথা বলেনি। এবার মুখ খুললেন, “তুমি বড় বেশি কতা কও! সবকিছু লইয়াই তুমি বেশি বাড়াবাড়ি কর। আমি তো আমার মায়ের মধ্যে খারাপ কিছু দেহি না। হ কথাবার্তার কিছু পরিবর্তন অইচে কিন্তু হে তো খারাপ না। ভদ্রলোকের মতো সুন্দর সুন্দর কথা কয়।” বড়মার দেবর এবার কথা বললেন, “আপনে যে কি কন বাজান। ভাবির মাথায় যে একবার দুষ দেহা দিছিল আপনের মনে নাই? সাবধান থাহনডা দুষের কিছু না। আইজ রাইতে বাইরে যাইতে চাইলে তারে আটকানি উচিত।” শাশুড়ি ছেলের কথায় জোর দিয়ে বললেন, “দরকার অইলে বাইন্দা রাখতে অইবো। শ্বশুর শাশুড়ির প্রস্তাবের তীব্র প্রতিবাদ করে উঠলেন, “তুমার মাতা তো দেহি এক্কেবারেই গেছে। এই রহম একটা বালা মানুষরে বাইন্দা রাহা কি বুদ্ধিমানের কাম?” দেবর বললেন, “বানতে না চান ছাইরা দেন! আমার মনে অয় রাইতে বাইরাইলে তার পিছে মানুষ লাগানি দরকার!” স্বামী এবার প্রতিবাদ করলেন, “পিছনে মানুষ লাগাইয়া কাম কি? তর ভাবি এমন কিছু করবো না যা হের করা উচিত না। মানুষের উপরে কিছু কিছু বিশ্বাস রাহার দরকার আছে। বিশ্বাসের শিকড় যদি ছিঁড়া যায় তাইলে ঐহানে আর সুখ-শান্তি থাহে না।” আলোচনা এভাবেই অসমাপ্ত রেখে শেষ হলো।
কিছুক্ষণ পর বড়মার স্বামী বড়মার সাথে আলাপে বসলেন।
: কি এমন ঘটনা ঘটবো যা তুমি সবাইরে কইতে পারো না!
: সকলকে বলার মতো হলে নিশ্চয়ই বলে দিতাম।
: আজ রাইতে একা একা না বাইরাইলে চলে না?
: চলবে না কেন! আমার উপর যদি তোমার আস্থা না থাকে- বিশ্বাস না থাকে, তাহলে বেরোবো কেন? তবু একটা কথা থেকে যায়!
: আবার কি কথা?
: না এ কথাটি তোমার স্ত্রী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে; আমার চারপাশের মানুষের মঙ্গলের জন্য সৌভাগ্যক্রমে যদি কিছু পেয়েই যাই, আমার কি সেটা করা উচিত নয়? তুমি হয়তো প্রশ্ন করবে কী পাবো আমি?
: প্রশ্ন করাডাকি অন্যায়?
: না প্রশ্ন করাটা অন্যায় নয়, তবে আমার উত্তর দেবার ক্ষেত্রে কিছু অুসবিধা আছে।
: অসুবিধা কি ?
: অসুবিধা হচ্ছে যার মাধ্যমে আমি ঐশ্বর্য প্রাপ্ত হবো তার দেয়া শর্ত এবং আমার দেয়া প্রতিশ্রুতি।
: সম্পত্তি যার কাছত্যে পাইতাছ তার পরিচয় কি?
: সেটিও তো বলা যাবে না। আমার ধারণা আমি যা বলেছি, তা-ই শেষ সীমানা। এর বেশি কিছু বলতে গেলেই সমস্ত ঐশ্বর্য হাতছাড়া হয়ে যাবে। শুধু হাতছাড়া হয়ে যাবে বলি কেন। যে ঐশ্বর্য মানুষের কল্যাণে আসতে পারে তা-ই মানুষের অকল্যাণে লেগে যাবার সম্ভাবনা। সুতরাং আমি কল্যাণের পক্ষে থাকাটাই সঙ্গত ভাবছি।
স্বামী-স্ত্রীর আলোচনাও যেন অসমাপ্ত অবস্থায় শেষ হলো। ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার আগে বড়মা স্বামীর পা ছুঁয়ে সালাম করলেন এবং দোয়া চাইলেন। স্বামী মুখে কিছু বললেন না। মাথায় হাত রেখে চোখ দু’টি বন্ধ করলেন। বড়মা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন স্বামীর চোখে যেন দু’ফোঁটা অশ্রু ছলছল করে উঠলো।
শাদা রঙের আলোহীন চাঁদটা বিশাল নীল সমুদ্রের বুকে মেঘকন্যাদের সমাবেশে ভেসে বেড়াচ্ছিল; সন্ধ্যার পর দ্রুত পৃথিবীর আলো কমে যাবার সাথে সাথে আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠলো পূর্ণিমা চাঁদ। চাঁদের আলোয় মুখরিত হয়ে উঠলো পৃথিবী। রাতের কাজ শেষ করে দ্রুত শুয়ে পড়লেন বড়মা।
রাত্রি দ্বিপ্রহর, এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়লেন বড়মা। পৃথিবীতে তখন চাঁদের জোছনায় উচ্ছলতা, ধান ক্ষেত পেরিয়ে বড়মা গোপাটে উঠলেন। পেছনে পানের বরজে একটা পেঁচা বিকট শব্দে চিৎকার করে উঠলো। আকাশে চাঁদটা একখ- ঘন মেঘের আড়ালে লুকালে পৃথিবী কিছুটা নিষ্প্রভ হলো। হঠাৎ আকাশে তীব্র আলোয় বিদ্যুৎ চমকালো এবং বিকট শব্দে বজ্রপাতের আওয়াজ হলো। বড়মার বুকের ভেতর একবার ধক করে উঠলো। এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে থাকলেন বড়মা। তারপর আবার হাঁটতে থাকলেন। চাঁদ বেরিয়ে এলো মেঘের আড়াল থেকে, পৃথিবী আবার আলোকিত হলো যথারীতি।
গোপাট থেকে বড় মাটির সড়ক। মাঝিবাড়ি পার হয়ে বড়মা পৌঁছালেন সাগরদীঘির পাড়ে। দীঘির উত্তরপাড়ে। দীঘির স্বচ্ছ পানি জ্যোৎস্নায় হেসে উঠলো, অভিনন্দন জানালো বড়মাকে। দাঁড়িয়ে বড়মা মনে মনে দু’বার ডাকলেন জলকন্যাকে। সমস্ত দীঘিতে বাড়তি উজ্জ্বলতার দ্যুতি ছড়িয়ে ভেসে উঠলো জলকন্যা। জলকন্যার চোখে মুখে কি যেন এক পবিত্র দীপ্তি ছড়াচ্ছে। বড়মা তার মুখের দিকে তাকালেন। মুখের দীপ্তির আড়ালে জলকন্যার চোখে বড়মা দেখলেন বেদনার ছায়া। জলকন্যা মৃদু হাসলো। আকাশে চাঁদটা আবার একটা হালকা শাদা মেঘের আড়ালে চলে গেলে পুকুরের ওপর মেঘের মৃদু একটা ছায়া পড়লো। জলকন্যা বললো, “হাতে বেশি সময় নেই সই। কাজটা তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে। ওদিকে আবার অন্য সমস্যাও আছে। তোমার পেছনে আজো লোক লেগেছে। তার এখানে পৌঁছার আগেই সম্পদগুলো তোমার কাছে হস্তান্তর করতে চাই।” জলকন্যা জলের দিকে তাকিয়ে কি যেন বললো বিড়বিড় করে। দীঘিতে একে একে ভেসে উঠলো সোনার ডেকচি-পাতিল, নৌকা, থালা-বাসন ইত্যাদি। জলকন্যা বাঁ হাতে পানিতে তিনটা টোকা দিতে সবকিছু ছোট হয়ে গেল এবং জলকন্যার চারপাশে ভিড় জমালো। জলকন্যা বললো, “সই হাতে সময় খুবই কম। দ্রুত সব কাজ করতে হবে, আবেগের সময় এখন নয়।” বড়মার চোখ জলকন্যার চোখে বেদনা আবিষ্কার করে অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠছিল।
হাত বাড়ালেন বড়মা। জলকন্যা পানি থেকে কয়েকটি পাতিল তুলে কি যেন বললো তাদের, তারপর বড়মার হাতে তুলে দিল। বড়মার সারা শরীর তখন কাঁপছে ভয়-সংশয়-উত্তেজনায়। বড়মা একবার জিনিসগুলো চোখের সামনে ধরে ভালো করে দেখতে চাইলেন। হঠাৎ কি হলো ডেকচি পাতিলগুলো বড়মার হাত থেকে লাফিয়ে পড়লো পানিতে। বড়মা তাকালেন জলকন্যার দিকে। জলকন্যা কিছু বলবার আগেই সমস্ত দীঘির পানিতে তা-ব শুরু হয়ে গেল। চারপাশ স্বাভাবিক। গাছ লতাপাতায় কোনো কম্পন নেই, কেবল দীঘির পানিতে তা-ব, উত্তাল ঢেউ- জলোচ্ছ্বাস। যেন ঝড় ও প্লাবন। বড়মা ভয় পেলেন। বড়মার শরীরে সামান্য বাতাসও নেই। জলকন্যার শরীরে ঝড়ের তীব্রতা জলকন্যার সোনালি চুল বাতাসে উড়ছে। ভয়ে বিস্ময়ে বড়মা তাকিয়ে আছেন জলকন্যার দিকে। জলকন্যা বড়মার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বললো, “তোমার ভয় নেই সই। যা হবার তাই হয়েছে। আমারই দুর্ভাগ্য মানুষের কল্যাণে আমার ঐশ্বর্য দিয়ে যেতে পারলাম না। বড়মা কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, “কি হয়েছে সই?” জলকন্যার কণ্ঠে দৃঢ়তা নিয়ে বললো, “দুর্ঘটনা যা ঘটবার ঘটে গেছে। আমি তোমাকে বলেছিলাম আমাদের ঐশ্বর্য হস্তান্তর কেউ যেন না দেখে ফেলে, তোমার নিজের লোকদের তুমি ফিরাতে পারলে না সই!” বড়মার চোখমুখ কঠিন হয়ে উঠলো। “বল সই কে আমার পিছু নিয়েছে?” জলকন্যা মৃদু হাসলো। জলকন্যার হাসিতে যেন না বলা বহু কথা বলা হলো। বড়মা জলকন্যার হাসিতে ভয় পেলেন। জলকন্যা শান্ত গলায় বললো, “হাতে আর সময় নেই সই। আমি চাই না আমার ঐশ্বর্যগুলো অশুভ শক্তির কাজে লাগুক। তুমি বাড়ি ফিরে যাও সাতদিনের মধ্যেই তুমি টের পেয়ে যাবে কে তোমার পিছু নিয়েছিল- কে মানুষের কল্যাণের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে।” বড়মা চোখ দু’টি বিস্ফারিত করে বললেন, “তুমি কি তাকে অভিশাপ দিয়েছো সই?” জলকন্যা আবার মৃদু হেসে বললো, “আমি কাউকে অভিশাপ দেইনি। অন্যায় যে করেছে সে অন্তর্দহনেই পুড়ে মরবে!”
জলকন্যা চোখ বন্ধ করে দুই হাত বুকের ওপর জড়ো করলো। সমস্ত দীঘিতে ঝড়ের দোর্দ- তা-ব। জলকন্যা দু’হাত প্রসারিত করলো আকাশের দিকে। কয়েক মুহূর্তে দীঘির ঠিক মাঝখানে ঝড়ের তা-ব কেন্দ্রীভূত হলো এবং প্রচ- এক ঘূর্ণির সৃষ্টি করলো। উজ্জ্বল পূর্ণিমায় সমস্ত প্রকৃতি শান্ত-স্নিগ্ধ। দীঘির ঠিক মাঝখানে তুমুল ঘূর্ণিঝড়। বড়মা অবাক তাকিয়ে দেখছেন সব। জলকন্যা দু’হাত আকাশের দিকে প্রসারিত করে আছে। জলকন্যার দু’চোখ বন্ধ। সোনালি জ্যোৎস্নায় জলকন্যাকে মোমের মূর্তির মতো দেখাচ্ছে। মধ্যদীঘি থেকে ঘূর্ণিঝড়টি এগিয়ে যেতে থাকে দীঘির উত্তর-পশ্চিম কোণার দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যে দীঘির উত্তর-পশ্চিম কোনায় একটি মস্ত নালা তৈরি করে ঘূর্ণিঝড়টি বেরিয়ে গেল। বড়মা ঘূর্ণিঝড়ের চলে যাওয়া দেখছিলেন। এবার জলকন্যার দিকে চোখ ফিরালেন। জলকন্যার হাত আগের মতোই আছে। নিথর-নিশ্চল ধীরে ধীরে ডুবে যেতে থাকলো জলকন্যার দেহ। বড়মার মুখে কথা ফুটবার আগেই জলকন্যা পানিতে তলিয়ে গেল। সমস্ত দীঘিতে নেমে এলো নিস্তব্ধতা-হীম-শীতলতা। প্রচ- ঠা-া বাতাস বয়ে গেল কিছুক্ষণ। শীতে কাঁপতে কাঁপতে বড়মা কখন বাড়িতে ফিরে এলেন টেরও পেলেন না। বাড়িতে ঢুকে দেখলেন তার স্বামী উঠোনে পায়চারী করছেন। বড়মার শরীর কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।
পরদিন সকালে এলাকার মানুষ আবিষ্কার করলো সাগরদীঘির উত্তর-পশ্চিম কোনায় এক নতুন নালা। গ্রামের মানুষ ভিড় করে দেখতে এলো সাগরদীঘির নতুন চেহারা। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে গেল নানান গল্প-কাহিনী। চারদিন পর বড়মার দেবরের কথাবার্তায় এলোমেলো ভাব লক্ষ করলো সবাই। দশদিনের মধ্যে দেবর সম্পূর্ণ পাগল হয়ে গেলেন এবং বাড়ি থেকে বেরিয়ে সাগরদীঘির উত্তর-পশ্চিম পাড়ে আস্তানা গাড়লেন। সাগরদীঘিকে নিয়ে নতুন নতুন গল্প-কাহিনী ছড়ালো। বাড়ির লোকজন, গ্রামের লোকজন অনেক চেষ্টা করেও তাকে দীঘির পাড় থেকে সরাতে পারলো না। বড়মার দেবর কারো সাথে কোনো কথা বলেন না, শুধু বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকেন নালার দিকে আর কিছুক্ষণ পর পর মাথা নাড়েন। মাস দু’য়েক পর একদিন সকালে সবাই দেখলো একটা মানুষ সাগরদীঘির উত্তর-পশ্চিম পাড়ে মরে পড়ে আছে। তিনি আর কেউ নন, আমার বড়মার দেবর। গ্রামের মানুষ সবাই মিলে ওখানেই তাঁকে কবর দিল। ঐ কবরকে ঘিরেই সাগরদীঘির পাড়ে প্রতিষ্ঠিত হলো মাজার। প্রথম কে সেই কবরে সন্ধ্যা প্রদীপ দিয়েছিলেন কেউ জানে না। মাজারকে নিয়েও গ্রামে নানা রকম গল্প ছড়ালো কিছুদিনের মধ্যে। এখনো সাগরদীঘির পাড়ে আছে, মজা পাগলার মাজার। বড়মার মুখেই এ গল্পটি আমি শুনেছিলাম শৈশবে। বড়মার গল্পের রেশ ধরেই আজকের গল্প।
সিফাত বললো, “কিন্তু আপনার বড়মার গল্পটা তো ভয়ের না- মজার।” আমি হেসে বললাম, “মজারই তো। আমি তো বলিনি বড়মার গল্পটা ভয়ের। আমি বলেছিলাম আমার গল্পটা ভয়ঙ্কর। আসল গল্পটা শুরু হবে এখন। বড়মার গল্পটা ছিল আমার গল্পের সূচনা পর্ব। তোমরা শুনেছো সাগরদীঘিতে জলকন্যা যেমন ছিল তেমনি ছিল এক অশুভ শক্তির বাস। বড়মার গল্প জলকন্যাকে নিয়ে আর আমার গল্পটা অশুভ শক্তিকে নিয়ে। আমরা এখন গল্পের ভয়ঙ্কর অংশে প্রবেশ করবো। বলতো এখন কী করা প্রয়োজন।”
রিফাত হেসে বললো, “নিশ্চয়ই এককাপ গরম চা প্রয়োজন।” আমি রিফাতের কথা শুনে সশব্দে হেসে উঠলাম। তারেক ওর আম্মুকে তাড়া দিল চা বানিয়ে দেবার জন্য। ভাবি হাসতে হাসতে বললেন, “আপনার চা খাওয়ার বহর নিয়ে আমার একটা গল্প বানাতে হবে। অভ্যাসটা বদলান!” চা বানাতে চলে গেলেন ভাবি। সিফাত এবার প্রশ্ন করলো, “আচ্ছা মামা নালাটা যে তৈরি হলো এ নালা দিয়েই কি সোনার সব জিনিসপত্র বেরিয়ে গিয়েছিল?” আমি মাথা নেড়ে বললাম, “তাইতো।” তারেক প্রশ্ন করলো, “নালাটা শেষ হলো কোথায় গিয়ে?” আমি মুচকি হেসে বললাম, “মাইলখানেক দূরে একটা বিলের সাথে মিশেছে নালাটা।” রিফাত উৎসাহ নিয়ে প্রশ্ন করলো, “তাহলে কি ঐ জিনিসগুলো এখন বিলের নিচে আছে?” একটুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, “থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে। হয়তো বিল থেকে আবার কোনো পথে বেরিয়ে গেছে। এখন তো আর তা বুঝবার উপায় নেই।” আমার কথায় সবার চোখে মুখে যেন দুশ্চিন্তার একটা ছায়া ছড়িয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ নীরবতা। আমরা সবাই হারানো ঐশ্বর্যের জন্য শোক পালন করছি, এমন সময় চায়ের কাপ হাতে ভাবি ঢুকলেন। আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম “আপনার হাতে জাদু আছে নাকি? অত দ্রুত চা?” ভাবি হাসতে হাসতে উত্তর দিলেন, “জাদু আমার হাতে নয়, জাদু আছে আধুনিক উন্নত ফ্লাক্সের পেটে!” গল্পের আসরে হাসির রোল পড়লো। হাসি থামলে ভাবি বললেন, “মজার গল্প শুনতে বসে ঠকতে চাই না। তাই চা বানিয়ে ফ্লাক্সে ভরে রেখে বসেছিলাম। যখন চাইবেন শুধু ঢেলে আনলেই হলো।” আমি চায়ের কাপ নিতে নিতে বললাম, “আর লোভ দেখাবেন না। শেষে গল্প রেখে শুধু চা-পানই চলবে।” রিফাত এবার ধমকের সুরে বললো, “মামা ফাঁকিবাজি চলবে না। তাড়াতাড়ি গল্প শুরু করুন।” আমি ভয় পাবার ভান করে বললাম, “এইতো ম্যাডাম এক্ষুনি শুরু করছি।”
সবাই গোছগাছ হয়ে বসলে আবার আমি গল্প শুরু করলাম। বড়মার মুখেই বড়মার এ গল্পটি শুনেছিলাম। তিনি সেবার আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। আমি মাত্র স্কুল পেরিয়ে কলেজে ঢুকেছি সেবার। বড়মার গল্পটি আমি মোটেই বিশ্বাস করিনি। কিন্তু তাকে সে কথা বলার সুযোগ ছিল না। আর বড়মা ঘটনাগুলো এমন এক গভীর বিশ্বাস নিয়ে উচ্চারণ করেছিলেন, যে সব মিলিয়ে আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হলো ঘটনাগুলো। শেষ পর্যন্ত সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সেবার বড়মার সাথে গ্রামে চলে গেলাম। বড়মা যখনকার গল্প বলেছিলেন তখন তাঁর যৌবন বয়স আর আমি যখন তদন্তে গেলাম তখন বড়মা শতবর্ষ ছুঁই ছুঁই করছেন। দীর্ঘদিনের ব্যবধানে পরিবেশের প্রচুর পরিবর্তন আসাই স্বাভাবিক। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম বড়মার গল্পের সাথে বাড়ির বর্ণনা পথের বর্ণনা সব যেন হুবহু মিলে যাচ্ছে। সেই কুয়োতলা, গোপাট, মাটির বড় সড়ক, মাঝিপাড়া এবং মাঝিপাড়া পেরিয়ে সেই সাগরদীঘি। সাগরদীঘির উত্তর-পশ্চিম কোণায় মস্ত নালা, নালার পাশে মজা পাগলার মাজার। সন্ধ্যার একটু আগে আমি পৌঁছেছিলাম সাগরদীঘির পাড়ে। সবদিক ঘুরে-ফিরে সন্ধ্যার একটু পর পুকুরের উত্তর পাড়ে দাঁড়ালাম পানির দিকে ফিরে। কেন যেন আমার মনে হয়েছিল ওখানটায় জলকন্যার সাথে দেখা হতো বড়মার। দীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে নিজের অজান্তে মনে মনে আমি জলকন্যাকে ডাকতে থাকলাম। একটুক্ষণ পরে ঘটে গেল অবাক কাণ্ড। আমার দু’চোখ যেন ছানাবড়া হয়ে গেল ঘটনার আকস্মিকতায়।

৭.
পানির নিচে ও কিসের আলো! সোনালি আলোর এক রাজকন্যা শুয়ে আছে পানির নিচে। রাজকন্যার সোনালি চুলগুলো পানিতে ভাসছে যেন। মেয়েটি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসলো। ওর চোখে এবং হাসিতে কি ছিল ঠিক বুঝতে পারলাম না। আমার মনে হলো এই সেই জলকন্যা যার গল্প শুনেছিলাম বড়মার মুখে। মেয়েটির চোখে বেদনা খেলা করছে যেন। মনে হলো জলকন্যা আমাকে বলছে, “তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো? এখানে এই জলের গভীরে আমি অশুভ শক্তির মাঝে মরে পড়ে আছি, আমাকে উদ্ধার কর।” আমি একবার পুকুরের চারদিকে তাকালাম। চারপাশ নীরব-চুপচাপ। বেশ অন্ধকার নেমে পড়েছে যেন হঠাৎ করে। ওপাড়ের বাঁশঝাড়ে দু’একটি জোনাক মিটিমিটি আলো দিতে শুরু করেছে। মজা পাগলার মাজারে কে যেন সান্ধ্যপ্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। আমার খুব ইচ্ছে ছিল মাজারে কে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালে দেখবো- তার কাছে জানবো কেন সে মাজারে বাতি জ্বালায় প্রতিদিন? আবার দীঘির পানিতে তাকালাম কিছু নেই, অন্ধকারে কালো পানি টল টল করছে। আমি যে একটু আগে জলকন্যাকে দেখছিলাম তা-কি মিথ্যা ছিল? সে-কি শুধুই আমার মনের ভুল? মনে মনে বললাম, “জলকন্যা আমি কাল আবার আসবো। অশুভ শক্তিকে আমি মোকাবেলা করতে চাই। চোখ বন্ধ করে আমি আরেকবার আমার অঙ্গীকার উচ্চারণ করি মনে মনে। খুব শীতল একটা বাতাস ছুঁয়ে দিয়ে যায়। মুহূর্তে আমার গায়ে শীত লাগে। আরেকবার আমি দীঘির চারপাশ তাকিয়ে দেখি, অন্ধকার শীতলতা চারদিকে। এবার আমার ভয় লাগে। আমি দীঘির পাড় থেকে ফিরতে চাই। কিন্তু কোনদিকে ফিরবো বুঝে উঠতে পারি না। ভয়ে আমার বুক কাঁপে। আমি প্রায় দৌড়ে গিয়ে মাঝিপাড়ায় উঠি।
মাঝিদের অনেকেই আমাকে চেনে না। অনেকেই আমার পরিচয় জানতে চারপাশে ভিড় করে। আমি কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে ভেতরের ভয়টাকে তাড়িয়ে দিয়ে নিজের পরিচয় বলি। সবাই এবার আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। সারারাত আমার ভয়ে ভয়ে কাটে। বারবার অন্ধকার ভেঙে চোখে ভাসে জলকন্যার সোনালি চুল- আলোকিত মুখ! জলকন্যা বারবার করুণ চোখে তাকাচ্ছে আমার দিকে। বারবার কাতর কণ্ঠে বলছে, “তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো? এখানে এই জলের গভীরে আমি অশুভ শক্তির মাঝে মরে পড়ে আছি, আমাকে উদ্ধার কর!” পরদিন সকালটা কাটলো খুব অস্থিরতার মাঝে। কে যেন আমাকে বারবার ডাকছে দীঘির পাড়ে। মনটা বারবার ছুটে যায় দীঘির দিকে।
দুপুরে লুঙ্গি গামছা নিয়ে স্নানে যাচ্ছি। এক চাচি বললেন, “আব্বা, কই যান গোছল করতে?” বললাম, “সাগরদীঘিতে।” চাচি যেন অস্থির হয়ে উঠলেন, “না-না আব্বা, দীঘিত যাউনের কাম নাই!” আমি চাচির অস্থিরতায় অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, “কেন কি হয়েছে?” চাচি যেন পাশ কেটে যেতে চাইলেন, “না আব্বা, কিছু অয় নাই। দীঘিত গিয়া দরকারডা কি ! বালতিত পানি তুইল্যা দেই বাড়িতই গোছল করেন। আপনেরা শহরের মানুষ দীঘিত ডুবাইয়া কাম কী?” আমি কিছু বললাম না, হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলাম। বাড়ির দহলিজে পড়ে থাকা কাঁঠালের কর্তিত কাণ্ডের পিঠে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। দূরে পানের বরজে ঘুঘুর একটা সুর শুনলাম। ঘুঘুর একটানা সুর শুনতে শুনতে কখন যে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম টের পাইনি। হঠাৎ কার কণ্ঠে আমার আচ্ছন্নতা কাটলো। কানের কাছে কে যেন বললো, “এই সাহস তোমার? অশুভ শক্তির কথা শুনে ঘাবড়ে গেলে! এই সাহস নিয়ে আবার বড়াই কর?” গা ঝাড়া দিয়ে দাঁড়ালাম। নিজেকে লজ্জিত মনে হলো। চোখের ওপর জলকন্যার মুখটা আরেকবার ভেসে উঠলো। জলকন্যা জলমগ্ন কণ্ঠে দূর থেকে ডেকে চলেছে, “তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো? এখানে এই জলের গভীরে…” জলকন্যার ডাক শেষ হবার আগেই আমি সোজা সাগরদীঘির উত্তর পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। ডানে বাঁয়ে কিছু না দেখে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। ডুব দিয়ে মাটি ছুঁয়ে গভীরের দিকে যাচ্ছি। কিছুই নেই। দম ফুরিয়ে গেলে ভেসে উঠলাম। আবার নতুন দম নিয়ে ডুব দিলাম এবং যথারীতি মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে গভীরের দিকে যেতে থাকলাম। মস্ত দীঘি। পঞ্চম ডুবের পর আমি দীঘির ঠিক মাঝামাঝি ভাসলাম। মাঝামাঝি ভেসে আমি একবার দীঘির চারদিকে তাকালাম। মনে হলো চারিদিকে অথৈ পানি। মনে হলো বিশাল সমুদ্রে ভাসছি এবং বাঁচার চেষ্টা করছি। একবার মনে হলো এতটা গভীরে যে এসে পড়লাম, আবার পাড়ে ফিরে যেতে পারবো তো? নিজেকে করা নিজের প্রশ্নে নিজেই হাসলাম মনে মনে। নিজেকে সাহস দিয়ে মনে মনে বললাম, “এই সাহস নিয়ে সাগরদীঘিতে এসেছো অশুভ শক্তির সাথে লড়তে?” ডানে বাঁয়ে না তাকিয়ে আবার ডুব দিলাম। দীঘির মাঝামাঝি।
নেমে যাচ্ছি ধীরে ধীরে নীচের দিকে। আমার দম প্রায় ফুরিয়ে যাচ্ছে অথচ মাটি স্পর্শ করতে পারছি না। একবার ভাবলাম উঠে পড়ি, আবার নিজের মধ্যে এক ধরনের জেদ চেপে গেল। “মাটি স্পর্শ করে তারপর উঠবো।” অবশেষে যখন মাটি স্পর্শ করলাম তখন আমার দম ফুরিয়ে গেছে। পা দিয়ে মাটি ছুঁয়ে শরীরে কেমন একটা শিহরণ অনুভব করলাম। অত্যন্ত কোমল এবং মসৃণ কি একটা লাগলো পায়ে। নিজেকে মাটির কাছাকাছি নিয়ে ছুঁয়ে দেখতে চাইলাম জিনিসটাকে। বুকের ভেতরে আমার আর দম নেই। উপরে উঠে আসা জরুরি মনে হলো। কিন্তু মাথায় আমার কেমন এক পাগলামি চেপে বসলো। খুঁজতে থাকলাম। শেষ পর্যন্ত কিছু পাওয়া গেল না। মন খারাপ করে উপরে উঠতে চেষ্টা করলাম। নিজের শরীরটাকে ভীষণ ভারী মনে হলো আমার কাছে। নিজেকে নিয়ে উপরে উঠতে পারলাম না। আমার চোখে আরেকবার জলকন্যার ছবিটা ভেসে উঠলো। সোনালি মেয়েটা জলের শ্যাওলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে জলের গভীরে। জলকন্যা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো? এখানে জলের গভীরে আমি অশুভ শক্তির মাঝে মরে পড়ে আছি। আমাকে উদ্ধার কর।” এবার মনে হলো পরিশ্রম করে উপরে ওঠার চেয়ে এখানে শুয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে খুঁজে বের করবো জলকন্যাকে। অশুভ শক্তিকে খুঁজে বের করবো! অশুভ শক্তির কথা মনে হতেই বুকের ভেতর টিপটিপ করে উঠলো! আমি কি পানির নিচে পড়ে মরে যাচ্ছি? নাকি অশুভ শক্তিই আমাকে মেরে ফেলতে চাইছে? আবার উপরে উঠতে চেষ্টা করলাম আমি, কিন্তু নিজেকে নিয়ে কোনোভাবেই উঠতে পারলাম না। কেউ আমাকে ধরে রেখেছে এমনও মনে হলো না। উপরের দিকে তাকিয়ে একবার পৃথিবীর আলো দেখতে চেষ্টা করলাম। মনে হলো মাথার ওপরের বিশাল জলের ছাদ পেরিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে আলোকিত পৃথিবী, কিন্তু আমি সেই আলোর দিকে যেতে পারছি না। শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর আকাশের দিকে তাকিয়ে মাটিতে সটান শুয়ে পড়লাম এবং ধীরে ধীরে সবকিছু ভুলে যেতে থাকলাম। চারপাশ ক্রমশ অন্ধকার হয়ে যেতে থাকলো।

৮.
যখন চোখ খুলে তাকালাম দেখি আমার পাশে ছোট্ট একটা মেয়ে বসে আছে। মেয়েটা কিন্তু দেখতে তোমাদের মতো না। সে এক অন্যরকম। কথা দিয়ে ঠিক বোঝানো যাবে না মেয়েটিকে। বলা যায় মেয়েটি খুবই সুন্দর, যেন গতরাতে ফোটা ফুল কিন্তু তার ভেতরেও যেন কি আছে একটা! চোখের দিকে তাকালে মনে হয় হিংস্র-ভয়ঙ্কর কিছু একটা লুকিয়ে আছে। আমি উঠে বসতে চাইলাম কিন্তু নিজেকে কিছুতেই নাড়াতে পারলাম না। মনে হলো সারা শরীর বাঁধা, আষ্টেপৃষ্ঠে যেন আমাকে বেঁধে রাখা হয়েছে। মাথাটা একটু তুলে নিজেকে দেখতে চেষ্টা করলাম। আমি অবাক হলাম, কিন্তু বেশিক্ষণ অবাক হয়ে থাকতে হলো না। আমার অবস্থা বুঝতে পেয়ে মেয়েটি খিলখিল শব্দে হেসে উঠলো। মেয়েটির হাসির শব্দে বিদ্যুৎ খেলে গেল। হাসিটি যেন স্বাভাবিক কোনো হাসি নয়। হাসির পেছনে যেন আরো কিছু নির্মম অনুভূতি লুকিয়ে আছে। হাসতে হাসতে মেয়েটি বললো, “তুমি কি বোকা নাকি?” মেয়েটি হাসতেই থাকলো। মেয়ের কথাগুলো যেন ক্যামন; ক্যামন যেন অন্যরকম। ঠিক মানুষের মতো নয়। এতো সুন্দর করে প্রশ্নটা করলো, আমি যেন হিসাব মিলাতে পারলাম না। আমি শুধু অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলাম মেয়েটির দিকে। মেয়েটি আবার বললো, “বোকা না হলে কেউ কি উঠতে চায়? তুমি এখনো বুঝতে পারোনি, কেন এখানে শুয়ে আছো?” আমি যন্ত্রচালিতের মতো বললাম, “তুমি কি জানো আমি কেন এখানে শুয়ে আছি?” মেয়েটি আবার হাসিতে ঢলে পড়লো। হাসতে হাসতে বললো, “আরে বোকা মানুষ, তোমাকে এখানে বন্দি করে রাখা হয়েছে। এক অদৃশ্য শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে তোমাকে।” এবার আমি বোকার মতোই ছোট্ট মেয়েটিকে প্রশ্ন করলাম, “আমার কি এখানে পড়েই মরতে হবে?” কয়েক মুহূর্ত মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো, “বোকা মানুষ, তোমার কষ্ট করে মরতে হবে না- তোমাকে মারা হবে। তোমার শরীর থেকে এমনভাবে রক্ত শুষে নেয়া হবে, যে তুমি টেরও পাবে না। ধীরে ধীরে রক্তশূন্য হয়ে তুমি মারা যাবে। মারা যাবার আগে জলভূত এসে তোমার হাড় মাংস চিবিয়ে খাবে।” মেয়েটির কথা শুনে আমার কান্না পেলো। আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম আমার দু’চোখ উপচে জল গড়িয়ে পড়লো এবং ধীরে ধীরে তা মিলিয়ে গেল দীঘির জলে। জলের ভেতর জল গড়ানোর এক অবাক দৃশ্য। মেয়েটি আমার কান্না দেখেছে, মনে হলো আমার জন্য মেয়েটির মায়া হলো এবার। আস্তে করে বললো, “তুমি এখান থেকে পালাতে চাও?” আমি অসহায়ের মতো মাথা নাড়ালাম। ছোট্ট মেয়েটি কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে কি ভাবলো। তারপর মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমার আবার ঘুম পেলো; কিন্তু না, ঘুুমিয়ে আমি মেয়েটিকে নিয়ে চিন্তা শুরু করলাম। “কে এই মেয়ে? ও কি মানুষ কেউ? তাহলে এখানে এলো কী করে? ও কি জলভূতের মেয়ে?”
ভাবনার মাঝে কখন যেনো তন্দ্রা এসে গেল। আমার তন্দ্রার মাঝে মেয়েটি ফিরে এসে আমায় চমকে দিল। এক হাতে একটা মলিন ফুল। একটি পাপড়ি ছাড়া সবগুলো পাপড়িই ঝরে গেছে। অন্য হাতে একটা চারা গাছ।
আমার খুব কাছে চলে এলো মেয়েটি। মৃদু কণ্ঠে কথা শুরু করলো, “হাতে মোটেই সময় নেই মানুষ। তোমার কান্না দেখে আমার খুব মায়া হয়েছে, তাই তোমার জন্য একটা ইচ্ছাপূরণ ফুল নিয়ে এলাম। আমি খুব দুঃখিত ফুলে মাত্র একটি পাপড়িই অবশিষ্ট আছে। এ ফুলের প্রতিটি পাপড়িই তোমার একটি ইচ্ছা পূরণ করবে। ফুলের একটা পাপড়ি ছিঁড়ে ফুলের কাছে যা খুশি একটা জিনিস তুমি চাইতে পারবে, যা চাইবে তাই তুমি পাবে। এ ফুলটির একটা মাত্র পাপড়ি ছিঁড়ে এখান থেকে তুমি মুক্তি চাইতে পারো। আর এই যে গাছটি দেখছো এটি ইচ্ছাপূরণ ফুলের গাছ। গাছের এ চারাটি তোমাকে দিলাম। এখন থেকে তিন মাস পর এ গাছে কুঁড়ি আসবে, কুঁড়িটি পরিপূর্ণ ফুল হতে লাগবে আরও তিনমাস; গাছে ঐ একটিই ফুল ফুটবে। পাঁচটা থেকে সাতটা পাপড়ি থাকবে ফুলে। যতগুলো পাপড়ি থাকবে ঠিক ততগুলো ইচ্ছে তোমার পূরণ হবে। আর একটা কথা, তুমি যখন ফুলের কাছে ইচ্ছের কথা বলবে, তখন কিন্তু একটি মাত্র ইচ্ছের কথা বলবে। দু’টি বলে ফেললে কিন্তু ইচ্ছে পূরণ হবে না। গাছটাকে যেন আবার মাটিতে পুঁতে দিও না। একটা পাত্রে দুধের খির দিয়ে তাতে লাগাবে গাছটা। আর যতদিন ফুল ফোটার কাজ শেষ না হবে, প্রতিদিন গাছের গোড়ায় গরুর আধসের খাঁটি দুধ দিবে। লক্ষ রাখবে দুধ দেবার সময় তোমার শরীর যেন পবিত্র থাকে। আরো একটা জরুরি কথা, গাছের গোড়ায় কেউ যদি জল দেয় তাহলে কিন্তু গাছটা মরে যাবে।”
মেয়েটি এবার ইচ্ছাপূরণ ফুল আর চারাটি আমার হাতে ধরিয়ে দিল। অবাক কাণ্ড ওগুলো হাতে নেবার সঙ্গে সঙ্গে আমি যেন সতেজ হয়ে উঠলাম আবার। আনন্দে আমার দু’চোখ দিয়ে আরেকবার জল গড়ালো। মেয়েটাকে বললাম, “তুমি আমার এতবড় উপকার করলে কিন্তু আমি তো তোমার নাম পরিচয় কিছুই জানতে পারলাম না।” মেয়েটি এবার নিঃশব্দে হাসলো। একটুক্ষণ চুপ থেকে বললো, “আমার পরিচয় দিয়ে কী হবে? বিপদের দিনে আমাকে স্মরণ করো। আমি তোমার পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করবো। মানুষ, হাতে এখন মোটেই সময় নেই। তাড়াতাড়ি কর! তাড়াতাড়ি এখান থেকে মুক্তি নিয়ে চলে যাও। কেউ এসে পড়লে কিন্তু সবকিছু প- হবে। তাড়াতাড়ি জানাও তোমার ইচ্ছের কথা, একটি মাত্র ইচ্ছের কথা বলবে কিন্তু!” আমি কৃতজ্ঞকণ্ঠে বললাম, “তুমি আমাকে শিখিয়ে দাও না বন্ধু আমি কী বলবো?” মেয়েটি আবার মৃদু হাসলো- “তুমি যদি বল- ফুল আমাকে এ দীঘির বাইরে নিয়ে যাও এবং বাড়িতে পৌঁছে দাও! তাহলে কাজ হবে না। তুমি বরং বলতে পারো, ফুল আমার ইচ্ছেপূরণ ফুল, তুমি আমাকে এ দীঘির ঘোর থেকে মুক্ত কর! মানুষ, দেরি হয়ে যাচ্ছে তাড়াতাড়ি কর!”
আমার বুক ঢিপঢিপ শুরু হলো। বুকের ভেতর একদিকে সংশয় আর উত্তেজনা। সত্যিই কি ইচ্ছেপূরণ ফুল আমকে মুক্ত করতে পারবে এখান থেকে? অন্যদিকে বেদনা- আমার এ বন্ধুটিকে ছেড়ে যাবো। যে আমার জীবন বাঁচালো কী বলে তাকে কৃতজ্ঞতা জানাবো? মেয়েটি আবার আমাকে তাগাদা করলো, “বন্ধু তুমি দেরি করে ফেলছো! তাড়াতাড়ি কর! তাড়াতাড়ি পাপড়িটা ছিঁড়ে ফুলকে তোমার ইচ্ছের কথা বল। আমার কথা তোমাকে ভাবতে হবে না। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি কর!” আমি ইচ্ছেপূরণ ফুলের শেষ পাপড়িটি ছিঁড়ে ফেললাম, তারপর বললাম, “ফুল! আমার ইচ্ছেপূরণ ফুল, তুমি আমাকে এই দীঘির ঘোর থেকে মুক্ত কর!” আমার চোখের সামনে পাতলা একটা পর্দা পড়ে গেল যেন। মেয়েটির মুখ অস্পষ্ট হয়ে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল। আমি ঘুমিয়ে গেলাম অথবা সংজ্ঞা হারালাম।

৯.
সবাই গল্প শুনছিল, মগ্ন হয়ে। মাঝখানে তারেক হঠাৎ কথা বলে উঠলো, “কাকা মেয়েটা কি ভূতের বাচ্চা?” তারেকের প্রশ্নের সাথে সাথে অন্যরাও কথা বলার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলো। রিফাত বললো, “মেয়েটা যদি ভূতের বাচ্চা হয় তাহলে আপনাকে মুক্তি দিলো কেন?” আমি ওদের থামিয়ে দেবার জন্য বললাম, “বললাম না আমার কান্না দেখে মেয়েটার মায়া হয়েছিল!” সিফাত হেসে বললো, “হু মানুষের জন্য ভূতের বাচ্চার কখনো মায়া হয় না-কি!” আমি হাসতে হাসতে বললাম, “বাচ্চা বয়সে সবাই ভালো থাকে। যখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, তখন নিজের মধ্যে চরিত্রের মূল বিষয়গুলো ফুটে ওঠে। মানুষের বাচ্চার কথাই ধর না কেন, আমরা যখন ছোট থাকি তখন সবাই নিষ্পাপ থাকি, বড় হতে থাকি আর অন্যায়ের সাথে যুক্ত হতে থাকি!” তারেক আবার নতুন প্রসঙ্গের কথা তুললো, “ইচ্ছেপূরণ ফুলের গাছে কি ফুল ফুটেছিল?” তারেকের আম্মা এতক্ষণ মুচকি মুচকি হাসছিলেন। এবার তারেককে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “অপেক্ষা কর। সময় হলে তো বলেবেনই গাছের কথা।” সিফাত আবার অন্য প্রশ্ন করলো, “আপনি তো পানির নিচে মরে যাচ্ছিলেন, তারপর কী হলো?” আমি আবার গল্প বলতে শুরু করলাম।
যখন আমার জ্ঞান ফিরলো, দেখলাম আমি একটা চৌকির ওপর শুয়ে আছি। চোখ মেলে আমি চারপাশে তাকালাম। ধীরে ধীরে সব কিছু পরিস্কার হলো। হঠাৎ ইচ্ছেপূরণ ফুল গাছের চারার কথা মনে হতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। ডান হাতটা চোখের সামনে এনে দেখলাম। তারপর উঠে বসলাম। আমার পাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিল বেশ ক’জন, কেউ কেউ বসেও ছিলেন। আমাকে উঠে বসতে দেখেই আমার এক চাচা এগিয়ে এলেন। যতœ করে আমার একটা হাত ধরলেন কিন্তু অন্য হাতে মাথার চুলে বিলি কেটে দিলেন। আস্তে করে প্রশ্ন করলেন, “কি হইছিল বাবা তোমার?” আমি কোনো উত্তর করলাম না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলাম চাচার মুখের দিকে? চাচার মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ কান্না পেলো। নিজেকে সামলে নিয়ে প্রশ্ন করলাম, “আমার হাতে একটা গাছ ছিল- গাছটা কোথায়?” সবাই পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলো। চাচা বললেন, “কই কিছু তো পাইনাই আমরা।” সকলকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলেন, “তোমরা কিছু পাইছো?” না কেউ কিছু পায়নি। তখনকার মতো সবাই চলে গেল। আমাকে এক গ্লাস গরম দুধ খাওয়ানো হলো। কচু পাতায় করে তিনবার পানি খাওয়ানো হলো। আমি শুয়ে শুয়ে সবগুলো ঘটনা একবার চিন্তা করলাম। কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। সন্ধ্যা হলো। রাত হলো। অনেকেই এসে আমাকে দেখে গেল, নানান কথা বলে গেল। সবার কথায় যা বুঝলাম তার অর্থ হচ্ছে, আমি আগের দিন গোছল করতে গিয়ে ফিরে আসিনি। দুপুরের পর থেকে সবাই আমার খোঁজাখুঁজি করে পায়নি। সারারাত ধরে জল্পনা-কল্পনা চলেছে। সকাল থেকে আশপাশের সবগুলো পুকুরে খোঁজা হয়েছে। সাগরদীঘিতেও খোঁজা হয়েছে। দুপুরের পর দীঘির পাড় দিয়ে যাবার সময় মাঝিপাড়ার অবনী আমাকে আবিষ্কার করেছে ঘাটের কোনায় কিছুটা পানিতে কিছুটা ডাঙায় পড়ে আছি। আমাকে নিয়ে সকলের প্রশ্নের অন্ত নেই। সাগরদীঘি নিয়ে এলাকায় নানা কাহিনী প্রচলিত আছে। আমি কথা বলছি না খুব একটা, তবে লক্ষ করছি সবাই আমার দিকে নজর রাখছে। সারারাত ভালো ঘুম হলো না আমার। শেষ রাতে যখন চোখটা বন্ধ হয়ে এলো, তখনি সেই মেয়েটি। সেই ফুটফুটে মুখ। সোনালি চুল উজ্জ্বল চোখ। আমাকে ডেকে বললো, “মানুষ তোমাকে যে গাছটা দিলাম সেটা তুমি হারিয়ে ফেললে?” মেয়েটির ডাকে আমি লাফ দিয়ে উঠে বসলাম। অপরাধীর মতো তাকিয়ে থাকলাম মেয়েটির মুখের দিকে। মেয়েটি এবার হাসতে হাসতে বললো, “ঘাবড়াবার কিছু নেই। তুমি না আমার বন্ধু! আমি তোমাকে বলেছি তোমাকে সাহায্য করবো।” মেয়েটির কথায় আমি যেন সাহস ফিরে পেলাম। আমার চোখ দু’টি উজ্জ্বল হলো। মেয়েটি আবার বললো, “ভয় নেই বন্ধু। ভোরে যখন আজান হবে তুমি তখন উঠবে। দরজা খুলেই ডানপাশে তাকাবে মাটিতে। ভয় নেই বন্ধু, যা-যা বলেছিলাম কথাগুলো মনে রেখো।” কথাগুলো বলতে বলতে মেয়েটি অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
ভোরের আজান হতেই আমি উঠে বসলাম। দরজা খুলে ডানদিকে তাকিয়ে আমি রীতিমতো অবাক। সেই গাছের চারাটি পড়ে আছে। এখনো আগের মতোই সতেজ। আমি মনে মনে একবার কর্মসূচি ঠিক করে নিলাম।
দুধের ক্ষির বানিয়ে একটা মাটির হাঁড়িতে চারা লাগিয়ে দিলাম, তারপর শুরু হলো পরিচর্যা। প্রতিদিন সকালে গরুর খাঁটি দুধ। বাড়ির সবাই আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়লো। এক মাস গেল, গাছ বেশ বড় হয়ে উঠলো। দু’মাস গেল, গাছটাকে বেশ সবল মনে হলো।
ঠিক তিন মাস পর গাছের মাথায় ছোট্ট একটা কুঁড়ির আভাস পাওয়া গেল। আরো এক মাস হলো, দু’মাস গেল কুঁড়ি ভেঙে ফুল ফুটতে শুরু হলো। আর মাত্র সাতদিন বাকি। সাতদিন পর তিনমাস পূর্ণ হবে। ফুলটা প্রায় পূর্ণতা পেয়েছে। আমার উৎকণ্ঠা! সারাদিন অস্থির, রাতে ভালো ঘুম হচ্ছে না। ছয়দিন! পাঁচদিন! চারদিন! তিনদিন! তিনদিন বাকি। রাতে সেই মেয়েটি এলো। আমাকে আস্তে আস্তে ডেকে জাগালো। “বন্ধু ঘুমিয়েছো? বন্ধু!” মেয়েটির ডাকে আমি লাফ দিয়ে উঠে বসলাম। আমার হাত-পা কাঁপছে। আমার ঠোঁট কাঁপছে। কথা বলতে পারছি না। আমার অবস্থা মেয়েটি বুঝলো। মুচকি হেসে বললো, “ভয় পাবার কিছু নেই বন্ধু। তোমার মনে আছে আর মাত্র তিনদিন বাকি। তিনদিন পর তুমি তোমার ইচ্ছেপূরণ ফুল তুলতে পারবে। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম- “হ্যাঁ মনে আছে! বন্ধু আমি কি তোমার কথামতো সব কাজ করতে পেরেছি?” মেয়েটি চোখ বন্ধ করে মাথা দুলালো- সব ঠিক আছে বন্ধু। এখন শোনো মন দিয়ে। খুব জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ ক’টি কথা তোমাকে বলার জন্য আজ এসেছি। মন দিয়ে শুনবে কথাগুলো।” আমি অবাক চোখে তাকালাম মেয়েটির দিকে। আমার হাত-পা ধীরে ধীরে অবশ হয়ে এলো। মনে মনে নিজেকে শক্ত করে মনোযোগ দিলাম মেয়েটির দিকে। মেয়েটি অবাক কণ্ঠে কথা বলতে শুরু করলো-
“আমি যে তোমাকে মুক্ত হতে সাহায্য করেছি, এ বিষয়টি আমার মা জেনে গেছে। আমি যে তোমাকে ইচ্ছেপূরণ ফুলের একটা চারা দিয়েছি এ কথাটিও মা জেনে গেছে। অবশ্য তোমার ঠিকানা এখনো জানতে পারেনি কেউ। আমার মা তোমাকে খোঁজার জন্য সিপাই নিয়োগ করেছে। ওরা তোমাকে খুঁজছে। আমি ইচ্ছা করলেই তোমার কাছে আসতে পারছি না। আমার কোনো অসুবিধা নেই কিন্তু তোমার খোঁজ পেয়ে গেলেই অসুবিধা। প্রয়োজনে ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে। তোমাকে পঙ্গু বানিয়ে ফেলবে আর তোমার গাছটিকে মেরে ফেলবে।
মেয়েটির কথায় আমার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেল। আমার হাত-পা কাঁপতে থাকলো। আমি কথা বলতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। কাঁপা গলায় বললাম “কে তো…. তোমার মা?” আমার অবস্থা বুঝতে পেরে মেয়েটি সামান্য হাসলো। আমাকে আশ্বস্ত করে বললো, “ভয় নেই বন্ধু আমি আছি তোমার পাশে। তোমাকে কেউ মারতে পারবে না। আমার মা’র পরিচয় জানতে চেয়ো না। আমি জানি আমার পরিচয় জানলে তুমি আমাকে ভয় করবে, তুমি আমাকে ঘৃণা করবে। আমি অবশ্য একটা ভুল করেছি শুরুতেই, তোমাকে ইচ্ছেপূরণ ফুলের চারা না দিলে আমাদের সম্প্রদায় তোমাকে ক্ষমা করে দিতো। এখন তো ইচ্ছেপূরণ ফুল দিয়ে তুমি আমাদের ক্ষতিও করতে পারো। তাই সবাই শঙ্কিত।” মেয়েটির গলা শেষের দিকে ভিজে উঠলো মনে হয়। আমার মেয়েটির জন্য খুব মায়া হলো। নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে বললাম, “তোমাকে আমি বন্ধু বলে ডেকেছি। তুমি আমার জীবন বাঁচিয়েছো। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারি না! তারচেয়ে তুমি এক কাজ কর ইচ্ছেপূরণ ফুলের গাছটি বরং নিয়ে যাও।” মেয়েটি এবার সামান্য শব্দ করে হাসলো। বললো, “একবার তোমাকে যা উপহার দিয়েছি বন্ধু বলে, তাতো আর ফেরত নিতে পারি না। এখন হাতে বেশি সময় নেই। আমি চলে যাচ্ছি। তুমি সাবধানে থেকো বন্ধু। আরেকটা কথা সন্ধ্যায় কখনো বাইরে যাবে না। আর গাছটাকে সাবধানে নিরাপদে রাখবে।” মেয়েটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। আমি ওর সাথে আরো কিছু কথা বলতে চাইলাম কিন্তু তার আগেই ও মিলিয়ে গেল। বিছানা থেকে নেমে আমি কিছুক্ষণ পায়চারী করলাম অন্ধকারে। ইচ্ছেপূরণ ফুলের গাছটিকে একবার দেখলাম। গাছটি আমার চৌকির শিয়রের পাশে থাকে সারারাত। প্রতিদিন সকালে বাইরে রাখি আর সন্ধ্যার আগেই উঠিয়ে ফেলি। এ পরামর্শটি আমার বন্ধুই দিয়েছিল। অন্ধকারের মধ্যে ফুলটি উজ্জ্বল, চমৎকার এক আলো ছড়াচ্ছে। ফুলটির দিকে তাকিয়ে আমি দুশ্চিন্তামগ্ন হলাম। ফুলটি যেন সামান্য নড়ে আমাকে শুভেচ্ছা জানালো।

১০.
সেদিন রাতে আর ঘুমাতে পারলাম না। বারবার শুধু সেই ছোট্ট মেয়েটির মুখ ভাসতে থাকলো চোখে। বারবার মনে হলো দুষ্টচরেরা যদি আগামী দু’দিনের মধ্যে ইচ্ছেপূরণ ফুলের গাছ খুঁজে না পায় তাহলে আমার ছোট্ট বন্ধুটির ওরা ক্ষতি করবে- ওকে শাস্তি দেবে! মেয়েটির সুন্দর মুখে আমি কষ্টের ছায়া দেখতে পেলাম বারবার। একবার ভাবলাম ওদের কাছে ধরা দিয়ে দিই! ক্ষতি যা হবার আমারই হোক। ইচ্ছেপূরণ ফুলের সাহায্যে নিজেকে বড় করে কি হবে! পৃথিবীর পরিপার্শ্বের সাথে সংগ্রাম করে টিকে থাকায়, বিকশিত হওয়ায় যে গৌরব- যে মর্যাদা, সে মর্যাদা কি আমি পাবো ইচ্ছেপূরণ ফুলের কাছে! তার চেয়ে আমার ছোট্ট বন্ধুকে শাস্তির হাত থেকে রক্ষা করি! আবার ভাবলাম ইচ্ছেপূরণ ফুলের সাহায্যে আমি যদি আমার দেশের মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন করতে পারি, তাতে দোষের কী!
পরদিন সারাদিন আমি বিক্ষিপ্ত ঘোরাফেরা করলাম। অস্থিরতার মধ্যে কেটে গেলে সমস্ত দিন। সারাদিন বিশ্রাম হলো না, খাওয়া হলো না, বাসায়ও ফেরা হলো না। বিকেলে নদীর কিনারে বসলাম। ঘাসের ওপর শুয়ে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমের মধ্যে নদী আমায় ডাকলো কানে কানে। আমি স্বপ্নের মধ্যেই উঠে বসলাম। নদী আমাকে বললো, “তুমি এখানে ঘুমিয়ে আছো কেন?” নদীর প্রশ্নে আমি এদিক ওদিক বোকার মতো তাকিয়ে দেখলাম। নদী আমাকে আবার প্রশ্ন করলো, “তোমাকে অমন বিক্ষিপ্ত দেখাচ্ছে কেন? কী কষ্ট তোমার?” আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “কী হবে তোমাকে আমার কষ্টের কথা বলে! আমার কষ্ট আমারই থাক!” নদী আমার কথায় সামান্য হাসলো, “কখন কে কার উপকারে আসবে কে জানে! তুমি যদি আমাকে বন্ধু ভাবতে পারো, তাহলে তোমার কষ্টের কথা শোনাতে পারো আমাকে। আমি হয়তো কোনো উপকারে আসবো না। আবার আসতেও পারি উপকারে।” নদীর কথা শুনে আমার ভেতরে কী হলো বুঝতে পারলাম না। সব ঘটনা খুলে বললাম নদীর কাছে। সব ঘটনা শুনে নদী হাসলো। আমি নদীর হাসিতে কিছুটা ক্ষুব্ধ হলাম। নদী হাসতে হাসতে বললো-
“জীবনটাকে একবার অন্যভাবে দেখ। তোমার ঐ ইচ্ছেপূরণ ফুলের সাহায্য নিয়ে তুমি হয়তো তোমার জন্য, তোমার কাছের মানুষের জন্য কিছু করতেও পারো, কিন্তু তা হবে অশুভচক্রের অনুকম্পা আর তোমার জন্য তা হবে পরাধীনতা!” নদীর কথায় আমি একবার আঁতকে উঠলাম, নিজেকে সামলে বললাম, “যে আমাকে ইচ্ছেপূরণ ফুলের গাছ উপহার দিয়েছে, সে আমার বন্ধু এবং শিশু। শিশুর মধ্যে তো এখনো অশুভ কোনো ছায়া পড়েনি। আমার কথায় নদী আরেকবার খিল খিল শব্দে হাসলো, “হ্যাঁ তা ঠিক। শিশুটি এখনো অশুভ হয়ে ওঠেনি। যখন বড় হবে তখন তো সে তোমাকে ছাড়বে না। তার চেয়ে নিজের দিকে তাকাও। নিজের শ্রম আর মেধা দিয়ে সুন্দর করতে চেষ্টা কর তোমার পৃথিবীকে, তাতে তুমি তৃপ্তি পাবে- পাবে স্বাধীনতার স্বাদ।” আমি অসহায়ের মতো বললাম, “তাহলে এখন আমি কী করবো?” “তোমার কিছুই করতে হবে না। তোমার গাছটা এখন কোথায়?” নদী প্রশ্ন করলো। নদীর প্রশ্নে আমি হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠলাম। নদী আবার প্রশ্ন করলো- “কী হলো তোমার?” আমার শরীর দিয়ে তখন ঘাম ছাড়লো। নদী এবার শান্ত গলায় বললো, “তোমার এখন এখানে ঘুমিয়ে পড়াই ভালো। এখন অশুভ চরেরা নিশ্চয়ই তোমার গাছটিকে নষ্ট করে ফেলছে। তোমাকে পেলে তোমাকেও মেরে ফেলবে। তার চেয়ে তুমি এখানে আছো এখানেই শুয়ে থাকো। আমি নদী- আমি স্বাধীন! আমি তোমাকে আগলে রাখবো। আমি তোমার বন্ধু। তুমি শুয়ে ঘুমাও। কখনো কোনো সমস্যা হলে আমার কাছে এসো পরামর্শ করতে।”
গভীর রাতে আমার ঘুম ভাঙলো। উঠে বসলাম, চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু একটানা ঝিঁঝি পোকার কান্না আর নদীর ছলছল বয়ে চলার শব্দ জেগে আছে। আমি সবকথা মনে করতে চেষ্টা করলাম। বাড়িতে ফিরে যাবার সাহস হারিয়ে ফেললাম।
“নদী বন্ধু আমার- আমি এখন কী করবো?” নদী উত্তর দিল, “তুমি এখানেই ঘুমিয়ে থাকো নিশ্চিন্তে, আমি তোমাকে পাহারা দিচ্ছি। সকালে উঠে সোজা বাড়িতে চলে যাবে। ভয় পাবার কিছু নেই, আমি তোমার পাশেই আছি।” আমি আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়লাম।
খুব সকালে আমার ঘুম ভাঙলো। শরীরটা খুব ঝরঝরে লাগলো। আমি হাঁটতে হাঁটতে বাড়িতে চলে গেলাম। বাড়িতে এসে দেখি ঘরের সামনে ইচ্ছেপূরণ ফুল গাছটি পড়ে আছে। পাশে ছিন্নভিন্ন ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে আছে। বাড়ির সবাইকে ডেকে আমি ফুল গাছটির কথা জিজ্ঞাসা করলাম। কেউ কিছু বলতে পারলো না। সেদিনই দুপুরের পর সোজা শহরে চলে এলাম। পড়ে থাকলো সাগরদীঘি-মজা পাগলার মাজার আর ইচ্ছেপূরণ ফুলের গল্প। সেই থেকে নদীই আমার ভালো বন্ধু। আজো কোনো সংকটে পড়ে নদীর কাছে গিয়ে যদি পরামর্শ করি, নদী আমাকে বন্ধুর মতো পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করে।
আমি কথা বলা থামালাম। আমাকে চুপচাপ দেখে সিফাত রিফাত আর তারেক একসাথে প্রশ্ন করলো- “আপনি কি আর কোনোদিন আপনার সেই ছোট্ট বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাননি? কোনোদিন তাকে ইচ্ছেপূরণ ফুলের জন্য বলেননি?” আমি মৃদু হেসে বললাম, “না। আমি এখন আর অলৌকিক কিছু পেতে চাই না। যা চাই তা নিজের মেধা আর শ্রম দিয়ে অর্জন করতে চাই। গভীর ভালোবেসে কিছু চাইতে পারলে, তা অবশ্যই পাওয়া যায়। আমি বিশ্বাস করি।” সিফাত বললো, “কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন নদীর সাথে কথা বলা শিখিয়ে দেবেন?” বললাম, “হ্যাঁ বলেছিলাম। আজ রাতে একবার নদীর সাথে পরামর্শ করে দেখবো তোমাদের নদীর সাথে কথা বলার কৌশল এখনই শেখানো ঠিক হবে কি-না! যদি নদী বলে শেখানো যাবে, তাহলে কাল সকালে শিখিয়ে দেবো। এখন তোমরা ঘুমাতে যাও! রাত অনেক হয়েছে।”

গল্পের আসর ভাঙলো। আমি চলে এলাম ওদের ছেড়ে। কিছুক্ষণ নদীর কিনারে হাঁটলাম একা একা। নদীর কিনারে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনটা একবার বিক্ষিপ্ত হলো। মনে হলো আমরা যে বাচ্চাদের প্রতিনিয়ত মিথ্যে ভূতের গল্প বলে চলেছি, তাতে তো বাচ্চাদের মনে এক ধরনের ভয় স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে।
হয়তো ওরা বড় হয়ে জানছে ভূত বলে কিছু নেই, কিন্তু ওদের মনে যে ভূতের একটা ছায়া থেকে যাচ্ছে, তা তো যাচ্ছে না!
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেল একটু। আমি দাঁত ব্রাশ করতে করতে গেলাম আমার বন্ধুর বাড়িতে। ভাবি আমাকে চা-নাস্তা দিলেন। আমি চা খেতে খেতে বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছি দেখে ভাবি প্রশ্ন করলেন, “কী হয়েছে আপনার?” ভাবির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললাম, “বাচ্চাদের একবার ডাকুন ভাবি।” ভাবি অবাক চোখে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে বললেন, “বাচ্চারা তো কেউ নেই! ওরা তো একটু আগেই চলে গেল ঢাকায়, সঙ্গে তারেককেও নিয়ে গেছে। কেন কী হয়েছে?” আমার মুখটা মুহূর্তে কালো হয়ে গেল। অসহায় কণ্ঠে বললাম, “না কিছু হয়নি। আমি ওদের বলতে চেয়েছিলাম, আমি ওদের যেসব গল্প বলেছি, তার সবই সত্য নয়। অলৌকিক যা কিছু বলেছি তার সবই সত্য নয়। অলৌকিক বলে কিছু নেই! অলৌকিক যা কিছু বলেছি তার সবটাই সত্যের সাথে মিথ্যার খাদ। খাদ গল্পকে আনন্দঘন করে, কিন্তু সেগুলো কখনোই সত্য নয়।

  • আরও পড়ুন
  • লেখকের অন্যান্য লেখা